কার্ড পাঠিয়েছে,ভেতরে একটা অতি পরিচিত হাতে লেখা চিরকুট আপকো আনা হি চাহিয়ে। মনে পড়ে গেল নিজের প্রতিজ্ঞার কথা এবং তখনই ঠিক করে ফেললাম যে বম্বেতে কয়েকটা দিন কাটিয়ে ওখানে বিয়েতে অন্তত একটা দিন কাটিয়ে আসব। ছেলেকে পাকড়াও করে সাথী করে নিলাম এবং গুজুমেলে( গুজরাট মেল) যাওয়ার টিকিট হলো। ফ্লাইটে যাওয়া আসা করায় আমার ঘোর আপত্তি কারণ এত হ্যাপা করে মুখ গোমড়া করে যাতায়াত করায় প্রচণ্ড মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। মানুষের বয়স হলে কথাবার্তা বলার লোক কমে যায় এবং ট্রেনে যদি স্লিপার ক্লাসে দিনের যাত্রা হয় তবে দুচারটে লোকের সঙ্গে আলাপচারিতা হয়। ছেলে কিন্তু যে টিকিট কেটেছে তাতে কোনটাই সম্ভব নয় কারণ রাতের ট্রেন এবং তাও আমার ট্রেন সফরের সাধ মেটাতে এসি ফার্স্ট ক্লাস । দাদার স্টেশনের সাত নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে ছাড়বে কিন্তু প্ল্যাটফর্ম খুঁজে পেতে ট্রেন প্রায় মিস হয়ে যায় আর কি। যাই হোক, দুজনের ক্যূপে ঢুকে পড়ে ভেতর থেকে লাগিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুম। কিন্তু গুজুমেলে মাঝেমাঝেই একটা এমন হেঁচকা টান পড়ছিল যে মনে হচ্ছিল যে আমাদের কামরাটা বোধহয় যেতে ইচ্ছুক নয় কিন্তু বড় দাদার মতো ইঞ্জিন হাত ধরে টান মেরে বলছিল ," চল, যাবিনা মানে" কোন কথাবার্তা না হয়েই ভোরবেলা আমেদাবাদ পৌঁছে গেলাম। ট্রেনেই মুখ ধুয়ে নেওয়ায় স্টেশনে নেমে চা খেতে কোন অসুবিধা হলোনা।এরপর উবের ট্যাক্সিতে আমার পরিচিত এক হোটেলে।
খানিকক্ষণ ঘুমিয়ে নিয়ে তৈরী হয়ে নিলাম এবং পুরনো বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে দেখা করে বিয়েবাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। নিকা হয়ে গেল জারুর আর্মানের সঙ্গে। ঝকঝকে ছেলে আরমান। বিয়ের কয়েকদিন পরেই জারুকে নিয়ে চলে যাবে সুদূর আমেরিকায়। ভারী সুন্দর লাগছিল জার্মিনকে। ও চিনতে পেরেছে আমাকে, মৃদু হাসিতে জানালো। ডিনারের পরে আবার আমেদাবাদ স্টেশনে। ফেরার পালা কিন্তু এবার আমাদের টিকিট আরাবল্লী এক্সপ্রেসের এসি টু টায়ারে। রথ দেখা হলো কিন্তু কলা বেচা হলোনা মানে লোকজনের সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে আসা এবং সেকেণ্ড ক্লাস চেয়ার কার বা স্লিপারে আসা হলোনা। কি আর করা যাবে, একসঙ্গে সব কিছু তো হয়না কারণ ছেলেকে একদিন ছুটি নিয়ে পরের দিন অফিস করতেই হবে। অতএব করতেই হবে সমঝোতা।
এবার ট্রেন আসার বেশ খানিকক্ষণ আগেই পৌঁছে গেছি আগের রাতের কথা মনে রেখে। আমাদের কোচটা যেখানে থামবে তার খুব কাছেই একটা বেঞ্চে বসে আছি। আর পি এফের লোকরা আলতু ফালতু লোকদের ভাগিয়ে দিচ্ছে। এখন স্টেশনগুলো খুব পরিষ্কার এবং সেটা সবার সহযোগিতার জন্য ই সম্ভব হয়েছে। হঠাৎ ঘসঘস করে কিছু টেনে নিয়ে যাওয়ার আওয়াজে চোখ চলে গেল পিছনদিকে। দুটো বছর আট নয়েকের ছেলে দুটো বড় প্লাস্টিকের বালতি টেনে নিয়ে যাচ্ছে আর সেই বালতিতে রয়েছে খালি জলের প্লাস্টিক বোতল। মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল। এই বয়সের ছেলেদের পেট চালাতে এইরকম কাজ করতে হচ্ছে এই ভাবে! আমাদের ঘরের ছেলেমেয়েরা এই বয়সে এত রাতে ঘুমাতে চলে যায় পরেরদিন স্কুলের রুটিন অনুযায়ী বইপত্র গুছিয়ে আর এরা বোতলগুলো বুঝিয়ে দিয়ে কিছু পয়সা নিয়ে তার মা বা বাবার কাছে বুঝিয়ে দেবে এবং তার পরে তাদের খাওয়াদাওয়া ও ঘুম। এক ই বয়সের শিশু অথচ কতটাই না বৈষম্য। ট্রেন আসতে এখনও প্রায় আধঘণ্টা দেরী। আমার আরাবল্লী এক্সপ্রেসের কথা মনে হতে লাগল আর মনে পড়তে লাগল মহারানা প্রতাপের কথা। রাজপুতানার ইতিহাস ঘাঁটলে এটাই দেখা যায় এরা নিজেদের মধ্যে যত রেষারেষি করেছে ততটাই সুবিধা করে দিয়েছে বাইরের শত্রুদের। এঁরা নিজেদের মধ্যে দলাদলি না করে যদি ঐক্যবদ্ধ ভাবে প্রতিরোধ করতো তাহলে ভারতবর্ষের ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতো। মনে পড়তে লাগলো হলদিঘাটের যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে মহারানা প্রতাপকে নিয়ে হাতির দাঁতে আহত মহারানা প্রতাপের ঘোড়া চেতক পালিয়ে যাচ্ছে নিরাপদ দূরত্বে, পিছন থেকে বৈমাত্রেয় ভাই শক্তি সিং রানা প্রতাপ কে হত্যার উদ্দেশ্যে প্রেরিত দুজন মুঘল যোদ্ধাকে হত্যা করে চিৎকার করে ডাকছে," হো নীল ঘোড়াকা সওয়ার" বলে রানা প্রতাপের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। আহত চেতকের আর চলার শক্তি নেই, পড়ে গেল মাটিতে কিন্তু ততক্ষণে তার মনিব মহারানাকে বিপন্মুক্ত করে দিয়েছে। ইতিমধ্যে শক্তি সিং পৌঁছে গেছেন তাঁর বড় ভাই রানার পাশে এবং চেতকের মৃত্যুর পর তার নিজের ঘোড়াটি দিয়ে মহারানাকে পালাতে সাহায্য করলেন। ইতিহাসে যদিও আছে যে শক্তি সিং আকবরের সঙ্গে ছিলেন অন্যান্য অনেক রাজপুত রাজাদের মতো কিন্তু যখন তিনি জানতে পারেন যে আকবর মেওয়ার আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং সেইখানে তাঁকে মেওয়ারের রাজা বানাতে চাইছেন, তিনি আকবরের অনুমতি না নিয়েই মহারানাকে সতর্ক করে দিয়েছেন যা এককথায় বলা যায় গুপ্তচরবৃত্তি করেছেন কারণ তিনি আকবরের সঙ্গে যোগ দিলেও নিজের বাবা ও ভাই তথা নিজের দেশের বিরুদ্ধে যেতে চাননি। চোখের সামনে চেতককে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে দেখে শক্তি সিং তার দাদাকে নিজের ঘোড়াটি দিয়ে পালাতে সাহায্য করলেন। এইসব ভাবতে ভাবতে কখন ট্রেন আসার ঘোষণা হয়ে গেল। ইতিহাসকে কাঁধে করে আরাবল্লী এক্সপ্রেস স্টেশনে এসে ঢুকল এবং আমরাও নিজেদের সীটে বসে পড়লাম। এটা আর পাঁচটা ট্রেনের মতোই , কিছু পার্থক্য নেই অথচ মনটা আমার কোথায় যেন উধাও হয়ে গেছিল, আমি তখনো সেই ট্রেনের মধ্যে ইতিহাস খুঁজে চলেছি। দশ মিনিট পরে ট্রেন ছাড়ল, ঘন্টা খানেক বাদে আনন্দ এবং দুঘন্টা পরে এল বরোদা, সুরাট, বাপি, নভসারী ,ভালসাড ও দহনুরোড। জেগে বসে আছি একটা ঘোরের মধ্যে, মনে হচ্ছে এই বোধহয় আটফুট দীর্ঘ রানা প্রতাপ এসে বলবেন আমি স্বাধীনতার প্রতীক, আমার মৃত্যু নেই, যুগে যুগে আমি আসি আর স্বাধীনতার বাণী শোনাই। চোখটা একটু লেগে এসেছিল সবে কিন্তু রাজপুতানা তথা ভারতবর্ষের গর্ব সেই মহারানা প্রতাপের চিন্তা মাথায় কিলবিল করছে। তিনি যেন বলছেন যে ইতিহাসবিদদের লেখনীতে তাঁর বীরত্বের কথা সেইভাবে প্রচার না পেলেও তিনি আছেন আপামর জনতার হৃদয়ে। ধীরে ধীরে এর বোরিভালি যেখানে বহু যাত্রী নেমে গেল। ট্রেন প্রায় খালি আর মাঝে মাঝেই থেমে যাচ্ছে এখানে সেখানে যখন যে কোন মূহুর্তে ছিনতাই হবার সম্ভাবনা প্রবল। জেগেই থাকলাম বান্দ্রা টার্মিনাস অবধি। এখানেই যাত্রা শেষ কিন্তু আমরা নামতে না নামতেই হুড়মুড় করে বোরখা পরা মহিলা ও লোকজন উঠতে লাগল এবং বাথরুমে ঢুকে পড়ল প্রাতঃকৃত্য সারার জন্য। স্টেশনের বাইরে এত নোংরা যে মনের মধ্যে যে রানা প্রতাপ ঘোরাঘুরি করছিলেন তিনি কোথায় যেন ভ্যানিশ হয়ে গেলেন।