গপ্পিষ্ঠি লোকদের কথা বলতে না পারলে পেট ফোলা শুরু হয় যার অবশ্যম্ভাবী ফল হলো পুরো যাত্রাটার আনন্দ মাঠে মারা যাওয়া। অনেকেই ওপরের বার্থ খুব পছন্দ করেন কারণ তাঁরা একবার ওপরে উঠেই বইয়ের মধ্যে ডুবে যান কিংবা ইদানিং কালের সদা সঙ্গী মুঠোফোন যেখানে ইউ টিউবে নানান জিনিস চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সুতরাং তাঁরা নিজেদের আপন গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেন।
দূরপাল্লার ট্রেন যেখানে যাত্রাপথ চব্বিশ ঘণ্টার বেশি, যদি সন্ধে গড়িয়ে একটু রাতে ছাড়ে তখন প্রথমে মালপত্র রাখা নিয়ে একটু মন কষাকষি হলেও পরেরদিন সকাল বেলায় বেশ স্বাভাবিক হয়ে আসে অবশ্য সেটা যদি মোটামুটি সমপর্যায়ের লোকজন হয়। অনেকেই থাকেন বড় বেশি উন্নাসিক এবং এসি টু টায়ারে একটা ক্যুপে যদি তিনটি বার্থ তাঁদের হয় তাহলে চতুর্থ ব্যক্তি হিসেবে সেখানে ঘাড় গলানো মুশকিল কিন্তু যদি দুই দুই হয় তবে ব্যাপারটা একটু জমে উঠতে পারে।
চিরাগ যাচ্ছে কলকাতা থেকে বম্বে রাতের ট্রেনে এসি টু টায়ারে কিন্তু তার পড়েছে আপার বার্থ এবং তার পায়ের ব্যথার জন্য সে টিকিট পরীক্ষককে অনুরোধ করছে যে একটা নিচের বার্থ তাকে দেওয়ার জন্য। নিচের দুটো বার্থ ই এক সিনিয়র সিটিজেন দম্পতির। সুতরাং, তাঁদের কারো পক্ষেই উপরের বার্থে যাওয়া সম্ভব নয়। সাইড লোয়ার বার্থেও একজন ভদ্রমহিলা একাই সফর করছেন এবং তাঁর উপরের বার্থে একজন সুদর্শন বাঙালি ভদ্রলোক যাচ্ছেন। চিরাগ বোম্বের লোক হলেও কলকাতার সঙ্গে সম্পর্ক তার বহুদিনের এবং কবে চুপিচুপি যে সেও সিনিয়র সিটিজেন হয়ে গেছে তার খেয়াল ই নেই। টিকিট পরীক্ষক অনেক চেষ্টা করেও চিরাগকে একটা লোয়ার বার্থ জোগাড় করে দিতে পারলেন না। অগত্যা সারা রাত উপরের বার্থে উঠতে না পেরে নিচের বার্থে থাকা ভদ্রমহিলার পায়ের কাছে কোনরকমে একটু বসার জায়গা করে নিয়ে রাতটা কাটিয়ে দিল প্রায় না ঘুমিয়েই। সামনের লোয়ার বার্থে থাকা ভদ্রলোকের একটু অস্বস্তি হচ্ছে তাঁর স্ত্রীর পায়ের কাছে বসার জন্য। শেষমেষ থাকতে না পেরে বলেই বসলেন যে আপনি ওখানে না বসেআমার পায়ের কাছে বসুন। সিংহ বুড়ো হলেও সে তো সিংহ ই। চিরাগ ওখানেই বসতো কিন্তু ভদ্রলোক বেশ লম্বা এবং পা টানটান করে শুলে অবশ্যই তার গায়ে লাথি লাগার সম্ভাবনা। একেবারে তাঁর প্রস্তাব উড়িয়ে না দিয়ে পায়ের কাছে বসলো এবং একটু পরেই ইচ্ছাকৃত না অনিচ্ছাকৃত দুচার বার লাথিও খেল সে। অগত্যা বাধ্য হয়েই সে একবার এই বাথরুমের ধারে বা উল্টোদিকের বাথরুমের ধারে খানিকটা দাঁড়িয়ে, খানিকটা হেলান দিয়ে সারা রাতটা কাটিয়ে দিল। পরদিন সকালে একটা স্টেশনে ট্রেন থামতেই দেখতে পেল যে চায়ের ডিব্বা নিয়ে একটা লোক চায় চায় করে যাচ্ছে। দুকাপ চা একসঙ্গে খেয়ে রাতের অনিদ্রা খানিকটা কম করার চেষ্টা করল। এদিকে ঐ সুদর্শন বাঙালি ভদ্রলোক ও নেমেছেন চা খেতে। চা খেতে খেতেই আলাপ হলো ভদ্রলোকের সঙ্গে। উনি দীপ্ত মুখার্জি, ভাল গান করেন মান্না দে এবং মানবেন্দ্র মুখার্জির। চিরাগ ও রফি ও মুকেশের গান একটু আধটু গাইতো এবং ধীরে ধীরে ট্রেন স্টার্ট করার আগেই উঠে পড়লো তারা। দুই সবে বুড়োর গল্প বেশ জমে উঠলো। ইতিমধ্যে ভদ্রমহিলা ও উঠে পড়েছেন এবং কোনরকমে তারা তিনজন সাইড বার্থে বসে পড়েছে। এদিকে ক্যুপের মধ্যে শোয়া ভদ্রমহিলা বা ভদ্রলোক তখন ও ওঠেন নি। যাই হোক খানিকক্ষণ বাদে তাঁরা উঠলেন কিন্তু তাঁদের ই একজন সহযাত্রী সারারাত কিভাবে কাটালেন সে রাস্তায় ভুলেও গেলেন না। চিরাগ ততক্ষণে দীপ্ত মুখার্জির সঙ্গে নানা বিষয়ে আলোচনায় মেতে উঠলো। ইতিমধ্যে ঐ ভদ্রমহিলা নাগপুরে নেমে যাওয়ায় মিস্টার মুখার্জির অনুরোধে টিকিট চেকার এবং নাগপুরে ওঠা ভদ্রলোককে অনুরোধ করে চিরাগের উপরের বার্থ টা নেওয়ালেন। অনেক রাত অবধি মিস্টার মুখার্জির সঙ্গে চিরাগের খুব ই নীচু স্বরে গল্প চলতে থাকলো এবং ভোরের আলো ফুটে উঠছে এমন সময় কর্জত স্টেশন এসে গেল। করজত স্টেশনে বাড়তি ইঞ্জিন লাগার জন্য একটু বেশি সময় দাঁড়ায়।ওখানে আলু বড়া ও চা দারুণ সুস্বাদু। চিরাগ একটু বেশি করেই আলু বড়া কিনতে চাওয়ায় ওকে দিতে একটু দেরি হয়েছে এবং ইতিমধ্যে দুভাঁড় চা নিয়ে এসে রেখেছে সামনের টেবিলে। ইতিমধ্যে ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলা সামনে চা দেখে তাঁরা চুমুক দিয়ে ফেলেছেন আর ট্রেনটাও চলতে শুরু করেছে এবং চাওয়াটাও বিদায় নিয়েছে। চিরাগ এবং মুখার্জি আলু বড়া নিয়ে উঠে দেখে যে তাদের রাখা চা সেই দম্পতি যুগল আরামে পান করছেন। পরে ভুল বুঝতে পেরে জিভ কাটা কিন্তু ততক্ষণে যা হবার তা হয়ে গেছে। দাদার স্টেশনে মুখার্জি নেমে গেলেন কিন্তু চিরাগ নামবে ছত্রপতি শিবাজী টার্মিনাসে। ওখানেই তার গাড়ি আসবে। কয়েকদিন থেকেই চিরাগ ফিরে আসবে কলকাতায়। প্রথম প্রথম মুখার্জির সঙ্গে বেশ ঘন ঘন টেলিফোনে কথাবার্তা চলতো । অনেকদিন হয়ে গেছে , কথাবার্তা নেই দুজনের। আজ সকালে চিরাগ ভাবলো যে মুখার্জির সঙ্গে একটু কথা বলে সম্পর্কটা ঝালিয়ে নিতে। মোবাইলে অনেকবার ফোন করার পর অকস্মাৎ হ্যালো বলে আওয়াজ এল। মিস্টার মুখার্জি, কেমন আছেন? আমি চিরাগ শাহ কথা বলছি, মনে পড়ে ট্রেনে আমাদের আলাপের কথা? কিন্তু এক নিথর নিস্তব্ধতা, অপর প্রান্ত থেকে উত্তর এল আমি মিসেস মুখার্জী বলছি। আপনার নম্বরটা সেভ করা ছিল বলে বুঝতে পারছি যে আপনি চিরাগ শাহ, ট্রেন মেট। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে আমার স্বামী মিস্টার মুখার্জি গতমাসের ১৬ তারিখে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। আবার নিস্তব্ধতা। কেউ কোন কথা বলতে পারছে না। চিরাগ অস্ফূট স্বরে বলে উঠলো দারুণ গাইতেন মিস্টার মুখার্জি মান্না দের গান। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ফোনটা ছেড়ে দিল সে।
অনেক সময় বৃত্ত ছোট হলে স্বল্প পরিচয়েও একজন অন্যের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পারে আবার অনেক ক্ষেত্রে বহুদিনের আলাপ ও সেই জায়গাটা করে নিতে পারে না। মিস্টার মুখার্জির নম্বরটা ডিলিট করে দিলেও মন থেকে তাঁকে মুছে ফেলা সহজে যাবেনা।