পাড়ার কোন ছেলে মেয়ে হুটহাট বাড়িতে ঢুকলে যদি দাদির নজরে পড়ত তাহলে আর রক্ষা নেই, চেঁচিয়ে তার গুষ্টির ষষ্টি পূজো করে দিত। সবাই এক কথায় বলতো দজ্জাল মহিলা। কিন্তু এই দাদিই ছিল অন্য মানুষ যদি তাঁকে জিজ্ঞেস করে কেউ কিছু করত। ছোট বেলায় তাঁর এই দ্বৈত আচরণ কিছুতেই বোধগম্য হতো না। বাড়িতে দুটো পেয়ারা গাছ, দুটো আম গাছ, ফলের ভারে সবসময়ই নুয়ে পড়তো। টিয়া পাখি, কাঠবিড়ালি এসে পেয়ারা তলা, আমতলা আধখাওয়া ফলে ভরিয়ে দিত, তারা থোড়াই দাদিকে পাত্তা দেয়? পাড়ার ছেলেরা এসে যদি দাদির কাছে ফল পাড়ার কথা বলত, দাদি খুশী হয়ে বলত, " যাও, যত পার নিয়ে যাও " কিন্তু কিছু বদমাইশ ছেলে তো সবসময়ই থাকে, তারা চুপিসারে এসে আম বা পেয়ারা পাড়তে ভালবাসতো, আর এখানেই দাদির আপত্তি, দেখতে পেলেই চেঁচিয়ে ভেবিয়ে পাড়া মাত করে দিত। অবশ্য চুরি করে খাওয়ার মজাই আলাদা। এই দাদির কাছে বসে একদিন রাতে জিজ্ঞেস করলাম , " দাদি, এই পিতিবেশী বা প্রতিবেশী কাকে বলে?" দাদির সোজাসাপটা উত্তর , যে তোমার দরকার অদরকারে তোমার পাশে এসে দাঁড়াবে, সেই তোমার পিতিবেশী।" দাদি গ্রামের মেয়ে হলেও হিন্দু মুসলমান নিয়ে কোনদিন বাড়াবাড়ি করেনি। আমাদের বাড়ির লাগোয়ায় ছিল বাবুয়া খলিফার বাড়ি। বাবুয়া খলিফা পেশায় দর্জি হলেও উনি কিন্তু মৌলভি ছিলেন এবং তাঁর তত্ত্বাবধানে বিয়ে বা নিকা হতো। তাঁর পাঁচ ছেলে সাত্তার ,সাদিক, হুল্লুক, হামিদ ও হানিফ এবং তিনটে মেয়ে ছিল ফুতু, বুলি ও আমিনা বা " বু"। কয়েকটা বাড়ির পরেই ছিল মুসলমান পাড়া। কিন্তু বাবুয়া খলিফা অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি ছিলেন এবং আমাদের বাড়িতে তাঁর যথেষ্ট আসা যাওয়া ছিল। দাদির পরিভাষায় উনি একজন পিতিবেশী। পশ্চিম দিকে পাখি সান্যালের মাসী শ্বাশুড়ি তিনিও একজন, ওদিকে ভট্টাচার্য পাড়ার ফেনু বাবু ( যিনি খ্রিস্টান ধর্ম নিয়েছিলেন ) তিনিও একজন পিতিবেশী। এছাড়াও পাড়ার সমস্ত বাড়ির ভদ্রমহিলা যাঁরা তাঁর সমবয়সী ছিলেন তাঁরাও পিতিবেশী। জিজ্ঞেস করলাম যে দাদি, তাহলে বাদ গেল কে এবং তুমি এত চেঁচামেচি কর কেন? পাড়ার ছেলেরা আম বা পেয়ারা পাড়তে এলে বা ঘুড়ি ধরতে এলে চেঁচামেচি কর কেন? এবার মুখ খুললেন দাদি, দেখ আমাকে না জিজ্ঞেস করে যদি কেউ কিছু করে তাহলে আমি কেন চেঁচাব না? আমি তো সবসময়ই ওদের বলি আমাকে জিজ্ঞেস করে কাজটা কর। আমি বুঝলাম যে দাদির অহঙ্কারে এই অবজ্ঞা লাগে। সত্যিই তো, একটু বললেই যদি সোজা রাস্তায় কাজটা হয়ে যায়, তাহলে চুরি চামারি করে দাদিকে
রাগানো কেন? আসলে ছেলেরা একটু মজা করতে চায়। বাড়ির মাঠে নাটক ও বিচিত্রানুষ্ঠান হবে অথচ আকাশের মুখ ভার। কে হঠাৎ বলে উঠল আমার দাদির কোন নিত্য ব্যবহার্য জিনিস লুকিয়ে রাখ। দাদি জিনিসটা দেখতে না পেয়েই চেঁচামেচি করবে ও গালমন্দ শুরু করবে আর তাতেই নাকি বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যাবে। যা বলা, তাই কাজ। বাদল দা দাদির ঘটি লুকিয়ে রেখেছে আর দাদি দেখতে না পেয়েই চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছে কিন্তু বৃষ্টি বন্ধ হবার কোন লক্ষনই দেখা যাচ্ছে না দেখে ঘটিটাকে চুপিসারে বাদল দা রেখে দিল। অন্ধকারে দাদি ঘটি ফিরে পেতেই একদম ঠাণ্ডা জল হয়ে গেল দাদি। দাদির মাথা গরম হলে একমাত্র রক্ষাকর্তা আমি। না বাবা, না মা বা জ্যাঠামশাই,জেঠিমা কেউ না। দাদু খুব ঠাণ্ডা প্রকৃতির মানুষ, দাদু কিছু বলতে গেলেই উল্টে বিপত্তি, সব নষ্টের মূল হচ্ছো তুমি। ভদ্রলোক দাদু পালাতে পারলে বাঁচেন।
এহেন পিতিবেশীর সংজ্ঞা আবার মনে পড়ে গেল যখন পূর্ব দিকের বাড়ির ভদ্রলোক চলে গেলেন। এই ওড়িয়া পরিবারের সঙ্গে কোনদিন কথাবার্তা ও হয়নি। কিন্তু কেন জানিনা এই পরিবারের সমস্ত সদস্যদের ই দেখে খুব পরিচ্ছন্ন পরিবার বলে মনে হতো। সকাল সন্ধে হুলুধ্বনি, শাঁখ বাজিয়ে পূজো, ছোট ছেলেটা ঘন্টা নাড়িয়ে ব্যালকনিতে এসে তুলসিমঞ্চে জল দিচ্ছে বা ধূপকাঠি জ্বালিয়ে সন্ধে দিচ্ছে এসব দেখে মনে হতো যে বাড়ির একটা ভ্যালু সিস্টেম রয়েছে। ওর দিদি টা বিশেষ বড় নয় কিন্তু ভাইকে পড়ানোর ধরণ দেখে নিজের মনের মধ্যেই একটা ছবি এঁকে ফেলেছিলাম। মাঝে মাঝেই বলতাম এই পরিবারের সবাই খুব পরিচ্ছন্ন। কয়েকদিন ধরেই দেখছি অনেক রাত অবধি আলো জ্বলছে, ভাবলাম আজকাল ছেলেমেয়েদের কাজ কর্মের ধারা পাল্টেছে, সেই কারণেই হয়তো দেরী কিন্তু আমার ধারণা ভুল। তারা গোছগাছ করে চলে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। পরশু দেখি এয়ার কন্ডিশনারটা খুলছে। একটু অবাক হয়েই গেলাম নতুন এয়ার কন্ডিশনারটা এর মধ্যেই বিগড়ালো? কেবলই মনের মধ্যে একটা অযথা আগ্রহ জেগে উঠছে। কিন্তু কেন, কোনদিন ভদ্রলোক বা ভদ্রমহিলা বা তাঁদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কথা হয়নি অথচ আমার কৌতুহল কমছে না। গতকাল ছেলেটা বাঁশি বাজাচ্ছিল, কিছুদিন ধরেই শিখছে। খেয়াল করতাম যে আমি যে সরগম গুলো করছি ঐ ছেলেটি সেটা করার চেষ্টা করছে। বেশ আনন্দ হলো, কাউকেই কোনদিন গান শেখাইনি,হয়তো মাঝে মধ্যে কাউকে একটু আধটু দেখিয়ে দিয়েছি বড় জোর। আর এই ছেলেটি একলব্যের মতো নিষ্ঠার সঙ্গে আমি যেগুলো করছি, সেইগুলোই করছে ভেবে খুশিতে মনটা ভরে যেত। আমার মনের ভুল ও হতে পারে। হয়তো যে মাস্টার মশাইয়ের কাছে ছেলেটি শিখছে তিনিই হয়তো ঐগুলো দিয়েছেন কিন্তু আমি মনে মনে ভাবতাম আর প্রার্থনা করতাম যে ছেলেটা যেন খুব ভালভাবে বাজাতে পারে। গতকাল ও ছেলেটি গাছে জল দিয়েছে কিন্তু আজ তাকে বা তার দিদিকে দেখতে পেলাম না। সকাল বেলায় দেখি ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলা জামাকাপড় মেলার দড়িটা খুলছেন এবং জামাকাপড়গুলো উঠিয়ে নিচ্ছেন। আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। জিজ্ঞেস করলাম আপনারা কি চলে যাচ্ছেন?
হ্যাঁ।
শুনে জিজ্ঞেস করলাম কি ট্রান্সফার হয়ে যাচ্ছেন?
না, পল্লীশ্রীতে একটা ফ্ল্যাট কিনেছি, অনেকদিন এখানে ছিলাম, মনটা বেশ খারাপ লাগছে।
আমি বললাম, মন খারাপ করবেন না, নিজের ফ্ল্যাটে চলে যাচ্ছেন, এ তো বড় খুশীর খবর। অভিনন্দন জানালাম এবং বললাম যে কাছেই যাচ্ছেন, সময় সুযোগ করে আসবেন।
এতদিন সামনাসামনি থাকলাম, কোনদিন কোন বাক্যালাপ ও হয়নি, অথচ আজ বিদায় বেলায় তাঁকে আমন্ত্রণ জানালাম বাড়িতে আসার জন্য। ইনি তাহলে একজন নিশ্চয়ই পিতিবেশী। কিন্তু দাদির কথা অনুযায়ী ইনি কোনভাবেই আমাদের পরিবারের সঙ্গে যুক্ত হননি, তাহলে তো দাদির কথা মিলছে না। না, এঁদের মানসিক তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের সঙ্গে আমার মনের তরঙ্গ মিলে একটা রেসোন্যান্স তৈরী হয়েছে আর সেই কারণেই ওঁদের চলে যাওয়াটা মনের মধ্যে এইরকম একটা ঢেউয়ের সৃষ্টি করেছে। নিশ্চয়ই ইনি পিতিবেশী থুড়ি প্রতিবেশী।