সুবীরের ইতিমধ্যে ট্রান্সফার অর্ডার এসে গেছে এবং ভাল কাজের সুবাদে প্রমোশনের পর প্রমোশন মিলেছে। ইতিমধ্যে কেটে গেছে প্রায় পনেরো বছর এবং সুবীরের পোস্টিং হয়েছে এই রিজিয়নের রিজিওনাল ম্যানেজার হিসেবে। সুবীর এসেছে ব্রাঞ্চ ভিজিটে কুতুবপুর ব্রাঞ্চে। গ্রামের পুরনো লোক তাকে দেখেই চিনতে পেরেছে এবং কানাঘুষোয় জানতে পারলেন যে এই কুতুবপুর ব্রাঞ্চের নাম মজুমদার সাহেবের ব্রাঞ্চ। মনে একটা খুশির ঝলক লেগে গেল। কুতুবপুর গ্রাম আজ ঝলমলে কিন্তু পাশাপাশি ললিতপুর শাখার বৃদ্ধি হলেও সেই অনুপাতে বাড়েনি। মিস্টার আইয়ার রিটায়ার করে গেছেন চীফ জেনারেল ম্যানেজার হয়ে, তদানীন্তন জেলাশাসক ও রিটায়ার করেছেন সেক্রেটারি হয়ে এবং কুতুবপুর ও হয়ে উঠেছে সদর মহকুমা। স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল ও অন্যান্য ব্যবসার প্রাণকেন্দ্র হয়ে এককালের গ্রাম কুতুবপুর আজ এক বড় শহরে পরিণত হয়েছে। সুবীরের আজ পরম তৃপ্তি।
Wednesday, 18 February 2026
"শহর যখন গ্রাম ছিল ---- এক উত্তরণের কাহিনী"
কুতুবপুর এখন এক ঝলমলে শহর। সম্প্রতি জেলা ভাগের পরে মহকুমা সদরের মর্যাদা পেয়েছে। এখানকার বুড়োবুড়িরা কোনদিন স্বপ্নেও ভাবেনি যে এই অজ পাড়াগাঁ যেখানে সভ্যতার আলো সেরকমভাবে পৌঁছায়নি সেটা আজ এই পর্যায়ে পৌঁছে যাবে। জেলা সদর বহরমপুর এখান থেকে প্রায় পঞ্চাশ মাইল দূর যেখানে ছিল বড় স্কুল, কলেজ ও হাসপাতাল। ঐ গড়িগ্রামে থেকে কেউ ভাবতেও পারতো না যে পড়াশোনার গণ্ডি স্কুল পেরিয়ে কলেজ পর্যন্ত যাবে। ছিলনা প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র, কোন জ্বর জ্বালা হলে ভরসা সেই গ্রামের হাতুড়ে। গ্রামের অধিকাংশ লোকই ছিল মুসলমান কিন্তু তার জন্য হিন্দুদের কোনদিনই কোন অসুবিধা হয়নি, গ্রামের দূর্গাপূজোর সঙ্গে সঙ্গে ঈদ মহরম ও মহাসমারোহে পালিত হয়েছে। কুতুবপুর মুর্শিদাবাদ জেলা ও পূর্ব পাকিস্তানের (অধুনা বাংলাদেশ) রাজশাহী জেলার সীমান্তবর্তী গ্রাম। প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দুই ক্রোশ দূরে ললিতপুর গ্রামে যেখানে রয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল এবং বাসের রাস্তায় বহরমপুর। কলকাতা যেতে হলে বহরমপুর স্টেশন থেকে ট্রেনে লালগোলা প্যাসেঞ্জারে যেতে হতো। আশ্চর্যের ব্যাপার এটাই যে সীমান্তবর্তী গ্রাম হওয়া সত্ত্বেও এই কুতুবপুর কি করে মহকুমা সদরে পরিবর্তিত হলো? ব্যাঙ্কের পরিষেবা পেতে হলেও যেতে হতো সেই ললিতপুর। অবশ্য কজন লোকের ই বা এই ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট থাকতো? বেশিরভাগ মানুষই গ্রামের বড় দাদাবাবুর কাছে যেত টাকা পয়সার প্রয়োজনে। মিস্টার আইয়ার এসেছেন স্টেট ব্যাঙ্কের রিজিওনাল ম্যানেজার হয়ে এবং এসেছেন ললিতপুর ব্রাঞ্চ পরিদর্শনে। কিন্তু আসার আগে তিনি আশপাশের জায়গাগুলো সম্বন্ধে একটু খবরাখবর নিয়ে এসেছেন। এক বাঁধা রাস্তায় চলার লোক উনি নন এবং উনি যেখানেই যান সেখানেই সমস্ত আশপাশের জায়গাকে উন্নত করার চেষ্টা করেন এবং সেইমতো একজন কঠিন পরিশ্রমী ছেলেকে ব্রাঞ্চ ম্যানেজার হিসেবে বাছেন। কি কারণে জানিনা ওঁর চোখে এই কুতুবপুর নজরে পড়ে গেল। ললিতপুর যেতে হলে একটা খাল( যেটাকে গ্রামের লোক বলে কাঁদর) পড়ে যেটা বর্ষার সময় টইটুম্বুর হয়ে কাঠের সেতুকে ভাসিয়ে দিত এবং তখন একমাত্র ভরসা ডিঙি বা ছোট নৌকা। বহু তদারকিতেও কোন পাকা ব্রিজ হয়নি সেখানে। আশপাশের গ্রামের লোকজন এই ললিতপুরেই আসত ব্যাঙ্কিং পরিষেবা নিতে অথচ পাকা রাস্তা চলে গেছে একেবারে বাংলাদেশ সীমান্তে এবং পাকা রাস্তা থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে এই কুতুবপুর এবং বাকি সড়ক যোগাযোগ কাঁচা পথে। কিন্তু মিস্টার আইয়ার দমবার পাত্র নন। উনি জেলাশাসকের সঙ্গে দেখা করে নিজের প্ল্যানের কথা জানালেন। জেলাশাসক ও ছিলেন একজন তেলুগু ভদ্রলোক কিন্তু ওঁর স্কুলের শিক্ষা কলকাতাস্থিত ন্যাশনাল হাইস্কুলে হওয়ায় উনি ভাল ই বাংলা বুঝতেও পারেন এবং বলতেও পারেন। মিস্টার আইয়ার তামিল ব্রাহ্মণ এবং তাঁর ও শিক্ষা দীক্ষা কলকাতায়। যাই হোক না কেন দুজনের স্বপ্ন ই এক হয়ে যাওয়ার কারণে মিস্টার আইয়ারের কাজ অনেক সোজা হয়ে গেল। রাস্তা পাকা হলো, বাসের ব্যবস্থাও হলো এবং তাঁর উদ্যোগে কুতুবপুরে ব্যাঙ্কের একটা শাখাও খুলে ফেললেন এবং একজন একবগ্গা বুদ্ধিমান ছেলে সুবীর মজুমদারকে ব্রাঞ্চ ম্যানেজার হিসেবে বাছলেন। তখন তো কম্পিউটারের আগমন হয়নি, সুতরাং বড় বড় জাবদা খাতা দিয়ে ব্যাঙ্ক যাত্রা শুরু করলো। ঐ সময় নেতাদের এত দাপাদাপি ছিলনা , সুতরাং জেলাশাসক বা মহকুমা শাসকরা যদি কোন বিষয় স্থির করতেন তার নড়চড় বিশেষ হতোনা। সুবীর ছিল খুবই পরিশ্রমী এবং গ্রামের লোকজনদের সঙ্গে তার ব্যবহার ছিল একদম নিজের লোকের মতো। সুতরাং, ব্যবসা জমাতে বেশি কষ্ট করতে হয়নি এবং অচিরেই ললিতপুর শাখা তার ঔজ্জ্বল্য হারিয়ে ফেলল। সুবীর ও মিস্টার আইয়ার এবং জেলাশাসকের সঙ্গে সুন্দর সম্পর্কের ফলে কুতুবপুরকে একটা আদর্শ গ্রামে পরিণত করে ফেলতে লাগল। সুবীরের বিশ্বস্ততায় এতটুকু সন্দেহ না থাকায় মিস্টার আইয়ার তাঁর সমর্থন জুগিয়ে গেলেন এবং তিনজনের যুগলবন্দীতে কুতুবপুর হয়ে উঠল একটা ব্যস্ত মফস্বল এবং ব্যবসাকেন্দ্র। একটা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে উঠল, গড়ে উঠল প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্কুল এবং কলেজ।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment