Wednesday, 4 November 2026

"অথ সারমেয় কথা"

চারিদিকে এখন সারমেয়দের নিয়ে হৈচৈ পড়ে গেছে। এতটাই গণ্ডগোল যে ব্যাপারটা আদালতের দরজা পর্যন্ত গড়িয়েছে। দুই যুযুধান গোষ্ঠী, একদিকে সারমেয় প্রেমী আর অপরদিকে সারমেয় দের দুচক্ষে ঘেন্নাকরা লোকজন। দুই পক্ষেরই শাণিত যুক্তি। প্রেমীরা বলেন," অবলা জীব, ওরা যাবে কোথায়? ওদের ও তো এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অধিকার আছে।।" ওদের খেতে না দিলে ওরা তো এমনিতেই মারা যাবে। অপরপক্ষের যুক্তি যে এই রাস্তার কুকুরগুলো ক্ষিপ্ত হয়ে পথচারীদের কামড়ে দিচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই কুকুরের কামড়ে বেশ কিছু লোক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে। মামলা আদালত অবধি গড়ালো। আদালতের হয়েছে ছুঁচো গেলার মতো অবস্থা। শ্যাম রাখি না কুল রাখি করে একটা মাঝামাঝি জায়গায় পৌঁছাতে চেষ্টা করে বললো যে অবশ্যই সারমেয়কুলের বাঁচার অধিকার আছে এবং তাদের খাওয়ানো খুবই দরকার কিন্তু সেটা একটা নির্দিষ্ট জায়গায় খাওয়াতে হবে এবং সংরক্ষণ করতে হবে যাতে তারা যত্রতত্র ঘুরে পরিবেশ নোংরা না করে এবং কোন লোক যাতে তাদের কামড়ে মারা না যায়। সরকারকে কিছু জায়গা নির্দিষ্ট করতে হবে যেখানে তাদের দেখভাল করতে পশুপ্রেমী দের কোন অসুবিধা না হয়। এই নিদানটা আপাতদৃষ্টিতে যতটা সহজ বলে মনে হয় ততটা নয়। কতগুলো সারমেয় কোন কোন এলাকায় আছে এবং তাদের পুনর্বাসন কিভাবে কোথায় হবে সেটাও যথেষ্ট আলোচনা সাপেক্ষ। তারপর এ পাড়ার দলের সঙ্গে অন্য পাড়ার দলের সঙ্গে মিলমিশ হবে কি না তাতেও বিস্তর সন্দেহ রয়েছে। সুতরাং পশুপ্রেমী বিশেষ করে সারমেয় প্রেমীরা তাঁদের নিজেদের জায়গার কুকুরগুলোকে যথেষ্ট ভালবেসেই সেখানকার নির্দিষ্ট জায়গায় তাদের খাবার দেন। এলাকার বেশ কিছু লোক আছেন যাঁরা বাড়িতে ভাতের সঙ্গে আরও কিছু দিয়ে খাবার বানিয়ে প্লাস্টিকের থালায় খেতে দেন এবং তাদের খাওয়া শেষ হলে সেই প্লেটগুলো নিয়ে তাঁরা চলে যান এবং পরের দিনের প্রস্তুতি নেন। এতে যথেষ্ট পয়সা খরচ হয় এবং তাঁরা সেই টাকা খরচে ও পিছপা হন না কিন্তু সমালোচনার তীর ধেয়ে আসে তাঁদের দিকে যাঁরা এইরকম সারমেয়কুলের সেবা বরদাস্ত করতে একদমই রাজি নন। সারমেয়কুলের জন্য রাখা জলের মাটির পাত্র মাঝেমাঝেই কোন না কোন কারণে উল্টে যায় এবং এই সারমেয়কুল তাদের তৃষ্ণা মিটাতে অসমর্থ হয়। 
তৃষ্ণা সকলের ই পায়, কারো বেশি, কারো কম। কিন্তু এদের তৃষ্ণা না মিটলে স্বাভাবিক ভাবেই এরা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠবে এবং কোন অজানিত কারণেই তারা পথচারীদের আক্রমণ করে এবং অনেক ক্ষেত্রেই তা মৃত্যুর পথে ঠেলে দেয়। 
চারিদিকে বড় বড় হাউসিং কমপ্লেক্স গড়ে উঠেছে যার মধ্যে অনেকগুলোই প্রাচীর বিহীন এবং আশেপাশের লোকজন সেই কমপ্লেক্সের মধ্যে দিয়ে শর্টকাটে যাওয়া আসা করে এবং অনেক ক্ষেত্রেই কমপ্লেক্সের বিভিন্ন লোকদের সঙ্গে তাদের বন্ধুত্ব ও নানাবিধ আদানপ্রদান আছে। আবার কোন কোন হাউসিং কমপ্লেক্স পাঁচিল দিয়ে ঘেরা এবং সেখানে ঢোকা বা বেরানো যথেষ্ট নিয়ন্ত্রিত সিকিউরিটি গার্ড থাকার জন্য। সেখানে মেইনটেন্যান্স বাবদ অনেক টাকাই গুণতে হয়। অবশ্য সিকিউরিটি ছাড়াও নানাবিধ সুযোগ সুবিধা সেই কমপ্লেক্সের লোকজন ভোগ করেন। আসল কথা হলো ফেল কড়ি মাখো তেল। সুতরাং যত সুযোগ ভোগ করতে চাও সেইমতো টাকা দাও। আলোর পাশেই যেমন অন্ধকার থাকে এখানে ও তার ব্যতিক্রম নয়। ঘেরাটোপে থাকা লোকদের সেবা করার জন্য অবশ্যই কিছু প্রান্তিক মানুষের দরকার হয় যারা বাড়িতে ফাইফরমাশ খাটে বা রান্নাবান্না করে এবং তারা অবশ্যই আসে সেই ঘেরাটোপের বাইরে থাকা বস্তি থেকে। গোলাপ বাগে গোলাপ তুলতে গেলে কিছু কাঁটা হাতে ফুটতেই পারে। এরা আমাদের জীবনের অঙ্গ, এদের ছাড়া আমরা চলতে অসমর্থ। বস্তিবাসীদের সঙ্গে ঘেরাটোপের বাসিন্দাদের অনেক পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও এরা পরস্পরের পরিপূরক।
ঘেরাটোপ কমপ্লেক্সের মধ্যে সারমেয় বা মার্জারকুল সিকিউরিটির কড়া নজর এড়িয়ে ঢোকে কিনা জানা নেই কিন্তু খোলা হাট হাউসিং কমপ্লেক্সে তাদের খুব একটা না হলেও অবাধ বিচরণ আছে এবং তাদের এই উপস্থিতি এই উপনগরীবাসীর মধ্যে কিছু বিভেদ সঞ্চার করছে। একটু সহনশীলতা দুই পক্ষেরই দেখানো প্রয়োজন। এখন এই খোলামেলা উপনগরীতেও খোলা ড্রেন দেখা যায় না বা টিউবওয়েল গুলো কোথায় অন্তর্হিত হয়েছে। তা এই সারমেয়কুল বা মার্জারকুল তাদের তৃষ্ণা কি করে মেটাবে এটা যদি সবাই একটু সহৃদয়তার সঙ্গে বিবেচনা করেন তাহলে সমস্যার অর্ধেক সমাধান হয়ে যায়। মানুষ খিদের জ্বালায় বা তেষ্টায় পাগল হয়ে যায় তো এই অবলা জীবগুলো তার ব্যতিক্রম কি করে হবে?  যাঁরা কষ্ট করে নিজেদের পকেটের পয়সা খরচ করে এই পশুপাখিদের খাওয়াচ্ছেন তাঁদের প্রতি একটু সহমর্মিতা দেখিয়ে এই অবলা জীবগুলোকে একটু বাঁচতে দিন। আবার অপরপক্ষের যুক্তি কেও ফেলে দেওয়ার নয়। রাস্তার কুকুরের কামড়ে মৃত্যুও অনাঙ্কাখিত। আর সবচেয়ে  বড় কথা মানুষের জীবনের চেয়ে  তো কুকুরের জীবন বেশি মূল্যবান হতে পারেনা। সুতরাং , তাদের  যেভাবেই হোক না কেন বর্জন কর ।
 কিছুক্ষণ আগেই আকাশ ভাঙা বৃষ্টি থেকে বাঁচতে  বয়সের ভারে ন্যুব্জ এক বৃদ্ধ কুকুর যে দৌড়বার ক্ষমতাটা ও হারিয়ে ফেলেছে সে অসহায় দৃষ্টিতে একবার আকাশের দিকে আর একবার ইতিউতি কোথাও ঠাঁই পাওয়া যায় কিনা তা দেখছে কিন্তু সমস্ত গেট বন্ধ আর তার নিজেরও শরীরটাও নীচু করে যে গাড়ির তলে আশ্রয় নেবে তাতেও সে অসমর্থ। এই দৃশ্য দেখেও কি কেউ চুপ করে থাকতে পারে বা কোন গেটের ফাঁক দিয়ে যদি সে ঢুকে পড়ে একটু শরীরটাকে বৃষ্টি থেকে বাঁচাতে, তাহলে কি তাকে হ্যাট হ্যাট করে তাড়িয়ে দেওয়া যায়? এদের নাই তো কোন ডানা ,কেমন করে উড়বে সেতো মেলে যে তার পাখনা? অতএব, তার ভেজা ছাড়া যে উপায় নেই।
একটু ভাবতে সবাইকে অনুরোধ জানাই।


Saturday, 31 October 2026

"পোস্ট কার্ড"

ভাড়া বাড়িতে থাকি, বাড়িওয়ালা নোটিশ দিয়েছে বাড়ি ছাড়ার জন্য। অনেকেই আছে যারা বাড়ি ছাড়তে চায়না এবং তর্ক বিতর্কের মধ্যে গিয়ে শেষমেশ মামলা মোকদ্দমায় জড়িয়ে রেন্ট কন্ট্রোলে বাড়ি ভাড়া জমা করে বাড়িওয়ালার কালঘাম ছুটিয়ে দেয়। পশ্চিমবঙ্গের বাড়িভাড়া সংক্রান্ত আইন সবই ভাড়াটেদের পক্ষে এবং এই কারণেই বাড়িওয়ালারা চট করে স্থানীয় লোকদের ভাড়া দিতে চায় না। কিন্তু রজত এক কথার মানুষ। শুভ্র বাবু যখন জানালেন যে বাড়িটি তাঁর দরকার তখন রজত আর কথা না বাড়িয়ে ছেড়ে দেবে বলল যদিও তার ও পৃথার সংসারে নতুন অতিথি আসতে চলেছে। এই অবস্থায় বাড়ি বদলানো বেশ ঝকমারি ব্যাপার।
গোছগাছ চলছে এবং অপ্রয়োজনীয় জিনিস ছাঁটকাট করে নিতে হচ্ছে কারণ নতুন বাড়ি বা ফ্ল্যাটটা অপেক্ষাকৃত ছোট এবং ভাড়াটাও একটু বেশিই। কিন্তু উপায় নেই এছাড়া কারণ বাড়ির সংখ্যা তখন এতটাই কম ছিল যে ভাড়াটেরা একবার ঢুকলে আর ছাড়তেই চাইতো না। টুকিটাকি গোছাতে গোছাতে কয়েকটা পোস্টকার্ড ও ইনল্যান্ড লেটারের গোছা চোখে পড়লো। রজতের একটা বদভ্যাস ছিল চিঠিগুলো পড়া হলেও ও কখনো ছিঁড়ত না। হোস্টেলে থাকাকালীন এই অভ্যেসটা যে শুরু করেছে যা এখনও ছাড়তে পারেনি। রবার ব্যাণ্ড দিয়ে পরপর চিঠিগুলো সে রেখে দিত। মফস্বলের ছেলে, কলেজ শেষে অবসর সময়ে বাবা, মা বা দাদুর চিঠিগুলো বারবার পড়তো আর তাদের মুখগুলো ভেসে উঠতো চোখের সামনে। কখনো কখনো  জলে ভিজে উঠতো তার চোখ বিশেষ করে মায়ের হাতের রান্নার কথা যখন মনে পড়তো আর হোস্টেলের মুরারি ঠাকুরের ট্যালটেলে ডালের সঙ্গে অবশ্যম্ভাবী তুলনা চলে আসতো। কিন্তু তাদের জায়গায় একটা কলেজ ছিল কিন্তু সেরকম ভাল  না হওয়ায় তাকে আসতে হয়েছে শহরে। একটু বেশি রকম পেটুক বলেই হয়তো তার কষ্টটা আরো বেশি হতো। বাবার হাতের লেখা, মায়ের লেখা এবং দাদুর লেখাগুলো প্রত্যেকেই যেন এক বিশেষ বার্তা বহন করে নিয়ে আসতো। দাদুর সম্বোধন ছিল স্নেহের ছুটকু, বাবার ছিল কল্যাণবরেষু শানু এবং মায়ের ছিল স্নেহের ছোটু এবং সবার শেষেই থাকতো আশীর্বাদক দাদু, বাবা এবং মায়ের ছিল ভালবাসা নিও-- ইতি ' মা'।
ছোট্ট হলদে রঙের পোস্টকার্ড, একটু শক্ত কার্ড দাম মাত্র পাঁচ পয়সা আর ইনল্যান্ড লেটার ছিল আকাশের মতো হাল্কা নীল দুই পাতার পাতলা কাগজ যার প্রথম পাতায় উপরের দিকে প্রাপকের নাম ও ঠিকানা লেখার জায়গা চারটে লাইন এবং নীচে থাকতো প্রেরকের নাম ও ঠিকানা লেখার জায়গা। দ্বিতীয় পাতাটা ছিল লম্বায় ও চওড়ায়  অপেক্ষাকৃত ছোট । দ্বিতীয় পাতা প্রথম পাতার উপর ভাঁজ করে প্রথম পাতার বাড়তি কাগজ দিয়ে ঘিরে দেওয়া হতো এবং তার পরে উপরে প্রাপক ও  নীচে প্রেরককে ভাঁজ করে প্রথম পাতার  ভিতরে মাথায় লাগানো আঠাতে একটু জল লাগিয়ে মুখ বন্ধ করে দেওয়া হতো এবং হয়ে যেতো একটু গোপনীয়। দাম মাত্র পনেরো পয়সা অথচ কত গোপনীয় ব্যক্তিগত কথাবার্তা বহন করতো এই ইনল্যাণ্ড লেটার যেখানে পাঁচ পয়সার পোস্টকার্ড ছিল খোলামেলা বিন্দাস। পঁচিশ পয়সার খামে কত যে লেখা  পাতা ভরা হতো তা  ভাবলেই একটু আশ্চর্য লাগে।চৌরাস্তার মোড়ে থাকা লাল একটা লেটার বক্স যেটা একদম শেষে সন্ধ্যেবেলা সাড়ে পাঁচটায় খোলা হতো। এরপরে চিঠি ফেললে পরের দিন সংগ্রহ করা হতো। তখন পোস্টাল ইনডেক্স নাম্বার চালু হয়নি এবং দূরদূরান্ত থেকে চিঠি চলে আসতো আজহার দা বা শচীন কাকুদের মাধ্যমে। টেলিগ্রাম সন্ধে বেলায় এলেই গা টা ছমছম করে উঠতো কোন দুঃসংবাদের সম্ভাবনা চিন্তা করে। ১৫ই আগস্ট,১৯৭২ সালে শ্রীরাম ভিকাজি ওয়েলেঙ্কারের মাথা থেকে বেরিয়ে আসা পোস্টাল ইনডেক্স নাম্বার এক যুগান্তকারী ঘটনা নিয়ে এল। ছয়টি নম্বর সম্বলিত এই পিআইএন ( পিন) এর প্রথম সংখ্যা পোস্টাল জোন, দ্বিতীয় টি সাব জোন , তৃতীয়টি কোন জেলা এবং পরের তিনটি অর্থাৎ চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ নম্বরটি কোন পোস্ট অফিস সেটা বোঝায়। অনেক সরলীকৃত হয়েছে এবং আগে যে ডেড লেটার বক্স যেখানে প্রাপককে যে কোন কারণে ওই চিঠি দেওয়া যায়নি সেগুলো পড়ে থাকতো এবং এই পিন বা পোস্টাল ইনডেক্স নাম্বার চালু হবার পর  তার কলেবর অনেকটাই কমে গেছে। পৃথিবীটাই এখন কত ছোট হয়ে গেছে। চিঠিপত্র আজকাল লেখা প্রায় উঠেই গেছে। মোবাইল ফোনের কল্যাণে আজ পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্ত নিমেষেই যোগাযোগ হয়ে যাচ্ছে। সময় এখন অত্যন্ত মূল্যবান , সুতরাং স্বাভাবিক ভাবেই চিঠি তার জৌলুস হারিয়ে ফেলেছে।

আজ পোস্টকার্ড নেই, নেই ইনল্যাণ্ড লেটার, হারিয়ে গেছে সেই জ্বলজ্বল করা লাল রঙের  লেটার  বক্স। এখন তার জায়গা নিয়েছে রেজিস্টার্ড পোস্ট এবং স্পীড পোস্ট এবং সেটাও পোস্ট অফিসে গিয়েই করতে হয়। আগে আজহার দা, শচীন কাকুরা চিঠি দিয়ে যেতেন বাড়ি বাড়ি ঘুরে এবং তাঁরাও সুখে দুঃখে আমাদের সাথী হয়েই থাকতেন।

চিঠির গোছা নিয়ে ভাবছে রজত কি করব কি করব, হঠাৎ এমন সময় পৃথা পিছনে এসে পিঠে হাত দিয়ে বললো কি, এত কি ভাবছো?
 একটু অপ্রস্তুত হয়েই রজত জানালো যে এই পুরনো চিঠির বাণ্ডিলটা ফেলে দেবে কিনা ভাবছে সে।
"কেন এত চিন্তা করছো তুমি? এরা তোমার এতদিনের সঙ্গী, অনেক সুখ দুঃখের সাথী এরা। এতদিন তুমি সযত্নে এগুলো সামলে রেখে এখন তুমি ফেলে দেবার কথা কি করে চিন্তা করলে?"
ঠিক তাই। কবে দাদু, বাবা ও মা চলে গেছে তাকে ছেড়ে কিন্তু ছেড়ে গেছে তাদের স্মৃতি এই চিঠির মাধ্যমে। তাদের হাতের লেখা সেই সময়ের ঘটনার কথা এমনভাবে তুলে ধরেছে যে চিঠিটা পড়লেই সেই ঘটনাগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। বিয়ের পরে প্রথম লীভ ট্র্যাভেল কনসেশন নিয়ে বাবা ও মাকে নিয়ে বেড়াতে যাবে বলে ঠিক করেছে জানতে পেরেই বাবা পোস্ট কার্ডে চিঠি লিখে দিল যে তোমার মায়ের শরীরটা বিশেষ ভাল যাচ্ছে না, সুতরাং আমরা দুজনেই যেন ঘুরে আসি। না, আমরা দুজনে গেলে নিজের পয়সায় যাব কিন্তু এলটিসি নিয়ে সবাইকে নিয়ে যাব। কিন্তু বলাই বাহুল্য যে রজতের তার বাবাকে নিয়ে আর বেড়াতে যাওয়া হয়নি কারণ তার বাবা কিছুদিনের মধ্যেই অমৃত লোকের পথে যাত্রা করেন। এক একটা চিঠি যা কয়েক লাইনের কিন্তু মনে পড়িয়ে দেয় অনেক গভীর স্মৃতি। তাই পৃথার কথাতেই সম্মতি জানালো সে, চিঠির গোছা থেকে গেল নতুন বাড়িতে একটা কোণে স্থান নিতে।

Thursday, 22 October 2026

"রাজার গামছা"

বহুবছর ধরে সুদূর ইংরেজদের দেশে পাকাপাকি ভাবে বসবাসকারী রায়বাহাদুর সুধীন্দ্র নারায়ণ সিংহ মশায়ের হঠাৎ করেই মনে হলো এবার দুর্গাপূজোর সময় বাংলার নিজের গ্রামের পূজোয় গেলে মন্দ হয়না। ভিটেমাটি ছেড়ে একবার চলে গেলে সেই দালান বাড়ি, ঠাকুরবাড়ি, খামার বাড়ি, পুকুর, জমিজমা সবই বেদখল হয়ে যায়। সেই কবে তাঁর বাবা ডাক্তারি পড়তে পাঠিয়েছিলেন তার পর প্রথম প্রথম দুচার বার এসেছিলেন নাড়ীর টানে। তারপর বাবা এবং মা গত হবার পর ফিরে আসার সেই টানটা ক্রমশই শুকিয়ে আসতে শুরু করলো। কিন্তু একেবারে কি ভোলা যায় শৈশবের সেই পুরনো দিনের কথাগুলো? ব্যস্ততার মাঝেও সেই বিলের মধ্যে ভেলায় চড়ে বেড়ানো বা আমগাছে উঠে আম পাড়া( যদিও লোকজন ই ঐসব কাজ গুলো করতো) বা  বটের ঝুড়ি ধরে হিতু মুনিষের ছেলের সঙ্গে দোল খাওয়া মাঝে মাঝেই মনে পড়ে যায় আর নিজের মনেই হেসে ওঠেন। শৈশব এমন ই একটা সময় যখন মনে হয় কবে বড় হব আমরা, কেউ বকবে না কিন্তু যেই না বড় হলাম তখন ই এসে গেল একের পর এক দায়িত্ব আর জীবনের জটিলতা গ্রাস করে নিল সেই অনাবিল আনন্দের দিনগুলো।
হাসপাতাল থেকে অবসর নিয়েছেন সুধীন্দ্র নারায়ণ, এবার আর অন্য কোন দেশ নয়, ফিরবেন সেই শৈশবের গ্রামের বাড়িতে, দেখবেন সেই হিতু মুনিষের ছেলে বা জটেশ্বর জেলের ছেলে যাদের সঙ্গে একসময় বাড়ির কড়া শাসন উপেক্ষা করে তিনি নির্মল আনন্দ উপভোগ করতেন। চিরকালই ধনী এবং দরিদ্রের মধ্যে পার্থক্য আছে এবং দরিদ্র হলেই তারা ভাল হয়না বা তাদের সঙ্গে মেলামেশা করলে ছেলেরা গোল্লায় চলে যায় এই মতবাদটা বড়লোকদের মধ্যে ভীষণ ভাবে সংক্রমিত। সেই কারণেই তারা সবসময়ই ভয়ে ভয়ে থাকে যে এই বুঝি তাদের বাড়ির ছেলেরা ওই গরীবগুর্বোদের সঙ্গে মিশে বখে যাবে। কিন্তু ধারণাটা যে কত ভুল তা বারে বারে প্রমাণিত হয়েছে এবং পাঁকে পদ্মফুল ফোটার মতো ওই গরীব ঘরের ছেলেরাই বড় হয়ে দেশের ও দশের মুখ উজ্জ্বল করেছে আর তথাকথিত বড় বাড়ির ছেলেমেয়েরা বেলেল্লাপনায় শীর্ষ স্থান লাভ করেছে।
ভাগ্যিস সুধীন্দ্র নারায়ণের বিয়ে তাঁর বাবামায়ের উপস্থিতিতেই হয়েছিল এবং তাঁদের ই পাল্টি ঘরের সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ের সঙ্গে হয়েছিল নাহলে সুধীন্দ্র নারায়ণ হয়তো আর ফিরেও তাকাতেন না তাঁর গ্রামের দিকে।

মানুষ যখন অর্থনৈতিক ভাবে বলীয়ান হয়ে যায় বা খ্যাতির শিখরে উঠে যায় তখন তার চারপাশে আলোর একটা বলয় তৈরী হয় এবং সেই বলয় ই তাদের আরো উজ্জ্বল করে তোলে। পাঁচ করলেও প্রচারে পঞ্চাশ হতে সময় লাগেনা। এমতাবস্থায় দেশে রায়বাহাদুর সুধীন্দ্র নারায়ণ গ্রামের বাড়িতে আসছেন পূজোর সময় এই নিয়ে হৈচৈ পড়ে গেছে গ্রামে। কিন্তু সুধীন্দ্র নারায়ণের একদমই পছন্দ নয় এ সামনের লেজ রায়বাহাদুর শব্দটি। তিনি ডাক্তারবাবু নামেই পরিচিত হতে ভালবাসেন এবং পূজোয় এসে তাঁর ফেলে যাওয়া গ্রামবাসী কেমন আছে তার সম্যক ধারণা পেতে চান এবং তাঁর পক্ষে যতটা করা সম্ভব ততটাই তিনি করতে চান এবং এই প্রচার বিমুখ মানুষ আজকের জগতে বিরল। বেশিরভাগ মানুষই নিজেকে আলোকিত দেখতে চান এবং নিকষ কালো অন্ধকারে সামান্য প্রদীপের আলোই যেমন সদর্পে তার উপস্থিতি ঘোষণা করে ঠিক সেই ভাবেই নিজেকে উপস্থাপিত করতে চান। কিন্তু সুধীন্দ্র নারায়ণ একজন শুধু ভাল ডাক্তার ই নন তিনি একজন বিরাট মাপের মানুষ। তিনি নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার আশেপাশের ব্যক্তিকেও আলোয় প্রতিভাত করতে চান। একটা রেলের ইঞ্জিন যদি শুধু নিজে চলে বা অল্পসংখ্যক কামরা নিয়ে চলে সে যতটা স্পীডে চলতে পারে তা অতটা স্পীড কিছুতেই নিতে পারবে না যদি তার সঙ্গে অনেক কামরা জুড়ে দেওয়া হয়। সুধীন্দ্র নারায়ণ কিন্তু এই দ্বিতীয় পর্যায়ের মানুষ। তিনি চান অনেক লোকের উপকার।

 গ্রামে তাঁর বাড়ি একটা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। সুতরাং সেই বাড়িতে বসবাস করা মানে সাপখোপের পাল্লায় পড়া। সুতরাং, নিকটবর্তী শহরের একটি হোটেলে থেকে গাড়িতে আসা যাওয়া করা এবং এই কয়েকটা দিনে শুধু তাঁর নিজের গ্রামটাই নয় আশেপাশের গ্রামের লোকজনকেও দেখে তাদের ওষুধ দেওয়া এবং নিজের সঙ্গে আনা নানারকম ওষুধ গ্রামবাসীদের দিয়ে লোকের উপকার করা। সুধীন্দ্র নারায়ণ অন্য মাপের মানুষ। গরীব গাড়া মানুষের সেবা করার ফাঁকেই মহাষ্টমীর দিন রাজওয়াড়ায় ঠাকুর দর্শন এবং অঞ্জলি নিবেদনের উদ্দেশ্যে একটু দূরে গাড়িতে যাওয়া। গাড়িতে আছে স্ত্রী মেয়ে, জামাই এবং নাতি নাতনি রা। রাজওয়াড়ায় এসে গাড়ি থামলো। বিশাল রাজবাড়ির বেশিরভাগই ধ্বংস স্তূপে পরিণত তবুও নাটমন্দির তার মধ্যেই কিছুটা মন্দের ভালো। সমস্ত রাজবাড়ির গঠন প্রায় একই রকম। চকমিলান বাড়ির মতো। মানে একদিকে তার নাটমন্দির আর তিনদিকে তার ঘর। মন্দিরের বিপরীতে থাকে জলসাঘর যেখানে রাজারা নৃত্যগীত উপভোগ করতে করতে মায়ের পূজো ও হোম দেখতেন এবং বাড়ির মেয়েরা ( রানীমা ও রাজকন্যারা ) পূজো দেখতেন নাটমন্দিরের দুইপাশের দালান বাড়ি থেকে। যিনি যত বড়মাপের রাজা , মাঝখানের ফাঁকা জায়গাটিও ততটাই প্রশস্ত এবং তার ই মানানসই দালান বাড়ি। সিংহ দরজায় গাড়ি এসে থামলো এবং গাড়ি থেকে সুধীন্দ্র নারায়ণ সপরিবারে নামলেন এবং নাতি নাতনিকে পুরনো দিনের কথা বেশ রসিয়ে রসিয়ে বলতে লাগলেন। মন্দিরের গায়ে একটু রঙের ছোঁয়া লাগিয়ে একটু ঝকমকে করার চেষ্টা হয়েছে কিন্তু পারিপার্শ্বিক অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। নাটমন্দিরের ঠিক উল্টো দিকে যেখানে নৃত্যগীতাদি পরিবেশিত হতো তার অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। পলেস্তারা খসে পড়া জানলা ও দরজাগুলো তার রং খুইয়ে শুধু কাঠের উপস্থিতি ঘোষণা করছে এবং জানলায়  ঝোলানো দড়িতে মেলা আছে পুরনো লুঙ্গি ও গামছা । রাজওয়াড়ায় এইরকম অবস্থা দেখবেন এটা সুধীন্দ্র নারায়ণ স্বপ্নেও ভাবেননি। এতক্ষণ নাটমন্দিরের গল্প শোনা নাতি ও নাতনিরাও একটু ধন্দে পড়ে গেছে। " দাদু, এগুলো কি রাজামশাইয়ের পোষাক?" একদম ক্লিন বোল্ড সুধীন্দ্র নারায়ণ। কোন উত্তর নেই তাঁর কাছে। রাজাদের সোনার মুকুট, হীরেজহরতের রাজপোশাক, কোমরে  তলোয়ার ও পায়ের বহু মূল্যবান নাগড়া জুতো কোথায় অন্তর্হিত, তার জায়গায় ঝুলছে পুরনো লুঙ্গি ও গামছা! কালক্ষেপ না করে সবাইকে নিয়ে গাড়িতে উঠে পড়লেন এবং খুবই বিষণ্ণ মনে ফিরে এলেন।

Sunday, 13 September 2026

"কে আমি" (৩)

আত্মানুসন্ধান খুবই ভাল জিনিস এবং প্রত্যেক মানুষের এটা করা উচিত যাতে গতকালের চেয়ে নিজেকে আরও একটু উন্নত করা যায়। কিন্তু শত চেষ্টার পরেও নিজেকে পুরোপুরি জেনে ওঠা সম্ভব হয়না। আমাদের অন্য কারো সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করলেই আমরা গড়গড় করে তার সম্বন্ধে বিস্তর কথা বলে দিতে পারি এবং অবশ্যই তার মধ্যে ব্যজস্তুতি অলঙ্কারে নানারকম খারাপ কথা মিছরির মোড়কে  ঘিরে দিয়ে অবলীলাক্রমে বলে যেতে পারি বেশ হাসি হাসি মুখ করে। অথচ এগুলো বলার সময় একবারও ভেবে দেখিনা যে আমাদের এর থেকে হাজারটা বেশি অপগুণ রয়েছে।

 আজকের দিনে আমার কথা একজন ব্যাঙ্কের আধিকারিককে নিয়ে। ভদ্রলোকের নাম নেওয়া সমীচীন হবে কিনা ঠিক বুঝতে পারছিনা কিন্তু তিনি তাঁর সহকর্মীদের মধ্যে এতটাই পরিচিত যে কথাগুলো শুনতে শুনতে তাঁরা বলে উঠবেন যে আরে এ তো আমাদের অসিতবরণ রায়ের কথা বলছেন এবং  মায়ের কাছে মামার বাড়ীর গল্পের কথা বলতে এসেছেন। হ্যাঁ খানিকটা হয়তো তাই, তবে আমার চোখে যতটুকু ধরা পড়েছেন তিনি, সেটুকুই বলবো এবং অনুরোধ জানাবো যদি আরও কিছু সংযোজন করা দরকার যেটা তাঁদের চোখে পড়েছে এবং আমার চোখ এড়িয়ে গেছে তাহলে সেটাকে অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করব যা তাঁকে আরোও উজ্জ্বলতর হিসেবে তুলে ধরতে পারবে।
ব্যাঙ্কের আধিকারিক বললেই সাধারণ লোকের চোখে ভেসে ওঠে একজন গোমড়ামুখো ভারিক্কি চেহারার ভদ্রলোক কাচের চেম্বারের ভিতরে বসে আছেন এবং মাঝে মধ্যে টেলিফোনে কারো সঙ্গে কথা বলছেন কিংবা টেবিলে রাখা ল্যাপটপে গভীর মনোযোগের সঙ্গে কাজ করছেন এবং প্রয়োজনে কোন অধস্তন কর্মচারীর সঙ্গে ইন্টারকমে কথা বলছেন বা ডেকে পাঠাচ্ছেন কোন ব্যাপারে আলোচনার জন্য। কিন্তু কখনোই আমরা এটা ভেবে দেখিনা যে ভদ্রলোক যখন কাচের ঘরে চুপ করে বসে আছেন তখন তাঁর মাথায় যে কি ধরণের সুনামি চলছে, অবশ্য এটা ভাবাও সম্ভব নয়। আধুনিক যুগে পাশের টেবিলে রাখা একটা স্ক্রীনে ব্রাঞ্চের আনাচে কানাচে কি ঘটছে তা ওখানে বসেই সবকিছু দেখতে পান শাখা অধীক্ষক। আগে তো এই সুব্যবস্থা ছিলনা , সুতরাং শাখা প্রবন্ধককে বিভিন্ন জায়গায় উঁকি মারতে হতো সবাই ঠিকঠাক কাজকর্ম করছে কিনা দেখার জন্য। 
প্রত্যেক মানুষের জীবনে কিছু না কিছু সমস্যা আসবেই এবং এটা খুব দরকার কারণ সমস্যা না থাকলে মানুষ মানসিক ভাবে মজবুত হয়ে ওঠেনা। অসিত বাবুর ক্ষেত্রেও তার কোন ব্যতিক্রম নয়। জীবন শুরু এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার ১৯৪৮ সালের ১৪ই মে মদনমোহন বাবু এবং বিভাদেবীর ঘরে তদানীন্তন অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার শ্রীমন্তপুর গ্রামে। গ্রামের অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শুরু শিক্ষা চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত । পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্রেণী সম্পন্ন হয় খাসবাড়ের জুনিয়র হাইস্কুলে এবং সপ্তম থেকে একাদশ শ্রেণী ইড়পালা কৃষ্ণমোহন ইনস্টিটিউশন হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল থেকে। প্রথম বিভাগে হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করার সুবাদে কলকাতার নামী কলেজ স্কটিশ চার্চ কলেজে রসায়ন বিভাগে অনার্স পড়া এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি বিভাগে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে স্বর্ণপদক প্রাপ্তি অসিত বাবুর মেধার পরিচয় বহন করে। ১৯৭১-৭২ সালে উত্তাল নকশালবাড়ির আন্দোলনে কলকাতায় তখন এক টালমাটাল অবস্থা এবং চাকরির বাজারও ছিল মন্দা। কিন্তু সেই অবস্থাও অসিত বাবুকে দমাতে পারেনি এবং কলকাতায় থেকে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অবতীর্ণ হওয়ার জন্য প্রাইভেট টিউশনিকে নিজের পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন যাতে বাবামায়ের উপর কোনরকম চাপ না পরে। মেধার স্বীকৃতি মেলে যখন তিনি সর্বভারতীয় পরীক্ষা ইণ্ডিয়ান ফরেস্ট সার্ভিস এবং ভারতবর্ষের সেরা ব্যাঙ্ক স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ায় প্রবেশনারি অফিসার হিসেবে যোগ্যতা অর্জন করেন। একটু দোলাচলে পড়ে যান তিনি, কিন্তু শেষমেশ ভারতবর্ষের সেরা  ব্যাঙ্ক  স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ায় নিজেকে উৎসর্গ করেন। প্রবেশনারি অফিসার হিসেবে প্রথম পোস্টিং হয় কলকাতা থেকে সুদূর পশ্চিম প্রান্তে গুজরাটের রাজকোটে। তখন সরাসরিভাবে ট্রেনে যাওয়া যেতনা রাজকোটে। সম্পূর্ণ আলাদা সেখানকার জলবায়ু, খাদ্যাভ্যাস,ভাষা এবং সংস্কৃতি কিন্তু এইসব বাধা বিঘ্নকে অতিক্রম করতে হয়েছিল অসিত বাবুকে। 
বিভিন্ন বিভাগে কাজ শিখিয়ে একজন প্রকৃত সুদক্ষ অফিসার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে স্টেট ব্যাঙ্কের ট্রেনিং প্রোগ্রাম এককথায় অতুলনীয়। সেই কারণে অসিত বাবুকে গান্ধীধাম, ব্রোচ, আমেদাবাদ এবং বিশনগর ব্রাঞ্চে যেতে হয়। এরপরেই আসে এক যুগান্তকারী পোস্টিং। ভারতবর্ষের বৃহত্তম ব্যাঙ্কের বৃহত্তম বিদেশ বিভাগ তখন ছিল কলকাতায় এবং সেখানে পোস্টিং পাওয়া ছিল উজ্জ্বলতম ছেলেমেয়েদের জন্য। এখানেই তাঁর প্রতিভা ভাস্বর হয়ে ওঠে এবং পরবর্তী কালে তাঁর লেখা "এক্সচেঞ্জ এরিথমেটিক" বইটি বিভিন্ন ছাত্রছাত্রীদের দারুণ ভাবে সাহায্য করে। 
এরপর তিনি আসেন গড়িয়া শাখায় এবং তারপরে বর্ধমানের আঞ্চলিক অফিসে। বিবিধ শাখায় কাজ করার অভিজ্ঞতা ভারতের সেরা ব্যাঙ্ক তাঁকে মোবাইল ইন্সপেকশন বিভাগে কাজে লাগান এবং লখনৌ, জয়পুর এবং পাটনা জোনাল অফিসে তাঁর অভিজ্ঞতা কাজে লাগায়।এরপর ফিরে আসা কলকাতার ইন্টারন্যাশনাল ব্যাঙ্কিং ডিভিশন কমার্শিয়াল ব্রাঞ্চে এবং সেখান থেকে হাওড়া জোনাল অফিস, গড়বেতা শাখা এবং তাঁর বিবিধ বিভাগে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে কলকাতাস্থিত স্ট্রেসড অ্যাসেটস ম্যানেজমেন্ট অফিসে নিয়োজিত করে এবং ধীরে ধীরে ২০০৮ সালের মে মাসে তিনি সসম্মানে রিটায়ার করেন। কিন্তু তাঁর অভিজ্ঞতা, ব্যাঙ্ক রিটায়ারমেন্টের পরেও কাজে লাগায় এবং বিভিন্ন ট্রেনিং সেন্টারে তাঁর অধীত জ্ঞান কাজে লাগায়।  তাঁর লেখা ভেস্টিজেস অন টাইম আরও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা এবং তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর লেখা স্ট্রেসড অ্যাসেটস ম্যানেজমেন্টের মধ্য দিয়ে।
দীর্ঘদিনের ব্যাঙ্কের কাজের অভিজ্ঞতা এবং সমগ্র ভারতবর্ষ জুড়ে বিভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গে যোগাযোগ কিন্তু তাঁকে শিকড় থেকে উৎপাটিত করতে পারেনি যা তাঁকে আরো উজ্জ্বল করে তুলেছে। ইড়পালা কৃষ্ণমোহন ইন্সটিটিউশনে মেধাবী ছাত্রদের জন্য কুড়িলাখ টাকার ট্রাস্ট তৈরী করা, ইড়পালা রামকৃষ্ণ মিশনে এক লক্ষ টাকা দান এবং তাঁর গ্রামের অবৈতনিক প্রাথমিক স্কুলে ত্রিশ হাজার টাকা দান তাঁকে এক অন্য জগতে স্থান দিয়েছে। সাধারণ লোকের মনে একটা ধারণা রয়েছে যে ব্যাঙ্কের ম্যানেজারকে খুশি না করতে পারলে ব্যাঙ্ক থেকে লোন পাওয়া যায়না, এই ধারণাকে সর্বৈব মিথ্যা প্রতিপন্ন করার জন্য অসিত বাবুর এই দান যথেষ্ট। এই প্রসঙ্গে মাদার টেরিজার এক উদ্ধৃতি খুবই মূল্যবান। তিনি বলেছেন যে আমাদের ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত কিন্তু আমরা অনেক সাধারণ কাজও খুব ভালভাবে করে নিজেদের অনেক উচ্চতায়  নিয়ে যেতে পারি যা সমাজে এক অসাধারণ বিপ্লব আনতে পারে। বিশাল এই দেশ ভারতবর্ষের দাক্ষিণাত্য ছাড়া কর্মসূত্রে পরিভ্রমণ  অসিত বাবুকে তাঁর শৈশবের গ্রামের স্মৃতিকে ভোলাতে পারেনি এবং গ্রামে শিক্ষার পরিকাঠামোর  অপ্রতুলতা তাঁকে সবসময় ভাবিয়েছে  এবং নিজের সাধ্যমত তিনি চেষ্টা করেছেন যাতে গ্রামের  মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা  অর্থাভাবে শিক্ষালাভ  থেকে বঞ্চিত না হয়। তাঁর  এই দানের কথা তুলে ধরার একটাই উদ্দেশ্য যে তাঁকে দেখে অন্যলোকজন  উদ্বুদ্ধ হবে  এবং এই আশায় বুক বেঁধে এই সামান্য প্রতিবেদন।

Wednesday, 19 August 2026

"দাশু ঘরামির পাঁচালী"

গ্রামের উত্তর দিকে দাশু থাকে তার  বৌ,ছেলেমেয়ে নিয়ে । বহুদিন আগে বিশ্বযুদ্ধ লাগার সময় জমিদার বাবুরা বোমার ভয়ে কলকাতা ছেড়ে এসে এখানে গ্রামের পত্তন করেন। চাটিবাটি গুটিয়ে কলকাতার পাট ওঠানো যায় কিন্তু গ্রামে এসে থাকব বললেই তো আর হয়না, ধোপা, নাপিত, মুচি, বামুন, চাষাভুষো এদের ও সঙ্গে করে না আনতে পারলে ঠাটবাট বজায় থাকবে কি করে? আর বললেই তো তারা এসে পড়বে না, তাদের ও খানিকটা জমিজমা, পুকুরের ভাগ না দিলে তারাই বা আসবে কোন দুঃখে? অতএব, খানিকটা নিজেদের প্রয়োজনেই একটু দয়া দাক্ষিণ্য দেখাতেই হয়। এভাবেই এসেছিল দাশুর দাদু হরিশ, পুলু বামুনের দাদু নাড়ু চক্কোত্তি এবং নাপিত, মুচি ও ডোমদের দাদু ঠাকুর্দারা।  যুদ্ধ তো থামলো, মানুষের প্রয়োজন ও দিন দিন বাড়তে থাকলো। শুধু পেটে খেলেই তো হয়না, চাষার ছেলেমেয়েরাও আর চাষবাস করতে চায়না, মুচির ছেলেও আজকাল জুতো, চটি সারাই করে দিন গুজরান করতে চায় না। সবাই পড়াশোনা করে বিএ, এম এ পাশ করে চাকরি করতে চায়। আগে গ্রামে স্কুল ছিলনা, একটু পড়াশোনা করতে গেলেই চার মাইল দূরে  আলের পথ মাড়িয়ে রাজগঞ্জ স্কুলে যেতে  হতো। তখন আজকের মতো স্কুলে মিড ডে মিলের ব্যবস্থা না থাকায় কিছুদিন পরেই স্কুলের পাঠ চুকিয়ে বাপ দাদাদের কাজে হাত লাগাতে হতো। যারা একটু লেগে থাকতো কষ্ট শিষ্ট করে তারা মাস্টারমশাইদের নেক নজরে পড়ে যেত এবং পরবর্তী কালে তাদের অনেকেই শহরে থাকা জমিদার বাবুদের বাড়িতে বিনাপয়সায় থেকে খেয়ে কলেজের পাট চুকিয়ে মাস্টারি বা অন্যান্য সরকারি কাজে যোগ দিত। এরা কিন্তু জমিদার বাবুদের দান চিরদিন স্বীকার করতো এবং গ্রামে এলেই একবার অন্তত দেখা করে তাদের কৃতজ্ঞতা বোধ জানিয়ে যেত। ধীরে ধীরে মূল্যবোধের অবনমনের  সঙ্গে সঙ্গে কারো কারো মনে এটাও জাগতে থাকলো যে ওঁরা তো নিজেদের প্রয়োজনে আমাদের জন্য এই জমিজমা বা পুকুর দিয়েছেন, এমনি এমনি তো দেননি। কিন্তু এই কথাটা ভুললে চলবে না যে এই পৃথিবীতে কোন কিছুই বিনামূল্যে পাওয়া যায় না। দুর্ভিক্ষের সময় যখন মানুষ একটু ভাতের ফেন চাইতো বা ঘাস,পাতা খেয়ে পেট ভরাতো সেইসময় তাদের জমির ধান বা পুকুরের মাছ পাওয়া একটা বিরাট ব্যাপার ছিল। যুদ্ধোত্তর কালে ভূমি সংস্কার আইন পাস হলো এবং লাঙ্গল যার জমি তার
স( অপারেশন বর্গা) চালু হয়ে গ্রামের সম্প্রীতিকে একদম নষ্ট করে দিল। যে দৈত্য এতদিন বোতল বন্দী ছিল তাকে বোতলের বাইরে এনে এক ভীষণ অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো এবং জমিদার বা বড়লোকদের জোতদার ও শোষক বলে ছাপ মেরে দেওয়া হলো এবং যারা এতদিন শান্তিতে বসবাস করছিল তাদের মনের মধ্যে বিষ ঢেলে দিয়ে এই মধ্য মেধার লোকজন নিজেদের একটা কেউকেটা বলে মনে করতে লাগলো। এইসব লোকজন সবাই যে অসৎ ছিলেন তা নয় কিন্তু ক্ষমতার অলিন্দে একবার ঢুকলেই মাথাটা ভারী হয়ে যায়। অনেক জায়গায় এই জমিজমার মালিকরা প্রাণ হারান তাঁদের ই একসময় প্রতিপালিত প্রজাদের হাতে। আরও কিছুদিন পরে এই গজিয়ে ওঠা নেতারাও এই দৈত্যদের হাতের ক্রীড়নক হয়ে পড়েন এবং আজকের রাজনীতির মূলকথা জোর যার মূলুক তার। সুতরাং লাঠালাঠির যুগে যার লাঠি বেশি মজবুত, সেই টিকে থাকবে। নেতার মান কেমন হবে সেটা নির্ভর করে তার হাতে কত টাকা রয়েছে, কতজন লেঠেল, কতজন গুণ্ডা ও বোমাবাজি করার লোক আছে। রাজনীতির অঙ্গনে আজ এইসব ষণ্ডা গুণ্ডাদের জয়জয়কার। নীতিবোধ নিয়ে চলা রাজনৈতিক নেতারা আজ অচল এবং আঙুলে গুণে বলা যায় কজন আছেন এইরকম সব লোকজন।

দাশুর বাপ ঠাকুর্দাও এই ঘরামির কাজ করতো। কিন্তু শুধু ঘরামির কাজে তো পেট ভরে না, বাবুদের দেওয়া জমিতে চাষাবাদ করে নানারকম ফসল ফলিয়ে সংসার মোটামুটি ভাবে চলে যেত। দাশুর ছেলেমেয়েরা এখন বাবুদের দেওয়া জমিতে গড়ে ওঠা স্কুলে পড়াশোনা করে। পয়সাকড়ি লাগেনা আর সরকারের দেওয়া মিড ডে মিলে ছেলেমেয়েদের একটা বেলা খাবার জুটে যায়। এছাড়া রয়েছে সরকারি রেশন ব্যবস্থা, যাতে রেশনের চালগম খেয়েও খানিকটা বাজারে বিক্রি করে দুটো পয়সা আসে। দাশু এছাড়াও করে সাইকেল রিপেয়ারিং এবং খুচখাচ নানারকম কাজ। একটাই ইচ্ছা তার, যাতে তার ছেলেমেয়েকে আর তার মতো ঘরামির কাজ করে না খেতে হয়। পূজো এগিয়ে আসছে। পাড়ায় পাড়ায় প্যান্ডেল বানানোর কাজ শুরু হয়ে গেছে। নানা জায়গায় খুঁটি পূজো হয়ে‌গেছে এবং রামবাবু নানা জায়গায় কন্ট্রাক্ট ধরার চেষ্টা করছেন। খুবই ব্যস্ত এই দুই তিন মাস। দাশু একটা প্যান্ডেল বেঁধে আরেকটা পাড়ায় বাঁধতে চলে যায়, বাড়ি আসা তার হয়েই ওঠেনা। দাশুর বউ তার ছেলে মেয়েদের নিয়ে বাড়ি সামলায় আর প্রতীক্ষায় থাকে কবে রামবাবুর কাছ থেকে টাকা নিয়ে সে তাদের জন্য নতুন জামাকাপড় আনবে। রামবাবুও সবসময় পুরো টাকা একসাথে দিতে পারেন না কারণ তাঁকেও পূজো কমিটি থেকে সব টাকা পেতে হবে। যাই হোক, এইভাবেই এক পূজো গড়িয়ে আর এক পূজো এসে যায়। রামবাবুর ও বয়স হয়েছে। ব্যবসা দেখে মূলত তার ছেলে যার মাথাটা বড়ই গরম। মাঝে মধ্যেই তার থেকে বয়সে অনেক বড় দাশুকে দুচার কথা বিশ্রীভাবে শুনিয়ে দেয়। দাশু কোন কথা বলেনা, আড়ালে জামার হাতায় চোখ মোছে। এতদিনের ব্যবসা, রামবাবুর বাবার আমল থেকে সে রয়েছে। ছেড়েও যেতে পারেনা, কেমন যেন মনে হয় এই ব্যবসাটা হয়তো তার ই। কিন্তু রামবাবুর একটা বড় অসুখ থেকে ওঠার পরে আজকাল প্রায় আসেন ই না আর ছেলেটাও হয়েছে এক অপগণ্ডো। বাপের টাকায় মদ খেয়ে পয়সা উড়িয়ে ব্যবসাটা কে লাটে ওঠানোর জোগাড় করেছে। ধীরে ধীরে কন্ট্রাক্টের সংখ্যা কমছে আর সেখানে টান ধরা মানেই সবকিছুতেই টান ধরা। দাশু পুরনো খদ্দেরের কাছে যায় এবং শুনতে পায় যে রামবাবুর ছেলের ব্যবহারে তারা অত্যন্ত অসন্তুষ্ট এবং তারা কাজ দিয়ে দিচ্ছে অন্য কন্ট্রাক্টরকে। আজকাল তো পাড়ার ছেলেরা নিজেরা প্যান্ডেল বাঁধেনা, তারা এদিকে ওদিকে ঘুরে কাপ্তানি করে আর কার কাছে কিভাবে টাকা তোলা যায় তার ধান্দায় থাকে। এরা কোন না কোন দলের মন্ত্রী বা নেতাদের আশ্রয় পুষ্ট।তোলাবাজি এরাই করে নেতাদের কথায় এবং নেতাদের কাছে যখন সাধারণ লোক যায় তখন একটু মানিয়ে গুছিয়ে নেতারা তাঁর যা নেবার সেটাই বলে দেন এবং ওই চ্যালাদের হাত ঘুরে সেটা নেতাদের কাছে আসে এবং ভাগ বাটোয়ারা তারপর হয়। ওই নেতাদেরও দাশু ছোট থেকেই দেখেছে এবং ঘেন্নায় তাদের ধার মারাতেও সে লজ্জা বোধ করে। আর কিছুদিন যদি চালাতে পারে, ছেলেটা যদি একটু দাঁড়িয়ে যায়, দাশু ছেড়ে দেবে এই কাজ। কিন্তু করবেটাই বা কি? আর কোন কাজ সে ভালভাবে জানেও না। আর দিন দিন বয়স তো বাড়ছে, চাষবাস করতেও যে শরীরের জোর লাগে তা ও আজ কমে আসছে। সুতরাং, ঘুরে ফিরে সেই রামবাবুর ওখানেই যাওয়া এবং তাঁর ছেলের কাছে কারণে অকারণে গালমন্দ শোনা। একদিন হঠাৎ ই রামবাবু দোকানে এসে হাজির এবং তার ছেলেকে দাশুর প্রতি অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুনে ভীষণ বিরক্ত হলেন। ছেলেকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলেন। ছেলে জানালো যে দাশু কন্ট্রাক্ট ধরতে পারেনি এবং সেই কারণেই তার এত রাগ। পরে দাশুকে ডেকে জিজ্ঞেস করায় জানতে পারলেন যে ছেলের অসভ্যতার কারণে কন্ট্রাক্ট হাতছাড়া হয়েছে। কিছু বললেন না তারপর আস্তে করে দাশুকে বললেন যে বাড়িতে তার সঙ্গে দেখা করতে।
দাশু তাঁর কথামতো বাড়িতে এলো। খানিকক্ষণ কথাবার্তা বলার পর রামবাবু বললেন, " দাশু, এই প্যাকেট টা তুই রাখ আর তুই আসিস না এখানে। দাশু হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো আর বললো, বাবু, আপনার বাবার আমল থেকে আমি আসছি এই বাড়িতে, আমার এবাড়ি ছাড়া আর কোথাও জায়গা নেই।'' রামবাবু বললেন, " তুই চিন্তা করিস না, এই প্যাকেটে কিছু টাকা আছে যেটা  আমি তোর টাকা থেকে কেটেই রেখে দিয়েছিলাম। আজ এই টাকাটা তুই নিয়ে যা আর আমি তোকে অন্য একটা জায়গায় বলে দিচ্ছি, সেখানে তুই কাজ করবি এবং তারা আমার থেকেও অনেক ভাল লোক এবং সেখানে তুই আরামে থাকতে পারবি। তোর মতো বিশ্বাসী লোক পেলে ওরাও বর্তে যাবে।" 
বাবু, আমি আর কাজ করবো না, আপনাদের কাছেই কাজ করেছি আর এখানেই শেষ।
ঠিক আছে, এই টাকাটা খুব কম কিছু নয়, এতে তোদের ভালভাবে চলে যাবে এবং তোর ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ ও এতে হয়ে যাবে। এর পরেও কোন প্রয়োজন হলে আমার কাছে আসবি, আমি সাধ্যমত তোর পাশে থাকব।
হঠাৎ আকাশটা কেমন শূন্য হয়ে গেল। গতবছর অবধি কাজের চাপে দাশু পূজোর প্রায় শেষে আসতো সবার জামাকাপড় কিনে কিন্তু এইবছর পূজোতে সময় ই সময়। এবার বউকে নিয়ে ঠাকুর দেখতে বেরোবে।

Thursday, 2 July 2026

"গল্প নয়, লেখক ও নই, তবু কিছু কথা"

জেলা সদরের সবচেয়ে বড় ব্যাঙ্ক, স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইণ্ডিয়া তার ই মতো একটা বড় বাড়িতে যেখানে  কয়েক হাত অন্তর বিরাট বিরাট কাঠের জানলা কাম দরজা যার মধ্যে দুটো বড় কাঠের লম্বা ডাণ্ডা যেটা ওপর নীচ করলে জানলার খড়খড়িগুলো খুলে যায় এবং পরিমিত পরিমাণে আলো হাওয়া আসে সারি সারি ভাবে বারান্দার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চলে গেছে। অনেক কর্মচারী সামনে বসে আছেন কাউন্টারে যারা কাউন্টারের বাইরে লাইনে দাঁড়ানো লোকের কাছ থেকে  চেক বা টাকা ওঠানোর ফর্ম নিয়ে একটা টোকেন দিয়ে দিচ্ছে এবং তাদের সামনে থাকা ব্যাঙ্কের লেজারে লিখে পাঠিয়ে দিচ্ছে পিছনে বসে থাকা ছোট,বড় ও মাঝারি কর্মকর্তাদের কাছে। কাউন্টারের পিছনে বসে আলাদা টেবিল চেয়ারে  বসে থাকা  কর্মকর্তারা পাঠানো চেকগুলো সই করে সাদা প্যান্ট জামা পরিহিত পিওনদের হাতে একটা ছোট খাতায় লিখে পাঠিয়ে দিচ্ছেন ক্যাশিয়ারদের কাছে।  তখন ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তোলা এবং জমা দেওয়া ছিল এক বিরাট ব্যাপার। কোন লোককে জিজ্ঞেস করে যদি এই উত্তর পাওয়া যেত যে সে ব্যাঙ্কে যাচ্ছে তাহলে ধরে নিতে হতো যে সে একটা বিরাট কাজ করতে চলেছে।  ব্যাঙ্ক খোলা মাত্রই অনেক লোক বিভিন্ন কাউন্টারে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে গেল, কেউ টাকা তুলবে, কেউ বা জমা দেবে আবার কেউ বা পাসবই আপ টু ডেট করাবে। ব্যাঙ্কের লোকেরা ভীষণ ব্যস্ত, কারো কথা বলার সময় নেই, ঠোঁটে সিগারেট চেপে সিনেমার নায়কদের মতো কথা বলতে তারা ব্যস্ত নিজেদের মধ্যে এবং কাউন্টারের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন অসহায় ভাবে তাকিয়ে আছে কখন সেই আকাঙ্খিত ভদ্রলোক কাউন্টারে এসে বসেন এবং তাঁরা তাঁদের কাজটা করে বিদায় নিতে পারেন। অনেক সময়ই অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা যেমন বর্তমান রাজনীতি বা বৈদেশিক রাজনীতি নিয়েও জ্ঞানগর্ভ আলোচনা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন তাঁরা, আলোচনায় ব্যাঘাত ঘটলে খুব বিরক্তি সহকারে এসে কাউন্টারে বসতেন এবং লাইনের সামনে থাকা প্রথম ভদ্রলোক খুব মোলায়েম স্বরে হয়তো জিজ্ঞেস করতেন, "ভাল আছেন?" বা আরও একটু বেশি পরিচিত হলে একটা সিগারেট অফার করতেন। একপ্রস্থ এই কাউন্টারে হলে,যাওয়া ক্যাশ কাউন্টারে এবং সেখানেও বিরক্তিভরা ক্যাশিয়ারের সামনে নিজের প্রয়োজনমতো টাকা চাইতে গেলে হয় ভীষণ বুকের পাটা কিংবা আরও একটা সিগারেট খসানো। অনেক সময়ই এমন হতো যে ক্যাশিয়ার একটা সিগারেট নেওয়ার ছলে পুরো প্যাকেটটাই নিজের কাছে রেখে দিত। অবশেষে কাজ সমাধা এবং একটা মহা আনন্দে বাড়ি ফিরে আসা যে ব্যাঙ্কের কাজ হয়েছে।‌ এ তো গেল টাকা তোলার কথা। জমা দিতে গেলে এত হ্যাপা ছিলনা, টাকা নিয়ে জমা দেয়ার ফর্ম বা ভাউচার ভর্তি করে ক্যাশিয়ার বাবুর জন্য অপেক্ষা করা এবং তিনি উল্টেপাল্টে নোটগুলো পরীক্ষা করে টাকাটা নেবেন এবং কাউন্টারফয়েলটা স্ট্যাম্প মেরে একটা দুর্বোধ্য কলমের আঁচড় দিয়ে ফেরত দিয়ে দেবেন। যদি পাসবুক আপটুডেট করতে হয় তবে সে আরো এক ঝামেলা। একটা দুটো এন্ট্রি থাকলে বকুনি খাওয়ার সম্ভাবনা কম কিন্তু বেশ কিছুদিন না করালে বকুনি খেতেই হবে বা নিদেনপক্ষে একটা বিরক্তিভরা মুখ ব্যাদান দেখতেই হবে। যাই হোক, ব্যাঙ্কের কাজ একটা বিরাট ব্যাপার এবং গ্রাহকদের কাছে ব্যাঙ্কের কর্মচারী ও অধিকর্তাদের ভীষণ চাহিদা এবং তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে সবাই এককাট্টা। কিন্তু সবাই তো একরকম হননা, অনেক সহৃদয় ব্যক্তি আছেন যাঁরা গ্রাহকদের সুবিধা কিসে হবে সেই দিকে নজর দিতেন এবং বলাই বাহুল্য যে তাঁরা সকলের কাছে প্রিয় থাকতেন। কারেন্ট অ্যাকাউন্টে যারা টাকা দেওয়া নেওয়া করতেন তাদের টাকার অঙ্কটা সাধারণত বড় হতো এবং অনেক ক্ষেত্রেই তাঁরা একটা বড় ব্যাগে ছোট বড় সব ধরনের নোটে ভর্তি  করে দিতেন । অনেক সময়ই ব্যাঙ্কের ক্যাশিয়ারদের সঙ্গে বিশ্বাসের মাত্রা এতটাই বেশি থাকতো যে ভাউচারে সই করে কোন টাকা কতটা দিয়েছেন সেটাও লিখতেন না, ক্যাশিয়ার বাবুর গোনা হলে তিনি লিখে দিতেন এবং জমা করে দিতেন। এটা একটা সর্বোচ্চ পর্যায়ের বিশ্বাস এবং এটা কখনোই এক দিনে আসেনা। কারেন্ট অ্যাকাউন্টের লেজার এক দেখার মতো জিনিস। বিশাল মোটা একটা চামড়ায় বাঁধানো রেজিস্টার যেটা তোলা  বা নামানো যে সে লোকের কম্মো নয় এবং তিনি সযত্নে একটি টেবিলের উপর থাকতেন। কর্মচারীরা চেক নিয়ে এসে এখানে পোস্ট করতেন  এবং আধিকারিকদের এখানে এসে সই করতে হতো কারণ ওটা নিয়ে নাড়াচাড়া করাটা খুব সহজসাধ্য ছিল না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছুই বদলে গেছে। এইরকম মোটা চামড়ায় বাঁধানো জাবদাখাতাগুলো আর্কাইভে স্থান পেয়েছে। সেভিংস ব্যাঙ্কের লেজারগুলো ছোট হলেও সেগুলোও বাঁধানো হতো। ধীরে ধীরে খোলা সিট দিয়ে কাঠের ফ্রেমে বাঁধানো হলো এবং ধীরে ধীরে তাও বদলে এল এ এল পি এম বা অ্যাডভান্সড লেজার পোস্টিং মেশিন। কিছুদিন পরে তাও বদলে গেল এবং ব্যাঙ্ক মাস্টার এবং তার ও পরে এল পুরোপুরি কম্পিউটারিজেশন। এখন অনেক লোক আর ব্যাঙ্কে কাজ করেনা, সেই কাজগুলো করে কম্পিউটার। আগে এক ই শহরে দুটো ব্রাঞ্চ থাকলে এক  ব্রাঞ্চ থেকে অন্য ব্রাঞ্চে থাকা টাকা তোলা যেতনা। বিদেশ থেকে আসা কোন কাস্টমার যখন এই ধরণের কথা বলতেন তখন হাঁ করে সবাই শুনতো এবং তিনি চলে গেলে মুখ টিপে হাসতো, ভাবতো নির্ভেজাল মিথ্যে বা গুল দিয়েছে। এ তো গেল এক ই শহরের  এক শাখার টাকা অন্য শাখা থেকে তোলা। এটা কি কখনো  ভাবা গিয়েছিল যে এক শহরের টাকা অন্য শহরে অতি অল্প সময়ের  মধ্যেই ঢুকে যাবে? হ্যাঁ , তাও সম্ভব হয়েছে আর টি জি এস( রিয়েল টাইম গ্রহ সেটেলমেন্ট ) বা এন ই এবং টির
( ন্যাশনাল ইলেকট্রনিক ফাণ্ড ট্রান্সফারের )  বা আই এম পি এস( ইমিডিয়েট পেমেন্ট সার্ভিসের ) মাধ্যমে । 
আগে কারেন্ট অ্যাকাউন্টের লেজার ব্যালান্স হতো প্রতি সপ্তাহের শুক্রবার এবং সেভিংস ব্যাঙ্কের লেজারগুলো মাসে একবার। ফিক্সড ডিপোজিটগুলো হতো তিনমাস বা ছয়মাসে একবার। সেভিংস ব্যাঙ্কের লেজারের সংখ্যা বেশি হওয়ায় প্রত্যেক দশটা বা পনেরটা লেজারের জন্য একটা প্রোগ্রেসিভ বুক এবং কয়েকটি প্রোগ্রেসিভ বুক মিলে একটা মাস্টার প্রোগ্রেসিভ,  যার ব্যালান্সটা মিলাতে হতো জেনারেল লেজারের ব্যালান্সের সঙ্গে। দিনের শেষে ডে বুক এবং ক্যাশ বুক, জেনারেল লেজার ও জেনারেল লেজার অ্যাবস্ট্রাক্ট। সপ্তাহের শেষে শুক্রবার দিন সাপ্তাহিক অ্যাবস্ট্রাক্ট, এই ছিল ব্যাঙ্কের কাজ। মাসের শেষে পি রিপোর্ট বা পারফর্মেন্স রিপোর্ট পাঠাতে হতো রিজিওনাল অফিসে। আজ সমস্ত দেশে কম্পিউটার আসায় এগুলো সব অতীত। আজ সবকিছুই কম্পিউটার করে , কেবল ঠিকঠাক করে প্রথম এন্ট্রিগুলো করলেই কাজ শেষ। এত লোকের ও দরকার নেই এবং ব্যাঙ্কের লাভের মাত্রাও অনেক বেড়ে গেছে। আজকের প্রজন্মকে খাতাপত্তরে লেখা কাজে ব্যাপৃত হতে হবেনা এবং কোন কাজ কেন করা হচ্ছে তা জানার ও দরকার নেই কেবল কম্পিউটারে ঠিকঠাক এন্ট্রি করলেই কাজ শেষ। যাঁরা কেন কাজটা করতে হচ্ছে জানার চেষ্টা করেন বা করবেন তাঁরা অবশ্যই শীর্ষে আরোহণ করবেন।

 যারা পুরনো দিনের কর্মী তারা অনেকেই এই নতুন কর্মকাণ্ডের সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবহিত নন। প্রতিদিন কিছু না কিছু নতুন জিনিস আসছে গ্রাহকদের সুবিধার্থে  যা মেশিন বা কম্পিউটার ই করছে তবুও  কর্মীদের বা আধিকারিকদের মুখের  হাসি  কোথায় যেন  মিলিয়ে  গেছে । লেজার ব্যালান্স করা একটা কুশলতার পর্যায়ে ছিল যেটা নবীন  প্রজন্মের কর্মীদের করতেই হয়না তবুও  সবাই যেন  ভীষণ ব্যস্ত এবং গম্ভীর, মানুষ যেন খুব বেশি মাত্রায় যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছে এবং ব্যাঙ্ক কর্মীরাও আর পাঁচটা কর্মীর মতো হয়ে গেছে। এর ই মধ্যে যাঁরা কাজ করার সঙ্গে সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের দিকেও নজর দেন তাঁরা একদমই আলাদা এবং তাঁরা এক শাখা থেকে চলে গেলেও লোকে তাঁদের অবশ্যই মনে রাখে।

Thursday, 25 June 2026

"যুগে যুগে মেঘনাদ"

অনেক সময়ই দেখা যায় লেখকরা তাঁদের নিজেদের নাম গোপন করে ছদ্মনামে লিখছেন। ব্রিটিশ রাজত্বে না হয় কারণটা বোঝা গেল কারণ সেই সময় যে কোন ব্যক্তি সরকারের বিরুদ্ধে কিছু লিখলেই মাথার উপর খাঁড়া নেমে আসার সম্ভাবনা থাকতো কিন্তু স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশে মতপ্রকাশের অধিকার তো সবার রয়েছে কিন্তু তা সত্ত্বেও লোকের ছদ্মনামে লেখার প্রবণতা কমেনি। সম্ভাব্য একটা কারণ হলেও হতে পারে যে লেখক কোন লেখা লিখে তার প্রতিক্রিয়া বিভিন্ন বর্গের লোকের মনে কি রকম পড়ে সেটা বোঝার চেষ্টা করেন। নাম প্রকাশ হয়ে গেলে পাঠক তার বক্তব্য লেখকের সামনে খোলাখুলি ভাবে প্রকাশ করতে পারবেনা। আরও একটা কারণ হতে পারে যে শাসকের সমালোচনা করলে তাদের পোষা গুণ্ডা বা ঊর্দিপরিহিত সরকারী কর্মচারীদের রক্তচক্ষুর আড়ালে থাকতে পারা। কারণ যাই হোক, ছদ্মনামে বহু প্রথিতযশা লেখক লিখেছেন এবং যথেষ্ট সমাদর ও লাভ করেছেন। কয়েকজন লেখকের নাম মনে পড়ছে এই সময়ে যাঁরা হলেন:
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর : ভানুসিংহ 
বনফুল: বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় 
হুতোম পেঁচা: কালীপ্রসন্ন সিংহ 
প্যারীচাঁদ মিত্র: টেকচাঁদ ঠাকুর 
প্রমথ চৌধুরী: বীরবল
রাজশেখর বসু: পরশুরাম 
সমরেশ বসু: কালকূট
সুবোধ ঘোষ: কালপুরুষ 
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়: অনিলাদেবী
বিমল ঘোষ: মৌমাছি 
মধুসূদন মজুমদার: দৃষ্টিহীন 
বীরবল: সবুজপত্র 
সুনীল গাঙ্গুলী: নীললোহিত
ধনপতি রাই শ্রীবাস্তব: মুন্সী প্রেমচন্দ।
বিশ্বসাহিত্যের মঞ্চ কাঁপানো লেখক অনেকেই আছেন যেমন 
স্যামুয়েল লংহর্ন ক্লিমেন্স: মার্ক টোয়েন 
এরিক আর্থার ব্লেয়ার: জর্জ অরওয়েল
মেরী অ্যান ইভান্স: জর্জ এলিয়ট 
চার্লস লুডভিজ ডডসন: লুইস ক্যারল
জে কে রাউলিং: রবার্ট গলব্রেথ
আমানতিন অরোর লুইস দু পঁ: জর্জ স্যাণ্ড।
এইরকম বহু লেখক লেখিকা সমস্ত পৃথিবীতে আছেন যাঁদের লেখা বিশ্বসাহিত্যকে  বিভিন্ন সময়ে সমৃদ্ধ করেছে।

লঙ্কেশ্বর  রাবণের জ্যেষ্ঠপুত্র মেঘনাদ  মহাবীর ছিলেন এবং তিনি মেঘের আড়ালে থেকে যুদ্ধ করতে পারতেন। এই মায়াবী যুদ্ধে তাঁর কুশলতার জন্য তিনি স্বয়ং দেবরাজ ইন্দ্রকেও পরাস্ত করেন এবং সেই কারণে তাঁর অপর নাম ছিল ইন্দ্রজিৎ। একবার তো তিনি রাম ও লক্ষণকে নাগপাশে বন্দী করেছিলেন এবং সেই সময় মহাবীর হনুমান সূর্য ওঠার আগে বিশল্যাকরণী না নিয়ে এলে রামায়ণ অন্যভাবে লেখা হতো।
 আগের দিনে যুদ্ধে একটা নির্দিষ্ট  নিয়ম  চালু ছিল। সূর্যোদয়ের পরে শঙ্খনাদ করে যুদ্ধ শুরু  হতো এবং  সূর্যাস্তের পরে তা সেদিনের মতো সমাপ্ত হতো যেটা আজকের  দিনে  একেবারেই  মানা হয়না। রাতের অন্ধকারে বিমান  চুপিসারে এসে বোমা বর্ষণ করে সমস্ত কিছু ওলোট পালোট করে দেবে। এই অগ্রগণ্য লেখকরাও তাঁদের লেখনীর তরবারিতে শান দিয়ে নানান বিষয়ে আলোকপাত করেছেন এবং সমাজকে ঋদ্ধ করেছেন। এঁরাও এক একজন মেঘনাদের সমতুল্য। কোনরকম বিরূপ সমালোচনা এঁদের ব্যাহত করতে পারেনি। আজকের দিনেও অনেক মেঘনাদ আছেন যাঁরা আড়ালে থেকে নিজের পরিচয় গোপন করে সমালোচনার তীর ছোঁড়েন কিন্তু পাল্টা আক্রমণ তাঁদের স্পর্শ করতে পারে না। এঁরাও মেঘনাদের সমতুল।