Tuesday, 2 June 2026

"ছোটঘর"

একান্নবর্তী পরিবারে একটা আলাদা মজা। অনেক ভাই বোন একসঙ্গে থাকার ফলে সবসময়ই একটা হৈহৈ রৈরৈ কাণ্ড। আজকাল তো এটা দেখতে পাওয়া একটা বিরল ঘটনা। তবে দেখা যায় আমাদের টিভির নিরবচ্ছিন্ন সিরিয়ালে আর কিছু পারিবারিক ব্যবসায়ীর পরিবারে। কিন্তু যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে মজাটা যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। ব্যবসায়িক পরিবারে জেঠতুতো, খুড়তুতো ভাইবোনেরা সবাই পড়াশোনা আর প্রাইভেট টিউশনের চাপে যেন কেমন সদাই ম্রিয়মাণ। এই ভাই একটা ক্লাসে তো আর এক ভাই ক্রিকেট কোচিং এ যাচ্ছে। নিজেদের মধ্যে খেলে যে অনাবিল আনন্দ পাওয়া, সেটা যেন কোন মন্ত্রবলে উধাও। টিভির সিরিয়ালে বাবা, মা, বড়ছেলে ও তার পরিবার, মেজ ছেলে ও তার পরিবার, বিবাহিত মেয়ে ও জামাইদের আসাযাওয়া, অবিবাহিত ছেলে এখনও চাকরি জোগাড় করতে না পারায় তার সংসার এখনও হয়নি এবং  সংসারে যাবতীয় এটা সেটা খাটার জন্য কেউ কোন অসুবিধা টের পাচ্ছে না এবং অবিবাহিত মেয়ে চাকরি করে বা টিউশনি করে নিজের হাতখরচা চালিয়ে নিচ্ছে কিন্তু কূটকচালিতে ওস্তাদ। এইধরনের সিরিয়ালগুলো মাসের পর মাস, বছরের পর বছর চলে এবং আই পি এল ক্রিকেট না থাকলে আপনি কোপনি পরিবারের এটাই একমাত্র সম্বল এবং তার পরেও সেই সিরিয়ালগুলো নিয়ে আলোচনা এবং কেউ একজনকে আবার কেউ অন্যকে সমর্থন করায় নিজেদের মধ্যেও মন কষাকষি। কিন্তু আমি যে সময়ের কথা বলতে চাইছি সেটা বেশ অনেকদিন আগের।

বড় একটা বাড়ি, অনেকগুলো ঘর এবং তাও  যথেষ্ট বড় ,বাবা মায়ের একটা ঘর এবং  অবিবাহিত ছেলে ও মেয়ের একটা করে ঘর হলেও বিবাহিত ছেলেদের দুটো করে ঘর , ঠাকুর ঘর, বাইরের ঘরে ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে পড়াশোনা করে এবং অন্যসময় অতিথি এলে সেখানে বসেন, বড় রান্নাঘরে যৌথ পরিবারের হেঁসেল এবং বড় বারান্দায় মাটিতে আসন পেতে খেতে বসা(ছুটির দিনে এবং রাতের খাওয়ার সময়) এবং বারান্দার শেষ প্রান্তে ছোটঘর যেখানে বাচ্চা ছেলেমেয়েরা খেলা করে এবং বিশেষ সময়ে সেটা আঁতুড়ঘর হিসেবে বা কেউ অসুস্থ হলে রোগের বিচার করে সেখানে থাকে। কোন কোন বাড়িতে ঠাকুরের স্থান হয় চিলেকোঠার ঘরে এবং খুব বয়স্ক মানুষ হলে( দাদু বা ঠাকুমা)  সেখানে থাকেন এবং সমস্ত ব্যবস্থা সেখানেই থাকে। তখন ছিল পাড়া কালচার এবং একটা পাড়ায় লোকজন বলতে বোঝাতো অমুকের বাড়ি বা তমুক বাবুর বাড়ি। ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে অস্থিরতা বাড়তে লাগল, সঙ্গে সঙ্গে অসহিষ্ণুতাও, রেষারেষি শুধু এবাড়ির সঙ্গে ও বাড়ির নয়, এক ই বাড়িতে ভাইয়ে ভাইযেও সংক্রমিত হতে লাগল এবং পারিবারিক বাঁধন যেন ক্রমশ শিথিল হতে লাগল। যারা একটু সফিস্টিকেটেড তারা ট্রান্সফার নিয়ে বাইরে চলে গেল এবং পরিবারের ভেঙে যাওয়া সাময়িক ভাবে পিছিয়ে দিতে পারল কিন্তু ততদিনে যা হবার তা হয়ে গেছে, জল চুঁয়ে চুঁয়ে পারিবারিক বন্ধনকে ধীরে ধীরে ক্ষয় ধরিয়ে দিয়েছে। আচ্ছা এটা তো বেশ পরের ঘটনা, ফিরে যাওয়া যাক সেই সোনালী দিনের কথায়, সেই ছোটঘরের প্রসঙ্গে।
ওটা নামেই ছোটঘর মানে অন্যান্য ঘরের তুলনায় বেশ ছোট যদিও তা দৈর্ঘ্যে ১২ ফুট এবং প্রস্থেও ১২ ফুট এবং সাবেকি আমলের বাড়ি বলেই উচ্চতাও ১২ ফুট। পূর্ব দিকে একটা বড় কাঠের খড়খড়ি দেওয়া জানলা, ভেতরের দিকে  খোলে কাঁচের ভাঁজ করা জানলা। পশ্চিমদিকে দরজা যা বাড়ির ভেতরের বারান্দায় সংযুক্ত এবং উত্তর দিকেও একটা দরজা যেখান দিয়ে বাড়ির সামনের ঘরের দিকে যাওয়া যায়। ঘরে একটা বেশ বড় তক্তাপোশ, একটা টেবিল  ও চেয়ার এবং ছিল একটা  বইয়ে ঠাসা দেয়াল আলমারি।  ঐ ছোটঘর  আবার আঁতুড়ঘর হিসেবে ও ব্যবহৃত হতো। প্রথমদিকে  দাই এবং  পরবর্তীকালে হাসপাতাল ফেরত পিসিমা বা কাকিমাদের বাচ্চা নিয়ে  স্থান হতো এ ছোট ঘরে এবং  একমাস তারা এককথায়  কোয়ারেন্টাইন অবস্থায় থাকতো। তখন বাচ্চাদের  এত পড়াশোনার চাপ ছিল না এবং স্কুলের পরে খেলা এবং সন্ধে বেলায়  পড়তে বসা। ছুটির দিন বাচ্চাদের  কলকলানিতে বাড়ি একদম মুখরিত  থাকতো। সামনের মাঠে খেলা বা বাড়ির  উঠোনে খেলা বা বৃষ্টি হলে বারান্দায় বা ছোটঘরে খেলা।  মাঝে মাঝেই পাড়ার সমবয়সীরাও এসে যোগ দিত এবং বাড়ি তখন কলরবে মুখরিত হয়ে উঠতো।  ওই সময় ঘরের সংলগ্ন পায়খানা (চিন্তাঘর) বা  বাথরুম কেউ কল্পনাও করতে পারত না। ঠাকুমা, দিদিমার পরিভাষায় হতো সেটা ম্লেচ্ছ বাড়ি। কিন্তু আজকের ফ্ল্যাট বাড়িতে তো সবগুলোই তো ম্লেচ্ছ বাড়ি কারণ প্রতি বর্গফুট জায়গা অত্যন্ত মূল্যবান। আর সেই ছোটঘরের দক্ষিণ দিকের বারান্দায় ও দুটো ঘর এবং তার পাশে কলতলা এবং কলতলা সংলগ্ন বারান্দায় একটা মেয়েদের বাথরুম এবং দুটো চিন্তাঘর এবং কলতলায় পাশে ছেলেদের দুটো স্নান ঘর যদিও ছেলেরা সবাই কলতলায় টিউবওয়েল পাম্প করে জল তুলে স্নান করতো। কলতলা এবং  রান্নাঘরের মাঝে বিরাট বাঁধানো উঠোন এবং বেশ খানিকটা ফাঁকা জায়গা যেখানে পেয়ারা গাছ, আমগাছ এবং নানারকম ফুলগাছ ও তুলসীতলা। রান্নাঘরের সংলগ্ন খানিকটা জায়গায় মাটি যেখানে লেবু গাছ, শিউলি গাছ এবং একটা পীচফলের গাছ ছিল। আর ছিল একটা স্থলপদ্ম গাছ যেটা দূর্গা পূজোর সময় ফুলে ফুলে ভরে থাকতো। এরপর ছিল গোয়ালঘর এবং দুটো পেয়ারা গাছ ও একটা আম গাছ। বাড়ির পিছন দিকে ছিল পাঁচটা ঘর  এবং তারপরেই ছিল বাগান। বাগানের পূর্ব দিকে ছিল একটা কুল গাছ, একটা খেজুর গাছ ও একটা খুব বড় ডুমুর গাছ। আউটহাউসের বাসিন্দাদের জন্য ছিল একটা বাথরুম ও চিন্তাঘর এবং আরও একটা টিউবওয়েল।
বাড়ির একটা বিশেষত্ব ছিল এই যে ছোটঘরের সংলগ্ন খিড়কির দরজা খুললে এবং সমস্ত ঘরের দরজাগুলো খুলে দিলে পূর্ব দিকে ওঠা সূর্যের আলো পশ্চিম প্রান্তে বাইরের ঘরে যাবার রাস্তায় পৌঁছে যেত। সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে ঐ সুন্দর বাড়িও ধীরে ধীরে অন্য হাতে চলে গেল কিন্তু রেখে গেল একরাশ স্মৃতি যা মনে পড়লেই ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে ওঠে।

Saturday, 30 May 2026

আকাল--- সেকাল ও একাল

আকাল বা দুর্ভিক্ষ চিরকালের , আগেও ছিল, এখনও আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। কিন্তু তার গতি প্রকৃতি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে যাচ্ছে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা সরকারের ভ্রান্ত নীতির কারণে এই দুর্ভিক্ষ বা আকাল নেমে এসেছে এবং লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি মানুষের প্রাণ হরণ করেছে। কয়েকটা ঘটনা  এই মর্মান্তিক দৃশ্যের প্রত্যক্ষ সাক্ষী। বিগত শতকে ঘটে যাওয়া এই আকাল কিভাবে জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি মানুষের প্রাণ হরণ করেছে যা ভাবলেই শিউরে উঠতে হয়। প্রথমেই মনে আসে ছিয়াত্তরের মন্বন্তর ১৭৭০ সালে ঘটে যাওয়া এই দুর্ভিক্ষ যা প্রায় ১ কোটি মানুষের প্রাণ হরণ করেছে। ১৭৮৩-৮৪ সালে উত্তর ভারতে ঘটে যাওয়া  দুর্ভিক্ষে প্রায় ১কোটি ১০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দোজি বারায় ১৭৮৯-৯২ সালে ঘটা দুর্ভিক্ষ যা খুলি দুর্ভিক্ষ নামেও পরিচিত প্রায় ১কোটি ১০লক্ষ মানুষের প্রাণ নিয়েছে। এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা কঙ্কাল সৎকারের অভাবে এই (খুলি দুর্ভিক্ষ) নামে পরিচিত হয়েছে। আয়ারল্যান্ডে ১৮৪৫-৫২ সালে তাদের প্রধান শস্য আলু উৎপাদন প্রাকৃতিক কারণে ব্যাহত হওয়ায় প্রায় দশ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। চীনের উত্তর ভাগে ১৮৭৬-৭৯সালে ঘটে যাওয়া দুর্ভিক্ষে আনুমানিক ৯০লক্ষ থেকে ১কোটি ৩০লক্ষ মানুষ প্রাণ হারান। সোভিয়েত রাশিয়ায় ঘটে যাওয়া দুর্ভিক্ষে দুই দফায় ৫০লক্ষ থেকে ১ কোটি(১৯২১-২২) এবং ৩৫লক্ষ থেকে ৫০লক্ষ মানুষ ১৯৩২-৩৩ সালে প্রাণ হারান। প্রথম দফায় মৃত্যুর কারণ প্রকৃতি হলেও দ্বিতীয় দফায় দুর্ভিক্ষের কারণ তখনকার শাসক জোসেফ স্ট্যালিনের ভ্রান্ত নীতি যা হলোডোমোর নামে খ্যাত। এর পরেই উল্লেখ করতে হয় আমাদের বাংলায় ১৯৪৩ সালে দুর্ভিক্ষের কথা যেখানে প্রায় ৩০থেকে ৭০ লক্ষ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়। প্রকৃতি ছাড়াও বৃটিশ সরকারের অত্যাচার মূলক ব্যবহার যা এখানে অপ্রতুল উৎপাদিত শস্যের ভাণ্ডার থেকে ব্রিটেনে পাঠিয়ে দেওয়া হয় এবং স্থানীয় লোকেরা অনাহারের সম্মুখীন হয়ে মৃত্যুবরণ করে। সাম্প্রতিক কালে চীনের দুর্ভিক্ষ যা মাও সে তুং এর ভ্রান্ত নীতির ফসল(১৯৫৯-৬১) প্রায় দেড় কোটি থেকে সাড়ে পাঁচ কোটি মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়। সাম্প্রতিক কালে (১৯৮৩-৮৫) ইথিওপিয়ায় ঘটে যাওয়া দুর্ভিক্ষ অনাবৃষ্টি, গৃহযুদ্ধ এবং শাসকদের ভ্রান্ত নীতির সমষ্টিগত ফল। 

সুতরাং, পর্যালোচনা করলে দেখা যায় অতিবৃষ্টি বা অনাবৃষ্টির সঙ্গে যখন তদানীন্তন শাসকদের অদূরদর্শিতা যোগ হয় তখন তার ফল হয় মারাত্মক। আজকের যুগে বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির ও অনেক পরিবর্তন হয়েছে এবং সহমর্মিতা ও বৃদ্ধি পেয়েছে। ইন্টিগ্রেটেড ফুড সোসাইটি ফেজ ক্ল্যাসিফিকেশন (আই পি সি) দুর্ভিক্ষ বা আকালের কারণ এবং সমস্ত বিশ্বের তাবড় তাবড় বিজ্ঞানীদের মতামত সংগ্রহ করে কিভাবে এই দুর্ভিক্ষ বা আকাল এড়ানো যায় এবং একদম এড়ানো না গেলেও তার প্রকোপ কমানো যায় তা নিয়ে পর্যালোচনা করে এবং তার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করার পরামর্শ দেয়। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য প্রকল্প দুর্ভিক্ষ কবলিত দেশগুলিকে খাদ্য জুগিয়ে মানুষকে অনাহার থেকে মুক্তি দান করার চেষ্টা করে এবং মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচতে সাহায্য করে। বিজ্ঞানের উন্নতি এবং মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হলেও প্রকৃতির সঙ্গে সবসময় এঁটে ওঠা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এখনও আফ্রিকার অনেক দেশে বিশেষ করে সুদানের বিস্তীর্ণ এলাকায় এবং দক্ষিণ সুদান ও মধ্য প্রাচ্যের গাজায় খরার প্রকোপে খাদ্যের প্রচণ্ড ঘাটতি হয় কিন্তু মানুষের সহযোগিতার ফলে মৃত্যুহার অনেক কমানো সম্ভব হয়েছে।

স্বাধীনোত্তর ভারতের প্রথমদিকে যখন আমাদের দেশ খাদ্যে স্বনির্ভর হয়ে উঠতে পারেনি তখন মানুষের চরম দুরবস্থা গেছে। অনাবৃষ্টি ও দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির মোকাবিলা করতে ভারতকে আমেরিকার দ্বারস্থ হতে হয় যা "পি এল ৪৮০"  বা পাবলিক ল ৪৮০ নামে খ্যাত। এই আইনটি বিখ্যাত এগ্রিকালচার ট্রেড ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাক্ট,১৯৫৪  বা ফুড ফর পিস বা শান্তির জন্য খাদ্য নামে খ্যাত। এর মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল আমেরিকায় উৎপন্ন বাড়তি খাদ্যশস্য বিক্রি করা এবং ঐদেশের বিদেশ নীতিকে প্রভাবিত করা যাতে তারা কমিউনিস্ট দেশের প্রতি না ঝোঁকে এবং তৃতীয়ত আমেরিকার বাজারের ব্যাপ্তি ঘটানো যা যে কোন দেশের ই লক্ষ্য । আর এই পি এল ৪৮০র অনেকগুলো ভাল দিক আছে। যেমন ক্রেতা দেশকে তাদের ডলার না দিয়ে  নিজেদের মুদ্রা দিয়ে কিনতে হতো এবং এই  মুদ্রাই তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে আমেরিকার সাহায্য হিসেবে গণ্য হতো এবং তৃতীয়ত দুর্গত ও বুভুক্ষু মানুষের প্রতি সহৃদয়তার হাত বাড়ানো একটা অত্যন্ত মানবিকতার পরিচয় এবং এই সাহায্য বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও ধর্মীয় সংগঠনের মাধ্যমে দেওয়া হতো।
যে কোন বিপর্যয়ের একটা ভাল দিক ও থাকে। এই বিপর্যয়ের মোকাবিলা করতে মানুষ চোয়াল শক্ত করে নিজের উদ্ভাবনী ক্ষমতার বিকাশ ঘটায়। স্বনামধন্য বিজ্ঞানী নরম্যান বোর্লো মেক্সিকোয় এক অসামান্য ছাপ রাখেন। তাঁর প্রচুর উৎপাদনশীল এবং পোকায় নষ্ট না হওয়া  ধান ও গমের বীজ, উন্নত মানের সার, আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা এবং যন্ত্রের ব্যবহার মেক্সিকোকে খাদ্যে স্বনির্ভর ই করে তোলেনি, আমদানি কারক দেশ থেকে রপ্তানিকারক দেশে রূপান্তরিত করেছে। আমাদের দেশের বিখ্যাত কৃষিবিজ্ঞানী প্রফেসর এম এস স্বামীনাথন নর্ম্যান বোর্লোর সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে  আমাদের দেশে সবুজ বিপ্লব আনেন এবং পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও পশ্চিম উত্তর প্রদেশে ধান ও গমের ফলনে আমূল পরিবর্তন আনেন এবং ধীরে ধীরে ভারত ও খাদ্যে স্বনির্ভরতার পথে এগিয়ে যায়। কিন্তু যে কোন জিনিসের ভাল ও মন্দ দুটো দিকই আছে। ধান ও গম দুটো শস্য উৎপাদনের জন্য প্রচুর জলের প্রয়োজন এবং হরিয়ানা ও পাঞ্জাবে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কম হওয়ায় অচিরেই ভূগর্ভস্থ জলের পরিমাণ কমে যাবে এবং এই কৃষি ব্যবস্থার পরিবর্তন না হলে মরুভূমিতে পরিণত হয়ে যাবে। বিহারে ধান ও গমের পরিবর্তে অন্যান্য কম জলের প্রয়োজন শস্য উৎপাদনের ফলে বহুলাংশে তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে।

আমাদের দেশে সবুজ বিপ্লবের আগে সাধারণ দরিদ্র মানুষের অবস্থা খুবই সঙ্গীন হয়ে গিয়েছিল। মানুষ ভাতের বদলে ভাতের ফেন ভিক্ষা করতো। ঠা ঠা রোদে খালি পায়ে ভিখারীদের ," মা গো একটু ফেন দাও" বলে ভিক্ষা করতে দেখা যেত। এখন খুব কম লোককেই খালি পায়ে হাঁটতে দেখা যায়। নিলেন পক্ষে হাওয়াই চপ্পল বা রবারের  চপ্পল তো দেখাই যায়। মোবাইল নিয়ে ভিখারির সংখ্যাও নিতান্ত কম নয়। এখন সব সরকার ই দারিদ্র্য সীমারেখার নীচে থাকা লোকজন যাতে অনাহারে না মারা যায় তা সুনিশ্চিত করেন।মাথা পিছু পাঁচ সাত কেজি চাল বা গম/ আটা এবং আর্থিক অনুদানের ও ব্যবস্থা করেছে যেটা পঞ্চাশ ষাট বছর আগে ছিল না। অর্থনৈতিক বৈষম্য চিরদিন ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে সে সাম্যবাদীরা যত ই চিৎকার করুন না কেন। সাম্যবাদের প্রবক্তারা যত ই গলা ফাটিয়ে চিৎকার করুন না কেন তাঁদের স্বপ্নের দেশেও সেই একই অবস্থা । সাম্যবাদ নিশ্চয় ই থাকা উচিত  এবং অর্থনৈতিক  বৈষম্য  যতটা কম হয় ততটাই ভাল কিন্তু  কথাটা কেমন যেন সোনার পাথর বাটি বলে মনে হয়। খুবই আদর্শবাদী ধারণা কিন্তু এই সাম্যবাদের প্রবক্তা দেশ চীন ও আজ বাস্তববাদী হয়েছে এবং রিফর্মের মাধ্যমে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে। অথচ চীন,ভারত ও কোরিয়ার অর্থনীতি সত্তরের দশকে এক লাইনেই খাড়া ছিল। অর্থনৈতিক সংস্কার ভারত নব্বইয়ের দশকে একরকম বাধ্য হয়েই করেছিল এবং তার সুফল আজ মিলছে যদিও নিন্দুকের সংখ্যা কম নেই যারা প্রতিনিয়ত দেশ রসাতলে যাচ্ছে বলে চিৎকার করে চলেছে অথচ এরাই যখন ক্ষমতাসীন ছিল তারা সেরকম ভাবে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেনি।
শুধু খাদ্যে স্বনির্ভরতাই যথেষ্ট নয় তার সুষম বণ্টন ভীষণ প্রয়োজন এবং দুর্নীতিমুক্ত না হলে এটা প্রায় অসম্ভব। দুর্নীতির সূচকে ভারতের অবস্থান ৯১ তম ১৮২টি দেশের মধ্যে যেখানে আমেরিকার অবস্থান ২৯ নম্বরে। ০ থেকে ১০০ নম্বরের স্কেলে আমেরিকার মান ৬৪ যেখানে ভারত পেয়েছে ৩৯। ডেনমার্ক ৮৯ নম্বর পেয়ে শীর্ষস্থানে মানে দুর্নীতি সেখানে সবচেয়ে কম।
ভারতবর্ষকে দুর্নীতিমুক্ত করতে গেলে আমাদের সকলের প্রয়াস দরকার এবং যাতে কোন লোক অনাহারে মারা না যায় তার দিকে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। প্রকৃতির রোষ থেকে হয়তো সবসময় রক্ষা পাওয়া যাবেনা কিন্তু যদি প্রয়োজনীয় খাদ্যের ভাণ্ডার গড়ে তোলা যায় তাহলে  অতিবৃষ্টি বা অনাবৃষ্টির ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতির মোকাবিলা করা সম্ভব এবং জনগণকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব।


Saturday, 18 April 2026

"ব্যালকনি"

আগের দিনের প্রশস্ত জায়গা জুড়ে নয়নাভিরাম বাড়ি আজকের দিনে আর দেখা যায়না যেখানে বসে দেখা যেত দূরদূরান্ত  বিশাল প্রান্তর, কোথাও বা ধানের ক্ষেত আর কোথাও বা অন্য কোন ফসল। মাঝে মধ্যে পুকুর বা দীঘি যার চারপাশটা নানা গাছ দিয়ে ঘেরা যা পুকুরের জলকে সূর্যের প্রখর তাপ থেকে শীতল রাখতে বেশ সাহায্য করে। দিনে দিনে লোকসংখ্যা বাড়ছে, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য খানিকটা হলেও কমেছে। আজকের যুগে যাঁদের হাতে প্রভূত অর্থ তাঁরাও আজ শহরে বড় বাড়ি করলেও সেই সুদূরপ্রসারী দিগন্ত পাওয়া সম্ভব নয় কারণ শহরে জায়গার অপ্রতুলতা। তাই জনসংখ্যার চাপেই হোক বা অন্য যে কোন কারণেই হোক না কেন বাড়ির বারান্দা বা ব্যালকনিতে বসে সেই দৃশ্য দেখা আর হয়ে ওঠেনা। সেটা দেখতে গেলে যেতে হবে  শহর থেকে একটু দূরে তাদের বাগানবাড়ি বা ফার্ম হাউসে যেটা প্রতিদিন তো সম্ভব নয়,  ছুটির ফাঁকে মাঝে মধ্যে শহরের ইট, কাঠ, কংক্রিটের জঙ্গল থেকে অব্যাহতি পেতে। তাই দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে ফ্ল্যাট বাড়িতে ব্যালকনি একটা আলাদা মাত্রা পেয়েছে। পুরনো দিনে সরকারী আনুকুল্যে যে ফ্ল্যাটগুলো তৈরী হয়েছিল তাতে দুটো বাড়ির মাঝে বেশ অনেকটাই ব্যবধান থাকায় আকাশের দিকে তাকালে যেন মনে হয় এই একটুকরো আকাশটাই আমার। কিন্তু বর্তমানে প্রোমোটারের কল্যাণে যে ফ্ল্যাটগুলো তৈরী হচ্ছে তাতে ব্যবধান এতটাই কম যে এ বাড়ির কথা পাশের বাড়ি থেকে শোনা যায় এবং তাই ঐ আকাশটুকুও যেন ভাগ বাটোয়ারা হয়ে গেছে। তবে একটা কথা অনস্বীকার্য যে ব্যালকনি ফ্ল্যাটের মর্যাদা ঢের বাড়িয়ে দিয়েছে।

আশির দশকের প্রথম দিকে তৈরী হওয়া গল্ফগ্রীনের ফ্ল্যাট গুলো গাছপালাদের সঙ্গী করে হয়েছিল বলে অনেক হাউসিং প্রজেক্টের তুলনায় এর আকর্ষণটা অনেক বেশী। রোলস রয়েস গাড়ি যত ই পুরনো হোক না কেন তার মর্যাদা একটা আলাদা। এই গল্ফগ্রীনের ফ্ল্যাটগুলোও অনেকটা সেইরকম এবং হালফিলের তৈরী ঝাঁ চকচকে ফ্ল্যাটের তুলনায় অনেক বেশী মনে ধরে। একদম সারি সারি পিছনে না থেকে অবয়ব এক ই রকম রেখে একটু আঁকাবাঁকা ছন্দে তৈরী এই বিল্ডিংগুলো প্রত্যেকটি একটা নিজস্ব ঢঙে গড়ে উঠেছে যেন মনে হয় নৃত্যশিল্পীরা এক ই মঞ্চে বিভিন্ন  আঙ্গিকে নৃত্য পরিবেশন করছে। এখানে বেশিরভাগ বাড়িগুলোই চারতলা কিংবা পাঁচতলা কেবল একটি বহুতল ছাড়া। ছাদে না উঠেও একটু উপরের দিকে ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে বসে অনেকটা আকাশ দেখা যায়। এই আবাসনে  অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরা জীবিকার কারণে অন্য প্রদেশে চলে যাওয়ায় পড়ে থাকা বৃদ্ধ বাবা মায়েদের  একটা বৃহৎ বৃদ্ধাশ্রমে পরিণত হয়েছে। এখন ফ্ল্যাট গুলোর গমগমে ভাব একেবারেই উধাও । বয়সের ভারে ব্যালকনিতে বসার লোক দিন দিন কমে যাচ্ছে, কোথাও দুই থেকে এক আবার কোথাও বা শূন্য ব্যালকনি মনের দুঃখে ম্রিয়মাণ। তবুও যাঁরা রয়েছেন ভোরবেলায় ও সন্ধেবেলায় পাখির কলতানে নিজেদের উদ্বুদ্ধ করতে পারেন। আলোর আভা ফোটার আগেই পাখিদের কিচিরমিচির শব্দে ঘুম ভাঙিয়ে দেয়, নানান ধরণের পাখিরা ব্যালকনিতে বসে থাকা বৃদ্ধ বৃদ্ধাদের কাছে খাবার খেতে আসে এবং গ্রিলের মধ্যেই রাখা জলের পাত্র থেকে নিজেদের তৃষ্ণা মিটিয়ে চলে যায়। সারাদিন কোথায় কোথায় যে তারা ঘোরে বুড়োবুড়িরা চিন্তা করেও উঠতে পারেনা। গ্রীষ্মের দাবদাহে মাঝে মাঝেই তারা আসে জল খেতে এবং কখনও কখনও শরীরের জ্বালা মেটাতে স্নানটাও সেরে নেয়। আশেপাশে সেগুন গাছ, কাঁঠাল গাছ বা বাদাম গাছগুলো এখন একটু স্তব্ধ কারণ তাদের অধিবাসীরা এখন বেড়িয়েছে খাবারের সন্ধানে এবং সন্ধেবেলায় ফিরে এসেই ঝগড়া অবশ্যম্ভাবী নিজেদের জায়গা নিয়ে। কিছুদিন ধরেই দূরে একটা বাড়ির জলের পাইপের উপর বসে থাকা একটা চিল চিঁহি হিঁহিঁ করে ডাকতে দেখা যাচ্ছে। কোন সময় তাকে খেতে দেখা যায়না। হয়তো বা সেও বয়সের ভারে ন্যূব্জ এবং খাওয়ার তাগিদ ও বিশেষ দেখতে পাওয়া যায় না। সমস্ত পাখিদের মোটামুটি ভাবে খাবার দেওয়া হয় এবং ইচ্ছে ও করে ওই চিলটার খিদে মেটাতে কিন্তু তাকে তো ডাকা যায় না আর সেও আমাদের থোড়াই তোয়াক্কা করে। প্রতিটি প্রাণীর ই খিদে তেষ্টা সব ই আছে কিন্তু এই চিলটাকে  দেখে সব ধারণাই কেমন ওলোট পালোট হয়ে যাচ্ছে। আর কাকগুলোও বড্ড বেশি হিংসুটে, ঐ বুড়ো চিলটাকে কারণে অকারণে ঠোকরাতে আসে। একটু যে নিশ্চিন্তে বিশ্রাম নেবে তাতেও তাদের হিংসা।  
ব্যালকনিতে বসে থাকা বুড়ো বুড়ির সংখ্যা যেমন কমছে তেমন ই হয়তো একদিন ওই বুড়ো চিলটাকেও আর দেখা যাবেনা ।

Monday, 13 April 2026

"কে আমি?" (১)

এই বিশাল পৃথিবীর সমস্ত দেশে( ছোট বড় সব মিলিয়ে ১৯৫ ) প্রায় ৮৩০ কোটি লোক আছে। তাদের সবার ই সাধারণ মানুষের মতো দুটো চোখ, দুটো কান , দুটো করে হাত,পা, একটা মাথা ও একটা নাক কিন্তু দৈহিক গঠন বা গায়ের রঙ ভিন্ন বা দেখতেও ভিন্ন এবং খাদ্যাভ্যাস ও ভিন্ন এবং সবাই এক একজন "ভিন্ন আমি"। কিছু কিছু ক্ষেত্রে একজনের সঙ্গে আরও একজনের মিল হতে পারে কিন্তু সম্পূর্ণ মিল কখনোই হয়না। দুটো যমজ ভাই বা বোনের ক্ষেত্রেও অনেক অমিল ধরা পড়ে, সুতরাং সব মানুষকেই একটি গোত্রে ফেলা ভীষণ কঠিন, এককথায় অসম্ভব। আমার গণ্ডিও খুব সীমিত এবং চারপাশে যে ধরনের লোকের সংস্পর্শে এসেছি, তাদের কথাই তুলে ধরার একটি সামান্য প্রয়াস। ৮৩০কোটি মানুষের মধ্যে আমিও একজন কিন্তু পৃথিবীতে এমন কোন মানুষ নেই যিনি আত্মানুসন্ধান করার পরেও নিজেকে সম্পূর্ণ জানতে পেরেছেন। আমরা অন্য সবার সম্বন্ধে হাজারটা কথা বলতে পারি কিন্তু নিজের সম্বন্ধে বলতে গেলেই গুণগুলো আরো ফলাও করে বলি এবং দোষগুলো চোখেই পড়েনা। অন্যজন আমার সম্বন্ধে খুব পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে সমালোচনা করতে পারে কিন্তু সেও তার নিজের সম্পর্কে বলতে গেলে আমার ই মতন কি আরও একটু বেশি বিশ্লেষক। আপ্তবাক্য হলো "আপনাকে এই জানা আমার ফুরাবে না"। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ও বলেন 
"জীবনে জীবনে যোগ করা 
ব্যর্থ হয়নি সে গানের পসরা
আমার কবিতা জানি আমি
গেলেও বিচিত্র পথে হয় নাই সে সর্বত্র গামী।"

প্রথমেই আসব কয়েকজন মহান শিক্ষকের কথা যাঁরা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন ছাত্র তথা দেশ গড়ার কাজে। কেউ অনেক বড় সরকারী পদ উপেক্ষা করে শিক্ষকতা  পেশা বেছে নিয়েছেন এবং শিক্ষক হিসেবে যাঁদের অবদান অনস্বীকার্য। তাঁদের সঙ্গে দেখা হবার সুযোগ না ঘটলেও তাঁদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি এবং আমার দেখা কিছু মাস্টার মশাইদের কথাই বলছি। প্রথমেই বলব আমাদের স্কুলের অঙ্কের মাস্টার মশাই কাবুলি বাবু বা শ্রী রণেন্দ্রনাথ বাগচির কথা। ওঁকে কখনো স্কুলের মেন বিল্ডিং এর টিচার্স রুমে বসতে দেখিনি, উনি বসতেন স্কুলের নতুন বিল্ডিং এ সায়েন্স ব্লকের একতলায় ছোট্ট একটি ঘরে। ছিলনা কোন পাখা, গরমকালে তালপাতার হাতপাখাই ছিল সম্বল। সামনে টেবিলে রাখা ডাঁই করা ছাত্রদের খাতা যেগুলো হোম টাস্ক দেওয়া হতো। অফ পিরিয়ডে বা টিফিনের সময় চা খেতে খেতে ঝড়ের গতিতে দেখতেন খাতা কিন্তু একদম নির্ভুল। একটা ছোট্ট ঘটনার কথা উল্লেখ না করলেই নয়। তখন ফাউন্টেন পেনে লেখা হতো , অঙ্ক করার মাঝে যোগ চিহ্ন দিতে হবে কিন্তু মাইনাস চিহ্ন দেওয়ার জন্য ওপর থেকে ভার্টিক্যাল লাইন দিয়ে প্লাস চিহ্ন করার সময় কালি শেষ এবং একটা আঁচড় পড়লেও কালির দাগ আর পড়লো না। পাশের বন্ধুর কাছ থেকে একটু কালি নিয়ে অঙ্ক শুরু করলেও সেই জায়গাটায় আর কালি দিয়ে দাগানো হলোনা এবং খাতা চেক করার সময় স্যারের নজর সেটা এড়ালো না। এর থেকেই বোঝা যায় তিনি যেন চোখ দিয়ে এক্সরে করতেন এবং খুঁটিনাটি সব কিছুই তিনি দেখতেন। স্যারকে কখনো গল্প করতে দেখিনি এবং তাঁর ভারী শরীর নিয়ে ক্লাসে চেয়ারে বসতেও কখনো দেখিনি। যে কোন চ্যাপ্টারের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত অঙ্ক তিনি করতেন এবং হোম টাস্ক দিয়ে সমস্ত চ্যাপ্টার আড়াই থেকে তিন বার শেষ করতেন যেখানে অন্য স্কুলে সব চ্যাপ্টারের সব অঙ্ক ই করা হতো না। কখনো কখনো মেন বিল্ডিং থেকে ক্লাস নিয়ে নতুন বিল্ডিংয়ে ক্লাস নিতে আসছেন , ছাত্ররা ব্যালকনিতে রোদ পোহাচ্ছে, হঠাৎ একটা ছেলে ছুটতে ছুটতে এসে বললো কবুলিবাবু আসছেন আর মূহুর্তেই ব্যালকনি ফাঁকা এবং যে  যার নিজের জায়গায় বসে স্যারের আসার অপেক্ষায়। দুর্দান্ত পারসোন্যালিটি, মোটা কালো ফ্রেমের চশমায় মোটা মোটা চোখ মাথা থেকে পা পর্যন্ত যখন দেখতেন তখন সেই ছাত্রের ই শুধু নয় সমস্ত ছাত্রদের অবস্থা খারাপ। কিন্তু অসম্ভব ছাত্রদরদী এই কাবুলি বাবুর ভাগ্যে কিন্তু কোন সরকারী শিরোপা জোটেনি কিন্তু তিনি তাঁর অগণিত ছাত্রের হ‌দয়ে আজ ও সমুজ্জল।
আরও অনেক মাস্টার মশাইয়ের সান্নিধ্যে এসেছি যাঁদের মধ্যে একজনের নাম অবশ্যই উল্লেখ করতে হয় এবং তিনি হলেন কৃষ্ণনাথ কলেজের কেমিস্ট্রি বিভাগের প্রধান এবং পরবর্তীকালে ঐ কলেজের প্রিন্সিপ্যাল শ্রী ধীরেন্দ্রনারায়ন রায় । ক্লাসে পড়াতে পড়াতে একটা অন্য জগতে বিচরণ খুব কম স্যারের মধ্যেই দেখা যায়। পুরো বিজ্ঞানটাই যেন তাঁর চোখের সামনে ভেসে ওঠে এবং ওঁর ক্লাস করাটা এক অসাধারণ অনুভূতি। এমন ছাত্র দরদী মাস্টার মশাইয়ের সান্নিধ্যে আসা একটা ভাগ্যের ব্যাপার।

অনেক খবর কানে আসে যেখানে একসময়ের ছাত্র বা ছাত্রী উন্নতির শিখরে উঠেও তাদের শিক্ষক বা শিক্ষিকার অবদান ভোলে না এবং নানারকম বাধা বিঘ্ন অতিক্রম করে তাঁদের অবদানের স্বীকৃতি জানাতে আসেন। এইখানেই সেই শিক্ষক বা শিক্ষিকার অবদান। তাঁরা তাঁদের পেশাগত প্রক্রিয়ায় ছাত্রছাত্রীদের গড়ে তোলেন কিন্তু কেউ কেউ তা মনে রাখে আবার কেউ কেউ তা বেমালুম ভুলে যায়।এক ই শিক্ষা কাউকে উন্নতির শিখরে তোলে আবার যারা তা গ্রহণ করতে অক্ষম তারা সাধারণ হয়ে থাকে বা বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যায়।
এইরকম অনেক শিক্ষক শিক্ষিকা রয়েছেন দেশ বিদেশে আনাচে কানাচে যাঁরা তাঁদের শিক্ষায় বহু ছাত্র ছাত্রীদের আলোকিত করেছেন এবং প্রকৃত মানুষ হতে সাহায্য করেছেন যাঁদের কথা আমরা জানিনা। সমস্ত শিক্ষক শিক্ষিকাদের প্রতি সশ্রদ্ধ নমস্কার জানাই।
এঁরা সবাই এক একজন "আমি"এবং তাঁরা নিজেদের সম্বন্ধে সম্পূর্ণ না জানলেও আমরা যারা তাঁদের সংস্পর্শে এসেছি তারা এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে তাঁদের সম্মান জানাই।

"কে আমি" (২)

ভোটের দামামা বেজে উঠেছে, চারিদিকে সাজো সাজো রব। সবাই খুব ব্যস্ত,এমনকি পাড়ার সবচেয়ে অকিঞ্চিৎকর ছেলে পটাই ও। সারাদিন কোন কাজ কর্ম করেনা, এখানে সেখানে বেগার খেটে বেড়ায় , বিনিময়ে কেউ একটু আদর করে মিষ্টি কথা বললেই ও গদগদ। বাড়িতেও তার উপস্থিতি কেউ কখনো নজর করেও দেখেনা। বাবা কবে যে ছিল তা মনেও পড়েনা, জ্ঞান হওয়া অবধি মাকে আর তার থেকে বড় একটা দাদাকে ই দেখেছে। তিন জনের সংসার থেকে বেড়ে ইদানিং চার হয়েছে, তার দাদা চায়ের দোকানের কাজ ছেড়ে একটু প্রোমোশন হয়ে ভাতের হোটেলে কাজ পেয়েছে এবং তার জীবন সঙ্গী জোগাড় করে নিয়েছে এবং তারপরেই শুরু হয়েছে বাড়িতে রোজ গনগনানি। এতদিন মা লোকের বাড়িতে কাজ করে যা পেত তা দিয়ে আর দাদার টাকা দিয়ে কোন রকমে টানাটানি করে চলে যেত। কিন্তু বাড়িতে দ্বিতীয় মহিলা আসার পরেই শুরু হয়েছে ছোট খাটো নানা বিষয়ে, শান্তি হয়েছে বাড়ন্ত। পটাই তার নিজের মতো করেই চলতো, এখানে সেখানে ঘুরে ফিরে বাড়িতে এসে কলাই করা থালায় খানিকটা তরকারি বা ডালের একটু ছোঁয়ায় বদলানো রঙের ভাতে তার ক্ষুন্নিবৃত্তি হতো। ঘুরে ঘুরে এর তার সঙ্গে হাত লাগিয়ে দুচার টাকা যে রোজগার করতো না তা নয় কিন্তু বাড়ি ঢোকার আগে তার খুব অল্প অংশ ই বেঁচে থাকতো যেটা তার মায়ের হাতে দিয়ে দিত।  ওর নিজের কোন কাজ ছিলনা, যে যা বলতো পটাই তাই করে দিত এবং বিনিময়ে পটাই এর কপালে কিছু জুটত। হয়তো কেউ সব্জি বিক্রি করবে বলে মোটর চালিত ভ্যান থেকে একটা বড়সড় বস্তা নামাল, তার সবজিগুলো সাজিয়ে গুছিয়ে আলাদা করে দিল,  খদ্দের এলে তার পছন্দের জিনিসগুলো দিয়ে সাহায্য করলো, বিনিময়ে পড়ে থাকা কিছু সবজি পাতি তার ভাগ্যে জুটলো বা সবটাই বিক্রি হয়ে গেলে দুচার টাকা সে পেলো কিন্তু কোন জায়গায় তার বাঁধা কাজ জোটেনা। গোদের উপর বিষফোঁড়া হলো যখন তার দাদার হাঁড়ি আলাদা হলো। মা তো আথান্তরে, কি করে সংসার চলবে সেই ভেবেই কূলকিনারা পাচ্ছেনা। তার নিজের ও বয়স হয়েছে, আগের মতো পাঁচ বাড়িতে কাজ করতে পারেনা আর ছোট ছেলে পটাইকে তো কেউ ধর্তব্যের মধ্যেই আনে না। হাজার হলেও ছেলে তো, মায়ের মন তো মানতে চায় না। আর দিন দিন বড় হচ্ছে, তার খাওয়ার জোগানটাও সেই রকমই বাড়ছে কিন্তু মায়ের কাজের বাড়ি কম হওয়ায় টাকার সঙ্গে সঙ্গে টুকটাক খেয়ে যে নিজের পেটটা ভরে যেত সেখানেও পড়েছে টান, এ যেন শাঁখের করাত, টাকাও কমেছে আবার নিজের পেটের সঙ্গে বেড়ে ওঠা পটাইয়ের ও বাড়তি খিদে। কিন্তু ভগবান যেন মুখ তুলে চেয়েছেন এবার।
 ভোটের কাজের জন্য সব দলেরই লোক দরকার। লোক পাওয়া খুব কঠিন নয় কিন্তু বিশ্বাসী ও কাজের লোক খুব কম। আর নেতাদের দরকার বোকাসোকা কর্মক্ষম লোকের। আর এই সময়েই চোখ পড়ল পটাইএর দিকে আর তাও আবার শাসকদলের নেতার। এখন সবাই নেতা, কুচোকাচা থেকে শুরু করে বড় মাপের কিন্তু নেতারা খুব বড় মাপের দাদার উপর ভরসা করতে পারেন না কারণ অতি অল্পসময়েই এরা তার চেয়ারের দাবিদার হতে পারে । এইসব ভেবে এই পটাই জাতীয় হঠাৎই বেড়ে ওঠা শক্তপোক্ত  ছেলেরাই তার সম্পদ। এদের সেরকম উচ্চাশা নেই এবং সামান্য কিছু অর্থের বিনিময়ে এদের বিশ্বস্ততা আদায় করে নেওয়া যায় আর পটাই এর ভাগ্য ও সেইভাবেই খুলে গেল। কিছুদিন আগে অবধি ," এই পটাই এটা নিয়ে আয় বা ওটা করে দে" এখন কিছুদিন ধরেই নিশ্চুপ। পটাই এখন নেতার বডিগার্ডের মর্যাদা পেয়ে গেছে। নেতার সংস্পর্শে থেকে বেশভূষা,চলন বলনে কেমন একটা কেতাদূরস্ত হয়ে গেছে। পটাই এখন সবসময় বাড়ি ফিরতে পারেনা। মা ভাতের থালা ঢাকা দিয়ে রাখলেও বেশিরভাগ দিনই তা কুকুর বিড়ালের পেটে যায় কারণ তাদের  বাড়িতে  তখন ও ফ্রিজ আসেনি যে রেখে দেবে। আর তাছাড়া নেতার দৌলতে বিরিয়ানি, মাংস দিয়েই রোজ পেট ভরছে। মায়ের কথা মনে হলেও নেতা দাদার অনুমতি ছাড়া এক পা ও এদিক ওদিক হবার জো নেই। রাতে দুচার পাত্র বিদেশি তরল ও জুটছে, মোটকথা একটা নিষ্পাপ ছেলেকে জাহান্নামের রাস্তায় টেনে নিয়ে যাওয়া আর কি। দাদা, বৌদির কথা মনে পড়লেই ভিতরটা যেন ঘেন্নায় ভরে যায় কিন্তু মা, মায়ের কথা মনে পড়লেই দাদার হাজার কাজের মধ্যেও ভিজে ওঠা চোখ দুটো রুমাল দিয়ে মুছে নেয়। পাঁচ বছর আগের ভোটে পটাই ততটা শক্তপোক্ত হয়ে ওঠেনি কিন্তু এবারের ভোটে নেতা দাদার কাছাকাছি থাকায় ওর গুরুত্ব বেড়েছে, সাইলেন্সার খোলা একটা মোটর সাইকেল জুটেছে যাতে তার উপস্থিতি সবার নজরে আসে। এই সুযোগে যতটা পারো কামিয়ে নাও আর একবার ভাল পয়সার মালিক হয়ে গেলে কোথা থেকে যে টাকার স্রোত আসতে থাকবে তা জানা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। অসদুপায়ে অর্জিত অর্থের দৌলতে এমন ই এক জায়গায় পৌঁছে যায় যে পরবর্তী জীবনে ভালোমানুষের একটা জোব্বা দিয়ে নিজেকে ঢেকে ফেলা যায়। পটাই থেকে পটাই দা বা পটাই বাবু এবং যে কোন ছোটখাটো বিবাদে পটাই দা বা ছোড়দার কথাই শেষ কথা। দুপক্ষের কাছেই টাকা নিয়ে মোটামুটি একটা আপসরফা সে করে দেয়। এসব করে এবং শাসকদলের নেতাদের ছত্রছায়ায় থাকার সুবাদে পুলিশের কাছেও সে বিশেষ সম্মান লাভ করে। তবে নীচুতলার সব পুলিশ যে ওকে পছন্দ করে তা নয় কিন্তু ওপরের মহলে ওর যোগাযোগ থাকায় কোন বাজে জায়গায় পোস্টিং হবে এই ভয়ে ওরা যেমন ঘাঁটায় না তেমন সেরকম সুযোগ পেলে ওকে মাটিতে মিশিয়ে দিতেও ওরা পিছপা হবেনা। নেতা ও পুলিশের এই মেলামেশার ফলে সাধারণ মানুষের প্রাণ ওষ্ঠাগত। যে পটাই একদিন সকলের কাছে হেলাফেলার মানুষ ছিল আজ ভোটের আগমনে সে একজন কেউকেটা। আজ সে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তার নেতা দাদাকে ভোট দেবার জন্য ঠাণ্ডা চোখে হুমকি দেয়। যদি দাদা জেতে তাহলে তো সোনায় সোহাগা, নাহলেও কোন ক্ষতি নেই  কারণ ইতিমধ্যেই সে ছোড়দা বনে গেছে এবং নতুন দাদা এসেও হয়তো তাকেই তোষামোদ করবে এবং আরও ক্ষমতার লোভ দেখাবে।
যেহেতু এরা স্কুলের গণ্ডি ও পেরোয়নি সুতরাং অন্তর্দর্শনের আশা করাই বৃথা তবুও সে একজন মানুষ এবং কখনও কোন এক বিষণ্ণ মূহুর্তে নিজের পূর্ব কথা ভাবতে যদি চেষ্টা করে তবে কতদূর সফল হবে তাতে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।

Wednesday, 1 April 2026

"উদুপি"

উদুপি কর্ণাটকের পশ্চিম প্রান্তে উপকূলবর্তী একটি ছোট শহর যা শ্রীকৃষ্ণ মঠ এবং  অন্যান্য অনেক হিন্দু মন্দিরের উপস্থিতির জন্য বিখ্যাত। শ্রীকৃষ্ণ মঠ ত্রয়োদশ শতাব্দীতে শ্রীমাধবাচার্য্য দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই প্রতিষ্ঠার পিছনে একটি সুন্দর পৌরাণিক কাহিনী প্রচলিত আছে যা হলো এইরকম। একদিন একটি জাহাজ সমুদ্রে ঝড়ের মধ্যে পড়ে এবং শ্রী মাধবাচার্য্য তাঁর ঐশ্বরিক যোগবলে সেই সামুদ্রিক ঝড়কে স্তিমিত করেন এবং জাহাজের ক্যাপ্টেন তাঁকে সেই জাহাজের যে কোন জিনিস উপহার হিসেবে দিতে চান কিন্তু শ্রী মাধবাচার্য্যজী( যিনি দ্বৈতবাদের প্রবক্তা) কর্দমাক্ত একটি অত্যন্ত ভারী জিনিস পছন্দ করেন এবং তা পরিষ্কার করার পরে শ্রীকৃষ্ণের ঐ মূর্তিটি তিনি পান এবং পরে তিনি ঐমঠের প্রতিষ্ঠা করেন। এই উদুপি শহরটি আবার তার নিরামিষ খাবারের জন্য খুব বিখ্যাত। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এবং বিদেশে ও এই উদুপির খাবার বিশেষ ভাবে সমাদৃত।শহর কলকাতাও এর ব্যতিক্রম নয়। লেক মার্কেট এবং দেশপ্রিয় পার্ক অঞ্চল কিছুদিন আগে পর্যন্তও দক্ষিণ ভারতীয়দের দখলেই ছিল এবং এখনও দক্ষিণ ভারতের কোন লোকজন এলেই তাঁরা এই অঞ্চলের হোটেলে এসে ওঠেন কারণ তাঁরা এখানকার খাবার ও দক্ষিণ ভারতের সংস্কৃতির সঙ্গে একাত্ম বোধ করেন যদিও ইদানিং কালে অনেক তামিল ও তেলেগু মানুষজন গড়িয়া সংলগ্ন এলাকায় নিজেদের বাড়ি অথবা ফ্ল্যাট কিনে থাকছেন। এতদসত্ত্বেও অনেক তামিল, তেলুগু,কন্নড় ও কেরালাবাসীরা এখনও এই অঞ্চলেই আছেন এবং তাঁদের আনুকুল্যে দক্ষিণ ভারতীয় রেস্তোরাঁয় অবিরত ভিড়। হোটেল স্বাগত,কোমলাভিলা, তারা মহল এবং উদুপি মধ্যবিত্তের নাগালের মধ্যেই রয়েছে এবং দক্ষিণ ভারতের এই খাবার বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। উদুপি হোটেলে থাকার ব্যবস্থা নেই কিন্তু খাবারের নিরিখে এটাই বোধহয় সর্বোত্তম। 

অনেকদিন মুম্বাই শহরে কাটিয়ে কলকাতায় ফিরছি। সন্ধেবেলায় ফ্লাইট ল্যাণ্ড করেছে কিন্তু লাগেজ পেতে একটু দেরি হওয়ায় অন্ধকার বেশ ঘনিয়ে এল। উবের ট্যাক্সিতে বাড়ি ফিরতে ফিরতে প্রায় একঘন্টার উপর লেগে গেল। মাঝে একটু আধটু জায়গা ছাড়া বেশিরভাগ জায়গাই অন্ধকারে ডুবে আছে বিশেষত মুম্বাইএর মতো আলো ঝলমলে শহর থেকে ফিরে মনে হচ্ছে যেন প্রেতপুরীতে প্রবেশ করছি। তবুতো এটাই আমার নিজের শহর, রিটায়ার করার আগে অন্য অনেক ঝাঁ চকচকে আলো ঝলমলে শহরে থাকার সুযোগ ও ছিল কিন্তু তাকে বিশেষ পাত্তা না দিয়ে আমার প্রিয় শহরেই থাকা শ্রেয় মনে করেছি এবং আত্মীয় স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে থাকাই বেছে নিয়েছি। দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকা এবং কাজে ডুবে থাকার সুবাদে আমার পুরনো শহর কলকাতা টা কেমন যেন বদলে গেছে এবং আজকের কলকাতা আমার দেখা কলকাতা থেকে অনেক বদলে গেছে। রাজনীতি এই শহরের এবং সমস্ত পশ্চিমবঙ্গকে কেমন যেন এক অজানা খাদের দিকে নিয়ে গেছে। অন্যান্য প্রদেশের তুলনায় আমরা অনেক পিছনের দিকে হেঁটে গিয়েছি। রাজনীতি সমস্ত পৃথিবীতেই আছে কিন্তু ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে আমরা প্রগতির পথে এগোতে পারিনি। অবনমন অনেক আগেই শুরু হয়েছিল কিন্তু এখন যেন তলানিতে ঠেকেছে। সমস্ত দেশেই ভোট হয় কিন্তু এখানে ভোট পরবর্তী হিংসা এক অভূতপূর্ব ব্যাপার। কত সংসার ভেসে যায় কিন্তু কোন হেলদোল নেই। তবুও কলকাতার প্রেমে গদগদ, এখানে ওখানে খুঁজি আমার সেই পুরনো চেনা শহর কলকাতাকে। আড্ডা মারার জায়গা ছিল গড়িয়াহাট মোড়। তখন ফ্লাই ওভার ছিলনা, মাঝখানে ছিল ট্রামলাইন, ঘটাংঘটাং শব্দ করে চলত ট্রাম। পিছনে সেকেন্ড ক্লাসের জানলার বাইরে থাকা অ্যান্টিনা মাঝে মাঝেই ওভারহেড তার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত এবং কন্ডাক্টার নীচে নেমে সেই অ্যান্টিনাকে যথাযথভাবে সংযোগ ঘটিয়ে ট্রামকে সচল করতে সাহায্য করতো। অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরা বাবা মা বা চেনা পরিচিতদের চোখ এড়িয়ে যশোদা ভবনের নীচে বা ঢাকেশ্বরী বস্ত্রালয়ের গেটের মুখে অপেক্ষা করতে বলত। অপেক্ষাকৃত ভীতু ছেলেমেয়েরা বলতো বাসন্তী দেবী গার্লস কলেজের সামনে। গড়িয়াহাট মোড় থেকে গোল পার্ক পর্যন্ত মাঝখানে থাকা ফুটপাতে সারি সারি গাছের মাঝে ছিল বুলেভার্ড হকার্স কর্ণার যা হিন্দুস্থান পার্ক ,গোল পার্ক বা বালিগঞ্জ এলাকার কাকিমা, মাসিমা ও‌বৌদিদের টুকিটাকি দরকারি জিনিস সরবরাহ করতো। গড়িয়াহাট বাজারে নিত্যানন্দ ভোজনালয় বা মাইতিদের ভাতের হোটেল খুব কম পয়সায় সাধারণ মানুষের উদরপূর্তির ব্যবস্থা করতো। রামকৃষ্ণ মিশনের উল্টোদিকে গোল পার্কে সন্ধেবেলায় অনেক লোক একটু খোলা হাওয়া নিতে আসতেন। গোল পার্ক থেকে গড়িয়াহাট মোড় আসতে বাঁদিকে ছিল ভাল্লা ফুটওয়্যার যেদিক দিয়ে হিন্দুস্থান পার্কে যাবার আরও একটা রাস্তা। গড়িয়াহাট মোড় থেকে ট্রাইঅ্যাঙ্গুলার পার্ক যেতে ছিল স্টাইলো, বেঙ্গল ফার্মেসি, সিনহা ব্রাদার্স এবং আরও একটু এগিয়ে ছিল এম এল রায়ের দোকান। আরও একটু এগোলেই ডানদিকে পড়তো আশা ব্রাদার্স ও হাটারি রেস্তোরাঁ এবং তাদের সঙ্গে পাঁচিল শেয়ার করা মহানির্বাণ মঠ। আশা ব্রাদার্স বাড়ির কোণে থাকা ছোট্ট একটা সাদামাটা রেস্তোরাঁ যার নাম ছিল জনতা রেস্তোরাঁ এবং স্বাভাবিক ভাবেই তা অতি সাধারণ লোকদের প্রয়োজনীয় রুটি, তরকা খাওয়াতো নামমাত্র পয়সায় কিন্তু তাতেও লোকে ধার বাকিতে খেত। পাশেই ছিল পণ্ডিতিয়া মোড়। নামীদামী রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী দেবব্রত বিশ্বাস, সাগর সেন ও অশোকতরু বন্দোপাধ্যায় কাছাকাছি থেকে যেন পণ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথের গানকে এক অসাধারণ উচ্চতায় নিয়ে যাবার। দেশপ্রিয় পার্কে তখন এত ইট কাঠ পাথরের জঙ্গল হয়নি, ছিল খেলার জন্য বিরাট খোলা মাঠ। ল্যান্সডাউন রোড ছিল এক অসাধারণ সুন্দর রাস্তা যা আরো মহিমান্বিত হয়েছিল রবীন্দ্রসঙ্গীতকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য শুভ গুহঠাকুরতার পরিচালনায় এক বিশ্বস্ত সংস্থা" দক্ষিণীর" উপস্থিতির। এই দক্ষিণী উপহার দিয়েছে অনেক প্রথিতযশা রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পীদের এবং এখনও সেই ধারা অব্যাহত। দক্ষিণ কলকাতার দক্ষিণ দেশীয় খাবার জোগাতে কেরালা কাফে, তারা মহল এবং একটু দূরেই লেক মার্কেটের কাছে কোমলা ভিলা যার ভেতরেই রয়েছে ব্যানানা লিভস। দেশপ্রিয় পার্ক মোড় থেকে স্টেডিয়ামের দিকে এগোতেই প্রথম ডানদিকের মোড়ে একটু এগোলেই এই উদুপি রেস্তোরাঁ। আমাদের দেশের রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালাম সাহেব যখনই কলকাতায় আসতেন, রাজভবনে উঠলেও তাঁর খাবার যেত এই উদুপি রেস্তোরাঁ থেকেই। সুতরাং বলাই বাহুল্য যে তখন থেকেই এই রেস্তোরাঁ একটা আলাদা জাতে উঠে গেছে।

এই উদুপি রেস্তোরাঁ একটি পুরনো আমলের বাড়িতে। ভেতরের ঘরগুলোতে বসার ব্যবস্থা থাকলেও বাইরের বারান্দাটা ঘিরে সেখানেও অনেকগুলো টেবিল পাতা আছে। কিন্তু সবচেয়ে পছন্দের যে জায়গা সেটা হচ্ছে বাইরে ফুটপাতে পাতা সারি করা চেয়ার এবং তাদের সামনে থাকা প্লাস্টিকের টুল যেখানে লোকজন চা, কফি বা স্ন্যাকস খায়। আবার এর ই মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান জায়গা সরু সরু লম্বা ছয়টি দেবদারু গাছ এবং তারা দুটি সারিতে তিনজন করে দাঁড়িয়ে আছে যার মাঝখানে রয়েছে একটি টেবিল এবং উভয় দিকে তিনটি করে চেয়ার। এই জায়গাটা হচ্ছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং কোন সময় ই তা ফাঁকা পাওয়া যায়না। এইখানে কোন সময় বসার সুযোগ পেলে নিজেকে ধন্য মনে  হয়। সবসময়ই ওই জায়গায় কেউ না কেউ বসে আছে। গতবছর ফেব্রুয়ারী মাসের নয় তারিখে আমরা স্কুলের চার বন্ধু তাদের পরিবার নিয়ে বেঙ্গল হাটারিতে লাঞ্চ সেরে কফি খেতে এই উদুপিতে গিয়েছিলাম। হয়তো বা সেই বন্ধুদের ভাগ্যেই বা স্ত্রীদের ভাগ্যেই জায়গা পেয়ে গিয়েছিলাম সেই মহামূল্যবান দেবদারু ছায়ায় থাকা সিটগুলোয়। আমরা চার বন্ধু এবং আমাদের স্ত্রীরা মোট আটজন ঐখানেই গুঁতোগুঁতি করে ম্যানেজ করে নিলাম। হাজারো পুরনো গল্পের স্মৃতি রোমন্থনে সময় কিভাবে এগিয়ে চলেছে কারো হুঁশ নেই। দু রাউন্ড কফির পরেও গল্প আর শেষ হয়না আর ওই জায়গার মৌরসীপাট্টাধারী সদস্যরা উশখুশ করছে আমরা ঐ জায়গা কখন খালি করি এবং তারা কখন সেই জায়গা দখল করে। আমরা উঠে গাড়ির দিকে পা বাড়াতেই সবাই প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে জায়গা দখল করতে এল। এর পরেও অনেকবার উদুপিতে কফি খেতে গিয়েছি কিন্তু আমাদের ভাগ্যে ঐ জায়গায় বসার শিকে ছেঁড়েনি।
 মুম্বাই থেকে ফেরার পর দুই বন্ধু পরিবারসহ গিয়েছি কফি খেতে। যথারীতি দেবদারু গাছের ছায়ায় চেয়ারগুলো তাদের বিশেষ সদস্যদের দ্বারাই পূর্ণ ছিল , আমরা ফুটপাতে রাখা চারটে চেয়ারে বসে সামনে রাখা দুটো টুলের উপর কফি রেখেই খেলাম। যতীন দাস রোড যা ল্যান্সডাউন রোডকে পূর্ব পশ্চিমে বিভক্ত করেছে একটু আলো আঁধারিতে ভরা। বড় বড় গাছ গাছড়া এই দিকটাকে আরও একটু মায়াবী করে তুলেছে। মুম্বাই শহরের ঝলকানি এখানে নেই ,  ম্লান  চাঁদের আলো এবং রাস্তার স্তিমিত আলো এক অপূর্ব রূপ  আমাদের সবাইকে মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছে। কফি শেষ, কিন্তু কিছুতেই উঠতে ইচ্ছে করছে না অথচ যেতে হবেই। একটা বিড়াল খুব আয়েশ করে ঘুমাচ্ছে। সাধারণত সে চেয়ারেই ঘুমায় কিন্তু আজ বাধ্য হয়েই টুলের উপর শুতে হয়েছে । লেজটা ঠিক জুত করে রাখা যাচ্ছে না যাতে একটু অস্বস্তি ই হচ্ছে। হঠাৎ একটা গাড়ি এসে দাঁড়ালো এবং তিনিও একটু স্বস্তি পেলেন। গুটি গুটি পায়ে টুল থেকে নেমে লঘুপদে তিনি গাড়ির বনেটে উঠে পড়লেন এবং এদিক ওদিক দেখে নিশ্চিন্ত মনে নিদ্রায় মগ্ন হলেন। এদিকে ভদ্রলোকের ও যাবার সময় হয়েছে। অনেক আদর করে বিড়ালটিকে অনুনয় বিনয় করতে লাগলেন এবং নেমে যাওয়ার অনুরোধ করলেন কিন্তু তিনি লেজ নাড়িয়ে নাড়িয়ে আদর খেতে থাকলেন কিন্তু ওঠার নামগন্ধও নেই। তখন ভদ্রলোক ঐ উদুপি রেস্তোরাঁর একজনকে বললেন বিড়ালটিকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য এবং সেই ছেলেটি অনেক আদর করে যেমন করে ছেলেকে ভুলিয়ে নিয়ে যায় সেইভাবে তাকে তুলে নিয়ে গেল। আমাদের ও ওঠার সময় হয়েছে কিন্তু দেবদারু ছায়ায় বসা লোকগুলো যেন ফেভিকল লাগিয়ে বসে আছে, একবার বাঁদিকে কাত হয়ে আবার কেউ কেউ ডানদিকে। একবার জিজ্ঞেস করলাম এই জায়গাটা কি শুধু মেম্বারদের জন্য? হা হা করে হেসে সবাই বলে উঠল," না, না কি যে বলেন?"


Saturday, 7 March 2026

"তারাপীঠ দর্শন"

বাড়িতে একলা বসে থেকে একঘেয়ে লাগছে, ভাবতে ভাবতে  সহদেব একটু  আনমনা হয়ে গেছে এবং ভাবছে আশেপাশে কোথাও ঘুরে এলে কেমন হয়। যেমন ভাবা, তেমন কাজ। পঞ্চপাণ্ডব এখন কেমন ছন্নছাড়া হয়ে গেছে। সর্বজ্যেষ্ঠ যুধিষ্ঠিরের শরীরটা মোটেও ভাল যাচ্ছে না, সুতরাং দেবিকাকে তার দেখাশোনা করতে হচ্ছে, দ্বিতীয় পাণ্ডব ভীম সদ্য প্রয়াত, তাই ভীমজায়া ভালান্দারা শোকে মূহ্যমান, চতুর্থ পাণ্ডব নকুল ও কারেনুমতি সুদূর আমেরিকায়  পাড়ি দিয়েছে এবং তার ই মতন সহদেব জায়া বিজয়াও প্রবাসে মেয়ের কাছে। থাকার মধ্যে অর্জুন ও সুভদ্রা এবং সহদেব এবং ধৃষ্টদ্যুম্ন ও তার সহধর্মিণী সুধন্যা। দুঃশলা দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ থাকায় সে ও এই অভিযানে সামিল হতে পারছেনা। অতএব বরাবরের মতো পাণ্ডব ত্রাতা অর্জুন ই ভরসা। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী        অর্জুনকে সব্যসাচী না বলে আরও অন্য কোন নামে ভূষিত করলেও কিছু খারাপ হতোনা। যাই হোক, অর্জুন ই স্বভাবসিদ্ধভাবে গাণ্ডীবের সঙ্গে সঙ্গে এই দায়িত্ব ও তুলে নিল।

যেমন ভাবা তেমন কাজ। যাওয়া হবে তারাপীঠ‌ গাড়িতে। ধৃষ্টদ্যুম্ন ও সুধন্যা দুর্গাপুর চলে যাওয়ায় প্রথমে ঠিক হয়েছিল যে তারা ওখান থেকে সরাসরি তারাপীঠ চলে যাবে এবং অর্জুন, সুভদ্রা ও সহদেব সাঁইথিয়া হয়ে ওখানে পৌঁছে যাবে। তারপর প্ল্যানে একটু রদবদল হলো, ঠিক হলো দুর্গাপুর হয়েই দুটো গাড়ি একসঙ্গে যাবে। ১৭ ই নভেম্বর ভোরে রওনা দিল অর্জুন, মাঝপথে তুলে নিল সহদেব কে, সঙ্গে সারথি রজত। দুর্গাপুর যাওয়ার পথে শক্তিগড়ে একটা ছোট্ট বায়ো ব্রেক নিয়ে ব্রেকফাস্ট করে নেওয়া হলো এবং দুর্গাপুরে মুচি পাড়া মোড়ে ধৃষ্টদ্যুম্ন ও সুধন্যা সারথি হৃদয়হরণকে নিয়ে মিলিত হলো। ঠাণ্ডা তখনো সেরকম জাঁকিয়ে না পড়লেও একটা হালকা মিষ্টি শীতের ভাব বেশ আনন্দদায়ক ছিল। মুচি পাড়া মোড়ে দুটো গাড়ি বেশ চলছে, একটু দূরেই শুরু হলো শাল পিয়ালের জঙ্গল। তারপর ওখানে একটু চওড়া জায়গা দেখে সুধন্যার সকাল সকাল বানিয়ে আনা ঘিয়ে ভাজা পরোটা ও আলুর দম এবং মিষ্টি দিয়ে বনভোজন শুরু হলো। রজত ও হৃদয়হরণের সহযোগিতায় ওই দুর্লভ দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি হলো। যাত্রা শুরু হলো তারাপীঠের দিকে। অর্জুন সোনার বাংলা হোটেলে দুটো স্যুইট বুক করে রেখেছিল আগে থেকেই। সুতরাং একটু দেরি হলেও অসুবিধা কিছুই হলোনা। রাস্তার মোড়েই উল্টোদিকে পশ্চিমবঙ্গের ট্যুরিজম ডিপার্টমেন্টের হোটেল রক্তজবায় রজত ও হৃদয়হরণের ব্যবস্থা করা হলো। খুব দারুণ কিছু না হলেও ব্যবস্থাপনা এবং খাওয়া দাওয়া সাধারণ মধ্যবিত্তের নাগালের মধ্যে। তবে লোকেশন কিন্তু দারুণ। অর্জুন সব ব্যবস্থাই করে রেখেছিল এবং পূজো দেওয়ার জন্য পুরোহিত ও ঠিক করেই রেখেছিল। আগেও বার তিনেক তারাপীঠ এসেছে সহদেব কিন্তু এবারের দর্শন একটা আলাদা অভিজ্ঞতা। হোটেলে ফিরে একটা দারুণ ডিনার এবং রাতে গল্প করতে করতে কখন চোখ লেগে আসা কিছুই বোঝা গেল না। পরদিন সকালে ব্রেকফাস্ট করে তারাপীঠের   শ্মশান দেখে বিরাট পরিবর্তন দেখতে পেল।বছর ষাটেক আগে প্রথম যখন সহদেব আসে তখন শ্মশানে এদিক সেদিকে জ্বলন্ত চিতা চোখে পড়েছিল এবং ইতস্ততঃ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কঙ্কাল ও নজরে পড়েছিল কিন্তু  মাঝের সময়টা একটু বেশিই লম্বা এবং তার ছাপ এই শ্মশানেও পড়েছে ।  বামা ক্ষ্যাপার মন্দির তথা বাড়ি দর্শন করে বক্রেশ্বরের পথে যাত্রা শুরু হলো। তারাপীঠ থেকে ঘন্টা দুয়েক চলার পর এল বক্রেশ্বরের মন্দির। সহদেবের এখানে আসা প্রায় ৬০বছর পর যখন তারাপীঠের সঙ্গেই এই বক্রেশ্বর দর্শন হয়েছিল ।  সহদেবের স্মৃতিশক্তির কথা মহাভারতে উল্লেখ রয়েছে কিন্তু এখানে সহদেব বোধহয় পাশ করতে পারবে বলে মনে হয়না আর যদিও বা করে তাহলে টেনেটুনে পাশ করবে। অষ্টাবক্র মুনি তাঁর কঠিন তপস্যায় মহাদেবকে সন্তুষ্ট করেন এবং তাঁর আশীর্বাদে তিনি পুনরাবস্থা ফিরে পান। এই বক্রেশ্বরেই দেবী পার্বতীর ভ্রূর অংশ পড়ার জন্য এটি ৫১পীঠের অন্যতম। দেবী এখানে মহিষাসুরমর্দিনী হিসেবে পূজিত হন। এক ই জায়গায় দেবী দুর্গা ও শিবের মন্দির হওয়ায় শিবরাত্রিতে প্রচুর ভক্ত সমাগম হয়। এখানকার আরও একটি বিশেষত্ব এখানকার উষ্ণ প্রস্রবণ। এখানে স্নান করে বহু লোকের রোগ নিরাময় হয়। পেট চোঁ চোঁ করছে, ডান হাতের কিছু ব্যবস্থা করা ভীষণ প্রয়োজন কিন্তু কাছাকাছি কোন ভাল হোটেল পাওয়া গেলনা। অতএব যাওয়া যাক দুর্গাপুরের পথে। ঘন্টা দুয়েক চলার পর দুর্গাপুর মুচি পাড়া মোড়ের একটু আগে ধৃষ্টদ্যুম্ন নিয়ে গেল পড়তি বেলায় লাঞ্চ করার জন্য। হোটেলটা মোটামুটি ভালো এবং রাস্তার উল্টোদিকেই একটা কলেজ থাকায় খাবার দাবার বাসি থাকার প্রশ্নই নেই। রজত ও হৃদয় হরণ ওই হোটেলেই দুপুরের খাবার খেয়ে নিল। ফেরার পালা এবার। সুধন্যা ও ধৃষ্টদ্যুম্ন দুর্গাপুরেই থেকে গেল হৃদয়কে নিয়ে আর এর পরেই শুরু হলো রজতের রথ ছোটানো আর অর্জুনের মনে পড়তে লাগল বাসুদেবের রথ ছোটানোর কথা। কখন যে শক্তিগড় পেরিয়ে গেল বোঝা গেলনা, চলে এল কলকাতায় চা না খেয়েই।