Thursday, 22 January 2026

"রানী টি স্টল"

লর্ডস মোড়ের অনতিদূরে একটা ছোট্ট চায়ের দোকান। না কোন ভুল করা যাবেনা, ওখানে বিভিন্ন দামের চায়ের পাতা বিক্রি হয় না, সেখানে চা তৈরি করে বিক্রি করেন রানী দি বলে এক মাঝবয়সী ভদ্রমহিলা। টিনের ঘেরাটোপে একটা  ছফুট লম্বা ও চার ফুট চওড়া বাক্স যার নীচের অংশ তালা দিয়ে বন্ধ, মাঝের অংশে স্টোভ,কেটলি, চা তৈরির সরঞ্জাম এবং কাচের গ্লাস, কাগজের কাপ/ গ্লাস, মাটির ভাঁড় এবং ইঞ্চি দশেক উঁচু তিন দিক ঘেরা একটা রেলিং যেখানে সারি সারি কাচের বয়ামে নানা ধরনের বিস্কুট ও কেক। ওর ই মাঝে রয়েছে ফোটানো দুধের একটা মাঝারি সাইজের গামলা।  মাথার উপরে টিনের শেড রোদ বৃষ্টি থেকে রানীদির মাথাও বাঁচায় আবার কাস্টমারের মাথাও। আগে পাঁউরুটি ও ঘুগনি খেত অনেক লোক কিন্তু আজকাল একা হয়ে যাওয়াতে ওসব হাঙ্গামায় আর যান না। ওঁর চায়ের স্টলের সামনে রাস্তাটা বেশ চওড়া থাকায় ফুটপাতটাও বেশ প্রশস্ত এবং সামনে ও দুপাশে তিনটে বেঞ্চ পাতার পরেও লোকজনের যাতায়াত করায় কোন অসুবিধা হয়না। চায়ের গুণমান ভাল হওয়ার জন্য  অটোওয়ালা, ট্যাক্সি ড্রাইভারদের ভিড় সবসময়ই লেগে রয়েছে কিন্তু ভদ্রমহিলা শান্তভাবে স্মিত হাসিতে সবাইকে চা খাইয়েই চলেছেন।

গাড়ির পলিউশন কন্ট্রোল সার্টিফিকেটটা রিনিউ করা দরকার কারণ আজকাল পুলিশ ধরলেই হাজার দুয়েক টাকা ফাইন করবে। বেরিয়েছি কিন্তু তাড়াহুড়োয় চা খাওয়া হয়ে ওঠেনি। বেশ লম্বা লাইন, অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আমার পালা এল। পাঁচ সাত মিনিটের ব্যাপার কিন্তু লম্বা লাইনে চায়ের তেষ্টা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। কাছাকাছি দুচারটে দোকান থাকলেও আমার ভ্রাতৃপ্রতিম চালক বলল যে আমাকে এমন জায়গায় চা খাওয়াবে যে চিরদিন মনে থাকবে। একটু বাদেই এসে গেলাম রানীদির দোকানে। ভিড় আজ একটু বেশিই মনে হচ্ছিল। বিজয় রানীদির বেশ পরিচিত। চোখের ইশারায় জানালো একটু অপেক্ষা করার জন্য। নতুন করে চা বানিয়ে বড় মাটির ভাঁড়ে চা এর সঙ্গে একটু বাহারি বিস্কুট ও এল। সাধারণত লিকার চা খাই কিন্তু মাঝে মধ্যে একটু দুধ চা খেতে মন্দ লাগে না। দুধ চায়ে চুমুক দিতেই একটা দারুণ তৃপ্তি অনুভব করলাম , ভেতরটা বেশ ভিজে গেল। আরও এক কাপ চায়ের অর্ডার দিলাম। এবার দাম চুকানোর পালা। কত হয়েছে জিজ্ঞেস করতেই বিজয় বলল যে রানী দি কোন দাম নেবেনা। অবাক হয়ে গেলাম, ভাবলাম যে হয়তো বিজয় ওঁর বিশেষ পরিচিত হওয়ার জন্য উনি দাম নিতে অস্বীকার করছেন। একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম দুভাঁড় চা ও বিস্কুট খেয়ে পয়সা না দেওয়ার জন্য। আশ্চর্যের ব্যাপার এটাই যে রানী দি কারো কাছেই আজ পয়সা নিচ্ছেন না। আকাশ থেকে পড়লাম যে একজন সামান্য টি স্টলের মালকিন বিনা পয়সায় আজ সবাইকে চা ও বিস্কুট খাওয়াচ্ছেন এবং তিনি না কি প্রত্যেক মাসে একটা দিন তিনি সবাইকে বিনা পয়সায় সব কিছু খাওয়ান। কেউ কিন্তু জানেনা যে মাসের কোন দিন তিনি বিনা পয়সায় খাওয়াবেন। রানী দির এটা ব্যবসা বাড়ানোর কোন কারণ কি না জানিনা কিন্তু ভাগ্যের জোরেই হোক বা অন্য কোন কারণেই হোক তিনি এটা করেন। আজকের দিনে মানুষ এতটাই স্বার্থপর হয়েছে যে নিজের কথা ছাড়া অন্যের কথা তো ভাবেই না, অন্য কেউ করলেও তাতেও নানাভাবে বাগড়া দেয়। স্বার্থময় জগতে রানী দির মতো অতি সাধারণ মানুষ ও  তাঁদের‌ এইধরণের ব্যবহারে অসামান্য হয়ে যান। রানী দির মতো মানুষ আরো অনেক অনেক হোক যাতে পৃথিবীটা একটু কলুষমুক্ত হয়।

No comments:

Post a Comment