Monday, 28 July 2025

পিতিবেশী

প্রতিবেশী শব্দটা অপভ্রংশ হয়ে পিতিবেশী হয়েছেন আমার ঠাকুমার ( আমরা দাদি বলতাম) কল্যাণে। জমিদার কন্যা ব্রিটিশ আমলে জজসাহেবের পুত্রবধূ, যাঁর স্বামী ও ব্রিটিশ সরকারের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, যাঁকে অফিস নিয়ে যাওয়া বা বাড়িতে আসার সময় চোগা চাপকান ও পাগড়ি পরিহিত বিরাট গোঁফ ওয়ালা সান্ত্রী আসতো তাঁর মেজাজ তো থাকবেই। ঠাকু্র্দা( আমরা দাদু বলতাম) যত ই রাশভারী হোন না কেন বাড়িতে দাদির কথাই শেষ কথা। ওখানে কারো ট্যাঁ ফোঁ চলবে না , দাদু তখন কেঁচো। আসতে আসতে বড় হচ্ছি, শব্দটা কানে বেসুরো ঠেকতো বলে দাদিকে বললাম," তুমি পিতিবেশী পিতিবেশী বল কেন, প্রতিবেশী বলতে পারোনা?"  অন্য কোন নাতি নাতনীদের কাছে এরকম কথা শুনলে দাদির ঝাঁঝের চোটে তাকে তখনই বাড়ি ছাড়া হতে হতো কিন্তু সবচেয়ে ছোট বলে আমাকে একটু বেশিই ভাল বাসতেন, বলা যায় একটু বেশিই লাই দিতেন। তাই হেসে বললেন," বাবা, তোমরা স্কুলে যাচ্ছো, পড়াশোনা করছো, তোমরা বলবে এরকম কথা, আমরা তো গাঁয়ের মেয়ে, আমরা তো অত পড়াশোনা করিনি ,আমি ঐটাই বলব। " জেদ এটাকেই বলে। বাড়ির অন্য কেউ এই কথা বলে পার পেয়ে যেত না।
পাড়ার কোন ছেলে মেয়ে হুটহাট বাড়িতে ঢুকলে যদি দাদির নজরে পড়ত তাহলে আর রক্ষা নেই, চেঁচিয়ে তার গুষ্টির ষষ্টি পূজো করে দিত। সবাই এক কথায় বলতো দজ্জাল মহিলা। কিন্তু এই দাদিই ছিল অন্য মানুষ যদি তাঁকে জিজ্ঞেস করে কেউ কিছু করত। ছোট বেলায়  তাঁর এই দ্বৈত আচরণ কিছুতেই বোধগম্য হতো না। বাড়িতে দুটো পেয়ারা গাছ, দুটো আম গাছ, ফলের ভারে সবসময়ই নুয়ে পড়তো। টিয়া পাখি, কাঠবিড়ালি এসে পেয়ারা তলা, আমতলা আধখাওয়া ফলে ভরিয়ে দিত, তারা থোড়াই দাদিকে পাত্তা দেয়? পাড়ার ছেলেরা এসে যদি দাদির কাছে ফল পাড়ার কথা বলত, দাদি খুশী হয়ে বলত, " যাও, যত পার নিয়ে যাও " কিন্তু কিছু বদমাইশ ছেলে তো সবসময়ই থাকে, তারা চুপিসারে এসে আম বা পেয়ারা পাড়তে ভালবাসতো, আর এখানেই দাদির আপত্তি, দেখতে পেলেই চেঁচিয়ে ভেবিয়ে পাড়া মাত করে দিত। অবশ্য চুরি করে খাওয়ার মজাই আলাদা। এই দাদির কাছে বসে একদিন রাতে জিজ্ঞেস করলাম , " দাদি, এই পিতিবেশী বা প্রতিবেশী কাকে বলে?" দাদির সোজাসাপটা উত্তর , যে তোমার দরকার অদরকারে তোমার পাশে এসে দাঁড়াবে, সেই তোমার পিতিবেশী।" দাদি গ্রামের মেয়ে হলেও হিন্দু মুসলমান নিয়ে কোনদিন বাড়াবাড়ি করেনি। আমাদের বাড়ির লাগোয়ায় ছিল বাবুয়া খলিফার বাড়ি। বাবুয়া খলিফা পেশায় দর্জি হলেও উনি কিন্তু মৌলভি ছিলেন এবং তাঁর তত্ত্বাবধানে বিয়ে বা নিকা হতো। তাঁর পাঁচ ছেলে সাত্তার ,সাদিক, হুল্লুক, হামিদ ও হানিফ এবং তিনটে মেয়ে ছিল  ফুতু, বুলি ও আমিনা বা " বু"। কয়েকটা বাড়ির পরেই ছিল মুসলমান পাড়া। কিন্তু বাবুয়া খলিফা অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি ছিলেন এবং আমাদের বাড়িতে তাঁর যথেষ্ট আসা যাওয়া ছিল। দাদির পরিভাষায় উনি একজন পিতিবেশী। পশ্চিম দিকে পাখি সান্যালের মাসী শ্বাশুড়ি তিনিও একজন, ওদিকে ভট্টাচার্য পাড়ার ফেনু বাবু ( যিনি খ্রিস্টান ধর্ম নিয়েছিলেন ) তিনিও একজন পিতিবেশী। এছাড়াও পাড়ার সমস্ত বাড়ির ভদ্রমহিলা যাঁরা তাঁর সমবয়সী ছিলেন তাঁরাও পিতিবেশী। জিজ্ঞেস করলাম যে দাদি, তাহলে বাদ গেল কে এবং তুমি এত চেঁচামেচি কর কেন? পাড়ার ছেলেরা আম বা পেয়ারা পাড়তে এলে বা ঘুড়ি ধরতে এলে চেঁচামেচি কর কেন? এবার মুখ খুললেন দাদি, দেখ আমাকে না জিজ্ঞেস করে যদি কেউ কিছু করে তাহলে আমি কেন চেঁচাব না? আমি তো সবসময়ই ওদের বলি আমাকে জিজ্ঞেস করে কাজটা কর। আমি বুঝলাম যে দাদির অহঙ্কারে এই অবজ্ঞা লাগে। সত্যিই তো, একটু বললেই যদি  সোজা রাস্তায় কাজটা হয়ে যায়, তাহলে চুরি চামারি করে দাদিকে 
রাগানো কেন? আসলে ছেলেরা একটু মজা করতে চায়। বাড়ির মাঠে নাটক ও বিচিত্রানুষ্ঠান হবে অথচ আকাশের মুখ ভার। কে হঠাৎ বলে উঠল আমার দাদির কোন নিত্য ব্যবহার্য জিনিস লুকিয়ে রাখ। দাদি জিনিসটা দেখতে না পেয়েই চেঁচামেচি করবে ও গালমন্দ শুরু করবে আর তাতেই নাকি বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যাবে। যা বলা, তাই কাজ। বাদল দা  দাদির ঘটি লুকিয়ে রেখেছে আর দাদি দেখতে না পেয়েই চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছে কিন্তু বৃষ্টি বন্ধ হবার কোন লক্ষনই দেখা যাচ্ছে না দেখে ঘটিটাকে চুপিসারে বাদল দা রেখে দিল। অন্ধকারে দাদি ঘটি ফিরে পেতেই একদম ঠাণ্ডা জল হয়ে গেল দাদি। দাদির মাথা গরম হলে একমাত্র রক্ষাকর্তা আমি। না বাবা, না মা বা জ্যাঠামশাই,জেঠিমা কেউ না। দাদু খুব ঠাণ্ডা প্রকৃতির মানুষ, দাদু কিছু বলতে গেলেই উল্টে বিপত্তি, সব নষ্টের মূল হচ্ছো তুমি। ভদ্রলোক দাদু পালাতে পারলে বাঁচেন।

এহেন পিতিবেশীর সংজ্ঞা আবার মনে পড়ে গেল যখন পূর্ব দিকের বাড়ির ভদ্রলোক চলে গেলেন। এই ওড়িয়া পরিবারের সঙ্গে কোনদিন কথাবার্তা ও হয়নি। কিন্তু কেন জানিনা এই পরিবারের সমস্ত সদস্যদের ই দেখে খুব পরিচ্ছন্ন পরিবার বলে মনে হতো। সকাল সন্ধে হুলুধ্বনি, শাঁখ বাজিয়ে পূজো, ছোট ছেলেটা ঘন্টা নাড়িয়ে ব্যালকনিতে এসে তুলসিমঞ্চে জল দিচ্ছে বা ধূপকাঠি জ্বালিয়ে  সন্ধে দিচ্ছে  এসব দেখে মনে হতো যে বাড়ির একটা ভ্যালু সিস্টেম রয়েছে। ওর দিদি টা বিশেষ বড় নয় কিন্তু ভাইকে পড়ানোর ধরণ দেখে নিজের মনের মধ্যেই একটা ছবি এঁকে ফেলেছিলাম। মাঝে মাঝেই বলতাম এই পরিবারের সবাই খুব পরিচ্ছন্ন। কয়েকদিন ধরেই দেখছি অনেক রাত অবধি আলো জ্বলছে, ভাবলাম আজকাল ছেলেমেয়েদের কাজ কর্মের ধারা পাল্টেছে, সেই কারণেই হয়তো দেরী কিন্তু আমার ধারণা ভুল। তারা গোছগাছ করে চলে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। পরশু দেখি এয়ার কন্ডিশনারটা খুলছে। একটু অবাক হয়েই গেলাম নতুন এয়ার কন্ডিশনারটা এর মধ্যেই বিগড়ালো? কেবলই মনের মধ্যে একটা অযথা আগ্রহ জেগে উঠছে। কিন্তু কেন, কোনদিন ভদ্রলোক বা ভদ্রমহিলা বা তাঁদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কথা হয়নি অথচ আমার কৌতুহল কমছে না। গতকাল ছেলেটা বাঁশি বাজাচ্ছিল, কিছুদিন ধরেই শিখছে। খেয়াল করতাম যে আমি যে সরগম গুলো করছি ঐ ছেলেটি সেটা করার চেষ্টা করছে। বেশ আনন্দ হলো, কাউকেই কোনদিন গান শেখাইনি,হয়তো মাঝে মধ্যে কাউকে একটু আধটু দেখিয়ে দিয়েছি বড় জোর। আর এই ছেলেটি একলব্যের মতো নিষ্ঠার সঙ্গে আমি যেগুলো করছি, সেইগুলোই করছে ভেবে খুশিতে মনটা ভরে যেত। আমার মনের ভুল ও হতে পারে। হয়তো যে মাস্টার মশাইয়ের কাছে ছেলেটি শিখছে তিনিই হয়তো ঐগুলো দিয়েছেন কিন্তু আমি মনে মনে ভাবতাম আর প্রার্থনা করতাম যে ছেলেটা যেন খুব ভালভাবে বাজাতে পারে। গতকাল ও ছেলেটি গাছে জল দিয়েছে কিন্তু আজ তাকে বা তার দিদিকে দেখতে পেলাম না। সকাল বেলায় দেখি ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলা জামাকাপড় মেলার দড়িটা খুলছেন এবং জামাকাপড়গুলো উঠিয়ে নিচ্ছেন। আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। জিজ্ঞেস করলাম আপনারা কি চলে যাচ্ছেন? 
হ্যাঁ।
শুনে জিজ্ঞেস করলাম কি ট্রান্সফার হয়ে যাচ্ছেন?
না, পল্লীশ্রীতে একটা ফ্ল্যাট কিনেছি, অনেকদিন এখানে ছিলাম, মনটা বেশ খারাপ লাগছে।
আমি বললাম, মন খারাপ করবেন না, নিজের ফ্ল্যাটে চলে যাচ্ছেন, এ তো বড় খুশীর খবর। অভিনন্দন জানালাম এবং বললাম যে কাছেই যাচ্ছেন, সময় সুযোগ করে আসবেন।

এতদিন সামনাসামনি থাকলাম, কোনদিন কোন বাক্যালাপ ও হয়নি, অথচ আজ বিদায় বেলায় তাঁকে আমন্ত্রণ জানালাম বাড়িতে আসার জন্য।  ইনি তাহলে একজন নিশ্চয়ই পিতিবেশী। কিন্তু দাদির কথা অনুযায়ী ইনি কোনভাবেই আমাদের পরিবারের সঙ্গে যুক্ত হননি, তাহলে তো দাদির কথা মিলছে না। না, এঁদের মানসিক তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের সঙ্গে আমার মনের তরঙ্গ মিলে একটা রেসোন্যান্স তৈরী হয়েছে আর সেই কারণেই ওঁদের চলে যাওয়াটা মনের মধ্যে এইরকম একটা ঢেউয়ের সৃষ্টি করেছে। নিশ্চয়ই ইনি পিতিবেশী থুড়ি প্রতিবেশী।

Saturday, 26 July 2025

মনসুখ ভাইয়ের রোজনামচা

আমেদাবাদ শহরে " বাসনা " অঞ্চলে মনসুখ ভাইয়ের আস্তানা। আস্তানা শব্দটা কানে এলেই মনে হয় একটা বাড়ি(গেট ওয়ালা বড় বাড়ি কিংবা নিদেন পক্ষে  একটা ছোট কুঁড়ে ঘর) কিন্তু মনসুখ ভাইয়ের আস্তানা খোঁজ করতে গিয়ে আমি রীতিমতো নাস্তানাবুদ হয়ে গেলাম।

যে গেস্টহাউসে ছিলাম তার বাইরে গেটের ধারে কোন সাতসকালে এসে ঠেলাগাড়ি নিয়ে এসে যেত মনসুখ ভাই, আর সকাল থেকেই তার খরিদ্দার আসতে শুরু করে দিত, কেউ নিত ইডলি বড়া আবার কেউ বা নিত ডাল বড়া ও কান্দা ভাজি( আমাদের পরিভাষায় পেঁয়াজি)। কিন্তু মোটামুটি বেলা বারোটা বাজতেই সেই ঠেলাগাড়ি সমেত মানুষটাই উধাও।  বেশ কিছুদিন হলো গেস্টহাউসেই আছি, ফ্ল্যাটের অ্যালটমেন্ট এখনও আসেনি, অফিস করতে হচ্ছে  সেই গেস্টহাউস থেকেই। সকালের জলখাবারটা মনসুখ ভাইয়ের কাছ থেকেই নিচ্ছি কারণ সেই একঘেয়ে ব্রেড, বাটার আর ওমলেট মুখে রুচছে না। কিন্তু মুশকিল হলো ওর কাছে সবসময়ই ভিড়, আমার কাছে টাকা ওর নেওয়া হয়ে ওঠেনা, বলে বাদ যে একসাথে লে লেঙ্গে, বরাবর(মানে ঠিক আছে)। একটু অস্বস্তি ই হয় কারণ আমার ফিরে আসার সময় সে তো থাকেনা।

এদিকে ফ্ল্যাটের অ্যালটমেন্ট এসে গেছে, আমাকে চলে যেতে হবে। ফিরে এসে দেখি মনসুখ ভাই নেই। গেস্টহাউসের কেয়ারটেকারের কাছে দিতে গেলাম কিন্তু কেন জানি না ও নিল না, সম্ভবত ওর ব্যবসার লাভে ভাগ বসিয়েছে বলে। মনটা খচখচ করছে গরীব মানুষের পয়সা না দিতে পারার জন্য। যাই হোক রবিবার ঠিক করলাম আজ যে ভাবেই হোক ওর পয়সা মেটাবোই। কিন্তু সকালে উঠতে দেরি হওয়ায় এবং শহরের অন্য প্রান্ত থেকে আসতে দেরি হয়ে গেল এবং যথারীতি ও ভাগলবা। কিন্তু আমি ওকে আজ যেভাবেই হোক পয়সা দিয়ে যাব ই ঠিক করেছি। আশেপাশের লোককে জিজ্ঞেস করে তিনটে মোড় পেরিয়ে পেলাম দেখা তার বাড়ি। কিন্তু ততক্ষণে অনেক সময় গড়িয়ে গেছে। খিদেতে পেট চোঁ চোঁ করছে কারণ বিভিন্ন লোকের বিভিন্ন রকম দিক নির্দেশন যার ফলে আমার আজ হাঁড়ির হাল।
 মোড়ের কাছে একটা পার্ক আর তার কাছেই এক জৈন মন্দির। মন্দিরের লাগোয়া একটা দেয়ালে রয়েছে মনসুখ ভাইয়ের সেই গাড়ি। চারটে ইট দিয়ে আটকানো আছে গাড়ির চাকা আর একটা শিকল দিয়ে একটা চাকা বাঁধা আছে দেয়ালের রেলিং এর সঙ্গে যাতে গাড়িটা বেসামাল হয়ে অন্য জায়গায় না চলে যায়। গ্যাসের স্টোভ, কড়াই গাড়ির পেটের তলে একটা বাক্সে চলে গেছে যেটা এখন তালা বন্ধ এবং ওপরের পাটাতনে যেখান থেকে অন্য সময় বিক্রি পাট্টা করে সেখানে একটা চটের উপর চাদর বিছিয়ে পরমানন্দে মনসুখ ভাই ঘুমিয়ে আছে। ঘুম ভাঙাতে একটু মনটা খারাপ ই লাগছিল কিন্তু আমাকে আবার ফিরে আসতে হবে ভেবে ডেকেই ফেললাম। সারাদিন এত পরিশ্রম করে যে কয়েকবার ডাকার পর তার ঘুম ভাঙলো এবং চোখ কচলাতে কচলাতে বলল, " সাব, আপ!" ম্যায় আপকো পাস যো বহুত কর্জ হ্যায়, উয়ো চুকানে কে লিয়ে আয়া হুঁ।" এতনা তকলিফ কিঁউ উঠায়া সাব? আপ থোড়ি ভাগনে বালা আদমী হ্যায়? একটু অবাক হয়ে গেলাম ওর আমার উপর ভরসা করা দেখে। সাধারণত কেউ ধারে কোন জিনিস দিতে চায়না আর দিলেও পয়সা ফেরত পাওয়া এক ভাগ্যের ব্যাপার কিন্তু যে লোকটার এই গাড়িটাই সম্বল, এটাই ওর কর্মস্থল এবং ঘর সেই লোকটা কেবল বিশ্বাসের উপর ভরসা করে এত টাকা বাকি থাকা সত্ত্বেও এত নিশ্চিন্তে কি করে ঘুমায়? আসলে যাদের অনেক সম্পদ তারা সামলাতেই ব্যস্ত আর যারা ভগবানের উপর ভরসা করে সামান্য পূঁজি নিয়ে সৎপথে এগিয়ে চলে তারাই বোধহয় এত নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে। জিজ্ঞেস করলাম যে বারিশ কা মৌসমমে ক্যায়সে রহতে হ্যায় ইঁহা?  ও দেখালো প্লাস্টিকের চাদর। এই দিয়ে বৃষ্টির সঙ্গে যুদ্ধ করে। এইরকম মনসুখ ভাই সারা দেশে আনাচে কানাচে ছড়িয়ে আছে এবং যথেষ্ট সততার সঙ্গে বেঁচে আছে আর অন্যদিকে প্রচুর সম্পদের মালিক তারা কত অসদুপায়ে টাকা রোজগারের ফন্দিফিকির খুঁজছে। এরাই  চিরদিন বলীয়ান আর মনসুখ ভাইদের সততার পুণ্যে এই অসৎ লোকগুলো মাথার উপর বসে রাজত্ব করে চলেছে।
মনসুখ ভাই আপনারা বেঁচে থাকুন অনেকদিন। ভগবান আপনাদের মঙ্গল করুন।

Wednesday, 9 July 2025

স্মৃতি ও বিবেক

স্মৃতির সঙ্গে বিবেকের কোন সম্পর্ক আছে কিনা ঠিক জানা নেই। কিন্তু একটা কথা ঠিক যে বিবেকের দংশন হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিকে হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে টেনে বার করে আনে। প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই হৃদয় বলে কিছু জিনিস থাকে কিন্তু কোন কোন সময় তা বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক কারণে চাপা পড়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে পারেনা কিন্তু আগুন যেমন চিরকাল ছাই চাপা পড়ে থাকেনা ঠিক সেই রকমই হৃদয়ের বাহ্যিক প্রকাশ হবেই। বিবেক তাকে ঠিক টেনে আনবেই। দুর্বাসা মুনির আশীর্বাদে কুন্তী সূর্যদেবের আবাহন করতেই ঘটে গেল বিপত্তি, জন্ম হলো কর্ণের এবং কুন্তী তাকে ঝুড়িতে শুইয়ে দিয়ে জলে ভাসিয়ে দিয়ে তখনকার মতো নিজের লজ্জ্বা বাঁচালেন বটে কিন্তু বিবেকের তাগিদেই হোক আর কুরুপাণ্ডবের যুদ্ধে নিজের ই এক সন্তান অন্য পাঁচ সন্তানের সঙ্গে যুদ্ধ যাতে না করে সেই কারণেই হোক, যুদ্ধের আগের দিন সন্ধ্যা বেলায় কর্ণের কাছে নিজের পরিচয় দিতে গেলেন , কিছুটা কি আত্মগ্লানি ঘোচাতে নয়? কবিগুরুর কলমে ঝরেছে, " লোভে যদি কারে দিয়ে থাকি দুখ, ভয়ে হয়ে থাকি কর্ম বিমুখ, পরের পীড়ায় পেয়ে থাকি সুখ মোহের ভরে, আমার বিচার তুমি করো তব আপন করে।" সুতরাং কোন না কোন সময় মানুষ বিবেকের দংশনে কাতর হবেই এবং দীর্ঘদিনের অব্যক্ত যন্ত্রণা বেরিয়ে আসবেই।

সন্তানেরা তাদের বাবা মায়ের অত্যন্ত প্রিয় জিনিস বা শখের জিনিস তাঁদের মৃত্যুর পর বিক্রি করে দেয় হয় লোভের বশে কিংবা একাধিক ভাইবোন থাকলে কে সেই জিনিসটা রাখবে তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে যাতে সম্পর্কের হানি না ঘটে বা সেই জিনিসের রক্ষণাবেক্ষণ আদৌ সম্ভব হবে কিনা সেটা ভেবে বা কিছু অর্থাগম হবে এই আশায়। এখানে ভাবাবেগ কোন কাজ করেনা এবং কারো সেটা থাকলে তাকে নানাভাবে প্রকাশ করতে দেওয়া হয়না। অথচ জিনিসটা হস্তান্তরিত হবার পর ক্রেতা যখন মূল জিনিসটা অবিকৃত রেখে তার সৌন্দর্য বাড়ায়, তখন তাদের বিবেক জাগ্রত হয় বা ভাবাবেগ বেরিয়ে আসে এবং চোখের জল ফেলে। জিনিসটাকে ধরে রাখা যে খুব কঠিন ছিল তা নয় কিন্তু যে কোন কারণেই হোক তাকে তো ধরে রাখার চেষ্টা করাই হয়নি বা যে ধরে রাখার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছিল তাকেও যেন তেন প্রকারেণ তাকে দমিয়ে রাখা হয়েছিল। আমরা কোন জিনিসের মূল্য তার জীবদ্দশায় ঠিক বুঝে উঠতে পারিনা, তার মূল্যায়ন হয় সেটা হাতছাড়া হবার পর। এটা কি বিবেকের দংশন না আর কিছু?