Monday, 13 April 2026

"কে আমি?" (১)

এই বিশাল পৃথিবীর সমস্ত দেশে( ছোট বড় সব মিলিয়ে ১৯৫ ) প্রায় ৮৩০ কোটি লোক আছে। তাদের সবার ই সাধারণ মানুষের মতো দুটো চোখ, দুটো কান , দুটো করে হাত,পা, একটা মাথা ও একটা নাক কিন্তু দৈহিক গঠন বা গায়ের রঙ ভিন্ন বা দেখতেও ভিন্ন এবং খাদ্যাভ্যাস ও ভিন্ন এবং সবাই এক একজন "ভিন্ন আমি"। কিছু কিছু ক্ষেত্রে একজনের সঙ্গে আরও একজনের মিল হতে পারে কিন্তু সম্পূর্ণ মিল কখনোই হয়না। দুটো যমজ ভাই বা বোনের ক্ষেত্রেও অনেক অমিল ধরা পড়ে, সুতরাং সব মানুষকেই একটি গোত্রে ফেলা ভীষণ কঠিন, এককথায় অসম্ভব। আমার গণ্ডিও খুব সীমিত এবং চারপাশে যে ধরনের লোকের সংস্পর্শে এসেছি, তাদের কথাই তুলে ধরার একটি সামান্য প্রয়াস। ৮৩০কোটি মানুষের মধ্যে আমিও একজন কিন্তু পৃথিবীতে এমন কোন মানুষ নেই যিনি আত্মানুসন্ধান করার পরেও নিজেকে সম্পূর্ণ জানতে পেরেছেন। আমরা অন্য সবার সম্বন্ধে হাজারটা কথা বলতে পারি কিন্তু নিজের সম্বন্ধে বলতে গেলেই গুণগুলো আরো ফলাও করে বলি এবং দোষগুলো চোখেই পড়েনা। অন্যজন আমার সম্বন্ধে খুব পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে সমালোচনা করতে পারে কিন্তু সেও তার নিজের সম্পর্কে বলতে গেলে আমার ই মতন কি আরও একটু বেশি বিশ্লেষক। আপ্তবাক্য হলো "আপনাকে এই জানা আমার ফুরাবে না"। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ও বলেন 
"জীবনে জীবনে যোগ করা 
ব্যর্থ হয়নি সে গানের পসরা
আমার কবিতা জানি আমি
গেলেও বিচিত্র পথে হয় নাই সে সর্বত্র গামী।"

প্রথমেই আসব কয়েকজন মহান শিক্ষকের কথা যাঁরা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন ছাত্র তথা দেশ গড়ার কাজে। কেউ অনেক বড় সরকারী পদ উপেক্ষা করে শিক্ষকতা  পেশা বেছে নিয়েছেন এবং শিক্ষক হিসেবে যাঁদের অবদান অনস্বীকার্য। তাঁদের সঙ্গে দেখা হবার সুযোগ না ঘটলেও তাঁদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি এবং আমার দেখা কিছু মাস্টার মশাইদের কথাই বলছি। প্রথমেই বলব আমাদের স্কুলের অঙ্কের মাস্টার মশাই কাবুলি বাবু বা শ্রী রণেন্দ্রনাথ বাগচির কথা। ওঁকে কখনো স্কুলের মেন বিল্ডিং এর টিচার্স রুমে বসতে দেখিনি, উনি বসতেন স্কুলের নতুন বিল্ডিং এ সায়েন্স ব্লকের একতলায় ছোট্ট একটি ঘরে। ছিলনা কোন পাখা, গরমকালে তালপাতার হাতপাখাই ছিল সম্বল। সামনে টেবিলে রাখা ডাঁই করা ছাত্রদের খাতা যেগুলো হোম টাস্ক দেওয়া হতো। অফ পিরিয়ডে বা টিফিনের সময় চা খেতে খেতে ঝড়ের গতিতে দেখতেন খাতা কিন্তু একদম নির্ভুল। একটা ছোট্ট ঘটনার কথা উল্লেখ না করলেই নয়। তখন ফাউন্টেন পেনে লেখা হতো , অঙ্ক করার মাঝে যোগ চিহ্ন দিতে হবে কিন্তু মাইনাস চিহ্ন দেওয়ার জন্য ওপর থেকে ভার্টিক্যাল লাইন দিয়ে প্লাস চিহ্ন করার সময় কালি শেষ এবং একটা আঁচড় পড়লেও কালির দাগ আর পড়লো না। পাশের বন্ধুর কাছ থেকে একটু কালি নিয়ে অঙ্ক শুরু করলেও সেই জায়গাটায় আর কালি দিয়ে দাগানো হলোনা এবং খাতা চেক করার সময় স্যারের নজর সেটা এড়ালো না। এর থেকেই বোঝা যায় তিনি যেন চোখ দিয়ে এক্সরে করতেন এবং খুঁটিনাটি সব কিছুই তিনি দেখতেন। স্যারকে কখনো গল্প করতে দেখিনি এবং তাঁর ভারী শরীর নিয়ে ক্লাসে চেয়ারে বসতেও কখনো দেখিনি। যে কোন চ্যাপ্টারের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত অঙ্ক তিনি করতেন এবং হোম টাস্ক দিয়ে সমস্ত চ্যাপ্টার আড়াই থেকে তিন বার শেষ করতেন যেখানে অন্য স্কুলে সব চ্যাপ্টারের সব অঙ্ক ই করা হতো না। কখনো কখনো মেন বিল্ডিং থেকে ক্লাস নিয়ে নতুন বিল্ডিংয়ে ক্লাস নিতে আসছেন , ছাত্ররা ব্যালকনিতে রোদ পোহাচ্ছে, হঠাৎ একটা ছেলে ছুটতে ছুটতে এসে বললো কবুলিবাবু আসছেন আর মূহুর্তেই ব্যালকনি ফাঁকা এবং যে  যার নিজের জায়গায় বসে স্যারের আসার অপেক্ষায়। দুর্দান্ত পারসোন্যালিটি, মোটা কালো ফ্রেমের চশমায় মোটা মোটা চোখ মাথা থেকে পা পর্যন্ত যখন দেখতেন তখন সেই ছাত্রের ই শুধু নয় সমস্ত ছাত্রদের অবস্থা খারাপ। কিন্তু অসম্ভব ছাত্রদরদী এই কাবুলি বাবুর ভাগ্যে কিন্তু কোন সরকারী শিরোপা জোটেনি কিন্তু তিনি তাঁর অগণিত ছাত্রের হ‌দয়ে আজ ও সমুজ্জল।
আরও অনেক মাস্টার মশাইয়ের সান্নিধ্যে এসেছি যাঁদের মধ্যে একজনের নাম অবশ্যই উল্লেখ করতে হয় এবং তিনি হলেন কৃষ্ণনাথ কলেজের কেমিস্ট্রি বিভাগের প্রধান এবং পরবর্তীকালে ঐ কলেজের প্রিন্সিপ্যাল শ্রী ধীরেন্দ্রনারায়ন রায় । ক্লাসে পড়াতে পড়াতে একটা অন্য জগতে বিচরণ খুব কম স্যারের মধ্যেই দেখা যায়। পুরো বিজ্ঞানটাই যেন তাঁর চোখের সামনে ভেসে ওঠে এবং ওঁর ক্লাস করাটা এক অসাধারণ অনুভূতি। এমন ছাত্র দরদী মাস্টার মশাইয়ের সান্নিধ্যে আসা একটা ভাগ্যের ব্যাপার।

অনেক খবর কানে আসে যেখানে একসময়ের ছাত্র বা ছাত্রী উন্নতির শিখরে উঠেও তাদের শিক্ষক বা শিক্ষিকার অবদান ভোলে না এবং নানারকম বাধা বিঘ্ন অতিক্রম করে তাঁদের অবদানের স্বীকৃতি জানাতে আসেন। এইখানেই সেই শিক্ষক বা শিক্ষিকার অবদান। তাঁরা তাঁদের পেশাগত প্রক্রিয়ায় ছাত্রছাত্রীদের গড়ে তোলেন কিন্তু কেউ কেউ তা মনে রাখে আবার কেউ কেউ তা বেমালুম ভুলে যায়।এক ই শিক্ষা কাউকে উন্নতির শিখরে তোলে আবার যারা তা গ্রহণ করতে অক্ষম তারা সাধারণ হয়ে থাকে বা বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যায়।
এইরকম অনেক শিক্ষক শিক্ষিকা রয়েছেন দেশ বিদেশে আনাচে কানাচে যাঁরা তাঁদের শিক্ষায় বহু ছাত্র ছাত্রীদের আলোকিত করেছেন এবং প্রকৃত মানুষ হতে সাহায্য করেছেন যাঁদের কথা আমরা জানিনা। সমস্ত শিক্ষক শিক্ষিকাদের প্রতি সশ্রদ্ধ নমস্কার জানাই।
এঁরা সবাই এক একজন "আমি"এবং তাঁরা নিজেদের সম্বন্ধে সম্পূর্ণ না জানলেও আমরা যারা তাঁদের সংস্পর্শে এসেছি তারা এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে তাঁদের সম্মান জানাই।

"কে আমি" (২)

ভোটের দামামা বেজে উঠেছে, চারিদিকে সাজো সাজো রব। সবাই খুব ব্যস্ত,এমনকি পাড়ার সবচেয়ে অকিঞ্চিৎকর ছেলে পটাই ও। সারাদিন কোন কাজ কর্ম করেনা, এখানে সেখানে বেগার খেটে বেড়ায় , বিনিময়ে কেউ একটু আদর করে মিষ্টি কথা বললেই ও গদগদ। বাড়িতেও তার উপস্থিতি কেউ কখনো নজর করেও দেখেনা। বাবা কবে যে ছিল তা মনেও পড়েনা, জ্ঞান হওয়া অবধি মাকে আর তার থেকে বড় একটা দাদাকে ই দেখেছে। তিন জনের সংসার থেকে বেড়ে ইদানিং চার হয়েছে, তার দাদা চায়ের দোকানের কাজ ছেড়ে একটু প্রোমোশন হয়ে ভাতের হোটেলে কাজ পেয়েছে এবং তার জীবন সঙ্গী জোগাড় করে নিয়েছে এবং তারপরেই শুরু হয়েছে বাড়িতে রোজ গনগনানি। এতদিন মা লোকের বাড়িতে কাজ করে যা পেত তা দিয়ে আর দাদার টাকা দিয়ে কোন রকমে টানাটানি করে চলে যেত। কিন্তু বাড়িতে দ্বিতীয় মহিলা আসার পরেই শুরু হয়েছে ছোট খাটো নানা বিষয়ে, শান্তি হয়েছে বাড়ন্ত। পটাই তার নিজের মতো করেই চলতো, এখানে সেখানে ঘুরে ফিরে বাড়িতে এসে কলাই করা থালায় খানিকটা তরকারি বা ডালের একটু ছোঁয়ায় বদলানো রঙের ভাতে তার ক্ষুন্নিবৃত্তি হতো। ঘুরে ঘুরে এর তার সঙ্গে হাত লাগিয়ে দুচার টাকা যে রোজগার করতো না তা নয় কিন্তু বাড়ি ঢোকার আগে তার খুব অল্প অংশ ই বেঁচে থাকতো যেটা তার মায়ের হাতে দিয়ে দিত।  ওর নিজের কোন কাজ ছিলনা, যে যা বলতো পটাই তাই করে দিত এবং বিনিময়ে পটাই এর কপালে কিছু জুটত। হয়তো কেউ সব্জি বিক্রি করবে বলে মোটর চালিত ভ্যান থেকে একটা বড়সড় বস্তা নামাল, তার সবজিগুলো সাজিয়ে গুছিয়ে আলাদা করে দিল,  খদ্দের এলে তার পছন্দের জিনিসগুলো দিয়ে সাহায্য করলো, বিনিময়ে পড়ে থাকা কিছু সবজি পাতি তার ভাগ্যে জুটলো বা সবটাই বিক্রি হয়ে গেলে দুচার টাকা সে পেলো কিন্তু কোন জায়গায় তার বাঁধা কাজ জোটেনা। গোদের উপর বিষফোঁড়া হলো যখন তার দাদার হাঁড়ি আলাদা হলো। মা তো আথান্তরে, কি করে সংসার চলবে সেই ভেবেই কূলকিনারা পাচ্ছেনা। তার নিজের ও বয়স হয়েছে, আগের মতো পাঁচ বাড়িতে কাজ করতে পারেনা আর ছোট ছেলে পটাইকে তো কেউ ধর্তব্যের মধ্যেই আনে না। হাজার হলেও ছেলে তো, মায়ের মন তো মানতে চায় না। আর দিন দিন বড় হচ্ছে, তার খাওয়ার জোগানটাও সেই রকমই বাড়ছে কিন্তু মায়ের কাজের বাড়ি কম হওয়ায় টাকার সঙ্গে সঙ্গে টুকটাক খেয়ে যে নিজের পেটটা ভরে যেত সেখানেও পড়েছে টান, এ যেন শাঁখের করাত, টাকাও কমেছে আবার নিজের পেটের সঙ্গে বেড়ে ওঠা পটাইয়ের ও বাড়তি খিদে। কিন্তু ভগবান যেন মুখ তুলে চেয়েছেন এবার।
 ভোটের কাজের জন্য সব দলেরই লোক দরকার। লোক পাওয়া খুব কঠিন নয় কিন্তু বিশ্বাসী ও কাজের লোক খুব কম। আর নেতাদের দরকার বোকাসোকা কর্মক্ষম লোকের। আর এই সময়েই চোখ পড়ল পটাইএর দিকে আর তাও আবার শাসকদলের নেতার। এখন সবাই নেতা, কুচোকাচা থেকে শুরু করে বড় মাপের কিন্তু নেতারা খুব বড় মাপের দাদার উপর ভরসা করতে পারেন না কারণ অতি অল্পসময়েই এরা তার চেয়ারের দাবিদার হতে পারে । এইসব ভেবে এই পটাই জাতীয় হঠাৎই বেড়ে ওঠা শক্তপোক্ত  ছেলেরাই তার সম্পদ। এদের সেরকম উচ্চাশা নেই এবং সামান্য কিছু অর্থের বিনিময়ে এদের বিশ্বস্ততা আদায় করে নেওয়া যায় আর পটাই এর ভাগ্য ও সেইভাবেই খুলে গেল। কিছুদিন আগে অবধি ," এই পটাই এটা নিয়ে আয় বা ওটা করে দে" এখন কিছুদিন ধরেই নিশ্চুপ। পটাই এখন নেতার বডিগার্ডের মর্যাদা পেয়ে গেছে। নেতার সংস্পর্শে থেকে বেশভূষা,চলন বলনে কেমন একটা কেতাদূরস্ত হয়ে গেছে। পটাই এখন সবসময় বাড়ি ফিরতে পারেনা। মা ভাতের থালা ঢাকা দিয়ে রাখলেও বেশিরভাগ দিনই তা কুকুর বিড়ালের পেটে যায় কারণ তাদের  বাড়িতে  তখন ও ফ্রিজ আসেনি যে রেখে দেবে। আর তাছাড়া নেতার দৌলতে বিরিয়ানি, মাংস দিয়েই রোজ পেট ভরছে। মায়ের কথা মনে হলেও নেতা দাদার অনুমতি ছাড়া এক পা ও এদিক ওদিক হবার জো নেই। রাতে দুচার পাত্র বিদেশি তরল ও জুটছে, মোটকথা একটা নিষ্পাপ ছেলেকে জাহান্নামের রাস্তায় টেনে নিয়ে যাওয়া আর কি। দাদা, বৌদির কথা মনে পড়লেই ভিতরটা যেন ঘেন্নায় ভরে যায় কিন্তু মা, মায়ের কথা মনে পড়লেই দাদার হাজার কাজের মধ্যেও ভিজে ওঠা চোখ দুটো রুমাল দিয়ে মুছে নেয়। পাঁচ বছর আগের ভোটে পটাই ততটা শক্তপোক্ত হয়ে ওঠেনি কিন্তু এবারের ভোটে নেতা দাদার কাছাকাছি থাকায় ওর গুরুত্ব বেড়েছে, সাইলেন্সার খোলা একটা মোটর সাইকেল জুটেছে যাতে তার উপস্থিতি সবার নজরে আসে। এই সুযোগে যতটা পারো কামিয়ে নাও আর একবার ভাল পয়সার মালিক হয়ে গেলে কোথা থেকে যে টাকার স্রোত আসতে থাকবে তা জানা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। অসদুপায়ে অর্জিত অর্থের দৌলতে এমন ই এক জায়গায় পৌঁছে যায় যে পরবর্তী জীবনে ভালোমানুষের একটা জোব্বা দিয়ে নিজেকে ঢেকে ফেলা যায়। পটাই থেকে পটাই দা বা পটাই বাবু এবং যে কোন ছোটখাটো বিবাদে পটাই দা বা ছোড়দার কথাই শেষ কথা। দুপক্ষের কাছেই টাকা নিয়ে মোটামুটি একটা আপসরফা সে করে দেয়। এসব করে এবং শাসকদলের নেতাদের ছত্রছায়ায় থাকার সুবাদে পুলিশের কাছেও সে বিশেষ সম্মান লাভ করে। তবে নীচুতলার সব পুলিশ যে ওকে পছন্দ করে তা নয় কিন্তু ওপরের মহলে ওর যোগাযোগ থাকায় কোন বাজে জায়গায় পোস্টিং হবে এই ভয়ে ওরা যেমন ঘাঁটায় না তেমন সেরকম সুযোগ পেলে ওকে মাটিতে মিশিয়ে দিতেও ওরা পিছপা হবেনা। নেতা ও পুলিশের এই মেলামেশার ফলে সাধারণ মানুষের প্রাণ ওষ্ঠাগত। যে পটাই একদিন সকলের কাছে হেলাফেলার মানুষ ছিল আজ ভোটের আগমনে সে একজন কেউকেটা। আজ সে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তার নেতা দাদাকে ভোট দেবার জন্য ঠাণ্ডা চোখে হুমকি দেয়। যদি দাদা জেতে তাহলে তো সোনায় সোহাগা, নাহলেও কোন ক্ষতি নেই  কারণ ইতিমধ্যেই সে ছোড়দা বনে গেছে এবং নতুন দাদা এসেও হয়তো তাকেই তোষামোদ করবে এবং আরও ক্ষমতার লোভ দেখাবে।
যেহেতু এরা স্কুলের গণ্ডি ও পেরোয়নি সুতরাং অন্তর্দর্শনের আশা করাই বৃথা তবুও সে একজন মানুষ এবং কখনও কোন এক বিষণ্ণ মূহুর্তে নিজের পূর্ব কথা ভাবতে যদি চেষ্টা করে তবে কতদূর সফল হবে তাতে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।

Wednesday, 1 April 2026

"উদুপি"

উদুপি কর্ণাটকের পশ্চিম প্রান্তে উপকূলবর্তী একটি ছোট শহর যা শ্রীকৃষ্ণ মঠ এবং  অন্যান্য অনেক হিন্দু মন্দিরের উপস্থিতির জন্য বিখ্যাত। শ্রীকৃষ্ণ মঠ ত্রয়োদশ শতাব্দীতে শ্রীমাধবাচার্য্য দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই প্রতিষ্ঠার পিছনে একটি সুন্দর পৌরাণিক কাহিনী প্রচলিত আছে যা হলো এইরকম। একদিন একটি জাহাজ সমুদ্রে ঝড়ের মধ্যে পড়ে এবং শ্রী মাধবাচার্য্য তাঁর ঐশ্বরিক যোগবলে সেই সামুদ্রিক ঝড়কে স্তিমিত করেন এবং জাহাজের ক্যাপ্টেন তাঁকে সেই জাহাজের যে কোন জিনিস উপহার হিসেবে দিতে চান কিন্তু শ্রী মাধবাচার্য্যজী( যিনি দ্বৈতবাদের প্রবক্তা) কর্দমাক্ত একটি অত্যন্ত ভারী জিনিস পছন্দ করেন এবং তা পরিষ্কার করার পরে শ্রীকৃষ্ণের ঐ মূর্তিটি তিনি পান এবং পরে তিনি ঐমঠের প্রতিষ্ঠা করেন। এই উদুপি শহরটি আবার তার নিরামিষ খাবারের জন্য খুব বিখ্যাত। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এবং বিদেশে ও এই উদুপির খাবার বিশেষ ভাবে সমাদৃত।শহর কলকাতাও এর ব্যতিক্রম নয়। লেক মার্কেট এবং দেশপ্রিয় পার্ক অঞ্চল কিছুদিন আগে পর্যন্তও দক্ষিণ ভারতীয়দের দখলেই ছিল এবং এখনও দক্ষিণ ভারতের কোন লোকজন এলেই তাঁরা এই অঞ্চলের হোটেলে এসে ওঠেন কারণ তাঁরা এখানকার খাবার ও দক্ষিণ ভারতের সংস্কৃতির সঙ্গে একাত্ম বোধ করেন যদিও ইদানিং কালে অনেক তামিল ও তেলেগু মানুষজন গড়িয়া সংলগ্ন এলাকায় নিজেদের বাড়ি অথবা ফ্ল্যাট কিনে থাকছেন। এতদসত্ত্বেও অনেক তামিল, তেলুগু,কন্নড় ও কেরালাবাসীরা এখনও এই অঞ্চলেই আছেন এবং তাঁদের আনুকুল্যে দক্ষিণ ভারতীয় রেস্তোরাঁয় অবিরত ভিড়। হোটেল স্বাগত,কোমলাভিলা, তারা মহল এবং উদুপি মধ্যবিত্তের নাগালের মধ্যেই রয়েছে এবং দক্ষিণ ভারতের এই খাবার বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। উদুপি হোটেলে থাকার ব্যবস্থা নেই কিন্তু খাবারের নিরিখে এটাই বোধহয় সর্বোত্তম। 

অনেকদিন মুম্বাই শহরে কাটিয়ে কলকাতায় ফিরছি। সন্ধেবেলায় ফ্লাইট ল্যাণ্ড করেছে কিন্তু লাগেজ পেতে একটু দেরি হওয়ায় অন্ধকার বেশ ঘনিয়ে এল। উবের ট্যাক্সিতে বাড়ি ফিরতে ফিরতে প্রায় একঘন্টার উপর লেগে গেল। মাঝে একটু আধটু জায়গা ছাড়া বেশিরভাগ জায়গাই অন্ধকারে ডুবে আছে বিশেষত মুম্বাইএর মতো আলো ঝলমলে শহর থেকে ফিরে মনে হচ্ছে যেন প্রেতপুরীতে প্রবেশ করছি। তবুতো এটাই আমার নিজের শহর, রিটায়ার করার আগে অন্য অনেক ঝাঁ চকচকে আলো ঝলমলে শহরে থাকার সুযোগ ও ছিল কিন্তু তাকে বিশেষ পাত্তা না দিয়ে আমার প্রিয় শহরেই থাকা শ্রেয় মনে করেছি এবং আত্মীয় স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে থাকাই বেছে নিয়েছি। দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকা এবং কাজে ডুবে থাকার সুবাদে আমার পুরনো শহর কলকাতা টা কেমন যেন বদলে গেছে এবং আজকের কলকাতা আমার দেখা কলকাতা থেকে অনেক বদলে গেছে। রাজনীতি এই শহরের এবং সমস্ত পশ্চিমবঙ্গকে কেমন যেন এক অজানা খাদের দিকে নিয়ে গেছে। অন্যান্য প্রদেশের তুলনায় আমরা অনেক পিছনের দিকে হেঁটে গিয়েছি। রাজনীতি সমস্ত পৃথিবীতেই আছে কিন্তু ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে আমরা প্রগতির পথে এগোতে পারিনি। অবনমন অনেক আগেই শুরু হয়েছিল কিন্তু এখন যেন তলানিতে ঠেকেছে। সমস্ত দেশেই ভোট হয় কিন্তু এখানে ভোট পরবর্তী হিংসা এক অভূতপূর্ব ব্যাপার। কত সংসার ভেসে যায় কিন্তু কোন হেলদোল নেই। তবুও কলকাতার প্রেমে গদগদ, এখানে ওখানে খুঁজি আমার সেই পুরনো চেনা শহর কলকাতাকে। আড্ডা মারার জায়গা ছিল গড়িয়াহাট মোড়। তখন ফ্লাই ওভার ছিলনা, মাঝখানে ছিল ট্রামলাইন, ঘটাংঘটাং শব্দ করে চলত ট্রাম। পিছনে সেকেন্ড ক্লাসের জানলার বাইরে থাকা অ্যান্টিনা মাঝে মাঝেই ওভারহেড তার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত এবং কন্ডাক্টার নীচে নেমে সেই অ্যান্টিনাকে যথাযথভাবে সংযোগ ঘটিয়ে ট্রামকে সচল করতে সাহায্য করতো। অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরা বাবা মা বা চেনা পরিচিতদের চোখ এড়িয়ে যশোদা ভবনের নীচে বা ঢাকেশ্বরী বস্ত্রালয়ের গেটের মুখে অপেক্ষা করতে বলত। অপেক্ষাকৃত ভীতু ছেলেমেয়েরা বলতো বাসন্তী দেবী গার্লস কলেজের সামনে। গড়িয়াহাট মোড় থেকে গোল পার্ক পর্যন্ত মাঝখানে থাকা ফুটপাতে সারি সারি গাছের মাঝে ছিল বুলেভার্ড হকার্স কর্ণার যা হিন্দুস্থান পার্ক ,গোল পার্ক বা বালিগঞ্জ এলাকার কাকিমা, মাসিমা ও‌বৌদিদের টুকিটাকি দরকারি জিনিস সরবরাহ করতো। গড়িয়াহাট বাজারে নিত্যানন্দ ভোজনালয় বা মাইতিদের ভাতের হোটেল খুব কম পয়সায় সাধারণ মানুষের উদরপূর্তির ব্যবস্থা করতো। রামকৃষ্ণ মিশনের উল্টোদিকে গোল পার্কে সন্ধেবেলায় অনেক লোক একটু খোলা হাওয়া নিতে আসতেন। গোল পার্ক থেকে গড়িয়াহাট মোড় আসতে বাঁদিকে ছিল ভাল্লা ফুটওয়্যার যেদিক দিয়ে হিন্দুস্থান পার্কে যাবার আরও একটা রাস্তা। গড়িয়াহাট মোড় থেকে ট্রাইঅ্যাঙ্গুলার পার্ক যেতে ছিল স্টাইলো, বেঙ্গল ফার্মেসি, সিনহা ব্রাদার্স এবং আরও একটু এগিয়ে ছিল এম এল রায়ের দোকান। আরও একটু এগোলেই ডানদিকে পড়তো আশা ব্রাদার্স ও হাটারি রেস্তোরাঁ এবং তাদের সঙ্গে পাঁচিল শেয়ার করা মহানির্বাণ মঠ। আশা ব্রাদার্স বাড়ির কোণে থাকা ছোট্ট একটা সাদামাটা রেস্তোরাঁ যার নাম ছিল জনতা রেস্তোরাঁ এবং স্বাভাবিক ভাবেই তা অতি সাধারণ লোকদের প্রয়োজনীয় রুটি, তরকা খাওয়াতো নামমাত্র পয়সায় কিন্তু তাতেও লোকে ধার বাকিতে খেত। পাশেই ছিল পণ্ডিতিয়া মোড়। নামীদামী রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী দেবব্রত বিশ্বাস, সাগর সেন ও অশোকতরু বন্দোপাধ্যায় কাছাকাছি থেকে যেন পণ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথের গানকে এক অসাধারণ উচ্চতায় নিয়ে যাবার। দেশপ্রিয় পার্কে তখন এত ইট কাঠ পাথরের জঙ্গল হয়নি, ছিল খেলার জন্য বিরাট খোলা মাঠ। ল্যান্সডাউন রোড ছিল এক অসাধারণ সুন্দর রাস্তা যা আরো মহিমান্বিত হয়েছিল রবীন্দ্রসঙ্গীতকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য শুভ গুহঠাকুরতার পরিচালনায় এক বিশ্বস্ত সংস্থা" দক্ষিণীর" উপস্থিতির। এই দক্ষিণী উপহার দিয়েছে অনেক প্রথিতযশা রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পীদের এবং এখনও সেই ধারা অব্যাহত। দক্ষিণ কলকাতার দক্ষিণ দেশীয় খাবার জোগাতে কেরালা কাফে, তারা মহল এবং একটু দূরেই লেক মার্কেটের কাছে কোমলা ভিলা যার ভেতরেই রয়েছে ব্যানানা লিভস। দেশপ্রিয় পার্ক মোড় থেকে স্টেডিয়ামের দিকে এগোতেই প্রথম ডানদিকের মোড়ে একটু এগোলেই এই উদুপি রেস্তোরাঁ। আমাদের দেশের রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালাম সাহেব যখনই কলকাতায় আসতেন, রাজভবনে উঠলেও তাঁর খাবার যেত এই উদুপি রেস্তোরাঁ থেকেই। সুতরাং বলাই বাহুল্য যে তখন থেকেই এই রেস্তোরাঁ একটা আলাদা জাতে উঠে গেছে।

এই উদুপি রেস্তোরাঁ একটি পুরনো আমলের বাড়িতে। ভেতরের ঘরগুলোতে বসার ব্যবস্থা থাকলেও বাইরের বারান্দাটা ঘিরে সেখানেও অনেকগুলো টেবিল পাতা আছে। কিন্তু সবচেয়ে পছন্দের যে জায়গা সেটা হচ্ছে বাইরে ফুটপাতে পাতা সারি করা চেয়ার এবং তাদের সামনে থাকা প্লাস্টিকের টুল যেখানে লোকজন চা, কফি বা স্ন্যাকস খায়। আবার এর ই মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান জায়গা সরু সরু লম্বা ছয়টি দেবদারু গাছ এবং তারা দুটি সারিতে তিনজন করে দাঁড়িয়ে আছে যার মাঝখানে রয়েছে একটি টেবিল এবং উভয় দিকে তিনটি করে চেয়ার। এই জায়গাটা হচ্ছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং কোন সময় ই তা ফাঁকা পাওয়া যায়না। এইখানে কোন সময় বসার সুযোগ পেলে নিজেকে ধন্য মনে  হয়। সবসময়ই ওই জায়গায় কেউ না কেউ বসে আছে। গতবছর ফেব্রুয়ারী মাসের নয় তারিখে আমরা স্কুলের চার বন্ধু তাদের পরিবার নিয়ে বেঙ্গল হাটারিতে লাঞ্চ সেরে কফি খেতে এই উদুপিতে গিয়েছিলাম। হয়তো বা সেই বন্ধুদের ভাগ্যেই বা স্ত্রীদের ভাগ্যেই জায়গা পেয়ে গিয়েছিলাম সেই মহামূল্যবান দেবদারু ছায়ায় থাকা সিটগুলোয়। আমরা চার বন্ধু এবং আমাদের স্ত্রীরা মোট আটজন ঐখানেই গুঁতোগুঁতি করে ম্যানেজ করে নিলাম। হাজারো পুরনো গল্পের স্মৃতি রোমন্থনে সময় কিভাবে এগিয়ে চলেছে কারো হুঁশ নেই। দু রাউন্ড কফির পরেও গল্প আর শেষ হয়না আর ওই জায়গার মৌরসীপাট্টাধারী সদস্যরা উশখুশ করছে আমরা ঐ জায়গা কখন খালি করি এবং তারা কখন সেই জায়গা দখল করে। আমরা উঠে গাড়ির দিকে পা বাড়াতেই সবাই প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে জায়গা দখল করতে এল। এর পরেও অনেকবার উদুপিতে কফি খেতে গিয়েছি কিন্তু আমাদের ভাগ্যে ঐ জায়গায় বসার শিকে ছেঁড়েনি।
 মুম্বাই থেকে ফেরার পর দুই বন্ধু পরিবারসহ গিয়েছি কফি খেতে। যথারীতি দেবদারু গাছের ছায়ায় চেয়ারগুলো তাদের বিশেষ সদস্যদের দ্বারাই পূর্ণ ছিল , আমরা ফুটপাতে রাখা চারটে চেয়ারে বসে সামনে রাখা দুটো টুলের উপর কফি রেখেই খেলাম। যতীন দাস রোড যা ল্যান্সডাউন রোডকে পূর্ব পশ্চিমে বিভক্ত করেছে একটু আলো আঁধারিতে ভরা। বড় বড় গাছ গাছড়া এই দিকটাকে আরও একটু মায়াবী করে তুলেছে। মুম্বাই শহরের ঝলকানি এখানে নেই ,  ম্লান  চাঁদের আলো এবং রাস্তার স্তিমিত আলো এক অপূর্ব রূপ  আমাদের সবাইকে মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছে। কফি শেষ, কিন্তু কিছুতেই উঠতে ইচ্ছে করছে না অথচ যেতে হবেই। একটা বিড়াল খুব আয়েশ করে ঘুমাচ্ছে। সাধারণত সে চেয়ারেই ঘুমায় কিন্তু আজ বাধ্য হয়েই টুলের উপর শুতে হয়েছে । লেজটা ঠিক জুত করে রাখা যাচ্ছে না যাতে একটু অস্বস্তি ই হচ্ছে। হঠাৎ একটা গাড়ি এসে দাঁড়ালো এবং তিনিও একটু স্বস্তি পেলেন। গুটি গুটি পায়ে টুল থেকে নেমে লঘুপদে তিনি গাড়ির বনেটে উঠে পড়লেন এবং এদিক ওদিক দেখে নিশ্চিন্ত মনে নিদ্রায় মগ্ন হলেন। এদিকে ভদ্রলোকের ও যাবার সময় হয়েছে। অনেক আদর করে বিড়ালটিকে অনুনয় বিনয় করতে লাগলেন এবং নেমে যাওয়ার অনুরোধ করলেন কিন্তু তিনি লেজ নাড়িয়ে নাড়িয়ে আদর খেতে থাকলেন কিন্তু ওঠার নামগন্ধও নেই। তখন ভদ্রলোক ঐ উদুপি রেস্তোরাঁর একজনকে বললেন বিড়ালটিকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য এবং সেই ছেলেটি অনেক আদর করে যেমন করে ছেলেকে ভুলিয়ে নিয়ে যায় সেইভাবে তাকে তুলে নিয়ে গেল। আমাদের ও ওঠার সময় হয়েছে কিন্তু দেবদারু ছায়ায় বসা লোকগুলো যেন ফেভিকল লাগিয়ে বসে আছে, একবার বাঁদিকে কাত হয়ে আবার কেউ কেউ ডানদিকে। একবার জিজ্ঞেস করলাম এই জায়গাটা কি শুধু মেম্বারদের জন্য? হা হা করে হেসে সবাই বলে উঠল," না, না কি যে বলেন?"


Saturday, 7 March 2026

"তারাপীঠ দর্শন"

বাড়িতে একলা বসে থেকে একঘেয়ে লাগছে, ভাবতে ভাবতে  সহদেব একটু  আনমনা হয়ে গেছে এবং ভাবছে আশেপাশে কোথাও ঘুরে এলে কেমন হয়। যেমন ভাবা, তেমন কাজ। পঞ্চপাণ্ডব এখন কেমন ছন্নছাড়া হয়ে গেছে। সর্বজ্যেষ্ঠ যুধিষ্ঠিরের শরীরটা মোটেও ভাল যাচ্ছে না, সুতরাং দেবিকাকে তার দেখাশোনা করতে হচ্ছে, দ্বিতীয় পাণ্ডব ভীম সদ্য প্রয়াত, তাই ভীমজায়া ভালান্দারা শোকে মূহ্যমান, চতুর্থ পাণ্ডব নকুল ও কারেনুমতি সুদূর আমেরিকায়  পাড়ি দিয়েছে এবং তার ই মতন সহদেব জায়া বিজয়াও প্রবাসে মেয়ের কাছে। থাকার মধ্যে অর্জুন ও সুভদ্রা এবং সহদেব এবং ধৃষ্টদ্যুম্ন ও তার সহধর্মিণী সুধন্যা। দুঃশলা দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ থাকায় সে ও এই অভিযানে সামিল হতে পারছেনা। অতএব বরাবরের মতো পাণ্ডব ত্রাতা অর্জুন ই ভরসা। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী        অর্জুনকে সব্যসাচী না বলে আরও অন্য কোন নামে ভূষিত করলেও কিছু খারাপ হতোনা। যাই হোক, অর্জুন ই স্বভাবসিদ্ধভাবে গাণ্ডীবের সঙ্গে সঙ্গে এই দায়িত্ব ও তুলে নিল।

যেমন ভাবা তেমন কাজ। যাওয়া হবে তারাপীঠ‌ গাড়িতে। ধৃষ্টদ্যুম্ন ও সুধন্যা দুর্গাপুর চলে যাওয়ায় প্রথমে ঠিক হয়েছিল যে তারা ওখান থেকে সরাসরি তারাপীঠ চলে যাবে এবং অর্জুন, সুভদ্রা ও সহদেব সাঁইথিয়া হয়ে ওখানে পৌঁছে যাবে। তারপর প্ল্যানে একটু রদবদল হলো, ঠিক হলো দুর্গাপুর হয়েই দুটো গাড়ি একসঙ্গে যাবে। ১৭ ই নভেম্বর ভোরে রওনা দিল অর্জুন, মাঝপথে তুলে নিল সহদেব কে, সঙ্গে সারথি রজত। দুর্গাপুর যাওয়ার পথে শক্তিগড়ে একটা ছোট্ট বায়ো ব্রেক নিয়ে ব্রেকফাস্ট করে নেওয়া হলো এবং দুর্গাপুরে মুচি পাড়া মোড়ে ধৃষ্টদ্যুম্ন ও সুধন্যা সারথি হৃদয়হরণকে নিয়ে মিলিত হলো। ঠাণ্ডা তখনো সেরকম জাঁকিয়ে না পড়লেও একটা হালকা মিষ্টি শীতের ভাব বেশ আনন্দদায়ক ছিল। মুচি পাড়া মোড়ে দুটো গাড়ি বেশ চলছে, একটু দূরেই শুরু হলো শাল পিয়ালের জঙ্গল। তারপর ওখানে একটু চওড়া জায়গা দেখে সুধন্যার সকাল সকাল বানিয়ে আনা ঘিয়ে ভাজা পরোটা ও আলুর দম এবং মিষ্টি দিয়ে বনভোজন শুরু হলো। রজত ও হৃদয়হরণের সহযোগিতায় ওই দুর্লভ দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি হলো। যাত্রা শুরু হলো তারাপীঠের দিকে। অর্জুন সোনার বাংলা হোটেলে দুটো স্যুইট বুক করে রেখেছিল আগে থেকেই। সুতরাং একটু দেরি হলেও অসুবিধা কিছুই হলোনা। রাস্তার মোড়েই উল্টোদিকে পশ্চিমবঙ্গের ট্যুরিজম ডিপার্টমেন্টের হোটেল রক্তজবায় রজত ও হৃদয়হরণের ব্যবস্থা করা হলো। খুব দারুণ কিছু না হলেও ব্যবস্থাপনা এবং খাওয়া দাওয়া সাধারণ মধ্যবিত্তের নাগালের মধ্যে। তবে লোকেশন কিন্তু দারুণ। অর্জুন সব ব্যবস্থাই করে রেখেছিল এবং পূজো দেওয়ার জন্য পুরোহিত ও ঠিক করেই রেখেছিল। আগেও বার তিনেক তারাপীঠ এসেছে সহদেব কিন্তু এবারের দর্শন একটা আলাদা অভিজ্ঞতা। হোটেলে ফিরে একটা দারুণ ডিনার এবং রাতে গল্প করতে করতে কখন চোখ লেগে আসা কিছুই বোঝা গেল না। পরদিন সকালে ব্রেকফাস্ট করে তারাপীঠের   শ্মশান দেখে বিরাট পরিবর্তন দেখতে পেল।বছর ষাটেক আগে প্রথম যখন সহদেব আসে তখন শ্মশানে এদিক সেদিকে জ্বলন্ত চিতা চোখে পড়েছিল এবং ইতস্ততঃ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কঙ্কাল ও নজরে পড়েছিল কিন্তু  মাঝের সময়টা একটু বেশিই লম্বা এবং তার ছাপ এই শ্মশানেও পড়েছে ।  বামা ক্ষ্যাপার মন্দির তথা বাড়ি দর্শন করে বক্রেশ্বরের পথে যাত্রা শুরু হলো। তারাপীঠ থেকে ঘন্টা দুয়েক চলার পর এল বক্রেশ্বরের মন্দির। সহদেবের এখানে আসা প্রায় ৬০বছর পর যখন তারাপীঠের সঙ্গেই এই বক্রেশ্বর দর্শন হয়েছিল ।  সহদেবের স্মৃতিশক্তির কথা মহাভারতে উল্লেখ রয়েছে কিন্তু এখানে সহদেব বোধহয় পাশ করতে পারবে বলে মনে হয়না আর যদিও বা করে তাহলে টেনেটুনে পাশ করবে। অষ্টাবক্র মুনি তাঁর কঠিন তপস্যায় মহাদেবকে সন্তুষ্ট করেন এবং তাঁর আশীর্বাদে তিনি পুনরাবস্থা ফিরে পান। এই বক্রেশ্বরেই দেবী পার্বতীর ভ্রূর অংশ পড়ার জন্য এটি ৫১পীঠের অন্যতম। দেবী এখানে মহিষাসুরমর্দিনী হিসেবে পূজিত হন। এক ই জায়গায় দেবী দুর্গা ও শিবের মন্দির হওয়ায় শিবরাত্রিতে প্রচুর ভক্ত সমাগম হয়। এখানকার আরও একটি বিশেষত্ব এখানকার উষ্ণ প্রস্রবণ। এখানে স্নান করে বহু লোকের রোগ নিরাময় হয়। পেট চোঁ চোঁ করছে, ডান হাতের কিছু ব্যবস্থা করা ভীষণ প্রয়োজন কিন্তু কাছাকাছি কোন ভাল হোটেল পাওয়া গেলনা। অতএব যাওয়া যাক দুর্গাপুরের পথে। ঘন্টা দুয়েক চলার পর দুর্গাপুর মুচি পাড়া মোড়ের একটু আগে ধৃষ্টদ্যুম্ন নিয়ে গেল পড়তি বেলায় লাঞ্চ করার জন্য। হোটেলটা মোটামুটি ভালো এবং রাস্তার উল্টোদিকেই একটা কলেজ থাকায় খাবার দাবার বাসি থাকার প্রশ্নই নেই। রজত ও হৃদয় হরণ ওই হোটেলেই দুপুরের খাবার খেয়ে নিল। ফেরার পালা এবার। সুধন্যা ও ধৃষ্টদ্যুম্ন দুর্গাপুরেই থেকে গেল হৃদয়কে নিয়ে আর এর পরেই শুরু হলো রজতের রথ ছোটানো আর অর্জুনের মনে পড়তে লাগল বাসুদেবের রথ ছোটানোর কথা। কখন যে শক্তিগড় পেরিয়ে গেল বোঝা গেলনা, চলে এল কলকাতায় চা না খেয়েই।

Wednesday, 4 March 2026

" আরাবল্লী এক্সপ্রেস"

আমেদাবাদে কাজের সুবাদে কয়েকজন বন্ধু বান্ধবের সংস্পর্শে এসেছিলাম যাদের সঙ্গে রিটায়ার করার পরেও ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ রয়ে গেছে। এইরকমই একজন বন্ধু দিলাওয়ার অনেকদিন আগে থেকেই বলে রেখেছিল যে তার মেয়ের বিয়েতে আমাকে উপস্থিত থাকতে হবে। ওর মেয়ের যখন বছর সাতেক বয়স তখন ও শুধু আমার সহকর্মী ই নয় , একটা গভীর বন্ধুত্ব ওর সঙ্গে হয়ে গেছিল। তারপর ওখান থেকে বদলি একের পর এক জায়গায় কিন্তু বন্ধুত্বের রেশ থেকেই গেছিল।  অপূর্ব সুন্দর ছিল ওর মেয়ে জার্মিন বা জারু। গলার আওয়াজ ছিল ভারী মিষ্টি এবং ওর গলার মিষ্টি আওয়াজ শুনে ওকে একটা হারমোনিয়াম উপহার দিয়েছিলাম ওর জন্মদিনে। দেখতে দেখতে জারু বড় হয়ে উঠছে এবং পড়াশোনার চাপের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গান করতে পারছে কিনা আর খবর পাইনি। হোয়াটসঅ্যাপে ই কার্ড পাঠিয়ে ও ক্ষান্ত হয়নি, ক্যুরিয়ারে একটা খুব সুন্দর
 কার্ড পাঠিয়েছে,ভেতরে একটা অতি পরিচিত হাতে লেখা চিরকুট আপকো আনা হি চাহিয়ে। মনে পড়ে গেল নিজের প্রতিজ্ঞার কথা এবং তখনই ঠিক করে ফেললাম যে বম্বেতে কয়েকটা দিন কাটিয়ে ওখানে বিয়েতে অন্তত একটা দিন কাটিয়ে আসব। ছেলেকে পাকড়াও করে সাথী করে নিলাম এবং গুজুমেলে( গুজরাট মেল) যাওয়ার টিকিট হলো। ফ্লাইটে যাওয়া আসা করায় আমার ঘোর আপত্তি কারণ এত হ্যাপা করে মুখ গোমড়া করে যাতায়াত করায় প্রচণ্ড মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। মানুষের বয়স হলে কথাবার্তা বলার লোক কমে যায় এবং ট্রেনে যদি স্লিপার ক্লাসে দিনের যাত্রা হয় তবে দুচারটে লোকের সঙ্গে আলাপচারিতা হয়। ছেলে কিন্তু যে টিকিট কেটেছে তাতে কোনটাই সম্ভব নয় কারণ রাতের ট্রেন এবং তাও আমার  ট্রেন সফরের  সাধ মেটাতে এসি ফার্স্ট ক্লাস । দাদার স্টেশনের সাত নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে ছাড়বে কিন্তু প্ল্যাটফর্ম খুঁজে পেতে ট্রেন প্রায় মিস হয়ে যায় আর কি। যাই হোক, দুজনের ক্যূপে ঢুকে পড়ে ভেতর থেকে লাগিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুম। কিন্তু গুজুমেলে মাঝেমাঝেই একটা এমন হেঁচকা টান পড়ছিল  যে মনে হচ্ছিল যে আমাদের কামরাটা বোধহয় যেতে  ইচ্ছুক নয় কিন্তু বড় দাদার মতো ইঞ্জিন হাত ধরে টান মেরে বলছিল ," চল, যাবিনা মানে"  কোন কথাবার্তা না হয়েই ভোরবেলা আমেদাবাদ পৌঁছে গেলাম। ট্রেনেই মুখ ধুয়ে নেওয়ায় স্টেশনে নেমে চা খেতে কোন অসুবিধা হলোনা।এরপর উবের ট্যাক্সিতে আমার পরিচিত এক হোটেলে।

খানিকক্ষণ ঘুমিয়ে নিয়ে তৈরী হয়ে নিলাম এবং পুরনো বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে দেখা করে বিয়েবাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। নিকা হয়ে গেল জারুর আর্মানের সঙ্গে। ঝকঝকে ছেলে আরমান। বিয়ের কয়েকদিন পরেই জারুকে নিয়ে চলে যাবে সুদূর আমেরিকায়। ভারী সুন্দর লাগছিল জার্মিনকে। ও চিনতে পেরেছে আমাকে, মৃদু হাসিতে জানালো। ডিনারের পরে আবার আমেদাবাদ স্টেশনে। ফেরার পালা কিন্তু এবার আমাদের টিকিট আরাবল্লী এক্সপ্রেসের এসি টু টায়ারে। রথ দেখা হলো কিন্তু কলা বেচা  হলোনা মানে লোকজনের সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে আসা এবং সেকেণ্ড ক্লাস চেয়ার কার বা স্লিপারে আসা হলোনা। কি আর করা যাবে, একসঙ্গে সব কিছু তো হয়না কারণ ছেলেকে একদিন  ছুটি নিয়ে পরের দিন অফিস করতেই হবে। অতএব করতেই হবে সমঝোতা।

এবার ট্রেন আসার বেশ খানিকক্ষণ আগেই পৌঁছে গেছি আগের রাতের কথা মনে রেখে। আমাদের কোচটা যেখানে থামবে তার খুব কাছেই একটা বেঞ্চে বসে আছি। আর পি এফের লোকরা আলতু ফালতু লোকদের ভাগিয়ে দিচ্ছে। এখন স্টেশনগুলো খুব পরিষ্কার এবং সেটা সবার সহযোগিতার জন্য ই সম্ভব হয়েছে। হঠাৎ ঘসঘস করে কিছু টেনে নিয়ে যাওয়ার আওয়াজে চোখ চলে গেল পিছনদিকে। দুটো বছর আট নয়েকের ছেলে দুটো বড় প্লাস্টিকের বালতি টেনে নিয়ে যাচ্ছে আর সেই বালতিতে রয়েছে খালি জলের প্লাস্টিক বোতল। মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল। এই বয়সের ছেলেদের পেট চালাতে এইরকম কাজ করতে হচ্ছে এই ভাবে! আমাদের ঘরের ছেলেমেয়েরা এই বয়সে এত রাতে ঘুমাতে চলে যায় পরেরদিন স্কুলের রুটিন অনুযায়ী বইপত্র গুছিয়ে আর এরা বোতলগুলো বুঝিয়ে দিয়ে কিছু পয়সা নিয়ে তার মা বা বাবার কাছে বুঝিয়ে দেবে এবং তার পরে তাদের খাওয়াদাওয়া ও ঘুম। এক ই বয়সের শিশু অথচ কতটাই না বৈষম্য। ট্রেন আসতে এখনও প্রায় আধঘণ্টা দেরী। আমার আরাবল্লী এক্সপ্রেসের কথা মনে হতে লাগল আর মনে পড়তে লাগল মহারানা প্রতাপের কথা। রাজপুতানার ইতিহাস ঘাঁটলে এটাই দেখা যায় এরা নিজেদের মধ্যে যত রেষারেষি করেছে ততটাই সুবিধা করে দিয়েছে বাইরের শত্রুদের। এঁরা নিজেদের মধ্যে দলাদলি না করে যদি ঐক্যবদ্ধ ভাবে প্রতিরোধ করতো তাহলে ভারতবর্ষের ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতো। মনে পড়তে লাগলো হলদিঘাটের যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে মহারানা প্রতাপকে নিয়ে হাতির দাঁতে আহত মহারানা প্রতাপের ঘোড়া   চেতক  পালিয়ে যাচ্ছে নিরাপদ দূরত্বে, পিছন থেকে বৈমাত্রেয় ভাই শক্তি সিং রানা প্রতাপ কে হত্যার উদ্দেশ্যে প্রেরিত দুজন মুঘল যোদ্ধাকে হত্যা করে চিৎকার করে ডাকছে," হো নীল ঘোড়াকা সওয়ার" বলে রানা প্রতাপের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। আহত চেতকের আর চলার শক্তি নেই, পড়ে গেল মাটিতে কিন্তু ততক্ষণে তার মনিব মহারানাকে বিপন্মুক্ত করে দিয়েছে। ইতিমধ্যে শক্তি সিং পৌঁছে গেছেন তাঁর বড় ভাই রানার পাশে এবং চেতকের মৃত্যুর পর তার নিজের ঘোড়াটি দিয়ে মহারানাকে পালাতে সাহায্য করলেন। ইতিহাসে যদিও আছে যে শক্তি সিং আকবরের সঙ্গে ছিলেন অন্যান্য অনেক রাজপুত রাজাদের মতো কিন্তু যখন তিনি জানতে পারেন যে আকবর মেওয়ার আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং সেইখানে তাঁকে মেওয়ারের রাজা বানাতে চাইছেন, তিনি আকবরের অনুমতি না নিয়েই মহারানাকে সতর্ক করে দিয়েছেন যা এককথায় বলা যায় গুপ্তচরবৃত্তি করেছেন কারণ তিনি আকবরের সঙ্গে যোগ দিলেও নিজের বাবা ও ভাই তথা নিজের দেশের বিরুদ্ধে যেতে চাননি। চোখের সামনে চেতককে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে দেখে শক্তি সিং তার দাদাকে নিজের ঘোড়াটি দিয়ে পালাতে সাহায্য করলেন। এইসব ভাবতে ভাবতে কখন ট্রেন আসার ঘোষণা হয়ে গেল। ইতিহাসকে কাঁধে করে আরাবল্লী এক্সপ্রেস স্টেশনে এসে ঢুকল এবং আমরাও নিজেদের সীটে বসে পড়লাম। এটা আর পাঁচটা ট্রেনের মতোই , কিছু পার্থক্য নেই অথচ মনটা আমার কোথায় যেন উধাও হয়ে গেছিল, আমি তখনো সেই ট্রেনের মধ্যে ইতিহাস খুঁজে চলেছি। দশ মিনিট পরে ট্রেন ছাড়ল, ঘন্টা খানেক বাদে আনন্দ এবং দুঘন্টা পরে এল বরোদা, সুরাট, বাপি, নভসারী ,ভালসাড ও দহনুরোড। জেগে বসে আছি একটা ঘোরের মধ্যে, মনে হচ্ছে এই বোধহয় আটফুট দীর্ঘ রানা প্রতাপ এসে বলবেন আমি স্বাধীনতার প্রতীক, আমার মৃত্যু নেই, যুগে যুগে আমি আসি আর স্বাধীনতার বাণী শোনাই। চোখটা একটু লেগে এসেছিল সবে কিন্তু রাজপুতানা তথা ভারতবর্ষের গর্ব সেই মহারানা প্রতাপের চিন্তা মাথায় কিলবিল করছে। তিনি যেন বলছেন যে ইতিহাসবিদদের লেখনীতে তাঁর বীরত্বের কথা সেইভাবে প্রচার না পেলেও তিনি আছেন আপামর জনতার হৃদয়ে। ধীরে ধীরে এর বোরিভালি যেখানে বহু যাত্রী নেমে গেল। ট্রেন প্রায় খালি আর মাঝে মাঝেই থেমে যাচ্ছে এখানে সেখানে যখন যে কোন মূহুর্তে ছিনতাই হবার সম্ভাবনা প্রবল। জেগেই থাকলাম বান্দ্রা টার্মিনাস অবধি। এখানেই যাত্রা শেষ কিন্তু আমরা নামতে না নামতেই হুড়মুড় করে বোরখা পরা মহিলা ও লোকজন উঠতে লাগল এবং বাথরুমে ঢুকে পড়ল প্রাতঃকৃত্য সারার জন্য। স্টেশনের বাইরে এত নোংরা যে মনের মধ্যে যে রানা প্রতাপ ঘোরাঘুরি করছিলেন তিনি কোথায় যেন ভ্যানিশ হয়ে গেলেন।

Saturday, 28 February 2026

"কার্টার রোডে কিছুক্ষণ"

বম্বে আসা দুসপ্তাহ হয়ে গেছে। পুরোনো সহকর্মীরা রিটায়ার করার পর যে যার নিজের জায়গায় ফিরে গেছে আমার ই মতন। নাতি নাতনিদের পরীক্ষা শেষ হয়ে গেলেও বিভিন্ন রকম কাজ যেমন আঁকা, গান বা নাচ বা ফুটবল খেলা ও সাঁতারে যুক্ত থাকায় তাদের সঙ্গটাও  নিরবচ্ছিন্ন ভাবে পাওয়া যাচ্ছে না। সময় কাটানোর একটাই রাস্তা, বাজারে যাওয়া ও নানান বিক্রেতাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলা। সেটাও বৃহনমুম্বাই মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের সৌজন্যে প্রায় অনেকটাই ব্যাহত। অবশ্য বহুবছর পর ভারতের সবচেয়ে ধনী কর্পোরেশনের পরিচালনে বদল হয়েছে এবং তাদের সামনে একটাই রাস্তা খোলা যে এই শহরের উন্নয়ন কি ভাবে আরও ভাল করা যায়। তাই মাঝে মাঝেই গলির রাস্তায় বদল আনা হচ্ছে এবং যে কোনও বদলেই সাময়িক অসুবিধা হয়। এই শহরেও তার ব্যতিক্রম নয় এবং পিচের রাস্তা বদলে কংক্রিটের রাস্তা করা হচ্ছে। এতে প্রথমেই অনেক খরচ হলেও ফি বছর রাস্তা সারাইয়ের ঝঞ্ঝাট থাকেনা। সুতরাং চেনা রাস্তা ও অচেনা হয়ে যাচ্ছে এবং ভরসার জায়গা সেই গাড়ি ও ড্রাইভার। এইসব কারণে বাড়ির বাইরে যাওয়া হয়েই উঠছে না।

আজ নাতনি যেখানে পাশ্চাত্য গান শেখে সেই সংস্থার বার্ষিক অনুষ্ঠানে ছাত্র ছাত্রীদের দ্বারা অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রিত থাকায় অল্পবয়সী মেধাবী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরিচয় ঘটলো। এতটাই পরিচ্ছন্ন ব্যবস্থা এবং উঁচু মানের শিশুশিল্পীদের সান্নিধ্যে কি করে তিন ঘণ্টা সময় কেটে গেল টের পেলাম না। মাঝে দুবার ব্রেক দিলেও অনুষ্ঠান কে তিন ঘন্টা টেনে নিয়ে যাওয়া যে সে কম্মো নয়। এতেই বোঝা যায় খুদে শিল্পীদের মান কি ধরণের। যাই হোক অনুষ্ঠান শেষে একটু কফি খাওয়ার উদ্দেশ্যে বান্দ্রার দিকে রওনা দেওয়া হলো। কিন্তু যেখানেই যাওয়া হচ্ছে সেখানেই দেখা যাচ্ছে বিরাট লাইন। শনিবার সন্ধ্যায় যে কোন রেস্তোরাঁয় ঢোকাই কঠিন।অতএব বান্দ্রার গলিঘুঁজিতে একটা পুরনো আমলের বাড়িতে একটা রেস্তোরাঁর খোঁজ পাওয়া গেল, নাম যার ভ্যানিলা মিয়েল যার মানে হচ্ছে খুব মিষ্টি ভ্যানিলা। গলিতে ঢুকে মনে হচ্ছিল যেন গোয়ার কোন গলিতে এসে পড়েছি। আশে পাশে নামী দামী প্রোমোটারদের গগনচুম্বী বহুতল গড়ে উঠেছে অথচ তাদের এই ছোবল থেকে কি করে নিজেদের বাঁচিয়ে রেখে নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রেখেছে তা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। সামনে পিছনে গলিতে সব বাংলো প্যাটার্নের বাড়ি , এককথায় ভারী সুন্দর। আধুনিকতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সাবেকিয়ানা বজায় রাখা চাট্টিখানি কথা নয়। বাড়ির বাইরের গঠন এক ই রয়েছে কিন্তু ঐ ছোট্ট জায়গায় এত সুন্দর ব্যবস্থা, না দেখলে হয়তো বিশ্বাস করাই যেত না। যাই হোক, জায়গা পাওয়া গেল। আমরা হয়তো খানিকটা ভাগ্যবান কারণ আমরা বেরোনোর পরেই আস্তে আস্তে জমায়েত হতে লাগল। কফির সঙ্গে তাল মিলিয়ে কিছু খাবার খেয়ে রওনা দিলাম কার্টার রোডের দিকে।

সূর্য তখন অস্ত যাচ্ছে এবং তার জায়গা দখল করছে আকাশ জুড়ে স্নিগ্ধ করে পূর্ণিমাতে বিলীন হতে সুন্দরী সেই চাঁদ। আমাদের নামিয়ে দিয়ে গাড়ি পার্কিং করতে লাগল ড্রাইভার। সমুদ্রের জল অনেকটাই নেমে গেছে, কাদায় মাখা পাথরগুলো তাদের নগ্নতা ঢাকতে অপারগ। কথায় আছে উপরে খোঁচার পত্তন ভিতরে ছুঁচোর কেত্তন, একদম ঠিক মনে হলো। একটু দূরেই বিস্তীর্ণ জলরাশি যা দেখে বোঝার উপায় নেই যে তার ই নীচে এইরকম রুক্ষ পাথরের অবিন্যস্ত সমাগম । সামনে চলছে সমুদ্রের উপর রাস্তা তৈরি যা মেরিন ড্রাইভ থেকে বোরিভালি পর্যন্ত যাবে এবং  সফরের সময়টাও অনেকটাই কমে যাবে।  সময় তো বহু মূল্য।চোখটা ঘোরাতেই দেখা গেল নানান দৃশ্য। হাঁটছে নানা বয়সী ছেলেমেয়ে, বুড়ো, বুড়ি। এঁদের মধ্যে কেউ বা হুইলচেয়ারে, কেউ বা লাঠির ভরে আবার কেউ বা লাঠি নিয়েও অন্যের সহায়তায়। বসে আছে অনেক লোক নানাধরণের কুকুর নিয়ে ( বড়, মেজো, সেজো, ন, ফুল ইত্যাদি) , গলায় তাদের নানা ধরণের গলাবন্ধ ও বেল্ট। পাশেই তাদের পথে থাকা কুকুররাও, তাদের ও মনে হয় কেন তাদের গলায় ওইরকম সুদৃশ্য গলাবন্ধ ও বেল্ট নেই? একটু কেমন যেন দুঃখ দুঃখ ভাব তাদের। তারাও পেতে চায় একটু স্নেহ , চায় একটা যেমন তেমন গলাবন্ধ, করুক শাসন বাংলা বা ইংরেজিতে। কিন্তু সেগুড়ে বালি, এপাশে ওপাশে লেজ নেড়ে ও কোন লাভ হলোনা, বরং মিলল একটু আধটু টক মিষ্টি ঝাল তিরস্কার। কোন জায়গায় আমল না পেয়ে শুয়ে পড়ল তার নিজের জায়গায় স্ন্যাকস কাউন্টারের পাশে। সেখানেই তার স্বর্গ যেখানে লোকজন খাওয়ার পর একটু উচ্ছিষ্ট তাদের উদ্দেশ্যে ফেলে দেয়। স্ন্যাকস বারের মালিক ই তাদের অকথিত মালিক যদিও সে কখনোই তাদের গলায় বেল্ট পড়ায় না এবং তাদের অপার স্বাধীনতা কেড়ে নেয় না। মানুষ ও স্বাধীনতা ই চায়, নাই বা মিলল তাদের দুবেলা পেট ভরা খাবার। সোনার চেন দিয়ে  বাঁধা থেকে রাজভোগ খাওয়ার  চেয়ে আধপেটা বা খালি পেটে  থেকে স্বাধীনতার স্বাদ অনেক ভাল ।   কুকুরটা তার পায়ের উপর মাথা রেখে শুয়ে শুয়ে দেখতে থাকল আমাকে ও অন্যান্য লোকদের, চোখদুটো থেকে যেন জল গড়িয়ে পড়ছে। ভাল করে লক্ষ্য করলাম যে জল নয় দুটো চোখের নীচেই এমন কালো দাগ যেন জল গড়াতে গড়াতে শুকিয়ে গেছে এবং রেখে গেছে এক অমলিন ছাপ। দুঃখে যাদের জীবন গড়া, দুঃখে তাদের ভয়টা কিসের?

Wednesday, 18 February 2026

"শহর যখন গ্রাম ছিল ---- এক উত্তরণের কাহিনী"

ছোটবেলায় একটা দেয়াল লিখন দেখতাম গ্রাম দিয়ে  শহর ঘেরো। কিন্তু গ্রাম শহরকে ঘিরতে গিয়ে  যদি নিজেই শহর হয়ে যায়  তাহলে কেমন দাঁড়ায় ব্যাপারটা। এইরকম ই একটা আজ পাড়াগাঁ কি করে এক ঝলমলে শহরে পরিণত  হলো তার কথাই বলব। কুতুবপুর  আজ এক ঝলমলে শহর। সম্প্রতি জেলা ভাগের পরে মহকুমা সদরের মর্যাদাও পেয়েছে। এখানকার বুড়োবুড়িরা কোনদিন স্বপ্নেও ভাবেনি যে এই অজ পাড়াগাঁ যেখানে সভ্যতার আলো সেরকমভাবে পৌঁছায়নি সেটা আজ এই পর্যায়ে পৌঁছে যাবে। জেলা সদর বহরমপুর এখান থেকে প্রায় পঞ্চাশ মাইল দূর যেখানে ছিল বড় স্কুল, কলেজ ও হাসপাতাল। ঐ গড়িগ্রামে থেকে কেউ ভাবতেও পারতো না যে পড়াশোনার গণ্ডি স্কুল পেরিয়ে কেউ কলেজ পর্যন্ত যাবে। ছিলনা প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র, কোন জ্বর জ্বালা হলে ভরসা সেই গ্রামের হাতুড়ে। গ্রামের অধিকাংশ লোকই ছিল মুসলমান কিন্তু তার জন্য হিন্দুদের কোনদিনই কোন অসুবিধা হয়নি, গ্রামের দূর্গাপূজোর সঙ্গে সঙ্গে ঈদ মহরম ও মহাসমারোহে পালিত হয়েছে। কুতুবপুর মুর্শিদাবাদ জেলা ও পূর্ব পাকিস্তানের (অধুনা বাংলাদেশ) রাজশাহী জেলার সীমান্তবর্তী গ্রাম। প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দুই ক্রোশ দূরে ললিতপুর গ্রামে যেখানে রয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল এবং  বাসের রাস্তায় বহরমপুর। কলকাতা যেতে হলে বহরমপুর স্টেশন থেকে ট্রেনে লালগোলা প্যাসেঞ্জারে যেতে হতো। আশ্চর্যের ব্যাপার এটাই যে সীমান্তবর্তী গ্রাম হওয়া সত্ত্বেও এই কুতুবপুর কি করে মহকুমা সদরে পরিবর্তিত হলো? ব্যাঙ্কের পরিষেবা পেতে হলেও যেতে হতো সেই ললিতপুর। অবশ্য কজন লোকের ই বা এই ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট থাকতো? বেশিরভাগ মানুষই গ্রামের বড় দাদাবাবুর কাছে যেত টাকা পয়সার প্রয়োজনে।  উনিই ছিলেন গ্রামের  গরীব গুর্বোদের ব্যাঙ্ক। যার যা কিছু  প্রয়োজন বড় দাদাবাবুর মেটাতেন। সুতরাং  সাধারণ  লোকের ব্যাঙ্ক  সম্পর্কে  কোন ধ্যানধারণাই ছিলনা। দুচারজন লোক যারা একটু বড় আকারে টাকার আদানপ্রদান করতেন তারা কয়েক মাইল দূরে  ললিতপুর গ্রামে আসতেন স্টেট ব্যাঙ্কে। গ্রামের সাধারণ  যানবাহন ছিল গরুর গাড়ি , ছিল  দু তিনটে সাইকেল  এবং  বড় দাদাবাবুর ছিল মোটরসাইকেল। মিস্টার আইয়ার   এসেছেন স্টেট ব্যাঙ্কের রিজিওনাল ম্যানেজার হয়ে এবং এসেছেন ললিতপুর ব্রাঞ্চ পরিদর্শনে। কিন্তু আসার আগে তিনি আশপাশের জায়গাগুলো সম্বন্ধে একটু খবরাখবর নিয়ে এসেছেন। এক বাঁধা রাস্তায় চলার লোক উনি নন এবং উনি যেখানেই যান সেখানেই সমস্ত আশপাশের জায়গাকে উন্নত করার চেষ্টা করেন এবং সেইমতো একজন কঠিন পরিশ্রমী ছেলেকে ব্রাঞ্চ ম্যানেজার হিসেবে বাছেন। কি কারণে জানিনা ওঁর চোখে এই কুতুবপুর নজরে পড়ে গেল। ললিতপুর যেতে হলে একটা খাল( যেটাকে গ্রামের  লোক বলে কাঁদর) পড়ে যেটা বর্ষার সময় টইটুম্বুর হয়ে কাঠের সেতুকে ভাসিয়ে দিত এবং তখন একমাত্র ভরসা ডিঙি বা ছোট নৌকা। বহু তদারকিতেও কোন পাকা ব্রিজ হয়নি সেখানে।  আশপাশের গ্রামের লোকজন এই ললিতপুরেই আসত ব্যাঙ্কিং পরিষেবা নিতে অথচ পাকা রাস্তা চলে গেছে একেবারে বাংলাদেশ সীমান্তে এবং পাকা রাস্তা থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে এই কুতুবপুর এবং বাকি সড়ক যোগাযোগ কাঁচা পথে। কিন্তু মিস্টার আইয়ার দমবার পাত্র নন। উনি জেলাশাসকের সঙ্গে দেখা করে নিজের প্ল্যানের কথা জানালেন। জেলাশাসক ও ছিলেন একজন তেলুগু ভদ্রলোক কিন্তু ওঁর  স্কুলের শিক্ষা কলকাতাস্থিত ন্যাশনাল হাইস্কুলে হওয়ায় উনি ভাল ই বাংলা বুঝতেও পারেন এবং বলতেও পারেন। মিস্টার আইয়ার তামিল ব্রাহ্মণ এবং তাঁর ও শিক্ষা দীক্ষা কলকাতায়। যাই হোক না কেন দুজনের স্বপ্ন ই এক হয়ে যাওয়ার কারণে মিস্টার আইয়ারের কাজ অনেক সোজা হয়ে গেল। রাস্তা পাকা হলো, বাসের ব্যবস্থাও হলো এবং তাঁর উদ্যোগে কুতুবপুরে ব্যাঙ্কের একটা শাখাও খুলে ফেললেন এবং একজন একবগ্গা বুদ্ধিমান ছেলে সুবীর মজুমদারকে ব্রাঞ্চ ম্যানেজার হিসেবে বাছলেন। তখন তো কম্পিউটারের আগমন হয়নি, সুতরাং বড় বড় জাবদা খাতা দিয়ে ব্যাঙ্ক যাত্রা শুরু করলো। ঐ সময় নেতাদের এত দাপাদাপি ছিলনা , সুতরাং জেলাশাসক বা মহকুমা শাসকরা যদি কোন বিষয় স্থির করতেন তার নড়চড় বিশেষ হতোনা। সুবীর ছিল খুবই পরিশ্রমী এবং গ্রামের লোকজনদের সঙ্গে তার ব্যবহার ছিল একদম নিজের লোকের মতো। সুতরাং, ব্যবসা জমাতে বেশি কষ্ট করতে হয়নি  এবং ধীরে  ধীরে  গ্রামের  লোকজনদের তাদের  প্রয়োজনীয়  লোন দিয়ে তাদের স্বনির্ভর করে তুলতে লাগল এবং অচিরেই ললিতপুর শাখা তার ঔজ্জ্বল্য হারিয়ে ফেলল। সুবীর ও মিস্টার আইয়ার এবং জেলাশাসকের সঙ্গে সুন্দর সম্পর্কের ফলে কুতুবপুরকে একটা আদর্শ গ্রামে পরিণত করে ফেলতে লাগল। সুবীরের বিশ্বস্ততায় এতটুকু সন্দেহ না থাকায় মিস্টার আইয়ার তাঁর সমর্থন জুগিয়ে গেলেন এবং তিনজনের যুগলবন্দীতে কুতুবপুর হয়ে উঠল একটা ব্যস্ত মফস্বল এবং ব্যবসাকেন্দ্র। একটা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে উঠল, গড়ে উঠল প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্কুল এবং কলেজ।
সুবীরের ইতিমধ্যে ট্রান্সফার অর্ডার এসে গেছে এবং ভাল কাজের সুবাদে প্রমোশনের পর প্রমোশন মিলেছে। ইতিমধ্যে কেটে গেছে প্রায় পনেরো বছর এবং সুবীরের পোস্টিং হয়েছে এই রিজিয়নের রিজিওনাল ম্যানেজার হিসেবে। সুবীর এসেছে ব্রাঞ্চ ভিজিটে কুতুবপুর ব্রাঞ্চে। গ্রামের পুরনো লোকদের কেউ কেউ তাকে দেখেই চিনতে পেরেছে এবং কানাঘুষোয় জানতে পারলেন যে এই কুতুবপুর ব্রাঞ্চের নাম মজুমদার সাহেবের ব্রাঞ্চ। মনে একটা খুশির ঝলক লেগে গেল। কুতুবপুর গ্রাম আজ ঝলমলে কিন্তু পাশাপাশি ললিতপুর শাখার বৃদ্ধি হলেও সেই অনুপাতে বাড়েনি। মিস্টার আইয়ার রিটায়ার করে গেছেন চীফ জেনারেল ম্যানেজার হয়ে, তদানীন্তন জেলাশাসক ও রিটায়ার করেছেন সেক্রেটারি হয়ে এবং কুতুবপুর ও হয়ে উঠেছে সদর মহকুমা। স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল ও অন্যান্য ব্যবসার প্রাণকেন্দ্র হয়ে এককালের  গ্রাম কুতুবপুর আজ এক বড় শহরে পরিণত হয়েছে। সুবীরের আজ পরম তৃপ্তি।