Thursday, 2 July 2026

"গল্প নয়, লেখক ও নই, তবু কিছু কথা"

জেলা সদরের সবচেয়ে বড় ব্যাঙ্ক, স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইণ্ডিয়া তার ই মতো একটা বড় বাড়িতে যেখানে  কয়েক হাত অন্তর বিরাট বিরাট কাঠের জানলা কাম দরজা যার মধ্যে দুটো বড় কাঠের লম্বা ডাণ্ডা যেটা ওপর নীচ করলে জানলার খড়খড়িগুলো খুলে যায় এবং পরিমিত পরিমাণে আলো হাওয়া আসে সারি সারি ভাবে বারান্দার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চলে গেছে। অনেক কর্মচারী সামনে বসে আছেন কাউন্টারে যারা কাউন্টারের বাইরে লাইনে দাঁড়ানো লোকের কাছ থেকে  চেক বা টাকা ওঠানোর ফর্ম নিয়ে একটা টোকেন দিয়ে দিচ্ছে এবং তাদের সামনে থাকা ব্যাঙ্কের লেজারে লিখে পাঠিয়ে দিচ্ছে পিছনে বসে থাকা ছোট,বড় ও মাঝারি কর্মকর্তাদের কাছে। কাউন্টারের পিছনে বসে আলাদা টেবিল চেয়ারে  বসে থাকা  কর্মকর্তারা পাঠানো চেকগুলো সই করে সাদা প্যান্ট জামা পরিহিত পিওনদের হাতে একটা ছোট খাতায় লিখে পাঠিয়ে দিচ্ছেন ক্যাশিয়ারদের কাছে।  তখন ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তোলা এবং জমা দেওয়া ছিল এক বিরাট ব্যাপার। কোন লোককে জিজ্ঞেস করে যদি এই উত্তর পাওয়া যেত যে সে ব্যাঙ্কে যাচ্ছে তাহলে ধরে নিতে হতো যে সে একটা বিরাট কাজ করতে চলেছে।  ব্যাঙ্ক খোলা মাত্রই অনেক লোক বিভিন্ন কাউন্টারে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে গেল, কেউ টাকা তুলবে, কেউ বা জমা দেবে আবার কেউ বা পাসবই আপ টু ডেট করাবে। ব্যাঙ্কের লোকেরা ভীষণ ব্যস্ত, কারো কথা বলার সময় নেই, ঠোঁটে সিগারেট চেপে সিনেমার নায়কদের মতো কথা বলতে তারা ব্যস্ত নিজেদের মধ্যে এবং কাউন্টারের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন অসহায় ভাবে তাকিয়ে আছে কখন সেই আকাঙ্খিত ভদ্রলোক কাউন্টারে এসে বসেন এবং তাঁরা তাঁদের কাজটা করে বিদায় নিতে পারেন। অনেক সময়ই অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা যেমন বর্তমান রাজনীতি বা বৈদেশিক রাজনীতি নিয়েও জ্ঞানগর্ভ আলোচনা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন তাঁরা, আলোচনায় ব্যাঘাত ঘটলে খুব বিরক্তি সহকারে এসে কাউন্টারে বসতেন এবং লাইনের সামনে থাকা প্রথম ভদ্রলোক খুব মোলায়েম স্বরে হয়তো জিজ্ঞেস করতেন, "ভাল আছেন?" বা আরও একটু বেশি পরিচিত হলে একটা সিগারেট অফার করতেন। একপ্রস্থ এই কাউন্টারে হলে,যাওয়া ক্যাশ কাউন্টারে এবং সেখানেও বিরক্তিভরা ক্যাশিয়ারের সামনে নিজের প্রয়োজনমতো টাকা চাইতে গেলে হয় ভীষণ বুকের পাটা কিংবা আরও একটা সিগারেট খসানো। অনেক সময়ই এমন হতো যে ক্যাশিয়ার একটা সিগারেট নেওয়ার ছলে পুরো প্যাকেটটাই নিজের কাছে রেখে দিত। অবশেষে কাজ সমাধা এবং একটা মহা আনন্দে বাড়ি ফিরে আসা যে ব্যাঙ্কের কাজ হয়েছে।‌ এ তো গেল টাকা তোলার কথা। জমা দিতে গেলে এত হ্যাপা ছিলনা, টাকা নিয়ে জমা দেয়ার ফর্ম বা ভাউচার ভর্তি করে ক্যাশিয়ার বাবুর জন্য অপেক্ষা করা এবং তিনি উল্টেপাল্টে নোটগুলো পরীক্ষা করে টাকাটা নেবেন এবং কাউন্টারফয়েলটা স্ট্যাম্প মেরে একটা দুর্বোধ্য কলমের আঁচড় দিয়ে ফেরত দিয়ে দেবেন। যদি পাসবুক আপটুডেট করতে হয় তবে সে আরো এক ঝামেলা। একটা দুটো এন্ট্রি থাকলে বকুনি খাওয়ার সম্ভাবনা কম কিন্তু বেশ কিছুদিন না করালে বকুনি খেতেই হবে বা নিদেনপক্ষে একটা বিরক্তিভরা মুখ ব্যাদান দেখতেই হবে। যাই হোক, ব্যাঙ্কের কাজ একটা বিরাট ব্যাপার এবং গ্রাহকদের কাছে ব্যাঙ্কের কর্মচারী ও অধিকর্তাদের ভীষণ চাহিদা এবং তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে সবাই এককাট্টা। কিন্তু সবাই তো একরকম হননা, অনেক সহৃদয় ব্যক্তি আছেন যাঁরা গ্রাহকদের সুবিধা কিসে হবে সেই দিকে নজর দিতেন এবং বলাই বাহুল্য যে তাঁরা সকলের কাছে প্রিয় থাকতেন। কারেন্ট অ্যাকাউন্টে যারা টাকা দেওয়া নেওয়া করতেন তাদের টাকার অঙ্কটা সাধারণত বড় হতো এবং অনেক ক্ষেত্রেই তাঁরা একটা বড় ব্যাগে ছোট বড় সব ধরনের নোটে ভর্তি  করে দিতেন । অনেক সময়ই ব্যাঙ্কের ক্যাশিয়ারদের সঙ্গে বিশ্বাসের মাত্রা এতটাই বেশি থাকতো যে ভাউচারে সই করে কোন টাকা কতটা দিয়েছেন সেটাও লিখতেন না, ক্যাশিয়ার বাবুর গোনা হলে তিনি লিখে দিতেন এবং জমা করে দিতেন। এটা একটা সর্বোচ্চ পর্যায়ের বিশ্বাস এবং এটা কখনোই এক দিনে আসেনা। কারেন্ট অ্যাকাউন্টের লেজার এক দেখার মতো জিনিস। বিশাল মোটা একটা চামড়ায় বাঁধানো রেজিস্টার যেটা তোলা  বা নামানো যে সে লোকের কম্মো নয় এবং তিনি সযত্নে একটি টেবিলের উপর থাকতেন। কর্মচারীরা চেক নিয়ে এসে এখানে পোস্ট করতেন  এবং আধিকারিকদের এখানে এসে সই করতে হতো কারণ ওটা নিয়ে নাড়াচাড়া করাটা খুব সহজসাধ্য ছিল না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছুই বদলে গেছে। এইরকম মোটা চামড়ায় বাঁধানো জাবদাখাতাগুলো আর্কাইভে স্থান পেয়েছে। সেভিংস ব্যাঙ্কের লেজারগুলো ছোট হলেও সেগুলোও বাঁধানো হতো। ধীরে ধীরে খোলা সিট দিয়ে কাঠের ফ্রেমে বাঁধানো হলো এবং ধীরে ধীরে তাও বদলে এল এ এল পি এম বা অ্যাডভান্সড লেজার পোস্টিং মেশিন। কিছুদিন পরে তাও বদলে গেল এবং ব্যাঙ্ক মাস্টার এবং তার ও পরে এল পুরোপুরি কম্পিউটারিজেশন। এখন অনেক লোক আর ব্যাঙ্কে কাজ করেনা, সেই কাজগুলো করে কম্পিউটার। আগে এক ই শহরে দুটো ব্রাঞ্চ থাকলে এক  ব্রাঞ্চ থেকে অন্য ব্রাঞ্চে থাকা টাকা তোলা যেতনা। বিদেশ থেকে আসা কোন কাস্টমার যখন এই ধরণের কথা বলতেন তখন হাঁ করে সবাই শুনতো এবং তিনি চলে গেলে মুখ টিপে হাসতো, ভাবতো নির্ভেজাল মিথ্যে বা গুল দিয়েছে। এ তো গেল এক ই শহরের  এক শাখার টাকা অন্য শাখা থেকে তোলা। এটা কি কখনো  ভাবা গিয়েছিল যে এক শহরের টাকা অন্য শহরে অতি অল্প সময়ের  মধ্যেই ঢুকে যাবে? হ্যাঁ , তাও সম্ভব হয়েছে আর টি জি এস( রিয়েল টাইম গ্রহ সেটেলমেন্ট ) বা এন ই এবং টির
( ন্যাশনাল ইলেকট্রনিক ফাণ্ড ট্রান্সফারের )  বা আই এম পি এস( ইমিডিয়েট পেমেন্ট সার্ভিসের ) মাধ্যমে । 
আগে কারেন্ট অ্যাকাউন্টের লেজার ব্যালান্স হতো প্রতি সপ্তাহের শুক্রবার এবং সেভিংস ব্যাঙ্কের লেজারগুলো মাসে একবার। ফিক্সড ডিপোজিটগুলো হতো তিনমাস বা ছয়মাসে একবার। সেভিংস ব্যাঙ্কের লেজারের সংখ্যা বেশি হওয়ায় প্রত্যেক দশটা বা পনেরটা লেজারের জন্য একটা প্রোগ্রেসিভ বুক এবং কয়েকটি প্রোগ্রেসিভ বুক মিলে একটা মাস্টার প্রোগ্রেসিভ,  যার ব্যালান্সটা মিলাতে হতো জেনারেল লেজারের ব্যালান্সের সঙ্গে। দিনের শেষে ডে বুক এবং ক্যাশ বুক, জেনারেল লেজার ও জেনারেল লেজার অ্যাবস্ট্রাক্ট। সপ্তাহের শেষে শুক্রবার দিন সাপ্তাহিক অ্যাবস্ট্রাক্ট, এই ছিল ব্যাঙ্কের কাজ। মাসের শেষে পি রিপোর্ট বা পারফর্মেন্স রিপোর্ট পাঠাতে হতো রিজিওনাল অফিসে। আজ সমস্ত দেশে কম্পিউটার আসায় এগুলো সব অতীত। আজ সবকিছুই কম্পিউটার করে , কেবল ঠিকঠাক করে প্রথম এন্ট্রিগুলো করলেই কাজ শেষ। এত লোকের ও দরকার নেই এবং ব্যাঙ্কের লাভের মাত্রাও অনেক বেড়ে গেছে। আজকের প্রজন্মকে খাতাপত্তরে লেখা কাজে ব্যাপৃত হতে হবেনা এবং কোন কাজ কেন করা হচ্ছে তা জানার ও দরকার নেই কেবল কম্পিউটারে ঠিকঠাক এন্ট্রি করলেই কাজ শেষ। যাঁরা কেন কাজটা করতে হচ্ছে জানার চেষ্টা করেন বা করবেন তাঁরা অবশ্যই শীর্ষে আরোহণ করবেন।

 যারা পুরনো দিনের কর্মী তারা অনেকেই এই নতুন কর্মকাণ্ডের সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবহিত নন। প্রতিদিন কিছু না কিছু নতুন জিনিস আসছে গ্রাহকদের সুবিধার্থে  যা মেশিন বা কম্পিউটার ই করছে তবুও  কর্মীদের বা আধিকারিকদের মুখের  হাসি  কোথায় যেন  মিলিয়ে  গেছে । লেজার ব্যালান্স করা একটা কুশলতার পর্যায়ে ছিল যেটা নবীন  প্রজন্মের কর্মীদের করতেই হয়না তবুও  সবাই যেন  ভীষণ ব্যস্ত এবং গম্ভীর, মানুষ যেন খুব বেশি মাত্রায় যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছে এবং ব্যাঙ্ক কর্মীরাও আর পাঁচটা কর্মীর মতো হয়ে গেছে। এর ই মধ্যে যাঁরা কাজ করার সঙ্গে সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের দিকেও নজর দেন তাঁরা একদমই আলাদা এবং তাঁরা এক শাখা থেকে চলে গেলেও লোকে তাঁদের অবশ্যই মনে রাখে।

Thursday, 25 June 2026

"যুগে যুগে মেঘনাদ"

অনেক সময়ই দেখা যায় লেখকরা তাঁদের নিজেদের নাম গোপন করে ছদ্মনামে লিখছেন। ব্রিটিশ রাজত্বে না হয় কারণটা বোঝা গেল কারণ সেই সময় যে কোন ব্যক্তি সরকারের বিরুদ্ধে কিছু লিখলেই মাথার উপর খাঁড়া নেমে আসার সম্ভাবনা থাকতো কিন্তু স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশে মতপ্রকাশের অধিকার তো সবার রয়েছে কিন্তু তা সত্ত্বেও লোকের ছদ্মনামে লেখার প্রবণতা কমেনি। সম্ভাব্য একটা কারণ হলেও হতে পারে যে লেখক কোন লেখা লিখে তার প্রতিক্রিয়া বিভিন্ন বর্গের লোকের মনে কি রকম পড়ে সেটা বোঝার চেষ্টা করেন। নাম প্রকাশ হয়ে গেলে পাঠক তার বক্তব্য লেখকের সামনে খোলাখুলি ভাবে প্রকাশ করতে পারবেনা। আরও একটা কারণ হতে পারে যে শাসকের সমালোচনা করলে তাদের পোষা গুণ্ডা বা ঊর্দিপরিহিত সরকারী কর্মচারীদের রক্তচক্ষুর আড়ালে থাকতে পারা। কারণ যাই হোক, ছদ্মনামে বহু প্রথিতযশা লেখক লিখেছেন এবং যথেষ্ট সমাদর ও লাভ করেছেন। কয়েকজন লেখকের নাম মনে পড়ছে এই সময়ে যাঁরা হলেন:
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর : ভানুসিংহ 
বনফুল: বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় 
হুতোম পেঁচা: কালীপ্রসন্ন সিংহ 
প্যারীচাঁদ মিত্র: টেকচাঁদ ঠাকুর 
প্রমথ চৌধুরী: বীরবল
রাজশেখর বসু: পরশুরাম 
সমরেশ বসু: কালকূট
সুবোধ ঘোষ: কালপুরুষ 
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়: অনিলাদেবী
বিমল ঘোষ: মৌমাছি 
মধুসূদন মজুমদার: দৃষ্টিহীন 
বীরবল: সবুজপত্র 
সুনীল গাঙ্গুলী: নীললোহিত
ধনপতি রাই শ্রীবাস্তব: মুন্সী প্রেমচন্দ।
বিশ্বসাহিত্যের মঞ্চ কাঁপানো লেখক অনেকেই আছেন যেমন 
স্যামুয়েল লংহর্ন ক্লিমেন্স: মার্ক টোয়েন 
এরিক আর্থার ব্লেয়ার: জর্জ অরওয়েল
মেরী অ্যান ইভান্স: জর্জ এলিয়ট 
চার্লস লুডভিজ ডডসন: লুইস ক্যারল
জে কে রাউলিং: রবার্ট গলব্রেথ
আমানতিন অরোর লুইস দু পঁ: জর্জ স্যাণ্ড।
এইরকম বহু লেখক লেখিকা সমস্ত পৃথিবীতে আছেন যাঁদের লেখা বিশ্বসাহিত্যকে  বিভিন্ন সময়ে সমৃদ্ধ করেছে।

লঙ্কেশ্বর  রাবণের জ্যেষ্ঠপুত্র মেঘনাদ  মহাবীর ছিলেন এবং তিনি মেঘের আড়ালে থেকে যুদ্ধ করতে পারতেন। এই মায়াবী যুদ্ধে তাঁর কুশলতার জন্য তিনি স্বয়ং দেবরাজ ইন্দ্রকেও পরাস্ত করেন এবং সেই কারণে তাঁর অপর নাম ছিল ইন্দ্রজিৎ। একবার তো তিনি রাম ও লক্ষণকে নাগপাশে বন্দী করেছিলেন এবং সেই সময় মহাবীর হনুমান সূর্য ওঠার আগে বিশল্যাকরণী না নিয়ে এলে রামায়ণ অন্যভাবে লেখা হতো।
 আগের দিনে যুদ্ধে একটা নির্দিষ্ট  নিয়ম  চালু ছিল। সূর্যোদয়ের পরে শঙ্খনাদ করে যুদ্ধ শুরু  হতো এবং  সূর্যাস্তের পরে তা সেদিনের মতো সমাপ্ত হতো যেটা আজকের  দিনে  একেবারেই  মানা হয়না। রাতের অন্ধকারে বিমান  চুপিসারে এসে বোমা বর্ষণ করে সমস্ত কিছু ওলোট পালোট করে দেবে। এই অগ্রগণ্য লেখকরাও তাঁদের লেখনীর তরবারিতে শান দিয়ে নানান বিষয়ে আলোকপাত করেছেন এবং সমাজকে ঋদ্ধ করেছেন। এঁরাও এক একজন মেঘনাদের সমতুল্য। কোনরকম বিরূপ সমালোচনা এঁদের ব্যাহত করতে পারেনি। আজকের দিনেও অনেক মেঘনাদ আছেন যাঁরা আড়ালে থেকে নিজের পরিচয় গোপন করে সমালোচনার তীর ছোঁড়েন কিন্তু পাল্টা আক্রমণ তাঁদের স্পর্শ করতে পারে না। এঁরাও মেঘনাদের সমতুল।







Monday, 22 June 2026

"আঁধারমানিক"

কোন কিছু লিখতে গেলেই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা মনে পড়ে যায় এবং তাঁকে নৈবেদ্য উৎসর্গ না করে কোন লেখাই যেন সম্পূর্ণতা পায়না। হঠাৎই তাঁর স্ফুলিঙ্গের একটি ছোট্ট কবিতা মনে পড়ে গেল আর বিড়বিড় করে বলে উঠলাম 
"বহুদিন ধরে বহু ক্রোশ দূরে 
বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে 
দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা,
দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু।
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া 
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া 
একটি ধানের শিষের উপর 
একটি শিশিরবিন্দু।"
সত্যিই তাঁর কি ব্যাপ্তি, কি গভীরতা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের চিন্তার ও অগম্য। আমাদের চিন্তা, বোধ বুদ্ধি কেমন যেন তাঁকে ঘিরেই আবর্তিত হয় বারবার যেমন সূর্যের চারপাশে সমস্ত গ্রহগুলো আবহমানকাল থেকে আবর্তিত হয়ে চলেছে।

আমাদের মধ্যে অনেকেই লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে বিদেশে যাই কিন্তু কাছে পিঠে কত সৌন্দর্য্য যে লুকিয়ে আছে যা আমাদের অজানা। এইরকম ই কলকাতা থেকে খুব একটা দূরে নয় প্রায় ১৫০কিলোমিটার দূরে
বর্ধমান জেলার গুসকরা থেকে দশ কিলোমিটার ভিতরে ছোট্ট একটা গ্রাম নূরপুরে থাকা কুটুমবাড়ি রিসর্ট বা গেস্ট হাউস। কুটুমবাড়ি শুনলেই যেন পাওয়া যায় একটা বৈবাহিক সম্বন্ধের গন্ধ, একটা বেশ ঘন মাখোমাখো সম্পর্কের সুবাস। আমাদের অর্জুন সব বিষয়েই যেন সিরিয়াস। কোন কিছু করার আগে তার সম্পর্কে চারিদিক থেকে নানান তথ্য সংগ্রহ করে সকলের সামনে যখন উপস্থাপন করে তখন আর কারও কিছুই জিজ্ঞাস্য থাকেনা। অবশ্য এটা একদিনেই সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতা আসেনা, আসে দীর্ঘ পথ পরিক্রমার পর। কেউ কেউ অতি অল্প সময়েই নিজের প্রতিষ্ঠা পায় আবার কারো হাজার চেষ্টাতেও তা অধরাই থেকে যায়। 
জামাইষষ্ঠী পেরিয়ে গেল সবেমাত্র গতকাল আর তার অব্যবহিত পরেই কুটুমবাড়ি যাওয়া সেই পুরনো দিনের সকাল সকাল জামাইবাবাজীবনের বৌ,ছেলেমেয়েকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার কথা মনে পড়িয়ে দিল। অর্জুন, নকুল,সহদেব ও ধৃষ্টদ্যুম্ন বেরিয়ে পড়েছে তাদের সহধর্মিণীদের নিয়ে( সবার ছেলেমেয়েরাই প্রতিষ্ঠিত এবং বাইরে থাকে)  কমন কুটুমবাড়ির উদ্দেশ্যে  একটা বাস ভাড়া করে। মাঝে ব্রেকফাস্ট সেরে পৌঁছাতে প্রায় বারোটা বেজে গেল। বাঁদিকে লম্বা লম্বা শালগাছগুলো পরস্পরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছে কে আগে ভাগে সূর্যের আলোটা নিতে পারে, পাশে অর্জুন গাছ, ইউক্যালিপটাস ও সোনাঝুড়িও বলছে তোমরা যদি ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনা হও, আমরাও পর্তুগাল বা সেনেগাল হতে পারি। যাওয়া মাত্রই নিজেদের জমিতে লাগানো ড্রাগন ফ্রুট জুস ওয়েলকাম ড্রিঙ্কস হিসেবে পেলাম এবং কর্ণধার হিসেবে যাকে দেখলাম তাতে আমাদের চোখ ছানাবড়া। একটি অল্পবয়সী সপ্রতিভ মেয়ে ইকনমিক্সে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন করে এই হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টকে প্রফেশন হিসেবে বেছে নিয়েছে। সবার আধার কার্ড রেজিস্ট্রেশন হয়ে যাওয়ার পরে স্থানীয় কয়েকটি ছেলে যারা ওই রিসর্ট বা কুটুমবাড়িতে কাজ করে ঘরে ঘরে সুটকেস ও ব্যাগ দিয়ে দিল। শালবনের উল্টো দিকে একটি গেস্ট হাউস যেখানে  এক ই ছাদের তলায় তিনটে ঘর এবং আরও একটি ঘর তার ডানদিক থেকে লক্ষ্য রাখা ম্যানেজমেন্ট হাউসে যেখানে বড় চওড়া বারান্দায় ডাইনিং হল , রান্নাঘর এবং মেয়েটির থাকার ঘর।  ম্যানেজমেন্ট হাউসের পাশে একটি ছোট অথচ সুন্দর মন্দির যা রিসর্টে ঢুকতে গেলেই চোখে পড়বে। ধৃষ্টদ্যুম্নের স্থান হলো মন্দির সংলগ্ন ম্যানেজমেন্ট হাউসে এবং অর্জুন, নকুল ও সহদেব থাকল অপর গেস্ট হাউসে। একটু পরিচয় বিনিময়ের পরেই হাতমুখ ধুয়ে চলে আসা হলো সেই ম্যানেজমেন্ট হাউসের বড় বারান্দায় বা ডাইনিং হলে। মেনু কি আছে জিজ্ঞেস করায় মেয়েটি মুচকি হেসে বললো একটু সারপ্রাইজ আছে স্যার। কোন কথা না বাড়িয়ে সারপ্রাইজের অপেক্ষা করতে লাগলাম। সরু চালের ভাতে যখন বাড়িতে তৈরি গাওয়া ঘি পড়ল সমস্ত জায়গাটা ম ম করে উঠলো ঘিয়ের সুগন্ধে। স্যালাডে নিজেদের জমির লঙ্কা এবং লেবু, নিজেদের জমির টাটকা বেগুন ভাজা, পাবতা মাছের ঝাল ও চরে খাওয়া খাসির মাংসের অপূর্ব স্বাদের পাতলা ঝোল। পাণ্ডবদের যথেষ্ট বয়স হয়েছে, সুতরাং হাজার অনুরোধ ও তাদের টলাতে পারল না আরও একটু মাংস নিতে। দারুণ পেঁপের চাটনি এবং পাঁপড় ভাজা ও ঘরে পাতা খুবই সুস্বাদু দই এবং খাঁটি ছানার রসগোল্লা। সেখানে ও অনুরোধ এবং তাতেও টলানো গেলনা তাদের। এরপর জম্পেশ আড্ডা এবং প্রকৃতির রূপ উপভোগ করা। রোদ পড়ে আসছে, গাছের পাতাগুলো তাদের রঙ বদলাচ্ছে তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আর তিনটি সারমেয় কালু, ঘুন্টুও ভুলুর পায়ে পায়ে সারাক্ষণ লেপটে থাকা । যারা কুকুর প্রেমী অথচ শহর কলকাতায় সেটা ব্যবহারে ফুটে উঠলে চারিদিকে হৈহৈরৈরৈ পড়ে যাবে, তাঁরা প্রাণভরে তাঁদের ভালবাসা বিনিময় করে নিলেন। একটু পরেই সেই অল্পবয়সী কর্ণধার  নিয়ে গেলেন তাঁর বাগান ও পুকুর দেখাতে। ছোট ছোট পেঁপে গাছে বিরাট বড় পেঁপে ঝুলছে, ছোট আমগাছে আমের গুচ্ছ, লেবু, মুসম্বি, কলা, সারি সারি কাঁঠাল গাছ, দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। পুকুর পাড়ে পৌঁছে আন্দাজ করা গেলনা কত মাছ আছে তবে মালকিন জানালেন যে  সেখানে থাকা রুই ও কাতলা প্রায় তিন কেজির এবং অনেক কৈ মাছ আছে সেখানে। পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সেই কালু, ঘুন্টুও ভুলু। বারান্দায় থাকা বেতের সোফায় বসে আড্ডা চলার ফাঁকে অরণ্যে সন্ধ্যা নেমে আসা উপভোগ করা। প্রকৃতি যে কিভাবে রঙ বদলায় তার বর্ণনা স্বয়ং কবিগুরু হয়তো পারতেন এবং তাঁর কলম থেকে নিঃসৃত হতো  সেই অসাধারণ রূপ। ধীরে ধীরে আলো জ্বলে উঠলো এবং শুরু হলো ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। হঠাৎই গেল আলোটা নিভে এবং জোনাকির আনাগোনা শুরু হলো। ওহ্, সেকি দারুণ রূপ। শহর কলকাতায় তো ঝিঁঝিঁর ডাক বা জোনাকির নিরুত্তাপ আলো দেখা তো বিরল ঘটনা। সন্ধে নামার আগে নানান রঙের প্রজাপতির নেচে নেচে বেড়ানো দেখাও  এক দুর্লভ ব্যাপার। অল্পক্ষণের মধ্যেই আলো এল কিন্তু সবগুলো জ্বলছে না মানে ইনভার্টার চালু হয়েছে। এর কিছুক্ষণ পরেই আবার কুটুমবাড়ি আলোয় ঝলমলিয়ে উঠলো, বোঝা গেল সরকারি আলো এসে গেল। রাতে খাবার টেবিলে বসে একটু গান গাওয়া হলো এবং অল্পবয়সী কর্ণধার ও তার সুরেলা গলায় ঝঙ্কার তুললেন । ইতিমধ্যে নকুলজায়া কারেনুমতিও তাঁর সুরেলা গলায় কয়েকটি রবীন্দ্র সঙ্গীত, নজরুল গীতি ও অতুলপ্রসাদের গান পরিবেশন করলেন এবং বোঝা গেল গত নয়মাস সুদূর আমেরিকায় তাঁর যথেষ্ট চর্চা হয়েছে।

অন্ধকারের এক বিশেষ রূপ আছে। আলো নিভিয়ে বসে আড্ডা চলছে এবং মাঝে মাঝেই বিদ্যুতের ঝিলিক এসে দেখিয়ে দিচ্ছে রাস্তাটা। মাঝে মাঝেই হুক্কা হুয়া শব্দে শেয়ালের ডাক শোনা যাচ্ছে আর দলপতি কালু তার দলবল নিয়ে ঐদিকে তেড়ে তেড়ে যাচ্ছে আর ঐ ডাকছাড়ার মালিকরা দিচ্ছে চম্পট। মাঝে মাঝেই পেঁচার ডাক জমাট বাঁধা অন্ধকারের নিস্তব্ধতাকে বাঙ্ময় করে তুলছে। রাত প্রায় সাড়ে বারোটা হলো, এবার একটু বিছানায় গা এলানো দরকার। 
সকাল সাতটায় চা এসে গেছে। ধৃষ্টদ্যুম্ন শরীরটাকে নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করছে। এবার স্নান করে জলখাবার খেয়েই বেরিয়ে পড়ার আয়োজন। তরুণী কর্ণধার দেবস্মিতার একটি বিশেষ গুণ লক্ষ্য করা গেল যে তিনি নিজেই পাখা নিয়ে হাওয়া করছেন যদিও ফ্যান যথেষ্ট জোরেই চলছে। অতিথি অভ্যাগতদের এইরকম যত্ন আত্তি করা আজকাল এক বিরল ঘটনা। সামনে রয়েছে তার বিরাট ভবিষ্যত। তাঁর সহযোগী অক্ষয়, মঙ্গল ও ধর্মের ব্যবহার ও রীতিমতো উল্লেখ করার মতো। আসলে যথা রাজা তথা প্রজা কথাটার সত্যতা এদের ব্যবহারে নজর পড়লো। বাসে মালপত্র ওঠাতে ওঠাতেই গেটের মধ্যে ঢুকল দুটো গাড়ি এবং নেমে এলেন আমাদের ই মতো আটজন ভদ্রলোক। বুঝলাম কুটুমবাড়ির খ্যাতি বেশ ভালই ছড়িয়েছে। প্রার্থনা করলাম সর্বশক্তিমান ভগবানের কাছে এই মেয়েটি যেন তার এই আন্তরিক আতিথেয়তা বজায় রাখে এবং জীবনে আশাতীত সাফল্য লাভ করে।

Monday, 15 June 2026

"বাজার---এক মহামিলন স্থল"

বাজারে যায়নি বা যায়না এরকম লোক খুব কমই আছে, সে যে ধরণের বাজার ই হোক না কেন।আগের দিনে আমাদের দিদিমা, ঠাকুমারা বাজারে যেতেন না বা যেতে হতো না কারণ তখন সেটা ছিল একমাত্র পুরুষদের বিচরণ ক্ষেত্র।  অবশ্য কোন  কোন বিশেষ  ক্ষেত্রে তাঁদের  কথাই ছিল  শেষ কথা যেমন কোন  গয়না গড়াতে হবে বা বিয়ের  সময় বিশেষ  কিছু  শাড়ি কিনতে হবে সেক্ষেত্রে বাড়িতে স্বর্ণকার  আসতেন বা শাড়ির  দোকান  থেকে স্বয়ং মালিক বা তাঁর খাস লোক আসতেন শাড়ির পসরা নিয়ে। গ্রামের দিকে বর্ধিষ্ণু পরিবারে এখনও এই জাতীয় ব্যাপার স্যাপার কিছু দেখা যায় কিন্তু  সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে  মহিলারা  এমন নাক গলিয়েছেন যে পুরুষদের  পৌরুষত্ব আজ ছত্রখান  এবং আজকের দিনে শপিং মলে মহিলাদের ই জয়জয়কার। তা অনেকদিন একচ্ছত্র আধিপত্য ভোগ করেছে পুরুষ সমাজ , এখন একটু জিরিয়ে নিলে মন্দ কিছু হয়না।
কিন্তু বাজার বলতে সাধারণত যা বোঝায় মানে তরিতরকারি বা মাছের বাজার সেখানে প্রমিলা সমাজের এত দাপট নেই। একটা যুৎসই কারণ হলো যে স্নো পাউডার মেখে বা সাজগোজের ঘটা করে গেলে দশটাকার জিনিসটা কুড়ি টাকা বলে পাঁচ টাকা কমিয়ে পনের টাকায় জিনিসটা কিনলে আখেরে লোকসান বই লাভ কিছুই হয়না। তাছাড়া, রোদের মধ্যে ঘুরে ঘুরে গলদঘর্ম হয়ে ঢেঁড়সের ল্যাজ মুড়িয়ে দেখে নেওয়া যে তিনি শিশু না শিশুর কাকা, জ্যাঠা বা দাদামশাই কিনা ,এটা এত সহজ কাজ নয়। দৈবাৎ, দুর্ঘটনাবশত দুচারটে এরকম চলে এলে বা বেগুনে একটাদুটো ফুটো বেরোলে বাবা, দাদুদের যে মুণ্ডুপাত হতো তা তো আর করা যাবেনা, সুতরাং ওই জায়গাটা পুরুষদের ই থাক, গজর গজর করলে হার্টটা অন্তত ভাল থাকবে। সেই কারণে সফ্ট স্কিল যেখানে দরকার সেখানে মহিলারা যাবেন এবং দোকানে গিয়ে  পুরুষ সেলসম্যানদের প্রাণ ওষ্ঠাগত করে ছাড়বেন। হাজার এক টা জিনিস নামিয়ে তারপর নাক সিঁটকে অন্য দোকানে পাড়ি জমাবেন। এঁদের ঠেকাতে যেমন বুনো ওল তেমন বাঘা তেঁতুল করার জন্য দোকানদাররাও তেমন সেয়ানা হয়ে গেছেন এবং তাঁরাও বেছে বেছে অত্যন্ত মুখরা মেয়েদের বিক্রেতা হিসেবে রেখেছেন। তারা ঐরকম মহিলা দেখলেই বুঝতে পারে যে এরা কিনতে আসেনি, বাড়ির ইলেকট্রিক বিল বাঁচিয়ে শপিং মলের ঠাণ্ডা উপভোগ করতে এসেছে। পান চিবোতে চিবোতে জিজ্ঞেস করে ম্যাডাম, আপনার বাজেটটা একটু বলুন তো। তারপর পাঁচ সাতটা দেখিয়েই বলে, সরি ম্যাডাম আপনার ওই বাজেটে আমাদের স্টকের মিল হচ্ছে না। এবার বোঝ ঠ্যালা। যে স্বামীর কপাল খারাপ তাকে তার স্ত্রীর পিছন পিছন চলতে হয় এবং একটু দেঁতো হাসি হেসে দোকান থেকে বিদায় নিতে হয়। এ এক রীতিমতো হিউমিলিয়েশন , একবার এ দোকানে আর একবার ওই দোকানে। বোনাস পেলে বা কিছু বাড়তি ইনসেনটিভ পেলে স্বামীর তখন তোয়াজ হয় এবং তখনই বুঝতে হবে যে পাঁঠাকে বলি দেবার জন‌্য স্নান করানো হচ্ছে। এইসব হক কথা লেখার ফল যে কি বিষময় তার ভাবলেই বুকটা কেঁপে কেঁপে উঠছে। যাওয়া যাক অন্য বাজারে যেখানে সামান্য একটু খারাপ জিনিস হলেও  দুচারটে অভিধান থেকে খুঁজে বের করা শব্দ বিন্যাস কানে ঢুকবে। ঠিক আছে, তখনকার জিনিস তখনই সামলানো যাবে।

এবার আসা যাক পুরুষের একচ্ছত্র সাম্রাজ্য সব্জি ও মাছের বাজারে।  এখানে যে বাজারের কথা বলা হচ্ছে সেটা কিন্তু পাইকারি বাজার নয়, এটা হচ্ছে প্রতিদিনের  খুচরো বাজার। প্রত্যেকটি লোকের ই কিছু পছন্দসই লোক আছে যার কাছে মালপত্র না নিলে মনে হয় বাজারটা ই ঠিকঠাক হলোনা। সোমনাথ, সুকুমার, কাশী, রহমানের কাছে বিশেষ বিশেষ জিনিস কিনতেই হবে। মাসির কাছে শাকের আঁটি ছাড়া বাজারটা তো সম্পূর্ণ ই হবেনা। অশোকের কাছে ফল, দিদির কাছে ফুল 
( বিশেষ করে বৃহস্পতিবার পূজোর ফুলে  একটা আমের শাখা, অন্তত দুচারটে জবা ও তুলসী পাতা থাকতেই হবে) এবং মাছের বাজারে সাধন বা উত্তমের কাছ থেকে নিতেই হবে কারণ ওরা মাছটা বেশ পরিস্কার করে কেটে দেয়। কোন কারণবশত ওরা না থাকলে অন্য কারো কাছে নিতে হয় কিন্তু মনটা একটু খুঁতখুঁত করে। তারপরে ছোট মাছ হলে ভোম্বল বা নারায়ণ বাবু যেরকম পরিষ্কার করে ছাড়িয়ে দেয় বাড়িতে আর বিশেষ কিছু করার থাকে না। পাঁঠার মাংস ফুল মহম্মদ এবং চিকেন টা মতির কাছেই কিনতে হবে। এদের ছাড়া বাজার করাটাই যেন অতৃপ্তির। অনেক সময়ই মুম্বাই যেতে হয়  ছেলের কাছে এবং সেখানে রোহিত বা ফৈয়জ বা মাছ ওয়ালি ইন্দু ছাড়া অন্য কারো কাছে যাওয়া নয়। ওরা যে কিছু কম দাম নিচ্ছে এমন নয় কিন্তু একটা দারুণ সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে এই কেনাবেচার মাধ্যমে। কব আয়া আঙ্কেল শুনলেই মনটা কেমন যেন খুশিতে ভরে ওঠে আসলে আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে যে " আমিটা" লুকিয়ে আছে সেটা পরিতৃপ্ত হয় এবং যে দামটাই তারা বলুক না কেন সেই ভেতরের আমিটা তাতেই সায় দেয়। মাঝে মাঝেই কোন পানু বা সৈয়দ কে আর দেখতে পাওয়া যায়না এবং তাদের বসার জায়গায় অন্য লোক বসলেও ফিরে তাকাতেও ইচ্ছে করেনা, কেবলই মনে হয় অলি বারবার ফিরে আসে অলি বারবার ফিরে যায়। এই বাজারেই গরীব, মধ্যবিত্ত বা বড়লোক আসে এবং নিজের নিজের সাধ্যানুযায়ী তাদের পছন্দের সোমনাথ, সুকুমার বা কাশীর কাছে জিনিস কেনে এবং এই মহা মিলনস্থলে সকলের সমাগম হয়। গ্রামে গঞ্জে যেমন দূরে দূরে গ্রাম  দশবারোখানি মাঝে একখানি হাট, সন্ধ্যায় সেরা জ্বলে না প্রদীপ প্রভাতে পড়েনা ঝাঁট       শহরের বাজার কিন্তু দিনে রাতে সবসময়ই জমজমাট আর আমরা সবাই এই মহামিলন স্থলের প্রতিনিয়ত যাত্রী।

Saturday, 13 June 2026

"অপরিচিত"

বহুলোকের সঙ্গে প্রথম পরিচয়েই কেমন যেন ভীষণ আপন মনে হয় আবার অনেক লোকের সঙ্গে দীর্ঘ পরিচিতির পরেও সম্পর্ক তেমন দানা বেঁধে ওঠেনা। প্লেনে বা বাসে এই জাতীয় সম্পর্ক সেরকম ঘনীভূত হয়না যতটা দূর পাল্লার ট্রেনে সহযাত্রীর সঙ্গে হয়। তাও সেই আলাপচারিতা সীমাবদ্ধ থাকে নিজের ক্যুপের মধ্যে বা বড়জোর পাশের সাইড বার্থের সহযাত্রীর সঙ্গে এবং এই চলার সঙ্গী যদি যাত্রা শুরু স্টেশনের থেকে শেষ পর্যন্ত হয়। মাঝপথে উঠলে বা নেমে গেলে সময়ের সংক্ষিপ্ততার জন্য সেরকম জমে ওঠেনা।
গপ্পিষ্ঠি লোকদের কথা বলতে না পারলে পেট ফোলা শুরু হয় যার অবশ্যম্ভাবী ফল হলো পুরো যাত্রাটার আনন্দ মাঠে মারা যাওয়া। অনেকেই ওপরের বার্থ খুব পছন্দ করেন কারণ তাঁরা একবার ওপরে উঠেই বইয়ের মধ্যে ডুবে যান কিংবা ইদানিং কালের সদা সঙ্গী মুঠোফোন যেখানে ইউ টিউবে নানান জিনিস চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সুতরাং তাঁরা নিজেদের আপন গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেন।
দূরপাল্লার ট্রেন যেখানে যাত্রাপথ চব্বিশ ঘণ্টার বেশি, যদি সন্ধে গড়িয়ে একটু রাতে ছাড়ে তখন প্রথমে মালপত্র রাখা নিয়ে একটু মন কষাকষি হলেও পরেরদিন সকাল বেলায় বেশ স্বাভাবিক হয়ে আসে অবশ্য সেটা যদি মোটামুটি সমপর্যায়ের লোকজন হয়। অনেকেই থাকেন বড় বেশি উন্নাসিক এবং এসি টু টায়ারে একটা ক্যুপে যদি তিনটি বার্থ তাঁদের হয় তাহলে চতুর্থ ব্যক্তি  হিসেবে সেখানে ঘাড় গলানো মুশকিল কিন্তু যদি দুই দুই হয় তবে ব্যাপারটা একটু জমে উঠতে পারে।

চিরাগ যাচ্ছে কলকাতা থেকে বম্বে রাতের ট্রেনে এসি টু টায়ারে কিন্তু তার পড়েছে আপার বার্থ এবং তার পায়ের ব্যথার জন্য সে টিকিট পরীক্ষককে অনুরোধ করছে যে একটা নিচের বার্থ তাকে দেওয়ার জন্য। নিচের দুটো বার্থ ই এক সিনিয়র সিটিজেন দম্পতির। সুতরাং, তাঁদের কারো পক্ষেই উপরের বার্থে যাওয়া সম্ভব নয়। সাইড লোয়ার বার্থেও একজন ভদ্রমহিলা একাই সফর করছেন এবং তাঁর উপরের বার্থে একজন সুদর্শন বাঙালি ভদ্রলোক যাচ্ছেন। চিরাগ বোম্বের লোক হলেও কলকাতার সঙ্গে সম্পর্ক তার বহুদিনের এবং কবে চুপিচুপি যে সেও সিনিয়র সিটিজেন হয়ে গেছে তার খেয়াল ই নেই। টিকিট পরীক্ষক অনেক চেষ্টা করেও চিরাগকে একটা লোয়ার বার্থ জোগাড় করে দিতে পারলেন না। অগত্যা সারা রাত উপরের বার্থে উঠতে না পেরে নিচের বার্থে থাকা ভদ্রমহিলার পায়ের কাছে কোনরকমে একটু বসার জায়গা করে নিয়ে রাতটা কাটিয়ে দিল প্রায় না ঘুমিয়েই। সামনের লোয়ার বার্থে থাকা ভদ্রলোকের একটু অস্বস্তি হচ্ছে তাঁর স্ত্রীর পায়ের কাছে বসার জন্য। শেষমেষ থাকতে না পেরে বলেই বসলেন যে আপনি ওখানে না বসেআমার পায়ের কাছে বসুন। সিংহ বুড়ো হলেও সে তো সিংহ ই। চিরাগ ওখানেই বসতো কিন্তু ভদ্রলোক বেশ লম্বা এবং পা টানটান করে শুলে অবশ্যই তার গায়ে লাথি লাগার সম্ভাবনা। একেবারে তাঁর প্রস্তাব উড়িয়ে না দিয়ে পায়ের কাছে বসলো এবং একটু পরেই ইচ্ছাকৃত না অনিচ্ছাকৃত দুচার বার লাথিও খেল সে। অগত্যা বাধ্য হয়েই সে একবার এই বাথরুমের ধারে বা উল্টোদিকের বাথরুমের ধারে খানিকটা দাঁড়িয়ে, খানিকটা হেলান দিয়ে সারা রাতটা কাটিয়ে দিল। পরদিন সকালে একটা স্টেশনে ট্রেন থামতেই দেখতে পেল যে চায়ের ডিব্বা নিয়ে একটা লোক চায় চায় করে যাচ্ছে। দুকাপ চা একসঙ্গে খেয়ে রাতের অনিদ্রা খানিকটা কম করার চেষ্টা করল। এদিকে ঐ সুদর্শন বাঙালি ভদ্রলোক ও নেমেছেন চা খেতে। চা খেতে খেতেই আলাপ হলো ভদ্রলোকের সঙ্গে। উনি দীপ্ত মুখার্জি, ভাল গান করেন মান্না দে এবং মানবেন্দ্র মুখার্জির। চিরাগ ও রফি ও মুকেশের গান একটু আধটু গাইতো এবং ধীরে ধীরে ট্রেন স্টার্ট করার আগেই উঠে পড়লো তারা। দুই সবে বুড়োর গল্প বেশ জমে উঠলো। ইতিমধ্যে ভদ্রমহিলা ও উঠে পড়েছেন এবং কোনরকমে তারা তিনজন সাইড বার্থে বসে পড়েছে। এদিকে ক্যুপের মধ্যে শোয়া ভদ্রমহিলা বা ভদ্রলোক তখন ও ওঠেন নি। যাই হোক খানিকক্ষণ বাদে তাঁরা উঠলেন কিন্তু তাঁদের ই একজন সহযাত্রী সারারাত কিভাবে কাটালেন সে রাস্তায় ভুলেও গেলেন না। চিরাগ ততক্ষণে দীপ্ত মুখার্জির সঙ্গে নানা বিষয়ে আলোচনায় মেতে উঠলো। ইতিমধ্যে ঐ ভদ্রমহিলা নাগপুরে নেমে যাওয়ায় মিস্টার মুখার্জির অনুরোধে টিকিট চেকার এবং নাগপুরে ওঠা ভদ্রলোককে অনুরোধ করে চিরাগের উপরের বার্থ টা নেওয়ালেন। অনেক রাত অবধি মিস্টার মুখার্জির সঙ্গে চিরাগের খুব ই নীচু স্বরে গল্প চলতে থাকলো এবং ভোরের আলো ফুটে উঠছে এমন সময় কর্জত স্টেশন এসে গেল।  করজত স্টেশনে বাড়তি ইঞ্জিন লাগার জন্য একটু বেশি সময় দাঁড়ায়।ওখানে আলু বড়া ও চা দারুণ সুস্বাদু। চিরাগ একটু বেশি করেই আলু বড়া কিনতে চাওয়ায় ওকে দিতে একটু দেরি হয়েছে এবং ইতিমধ্যে দুভাঁড় চা নিয়ে এসে রেখেছে সামনের  টেবিলে। ইতিমধ্যে ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলা সামনে চা দেখে তাঁরা চুমুক দিয়ে ফেলেছেন আর ট্রেনটাও চলতে শুরু করেছে এবং চাওয়াটাও বিদায় নিয়েছে। চিরাগ এবং মুখার্জি আলু বড়া নিয়ে উঠে দেখে যে তাদের রাখা চা সেই দম্পতি যুগল আরামে পান করছেন। পরে ভুল বুঝতে পেরে জিভ কাটা কিন্তু ততক্ষণে যা হবার তা হয়ে গেছে। দাদার স্টেশনে মুখার্জি নেমে গেলেন কিন্তু চিরাগ নামবে ছত্রপতি শিবাজী টার্মিনাসে। ওখানেই তার গাড়ি আসবে। কয়েকদিন থেকেই চিরাগ ফিরে আসবে কলকাতায়। প্রথম প্রথম মুখার্জির সঙ্গে বেশ ঘন ঘন টেলিফোনে কথাবার্তা চলতো । অনেকদিন হয়ে গেছে , কথাবার্তা নেই দুজনের। আজ সকালে চিরাগ ভাবলো যে মুখার্জির সঙ্গে একটু কথা বলে সম্পর্কটা ঝালিয়ে নিতে। মোবাইলে অনেকবার ফোন করার পর অকস্মাৎ হ্যালো বলে আওয়াজ এল। মিস্টার মুখার্জি, কেমন আছেন? আমি চিরাগ শাহ কথা বলছি, মনে পড়ে ট্রেনে আমাদের আলাপের কথা? কিন্তু এক নিথর নিস্তব্ধতা, অপর প্রান্ত থেকে উত্তর এল আমি মিসেস মুখার্জী বলছি। আপনার নম্বরটা সেভ করা ছিল বলে বুঝতে পারছি যে আপনি চিরাগ শাহ, ট্রেন মেট। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে আমার স্বামী মিস্টার মুখার্জি গতমাসের ১৬ তারিখে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। আবার নিস্তব্ধতা। কেউ কোন কথা বলতে পারছে না। চিরাগ অস্ফূট স্বরে বলে উঠলো দারুণ গাইতেন মিস্টার মুখার্জি মান্না দের গান। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ফোনটা ছেড়ে দিল সে।
অনেক সময়‌ বৃত্ত ছোট হলে স্বল্প পরিচয়েও একজন অন্যের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পারে আবার অনেক  ক্ষেত্রে বহুদিনের আলাপ ও সেই জায়গাটা করে নিতে পারে না। মিস্টার মুখার্জির নম্বরটা ডিলিট করে দিলেও মন থেকে তাঁকে মুছে ফেলা সহজে যাবেনা।

Tuesday, 2 June 2026

"ছোটঘর"

একান্নবর্তী পরিবারে একটা আলাদা মজা। অনেক ভাই বোন একসঙ্গে থাকার ফলে সবসময়ই একটা হৈহৈ রৈরৈ কাণ্ড। আজকাল তো এটা দেখতে পাওয়া একটা বিরল ঘটনা। তবে দেখা যায় আমাদের টিভির নিরবচ্ছিন্ন সিরিয়ালে আর কিছু পারিবারিক ব্যবসায়ীর পরিবারে। কিন্তু যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে মজাটা যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। ব্যবসায়িক পরিবারে জেঠতুতো, খুড়তুতো ভাইবোনেরা সবাই পড়াশোনা আর প্রাইভেট টিউশনের চাপে যেন কেমন সদাই ম্রিয়মাণ। এই ভাই একটা ক্লাসে তো আর এক ভাই ক্রিকেট কোচিং এ যাচ্ছে। নিজেদের মধ্যে খেলে যে অনাবিল আনন্দ পাওয়া, সেটা যেন কোন মন্ত্রবলে উধাও। টিভির সিরিয়ালে বাবা, মা, বড়ছেলে ও তার পরিবার, মেজ ছেলে ও তার পরিবার, বিবাহিত মেয়ে ও জামাইদের আসাযাওয়া, অবিবাহিত ছেলে এখনও চাকরি জোগাড় করতে না পারায় তার সংসার এখনও হয়নি এবং  সংসারে যাবতীয় এটা সেটা খাটার জন্য কেউ কোন অসুবিধা টের পাচ্ছে না এবং অবিবাহিত মেয়ে চাকরি করে বা টিউশনি করে নিজের হাতখরচা চালিয়ে নিচ্ছে কিন্তু কূটকচালিতে ওস্তাদ। এইধরনের সিরিয়ালগুলো মাসের পর মাস, বছরের পর বছর চলে এবং আই পি এল ক্রিকেট না থাকলে আপনি কোপনি পরিবারের এটাই একমাত্র সম্বল এবং তার পরেও সেই সিরিয়ালগুলো নিয়ে আলোচনা এবং কেউ একজনকে আবার কেউ অন্যকে সমর্থন করায় নিজেদের মধ্যেও মন কষাকষি। কিন্তু আমি যে সময়ের কথা বলতে চাইছি সেটা বেশ অনেকদিন আগের।

বড় একটা বাড়ি, অনেকগুলো ঘর এবং তাও  যথেষ্ট বড় ,বাবা মায়ের একটা ঘর এবং  অবিবাহিত ছেলে ও মেয়ের একটা করে ঘর হলেও বিবাহিত ছেলেদের দুটো করে ঘর , ঠাকুর ঘর, বাইরের ঘরে ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে পড়াশোনা করে এবং অন্যসময় অতিথি এলে সেখানে বসেন, বড় রান্নাঘরে যৌথ পরিবারের হেঁসেল এবং বড় বারান্দায় মাটিতে আসন পেতে খেতে বসা(ছুটির দিনে এবং রাতের খাওয়ার সময়) এবং বারান্দার শেষ প্রান্তে ছোটঘর যেখানে বাচ্চা ছেলেমেয়েরা খেলা করে এবং বিশেষ সময়ে সেটা আঁতুড়ঘর হিসেবে বা কেউ অসুস্থ হলে রোগের বিচার করে সেখানে থাকে। কোন কোন বাড়িতে ঠাকুরের স্থান হয় চিলেকোঠার ঘরে এবং খুব বয়স্ক মানুষ হলে( দাদু বা ঠাকুমা)  সেখানে থাকেন এবং সমস্ত ব্যবস্থা সেখানেই থাকে। তখন ছিল পাড়া কালচার এবং একটা পাড়ায় লোকজন বলতে বোঝাতো অমুকের বাড়ি বা তমুক বাবুর বাড়ি। ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে অস্থিরতা বাড়তে লাগল, সঙ্গে সঙ্গে অসহিষ্ণুতাও, রেষারেষি শুধু এবাড়ির সঙ্গে ও বাড়ির নয়, এক ই বাড়িতে ভাইয়ে ভাইযেও সংক্রমিত হতে লাগল এবং পারিবারিক বাঁধন যেন ক্রমশ শিথিল হতে লাগল। যারা একটু সফিস্টিকেটেড তারা ট্রান্সফার নিয়ে বাইরে চলে গেল এবং পরিবারের ভেঙে যাওয়া সাময়িক ভাবে পিছিয়ে দিতে পারল কিন্তু ততদিনে যা হবার তা হয়ে গেছে, জল চুঁয়ে চুঁয়ে পারিবারিক বন্ধনকে ধীরে ধীরে ক্ষয় ধরিয়ে দিয়েছে। আচ্ছা এটা তো বেশ পরের ঘটনা, ফিরে যাওয়া যাক সেই সোনালী দিনের কথায়, সেই ছোটঘরের প্রসঙ্গে।
ওটা নামেই ছোটঘর মানে অন্যান্য ঘরের তুলনায় বেশ ছোট যদিও তা দৈর্ঘ্যে ১২ ফুট এবং প্রস্থেও ১২ ফুট এবং সাবেকি আমলের বাড়ি বলেই উচ্চতাও ১২ ফুট। পূর্ব দিকে একটা বড় কাঠের খড়খড়ি দেওয়া জানলা, ভেতরের দিকে  খোলে কাঁচের ভাঁজ করা জানলা। পশ্চিমদিকে দরজা যা বাড়ির ভেতরের বারান্দায় সংযুক্ত এবং উত্তর দিকেও একটা দরজা যেখান দিয়ে বাড়ির সামনের ঘরের দিকে যাওয়া যায়। ঘরে একটা বেশ বড় তক্তাপোশ, একটা টেবিল  ও চেয়ার এবং ছিল একটা  বইয়ে ঠাসা দেয়াল আলমারি।  ঐ ছোটঘর  আবার আঁতুড়ঘর হিসেবে ও ব্যবহৃত হতো। প্রথমদিকে  দাই এবং  পরবর্তীকালে হাসপাতাল ফেরত পিসিমা বা কাকিমাদের বাচ্চা নিয়ে  স্থান হতো এ ছোট ঘরে এবং  একমাস তারা এককথায়  কোয়ারেন্টাইন অবস্থায় থাকতো। তখন বাচ্চাদের  এত পড়াশোনার চাপ ছিল না এবং স্কুলের পরে খেলা এবং সন্ধে বেলায়  পড়তে বসা। ছুটির দিন বাচ্চাদের  কলকলানিতে বাড়ি একদম মুখরিত  থাকতো। সামনের মাঠে খেলা বা বাড়ির  উঠোনে খেলা বা বৃষ্টি হলে বারান্দায় বা ছোটঘরে খেলা।  মাঝে মাঝেই পাড়ার সমবয়সীরাও এসে যোগ দিত এবং বাড়ি তখন কলরবে মুখরিত হয়ে উঠতো।  ওই সময় ঘরের সংলগ্ন পায়খানা (চিন্তাঘর) বা  বাথরুম কেউ কল্পনাও করতে পারত না। ঠাকুমা, দিদিমার পরিভাষায় হতো সেটা ম্লেচ্ছ বাড়ি। কিন্তু আজকের ফ্ল্যাট বাড়িতে তো সবগুলোই তো ম্লেচ্ছ বাড়ি কারণ প্রতি বর্গফুট জায়গা অত্যন্ত মূল্যবান। আর সেই ছোটঘরের দক্ষিণ দিকের বারান্দায় ও দুটো ঘর এবং তার পাশে কলতলা এবং কলতলা সংলগ্ন বারান্দায় একটা মেয়েদের বাথরুম এবং দুটো চিন্তাঘর এবং কলতলায় পাশে ছেলেদের দুটো স্নান ঘর যদিও ছেলেরা সবাই কলতলায় টিউবওয়েল পাম্প করে জল তুলে স্নান করতো। কলতলা এবং  রান্নাঘরের মাঝে বিরাট বাঁধানো উঠোন এবং বেশ খানিকটা ফাঁকা জায়গা যেখানে পেয়ারা গাছ, আমগাছ এবং নানারকম ফুলগাছ ও তুলসীতলা। রান্নাঘরের সংলগ্ন খানিকটা জায়গায় মাটি যেখানে লেবু গাছ, শিউলি গাছ এবং একটা পীচফলের গাছ ছিল। আর ছিল একটা স্থলপদ্ম গাছ যেটা দূর্গা পূজোর সময় ফুলে ফুলে ভরে থাকতো। এরপর ছিল গোয়ালঘর এবং দুটো পেয়ারা গাছ ও একটা আম গাছ। বাড়ির পিছন দিকে ছিল পাঁচটা ঘর  এবং তারপরেই ছিল বাগান। বাগানের পূর্ব দিকে ছিল একটা কুল গাছ, একটা খেজুর গাছ ও একটা খুব বড় ডুমুর গাছ। আউটহাউসের বাসিন্দাদের জন্য ছিল একটা বাথরুম ও চিন্তাঘর এবং আরও একটা টিউবওয়েল।
বাড়ির একটা বিশেষত্ব ছিল এই যে ছোটঘরের সংলগ্ন খিড়কির দরজা খুললে এবং সমস্ত ঘরের দরজাগুলো খুলে দিলে পূর্ব দিকে ওঠা সূর্যের আলো পশ্চিম প্রান্তে বাইরের ঘরে যাবার রাস্তায় পৌঁছে যেত। সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে ঐ সুন্দর বাড়িও ধীরে ধীরে অন্য হাতে চলে গেল কিন্তু রেখে গেল একরাশ স্মৃতি যা মনে পড়লেই ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে ওঠে।

Saturday, 30 May 2026

আকাল--- সেকাল ও একাল

আকাল বা দুর্ভিক্ষ চিরকালের , আগেও ছিল, এখনও আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। কিন্তু তার গতি প্রকৃতি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে যাচ্ছে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা সরকারের ভ্রান্ত নীতির কারণে এই দুর্ভিক্ষ বা আকাল নেমে এসেছে এবং লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি মানুষের প্রাণ হরণ করেছে। কয়েকটা ঘটনা  এই মর্মান্তিক দৃশ্যের প্রত্যক্ষ সাক্ষী। বিগত শতকে ঘটে যাওয়া এই আকাল কিভাবে জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি মানুষের প্রাণ হরণ করেছে যা ভাবলেই শিউরে উঠতে হয়। প্রথমেই মনে আসে ছিয়াত্তরের মন্বন্তর ১৭৭০ সালে ঘটে যাওয়া এই দুর্ভিক্ষ যা প্রায় ১ কোটি মানুষের প্রাণ হরণ করেছে। ১৭৮৩-৮৪ সালে উত্তর ভারতে ঘটে যাওয়া  দুর্ভিক্ষে প্রায় ১কোটি ১০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দোজি বারায় ১৭৮৯-৯২ সালে ঘটা দুর্ভিক্ষ যা খুলি দুর্ভিক্ষ নামেও পরিচিত প্রায় ১কোটি ১০লক্ষ মানুষের প্রাণ নিয়েছে। এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা কঙ্কাল সৎকারের অভাবে এই (খুলি দুর্ভিক্ষ) নামে পরিচিত হয়েছে। আয়ারল্যান্ডে ১৮৪৫-৫২ সালে তাদের প্রধান শস্য আলু উৎপাদন প্রাকৃতিক কারণে ব্যাহত হওয়ায় প্রায় দশ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। চীনের উত্তর ভাগে ১৮৭৬-৭৯সালে ঘটে যাওয়া দুর্ভিক্ষে আনুমানিক ৯০লক্ষ থেকে ১কোটি ৩০লক্ষ মানুষ প্রাণ হারান। সোভিয়েত রাশিয়ায় ঘটে যাওয়া দুর্ভিক্ষে দুই দফায় ৫০লক্ষ থেকে ১ কোটি(১৯২১-২২) এবং ৩৫লক্ষ থেকে ৫০লক্ষ মানুষ ১৯৩২-৩৩ সালে প্রাণ হারান। প্রথম দফায় মৃত্যুর কারণ প্রকৃতি হলেও দ্বিতীয় দফায় দুর্ভিক্ষের কারণ তখনকার শাসক জোসেফ স্ট্যালিনের ভ্রান্ত নীতি যা হলোডোমোর নামে খ্যাত। এর পরেই উল্লেখ করতে হয় আমাদের বাংলায় ১৯৪৩ সালে দুর্ভিক্ষের কথা যেখানে প্রায় ৩০থেকে ৭০ লক্ষ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়। প্রকৃতি ছাড়াও বৃটিশ সরকারের অত্যাচার মূলক ব্যবহার যা এখানে অপ্রতুল উৎপাদিত শস্যের ভাণ্ডার থেকে ব্রিটেনে পাঠিয়ে দেওয়া হয় এবং স্থানীয় লোকেরা অনাহারের সম্মুখীন হয়ে মৃত্যুবরণ করে। সাম্প্রতিক কালে চীনের দুর্ভিক্ষ যা মাও সে তুং এর ভ্রান্ত নীতির ফসল(১৯৫৯-৬১) প্রায় দেড় কোটি থেকে সাড়ে পাঁচ কোটি মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়। সাম্প্রতিক কালে (১৯৮৩-৮৫) ইথিওপিয়ায় ঘটে যাওয়া দুর্ভিক্ষ অনাবৃষ্টি, গৃহযুদ্ধ এবং শাসকদের ভ্রান্ত নীতির সমষ্টিগত ফল। 

সুতরাং, পর্যালোচনা করলে দেখা যায় অতিবৃষ্টি বা অনাবৃষ্টির সঙ্গে যখন তদানীন্তন শাসকদের অদূরদর্শিতা যোগ হয় তখন তার ফল হয় মারাত্মক। আজকের যুগে বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির ও অনেক পরিবর্তন হয়েছে এবং সহমর্মিতা ও বৃদ্ধি পেয়েছে। ইন্টিগ্রেটেড ফুড সোসাইটি ফেজ ক্ল্যাসিফিকেশন (আই পি সি) দুর্ভিক্ষ বা আকালের কারণ এবং সমস্ত বিশ্বের তাবড় তাবড় বিজ্ঞানীদের মতামত সংগ্রহ করে কিভাবে এই দুর্ভিক্ষ বা আকাল এড়ানো যায় এবং একদম এড়ানো না গেলেও তার প্রকোপ কমানো যায় তা নিয়ে পর্যালোচনা করে এবং তার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করার পরামর্শ দেয়। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য প্রকল্প দুর্ভিক্ষ কবলিত দেশগুলিকে খাদ্য জুগিয়ে মানুষকে অনাহার থেকে মুক্তি দান করার চেষ্টা করে এবং মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচতে সাহায্য করে। বিজ্ঞানের উন্নতি এবং মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হলেও প্রকৃতির সঙ্গে সবসময় এঁটে ওঠা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এখনও আফ্রিকার অনেক দেশে বিশেষ করে সুদানের বিস্তীর্ণ এলাকায় এবং দক্ষিণ সুদান ও মধ্য প্রাচ্যের গাজায় খরার প্রকোপে খাদ্যের প্রচণ্ড ঘাটতি হয় কিন্তু মানুষের সহযোগিতার ফলে মৃত্যুহার অনেক কমানো সম্ভব হয়েছে।

স্বাধীনোত্তর ভারতের প্রথমদিকে যখন আমাদের দেশ খাদ্যে স্বনির্ভর হয়ে উঠতে পারেনি তখন মানুষের চরম দুরবস্থা গেছে। অনাবৃষ্টি ও দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির মোকাবিলা করতে ভারতকে আমেরিকার দ্বারস্থ হতে হয় যা "পি এল ৪৮০"  বা পাবলিক ল ৪৮০ নামে খ্যাত। এই আইনটি বিখ্যাত এগ্রিকালচার ট্রেড ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাক্ট,১৯৫৪  বা ফুড ফর পিস বা শান্তির জন্য খাদ্য নামে খ্যাত। এর মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল আমেরিকায় উৎপন্ন বাড়তি খাদ্যশস্য বিক্রি করা এবং ঐদেশের বিদেশ নীতিকে প্রভাবিত করা যাতে তারা কমিউনিস্ট দেশের প্রতি না ঝোঁকে এবং তৃতীয়ত আমেরিকার বাজারের ব্যাপ্তি ঘটানো যা যে কোন দেশের ই লক্ষ্য । আর এই পি এল ৪৮০র অনেকগুলো ভাল দিক আছে। যেমন ক্রেতা দেশকে তাদের ডলার না দিয়ে  নিজেদের মুদ্রা দিয়ে কিনতে হতো এবং এই  মুদ্রাই তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে আমেরিকার সাহায্য হিসেবে গণ্য হতো এবং তৃতীয়ত দুর্গত ও বুভুক্ষু মানুষের প্রতি সহৃদয়তার হাত বাড়ানো একটা অত্যন্ত মানবিকতার পরিচয় এবং এই সাহায্য বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও ধর্মীয় সংগঠনের মাধ্যমে দেওয়া হতো।
যে কোন বিপর্যয়ের একটা ভাল দিক ও থাকে। এই বিপর্যয়ের মোকাবিলা করতে মানুষ চোয়াল শক্ত করে নিজের উদ্ভাবনী ক্ষমতার বিকাশ ঘটায়। স্বনামধন্য বিজ্ঞানী নরম্যান বোর্লো মেক্সিকোয় এক অসামান্য ছাপ রাখেন। তাঁর প্রচুর উৎপাদনশীল এবং পোকায় নষ্ট না হওয়া  ধান ও গমের বীজ, উন্নত মানের সার, আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা এবং যন্ত্রের ব্যবহার মেক্সিকোকে খাদ্যে স্বনির্ভর ই করে তোলেনি, আমদানি কারক দেশ থেকে রপ্তানিকারক দেশে রূপান্তরিত করেছে। আমাদের দেশের বিখ্যাত কৃষিবিজ্ঞানী প্রফেসর এম এস স্বামীনাথন নর্ম্যান বোর্লোর সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে  আমাদের দেশে সবুজ বিপ্লব আনেন এবং পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও পশ্চিম উত্তর প্রদেশে ধান ও গমের ফলনে আমূল পরিবর্তন আনেন এবং ধীরে ধীরে ভারত ও খাদ্যে স্বনির্ভরতার পথে এগিয়ে যায়। কিন্তু যে কোন জিনিসের ভাল ও মন্দ দুটো দিকই আছে। ধান ও গম দুটো শস্য উৎপাদনের জন্য প্রচুর জলের প্রয়োজন এবং হরিয়ানা ও পাঞ্জাবে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কম হওয়ায় অচিরেই ভূগর্ভস্থ জলের পরিমাণ কমে যাবে এবং এই কৃষি ব্যবস্থার পরিবর্তন না হলে মরুভূমিতে পরিণত হয়ে যাবে। বিহারে ধান ও গমের পরিবর্তে অন্যান্য কম জলের প্রয়োজন শস্য উৎপাদনের ফলে বহুলাংশে তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে।

আমাদের দেশে সবুজ বিপ্লবের আগে সাধারণ দরিদ্র মানুষের অবস্থা খুবই সঙ্গীন হয়ে গিয়েছিল। মানুষ ভাতের বদলে ভাতের ফেন ভিক্ষা করতো। ঠা ঠা রোদে খালি পায়ে ভিখারীদের ," মা গো একটু ফেন দাও" বলে ভিক্ষা করতে দেখা যেত। এখন খুব কম লোককেই খালি পায়ে হাঁটতে দেখা যায়। নিলেন পক্ষে হাওয়াই চপ্পল বা রবারের  চপ্পল তো দেখাই যায়। মোবাইল নিয়ে ভিখারির সংখ্যাও নিতান্ত কম নয়। এখন সব সরকার ই দারিদ্র্য সীমারেখার নীচে থাকা লোকজন যাতে অনাহারে না মারা যায় তা সুনিশ্চিত করেন।মাথা পিছু পাঁচ সাত কেজি চাল বা গম/ আটা এবং আর্থিক অনুদানের ও ব্যবস্থা করেছে যেটা পঞ্চাশ ষাট বছর আগে ছিল না। অর্থনৈতিক বৈষম্য চিরদিন ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে সে সাম্যবাদীরা যত ই চিৎকার করুন না কেন। সাম্যবাদের প্রবক্তারা যত ই গলা ফাটিয়ে চিৎকার করুন না কেন তাঁদের স্বপ্নের দেশেও সেই একই অবস্থা । সাম্যবাদ নিশ্চয় ই থাকা উচিত  এবং অর্থনৈতিক  বৈষম্য  যতটা কম হয় ততটাই ভাল কিন্তু  কথাটা কেমন যেন সোনার পাথর বাটি বলে মনে হয়। খুবই আদর্শবাদী ধারণা কিন্তু এই সাম্যবাদের প্রবক্তা দেশ চীন ও আজ বাস্তববাদী হয়েছে এবং রিফর্মের মাধ্যমে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে। অথচ চীন,ভারত ও কোরিয়ার অর্থনীতি সত্তরের দশকে এক লাইনেই খাড়া ছিল। অর্থনৈতিক সংস্কার ভারত নব্বইয়ের দশকে একরকম বাধ্য হয়েই করেছিল এবং তার সুফল আজ মিলছে যদিও নিন্দুকের সংখ্যা কম নেই যারা প্রতিনিয়ত দেশ রসাতলে যাচ্ছে বলে চিৎকার করে চলেছে অথচ এরাই যখন ক্ষমতাসীন ছিল তারা সেরকম ভাবে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেনি।
শুধু খাদ্যে স্বনির্ভরতাই যথেষ্ট নয় তার সুষম বণ্টন ভীষণ প্রয়োজন এবং দুর্নীতিমুক্ত না হলে এটা প্রায় অসম্ভব। দুর্নীতির সূচকে ভারতের অবস্থান ৯১ তম ১৮২টি দেশের মধ্যে যেখানে আমেরিকার অবস্থান ২৯ নম্বরে। ০ থেকে ১০০ নম্বরের স্কেলে আমেরিকার মান ৬৪ যেখানে ভারত পেয়েছে ৩৯। ডেনমার্ক ৮৯ নম্বর পেয়ে শীর্ষস্থানে মানে দুর্নীতি সেখানে সবচেয়ে কম।
ভারতবর্ষকে দুর্নীতিমুক্ত করতে গেলে আমাদের সকলের প্রয়াস দরকার এবং যাতে কোন লোক অনাহারে মারা না যায় তার দিকে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। প্রকৃতির রোষ থেকে হয়তো সবসময় রক্ষা পাওয়া যাবেনা কিন্তু যদি প্রয়োজনীয় খাদ্যের ভাণ্ডার গড়ে তোলা যায় তাহলে  অতিবৃষ্টি বা অনাবৃষ্টির ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতির মোকাবিলা করা সম্ভব এবং জনগণকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব।