Tuesday, 20 January 2026

"ইন্দ্রপ্রস্থ লজ"

নতুনপাড়ায় চৌমাথার মোড়ে  গোলক বাবুদের বিরাট তিনতলা বাড়ি এই ইন্দ্রপ্রস্থ লজ। তাঁর আরও তিন ভাই অলোক , পুলক ও তিলক ওই বাড়িতেই থাকেন, মেজভাই অলোক ও সেজভাই পুলক দোতলায় থাকেন যদিও হাঁড়ি আলাদা এবং সন্তানসম ছোটভাই তিলক ও তার পরিবার এবং অকৃতদার গোলক বাবু থাকেন তিনতলায় এবং তাঁর খাওয়াদাওয়া ঐ ছোটভাই তিলকের ই সঙ্গে। কন্ট্রাকটার হওয়ার সুবাদে বাড়ির গঠন ও ব্যবস্থা সুন্দর। প্রত্যেক তলায় দুটো বাথরুম ও দুটো রান্নাঘর এবং রান্নাঘর এতটাই বড় যে সেখানে মাটিতে আসন পেতে বসে খাওয়া যেত, এখনকার মতো আলাদা ডাইনিং রুম ছিলনা এবং সাহেবসুবোদের মতো টেবিল  চেয়ারে বসে খাওয়ার রেওয়াজ ও ছিলনা। গোলক বাবুর বয়স হয়ে যাওয়ায় কাজকর্ম আর সেরকম করেন না এবং সংসারে সচ্ছলতা আনার জন্য একতলায় একটু অদল বদল করে তিনটে ভাড়াটে বসিয়েছেন। ঘরের সামনে প্রশস্ত বারান্দা বাড়ির সবাই মিলে বসে গল্পগুজব করার জন্য যথেষ্ট। উঠোনটাও যথেষ্ট বড় এবং একটা টিউবওয়েল তিনতলা পর্যন্ত জল সরবরাহ করছে। ইন্দ্রপ্রস্থ লজের আরও একটা বৈশিষ্ট্য ছিল বাইরের দিকে ব্যালকনি ছাড়াও দোতলায় এবং তিনতলায় লোহার রড দিয়ে বানানো মাঝখানে ফাঁকা ছাদ যার মধ্য দিয়ে সূর্যের আলো একতলায় পৌঁছে যায় এবং যার মধ্য দিয়ে টিউবওয়েলের পাইপ চলে আসে। গোলক বাবু ছাড়া ছটি পরিবার ছেলেমেয়ে নিয়ে সদাই কলতানে মুখরিত থাকতো এই ইন্দ্রপ্রস্থ লজ। বাড়ির নাম কেন ইন্দ্রপ্রস্থ লজ হয়েছিল সে বিষয়টি নিয়ে চিরদিন একটা ধন্দ ই রয়ে গিয়েছিল সবার মনে। সাধারণত বাড়ির নাম বাবা অথবা মায়ের নামে রেখে ভবন বা নিকেতন কিংবা একটু কাব্যিক ছান্দিক ভাবে সুখনীড় বা আনন্দ নিলয়  রাখা হতো কিন্তু কন্ট্রাক্টর গোলক বাবুর মনে কি ছিল কেউ জানতে পারেনি।
বাড়িতে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা থাকলে সবসময়ই একটা প্রাণের সঞ্চার হয় এবং সেটা বেশ রমরমিয়ে ওঠে যখন পাঁচ ছটা পরিবারের বার চোদ্দটা বাচ্চা একত্রিত হয় তখন সেটা একটা আলাদা মেজাজে পর্যবসিত হয়। বাড়ি একটাই, আলাদা বাথরুম, আলাদা রান্নাঘর কিন্তু কোন দেওয়াল নেই তাদের আলাদা করার। মাঝে মাঝেই এই রান্নাঘরের একটা পদ আরও পাঁচটি পরিবারে চলে আসে এবং লজ তখন আনন্দ নিকেতনে পরিণত হয়। সব ছেলেমেয়েরাই নিজেদের বয়স অনুযায়ী গ্রুপ বানিয়ে নিয়েছে কিন্তু  লজের কোন পরিবারের যে কোন অনুষ্ঠান ও লজের ই অনুষ্ঠান হয়ে যায়। বাইরে অক্লান্ত বর্ষণ কিন্তু ঐ বাড়ির ছেলেমেয়েরা বসে গেছে ক্যারাম বা লুডো বা দাবার বোর্ড নিয়ে। পাড়ার প্রত্যেকটি বাড়ির কাছে ঈর্ষণীয় ব্যাপার। স্কুল, পড়াশোনা, খেলাধূলা করার ফাঁকে ছেলেমেয়েরা সব বড় হয়ে গেল আর গোলকবাবুরাও প্রৌঢ়ত্ব পেরিয়ে বৃদ্ধ হলেন, শরীর ধীরে ধীরে অশক্ত হতে থাকলো। ছেলেমেয়েরা স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কেউ সাধারণ কলেজ, কেউ বা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ আবার কেউ কেউ মেডিকেল কলেজে ভর্তি হলো। একসময়ের কলকলে আওয়াজে মুখরিত ইন্দ্রপ্রস্থ লজ কেমন যেন মনমরা বিশু পাগলার মতো হয়ে গেল। বাড়ির সামনের গেটের একটা পাল্লা কে বা কারা চুরি করে নিয়ে গেছে আর অন্যটি ও ঘাড় বেঁকিয়ে এক দিকে কাত হয়ে আছে, অপেক্ষা করছে কখন দুষ্কৃতিরা এসে তাকেও তার বন্ধুর মতো টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাবে। মনে পড়ে সেই দিনের কথা যখন তার মানিকজোড় তারস্বরে আর্তনাদ করছিল বন্ধু বিচ্ছেদের চিন্তায় কিন্তু কেউ কান দেয়নি তার আর্তনাদে, গ্যাস কাটার দিয়ে কেটে নিয়ে গেল তাকে। তার ও ঐ অবস্থাই হতো কিন্তু লজের কেউ এসে পরায় সে যাত্রা রক্ষা পেয়েছে কিন্তু কতদিন সুরক্ষিত থাকবে তাতে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। গোলক বাবু পৃথিবীর মায়া ছাড়িয়েছেন, অলোক, পুলক ও তিলকদের মধ্যেও দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে গোলকবাবুর সম্পত্তির ভাগ নিয়ে। একসময় যারা একে অন্যকে চোখে হারাতো, আজ তাদের মুখ দেখাদেখি বন্ধ। যাঁরা ভাড়াটে ছিলেন, তাঁদের ছেলেমেয়েরা কেউ ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বাইরে চলে গেছে চাকরির সূত্রে, মেয়েদের ও ভাল ই বিয়ে হয়ে গেছে , একসময়ের উচ্ছলিত ইন্দ্রপ্রস্থ লজ আজ এক ভূতুড়ে বাড়ি। ভাড়াটে বিজন বাবুর ছেলে গুঞ্জন বড় ডাক্তার হয়ে ইংল্যান্ডের বাসিন্দা হয়েছে, বন্ধুর মেয়ের বিয়েতে এসেছে কলকাতায়। একঝলক উঁকি দেওয়ার ইচ্ছায় গাড়ি নিয়ে এসেছে নিজের শৈশব যেখানে কেটেছে সেই জায়গায়, স্কুল, পুরনো বন্ধুবান্ধবদের এক আধজনের সঙ্গে ও যদি দেখা হয় এই আশায়। অনেক বদলে গেছে তার শৈশবের শহর, পাড়ার আদল অনেক বদলে গেছে, তাদের  বাড়ি ইন্দ্রপ্রস্থ লজের ফলকটা খোঁজার বৃথা চেষ্টা, সেই জায়গায় উঠেছে এক বিশাল বহুতল দুকামরা, তিন কামরার ছোট ছোট ইউনিট নিয়ে। ছয়টি পরিবার এখন কত ভগ্নাংশে পরিণত হয়েছে সেটা গোণার চেষ্টা না করে অপলক দৃষ্টিতে খানিকক্ষণ চেয়ে পুরনো স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে কখন যে নিজের হোটেলের কাছে এসে পড়েছে খেয়াল নেই। 
ভীষণ ব্যস্ত শিডিউল, চেক আউট করার সময় হয়ে গেছে অথচ জিনিস পত্র ছত্রখান, যেন বলছে আরো কিছুক্ষন থাকলে হয় না?

No comments:

Post a Comment