গাড়ির পলিউশন কন্ট্রোল সার্টিফিকেটটা রিনিউ করা দরকার কারণ আজকাল পুলিশ ধরলেই হাজার দুয়েক টাকা ফাইন করবে। বেরিয়েছি কিন্তু তাড়াহুড়োয় চা খাওয়া হয়ে ওঠেনি। বেশ লম্বা লাইন, অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আমার পালা এল। পাঁচ সাত মিনিটের ব্যাপার কিন্তু লম্বা লাইনে চায়ের তেষ্টা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। কাছাকাছি দুচারটে দোকান থাকলেও আমার ভ্রাতৃপ্রতিম চালক বলল যে আমাকে এমন জায়গায় চা খাওয়াবে যে চিরদিন মনে থাকবে। একটু বাদেই এসে গেলাম রানীদির দোকানে। ভিড় আজ একটু বেশিই মনে হচ্ছিল। বিজয় রানীদির বেশ পরিচিত। চোখের ইশারায় জানালো একটু অপেক্ষা করার জন্য। নতুন করে চা বানিয়ে বড় মাটির ভাঁড়ে চা এর সঙ্গে একটু বাহারি বিস্কুট ও এল। সাধারণত লিকার চা খাই কিন্তু মাঝে মধ্যে একটু দুধ চা খেতে মন্দ লাগে না। দুধ চায়ে চুমুক দিতেই একটা দারুণ তৃপ্তি অনুভব করলাম , ভেতরটা বেশ ভিজে গেল। আরও এক কাপ চায়ের অর্ডার দিলাম। এবার দাম চুকানোর পালা। কত হয়েছে জিজ্ঞেস করতেই বিজয় বলল যে রানী দি কোন দাম নেবেনা। অবাক হয়ে গেলাম, ভাবলাম যে হয়তো বিজয় ওঁর বিশেষ পরিচিত হওয়ার জন্য উনি দাম নিতে অস্বীকার করছেন। একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম দুভাঁড় চা ও বিস্কুট খেয়ে পয়সা না দেওয়ার জন্য। আশ্চর্যের ব্যাপার এটাই যে রানী দি কারো কাছেই আজ পয়সা নিচ্ছেন না। আকাশ থেকে পড়লাম যে একজন সামান্য টি স্টলের মালকিন বিনা পয়সায় আজ সবাইকে চা ও বিস্কুট খাওয়াচ্ছেন এবং তিনি না কি প্রত্যেক মাসে একটা দিন তিনি সবাইকে বিনা পয়সায় সব কিছু খাওয়ান। কেউ কিন্তু জানেনা যে মাসের কোন দিন তিনি বিনা পয়সায় খাওয়াবেন। রানী দির এটা ব্যবসা বাড়ানোর কোন কারণ কি না জানিনা কিন্তু ভাগ্যের জোরেই হোক বা অন্য কোন কারণেই হোক তিনি এটা করেন। আজকের দিনে মানুষ এতটাই স্বার্থপর হয়েছে যে নিজের কথা ছাড়া অন্যের কথা তো ভাবেই না, অন্য কেউ করলেও তাতেও নানাভাবে বাগড়া দেয়। স্বার্থময় জগতে রানী দির মতো অতি সাধারণ মানুষ ও তাঁদের এইধরণের ব্যবহারে অসামান্য হয়ে যান। রানী দির মতো মানুষ আরো অনেক অনেক হোক যাতে পৃথিবীটা একটু কলুষমুক্ত হয়।
Shobujbabu
Thursday, 22 January 2026
"রানী টি স্টল"
লর্ডস মোড়ের অনতিদূরে একটা ছোট্ট চায়ের দোকান। না কোন ভুল করা যাবেনা, ওখানে বিভিন্ন দামের চায়ের পাতা বিক্রি হয় না, সেখানে চা তৈরি করে বিক্রি করেন রানী দি বলে এক মাঝবয়সী ভদ্রমহিলা। টিনের ঘেরাটোপে একটা ছফুট লম্বা ও চার ফুট চওড়া বাক্স যার নীচের অংশ তালা দিয়ে বন্ধ, মাঝের অংশে স্টোভ,কেটলি, চা তৈরির সরঞ্জাম এবং কাচের গ্লাস, কাগজের কাপ/ গ্লাস, মাটির ভাঁড় এবং ইঞ্চি দশেক উঁচু তিন দিক ঘেরা একটা রেলিং যেখানে সারি সারি কাচের বয়ামে নানা ধরনের বিস্কুট ও কেক। ওর ই মাঝে রয়েছে ফোটানো দুধের একটা মাঝারি সাইজের গামলা। মাথার উপরে টিনের শেড রোদ বৃষ্টি থেকে রানীদির মাথাও বাঁচায় আবার কাস্টমারের মাথাও। আগে পাঁউরুটি ও ঘুগনি খেত অনেক লোক কিন্তু আজকাল একা হয়ে যাওয়াতে ওসব হাঙ্গামায় আর যান না। ওঁর চায়ের স্টলের সামনে রাস্তাটা বেশ চওড়া থাকায় ফুটপাতটাও বেশ প্রশস্ত এবং সামনে ও দুপাশে তিনটে বেঞ্চ পাতার পরেও লোকজনের যাতায়াত করায় কোন অসুবিধা হয়না। চায়ের গুণমান ভাল হওয়ার জন্য অটোওয়ালা, ট্যাক্সি ড্রাইভারদের ভিড় সবসময়ই লেগে রয়েছে কিন্তু ভদ্রমহিলা শান্তভাবে স্মিত হাসিতে সবাইকে চা খাইয়েই চলেছেন।
Tuesday, 20 January 2026
"ইন্দ্রপ্রস্থ লজ"
নতুনপাড়ায় চৌমাথার মোড়ে গোলক বাবুদের বিরাট তিনতলা বাড়ি এই ইন্দ্রপ্রস্থ লজ। তাঁর আরও তিন ভাই অলোক , পুলক ও তিলক ওই বাড়িতেই থাকেন, মেজভাই অলোক ও সেজভাই পুলক দোতলায় থাকেন যদিও হাঁড়ি আলাদা এবং সন্তানসম ছোটভাই তিলক ও তার পরিবার এবং অকৃতদার গোলক বাবু থাকেন তিনতলায় এবং তাঁর খাওয়াদাওয়া ঐ ছোটভাই তিলকের ই সঙ্গে। কন্ট্রাকটার হওয়ার সুবাদে বাড়ির গঠন ও ব্যবস্থা সুন্দর। প্রত্যেক তলায় দুটো বাথরুম ও দুটো রান্নাঘর এবং রান্নাঘর এতটাই বড় যে সেখানে মাটিতে আসন পেতে বসে খাওয়া যেত, এখনকার মতো আলাদা ডাইনিং রুম ছিলনা এবং সাহেবসুবোদের মতো টেবিল চেয়ারে বসে খাওয়ার রেওয়াজ ও ছিলনা। গোলক বাবুর বয়স হয়ে যাওয়ায় কাজকর্ম আর সেরকম করেন না এবং সংসারে সচ্ছলতা আনার জন্য একতলায় একটু অদল বদল করে তিনটে ভাড়াটে বসিয়েছেন। ঘরের সামনে প্রশস্ত বারান্দা বাড়ির সবাই মিলে বসে গল্পগুজব করার জন্য যথেষ্ট। উঠোনটাও যথেষ্ট বড় এবং একটা টিউবওয়েল তিনতলা পর্যন্ত জল সরবরাহ করছে। ইন্দ্রপ্রস্থ লজের আরও একটা বৈশিষ্ট্য ছিল বাইরের দিকে ব্যালকনি ছাড়াও দোতলায় এবং তিনতলায় লোহার রড দিয়ে বানানো মাঝখানে ফাঁকা ছাদ যার মধ্য দিয়ে সূর্যের আলো একতলায় পৌঁছে যায় এবং যার মধ্য দিয়ে টিউবওয়েলের পাইপ চলে আসে। গোলক বাবু ছাড়া ছটি পরিবার ছেলেমেয়ে নিয়ে সদাই কলতানে মুখরিত থাকতো এই ইন্দ্রপ্রস্থ লজ। বাড়ির নাম কেন ইন্দ্রপ্রস্থ লজ হয়েছিল সে বিষয়টি নিয়ে চিরদিন একটা ধন্দ ই রয়ে গিয়েছিল সবার মনে। সাধারণত বাড়ির নাম বাবা অথবা মায়ের নামে রেখে ভবন বা নিকেতন কিংবা একটু কাব্যিক ছান্দিক ভাবে সুখনীড় বা আনন্দ নিলয় রাখা হতো কিন্তু কন্ট্রাক্টর গোলক বাবুর মনে কি ছিল কেউ জানতে পারেনি।
বাড়িতে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা থাকলে সবসময়ই একটা প্রাণের সঞ্চার হয় এবং সেটা বেশ রমরমিয়ে ওঠে যখন পাঁচ ছটা পরিবারের বার চোদ্দটা বাচ্চা একত্রিত হয় তখন সেটা একটা আলাদা মেজাজে পর্যবসিত হয়। বাড়ি একটাই, আলাদা বাথরুম, আলাদা রান্নাঘর কিন্তু কোন দেওয়াল নেই তাদের আলাদা করার। মাঝে মাঝেই এই রান্নাঘরের একটা পদ আরও পাঁচটি পরিবারে চলে আসে এবং লজ তখন আনন্দ নিকেতনে পরিণত হয়। সব ছেলেমেয়েরাই নিজেদের বয়স অনুযায়ী গ্রুপ বানিয়ে নিয়েছে কিন্তু লজের কোন পরিবারের যে কোন অনুষ্ঠান ও লজের ই অনুষ্ঠান হয়ে যায়। বাইরে অক্লান্ত বর্ষণ কিন্তু ঐ বাড়ির ছেলেমেয়েরা বসে গেছে ক্যারাম বা লুডো বা দাবার বোর্ড নিয়ে। পাড়ার প্রত্যেকটি বাড়ির কাছে ঈর্ষণীয় ব্যাপার। স্কুল, পড়াশোনা, খেলাধূলা করার ফাঁকে ছেলেমেয়েরা সব বড় হয়ে গেল আর গোলকবাবুরাও প্রৌঢ়ত্ব পেরিয়ে বৃদ্ধ হলেন, শরীর ধীরে ধীরে অশক্ত হতে থাকলো। ছেলেমেয়েরা স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কেউ সাধারণ কলেজ, কেউ বা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ আবার কেউ কেউ মেডিকেল কলেজে ভর্তি হলো। একসময়ের কলকলে আওয়াজে মুখরিত ইন্দ্রপ্রস্থ লজ কেমন যেন মনমরা বিশু পাগলার মতো হয়ে গেল। বাড়ির সামনের গেটের একটা পাল্লা কে বা কারা চুরি করে নিয়ে গেছে আর অন্যটি ও ঘাড় বেঁকিয়ে এক দিকে কাত হয়ে আছে, অপেক্ষা করছে কখন দুষ্কৃতিরা এসে তাকেও তার বন্ধুর মতো টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাবে। মনে পড়ে সেই দিনের কথা যখন তার মানিকজোড় তারস্বরে আর্তনাদ করছিল বন্ধু বিচ্ছেদের চিন্তায় কিন্তু কেউ কান দেয়নি তার আর্তনাদে, গ্যাস কাটার দিয়ে কেটে নিয়ে গেল তাকে। তার ও ঐ অবস্থাই হতো কিন্তু লজের কেউ এসে পরায় সে যাত্রা রক্ষা পেয়েছে কিন্তু কতদিন সুরক্ষিত থাকবে তাতে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। গোলক বাবু পৃথিবীর মায়া ছাড়িয়েছেন, অলোক, পুলক ও তিলকদের মধ্যেও দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে গোলকবাবুর সম্পত্তির ভাগ নিয়ে। একসময় যারা একে অন্যকে চোখে হারাতো, আজ তাদের মুখ দেখাদেখি বন্ধ। যাঁরা ভাড়াটে ছিলেন, তাঁদের ছেলেমেয়েরা কেউ ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বাইরে চলে গেছে চাকরির সূত্রে, মেয়েদের ও ভাল ই বিয়ে হয়ে গেছে , একসময়ের উচ্ছলিত ইন্দ্রপ্রস্থ লজ আজ এক ভূতুড়ে বাড়ি। ভাড়াটে বিজন বাবুর ছেলে গুঞ্জন বড় ডাক্তার হয়ে ইংল্যান্ডের বাসিন্দা হয়েছে, বন্ধুর মেয়ের বিয়েতে এসেছে কলকাতায়। একঝলক উঁকি দেওয়ার ইচ্ছায় গাড়ি নিয়ে এসেছে নিজের শৈশব যেখানে কেটেছে সেই জায়গায়, স্কুল, পুরনো বন্ধুবান্ধবদের এক আধজনের সঙ্গে ও যদি দেখা হয় এই আশায়। অনেক বদলে গেছে তার শৈশবের শহর, পাড়ার আদল অনেক বদলে গেছে, তাদের বাড়ি ইন্দ্রপ্রস্থ লজের ফলকটা খোঁজার বৃথা চেষ্টা, সেই জায়গায় উঠেছে এক বিশাল বহুতল দুকামরা, তিন কামরার ছোট ছোট ইউনিট নিয়ে। ছয়টি পরিবার এখন কত ভগ্নাংশে পরিণত হয়েছে সেটা গোণার চেষ্টা না করে অপলক দৃষ্টিতে খানিকক্ষণ চেয়ে পুরনো স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে কখন যে নিজের হোটেলের কাছে এসে পড়েছে খেয়াল নেই।
ভীষণ ব্যস্ত শিডিউল, চেক আউট করার সময় হয়ে গেছে অথচ জিনিস পত্র ছত্রখান, যেন বলছে আরো কিছুক্ষন থাকলে হয় না?
Monday, 12 January 2026
"উপেক্ষিত"
ঢুক ঢুক ঢুক ঢুক করে থেমে থেমে আওয়াজ আসছে। বেণুর ঘুমটা ভেঙে গেল । পাতলা হয়েই আসছিল ঘুমটা কারণ কি যেন একটা স্বপ্ন দেখছিল, মনে করার চেষ্টা করছিল । এই সময়ে ওই আওয়াজে আরও সচকিত হয়ে উঠল সেই শব্দে। আজকাল চারদিকে যেরকম চুরি চামারি হচ্ছে তাতে কিছুই বিচিত্র নয় । অবশ্য আমরা এদের ভয়ে সন্ত্রস্ত থাকি কিন্তু আশেপাশে থাকা কেষ্টবিষ্টুরা যখন চুরির বদলে ডাকাতি করে তখন আমরা নির্লিপ্ত থাকি, সবকিছুই যেন গা সওয়া হয়ে গেছে।
চোখ কচলে শব্দের উৎস জানতে বেণু উঠে এদিক ওদিক দেখার চেষ্টা করতে থাকল কিন্তু কিছুই ঠাউরাতে পারল না। চারিদিকে কুয়াশায় মোড়া চাদরে ঢাকা সমস্ত শহর। কুড়ি মিটার দূরে থাকা জিনিসগুলোও অস্পষ্ট, ভাল করে দেখাই যায় না। মোবাইলে টর্চের আলোয় যতটুকু দেখা যায় ততটুকুতে অপসৃয়মান একটা মাঝারি উচ্চতার লোককে দুলে দুলে চলতে দেখে মনে হলো অশোক। মোবাইলে ঘড়িতে নজর পড়ল ভোর সাড়ে পাঁচটা। এই সাতসকালে যখন আমরা কম্বলের তলা থেকে বেরোতে সাতবার ভাবি তখন এই অশোক বা তরুণরা আরও ভোরের ট্রেনে এসে অটো বা পায়ে হেঁটে এসে এই উপনগরীর মানুষের সকালে উঠেই যেন কোন অসুবিধা না হয় সেদিকে খেয়াল রাখে। এরপরেই ওরা আসে বাড়ির জমে থাকা আগের দিনের ময়লা নিতে। ফি শনিবার বা রবিবার সিঁড়ি ধোওয়া। তার সেখানে আমাদের জল দিতে অসুবিধা হবে বলে ছাদের ওপর থাকা জলের ট্যাঙ্ক থেকে পাইপ লাগিয়ে জল নিয়ে সিঁড়ি ধোওয়া এবং সেখানেও আমাদের মনের মতো না হওয়ায় হাজারো তির্যক সমালোচনা। কিন্তু বিনিময়ে আমরা তাদের কতটুকু ফিরিয়ে দিতে পারি?
যৎসামান্য ।
আমাদের মাইনে না বাড়লে বা ডি এ না বাড়ালে আমরা সঙ্ঘবদ্ধ ভাবে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ি কিন্তু এই ধরণের লোকজন যাদের ছাড়া আমাদের পথচলা একদম প্রায় অসম্ভব তাদের কথা মনেই পড়েনা কারণ তাদের গলার স্বর উচ্চকিত হয়না। তাদের কথা দুএকজন সহৃদয় ব্যক্তি ওঠালে বাকিরা হৈ হৈ করে ওঠে।
কেন এই দ্বিচারিতা? আমরা দিনদিন কি এতটাই স্বার্থপর হয়ে যাব? উল্টে তাদের কাজের মানের সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠি আমরা। নিজেদের কাজের যে কিরকম গতি প্রকৃতি তা নিয়ে কোনদিন ভাবিও না।
আচ্ছা, হঠাৎ যদি এমন হয় যে ট্রেন ঠিকমতো চলল না বা অশোকরাই মাঝপথে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ল, তাহলে কি হবে? তার জায়গায় অন্য লোক এসে কাজটা বুঝে উঠে করতে করতেই অনেক সময় গড়িয়ে যাবে। ততক্ষণ আমাদের সকালবেলার কাজকর্ম স্থগিত রাখতে পারব কি? আমরা যারা ছাপোষা মানুষ, সাতে পাঁচে থাকিনা, তারাই তখন হয়ে যাই অগ্নিশর্মা। আমরা যারা কথায় কথায় রাজা উজির মারি তাদের বেশির ভাগ লোক ই ওই দুঃসময়ে এগিয়ে আসিনা।
সমালোচনার তীর ছোঁড়ার আগে আমরা কি একটু ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করতে পারিনা? একটু ভেবে দেখার সময় হয়নি কি?
Saturday, 27 December 2025
"বনলক্ষ্মীর দ্বারে"
সুজন বাবু আজ খুশীতে ডগমগ। অনেকদিন পরে স্ত্রী, ছেলে, বৌমা, নাতি, নাতনিদের নিয়ে শান্তিনিকেতনে দুটো দিন কাটিয়ে ফিরে যাচ্ছেন নিজের বাড়িতে। দুটো দিন কেটেছে তাঁর পছন্দের গার্ডেন বাংলোয়, নানান ধরণের গাছগাছড়ায় ভর্তি আর পাখিদের কূজনে যেখানে ঘুম ভাঙে সেই ছবির মতন গেস্ট হাউসে। সামনে বড় লোহার গেট, গাড়ি পৌঁছে হর্ণ দেওয়া মাত্র দারোয়ান বেরিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল বুকিং আছে কি না এবং ভেতরে ঢুকে দেখে নিয়েই খুলে দিল গেট। দরজা খুলে বেরিয়ে আসতেই একগাল হেসে দারোয়ান মহাদেব বলল," স্যার, আপনি?" সুজন বাবু মনে মনে একটু খুশিই হলেন চিনতে পেরেছে দেখে , প্রত্যেক মানুষেরই একটা অহংবোধ থাকে আর সেটা যখন পরিতৃপ্ত হয় তখনই মানুষের মন খুশিতে ভরে ওঠে। ঢুকেই ডানদিকে গাড়ি রাখার জায়গা, বেশ কয়েকটা বড় গাড়ি থাকতে পারে। গাড়ি আর আগে যাবেনা, সমস্ত মালপত্র ওখানেই নামিয়ে রিক্সা ভ্যানে করে দুজন মহিলা সেটাকে টেনে নিয়ে রিসেপশনে চলে এল। মাল্টিপল অ্যাকটিভিটি তাদের, তারাই রেজিস্টার এগিয়ে দিল, তারাই মালপত্র ওপরে নিয়ে গেল এবং সব ব্যবস্থা করে দিল। ভাল লাগল দেখে, স্থানীয় মহিলারা যাঁরা খুব বেশি পড়াশোনা না করেও স্রেফ মুখের হাসি এবং আন্তরিকতা দিয়ে গ্রাহকদের মন জয় করে নেন না এবং সঙ্গে সঙ্গে গেস্ট হাউসের মর্যাদাও।
শান্তিনিকেতনে সবাই যেন গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের মর্যাদা ধরে রাখতে ব্যস্ত। ভারী সুন্দর কাব্যিক নাম তাদের বাড়ির এবং ফুলের বাহার সর্বত্র। কোন বাড়ির নাম খেয়া আবার কোনটার নাম গেহ আবার কেউ বা হলো দর্পণ বা শ্যামশ্রী বা ছান্দিক। ভাল লাগল যে কবিগুরুর আত্মাও হয়তো পরিতৃপ্ত হয়েছেন। এই বাড়ির মালিক একজন শিল্পী এবং তাঁর বাড়ির প্রত্যেকটি কোণে তার ছাপ স্পষ্ট। ডাইনিং হল সম্পূর্ণ কাচের, শীতের হিমেল হাওয়ার সেখানে প্রবেশ নিষেধ। তার ই সংলগ্ন একটা আধুনিক ধারার অ্যাপার্টমেন্ট আর ওই ডাইনিং হলের সোজা লনের উপর দিয়ে হেঁটে গেলে আসবে সেই হেরিটেজ বাংলো যার দুটো তলায় চারটে অত্যন্ত প্রশস্ত ঘর এবং মাঝখানে বিরাট লাউঞ্জ। বিশাল দুই দেয়ালে দুটো বড় আয়না এবং কারুকার্য মণ্ডিত কাঠের সোফা এবং দেওয়ালে শিল্পীর আঁকা পটচিত্র যা যে কোন শিল্পমনস্ক ব্যক্তিকেই আকর্ষণ করবে। ঐ হেরিটেজ বাংলোর তৃতীয় তলে প্রবেশ নিষেধ। বিশাল উঁচু ঘরের প্রবেশ পথে এক শিল্পময় দরজা যাতে লাগানো তালা খুলে ঘরে প্রবেশ করতে হবে এবং ডানদিকে একটা বড় বাথরুম। উল্টোদিকের ঘরে বাঁদিকে বাথরুম। বাথরুম থেকে বেরিয়ে শোবার ঘর , সেখানে ও রয়েছে একটা বড় শক্তপোক্ত কাঠের দরজা যাতে তালা ও লাগানো যায়। বিশাল বড় ঘরে রয়েছে আরও দুটো বড় দরজা এবং তার ই সঙ্গে মানানসই জানলা। বড় কাঠের সোফা ও টেবিল রয়েছে একদিকে আর অন্যদিকে রয়েছে সুদশ্য ড্রেসিং টেবিল এবং কাঠের চেয়ার ও টেবিল। একদিকে রয়েছে বিরাট মাপের সাবেকি আমলের কারুকার্য করা খাট যাতে তিনজন খুব ভাল ভাবে শুতে পারে, শীতকালে হয়তো চারজনেও। ড্রেসিং টেবিলের দিকেও একটা বড় খাট যেখানে দুজন আরামে শুতে পারে। আরও একটা দারুন জিনিস চোখে পড়ল যেটা হচ্ছে সুদৃশ্য এক আলনা যেখানে কোট, জামা কাপড় রাখা যায়। বড় খাটের পায়ের দিকে রয়েছে এক প্রকাণ্ড কাঠের সিন্দুক যার ভেতরে রয়েছে বাড়তি লেপ, চাদর ও বালিশ। সিন্দুকের ওপরে রাখা ইলেকট্রিক কেটলি এবং চায়ের সম্ভার, কাপ ও প্লেট। ঘরের দেয়ালেও রয়েছে সুন্দর চিত্রকলা। এককথায় বলা যায় যে হেরিটেজ যেন সর্বাঙ্গে মিশে আছে। একতলায় ও এক ই রকম, বাঁকানো কাঠের সিঁড়ির উল্টোদিকে রয়েছে রিসেপশন এবং সিসিটিভির মনিটর যা চব্বিশ ঘণ্টা নজর রাখছে কি হচ্ছে বা কে এল বা গেল। মানে আধুনিকতায় মোড়ানো হেরিটেজ।
মেন গেটের বাঁদিকে রয়েছে মাড হাউস যার দরজা, জানলা ও কাঠের স্তম্ভগুলো প্রত্যেকটি ই শিল্পময়। বাড়ির মালিক যে শিল্পী তা যেন প্রতি মূহুর্তে মনে পড়িয়ে দেয়। বহু বছরের পুরনো কাঠের স্তম্ভগুলো ইট দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে যা বছর পাঁচেক আগে এসে সুজন বাবু দেখেন নি। হয়তো বা দোতলার ঘরগুলোকে একটু মজবুত করার জন্য। কিন্তু সেই ইটগুলো ও বসানো হয়েছে শিল্পীর মান রেখেই। এই মাড হাউসে মাঝে মাঝেই সিনেমার শ্যুটিং হয়। পাঁচ বছর আগে যখন প্রথম এসেছিলেন সুজন তখন শিল্পীর স্ত্রী ছিলেন এবং তাঁর স্বামীর শিল্পকর্মের কিছু অ্যালবাম ও দেখেছিলেন যেটা এবার হলো না উনি না থাকায়।
আসার পথে শক্তিগড়ে ব্রেকফাস্ট বেশ ভাল রকমের হওয়ায় লাঞ্চ করার তেমন ইচ্ছে হলোনা, গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পরা হলো সোনাঝুড়ির মেলায়। এই মেলার প্রধান আকর্ষণ আশপাশের গ্রাম থেকে আসা বিভিন্ন ধরনের শিল্পীর হাতের কাজের নমুনা। দেবদারু গাছ, ইউক্যালিপটাস গাছ ও নানাধরণের গাছের ফাঁকে ফাঁকে বসা এই মেলায় ঘুরে ঘুরে নানাবিধ জিনিস কেনা একটা দারুন অভিজ্ঞতা। কেউ বা বিক্রি করছে দই, কেউ বা গামছা আবার কেউ বা বসে আছে পেয়ারা, কামরাঙা বা কদবেল নিয়ে। আচারের তেলে মাখানো পেয়ারা খাওয়া এক বিরল অভিজ্ঞতা। কতরকমের জিনিস এই গ্রামীণ শিল্পীরা যে বিপণন করেন তার ইয়ত্ত্বা নেই এবং দামেও যথেষ্ট শস্তা। কলকাতা এবং অন্যান্য জায়গা থেকে বহুলোক এখানে আসেন ব্যবসার খাতিরে। বাউলরা আগে বসতেন বাঁশের মাচার উপর কিন্তু এখন সেগুলো ভেঙে দেওয়ায় তাদের মাটির উপর ত্রিপল বা প্লাস্টিকের চাদরে বসতে হয়। চারিদিকে নানান কলরব কিন্তু এর ই মধ্যে এই শিল্পীদের গান গাইতে হয়। আদিবাসী মেয়েরা সাধারণত হলুদ শাড়িতে সজ্জিত হয়ে তালে তালে নাচেন এবং কিছু আধুনিকারা তাঁদের সঙ্গে তাল মেলান। প্রথম দিন বাউলদের দেখা মিলল না, বেলাও বেশ বেড়েছে, যাওয়া হলো একজনের রেফারেন্সে আমোলি রেস্তোরাঁয়। গলি ঘুঁজি খুঁজে বের করা রীতিমতো কঠিন কাজ কিন্তু অবশেষে মিলল দেখা তাঁর এবং অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর এল বহু প্রতীক্ষিত কিছু বিশেষ খাবার যা সচরাচর সাধারণ রেস্তোরাঁয় পাওয়া যায়না এবং অবশ্যই তুলনায় দামী অন্তত ঐ জায়গার অনুপাতে। অবশ্য ওটা না হলে চলবেই বা কি করে। যাই হোক ওখান থেকে বিশ্বভারতীর ছাতিম তলায় পৌষ মেলার উদ্বোধনের আয়োজন দেখতে যাওয়া হলো কিন্তু সিকিউরিটি গার্ডের কাছে পাওয়া খবরে বিশেষ উৎসাহী হতে পারা গেলনা। ফিরে আসা হল গেস্ট হাউসে এবং সেখান থেকে ভোরবেলা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ভেসে আসা আওয়াজে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো হলো। গা গড়িমসি করে উঠে জলখাবার খেতে বেশ দেরী হলো এবং কঙ্কালীতলার উদ্দেশ্যে যাওয়া হলো। বেশ কয়েক বছর বন্ধ থাকার পর ফের চালু হওয়া পৌষ মেলার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে নানান বিড়ম্বনায় পড়তে হলো ।পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ । এদিকে রাস্তা খোলা তো ঐদিকো
বন্ধ । গাড়ি ছেড়ে দিয়ে টোটোয় যাত্রা পৌষ মেলার উদ্দেশ্যে । সেখানে ও কিছু জিনিসপত্র কেনা হলো কিন্তু অসম্পূর্ণ কেনাকাটা সম্পূর্ণ করতে যাওয়া হলো ফের সোনা ঝুড়ির মেলায়। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হবার মতো, খাওয়া হলো রাম শ্যামের হোটেলে। ভেজিটেরিয়ান থালি ২০৫টাকা জি এস টি সমেত কিন্তু খাওয়ার গুণগতমান এবং আতিথেয়তা প্রশংসনীয়। খাওয়ার পর ছোটখাটো দুচারটে জিনিস কিনে ফেরার পথে চোখে পড়ল বাউলদের। সুজনের অত্যন্ত পছন্দের জগন্নাথ দাস বাউলের সন্ধান পেয়ে নমস্কার করে প্রিয় গান"পরের জায়গা পরের জমিন ঘর বানাইয়া আমি রই, আমি তো এই জমির মালিক নই" শুনে মনটা ভরে গেল। বাঁ হাতে একতারা, ডান হাতে মাঝে মাঝে তবলা বা ম্যারাকাশ এবং পায়ে ঝুমুর এবং গলায় দরদ ভরা গান এক আলাদা মাত্রা নিয়ে আসে। নাতি, নাতনী ও ছেলের সঙ্গে আলাপচারিতার মাঝে আরো খান চারেক গান শোনালেন জগন্নাথ দাস বাউল এবং ফিরে আসা গার্ডেন বাংলোয়।
পরের দিন সকাল বেলায় ফিরে আসার পালা। বোঁচকা বুঁচকি সব বাঁধা ছাঁদা শেষ। ব্রেকফাস্ট সারা হয়ে গেছে, মালপত্র গাড়িতে উঠে গেছে, সবাইকে বিদায় জানিয়ে অবশেষে ফেরার পালা। কিন্তু বনলক্ষ্মী তো যাওয়া হলোনা। বিভিন্ন রাস্তা বন্ধ, ঘুরে ঘুরে পৌঁছানো গেল বনলক্ষ্মীর দ্বারে। প্রবেশ পথ একটা বাঁশ দিয়ে আটকানো। গাড়ি পৌঁছাতেই কয়েকটি বাচ্চা ছেলেমেয়েরা ছুটে এল, কারণ জিজ্ঞেস করতেই জানালো তারা সরস্বতী পুজো করবে, তার জন্য চাঁদা চাইছে তারা। কয়েকজন গাড়িওয়ালা খুব বকাবকি করায় ওই শিশুদের মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। কয়েকটা গাড়ির পিছনে থাকা সুজনের নজর সেটা এড়ায়নি। বছর দশ এগারোর ছেলেমেয়েদের এমনভাবে বকুনি দেওয়াটা সুজনের একদমই পছন্দ নয়। মনে পড়ে গেল তার নিজের শৈশবের কথা। শিব পূজোর চাঁদা তুলতে গিয়েছিল সে তার বন্ধুদের সঙ্গে কলেজের মেন হোস্টেলে। কলেজের পড়ুয়া ড়্গলল্লছাত্ররা প্রথমে তাদের একটা ঘরে বন্ধ করে দিয়েছিল। তারপর কান্নাকাটি করায় তাদের ছেড়ে দিয়েছিল কিন্তু কয়েকটা গান শোনানোর পরে। সুজন সেই সময় খান চার পাঁচেক করার পর ছাড়া পেয়েছিল কিন্তু কয়েকজন ছাত্র যারা একটু কষ্ট পেয়েই হোক বা সহানুভুতিশীল হয়েই হোক একটাকা সাড়ে দশ আনা চাঁদা তুলে দিয়েছিল। তখন সুজন কান্না ভুলে টাকাটা পকেটে ভরে নিয়েছিল। একটা একটা করে গাড়ি ঢুকছে আর বেরোচ্ছে। ছেলেমেয়েগুলো একটু দমে গিয়ে পাশেই এক্কা দোক্কা খেলতে শুরু করে দিল। অনেকদিন পর এই খেলাটা দেখে সুজন আবার শৈশবের গভীরে ডুব দিল। আগে তো সেও তার দিদিদের সঙ্গে এক্কা দোক্কা খেলেছে এবং নিজেদের বন্ধুদের সঙ্গে পিট্টু বা গাদন খেলেছে। সবকিছুই মনে পড়ে যাচ্ছে। অবশেষে তাদের গাড়ি ঢুকলো। ও প্রথমে বনলক্ষ্মীর ভেতরে ঢুকল না এবং বাচ্চাদের খেলা দেখতে লাগলো। বছর দশেকের একটি ছিপছিপে চেহারার কোঁকড়ানো চুলের মেয়ের দিকে চোখ পড়ে গেল। কি অপূর্ব সুন্দর রূপ দিয়েছেন ভগবান তাকে। তার নাতনির থেকে বছর খানেক বড় হবে হয়তো, তার সঙ্গে আরো একটি দীঘল চোখের মেয়ে। সুজন তাদের ডাকলো এবং নাম জিজ্ঞেস করল ও কোন স্কুলে ও কোন ক্লাসে পড়ে জিজ্ঞেস করল। একজন ক্লাস ফোর থেকে ফাইভে উঠবে আর অন্যজন ফাইভ থেকে সিক্সে। ছেলেরাও এগিয়ে এসে বললো, " আঙ্কেল,আমরা সরস্বতী পূজো করব, আমাদের একটু চাঁদা দেবেন?"
"নিশ্চয়ই দেব" বলে জিজ্ঞেস করলেন কত দিতে হবে। ওরা জানালো পাঁচ টাকা,দশ টাকা যা হোক। সুজন ওদের একটা একশো টাকার নোট দিয়ে বললো যে এটা এই গাড়ির তরফ থেকে। ওরা তো খুব খুশি। সবাই ঘিরে ধরেছে ওঁকে। হঠাৎ ই একটা মোটর সাইকেলে স্বামী ও স্ত্রী বনলক্ষ্মী থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে দেখে ওরা তাদের কাছে চাঁদা চাইল। ওরা বললো," আমরা মুসলমান, আমরা পূজোর চাঁদা দিই না।" ঐ বাচ্চা ছেলেমেয়েদের মধ্যে যে সবচেয়ে বড় সেই সুদীপ সরকার ক্লাস সিক্স থেকে সেভেনে উঠবে সুজনকে এসে সরাসরি জিজ্ঞেস করলো, " আঙ্কেল, মুসলমানরা কি পড়াশোনা করেনা?" সুজন প্রায় বোল্ড আউট, বাঁচিয়ে দিল তাদের ই ড্রাইভার আলম ভাই। উনি বললেন, যে চাঁদা না দেওয়ার বাহানায় উনি এইরকম কথা বলেছেন। আমি ও তো মুসলমান, আর ইনি হচ্ছেন আমার দাদা। আমিও তো আমার ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করিয়েছি। মনের মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকল সুদীপের প্রশ্নটা। তাঁর সঙ্গে ও তো পড়তো কুদ্দুস, আকবর, মোর্শেদ, রিয়াজুল, সফিকুল ও রফিকুল রা। তারা তো ওঁর সঙ্গে দূর্গাপূজো, সরস্বতী পুজোর চাঁদা তুলতো, কোনদিন তো এইধরণের প্রশ্ন ওঠেনি, তবে আজ কেন? কেন এই রাজনৈতিক নেতারা মানুষের মনের মধ্যে বিষ ঢুকিয়ে দিচ্ছেন যাতে এই শিশুদের মনটাও কলুষিত হয়ে যায়? বনলক্ষ্মীর দ্বারে এসে নিজেকেই হারিয়ে ফেললেন সুজন, ধীরে ধীরে বৌমা, নাতি নাতনিদের ডেকে গাড়িতে উঠে পড়লেন।
Tuesday, 16 December 2025
"সম্রাটের সম্রাট দর্শন"
ইতিহাসের পাতা ওল্টালেই দেখা যায় একজন রাজা বা সম্রাট আরও একজন রাজা বা সম্রাট(তিনি যত ই ছোট মাপের হ'ন না কেন) তাঁকে যথাযোগ্য মর্যাদা প্রদর্শন করেন। মহাভারতে বা অন্য বিদেশী সাহিত্যেও এর প্রচুর নিদর্শন রয়েছে। কোন কোন ক্ষেত্রে যেখানে এক দেশের রাজা আর এক দেশ আক্রমণ করেছেন এবং বিজয়ী হয়েছেন সেক্ষেত্রে অবশ্য আলাদা ব্যাপার। সেখানে পরাজিত রাজাকে বন্দী করে অমানুষিক অত্যাচার করে মেরে ফেলা হয়েছে এবং সমস্ত রকমের লুণ্ঠন করা হয়েছে কিন্তু অবশ্যই তার ব্যতিক্রম ও আছে। যেমন আলেকজাণ্ডার পুরুকে পরাজিত করার পর যখন জিজ্ঞেস করেন তিনি তাঁর কাছে কি রকম ব্যবহার আশা করেন যার উত্তরে রাজা পুরু উত্তর দেন একজন রাজার প্রতি আরেকজন রাজার ব্যবহার। তাঁর এই নির্ভীক উত্তরে আলেকজান্ডার খুশী হয়ে তাঁর রাজ্য ফিরিয়ে দেন এটাই আমরা জেনেছি। আজকের দিনে ও পৃথিবীর মহাশক্তিধর রাষ্ট্রের নেতার ব্যবহার আর একজন ক্ষুদ্র দেশের প্রধানের প্রতি সেই ইঙ্গিত বহন করে। মাঝে মাঝে বড় দাদার মতো ছোট ভাইকে ডেকে এনে কান মলে দেওয়ার মতো ভর্ৎসনা করার নিদর্শন ও কিন্তু আছে যদিও সেটা সংখ্যায় নিতান্তই কম।
সম্রাট যার ভাল নাম সেই নীলু গেছে বাবার সঙ্গে চিড়িয়াখানায়। ছোটবেলা থেকেই নীলু ছিল একটু বেশি পরিমাণেই অনুসন্ধিৎসু এবং ছোটখাটো সব বিষয়েই ওর মনোযোগ ছিল নজরে পড়ার মতো। নীলুদের বড় বাড়ির মাঠে ও বাগানে ছিল নানাধরনের গাছগাছড়া এবং ফুলের গাছ। রঙ বেরঙের প্রজাপতিগুলো একফুল থেকে অন্য ফুলে নাচতে নাচতে চলে যায় আর নীলু কিন্তু একদৃষ্টে নজর করে যে প্রজাপতিগুলো একটা ফুলের উপর তার দুটো ডানা সোজা উপর করে ত্রিভুজাকৃতি ধারণ করে আবার মাঝেই ডানা দুটো ছড়িয়ে দিয়ে আস্তে আস্তে নাড়াতে নাড়াতে কখন আরও একটা ফুলের উপর বসার আয়োজন করে। ফড়িংগুলোর বসার ধরণ একটু অন্য রকম, তারা মাঝে মাঝেই তাদের নিম্ন ভাগ উপর থেকে নীচের দিকে বাঁকায় এবং তারপরেই টুক করে অন্য জায়গায় ধাওয়া করে। ছোট থেকেই ওর মৃৎশিল্পের উপর একটা আলাদা ভালবাসা ছিল। বাড়ির কাছে থাকা প্রতিমা শিল্পী বসন্ত এবং কার্তিকের বাড়ি ওকে খুঁজে পাওয়ার একটা জায়গা ছিল। ওর বয়সী ছেলেরা যখন এদিকে ওদিকে ছুটোছুটি করে খেলা করে নীলু তখন একদৃষ্টিতে দেখে মা দূর্গার মূর্তি তৈরি করা বিশেষ করে সিংহ কি করে অসুরকে আক্রমণ করছে সেটা দেখা। মাঝে মাঝেই ওর নিজের আইডিয়াটাও বলতো বসন্ত বা কার্তিকের কাছে। ও মনে মনে নিজেই প্রতিমা গড়তো এবং ওর ছোট ছোট পেলব নরম আঙ্গুলের ছোঁয়ায় গড়ে উঠত মা দূর্গা বা মা কালীর মূর্তি এবং কেউ ধারণায় আনতে পারতো না যে এটা কোন পাকা শিল্পীর সৃষ্টি নয়। নীলুর শৈশবটাই ছিল শিল্পময়। এহেন নীলুর চিড়িয়াখানা দর্শন ওর মনে এক বিশেষ প্রতিফলন ফেলল। কেশরধারী সিংহকে দেখে ওর মনে একটা আলাদা অনুভুতির সঞ্চার হলো। ঐরকম যদি একটা সিংহ ওর বন্ধু হতো, ঐ পশুরাজ সমস্ত পশুর সঙ্গে ওর পরিচয় করিয়ে দিত যে এই নীলু আমার বন্ধু, ও এই বনের মধ্যে যখন ইচ্ছে আসবে যাবে, ওর যেন কোন ক্ষতি কেউ না করে। নীলুর বুকটা দারুণ ফুলে উঠল। সেই সিংহের প্রতি ওর আকর্ষণ যেন কয়েকগুণ বেড়ে গেল। প্রতিভাশালী সৃষ্টিশীল নীলু বড় হয়েছে কিন্তু মনের নিভৃতে সেই সিংহের সঙ্গে বন্ধুত্ব করার ইচ্ছেটা কিন্তু যায়নি। ভাল চাকরি করার সুবাদে একদিন ও চিড়িয়াখানার অধিকর্তার সঙ্গে দেখা করে ওর মনের ইচ্ছার কথা বলল। উনি শুনে তো খুব খুশি। তিনি বললেন যে আপনার মতো অনেকেই যদি এগিয়ে আসেন এই পশুপাখিদের সংরক্ষণের ব্যাপারে তাহলে তো সত্যিই সেটা খুব আনন্দের। আমরা চাই আরও বহু মানুষ এই ব্যাপারে এগিয়ে আসুন। কথাবার্তা সব পাকা, মাসে বার হাজার টাকা লাগবে ওই সম্রাটের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য । নীলুও সম্রাটের জন্য এই টাকার ব্যয়ভার বহন করতে রাজি। এরপর ই হল একটা বিপত্তি। মোটরসাইকেলে আসার সময় একটা কুকুরকে বাঁচাতে গিয়ে সাঙ্ঘাতিক এক দুর্ঘটনার সম্মুখীন হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলো এবং দীর্ঘ সময়ের অপারেশনের পর নীলু বা সম্রাট সুস্থ হয়ে উঠল কিন্তু এর মধ্যেই বেশ কয়েক মাস কেটে গেছে। সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েই ছুটল সেই চিড়িয়াখানার অধিকর্তার সঙ্গে দেখা করতে এবং সেই সিংহটি যার নাম ও সম্রাট তার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সই সাবুদ করতে। চিড়িয়াখানার অধিকর্তা সুদর্শন বাবু নীলুকে দেখেই চিনতে পারলেন এবং বললেন," সম্রাট বাবু, কি হয়েছিল আপনার, সেই গেলেন আর এতদিন পরে এলেন, কি ব্যাপার?" নীলুর কাছে সমস্ত ঘটনা জানার পর তিনি একটু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন," সরি , সম্রাট বাবু, এযাত্রায় আপনার ইচ্ছা পূরণ করতে পারা গেল না কারণ আমাদের সেই সিংহটি যার নাম ও সম্রাট ছিল সে মারা গেছে।" এক রাশ যন্ত্রণা বুক ঠেলে এগিয়ে এল, ছলছলে চোখে কোন রকমে অশক্ত শরীরটাকে টেনে নিয়ে এসে গাড়ির মধ্যে চুপ করে বসে থাকলো। ড্রাইভার তো হতভম্ব। খানিকক্ষণ পরে জিজ্ঞেস করল, " নীলু দা, শরীরটা ঠিক আছে তো?"
নীলু কোন উত্তর না দিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে ইশারা করল স্টার্ট করার জন্য।
Saturday, 13 December 2025
"অথ মার্জার কথা"
মার্জার বা বিড়ালকে অনেক লোক যেমন ভালবাসেন তেমন ই অনেক লোক মনে প্রাণে ঘৃণা করেন। কেউ কেউ আবার বিড়াল দেখলে ভয়ে সিঁটিয়ে যান, যতক্ষণ তাকে না সরানো হবে ততক্ষণ সে ঐ পথ ই মারাবে না।ভয়ানক জ্বালা। কোন কোন মানুষ আছেন যাঁদের পশুপাখিদের প্রতি স্বাভাবিক ভালবাসা আছে এবং সুযোগ পেলেই তাঁরা এদের খাবার দিয়ে ক্ষুন্নিবৃত্তি করেন আবার উল্টোদিকে কেউ কেউ তাদের খাবার তো দেন ই না উপরন্তু অন্য কেউ দিলে রেরে করে তেড়ে আসেন এবং নানাভাবে তাদের সমালোচনা করেন এবং খাবার দিয়ে নোংরা করছেন জায়গাটা বলেও গালমন্দ করতে ছাড়েন না। মাঝে মাঝে সমাজ মাধ্যমে লেখালেখি করে জনমত গড়ে তুলে এমনকি থানা পুলিশ পর্যন্ত ও গড়ায়। এঁদের মধ্যে কয়েকজন এমন নাক উঁচু লোক আছেন যাঁদের এইসব ব্যাপারস্যাপারগুলো beneath dignity বলে মনে হয়। অথচ এঁরাই জনসমক্ষে এমন বেশভূষা করে বেরোন যে লোকজন তাদের দেখেন ই না আবার হঠাৎ চোখ পড়ে গেলেও নিজেরাই অপ্রস্তুত হয়ে যান। কিছু তো বলা যাবেনা, ব্যক্তি স্বাধীনতায় আঘাত বলে কথা। এঁরা মাঝে মাঝেই কথায় এমন খই ফোটান যেন মনে হয় কত ই না রুচিশীল ব্যক্তি এঁরা কিন্তু একটু গভীরে খোঁজাখুঁজি করলেই দেখা যাবে যে এদের অনেকেই চরম অসৎ এবং তাঁদের ঐ খারাপ দিক ঢাকতেই তাঁরা এরকম আচরণ করেন।
এবার মূল বিষয়ে ফিরে আসা যাক। মার্জারকুল কিন্তু ভীষণ সুন্দর। তাদের আচার আচরণে রীতিমতো মুগ্ধ হয়ে যেতে হয়। সবাই একটু ভালবাসা পেতে চায়। একটু আদর করে খেতে দিলে কি আর এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায়? রাস্তা ঘাট নোংরা হয়ে যায় এইরকম সমালোচনার তীর প্রায়শই ছুটে আসে অথচ আমরা যেন ধোয়া তুলসী পাতা। আমাদের দ্বারা কোনরকম দূষণ হচ্ছে না এইরকম গ্যারান্টি কি আমরা দিতে পারি? গাড়িতে যেতে যেতে পথে ঝালমুড়ি ( ভুল হয়ে গেল, এঁরা তো রাস্তায় পাতি লোকের কাছে ঝালমুড়ি কিনলে এঁদের মানসম্ভ্রম মাটিতে মিশে যাবে)/ মঞ্জিনী বা মিও অ্যামোরের চিকেন প্যাটিস বা রোল কিনে খাওয়া শেষে প্যাকেটটা রাস্তায় ফেলে দিয়ে নোংরা করেন না? খুব কম লোকই আছেন যাঁরা বাক্সটিকে সযত্নে রেখে দিয়ে নিকটবর্তী কোন ডাস্টবিনে ফেলে দেন। এঁদের কথা তবু একটু হজম করা যায় কিন্তু বেশিরভাগ লোকই সমালোচনা করতে হয় ভেবে করেন। তাঁদের কাছে পশুপাখিদের প্রতি ভালবাসা দেখানো একটা অপরাধ বা স্রেফ ন্যাকামো বলে মনে হয়।
আমি সেই ন্যাকার দলের একজন। কথায় আছে ন্যাড়া বেলতলায় একবারই যায় কিন্তু আমি ন্যাড়ার ও অধম। আমি দু দুবার কুকুরের কামড় খেয়ে চোদ্দটা করে আটাশটা ইঞ্জেকশন নেওয়ার পরেও আমার হুঁশ হয়নি এবং এখনও আমি মনেপ্রাণে পশুপাখিদের ভালবাসি এবং সুযোগ পেলেই একটু আদিখ্যেতা দেখাই। এতে প্রচুর গনগনানি শুনতে হয় কিন্তু আমি তখন কালা ও বোবা। ছাদ সারানোর কাজ সবে শেষ করে মিস্ত্রিরা চাবি দিয়ে গেছে আর আমিও কেমন কাজটা করলো দেখতে গেছি। কখন পিছন পিছন একটা সাদা বিড়াল আমার সঙ্গ নিয়ে পিছু পিছু দেখতে এসেছে খেয়াল করিনি। আমি এদিক সেদিক দেখছি আর মোবাইলে ফটো তুলছি। হঠাৎ কা কা করে অনেকগুলো কাকের আওয়াজে সচকিত হয়ে ভাবছি কোন কাকের বাসা টাসা রয়েছে আর আমাকে দেখে চেঁচামেচি শুরু করেছে। কাকের ঠোকর যাতে না খেতে হয় এইভেবে যেই না পিছন ফিরে চলে আসার চেষ্টা করছি, দেখি সেই সুন্দরী মার্জার আমার পিছনে আর তাকে দেখেই বায়সদের এত আর্তনাদ। তাকে নামানোর চেষ্টা অনেক ক্ষণ ধরে করার পরে বিফল হয়ে ফিরে এলাম। তিনি তো এলেন ই না উপরন্তু একটু জেদাজেদি করাতে তিনি পাশের বাড়ির ছাদে আশ্রয় নিলেন এবং ফিরে এলাম। ছাদের দরজা খোলা রাখা যায়না বলে বন্ধ করে এলাম কিন্তু মনটা খচখচ করছে। একজন খুব কাছের প্রতিবেশীকে ফোন করে জানতে পারলাম যে তিনি নেই এবং তাঁর নিদান অনুযায়ী দরজা খুলে রেখেই খানিকক্ষণ এদিক ওদিক পায়চারি করলাম কিন্তু তাঁকে আর দেখা গেল না। ঠাণ্ডা টা বেশ বাড়ছে, নাক দিয়ে জল পড়াতে আরও বেশী মনে হচ্ছে, খানিকক্ষণ থাকার পরে আবার বন্ধ করে চলে এলাম। মনটা একটা ভীষণ অপরাধ বোধে ভুগছে যে এই ঠাণ্ডায় বিড়ালটা না কিছু খেতে পাবে না কোন আশ্রয় পাবে জলের ট্যাঙ্কের নীচে ছাড়া। ফের রাত দশটা নাগাদ গিয়ে আরো একবার টর্চ জ্বেলে খোঁজ করেও কিছু লাভ হলোনা মাঝখান থেকে আমার নাক দিয়ে জল পড়ার মাত্রা বেড়ে গেল। রাতে ঠিক ঘুম ও হলোনা, সকালে উঠেই আরো একবার দেখতে গেলাম কিন্তু না, এবার ও দেখা পেলাম না। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। একটা অপরাধবোধ মনটাকে কুড়ে কুড়ে খেতে লাগল কিন্তু কিছু করার ও নেই বলে মনটাকে সান্ত্বনা দিলাম।
এরমধ্যেই নয় নয় করে চারটে দিন কেটে গেছে। ব্যালকনিতে বসে খবরের কাগজ পড়ছি। হঠাৎ ই চোখ পড়ল সামনে পার্কিং করা বড় কালো গাড়িটার দিকে। একজন লোক নীল জ্যাকেট পড়ে কারও জন্য অপেক্ষা করছে। একটু বাদ বাদ ই ঘড়িটা দেখছে আর মোবাইলে কাউকে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে। হঠাৎ করেই সেদিনের ঐ সাদা বিড়ালটার মতো একটা বিড়াল লোকটির দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে। মুখের দিকে চেয়ে অস্ফূট স্বরে ম্যাও ম্যাও করছে। আমার মনে হলো সেদিনের বিড়ালটাই এবং বেশ খানিকটা আশ্বস্ত বোধ করলাম যে অন্তত আমার জন্য বিড়ালটা মারা যায়নি। মনটা বেশ হালকা লাগছে। বিড়ালটা অনেকক্ষণ দৃষ্টি আকর্ষণ করার পর লেজটাকে উঠিয়ে লোকটার পায়ের কাছে নিজের গা টা ঘষতে থাকলো। তারপর তড়াক করে লাফ দিয়ে গাড়ির বনেটে উঠে পড়লো। এইবার বেশ স্পষ্ট দেখতে পেলাম যে হ্যাঁ, ইনিই তিনি। লোকটা কথা বলার ফাঁকে ফাঁকেই বিড়ালটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো আর বিড়ালটাও বেশ আদর খেতে লাগলো। বুঝতে অসুবিধা হলোনা যে এটা কারো পোষা বিড়াল। আরও একটা জিনিস ভেবে খুব ভাল লাগলো যে হয়তো এখনও কিছু পাগল রয়েছে যাদের জন্য পৃথিবীটা এখনো পর্যন্ত নীরস হয়ে যায় নি।
Thursday, 13 November 2025
তবে কেমন হতো?
চারিদিকে আলোড়ন পড়ে গেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে, এবার সাধারণ মানুষের বুদ্ধি শুদ্ধি আর লাগবেনা, স্কুল কলেজ আর যেতে হবেনা, বাড়িতে বসেই রোবটের কাছে সব ঠিকঠাক উত্তর পেয়ে যাবে। অভিভাবকরাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচবেন বাচ্চাদের স্কুলে ভর্তি নিয়ে চিন্তা করার দিন শেষ। স্কুল, কলেজের আর দরকার নেই, শিক্ষক শিক্ষিকার দরকার নেই, খরচাপাতি করে একটা বেশ ভাল জাতের রোবট কিনলেই সব হ্যাপা গেল মিটে। বাচ্চাদের স্কুলের বাসের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না, স্কুল ই নেই তো কিসের বাস। বাড়িতে বাচ্চাদের পড়াতে বসানোর ঝামেলা নেই, টাকা রোজগার করো আর মস্তি করো। কিন্তু চাকরিও তো সহজে মিলবে না কারণ সেই রোবটের জয়জয়কার। কোম্পানিগুলো রোবট কিনেই লোকজনদের হটাবে। জিন্দাবাদ ধ্বনিতে আর কান ফাটবে না, আঙুলে গোনা দুচারটে লোক যারা থাকবে তারাও সবসময়ই কি হয় কি হয় ভেবে চিন্তিত থাকবে, বসের কথা না শুনলেই দাঁড় করানো রোবটের দিকে আঙুল দেখাবে। ভারী ঝামেলা হলো , তাই না? লেখকরা আর নাটক লিখবেন না, প্রেমের গল্প --- সে তো কবে শেষ? প্রেম করার মতো সময় কোথায়? বেশ কয়েক বছর আগেও লেকটা বেশ খোলামেলা ছিল যেটা এখন ঘেরাটোপে বন্দী হয়েছে। কিছুদিন পর হয়তো লেকের হাওয়া খেতে গেলেও ট্যাঁক থেকে পয়সা বের করতে হবে। ধরা যাক, লেকের চারপাশে লোহার রেলিং নেই এবং সন্ধ্যে হয়ে যাবার পরেও প্রেমিক প্রেমিকার পাশে বসে থাকাটা ও পুলিশ বেশ সহানুভূতির চোখেই দেখে। একদিকে একটা ছেলে ও মেয়ে এবং তার থেকে আর একটু দূরেই আরেকটি মেয়েও তার একটি মানুষ রূপী রোবট বন্ধু ( যাকে মেয়েটি সত্যি সত্যিই মানুষ বলে ভেবেছে) বসে গল্প করছে। প্রথম জুটি লেকের জলে পূর্ণিমার চাঁদের গ্রহণ লাগার রূপটা দেখছে। ধীরে ধীরে চাঁদটা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে আসতে দেখে পাশে বসে থাকা বন্ধুকে বলে উঠল,
" দেখ, দেখ চাঁদটাকে কি সুন্দর লাগছে , তাই না?" ছেলেটি মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে পাশে বসে থাকা বান্ধবী ও জলে চাঁদের প্রতিবিম্বের প্রতি। অস্ফূট স্বরে বলে উঠল হুঁ। অদূরে বসে থাকা দ্বিতীয় যুগলের মেয়েটিও বলে উঠল এক ই কথা কিন্তু উত্তর পেল হ্যাঁ, আজ চন্দ্রগ্রহণ ,আজ পৃথিবী সূর্য ও চাঁদের মধ্যে চলে আসায় এ ছায়াটা পড়েছে, এতে আশ্চর্য হবার কি আছে? মেয়েটা বলে উঠল,
"হ্যাঁ, সে তো জানি, কিন্তু কি সুন্দর লাগছে, তাই না?" উত্তর এল, যতখানি ছায়া পড়েছে, ততটাই জলে দেখা যাচ্ছে, তার বেশীও নয়, কম ও নয়। মেয়েটার মনটা বিরক্তিতে ভরে গেল। এদিকে প্রথম যুগলের প্রেম বেশ ঘনিয়ে উঠেছে, একে অপরের প্রতি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে কিন্তু দ্বিতীয় ক্ষেত্রে মেয়েটির মন তিক্ততায় ভরে গেছে, বলল এবার ওঠা যাক।
মনে পড়ে গেল স্কুলে বিটি পড়তে আসা প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস নেওয়ার একটা ঘটনা। একজন স্যার এসেছেন একটা ক্রাচ নিয়ে বাংলার ক্লাস নিতে। পড়াবেন কবি যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের "হাট" কবিতাটি। পিছনে বসে আছেন বিটি কলেজের প্রিন্সিপাল এবং এক্সটারনাল একজামিনার। স্যার কবিতাটি পড়াতে পড়াতে যেন এক অন্য জগতে চলে গিয়েছিলেন। পিছনে বসে থাকা দুজন একজামিনার সবার অলক্ষ্যে কখন চলে গেছেন কেউ জানেনা আর আমরাও সেই নাম না জানা স্যারের পড়ানোয় একদম মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। সমস্ত স্যাররাই যদি এইভাবে পড়াতেন তাহলে পড়াশোনা করার ভীতিতে এত ছেলেমেয়েরা স্কুল ড্রপ আউট হতো না। এখন সেই স্যারের জায়গায় ধরা যাক একজন রোবট ঐ কবিতাটি পড়াচ্ছেন। কি রকম পরিস্থিতি হবে একটু কল্পনা করা যাক।
দূরে দূরে গ্রাম দশ বারোখানি মাঝে একখানি হাট,
সন্ধ্যায় সেথা জ্বলে না প্রদীপ, প্রভাতে পড়েনা ঝাঁট।
রোবট স্যার বলবেন, প্রত্যেক গ্রামে তো এক একটা হাট বসতে পারে না কারণ কটাই বা লোক থাকে একটা গ্রামে। যদি ক্রেতার সংখ্যা বেশি না হয় তবে হাট বসবে কেন? আর সেই কারণেই দশ বারোটা গ্রামের মাঝেই একটা হাট বসে। বেচাকেনার শেষে লোকজন চলে গেলে কে ই বা সন্ধ্যে প্রদীপ জ্বালবে আর কে ই বা সকালে ঝাঁট দেবে? সম্পূর্ণ সত্যি কথা কিন্তু মনটা কি ভরে উঠবে? কবিতা তো শুধু কথাবার্তার কচকচানি নয়, এর মধ্যে আছে ছন্দ, ভাব আর এটার অভাব ঘটলে সেটা কবিতা হবেনা, হবে শব্দবন্ধের প্রতিফলন। জানিনা ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় ভাব ভালবাসার ও উন্মেষ হবে কিনা। যদি এটাও হয়ে যায় তাহলে আর মানুষের দরকার কি? মানুষ থাকলেই তার খাওয়া পড়া, শিক্ষা দীক্ষা, রোগভোগের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল কিছুই দরকার হবেনা। মন দেওয়া নেওয়ার কোন ব্যাপার নেই। বোমা ফাটিয়ে নিশ্চিহ্ন করার দরকার নেই, দলাদলির দরকার নেই, রাজনৈতিক নেতাদের দরকার নেই, শুধু থাকবে হৃদয়হীন রোবট আর দেশ চলবে ড্যাং ড্যাং করে।
কেমন হবে তাহলে?
Subscribe to:
Comments (Atom)