Wednesday, 4 November 2026

"অথ সারমেয় কথা"

চারিদিকে এখন সারমেয়দের নিয়ে হৈচৈ পড়ে গেছে। এতটাই গণ্ডগোল যে ব্যাপারটা আদালতের দরজা পর্যন্ত গড়িয়েছে। দুই যুযুধান গোষ্ঠী, একদিকে সারমেয় প্রেমী আর অপরদিকে সারমেয় দের দুচক্ষে ঘেন্নাকরা লোকজন। দুই পক্ষেরই শাণিত যুক্তি। প্রেমীরা বলেন," অবলা জীব, ওরা যাবে কোথায়? ওদের ও তো এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অধিকার আছে।।" ওদের খেতে না দিলে ওরা তো এমনিতেই মারা যাবে। অপরপক্ষের যুক্তি যে এই রাস্তার কুকুরগুলো ক্ষিপ্ত হয়ে পথচারীদের কামড়ে দিচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই কুকুরের কামড়ে বেশ কিছু লোক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে। মামলা আদালত অবধি গড়ালো। আদালতের হয়েছে ছুঁচো গেলার মতো অবস্থা। শ্যাম রাখি না কুল রাখি করে একটা মাঝামাঝি জায়গায় পৌঁছাতে চেষ্টা করে বললো যে অবশ্যই সারমেয়কুলের বাঁচার অধিকার আছে এবং তাদের খাওয়ানো খুবই দরকার কিন্তু সেটা একটা নির্দিষ্ট জায়গায় খাওয়াতে হবে এবং সংরক্ষণ করতে হবে যাতে তারা যত্রতত্র ঘুরে পরিবেশ নোংরা না করে এবং কোন লোক যাতে তাদের কামড়ে মারা না যায়। সরকারকে কিছু জায়গা নির্দিষ্ট করতে হবে যেখানে তাদের দেখভাল করতে পশুপ্রেমী দের কোন অসুবিধা না হয়। এই নিদানটা আপাতদৃষ্টিতে যতটা সহজ বলে মনে হয় ততটা নয়। কতগুলো সারমেয় কোন কোন এলাকায় আছে এবং তাদের পুনর্বাসন কিভাবে কোথায় হবে সেটাও যথেষ্ট আলোচনা সাপেক্ষ। তারপর এ পাড়ার দলের সঙ্গে অন্য পাড়ার দলের সঙ্গে মিলমিশ হবে কি না তাতেও বিস্তর সন্দেহ রয়েছে। সুতরাং পশুপ্রেমী বিশেষ করে সারমেয় প্রেমীরা তাঁদের নিজেদের জায়গার কুকুরগুলোকে যথেষ্ট ভালবেসেই সেখানকার নির্দিষ্ট জায়গায় তাদের খাবার দেন। এলাকার বেশ কিছু লোক আছেন যাঁরা বাড়িতে ভাতের সঙ্গে আরও কিছু দিয়ে খাবার বানিয়ে প্লাস্টিকের থালায় খেতে দেন এবং তাদের খাওয়া শেষ হলে সেই প্লেটগুলো নিয়ে তাঁরা চলে যান এবং পরের দিনের প্রস্তুতি নেন। এতে যথেষ্ট পয়সা খরচ হয় এবং তাঁরা সেই টাকা খরচে ও পিছপা হন না কিন্তু সমালোচনার তীর ধেয়ে আসে তাঁদের দিকে যাঁরা এইরকম সারমেয়কুলের সেবা বরদাস্ত করতে একদমই রাজি নন। সারমেয়কুলের জন্য রাখা জলের মাটির পাত্র মাঝেমাঝেই কোন না কোন কারণে উল্টে যায় এবং এই সারমেয়কুল তাদের তৃষ্ণা মিটাতে অসমর্থ হয়। 
তৃষ্ণা সকলের ই পায়, কারো বেশি, কারো কম। কিন্তু এদের তৃষ্ণা না মিটলে স্বাভাবিক ভাবেই এরা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠবে এবং কোন অজানিত কারণেই তারা পথচারীদের আক্রমণ করে এবং অনেক ক্ষেত্রেই তা মৃত্যুর পথে ঠেলে দেয়। 
চারিদিকে বড় বড় হাউসিং কমপ্লেক্স গড়ে উঠেছে যার মধ্যে অনেকগুলোই প্রাচীর বিহীন এবং আশেপাশের লোকজন সেই কমপ্লেক্সের মধ্যে দিয়ে শর্টকাটে যাওয়া আসা করে এবং অনেক ক্ষেত্রেই কমপ্লেক্সের বিভিন্ন লোকদের সঙ্গে তাদের বন্ধুত্ব ও নানাবিধ আদানপ্রদান আছে। আবার কোন কোন হাউসিং কমপ্লেক্স পাঁচিল দিয়ে ঘেরা এবং সেখানে ঢোকা বা বেরানো যথেষ্ট নিয়ন্ত্রিত সিকিউরিটি গার্ড থাকার জন্য। সেখানে মেইনটেন্যান্স বাবদ অনেক টাকাই গুণতে হয়। অবশ্য সিকিউরিটি ছাড়াও নানাবিধ সুযোগ সুবিধা সেই কমপ্লেক্সের লোকজন ভোগ করেন। আসল কথা হলো ফেল কড়ি মাখো তেল। সুতরাং যত সুযোগ ভোগ করতে চাও সেইমতো টাকা দাও। আলোর পাশেই যেমন অন্ধকার থাকে এখানে ও তার ব্যতিক্রম নয়। ঘেরাটোপে থাকা লোকদের সেবা করার জন্য অবশ্যই কিছু প্রান্তিক মানুষের দরকার হয় যারা বাড়িতে ফাইফরমাশ খাটে বা রান্নাবান্না করে এবং তারা অবশ্যই আসে সেই ঘেরাটোপের বাইরে থাকা বস্তি থেকে। গোলাপ বাগে গোলাপ তুলতে গেলে কিছু কাঁটা হাতে ফুটতেই পারে। এরা আমাদের জীবনের অঙ্গ, এদের ছাড়া আমরা চলতে অসমর্থ। বস্তিবাসীদের সঙ্গে ঘেরাটোপের বাসিন্দাদের অনেক পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও এরা পরস্পরের পরিপূরক।
ঘেরাটোপ কমপ্লেক্সের মধ্যে সারমেয় বা মার্জারকুল সিকিউরিটির কড়া নজর এড়িয়ে ঢোকে কিনা জানা নেই কিন্তু খোলা হাট হাউসিং কমপ্লেক্সে তাদের খুব একটা না হলেও অবাধ বিচরণ আছে এবং তাদের এই উপস্থিতি এই উপনগরীবাসীর মধ্যে কিছু বিভেদ সঞ্চার করছে। একটু সহনশীলতা দুই পক্ষেরই দেখানো প্রয়োজন। এখন এই খোলামেলা উপনগরীতেও খোলা ড্রেন দেখা যায় না বা টিউবওয়েল গুলো কোথায় অন্তর্হিত হয়েছে। তা এই সারমেয়কুল বা মার্জারকুল তাদের তৃষ্ণা কি করে মেটাবে এটা যদি সবাই একটু সহৃদয়তার সঙ্গে বিবেচনা করেন তাহলে সমস্যার অর্ধেক সমাধান হয়ে যায়। মানুষ খিদের জ্বালায় বা তেষ্টায় পাগল হয়ে যায় তো এই অবলা জীবগুলো তার ব্যতিক্রম কি করে হবে?  যাঁরা কষ্ট করে নিজেদের পকেটের পয়সা খরচ করে এই পশুপাখিদের খাওয়াচ্ছেন তাঁদের প্রতি একটু সহমর্মিতা দেখিয়ে এই অবলা জীবগুলোকে একটু বাঁচতে দিন। আবার অপরপক্ষের যুক্তি কেও ফেলে দেওয়ার নয়। রাস্তার কুকুরের কামড়ে মৃত্যুও অনাঙ্কাখিত। আর সবচেয়ে  বড় কথা মানুষের জীবনের চেয়ে  তো কুকুরের জীবন বেশি মূল্যবান হতে পারেনা। সুতরাং , তাদের  যেভাবেই হোক না কেন বর্জন কর ।
 কিছুক্ষণ আগেই আকাশ ভাঙা বৃষ্টি থেকে বাঁচতে  বয়সের ভারে ন্যুব্জ এক বৃদ্ধ কুকুর যে দৌড়বার ক্ষমতাটা ও হারিয়ে ফেলেছে সে অসহায় দৃষ্টিতে একবার আকাশের দিকে আর একবার ইতিউতি কোথাও ঠাঁই পাওয়া যায় কিনা তা দেখছে কিন্তু সমস্ত গেট বন্ধ আর তার নিজেরও শরীরটাও নীচু করে যে গাড়ির তলে আশ্রয় নেবে তাতেও সে অসমর্থ। এই দৃশ্য দেখেও কি কেউ চুপ করে থাকতে পারে বা কোন গেটের ফাঁক দিয়ে যদি সে ঢুকে পড়ে একটু শরীরটাকে বৃষ্টি থেকে বাঁচাতে, তাহলে কি তাকে হ্যাট হ্যাট করে তাড়িয়ে দেওয়া যায়? এদের নাই তো কোন ডানা ,কেমন করে উড়বে সেতো মেলে যে তার পাখনা? অতএব, তার ভেজা ছাড়া যে উপায় নেই।
একটু ভাবতে সবাইকে অনুরোধ জানাই।


Saturday, 31 October 2026

"পোস্ট কার্ড"

ভাড়া বাড়িতে থাকি, বাড়িওয়ালা নোটিশ দিয়েছে বাড়ি ছাড়ার জন্য। অনেকেই আছে যারা বাড়ি ছাড়তে চায়না এবং তর্ক বিতর্কের মধ্যে গিয়ে শেষমেশ মামলা মোকদ্দমায় জড়িয়ে রেন্ট কন্ট্রোলে বাড়ি ভাড়া জমা করে বাড়িওয়ালার কালঘাম ছুটিয়ে দেয়। পশ্চিমবঙ্গের বাড়িভাড়া সংক্রান্ত আইন সবই ভাড়াটেদের পক্ষে এবং এই কারণেই বাড়িওয়ালারা চট করে স্থানীয় লোকদের ভাড়া দিতে চায় না। কিন্তু রজত এক কথার মানুষ। শুভ্র বাবু যখন জানালেন যে বাড়িটি তাঁর দরকার তখন রজত আর কথা না বাড়িয়ে ছেড়ে দেবে বলল যদিও তার ও পৃথার সংসারে নতুন অতিথি আসতে চলেছে। এই অবস্থায় বাড়ি বদলানো বেশ ঝকমারি ব্যাপার।
গোছগাছ চলছে এবং অপ্রয়োজনীয় জিনিস ছাঁটকাট করে নিতে হচ্ছে কারণ নতুন বাড়ি বা ফ্ল্যাটটা অপেক্ষাকৃত ছোট এবং ভাড়াটাও একটু বেশিই। কিন্তু উপায় নেই এছাড়া কারণ বাড়ির সংখ্যা তখন এতটাই কম ছিল যে ভাড়াটেরা একবার ঢুকলে আর ছাড়তেই চাইতো না। টুকিটাকি গোছাতে গোছাতে কয়েকটা পোস্টকার্ড ও ইনল্যান্ড লেটারের গোছা চোখে পড়লো। রজতের একটা বদভ্যাস ছিল চিঠিগুলো পড়া হলেও ও কখনো ছিঁড়ত না। হোস্টেলে থাকাকালীন এই অভ্যেসটা যে শুরু করেছে যা এখনও ছাড়তে পারেনি। রবার ব্যাণ্ড দিয়ে পরপর চিঠিগুলো সে রেখে দিত। মফস্বলের ছেলে, কলেজ শেষে অবসর সময়ে বাবা, মা বা দাদুর চিঠিগুলো বারবার পড়তো আর তাদের মুখগুলো ভেসে উঠতো চোখের সামনে। কখনো কখনো  জলে ভিজে উঠতো তার চোখ বিশেষ করে মায়ের হাতের রান্নার কথা যখন মনে পড়তো আর হোস্টেলের মুরারি ঠাকুরের ট্যালটেলে ডালের সঙ্গে অবশ্যম্ভাবী তুলনা চলে আসতো। কিন্তু তাদের জায়গায় একটা কলেজ ছিল কিন্তু সেরকম ভাল  না হওয়ায় তাকে আসতে হয়েছে শহরে। একটু বেশি রকম পেটুক বলেই হয়তো তার কষ্টটা আরো বেশি হতো। বাবার হাতের লেখা, মায়ের লেখা এবং দাদুর লেখাগুলো প্রত্যেকেই যেন এক বিশেষ বার্তা বহন করে নিয়ে আসতো। দাদুর সম্বোধন ছিল স্নেহের ছুটকু, বাবার ছিল কল্যাণবরেষু শানু এবং মায়ের ছিল স্নেহের ছোটু এবং সবার শেষেই থাকতো আশীর্বাদক দাদু, বাবা এবং মায়ের ছিল ভালবাসা নিও-- ইতি ' মা'।
ছোট্ট হলদে রঙের পোস্টকার্ড, একটু শক্ত কার্ড দাম মাত্র পাঁচ পয়সা আর ইনল্যান্ড লেটার ছিল আকাশের মতো হাল্কা নীল দুই পাতার পাতলা কাগজ যার প্রথম পাতায় উপরের দিকে প্রাপকের নাম ও ঠিকানা লেখার জায়গা চারটে লাইন এবং নীচে থাকতো প্রেরকের নাম ও ঠিকানা লেখার জায়গা। দ্বিতীয় পাতাটা ছিল লম্বায় ও চওড়ায়  অপেক্ষাকৃত ছোট । দ্বিতীয় পাতা প্রথম পাতার উপর ভাঁজ করে প্রথম পাতার বাড়তি কাগজ দিয়ে ঘিরে দেওয়া হতো এবং তার পরে উপরে প্রাপক ও  নীচে প্রেরককে ভাঁজ করে প্রথম পাতার  ভিতরে মাথায় লাগানো আঠাতে একটু জল লাগিয়ে মুখ বন্ধ করে দেওয়া হতো এবং হয়ে যেতো একটু গোপনীয়। দাম মাত্র পনেরো পয়সা অথচ কত গোপনীয় ব্যক্তিগত কথাবার্তা বহন করতো এই ইনল্যাণ্ড লেটার যেখানে পাঁচ পয়সার পোস্টকার্ড ছিল খোলামেলা বিন্দাস। পঁচিশ পয়সার খামে কত যে লেখা  পাতা ভরা হতো তা  ভাবলেই একটু আশ্চর্য লাগে।চৌরাস্তার মোড়ে থাকা লাল একটা লেটার বক্স যেটা একদম শেষে সন্ধ্যেবেলা সাড়ে পাঁচটায় খোলা হতো। এরপরে চিঠি ফেললে পরের দিন সংগ্রহ করা হতো। তখন পোস্টাল ইনডেক্স নাম্বার চালু হয়নি এবং দূরদূরান্ত থেকে চিঠি চলে আসতো আজহার দা বা শচীন কাকুদের মাধ্যমে। টেলিগ্রাম সন্ধে বেলায় এলেই গা টা ছমছম করে উঠতো কোন দুঃসংবাদের সম্ভাবনা চিন্তা করে। ১৫ই আগস্ট,১৯৭২ সালে শ্রীরাম ভিকাজি ওয়েলেঙ্কারের মাথা থেকে বেরিয়ে আসা পোস্টাল ইনডেক্স নাম্বার এক যুগান্তকারী ঘটনা নিয়ে এল। ছয়টি নম্বর সম্বলিত এই পিআইএন ( পিন) এর প্রথম সংখ্যা পোস্টাল জোন, দ্বিতীয় টি সাব জোন , তৃতীয়টি কোন জেলা এবং পরের তিনটি অর্থাৎ চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ নম্বরটি কোন পোস্ট অফিস সেটা বোঝায়। অনেক সরলীকৃত হয়েছে এবং আগে যে ডেড লেটার বক্স যেখানে প্রাপককে যে কোন কারণে ওই চিঠি দেওয়া যায়নি সেগুলো পড়ে থাকতো এবং এই পিন বা পোস্টাল ইনডেক্স নাম্বার চালু হবার পর  তার কলেবর অনেকটাই কমে গেছে। পৃথিবীটাই এখন কত ছোট হয়ে গেছে। চিঠিপত্র আজকাল লেখা প্রায় উঠেই গেছে। মোবাইল ফোনের কল্যাণে আজ পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্ত নিমেষেই যোগাযোগ হয়ে যাচ্ছে। সময় এখন অত্যন্ত মূল্যবান , সুতরাং স্বাভাবিক ভাবেই চিঠি তার জৌলুস হারিয়ে ফেলেছে।

আজ পোস্টকার্ড নেই, নেই ইনল্যাণ্ড লেটার, হারিয়ে গেছে সেই জ্বলজ্বল করা লাল রঙের  লেটার  বক্স। এখন তার জায়গা নিয়েছে রেজিস্টার্ড পোস্ট এবং স্পীড পোস্ট এবং সেটাও পোস্ট অফিসে গিয়েই করতে হয়। আগে আজহার দা, শচীন কাকুরা চিঠি দিয়ে যেতেন বাড়ি বাড়ি ঘুরে এবং তাঁরাও সুখে দুঃখে আমাদের সাথী হয়েই থাকতেন।

চিঠির গোছা নিয়ে ভাবছে রজত কি করব কি করব, হঠাৎ এমন সময় পৃথা পিছনে এসে পিঠে হাত দিয়ে বললো কি, এত কি ভাবছো?
 একটু অপ্রস্তুত হয়েই রজত জানালো যে এই পুরনো চিঠির বাণ্ডিলটা ফেলে দেবে কিনা ভাবছে সে।
"কেন এত চিন্তা করছো তুমি? এরা তোমার এতদিনের সঙ্গী, অনেক সুখ দুঃখের সাথী এরা। এতদিন তুমি সযত্নে এগুলো সামলে রেখে এখন তুমি ফেলে দেবার কথা কি করে চিন্তা করলে?"
ঠিক তাই। কবে দাদু, বাবা ও মা চলে গেছে তাকে ছেড়ে কিন্তু ছেড়ে গেছে তাদের স্মৃতি এই চিঠির মাধ্যমে। তাদের হাতের লেখা সেই সময়ের ঘটনার কথা এমনভাবে তুলে ধরেছে যে চিঠিটা পড়লেই সেই ঘটনাগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। বিয়ের পরে প্রথম লীভ ট্র্যাভেল কনসেশন নিয়ে বাবা ও মাকে নিয়ে বেড়াতে যাবে বলে ঠিক করেছে জানতে পেরেই বাবা পোস্ট কার্ডে চিঠি লিখে দিল যে তোমার মায়ের শরীরটা বিশেষ ভাল যাচ্ছে না, সুতরাং আমরা দুজনেই যেন ঘুরে আসি। না, আমরা দুজনে গেলে নিজের পয়সায় যাব কিন্তু এলটিসি নিয়ে সবাইকে নিয়ে যাব। কিন্তু বলাই বাহুল্য যে রজতের তার বাবাকে নিয়ে আর বেড়াতে যাওয়া হয়নি কারণ তার বাবা কিছুদিনের মধ্যেই অমৃত লোকের পথে যাত্রা করেন। এক একটা চিঠি যা কয়েক লাইনের কিন্তু মনে পড়িয়ে দেয় অনেক গভীর স্মৃতি। তাই পৃথার কথাতেই সম্মতি জানালো সে, চিঠির গোছা থেকে গেল নতুন বাড়িতে একটা কোণে স্থান নিতে।

Thursday, 22 October 2026

"রাজার গামছা"

বহুবছর ধরে সুদূর ইংরেজদের দেশে পাকাপাকি ভাবে বসবাসকারী রায়বাহাদুর সুধীন্দ্র নারায়ণ সিংহ মশায়ের হঠাৎ করেই মনে হলো এবার দুর্গাপূজোর সময় বাংলার নিজের গ্রামের পূজোয় গেলে মন্দ হয়না। ভিটেমাটি ছেড়ে একবার চলে গেলে সেই দালান বাড়ি, ঠাকুরবাড়ি, খামার বাড়ি, পুকুর, জমিজমা সবই বেদখল হয়ে যায়। সেই কবে তাঁর বাবা ডাক্তারি পড়তে পাঠিয়েছিলেন তার পর প্রথম প্রথম দুচার বার এসেছিলেন নাড়ীর টানে। তারপর বাবা এবং মা গত হবার পর ফিরে আসার সেই টানটা ক্রমশই শুকিয়ে আসতে শুরু করলো। কিন্তু একেবারে কি ভোলা যায় শৈশবের সেই পুরনো দিনের কথাগুলো? ব্যস্ততার মাঝেও সেই বিলের মধ্যে ভেলায় চড়ে বেড়ানো বা আমগাছে উঠে আম পাড়া( যদিও লোকজন ই ঐসব কাজ গুলো করতো) বা  বটের ঝুড়ি ধরে হিতু মুনিষের ছেলের সঙ্গে দোল খাওয়া মাঝে মাঝেই মনে পড়ে যায় আর নিজের মনেই হেসে ওঠেন। শৈশব এমন ই একটা সময় যখন মনে হয় কবে বড় হব আমরা, কেউ বকবে না কিন্তু যেই না বড় হলাম তখন ই এসে গেল একের পর এক দায়িত্ব আর জীবনের জটিলতা গ্রাস করে নিল সেই অনাবিল আনন্দের দিনগুলো।
হাসপাতাল থেকে অবসর নিয়েছেন সুধীন্দ্র নারায়ণ, এবার আর অন্য কোন দেশ নয়, ফিরবেন সেই শৈশবের গ্রামের বাড়িতে, দেখবেন সেই হিতু মুনিষের ছেলে বা জটেশ্বর জেলের ছেলে যাদের সঙ্গে একসময় বাড়ির কড়া শাসন উপেক্ষা করে তিনি নির্মল আনন্দ উপভোগ করতেন। চিরকালই ধনী এবং দরিদ্রের মধ্যে পার্থক্য আছে এবং দরিদ্র হলেই তারা ভাল হয়না বা তাদের সঙ্গে মেলামেশা করলে ছেলেরা গোল্লায় চলে যায় এই মতবাদটা বড়লোকদের মধ্যে ভীষণ ভাবে সংক্রমিত। সেই কারণেই তারা সবসময়ই ভয়ে ভয়ে থাকে যে এই বুঝি তাদের বাড়ির ছেলেরা ওই গরীবগুর্বোদের সঙ্গে মিশে বখে যাবে। কিন্তু ধারণাটা যে কত ভুল তা বারে বারে প্রমাণিত হয়েছে এবং পাঁকে পদ্মফুল ফোটার মতো ওই গরীব ঘরের ছেলেরাই বড় হয়ে দেশের ও দশের মুখ উজ্জ্বল করেছে আর তথাকথিত বড় বাড়ির ছেলেমেয়েরা বেলেল্লাপনায় শীর্ষ স্থান লাভ করেছে।
ভাগ্যিস সুধীন্দ্র নারায়ণের বিয়ে তাঁর বাবামায়ের উপস্থিতিতেই হয়েছিল এবং তাঁদের ই পাল্টি ঘরের সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ের সঙ্গে হয়েছিল নাহলে সুধীন্দ্র নারায়ণ হয়তো আর ফিরেও তাকাতেন না তাঁর গ্রামের দিকে।

মানুষ যখন অর্থনৈতিক ভাবে বলীয়ান হয়ে যায় বা খ্যাতির শিখরে উঠে যায় তখন তার চারপাশে আলোর একটা বলয় তৈরী হয় এবং সেই বলয় ই তাদের আরো উজ্জ্বল করে তোলে। পাঁচ করলেও প্রচারে পঞ্চাশ হতে সময় লাগেনা। এমতাবস্থায় দেশে রায়বাহাদুর সুধীন্দ্র নারায়ণ গ্রামের বাড়িতে আসছেন পূজোর সময় এই নিয়ে হৈচৈ পড়ে গেছে গ্রামে। কিন্তু সুধীন্দ্র নারায়ণের একদমই পছন্দ নয় এ সামনের লেজ রায়বাহাদুর শব্দটি। তিনি ডাক্তারবাবু নামেই পরিচিত হতে ভালবাসেন এবং পূজোয় এসে তাঁর ফেলে যাওয়া গ্রামবাসী কেমন আছে তার সম্যক ধারণা পেতে চান এবং তাঁর পক্ষে যতটা করা সম্ভব ততটাই তিনি করতে চান এবং এই প্রচার বিমুখ মানুষ আজকের জগতে বিরল। বেশিরভাগ মানুষই নিজেকে আলোকিত দেখতে চান এবং নিকষ কালো অন্ধকারে সামান্য প্রদীপের আলোই যেমন সদর্পে তার উপস্থিতি ঘোষণা করে ঠিক সেই ভাবেই নিজেকে উপস্থাপিত করতে চান। কিন্তু সুধীন্দ্র নারায়ণ একজন শুধু ভাল ডাক্তার ই নন তিনি একজন বিরাট মাপের মানুষ। তিনি নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার আশেপাশের ব্যক্তিকেও আলোয় প্রতিভাত করতে চান। একটা রেলের ইঞ্জিন যদি শুধু নিজে চলে বা অল্পসংখ্যক কামরা নিয়ে চলে সে যতটা স্পীডে চলতে পারে তা অতটা স্পীড কিছুতেই নিতে পারবে না যদি তার সঙ্গে অনেক কামরা জুড়ে দেওয়া হয়। সুধীন্দ্র নারায়ণ কিন্তু এই দ্বিতীয় পর্যায়ের মানুষ। তিনি চান অনেক লোকের উপকার।

 গ্রামে তাঁর বাড়ি একটা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। সুতরাং সেই বাড়িতে বসবাস করা মানে সাপখোপের পাল্লায় পড়া। সুতরাং, নিকটবর্তী শহরের একটি হোটেলে থেকে গাড়িতে আসা যাওয়া করা এবং এই কয়েকটা দিনে শুধু তাঁর নিজের গ্রামটাই নয় আশেপাশের গ্রামের লোকজনকেও দেখে তাদের ওষুধ দেওয়া এবং নিজের সঙ্গে আনা নানারকম ওষুধ গ্রামবাসীদের দিয়ে লোকের উপকার করা। সুধীন্দ্র নারায়ণ অন্য মাপের মানুষ। গরীব গাড়া মানুষের সেবা করার ফাঁকেই মহাষ্টমীর দিন রাজওয়াড়ায় ঠাকুর দর্শন এবং অঞ্জলি নিবেদনের উদ্দেশ্যে একটু দূরে গাড়িতে যাওয়া। গাড়িতে আছে স্ত্রী মেয়ে, জামাই এবং নাতি নাতনি রা। রাজওয়াড়ায় এসে গাড়ি থামলো। বিশাল রাজবাড়ির বেশিরভাগই ধ্বংস স্তূপে পরিণত তবুও নাটমন্দির তার মধ্যেই কিছুটা মন্দের ভালো। সমস্ত রাজবাড়ির গঠন প্রায় একই রকম। চকমিলান বাড়ির মতো। মানে একদিকে তার নাটমন্দির আর তিনদিকে তার ঘর। মন্দিরের বিপরীতে থাকে জলসাঘর যেখানে রাজারা নৃত্যগীত উপভোগ করতে করতে মায়ের পূজো ও হোম দেখতেন এবং বাড়ির মেয়েরা ( রানীমা ও রাজকন্যারা ) পূজো দেখতেন নাটমন্দিরের দুইপাশের দালান বাড়ি থেকে। যিনি যত বড়মাপের রাজা , মাঝখানের ফাঁকা জায়গাটিও ততটাই প্রশস্ত এবং তার ই মানানসই দালান বাড়ি। সিংহ দরজায় গাড়ি এসে থামলো এবং গাড়ি থেকে সুধীন্দ্র নারায়ণ সপরিবারে নামলেন এবং নাতি নাতনিকে পুরনো দিনের কথা বেশ রসিয়ে রসিয়ে বলতে লাগলেন। মন্দিরের গায়ে একটু রঙের ছোঁয়া লাগিয়ে একটু ঝকমকে করার চেষ্টা হয়েছে কিন্তু পারিপার্শ্বিক অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। নাটমন্দিরের ঠিক উল্টো দিকে যেখানে নৃত্যগীতাদি পরিবেশিত হতো তার অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। পলেস্তারা খসে পড়া জানলা ও দরজাগুলো তার রং খুইয়ে শুধু কাঠের উপস্থিতি ঘোষণা করছে এবং জানলায়  ঝোলানো দড়িতে মেলা আছে পুরনো লুঙ্গি ও গামছা । রাজওয়াড়ায় এইরকম অবস্থা দেখবেন এটা সুধীন্দ্র নারায়ণ স্বপ্নেও ভাবেননি। এতক্ষণ নাটমন্দিরের গল্প শোনা নাতি ও নাতনিরাও একটু ধন্দে পড়ে গেছে। " দাদু, এগুলো কি রাজামশাইয়ের পোষাক?" একদম ক্লিন বোল্ড সুধীন্দ্র নারায়ণ। কোন উত্তর নেই তাঁর কাছে। রাজাদের সোনার মুকুট, হীরেজহরতের রাজপোশাক, কোমরে  তলোয়ার ও পায়ের বহু মূল্যবান নাগড়া জুতো কোথায় অন্তর্হিত, তার জায়গায় ঝুলছে পুরনো লুঙ্গি ও গামছা! কালক্ষেপ না করে সবাইকে নিয়ে গাড়িতে উঠে পড়লেন এবং খুবই বিষণ্ণ মনে ফিরে এলেন।

Sunday, 13 September 2026

"কে আমি" (৩)

আত্মানুসন্ধান খুবই ভাল জিনিস এবং প্রত্যেক মানুষের এটা করা উচিত যাতে গতকালের চেয়ে নিজেকে আরও একটু উন্নত করা যায়। কিন্তু শত চেষ্টার পরেও নিজেকে পুরোপুরি জেনে ওঠা সম্ভব হয়না। আমাদের অন্য কারো সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করলেই আমরা গড়গড় করে তার সম্বন্ধে বিস্তর কথা বলে দিতে পারি এবং অবশ্যই তার মধ্যে ব্যজস্তুতি অলঙ্কারে নানারকম খারাপ কথা মিছরির মোড়কে  ঘিরে দিয়ে অবলীলাক্রমে বলে যেতে পারি বেশ হাসি হাসি মুখ করে। অথচ এগুলো বলার সময় একবারও ভেবে দেখিনা যে আমাদের এর থেকে হাজারটা বেশি অপগুণ রয়েছে।

 আজকের দিনে আমার কথা একজন ব্যাঙ্কের আধিকারিককে নিয়ে। ভদ্রলোকের নাম নেওয়া সমীচীন হবে কিনা ঠিক বুঝতে পারছিনা কিন্তু তিনি তাঁর সহকর্মীদের মধ্যে এতটাই পরিচিত যে কথাগুলো শুনতে শুনতে তাঁরা বলে উঠবেন যে আরে এ তো আমাদের অসিতবরণ রায়ের কথা বলছেন এবং  মায়ের কাছে মামার বাড়ীর গল্পের কথা বলতে এসেছেন। হ্যাঁ খানিকটা হয়তো তাই, তবে আমার চোখে যতটুকু ধরা পড়েছেন তিনি, সেটুকুই বলবো এবং অনুরোধ জানাবো যদি আরও কিছু সংযোজন করা দরকার যেটা তাঁদের চোখে পড়েছে এবং আমার চোখ এড়িয়ে গেছে তাহলে সেটাকে অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করব যা তাঁকে আরোও উজ্জ্বলতর হিসেবে তুলে ধরতে পারবে।
ব্যাঙ্কের আধিকারিক বললেই সাধারণ লোকের চোখে ভেসে ওঠে একজন গোমড়ামুখো ভারিক্কি চেহারার ভদ্রলোক কাচের চেম্বারের ভিতরে বসে আছেন এবং মাঝে মধ্যে টেলিফোনে কারো সঙ্গে কথা বলছেন কিংবা টেবিলে রাখা ল্যাপটপে গভীর মনোযোগের সঙ্গে কাজ করছেন এবং প্রয়োজনে কোন অধস্তন কর্মচারীর সঙ্গে ইন্টারকমে কথা বলছেন বা ডেকে পাঠাচ্ছেন কোন ব্যাপারে আলোচনার জন্য। কিন্তু কখনোই আমরা এটা ভেবে দেখিনা যে ভদ্রলোক যখন কাচের ঘরে চুপ করে বসে আছেন তখন তাঁর মাথায় যে কি ধরণের সুনামি চলছে, অবশ্য এটা ভাবাও সম্ভব নয়। আধুনিক যুগে পাশের টেবিলে রাখা একটা স্ক্রীনে ব্রাঞ্চের আনাচে কানাচে কি ঘটছে তা ওখানে বসেই সবকিছু দেখতে পান শাখা অধীক্ষক। আগে তো এই সুব্যবস্থা ছিলনা , সুতরাং শাখা প্রবন্ধককে বিভিন্ন জায়গায় উঁকি মারতে হতো সবাই ঠিকঠাক কাজকর্ম করছে কিনা দেখার জন্য। 
প্রত্যেক মানুষের জীবনে কিছু না কিছু সমস্যা আসবেই এবং এটা খুব দরকার কারণ সমস্যা না থাকলে মানুষ মানসিক ভাবে মজবুত হয়ে ওঠেনা। অসিত বাবুর ক্ষেত্রেও তার কোন ব্যতিক্রম নয়। জীবন শুরু এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার ১৯৪৮ সালের ১৪ই মে মদনমোহন বাবু এবং বিভাদেবীর ঘরে তদানীন্তন অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার শ্রীমন্তপুর গ্রামে। গ্রামের অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শুরু শিক্ষা চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত । পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্রেণী সম্পন্ন হয় খাসবাড়ের জুনিয়র হাইস্কুলে এবং সপ্তম থেকে একাদশ শ্রেণী ইড়পালা কৃষ্ণমোহন ইনস্টিটিউশন হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল থেকে। প্রথম বিভাগে হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করার সুবাদে কলকাতার নামী কলেজ স্কটিশ চার্চ কলেজে রসায়ন বিভাগে অনার্স পড়া এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি বিভাগে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে স্বর্ণপদক প্রাপ্তি অসিত বাবুর মেধার পরিচয় বহন করে। ১৯৭১-৭২ সালে উত্তাল নকশালবাড়ির আন্দোলনে কলকাতায় তখন এক টালমাটাল অবস্থা এবং চাকরির বাজারও ছিল মন্দা। কিন্তু সেই অবস্থাও অসিত বাবুকে দমাতে পারেনি এবং কলকাতায় থেকে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অবতীর্ণ হওয়ার জন্য প্রাইভেট টিউশনিকে নিজের পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন যাতে বাবামায়ের উপর কোনরকম চাপ না পরে। মেধার স্বীকৃতি মেলে যখন তিনি সর্বভারতীয় পরীক্ষা ইণ্ডিয়ান ফরেস্ট সার্ভিস এবং ভারতবর্ষের সেরা ব্যাঙ্ক স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ায় প্রবেশনারি অফিসার হিসেবে যোগ্যতা অর্জন করেন। একটু দোলাচলে পড়ে যান তিনি, কিন্তু শেষমেশ ভারতবর্ষের সেরা  ব্যাঙ্ক  স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ায় নিজেকে উৎসর্গ করেন। প্রবেশনারি অফিসার হিসেবে প্রথম পোস্টিং হয় কলকাতা থেকে সুদূর পশ্চিম প্রান্তে গুজরাটের রাজকোটে। তখন সরাসরিভাবে ট্রেনে যাওয়া যেতনা রাজকোটে। সম্পূর্ণ আলাদা সেখানকার জলবায়ু, খাদ্যাভ্যাস,ভাষা এবং সংস্কৃতি কিন্তু এইসব বাধা বিঘ্নকে অতিক্রম করতে হয়েছিল অসিত বাবুকে। 
বিভিন্ন বিভাগে কাজ শিখিয়ে একজন প্রকৃত সুদক্ষ অফিসার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে স্টেট ব্যাঙ্কের ট্রেনিং প্রোগ্রাম এককথায় অতুলনীয়। সেই কারণে অসিত বাবুকে গান্ধীধাম, ব্রোচ, আমেদাবাদ এবং বিশনগর ব্রাঞ্চে যেতে হয়। এরপরেই আসে এক যুগান্তকারী পোস্টিং। ভারতবর্ষের বৃহত্তম ব্যাঙ্কের বৃহত্তম বিদেশ বিভাগ তখন ছিল কলকাতায় এবং সেখানে পোস্টিং পাওয়া ছিল উজ্জ্বলতম ছেলেমেয়েদের জন্য। এখানেই তাঁর প্রতিভা ভাস্বর হয়ে ওঠে এবং পরবর্তী কালে তাঁর লেখা "এক্সচেঞ্জ এরিথমেটিক" বইটি বিভিন্ন ছাত্রছাত্রীদের দারুণ ভাবে সাহায্য করে। 
এরপর তিনি আসেন গড়িয়া শাখায় এবং তারপরে বর্ধমানের আঞ্চলিক অফিসে। বিবিধ শাখায় কাজ করার অভিজ্ঞতা ভারতের সেরা ব্যাঙ্ক তাঁকে মোবাইল ইন্সপেকশন বিভাগে কাজে লাগান এবং লখনৌ, জয়পুর এবং পাটনা জোনাল অফিসে তাঁর অভিজ্ঞতা কাজে লাগায়।এরপর ফিরে আসা কলকাতার ইন্টারন্যাশনাল ব্যাঙ্কিং ডিভিশন কমার্শিয়াল ব্রাঞ্চে এবং সেখান থেকে হাওড়া জোনাল অফিস, গড়বেতা শাখা এবং তাঁর বিবিধ বিভাগে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে কলকাতাস্থিত স্ট্রেসড অ্যাসেটস ম্যানেজমেন্ট অফিসে নিয়োজিত করে এবং ধীরে ধীরে ২০০৮ সালের মে মাসে তিনি সসম্মানে রিটায়ার করেন। কিন্তু তাঁর অভিজ্ঞতা, ব্যাঙ্ক রিটায়ারমেন্টের পরেও কাজে লাগায় এবং বিভিন্ন ট্রেনিং সেন্টারে তাঁর অধীত জ্ঞান কাজে লাগায়।  তাঁর লেখা ভেস্টিজেস অন টাইম আরও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা এবং তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর লেখা স্ট্রেসড অ্যাসেটস ম্যানেজমেন্টের মধ্য দিয়ে।
দীর্ঘদিনের ব্যাঙ্কের কাজের অভিজ্ঞতা এবং সমগ্র ভারতবর্ষ জুড়ে বিভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গে যোগাযোগ কিন্তু তাঁকে শিকড় থেকে উৎপাটিত করতে পারেনি যা তাঁকে আরো উজ্জ্বল করে তুলেছে। ইড়পালা কৃষ্ণমোহন ইন্সটিটিউশনে মেধাবী ছাত্রদের জন্য কুড়িলাখ টাকার ট্রাস্ট তৈরী করা, ইড়পালা রামকৃষ্ণ মিশনে এক লক্ষ টাকা দান এবং তাঁর গ্রামের অবৈতনিক প্রাথমিক স্কুলে ত্রিশ হাজার টাকা দান তাঁকে এক অন্য জগতে স্থান দিয়েছে। সাধারণ লোকের মনে একটা ধারণা রয়েছে যে ব্যাঙ্কের ম্যানেজারকে খুশি না করতে পারলে ব্যাঙ্ক থেকে লোন পাওয়া যায়না, এই ধারণাকে সর্বৈব মিথ্যা প্রতিপন্ন করার জন্য অসিত বাবুর এই দান যথেষ্ট। এই প্রসঙ্গে মাদার টেরিজার এক উদ্ধৃতি খুবই মূল্যবান। তিনি বলেছেন যে আমাদের ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত কিন্তু আমরা অনেক সাধারণ কাজও খুব ভালভাবে করে নিজেদের অনেক উচ্চতায়  নিয়ে যেতে পারি যা সমাজে এক অসাধারণ বিপ্লব আনতে পারে। বিশাল এই দেশ ভারতবর্ষের দাক্ষিণাত্য ছাড়া কর্মসূত্রে পরিভ্রমণ  অসিত বাবুকে তাঁর শৈশবের গ্রামের স্মৃতিকে ভোলাতে পারেনি এবং গ্রামে শিক্ষার পরিকাঠামোর  অপ্রতুলতা তাঁকে সবসময় ভাবিয়েছে  এবং নিজের সাধ্যমত তিনি চেষ্টা করেছেন যাতে গ্রামের  মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা  অর্থাভাবে শিক্ষালাভ  থেকে বঞ্চিত না হয়। তাঁর  এই দানের কথা তুলে ধরার একটাই উদ্দেশ্য যে তাঁকে দেখে অন্যলোকজন  উদ্বুদ্ধ হবে  এবং এই আশায় বুক বেঁধে এই সামান্য প্রতিবেদন।

Wednesday, 19 August 2026

"দাশু ঘরামির পাঁচালী"

গ্রামের উত্তর দিকে দাশু থাকে তার  বৌ,ছেলেমেয়ে নিয়ে । বহুদিন আগে বিশ্বযুদ্ধ লাগার সময় জমিদার বাবুরা বোমার ভয়ে কলকাতা ছেড়ে এসে এখানে গ্রামের পত্তন করেন। চাটিবাটি গুটিয়ে কলকাতার পাট ওঠানো যায় কিন্তু গ্রামে এসে থাকব বললেই তো আর হয়না, ধোপা, নাপিত, মুচি, বামুন, চাষাভুষো এদের ও সঙ্গে করে না আনতে পারলে ঠাটবাট বজায় থাকবে কি করে? আর বললেই তো তারা এসে পড়বে না, তাদের ও খানিকটা জমিজমা, পুকুরের ভাগ না দিলে তারাই বা আসবে কোন দুঃখে? অতএব, খানিকটা নিজেদের প্রয়োজনেই একটু দয়া দাক্ষিণ্য দেখাতেই হয়। এভাবেই এসেছিল দাশুর দাদু হরিশ, পুলু বামুনের দাদু নাড়ু চক্কোত্তি এবং নাপিত, মুচি ও ডোমদের দাদু ঠাকুর্দারা।  যুদ্ধ তো থামলো, মানুষের প্রয়োজন ও দিন দিন বাড়তে থাকলো। শুধু পেটে খেলেই তো হয়না, চাষার ছেলেমেয়েরাও আর চাষবাস করতে চায়না, মুচির ছেলেও আজকাল জুতো, চটি সারাই করে দিন গুজরান করতে চায় না। সবাই পড়াশোনা করে বিএ, এম এ পাশ করে চাকরি করতে চায়। আগে গ্রামে স্কুল ছিলনা, একটু পড়াশোনা করতে গেলেই চার মাইল দূরে  আলের পথ মাড়িয়ে রাজগঞ্জ স্কুলে যেতে  হতো। তখন আজকের মতো স্কুলে মিড ডে মিলের ব্যবস্থা না থাকায় কিছুদিন পরেই স্কুলের পাঠ চুকিয়ে বাপ দাদাদের কাজে হাত লাগাতে হতো। যারা একটু লেগে থাকতো কষ্ট শিষ্ট করে তারা মাস্টারমশাইদের নেক নজরে পড়ে যেত এবং পরবর্তী কালে তাদের অনেকেই শহরে থাকা জমিদার বাবুদের বাড়িতে বিনাপয়সায় থেকে খেয়ে কলেজের পাট চুকিয়ে মাস্টারি বা অন্যান্য সরকারি কাজে যোগ দিত। এরা কিন্তু জমিদার বাবুদের দান চিরদিন স্বীকার করতো এবং গ্রামে এলেই একবার অন্তত দেখা করে তাদের কৃতজ্ঞতা বোধ জানিয়ে যেত। ধীরে ধীরে মূল্যবোধের অবনমনের  সঙ্গে সঙ্গে কারো কারো মনে এটাও জাগতে থাকলো যে ওঁরা তো নিজেদের প্রয়োজনে আমাদের জন্য এই জমিজমা বা পুকুর দিয়েছেন, এমনি এমনি তো দেননি। কিন্তু এই কথাটা ভুললে চলবে না যে এই পৃথিবীতে কোন কিছুই বিনামূল্যে পাওয়া যায় না। দুর্ভিক্ষের সময় যখন মানুষ একটু ভাতের ফেন চাইতো বা ঘাস,পাতা খেয়ে পেট ভরাতো সেইসময় তাদের জমির ধান বা পুকুরের মাছ পাওয়া একটা বিরাট ব্যাপার ছিল। যুদ্ধোত্তর কালে ভূমি সংস্কার আইন পাস হলো এবং লাঙ্গল যার জমি তার
স( অপারেশন বর্গা) চালু হয়ে গ্রামের সম্প্রীতিকে একদম নষ্ট করে দিল। যে দৈত্য এতদিন বোতল বন্দী ছিল তাকে বোতলের বাইরে এনে এক ভীষণ অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো এবং জমিদার বা বড়লোকদের জোতদার ও শোষক বলে ছাপ মেরে দেওয়া হলো এবং যারা এতদিন শান্তিতে বসবাস করছিল তাদের মনের মধ্যে বিষ ঢেলে দিয়ে এই মধ্য মেধার লোকজন নিজেদের একটা কেউকেটা বলে মনে করতে লাগলো। এইসব লোকজন সবাই যে অসৎ ছিলেন তা নয় কিন্তু ক্ষমতার অলিন্দে একবার ঢুকলেই মাথাটা ভারী হয়ে যায়। অনেক জায়গায় এই জমিজমার মালিকরা প্রাণ হারান তাঁদের ই একসময় প্রতিপালিত প্রজাদের হাতে। আরও কিছুদিন পরে এই গজিয়ে ওঠা নেতারাও এই দৈত্যদের হাতের ক্রীড়নক হয়ে পড়েন এবং আজকের রাজনীতির মূলকথা জোর যার মূলুক তার। সুতরাং লাঠালাঠির যুগে যার লাঠি বেশি মজবুত, সেই টিকে থাকবে। নেতার মান কেমন হবে সেটা নির্ভর করে তার হাতে কত টাকা রয়েছে, কতজন লেঠেল, কতজন গুণ্ডা ও বোমাবাজি করার লোক আছে। রাজনীতির অঙ্গনে আজ এইসব ষণ্ডা গুণ্ডাদের জয়জয়কার। নীতিবোধ নিয়ে চলা রাজনৈতিক নেতারা আজ অচল এবং আঙুলে গুণে বলা যায় কজন আছেন এইরকম সব লোকজন।

দাশুর বাপ ঠাকুর্দাও এই ঘরামির কাজ করতো। কিন্তু শুধু ঘরামির কাজে তো পেট ভরে না, বাবুদের দেওয়া জমিতে চাষাবাদ করে নানারকম ফসল ফলিয়ে সংসার মোটামুটি ভাবে চলে যেত। দাশুর ছেলেমেয়েরা এখন বাবুদের দেওয়া জমিতে গড়ে ওঠা স্কুলে পড়াশোনা করে। পয়সাকড়ি লাগেনা আর সরকারের দেওয়া মিড ডে মিলে ছেলেমেয়েদের একটা বেলা খাবার জুটে যায়। এছাড়া রয়েছে সরকারি রেশন ব্যবস্থা, যাতে রেশনের চালগম খেয়েও খানিকটা বাজারে বিক্রি করে দুটো পয়সা আসে। দাশু এছাড়াও করে সাইকেল রিপেয়ারিং এবং খুচখাচ নানারকম কাজ। একটাই ইচ্ছা তার, যাতে তার ছেলেমেয়েকে আর তার মতো ঘরামির কাজ করে না খেতে হয়। পূজো এগিয়ে আসছে। পাড়ায় পাড়ায় প্যান্ডেল বানানোর কাজ শুরু হয়ে গেছে। নানা জায়গায় খুঁটি পূজো হয়ে‌গেছে এবং রামবাবু নানা জায়গায় কন্ট্রাক্ট ধরার চেষ্টা করছেন। খুবই ব্যস্ত এই দুই তিন মাস। দাশু একটা প্যান্ডেল বেঁধে আরেকটা পাড়ায় বাঁধতে চলে যায়, বাড়ি আসা তার হয়েই ওঠেনা। দাশুর বউ তার ছেলে মেয়েদের নিয়ে বাড়ি সামলায় আর প্রতীক্ষায় থাকে কবে রামবাবুর কাছ থেকে টাকা নিয়ে সে তাদের জন্য নতুন জামাকাপড় আনবে। রামবাবুও সবসময় পুরো টাকা একসাথে দিতে পারেন না কারণ তাঁকেও পূজো কমিটি থেকে সব টাকা পেতে হবে। যাই হোক, এইভাবেই এক পূজো গড়িয়ে আর এক পূজো এসে যায়। রামবাবুর ও বয়স হয়েছে। ব্যবসা দেখে মূলত তার ছেলে যার মাথাটা বড়ই গরম। মাঝে মধ্যেই তার থেকে বয়সে অনেক বড় দাশুকে দুচার কথা বিশ্রীভাবে শুনিয়ে দেয়। দাশু কোন কথা বলেনা, আড়ালে জামার হাতায় চোখ মোছে। এতদিনের ব্যবসা, রামবাবুর বাবার আমল থেকে সে রয়েছে। ছেড়েও যেতে পারেনা, কেমন যেন মনে হয় এই ব্যবসাটা হয়তো তার ই। কিন্তু রামবাবুর একটা বড় অসুখ থেকে ওঠার পরে আজকাল প্রায় আসেন ই না আর ছেলেটাও হয়েছে এক অপগণ্ডো। বাপের টাকায় মদ খেয়ে পয়সা উড়িয়ে ব্যবসাটা কে লাটে ওঠানোর জোগাড় করেছে। ধীরে ধীরে কন্ট্রাক্টের সংখ্যা কমছে আর সেখানে টান ধরা মানেই সবকিছুতেই টান ধরা। দাশু পুরনো খদ্দেরের কাছে যায় এবং শুনতে পায় যে রামবাবুর ছেলের ব্যবহারে তারা অত্যন্ত অসন্তুষ্ট এবং তারা কাজ দিয়ে দিচ্ছে অন্য কন্ট্রাক্টরকে। আজকাল তো পাড়ার ছেলেরা নিজেরা প্যান্ডেল বাঁধেনা, তারা এদিকে ওদিকে ঘুরে কাপ্তানি করে আর কার কাছে কিভাবে টাকা তোলা যায় তার ধান্দায় থাকে। এরা কোন না কোন দলের মন্ত্রী বা নেতাদের আশ্রয় পুষ্ট।তোলাবাজি এরাই করে নেতাদের কথায় এবং নেতাদের কাছে যখন সাধারণ লোক যায় তখন একটু মানিয়ে গুছিয়ে নেতারা তাঁর যা নেবার সেটাই বলে দেন এবং ওই চ্যালাদের হাত ঘুরে সেটা নেতাদের কাছে আসে এবং ভাগ বাটোয়ারা তারপর হয়। ওই নেতাদেরও দাশু ছোট থেকেই দেখেছে এবং ঘেন্নায় তাদের ধার মারাতেও সে লজ্জা বোধ করে। আর কিছুদিন যদি চালাতে পারে, ছেলেটা যদি একটু দাঁড়িয়ে যায়, দাশু ছেড়ে দেবে এই কাজ। কিন্তু করবেটাই বা কি? আর কোন কাজ সে ভালভাবে জানেও না। আর দিন দিন বয়স তো বাড়ছে, চাষবাস করতেও যে শরীরের জোর লাগে তা ও আজ কমে আসছে। সুতরাং, ঘুরে ফিরে সেই রামবাবুর ওখানেই যাওয়া এবং তাঁর ছেলের কাছে কারণে অকারণে গালমন্দ শোনা। একদিন হঠাৎ ই রামবাবু দোকানে এসে হাজির এবং তার ছেলেকে দাশুর প্রতি অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুনে ভীষণ বিরক্ত হলেন। ছেলেকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলেন। ছেলে জানালো যে দাশু কন্ট্রাক্ট ধরতে পারেনি এবং সেই কারণেই তার এত রাগ। পরে দাশুকে ডেকে জিজ্ঞেস করায় জানতে পারলেন যে ছেলের অসভ্যতার কারণে কন্ট্রাক্ট হাতছাড়া হয়েছে। কিছু বললেন না তারপর আস্তে করে দাশুকে বললেন যে বাড়িতে তার সঙ্গে দেখা করতে।
দাশু তাঁর কথামতো বাড়িতে এলো। খানিকক্ষণ কথাবার্তা বলার পর রামবাবু বললেন, " দাশু, এই প্যাকেট টা তুই রাখ আর তুই আসিস না এখানে। দাশু হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো আর বললো, বাবু, আপনার বাবার আমল থেকে আমি আসছি এই বাড়িতে, আমার এবাড়ি ছাড়া আর কোথাও জায়গা নেই।'' রামবাবু বললেন, " তুই চিন্তা করিস না, এই প্যাকেটে কিছু টাকা আছে যেটা  আমি তোর টাকা থেকে কেটেই রেখে দিয়েছিলাম। আজ এই টাকাটা তুই নিয়ে যা আর আমি তোকে অন্য একটা জায়গায় বলে দিচ্ছি, সেখানে তুই কাজ করবি এবং তারা আমার থেকেও অনেক ভাল লোক এবং সেখানে তুই আরামে থাকতে পারবি। তোর মতো বিশ্বাসী লোক পেলে ওরাও বর্তে যাবে।" 
বাবু, আমি আর কাজ করবো না, আপনাদের কাছেই কাজ করেছি আর এখানেই শেষ।
ঠিক আছে, এই টাকাটা খুব কম কিছু নয়, এতে তোদের ভালভাবে চলে যাবে এবং তোর ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ ও এতে হয়ে যাবে। এর পরেও কোন প্রয়োজন হলে আমার কাছে আসবি, আমি সাধ্যমত তোর পাশে থাকব।
হঠাৎ আকাশটা কেমন শূন্য হয়ে গেল। গতবছর অবধি কাজের চাপে দাশু পূজোর প্রায় শেষে আসতো সবার জামাকাপড় কিনে কিন্তু এইবছর পূজোতে সময় ই সময়। এবার বউকে নিয়ে ঠাকুর দেখতে বেরোবে।

Thursday, 2 July 2026

"গল্প নয়, লেখক ও নই, তবু কিছু কথা"

জেলা সদরের সবচেয়ে বড় ব্যাঙ্ক, স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইণ্ডিয়া তার ই মতো একটা বড় বাড়িতে যেখানে  কয়েক হাত অন্তর বিরাট বিরাট কাঠের জানলা কাম দরজা যার মধ্যে দুটো বড় কাঠের লম্বা ডাণ্ডা যেটা ওপর নীচ করলে জানলার খড়খড়িগুলো খুলে যায় এবং পরিমিত পরিমাণে আলো হাওয়া আসে সারি সারি ভাবে বারান্দার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চলে গেছে। অনেক কর্মচারী সামনে বসে আছেন কাউন্টারে যারা কাউন্টারের বাইরে লাইনে দাঁড়ানো লোকের কাছ থেকে  চেক বা টাকা ওঠানোর ফর্ম নিয়ে একটা টোকেন দিয়ে দিচ্ছে এবং তাদের সামনে থাকা ব্যাঙ্কের লেজারে লিখে পাঠিয়ে দিচ্ছে পিছনে বসে থাকা ছোট,বড় ও মাঝারি কর্মকর্তাদের কাছে। কাউন্টারের পিছনে বসে আলাদা টেবিল চেয়ারে  বসে থাকা  কর্মকর্তারা পাঠানো চেকগুলো সই করে সাদা প্যান্ট জামা পরিহিত পিওনদের হাতে একটা ছোট খাতায় লিখে পাঠিয়ে দিচ্ছেন ক্যাশিয়ারদের কাছে।  তখন ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তোলা এবং জমা দেওয়া ছিল এক বিরাট ব্যাপার। কোন লোককে জিজ্ঞেস করে যদি এই উত্তর পাওয়া যেত যে সে ব্যাঙ্কে যাচ্ছে তাহলে ধরে নিতে হতো যে সে একটা বিরাট কাজ করতে চলেছে।  ব্যাঙ্ক খোলা মাত্রই অনেক লোক বিভিন্ন কাউন্টারে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে গেল, কেউ টাকা তুলবে, কেউ বা জমা দেবে আবার কেউ বা পাসবই আপ টু ডেট করাবে। ব্যাঙ্কের লোকেরা ভীষণ ব্যস্ত, কারো কথা বলার সময় নেই, ঠোঁটে সিগারেট চেপে সিনেমার নায়কদের মতো কথা বলতে তারা ব্যস্ত নিজেদের মধ্যে এবং কাউন্টারের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন অসহায় ভাবে তাকিয়ে আছে কখন সেই আকাঙ্খিত ভদ্রলোক কাউন্টারে এসে বসেন এবং তাঁরা তাঁদের কাজটা করে বিদায় নিতে পারেন। অনেক সময়ই অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা যেমন বর্তমান রাজনীতি বা বৈদেশিক রাজনীতি নিয়েও জ্ঞানগর্ভ আলোচনা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন তাঁরা, আলোচনায় ব্যাঘাত ঘটলে খুব বিরক্তি সহকারে এসে কাউন্টারে বসতেন এবং লাইনের সামনে থাকা প্রথম ভদ্রলোক খুব মোলায়েম স্বরে হয়তো জিজ্ঞেস করতেন, "ভাল আছেন?" বা আরও একটু বেশি পরিচিত হলে একটা সিগারেট অফার করতেন। একপ্রস্থ এই কাউন্টারে হলে,যাওয়া ক্যাশ কাউন্টারে এবং সেখানেও বিরক্তিভরা ক্যাশিয়ারের সামনে নিজের প্রয়োজনমতো টাকা চাইতে গেলে হয় ভীষণ বুকের পাটা কিংবা আরও একটা সিগারেট খসানো। অনেক সময়ই এমন হতো যে ক্যাশিয়ার একটা সিগারেট নেওয়ার ছলে পুরো প্যাকেটটাই নিজের কাছে রেখে দিত। অবশেষে কাজ সমাধা এবং একটা মহা আনন্দে বাড়ি ফিরে আসা যে ব্যাঙ্কের কাজ হয়েছে।‌ এ তো গেল টাকা তোলার কথা। জমা দিতে গেলে এত হ্যাপা ছিলনা, টাকা নিয়ে জমা দেয়ার ফর্ম বা ভাউচার ভর্তি করে ক্যাশিয়ার বাবুর জন্য অপেক্ষা করা এবং তিনি উল্টেপাল্টে নোটগুলো পরীক্ষা করে টাকাটা নেবেন এবং কাউন্টারফয়েলটা স্ট্যাম্প মেরে একটা দুর্বোধ্য কলমের আঁচড় দিয়ে ফেরত দিয়ে দেবেন। যদি পাসবুক আপটুডেট করতে হয় তবে সে আরো এক ঝামেলা। একটা দুটো এন্ট্রি থাকলে বকুনি খাওয়ার সম্ভাবনা কম কিন্তু বেশ কিছুদিন না করালে বকুনি খেতেই হবে বা নিদেনপক্ষে একটা বিরক্তিভরা মুখ ব্যাদান দেখতেই হবে। যাই হোক, ব্যাঙ্কের কাজ একটা বিরাট ব্যাপার এবং গ্রাহকদের কাছে ব্যাঙ্কের কর্মচারী ও অধিকর্তাদের ভীষণ চাহিদা এবং তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে সবাই এককাট্টা। কিন্তু সবাই তো একরকম হননা, অনেক সহৃদয় ব্যক্তি আছেন যাঁরা গ্রাহকদের সুবিধা কিসে হবে সেই দিকে নজর দিতেন এবং বলাই বাহুল্য যে তাঁরা সকলের কাছে প্রিয় থাকতেন। কারেন্ট অ্যাকাউন্টে যারা টাকা দেওয়া নেওয়া করতেন তাদের টাকার অঙ্কটা সাধারণত বড় হতো এবং অনেক ক্ষেত্রেই তাঁরা একটা বড় ব্যাগে ছোট বড় সব ধরনের নোটে ভর্তি  করে দিতেন । অনেক সময়ই ব্যাঙ্কের ক্যাশিয়ারদের সঙ্গে বিশ্বাসের মাত্রা এতটাই বেশি থাকতো যে ভাউচারে সই করে কোন টাকা কতটা দিয়েছেন সেটাও লিখতেন না, ক্যাশিয়ার বাবুর গোনা হলে তিনি লিখে দিতেন এবং জমা করে দিতেন। এটা একটা সর্বোচ্চ পর্যায়ের বিশ্বাস এবং এটা কখনোই এক দিনে আসেনা। কারেন্ট অ্যাকাউন্টের লেজার এক দেখার মতো জিনিস। বিশাল মোটা একটা চামড়ায় বাঁধানো রেজিস্টার যেটা তোলা  বা নামানো যে সে লোকের কম্মো নয় এবং তিনি সযত্নে একটি টেবিলের উপর থাকতেন। কর্মচারীরা চেক নিয়ে এসে এখানে পোস্ট করতেন  এবং আধিকারিকদের এখানে এসে সই করতে হতো কারণ ওটা নিয়ে নাড়াচাড়া করাটা খুব সহজসাধ্য ছিল না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছুই বদলে গেছে। এইরকম মোটা চামড়ায় বাঁধানো জাবদাখাতাগুলো আর্কাইভে স্থান পেয়েছে। সেভিংস ব্যাঙ্কের লেজারগুলো ছোট হলেও সেগুলোও বাঁধানো হতো। ধীরে ধীরে খোলা সিট দিয়ে কাঠের ফ্রেমে বাঁধানো হলো এবং ধীরে ধীরে তাও বদলে এল এ এল পি এম বা অ্যাডভান্সড লেজার পোস্টিং মেশিন। কিছুদিন পরে তাও বদলে গেল এবং ব্যাঙ্ক মাস্টার এবং তার ও পরে এল পুরোপুরি কম্পিউটারিজেশন। এখন অনেক লোক আর ব্যাঙ্কে কাজ করেনা, সেই কাজগুলো করে কম্পিউটার। আগে এক ই শহরে দুটো ব্রাঞ্চ থাকলে এক  ব্রাঞ্চ থেকে অন্য ব্রাঞ্চে থাকা টাকা তোলা যেতনা। বিদেশ থেকে আসা কোন কাস্টমার যখন এই ধরণের কথা বলতেন তখন হাঁ করে সবাই শুনতো এবং তিনি চলে গেলে মুখ টিপে হাসতো, ভাবতো নির্ভেজাল মিথ্যে বা গুল দিয়েছে। এ তো গেল এক ই শহরের  এক শাখার টাকা অন্য শাখা থেকে তোলা। এটা কি কখনো  ভাবা গিয়েছিল যে এক শহরের টাকা অন্য শহরে অতি অল্প সময়ের  মধ্যেই ঢুকে যাবে? হ্যাঁ , তাও সম্ভব হয়েছে আর টি জি এস( রিয়েল টাইম গ্রহ সেটেলমেন্ট ) বা এন ই এবং টির
( ন্যাশনাল ইলেকট্রনিক ফাণ্ড ট্রান্সফারের )  বা আই এম পি এস( ইমিডিয়েট পেমেন্ট সার্ভিসের ) মাধ্যমে । 
আগে কারেন্ট অ্যাকাউন্টের লেজার ব্যালান্স হতো প্রতি সপ্তাহের শুক্রবার এবং সেভিংস ব্যাঙ্কের লেজারগুলো মাসে একবার। ফিক্সড ডিপোজিটগুলো হতো তিনমাস বা ছয়মাসে একবার। সেভিংস ব্যাঙ্কের লেজারের সংখ্যা বেশি হওয়ায় প্রত্যেক দশটা বা পনেরটা লেজারের জন্য একটা প্রোগ্রেসিভ বুক এবং কয়েকটি প্রোগ্রেসিভ বুক মিলে একটা মাস্টার প্রোগ্রেসিভ,  যার ব্যালান্সটা মিলাতে হতো জেনারেল লেজারের ব্যালান্সের সঙ্গে। দিনের শেষে ডে বুক এবং ক্যাশ বুক, জেনারেল লেজার ও জেনারেল লেজার অ্যাবস্ট্রাক্ট। সপ্তাহের শেষে শুক্রবার দিন সাপ্তাহিক অ্যাবস্ট্রাক্ট, এই ছিল ব্যাঙ্কের কাজ। মাসের শেষে পি রিপোর্ট বা পারফর্মেন্স রিপোর্ট পাঠাতে হতো রিজিওনাল অফিসে। আজ সমস্ত দেশে কম্পিউটার আসায় এগুলো সব অতীত। আজ সবকিছুই কম্পিউটার করে , কেবল ঠিকঠাক করে প্রথম এন্ট্রিগুলো করলেই কাজ শেষ। এত লোকের ও দরকার নেই এবং ব্যাঙ্কের লাভের মাত্রাও অনেক বেড়ে গেছে। আজকের প্রজন্মকে খাতাপত্তরে লেখা কাজে ব্যাপৃত হতে হবেনা এবং কোন কাজ কেন করা হচ্ছে তা জানার ও দরকার নেই কেবল কম্পিউটারে ঠিকঠাক এন্ট্রি করলেই কাজ শেষ। যাঁরা কেন কাজটা করতে হচ্ছে জানার চেষ্টা করেন বা করবেন তাঁরা অবশ্যই শীর্ষে আরোহণ করবেন।

 যারা পুরনো দিনের কর্মী তারা অনেকেই এই নতুন কর্মকাণ্ডের সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবহিত নন। প্রতিদিন কিছু না কিছু নতুন জিনিস আসছে গ্রাহকদের সুবিধার্থে  যা মেশিন বা কম্পিউটার ই করছে তবুও  কর্মীদের বা আধিকারিকদের মুখের  হাসি  কোথায় যেন  মিলিয়ে  গেছে । লেজার ব্যালান্স করা একটা কুশলতার পর্যায়ে ছিল যেটা নবীন  প্রজন্মের কর্মীদের করতেই হয়না তবুও  সবাই যেন  ভীষণ ব্যস্ত এবং গম্ভীর, মানুষ যেন খুব বেশি মাত্রায় যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছে এবং ব্যাঙ্ক কর্মীরাও আর পাঁচটা কর্মীর মতো হয়ে গেছে। এর ই মধ্যে যাঁরা কাজ করার সঙ্গে সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের দিকেও নজর দেন তাঁরা একদমই আলাদা এবং তাঁরা এক শাখা থেকে চলে গেলেও লোকে তাঁদের অবশ্যই মনে রাখে।

Thursday, 25 June 2026

"যুগে যুগে মেঘনাদ"

অনেক সময়ই দেখা যায় লেখকরা তাঁদের নিজেদের নাম গোপন করে ছদ্মনামে লিখছেন। ব্রিটিশ রাজত্বে না হয় কারণটা বোঝা গেল কারণ সেই সময় যে কোন ব্যক্তি সরকারের বিরুদ্ধে কিছু লিখলেই মাথার উপর খাঁড়া নেমে আসার সম্ভাবনা থাকতো কিন্তু স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশে মতপ্রকাশের অধিকার তো সবার রয়েছে কিন্তু তা সত্ত্বেও লোকের ছদ্মনামে লেখার প্রবণতা কমেনি। সম্ভাব্য একটা কারণ হলেও হতে পারে যে লেখক কোন লেখা লিখে তার প্রতিক্রিয়া বিভিন্ন বর্গের লোকের মনে কি রকম পড়ে সেটা বোঝার চেষ্টা করেন। নাম প্রকাশ হয়ে গেলে পাঠক তার বক্তব্য লেখকের সামনে খোলাখুলি ভাবে প্রকাশ করতে পারবেনা। আরও একটা কারণ হতে পারে যে শাসকের সমালোচনা করলে তাদের পোষা গুণ্ডা বা ঊর্দিপরিহিত সরকারী কর্মচারীদের রক্তচক্ষুর আড়ালে থাকতে পারা। কারণ যাই হোক, ছদ্মনামে বহু প্রথিতযশা লেখক লিখেছেন এবং যথেষ্ট সমাদর ও লাভ করেছেন। কয়েকজন লেখকের নাম মনে পড়ছে এই সময়ে যাঁরা হলেন:
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর : ভানুসিংহ 
বনফুল: বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় 
হুতোম পেঁচা: কালীপ্রসন্ন সিংহ 
প্যারীচাঁদ মিত্র: টেকচাঁদ ঠাকুর 
প্রমথ চৌধুরী: বীরবল
রাজশেখর বসু: পরশুরাম 
সমরেশ বসু: কালকূট
সুবোধ ঘোষ: কালপুরুষ 
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়: অনিলাদেবী
বিমল ঘোষ: মৌমাছি 
মধুসূদন মজুমদার: দৃষ্টিহীন 
বীরবল: সবুজপত্র 
সুনীল গাঙ্গুলী: নীললোহিত
ধনপতি রাই শ্রীবাস্তব: মুন্সী প্রেমচন্দ।
বিশ্বসাহিত্যের মঞ্চ কাঁপানো লেখক অনেকেই আছেন যেমন 
স্যামুয়েল লংহর্ন ক্লিমেন্স: মার্ক টোয়েন 
এরিক আর্থার ব্লেয়ার: জর্জ অরওয়েল
মেরী অ্যান ইভান্স: জর্জ এলিয়ট 
চার্লস লুডভিজ ডডসন: লুইস ক্যারল
জে কে রাউলিং: রবার্ট গলব্রেথ
আমানতিন অরোর লুইস দু পঁ: জর্জ স্যাণ্ড।
এইরকম বহু লেখক লেখিকা সমস্ত পৃথিবীতে আছেন যাঁদের লেখা বিশ্বসাহিত্যকে  বিভিন্ন সময়ে সমৃদ্ধ করেছে।

লঙ্কেশ্বর  রাবণের জ্যেষ্ঠপুত্র মেঘনাদ  মহাবীর ছিলেন এবং তিনি মেঘের আড়ালে থেকে যুদ্ধ করতে পারতেন। এই মায়াবী যুদ্ধে তাঁর কুশলতার জন্য তিনি স্বয়ং দেবরাজ ইন্দ্রকেও পরাস্ত করেন এবং সেই কারণে তাঁর অপর নাম ছিল ইন্দ্রজিৎ। একবার তো তিনি রাম ও লক্ষণকে নাগপাশে বন্দী করেছিলেন এবং সেই সময় মহাবীর হনুমান সূর্য ওঠার আগে বিশল্যাকরণী না নিয়ে এলে রামায়ণ অন্যভাবে লেখা হতো।
 আগের দিনে যুদ্ধে একটা নির্দিষ্ট  নিয়ম  চালু ছিল। সূর্যোদয়ের পরে শঙ্খনাদ করে যুদ্ধ শুরু  হতো এবং  সূর্যাস্তের পরে তা সেদিনের মতো সমাপ্ত হতো যেটা আজকের  দিনে  একেবারেই  মানা হয়না। রাতের অন্ধকারে বিমান  চুপিসারে এসে বোমা বর্ষণ করে সমস্ত কিছু ওলোট পালোট করে দেবে। এই অগ্রগণ্য লেখকরাও তাঁদের লেখনীর তরবারিতে শান দিয়ে নানান বিষয়ে আলোকপাত করেছেন এবং সমাজকে ঋদ্ধ করেছেন। এঁরাও এক একজন মেঘনাদের সমতুল্য। কোনরকম বিরূপ সমালোচনা এঁদের ব্যাহত করতে পারেনি। আজকের দিনেও অনেক মেঘনাদ আছেন যাঁরা আড়ালে থেকে নিজের পরিচয় গোপন করে সমালোচনার তীর ছোঁড়েন কিন্তু পাল্টা আক্রমণ তাঁদের স্পর্শ করতে পারে না। এঁরাও মেঘনাদের সমতুল।







Monday, 22 June 2026

"আঁধারমানিক"

কোন কিছু লিখতে গেলেই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা মনে পড়ে যায় এবং তাঁকে নৈবেদ্য উৎসর্গ না করে কোন লেখাই যেন সম্পূর্ণতা পায়না। হঠাৎই তাঁর স্ফুলিঙ্গের একটি ছোট্ট কবিতা মনে পড়ে গেল আর বিড়বিড় করে বলে উঠলাম 
"বহুদিন ধরে বহু ক্রোশ দূরে 
বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে 
দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা,
দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু।
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া 
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া 
একটি ধানের শিষের উপর 
একটি শিশিরবিন্দু।"
সত্যিই তাঁর কি ব্যাপ্তি, কি গভীরতা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের চিন্তার ও অগম্য। আমাদের চিন্তা, বোধ বুদ্ধি কেমন যেন তাঁকে ঘিরেই আবর্তিত হয় বারবার যেমন সূর্যের চারপাশে সমস্ত গ্রহগুলো আবহমানকাল থেকে আবর্তিত হয়ে চলেছে।

আমাদের মধ্যে অনেকেই লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে বিদেশে যাই কিন্তু কাছে পিঠে কত সৌন্দর্য্য যে লুকিয়ে আছে যা আমাদের অজানা। এইরকম ই কলকাতা থেকে খুব একটা দূরে নয় প্রায় ১৫০কিলোমিটার দূরে
বর্ধমান জেলার গুসকরা থেকে দশ কিলোমিটার ভিতরে ছোট্ট একটা গ্রাম নূরপুরে থাকা কুটুমবাড়ি রিসর্ট বা গেস্ট হাউস। কুটুমবাড়ি শুনলেই যেন পাওয়া যায় একটা বৈবাহিক সম্বন্ধের গন্ধ, একটা বেশ ঘন মাখোমাখো সম্পর্কের সুবাস। আমাদের অর্জুন সব বিষয়েই যেন সিরিয়াস। কোন কিছু করার আগে তার সম্পর্কে চারিদিক থেকে নানান তথ্য সংগ্রহ করে সকলের সামনে যখন উপস্থাপন করে তখন আর কারও কিছুই জিজ্ঞাস্য থাকেনা। অবশ্য এটা একদিনেই সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতা আসেনা, আসে দীর্ঘ পথ পরিক্রমার পর। কেউ কেউ অতি অল্প সময়েই নিজের প্রতিষ্ঠা পায় আবার কারো হাজার চেষ্টাতেও তা অধরাই থেকে যায়। 
জামাইষষ্ঠী পেরিয়ে গেল সবেমাত্র গতকাল আর তার অব্যবহিত পরেই কুটুমবাড়ি যাওয়া সেই পুরনো দিনের সকাল সকাল জামাইবাবাজীবনের বৌ,ছেলেমেয়েকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার কথা মনে পড়িয়ে দিল। অর্জুন, নকুল,সহদেব ও ধৃষ্টদ্যুম্ন বেরিয়ে পড়েছে তাদের সহধর্মিণীদের নিয়ে( সবার ছেলেমেয়েরাই প্রতিষ্ঠিত এবং বাইরে থাকে)  কমন কুটুমবাড়ির উদ্দেশ্যে  একটা বাস ভাড়া করে। মাঝে ব্রেকফাস্ট সেরে পৌঁছাতে প্রায় বারোটা বেজে গেল। বাঁদিকে লম্বা লম্বা শালগাছগুলো পরস্পরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছে কে আগে ভাগে সূর্যের আলোটা নিতে পারে, পাশে অর্জুন গাছ, ইউক্যালিপটাস ও সোনাঝুড়িও বলছে তোমরা যদি ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনা হও, আমরাও পর্তুগাল বা সেনেগাল হতে পারি। যাওয়া মাত্রই নিজেদের জমিতে লাগানো ড্রাগন ফ্রুট জুস ওয়েলকাম ড্রিঙ্কস হিসেবে পেলাম এবং কর্ণধার হিসেবে যাকে দেখলাম তাতে আমাদের চোখ ছানাবড়া। একটি অল্পবয়সী সপ্রতিভ মেয়ে ইকনমিক্সে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন করে এই হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টকে প্রফেশন হিসেবে বেছে নিয়েছে। সবার আধার কার্ড রেজিস্ট্রেশন হয়ে যাওয়ার পরে স্থানীয় কয়েকটি ছেলে যারা ওই রিসর্ট বা কুটুমবাড়িতে কাজ করে ঘরে ঘরে সুটকেস ও ব্যাগ দিয়ে দিল। শালবনের উল্টো দিকে একটি গেস্ট হাউস যেখানে  এক ই ছাদের তলায় তিনটে ঘর এবং আরও একটি ঘর তার ডানদিক থেকে লক্ষ্য রাখা ম্যানেজমেন্ট হাউসে যেখানে বড় চওড়া বারান্দায় ডাইনিং হল , রান্নাঘর এবং মেয়েটির থাকার ঘর।  ম্যানেজমেন্ট হাউসের পাশে একটি ছোট অথচ সুন্দর মন্দির যা রিসর্টে ঢুকতে গেলেই চোখে পড়বে। ধৃষ্টদ্যুম্নের স্থান হলো মন্দির সংলগ্ন ম্যানেজমেন্ট হাউসে এবং অর্জুন, নকুল ও সহদেব থাকল অপর গেস্ট হাউসে। একটু পরিচয় বিনিময়ের পরেই হাতমুখ ধুয়ে চলে আসা হলো সেই ম্যানেজমেন্ট হাউসের বড় বারান্দায় বা ডাইনিং হলে। মেনু কি আছে জিজ্ঞেস করায় মেয়েটি মুচকি হেসে বললো একটু সারপ্রাইজ আছে স্যার। কোন কথা না বাড়িয়ে সারপ্রাইজের অপেক্ষা করতে লাগলাম। সরু চালের ভাতে যখন বাড়িতে তৈরি গাওয়া ঘি পড়ল সমস্ত জায়গাটা ম ম করে উঠলো ঘিয়ের সুগন্ধে। স্যালাডে নিজেদের জমির লঙ্কা এবং লেবু, নিজেদের জমির টাটকা বেগুন ভাজা, পাবতা মাছের ঝাল ও চরে খাওয়া খাসির মাংসের অপূর্ব স্বাদের পাতলা ঝোল। পাণ্ডবদের যথেষ্ট বয়স হয়েছে, সুতরাং হাজার অনুরোধ ও তাদের টলাতে পারল না আরও একটু মাংস নিতে। দারুণ পেঁপের চাটনি এবং পাঁপড় ভাজা ও ঘরে পাতা খুবই সুস্বাদু দই এবং খাঁটি ছানার রসগোল্লা। সেখানে ও অনুরোধ এবং তাতেও টলানো গেলনা তাদের। এরপর জম্পেশ আড্ডা এবং প্রকৃতির রূপ উপভোগ করা। রোদ পড়ে আসছে, গাছের পাতাগুলো তাদের রঙ বদলাচ্ছে তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আর তিনটি সারমেয় কালু, ঘুন্টুও ভুলুর পায়ে পায়ে সারাক্ষণ লেপটে থাকা । যারা কুকুর প্রেমী অথচ শহর কলকাতায় সেটা ব্যবহারে ফুটে উঠলে চারিদিকে হৈহৈরৈরৈ পড়ে যাবে, তাঁরা প্রাণভরে তাঁদের ভালবাসা বিনিময় করে নিলেন। একটু পরেই সেই অল্পবয়সী কর্ণধার  নিয়ে গেলেন তাঁর বাগান ও পুকুর দেখাতে। ছোট ছোট পেঁপে গাছে বিরাট বড় পেঁপে ঝুলছে, ছোট আমগাছে আমের গুচ্ছ, লেবু, মুসম্বি, কলা, সারি সারি কাঁঠাল গাছ, দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। পুকুর পাড়ে পৌঁছে আন্দাজ করা গেলনা কত মাছ আছে তবে মালকিন জানালেন যে  সেখানে থাকা রুই ও কাতলা প্রায় তিন কেজির এবং অনেক কৈ মাছ আছে সেখানে। পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সেই কালু, ঘুন্টুও ভুলু। বারান্দায় থাকা বেতের সোফায় বসে আড্ডা চলার ফাঁকে অরণ্যে সন্ধ্যা নেমে আসা উপভোগ করা। প্রকৃতি যে কিভাবে রঙ বদলায় তার বর্ণনা স্বয়ং কবিগুরু হয়তো পারতেন এবং তাঁর কলম থেকে নিঃসৃত হতো  সেই অসাধারণ রূপ। ধীরে ধীরে আলো জ্বলে উঠলো এবং শুরু হলো ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। হঠাৎই গেল আলোটা নিভে এবং জোনাকির আনাগোনা শুরু হলো। ওহ্, সেকি দারুণ রূপ। শহর কলকাতায় তো ঝিঁঝিঁর ডাক বা জোনাকির নিরুত্তাপ আলো দেখা তো বিরল ঘটনা। সন্ধে নামার আগে নানান রঙের প্রজাপতির নেচে নেচে বেড়ানো দেখাও  এক দুর্লভ ব্যাপার। অল্পক্ষণের মধ্যেই আলো এল কিন্তু সবগুলো জ্বলছে না মানে ইনভার্টার চালু হয়েছে। এর কিছুক্ষণ পরেই আবার কুটুমবাড়ি আলোয় ঝলমলিয়ে উঠলো, বোঝা গেল সরকারি আলো এসে গেল। রাতে খাবার টেবিলে বসে একটু গান গাওয়া হলো এবং অল্পবয়সী কর্ণধার ও তার সুরেলা গলায় ঝঙ্কার তুললেন । ইতিমধ্যে নকুলজায়া কারেনুমতিও তাঁর সুরেলা গলায় কয়েকটি রবীন্দ্র সঙ্গীত, নজরুল গীতি ও অতুলপ্রসাদের গান পরিবেশন করলেন এবং বোঝা গেল গত নয়মাস সুদূর আমেরিকায় তাঁর যথেষ্ট চর্চা হয়েছে।

অন্ধকারের এক বিশেষ রূপ আছে। আলো নিভিয়ে বসে আড্ডা চলছে এবং মাঝে মাঝেই বিদ্যুতের ঝিলিক এসে দেখিয়ে দিচ্ছে রাস্তাটা। মাঝে মাঝেই হুক্কা হুয়া শব্দে শেয়ালের ডাক শোনা যাচ্ছে আর দলপতি কালু তার দলবল নিয়ে ঐদিকে তেড়ে তেড়ে যাচ্ছে আর ঐ ডাকছাড়ার মালিকরা দিচ্ছে চম্পট। মাঝে মাঝেই পেঁচার ডাক জমাট বাঁধা অন্ধকারের নিস্তব্ধতাকে বাঙ্ময় করে তুলছে। রাত প্রায় সাড়ে বারোটা হলো, এবার একটু বিছানায় গা এলানো দরকার। 
সকাল সাতটায় চা এসে গেছে। ধৃষ্টদ্যুম্ন শরীরটাকে নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করছে। এবার স্নান করে জলখাবার খেয়েই বেরিয়ে পড়ার আয়োজন। তরুণী কর্ণধার দেবস্মিতার একটি বিশেষ গুণ লক্ষ্য করা গেল যে তিনি নিজেই পাখা নিয়ে হাওয়া করছেন যদিও ফ্যান যথেষ্ট জোরেই চলছে। অতিথি অভ্যাগতদের এইরকম যত্ন আত্তি করা আজকাল এক বিরল ঘটনা। সামনে রয়েছে তার বিরাট ভবিষ্যত। তাঁর সহযোগী অক্ষয়, মঙ্গল ও ধর্মের ব্যবহার ও রীতিমতো উল্লেখ করার মতো। আসলে যথা রাজা তথা প্রজা কথাটার সত্যতা এদের ব্যবহারে নজর পড়লো। বাসে মালপত্র ওঠাতে ওঠাতেই গেটের মধ্যে ঢুকল দুটো গাড়ি এবং নেমে এলেন আমাদের ই মতো আটজন ভদ্রলোক। বুঝলাম কুটুমবাড়ির খ্যাতি বেশ ভালই ছড়িয়েছে। প্রার্থনা করলাম সর্বশক্তিমান ভগবানের কাছে এই মেয়েটি যেন তার এই আন্তরিক আতিথেয়তা বজায় রাখে এবং জীবনে আশাতীত সাফল্য লাভ করে।

Monday, 15 June 2026

"বাজার---এক মহামিলন স্থল"

বাজারে যায়নি বা যায়না এরকম লোক খুব কমই আছে, সে যে ধরণের বাজার ই হোক না কেন।আগের দিনে আমাদের দিদিমা, ঠাকুমারা বাজারে যেতেন না বা যেতে হতো না কারণ তখন সেটা ছিল একমাত্র পুরুষদের বিচরণ ক্ষেত্র।  অবশ্য কোন  কোন বিশেষ  ক্ষেত্রে তাঁদের  কথাই ছিল  শেষ কথা যেমন কোন  গয়না গড়াতে হবে বা বিয়ের  সময় বিশেষ  কিছু  শাড়ি কিনতে হবে সেক্ষেত্রে বাড়িতে স্বর্ণকার  আসতেন বা শাড়ির  দোকান  থেকে স্বয়ং মালিক বা তাঁর খাস লোক আসতেন শাড়ির পসরা নিয়ে। গ্রামের দিকে বর্ধিষ্ণু পরিবারে এখনও এই জাতীয় ব্যাপার স্যাপার কিছু দেখা যায় কিন্তু  সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে  মহিলারা  এমন নাক গলিয়েছেন যে পুরুষদের  পৌরুষত্ব আজ ছত্রখান  এবং আজকের দিনে শপিং মলে মহিলাদের ই জয়জয়কার। তা অনেকদিন একচ্ছত্র আধিপত্য ভোগ করেছে পুরুষ সমাজ , এখন একটু জিরিয়ে নিলে মন্দ কিছু হয়না।
কিন্তু বাজার বলতে সাধারণত যা বোঝায় মানে তরিতরকারি বা মাছের বাজার সেখানে প্রমিলা সমাজের এত দাপট নেই। একটা যুৎসই কারণ হলো যে স্নো পাউডার মেখে বা সাজগোজের ঘটা করে গেলে দশটাকার জিনিসটা কুড়ি টাকা বলে পাঁচ টাকা কমিয়ে পনের টাকায় জিনিসটা কিনলে আখেরে লোকসান বই লাভ কিছুই হয়না। তাছাড়া, রোদের মধ্যে ঘুরে ঘুরে গলদঘর্ম হয়ে ঢেঁড়সের ল্যাজ মুড়িয়ে দেখে নেওয়া যে তিনি শিশু না শিশুর কাকা, জ্যাঠা বা দাদামশাই কিনা ,এটা এত সহজ কাজ নয়। দৈবাৎ, দুর্ঘটনাবশত দুচারটে এরকম চলে এলে বা বেগুনে একটাদুটো ফুটো বেরোলে বাবা, দাদুদের যে মুণ্ডুপাত হতো তা তো আর করা যাবেনা, সুতরাং ওই জায়গাটা পুরুষদের ই থাক, গজর গজর করলে হার্টটা অন্তত ভাল থাকবে। সেই কারণে সফ্ট স্কিল যেখানে দরকার সেখানে মহিলারা যাবেন এবং দোকানে গিয়ে  পুরুষ সেলসম্যানদের প্রাণ ওষ্ঠাগত করে ছাড়বেন। হাজার এক টা জিনিস নামিয়ে তারপর নাক সিঁটকে অন্য দোকানে পাড়ি জমাবেন। এঁদের ঠেকাতে যেমন বুনো ওল তেমন বাঘা তেঁতুল করার জন্য দোকানদাররাও তেমন সেয়ানা হয়ে গেছেন এবং তাঁরাও বেছে বেছে অত্যন্ত মুখরা মেয়েদের বিক্রেতা হিসেবে রেখেছেন। তারা ঐরকম মহিলা দেখলেই বুঝতে পারে যে এরা কিনতে আসেনি, বাড়ির ইলেকট্রিক বিল বাঁচিয়ে শপিং মলের ঠাণ্ডা উপভোগ করতে এসেছে। পান চিবোতে চিবোতে জিজ্ঞেস করে ম্যাডাম, আপনার বাজেটটা একটু বলুন তো। তারপর পাঁচ সাতটা দেখিয়েই বলে, সরি ম্যাডাম আপনার ওই বাজেটে আমাদের স্টকের মিল হচ্ছে না। এবার বোঝ ঠ্যালা। যে স্বামীর কপাল খারাপ তাকে তার স্ত্রীর পিছন পিছন চলতে হয় এবং একটু দেঁতো হাসি হেসে দোকান থেকে বিদায় নিতে হয়। এ এক রীতিমতো হিউমিলিয়েশন , একবার এ দোকানে আর একবার ওই দোকানে। বোনাস পেলে বা কিছু বাড়তি ইনসেনটিভ পেলে স্বামীর তখন তোয়াজ হয় এবং তখনই বুঝতে হবে যে পাঁঠাকে বলি দেবার জন‌্য স্নান করানো হচ্ছে। এইসব হক কথা লেখার ফল যে কি বিষময় তার ভাবলেই বুকটা কেঁপে কেঁপে উঠছে। যাওয়া যাক অন্য বাজারে যেখানে সামান্য একটু খারাপ জিনিস হলেও  দুচারটে অভিধান থেকে খুঁজে বের করা শব্দ বিন্যাস কানে ঢুকবে। ঠিক আছে, তখনকার জিনিস তখনই সামলানো যাবে।

এবার আসা যাক পুরুষের একচ্ছত্র সাম্রাজ্য সব্জি ও মাছের বাজারে।  এখানে যে বাজারের কথা বলা হচ্ছে সেটা কিন্তু পাইকারি বাজার নয়, এটা হচ্ছে প্রতিদিনের  খুচরো বাজার। প্রত্যেকটি লোকের ই কিছু পছন্দসই লোক আছে যার কাছে মালপত্র না নিলে মনে হয় বাজারটা ই ঠিকঠাক হলোনা। সোমনাথ, সুকুমার, কাশী, রহমানের কাছে বিশেষ বিশেষ জিনিস কিনতেই হবে। মাসির কাছে শাকের আঁটি ছাড়া বাজারটা তো সম্পূর্ণ ই হবেনা। অশোকের কাছে ফল, দিদির কাছে ফুল 
( বিশেষ করে বৃহস্পতিবার পূজোর ফুলে  একটা আমের শাখা, অন্তত দুচারটে জবা ও তুলসী পাতা থাকতেই হবে) এবং মাছের বাজারে সাধন বা উত্তমের কাছ থেকে নিতেই হবে কারণ ওরা মাছটা বেশ পরিস্কার করে কেটে দেয়। কোন কারণবশত ওরা না থাকলে অন্য কারো কাছে নিতে হয় কিন্তু মনটা একটু খুঁতখুঁত করে। তারপরে ছোট মাছ হলে ভোম্বল বা নারায়ণ বাবু যেরকম পরিষ্কার করে ছাড়িয়ে দেয় বাড়িতে আর বিশেষ কিছু করার থাকে না। পাঁঠার মাংস ফুল মহম্মদ এবং চিকেন টা মতির কাছেই কিনতে হবে। এদের ছাড়া বাজার করাটাই যেন অতৃপ্তির। অনেক সময়ই মুম্বাই যেতে হয়  ছেলের কাছে এবং সেখানে রোহিত বা ফৈয়জ বা মাছ ওয়ালি ইন্দু ছাড়া অন্য কারো কাছে যাওয়া নয়। ওরা যে কিছু কম দাম নিচ্ছে এমন নয় কিন্তু একটা দারুণ সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে এই কেনাবেচার মাধ্যমে। কব আয়া আঙ্কেল শুনলেই মনটা কেমন যেন খুশিতে ভরে ওঠে আসলে আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে যে " আমিটা" লুকিয়ে আছে সেটা পরিতৃপ্ত হয় এবং যে দামটাই তারা বলুক না কেন সেই ভেতরের আমিটা তাতেই সায় দেয়। মাঝে মাঝেই কোন পানু বা সৈয়দ কে আর দেখতে পাওয়া যায়না এবং তাদের বসার জায়গায় অন্য লোক বসলেও ফিরে তাকাতেও ইচ্ছে করেনা, কেবলই মনে হয় অলি বারবার ফিরে আসে অলি বারবার ফিরে যায়। এই বাজারেই গরীব, মধ্যবিত্ত বা বড়লোক আসে এবং নিজের নিজের সাধ্যানুযায়ী তাদের পছন্দের সোমনাথ, সুকুমার বা কাশীর কাছে জিনিস কেনে এবং এই মহা মিলনস্থলে সকলের সমাগম হয়। গ্রামে গঞ্জে যেমন দূরে দূরে গ্রাম  দশবারোখানি মাঝে একখানি হাট, সন্ধ্যায় সেরা জ্বলে না প্রদীপ প্রভাতে পড়েনা ঝাঁট       শহরের বাজার কিন্তু দিনে রাতে সবসময়ই জমজমাট আর আমরা সবাই এই মহামিলন স্থলের প্রতিনিয়ত যাত্রী।

Saturday, 13 June 2026

"অপরিচিত"

বহুলোকের সঙ্গে প্রথম পরিচয়েই কেমন যেন ভীষণ আপন মনে হয় আবার অনেক লোকের সঙ্গে দীর্ঘ পরিচিতির পরেও সম্পর্ক তেমন দানা বেঁধে ওঠেনা। প্লেনে বা বাসে এই জাতীয় সম্পর্ক সেরকম ঘনীভূত হয়না যতটা দূর পাল্লার ট্রেনে সহযাত্রীর সঙ্গে হয়। তাও সেই আলাপচারিতা সীমাবদ্ধ থাকে নিজের ক্যুপের মধ্যে বা বড়জোর পাশের সাইড বার্থের সহযাত্রীর সঙ্গে এবং এই চলার সঙ্গী যদি যাত্রা শুরু স্টেশনের থেকে শেষ পর্যন্ত হয়। মাঝপথে উঠলে বা নেমে গেলে সময়ের সংক্ষিপ্ততার জন্য সেরকম জমে ওঠেনা।
গপ্পিষ্ঠি লোকদের কথা বলতে না পারলে পেট ফোলা শুরু হয় যার অবশ্যম্ভাবী ফল হলো পুরো যাত্রাটার আনন্দ মাঠে মারা যাওয়া। অনেকেই ওপরের বার্থ খুব পছন্দ করেন কারণ তাঁরা একবার ওপরে উঠেই বইয়ের মধ্যে ডুবে যান কিংবা ইদানিং কালের সদা সঙ্গী মুঠোফোন যেখানে ইউ টিউবে নানান জিনিস চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সুতরাং তাঁরা নিজেদের আপন গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেন।
দূরপাল্লার ট্রেন যেখানে যাত্রাপথ চব্বিশ ঘণ্টার বেশি, যদি সন্ধে গড়িয়ে একটু রাতে ছাড়ে তখন প্রথমে মালপত্র রাখা নিয়ে একটু মন কষাকষি হলেও পরেরদিন সকাল বেলায় বেশ স্বাভাবিক হয়ে আসে অবশ্য সেটা যদি মোটামুটি সমপর্যায়ের লোকজন হয়। অনেকেই থাকেন বড় বেশি উন্নাসিক এবং এসি টু টায়ারে একটা ক্যুপে যদি তিনটি বার্থ তাঁদের হয় তাহলে চতুর্থ ব্যক্তি  হিসেবে সেখানে ঘাড় গলানো মুশকিল কিন্তু যদি দুই দুই হয় তবে ব্যাপারটা একটু জমে উঠতে পারে।

চিরাগ যাচ্ছে কলকাতা থেকে বম্বে রাতের ট্রেনে এসি টু টায়ারে কিন্তু তার পড়েছে আপার বার্থ এবং তার পায়ের ব্যথার জন্য সে টিকিট পরীক্ষককে অনুরোধ করছে যে একটা নিচের বার্থ তাকে দেওয়ার জন্য। নিচের দুটো বার্থ ই এক সিনিয়র সিটিজেন দম্পতির। সুতরাং, তাঁদের কারো পক্ষেই উপরের বার্থে যাওয়া সম্ভব নয়। সাইড লোয়ার বার্থেও একজন ভদ্রমহিলা একাই সফর করছেন এবং তাঁর উপরের বার্থে একজন সুদর্শন বাঙালি ভদ্রলোক যাচ্ছেন। চিরাগ বোম্বের লোক হলেও কলকাতার সঙ্গে সম্পর্ক তার বহুদিনের এবং কবে চুপিচুপি যে সেও সিনিয়র সিটিজেন হয়ে গেছে তার খেয়াল ই নেই। টিকিট পরীক্ষক অনেক চেষ্টা করেও চিরাগকে একটা লোয়ার বার্থ জোগাড় করে দিতে পারলেন না। অগত্যা সারা রাত উপরের বার্থে উঠতে না পেরে নিচের বার্থে থাকা ভদ্রমহিলার পায়ের কাছে কোনরকমে একটু বসার জায়গা করে নিয়ে রাতটা কাটিয়ে দিল প্রায় না ঘুমিয়েই। সামনের লোয়ার বার্থে থাকা ভদ্রলোকের একটু অস্বস্তি হচ্ছে তাঁর স্ত্রীর পায়ের কাছে বসার জন্য। শেষমেষ থাকতে না পেরে বলেই বসলেন যে আপনি ওখানে না বসেআমার পায়ের কাছে বসুন। সিংহ বুড়ো হলেও সে তো সিংহ ই। চিরাগ ওখানেই বসতো কিন্তু ভদ্রলোক বেশ লম্বা এবং পা টানটান করে শুলে অবশ্যই তার গায়ে লাথি লাগার সম্ভাবনা। একেবারে তাঁর প্রস্তাব উড়িয়ে না দিয়ে পায়ের কাছে বসলো এবং একটু পরেই ইচ্ছাকৃত না অনিচ্ছাকৃত দুচার বার লাথিও খেল সে। অগত্যা বাধ্য হয়েই সে একবার এই বাথরুমের ধারে বা উল্টোদিকের বাথরুমের ধারে খানিকটা দাঁড়িয়ে, খানিকটা হেলান দিয়ে সারা রাতটা কাটিয়ে দিল। পরদিন সকালে একটা স্টেশনে ট্রেন থামতেই দেখতে পেল যে চায়ের ডিব্বা নিয়ে একটা লোক চায় চায় করে যাচ্ছে। দুকাপ চা একসঙ্গে খেয়ে রাতের অনিদ্রা খানিকটা কম করার চেষ্টা করল। এদিকে ঐ সুদর্শন বাঙালি ভদ্রলোক ও নেমেছেন চা খেতে। চা খেতে খেতেই আলাপ হলো ভদ্রলোকের সঙ্গে। উনি দীপ্ত মুখার্জি, ভাল গান করেন মান্না দে এবং মানবেন্দ্র মুখার্জির। চিরাগ ও রফি ও মুকেশের গান একটু আধটু গাইতো এবং ধীরে ধীরে ট্রেন স্টার্ট করার আগেই উঠে পড়লো তারা। দুই সবে বুড়োর গল্প বেশ জমে উঠলো। ইতিমধ্যে ভদ্রমহিলা ও উঠে পড়েছেন এবং কোনরকমে তারা তিনজন সাইড বার্থে বসে পড়েছে। এদিকে ক্যুপের মধ্যে শোয়া ভদ্রমহিলা বা ভদ্রলোক তখন ও ওঠেন নি। যাই হোক খানিকক্ষণ বাদে তাঁরা উঠলেন কিন্তু তাঁদের ই একজন সহযাত্রী সারারাত কিভাবে কাটালেন সে রাস্তায় ভুলেও গেলেন না। চিরাগ ততক্ষণে দীপ্ত মুখার্জির সঙ্গে নানা বিষয়ে আলোচনায় মেতে উঠলো। ইতিমধ্যে ঐ ভদ্রমহিলা নাগপুরে নেমে যাওয়ায় মিস্টার মুখার্জির অনুরোধে টিকিট চেকার এবং নাগপুরে ওঠা ভদ্রলোককে অনুরোধ করে চিরাগের উপরের বার্থ টা নেওয়ালেন। অনেক রাত অবধি মিস্টার মুখার্জির সঙ্গে চিরাগের খুব ই নীচু স্বরে গল্প চলতে থাকলো এবং ভোরের আলো ফুটে উঠছে এমন সময় কর্জত স্টেশন এসে গেল।  করজত স্টেশনে বাড়তি ইঞ্জিন লাগার জন্য একটু বেশি সময় দাঁড়ায়।ওখানে আলু বড়া ও চা দারুণ সুস্বাদু। চিরাগ একটু বেশি করেই আলু বড়া কিনতে চাওয়ায় ওকে দিতে একটু দেরি হয়েছে এবং ইতিমধ্যে দুভাঁড় চা নিয়ে এসে রেখেছে সামনের  টেবিলে। ইতিমধ্যে ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলা সামনে চা দেখে তাঁরা চুমুক দিয়ে ফেলেছেন আর ট্রেনটাও চলতে শুরু করেছে এবং চাওয়াটাও বিদায় নিয়েছে। চিরাগ এবং মুখার্জি আলু বড়া নিয়ে উঠে দেখে যে তাদের রাখা চা সেই দম্পতি যুগল আরামে পান করছেন। পরে ভুল বুঝতে পেরে জিভ কাটা কিন্তু ততক্ষণে যা হবার তা হয়ে গেছে। দাদার স্টেশনে মুখার্জি নেমে গেলেন কিন্তু চিরাগ নামবে ছত্রপতি শিবাজী টার্মিনাসে। ওখানেই তার গাড়ি আসবে। কয়েকদিন থেকেই চিরাগ ফিরে আসবে কলকাতায়। প্রথম প্রথম মুখার্জির সঙ্গে বেশ ঘন ঘন টেলিফোনে কথাবার্তা চলতো । অনেকদিন হয়ে গেছে , কথাবার্তা নেই দুজনের। আজ সকালে চিরাগ ভাবলো যে মুখার্জির সঙ্গে একটু কথা বলে সম্পর্কটা ঝালিয়ে নিতে। মোবাইলে অনেকবার ফোন করার পর অকস্মাৎ হ্যালো বলে আওয়াজ এল। মিস্টার মুখার্জি, কেমন আছেন? আমি চিরাগ শাহ কথা বলছি, মনে পড়ে ট্রেনে আমাদের আলাপের কথা? কিন্তু এক নিথর নিস্তব্ধতা, অপর প্রান্ত থেকে উত্তর এল আমি মিসেস মুখার্জী বলছি। আপনার নম্বরটা সেভ করা ছিল বলে বুঝতে পারছি যে আপনি চিরাগ শাহ, ট্রেন মেট। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে আমার স্বামী মিস্টার মুখার্জি গতমাসের ১৬ তারিখে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। আবার নিস্তব্ধতা। কেউ কোন কথা বলতে পারছে না। চিরাগ অস্ফূট স্বরে বলে উঠলো দারুণ গাইতেন মিস্টার মুখার্জি মান্না দের গান। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ফোনটা ছেড়ে দিল সে।
অনেক সময়‌ বৃত্ত ছোট হলে স্বল্প পরিচয়েও একজন অন্যের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পারে আবার অনেক  ক্ষেত্রে বহুদিনের আলাপ ও সেই জায়গাটা করে নিতে পারে না। মিস্টার মুখার্জির নম্বরটা ডিলিট করে দিলেও মন থেকে তাঁকে মুছে ফেলা সহজে যাবেনা।

Tuesday, 2 June 2026

"ছোটঘর"

একান্নবর্তী পরিবারে একটা আলাদা মজা। অনেক ভাই বোন একসঙ্গে থাকার ফলে সবসময়ই একটা হৈহৈ রৈরৈ কাণ্ড। আজকাল তো এটা দেখতে পাওয়া একটা বিরল ঘটনা। তবে দেখা যায় আমাদের টিভির নিরবচ্ছিন্ন সিরিয়ালে আর কিছু পারিবারিক ব্যবসায়ীর পরিবারে। কিন্তু যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে মজাটা যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। ব্যবসায়িক পরিবারে জেঠতুতো, খুড়তুতো ভাইবোনেরা সবাই পড়াশোনা আর প্রাইভেট টিউশনের চাপে যেন কেমন সদাই ম্রিয়মাণ। এই ভাই একটা ক্লাসে তো আর এক ভাই ক্রিকেট কোচিং এ যাচ্ছে। নিজেদের মধ্যে খেলে যে অনাবিল আনন্দ পাওয়া, সেটা যেন কোন মন্ত্রবলে উধাও। টিভির সিরিয়ালে বাবা, মা, বড়ছেলে ও তার পরিবার, মেজ ছেলে ও তার পরিবার, বিবাহিত মেয়ে ও জামাইদের আসাযাওয়া, অবিবাহিত ছেলে এখনও চাকরি জোগাড় করতে না পারায় তার সংসার এখনও হয়নি এবং  সংসারে যাবতীয় এটা সেটা খাটার জন্য কেউ কোন অসুবিধা টের পাচ্ছে না এবং অবিবাহিত মেয়ে চাকরি করে বা টিউশনি করে নিজের হাতখরচা চালিয়ে নিচ্ছে কিন্তু কূটকচালিতে ওস্তাদ। এইধরনের সিরিয়ালগুলো মাসের পর মাস, বছরের পর বছর চলে এবং আই পি এল ক্রিকেট না থাকলে আপনি কোপনি পরিবারের এটাই একমাত্র সম্বল এবং তার পরেও সেই সিরিয়ালগুলো নিয়ে আলোচনা এবং কেউ একজনকে আবার কেউ অন্যকে সমর্থন করায় নিজেদের মধ্যেও মন কষাকষি। কিন্তু আমি যে সময়ের কথা বলতে চাইছি সেটা বেশ অনেকদিন আগের।

বড় একটা বাড়ি, অনেকগুলো ঘর এবং তাও  যথেষ্ট বড় ,বাবা মায়ের একটা ঘর এবং  অবিবাহিত ছেলে ও মেয়ের একটা করে ঘর হলেও বিবাহিত ছেলেদের দুটো করে ঘর , ঠাকুর ঘর, বাইরের ঘরে ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে পড়াশোনা করে এবং অন্যসময় অতিথি এলে সেখানে বসেন, বড় রান্নাঘরে যৌথ পরিবারের হেঁসেল এবং বড় বারান্দায় মাটিতে আসন পেতে খেতে বসা(ছুটির দিনে এবং রাতের খাওয়ার সময়) এবং বারান্দার শেষ প্রান্তে ছোটঘর যেখানে বাচ্চা ছেলেমেয়েরা খেলা করে এবং বিশেষ সময়ে সেটা আঁতুড়ঘর হিসেবে বা কেউ অসুস্থ হলে রোগের বিচার করে সেখানে থাকে। কোন কোন বাড়িতে ঠাকুরের স্থান হয় চিলেকোঠার ঘরে এবং খুব বয়স্ক মানুষ হলে( দাদু বা ঠাকুমা)  সেখানে থাকেন এবং সমস্ত ব্যবস্থা সেখানেই থাকে। তখন ছিল পাড়া কালচার এবং একটা পাড়ায় লোকজন বলতে বোঝাতো অমুকের বাড়ি বা তমুক বাবুর বাড়ি। ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে অস্থিরতা বাড়তে লাগল, সঙ্গে সঙ্গে অসহিষ্ণুতাও, রেষারেষি শুধু এবাড়ির সঙ্গে ও বাড়ির নয়, এক ই বাড়িতে ভাইয়ে ভাইযেও সংক্রমিত হতে লাগল এবং পারিবারিক বাঁধন যেন ক্রমশ শিথিল হতে লাগল। যারা একটু সফিস্টিকেটেড তারা ট্রান্সফার নিয়ে বাইরে চলে গেল এবং পরিবারের ভেঙে যাওয়া সাময়িক ভাবে পিছিয়ে দিতে পারল কিন্তু ততদিনে যা হবার তা হয়ে গেছে, জল চুঁয়ে চুঁয়ে পারিবারিক বন্ধনকে ধীরে ধীরে ক্ষয় ধরিয়ে দিয়েছে। আচ্ছা এটা তো বেশ পরের ঘটনা, ফিরে যাওয়া যাক সেই সোনালী দিনের কথায়, সেই ছোটঘরের প্রসঙ্গে।
ওটা নামেই ছোটঘর মানে অন্যান্য ঘরের তুলনায় বেশ ছোট যদিও তা দৈর্ঘ্যে ১২ ফুট এবং প্রস্থেও ১২ ফুট এবং সাবেকি আমলের বাড়ি বলেই উচ্চতাও ১২ ফুট। পূর্ব দিকে একটা বড় কাঠের খড়খড়ি দেওয়া জানলা, ভেতরের দিকে  খোলে কাঁচের ভাঁজ করা জানলা। পশ্চিমদিকে দরজা যা বাড়ির ভেতরের বারান্দায় সংযুক্ত এবং উত্তর দিকেও একটা দরজা যেখান দিয়ে বাড়ির সামনের ঘরের দিকে যাওয়া যায়। ঘরে একটা বেশ বড় তক্তাপোশ, একটা টেবিল  ও চেয়ার এবং ছিল একটা  বইয়ে ঠাসা দেয়াল আলমারি।  ঐ ছোটঘর  আবার আঁতুড়ঘর হিসেবে ও ব্যবহৃত হতো। প্রথমদিকে  দাই এবং  পরবর্তীকালে হাসপাতাল ফেরত পিসিমা বা কাকিমাদের বাচ্চা নিয়ে  স্থান হতো এ ছোট ঘরে এবং  একমাস তারা এককথায়  কোয়ারেন্টাইন অবস্থায় থাকতো। তখন বাচ্চাদের  এত পড়াশোনার চাপ ছিল না এবং স্কুলের পরে খেলা এবং সন্ধে বেলায়  পড়তে বসা। ছুটির দিন বাচ্চাদের  কলকলানিতে বাড়ি একদম মুখরিত  থাকতো। সামনের মাঠে খেলা বা বাড়ির  উঠোনে খেলা বা বৃষ্টি হলে বারান্দায় বা ছোটঘরে খেলা।  মাঝে মাঝেই পাড়ার সমবয়সীরাও এসে যোগ দিত এবং বাড়ি তখন কলরবে মুখরিত হয়ে উঠতো।  ওই সময় ঘরের সংলগ্ন পায়খানা (চিন্তাঘর) বা  বাথরুম কেউ কল্পনাও করতে পারত না। ঠাকুমা, দিদিমার পরিভাষায় হতো সেটা ম্লেচ্ছ বাড়ি। কিন্তু আজকের ফ্ল্যাট বাড়িতে তো সবগুলোই তো ম্লেচ্ছ বাড়ি কারণ প্রতি বর্গফুট জায়গা অত্যন্ত মূল্যবান। আর সেই ছোটঘরের দক্ষিণ দিকের বারান্দায় ও দুটো ঘর এবং তার পাশে কলতলা এবং কলতলা সংলগ্ন বারান্দায় একটা মেয়েদের বাথরুম এবং দুটো চিন্তাঘর এবং কলতলায় পাশে ছেলেদের দুটো স্নান ঘর যদিও ছেলেরা সবাই কলতলায় টিউবওয়েল পাম্প করে জল তুলে স্নান করতো। কলতলা এবং  রান্নাঘরের মাঝে বিরাট বাঁধানো উঠোন এবং বেশ খানিকটা ফাঁকা জায়গা যেখানে পেয়ারা গাছ, আমগাছ এবং নানারকম ফুলগাছ ও তুলসীতলা। রান্নাঘরের সংলগ্ন খানিকটা জায়গায় মাটি যেখানে লেবু গাছ, শিউলি গাছ এবং একটা পীচফলের গাছ ছিল। আর ছিল একটা স্থলপদ্ম গাছ যেটা দূর্গা পূজোর সময় ফুলে ফুলে ভরে থাকতো। এরপর ছিল গোয়ালঘর এবং দুটো পেয়ারা গাছ ও একটা আম গাছ। বাড়ির পিছন দিকে ছিল পাঁচটা ঘর  এবং তারপরেই ছিল বাগান। বাগানের পূর্ব দিকে ছিল একটা কুল গাছ, একটা খেজুর গাছ ও একটা খুব বড় ডুমুর গাছ। আউটহাউসের বাসিন্দাদের জন্য ছিল একটা বাথরুম ও চিন্তাঘর এবং আরও একটা টিউবওয়েল।
বাড়ির একটা বিশেষত্ব ছিল এই যে ছোটঘরের সংলগ্ন খিড়কির দরজা খুললে এবং সমস্ত ঘরের দরজাগুলো খুলে দিলে পূর্ব দিকে ওঠা সূর্যের আলো পশ্চিম প্রান্তে বাইরের ঘরে যাবার রাস্তায় পৌঁছে যেত। সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে ঐ সুন্দর বাড়িও ধীরে ধীরে অন্য হাতে চলে গেল কিন্তু রেখে গেল একরাশ স্মৃতি যা মনে পড়লেই ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে ওঠে।

Saturday, 30 May 2026

আকাল--- সেকাল ও একাল

আকাল বা দুর্ভিক্ষ চিরকালের , আগেও ছিল, এখনও আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। কিন্তু তার গতি প্রকৃতি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে যাচ্ছে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা সরকারের ভ্রান্ত নীতির কারণে এই দুর্ভিক্ষ বা আকাল নেমে এসেছে এবং লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি মানুষের প্রাণ হরণ করেছে। কয়েকটা ঘটনা  এই মর্মান্তিক দৃশ্যের প্রত্যক্ষ সাক্ষী। বিগত শতকে ঘটে যাওয়া এই আকাল কিভাবে জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি মানুষের প্রাণ হরণ করেছে যা ভাবলেই শিউরে উঠতে হয়। প্রথমেই মনে আসে ছিয়াত্তরের মন্বন্তর ১৭৭০ সালে ঘটে যাওয়া এই দুর্ভিক্ষ যা প্রায় ১ কোটি মানুষের প্রাণ হরণ করেছে। ১৭৮৩-৮৪ সালে উত্তর ভারতে ঘটে যাওয়া  দুর্ভিক্ষে প্রায় ১কোটি ১০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দোজি বারায় ১৭৮৯-৯২ সালে ঘটা দুর্ভিক্ষ যা খুলি দুর্ভিক্ষ নামেও পরিচিত প্রায় ১কোটি ১০লক্ষ মানুষের প্রাণ নিয়েছে। এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা কঙ্কাল সৎকারের অভাবে এই (খুলি দুর্ভিক্ষ) নামে পরিচিত হয়েছে। আয়ারল্যান্ডে ১৮৪৫-৫২ সালে তাদের প্রধান শস্য আলু উৎপাদন প্রাকৃতিক কারণে ব্যাহত হওয়ায় প্রায় দশ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। চীনের উত্তর ভাগে ১৮৭৬-৭৯সালে ঘটে যাওয়া দুর্ভিক্ষে আনুমানিক ৯০লক্ষ থেকে ১কোটি ৩০লক্ষ মানুষ প্রাণ হারান। সোভিয়েত রাশিয়ায় ঘটে যাওয়া দুর্ভিক্ষে দুই দফায় ৫০লক্ষ থেকে ১ কোটি(১৯২১-২২) এবং ৩৫লক্ষ থেকে ৫০লক্ষ মানুষ ১৯৩২-৩৩ সালে প্রাণ হারান। প্রথম দফায় মৃত্যুর কারণ প্রকৃতি হলেও দ্বিতীয় দফায় দুর্ভিক্ষের কারণ তখনকার শাসক জোসেফ স্ট্যালিনের ভ্রান্ত নীতি যা হলোডোমোর নামে খ্যাত। এর পরেই উল্লেখ করতে হয় আমাদের বাংলায় ১৯৪৩ সালে দুর্ভিক্ষের কথা যেখানে প্রায় ৩০থেকে ৭০ লক্ষ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়। প্রকৃতি ছাড়াও বৃটিশ সরকারের অত্যাচার মূলক ব্যবহার যা এখানে অপ্রতুল উৎপাদিত শস্যের ভাণ্ডার থেকে ব্রিটেনে পাঠিয়ে দেওয়া হয় এবং স্থানীয় লোকেরা অনাহারের সম্মুখীন হয়ে মৃত্যুবরণ করে। সাম্প্রতিক কালে চীনের দুর্ভিক্ষ যা মাও সে তুং এর ভ্রান্ত নীতির ফসল(১৯৫৯-৬১) প্রায় দেড় কোটি থেকে সাড়ে পাঁচ কোটি মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়। সাম্প্রতিক কালে (১৯৮৩-৮৫) ইথিওপিয়ায় ঘটে যাওয়া দুর্ভিক্ষ অনাবৃষ্টি, গৃহযুদ্ধ এবং শাসকদের ভ্রান্ত নীতির সমষ্টিগত ফল। 

সুতরাং, পর্যালোচনা করলে দেখা যায় অতিবৃষ্টি বা অনাবৃষ্টির সঙ্গে যখন তদানীন্তন শাসকদের অদূরদর্শিতা যোগ হয় তখন তার ফল হয় মারাত্মক। আজকের যুগে বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির ও অনেক পরিবর্তন হয়েছে এবং সহমর্মিতা ও বৃদ্ধি পেয়েছে। ইন্টিগ্রেটেড ফুড সোসাইটি ফেজ ক্ল্যাসিফিকেশন (আই পি সি) দুর্ভিক্ষ বা আকালের কারণ এবং সমস্ত বিশ্বের তাবড় তাবড় বিজ্ঞানীদের মতামত সংগ্রহ করে কিভাবে এই দুর্ভিক্ষ বা আকাল এড়ানো যায় এবং একদম এড়ানো না গেলেও তার প্রকোপ কমানো যায় তা নিয়ে পর্যালোচনা করে এবং তার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করার পরামর্শ দেয়। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য প্রকল্প দুর্ভিক্ষ কবলিত দেশগুলিকে খাদ্য জুগিয়ে মানুষকে অনাহার থেকে মুক্তি দান করার চেষ্টা করে এবং মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচতে সাহায্য করে। বিজ্ঞানের উন্নতি এবং মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হলেও প্রকৃতির সঙ্গে সবসময় এঁটে ওঠা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এখনও আফ্রিকার অনেক দেশে বিশেষ করে সুদানের বিস্তীর্ণ এলাকায় এবং দক্ষিণ সুদান ও মধ্য প্রাচ্যের গাজায় খরার প্রকোপে খাদ্যের প্রচণ্ড ঘাটতি হয় কিন্তু মানুষের সহযোগিতার ফলে মৃত্যুহার অনেক কমানো সম্ভব হয়েছে।

স্বাধীনোত্তর ভারতের প্রথমদিকে যখন আমাদের দেশ খাদ্যে স্বনির্ভর হয়ে উঠতে পারেনি তখন মানুষের চরম দুরবস্থা গেছে। অনাবৃষ্টি ও দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির মোকাবিলা করতে ভারতকে আমেরিকার দ্বারস্থ হতে হয় যা "পি এল ৪৮০"  বা পাবলিক ল ৪৮০ নামে খ্যাত। এই আইনটি বিখ্যাত এগ্রিকালচার ট্রেড ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাক্ট,১৯৫৪  বা ফুড ফর পিস বা শান্তির জন্য খাদ্য নামে খ্যাত। এর মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল আমেরিকায় উৎপন্ন বাড়তি খাদ্যশস্য বিক্রি করা এবং ঐদেশের বিদেশ নীতিকে প্রভাবিত করা যাতে তারা কমিউনিস্ট দেশের প্রতি না ঝোঁকে এবং তৃতীয়ত আমেরিকার বাজারের ব্যাপ্তি ঘটানো যা যে কোন দেশের ই লক্ষ্য । আর এই পি এল ৪৮০র অনেকগুলো ভাল দিক আছে। যেমন ক্রেতা দেশকে তাদের ডলার না দিয়ে  নিজেদের মুদ্রা দিয়ে কিনতে হতো এবং এই  মুদ্রাই তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে আমেরিকার সাহায্য হিসেবে গণ্য হতো এবং তৃতীয়ত দুর্গত ও বুভুক্ষু মানুষের প্রতি সহৃদয়তার হাত বাড়ানো একটা অত্যন্ত মানবিকতার পরিচয় এবং এই সাহায্য বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও ধর্মীয় সংগঠনের মাধ্যমে দেওয়া হতো।
যে কোন বিপর্যয়ের একটা ভাল দিক ও থাকে। এই বিপর্যয়ের মোকাবিলা করতে মানুষ চোয়াল শক্ত করে নিজের উদ্ভাবনী ক্ষমতার বিকাশ ঘটায়। স্বনামধন্য বিজ্ঞানী নরম্যান বোর্লো মেক্সিকোয় এক অসামান্য ছাপ রাখেন। তাঁর প্রচুর উৎপাদনশীল এবং পোকায় নষ্ট না হওয়া  ধান ও গমের বীজ, উন্নত মানের সার, আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা এবং যন্ত্রের ব্যবহার মেক্সিকোকে খাদ্যে স্বনির্ভর ই করে তোলেনি, আমদানি কারক দেশ থেকে রপ্তানিকারক দেশে রূপান্তরিত করেছে। আমাদের দেশের বিখ্যাত কৃষিবিজ্ঞানী প্রফেসর এম এস স্বামীনাথন নর্ম্যান বোর্লোর সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে  আমাদের দেশে সবুজ বিপ্লব আনেন এবং পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও পশ্চিম উত্তর প্রদেশে ধান ও গমের ফলনে আমূল পরিবর্তন আনেন এবং ধীরে ধীরে ভারত ও খাদ্যে স্বনির্ভরতার পথে এগিয়ে যায়। কিন্তু যে কোন জিনিসের ভাল ও মন্দ দুটো দিকই আছে। ধান ও গম দুটো শস্য উৎপাদনের জন্য প্রচুর জলের প্রয়োজন এবং হরিয়ানা ও পাঞ্জাবে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কম হওয়ায় অচিরেই ভূগর্ভস্থ জলের পরিমাণ কমে যাবে এবং এই কৃষি ব্যবস্থার পরিবর্তন না হলে মরুভূমিতে পরিণত হয়ে যাবে। বিহারে ধান ও গমের পরিবর্তে অন্যান্য কম জলের প্রয়োজন শস্য উৎপাদনের ফলে বহুলাংশে তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে।

আমাদের দেশে সবুজ বিপ্লবের আগে সাধারণ দরিদ্র মানুষের অবস্থা খুবই সঙ্গীন হয়ে গিয়েছিল। মানুষ ভাতের বদলে ভাতের ফেন ভিক্ষা করতো। ঠা ঠা রোদে খালি পায়ে ভিখারীদের ," মা গো একটু ফেন দাও" বলে ভিক্ষা করতে দেখা যেত। এখন খুব কম লোককেই খালি পায়ে হাঁটতে দেখা যায়। নিলেন পক্ষে হাওয়াই চপ্পল বা রবারের  চপ্পল তো দেখাই যায়। মোবাইল নিয়ে ভিখারির সংখ্যাও নিতান্ত কম নয়। এখন সব সরকার ই দারিদ্র্য সীমারেখার নীচে থাকা লোকজন যাতে অনাহারে না মারা যায় তা সুনিশ্চিত করেন।মাথা পিছু পাঁচ সাত কেজি চাল বা গম/ আটা এবং আর্থিক অনুদানের ও ব্যবস্থা করেছে যেটা পঞ্চাশ ষাট বছর আগে ছিল না। অর্থনৈতিক বৈষম্য চিরদিন ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে সে সাম্যবাদীরা যত ই চিৎকার করুন না কেন। সাম্যবাদের প্রবক্তারা যত ই গলা ফাটিয়ে চিৎকার করুন না কেন তাঁদের স্বপ্নের দেশেও সেই একই অবস্থা । সাম্যবাদ নিশ্চয় ই থাকা উচিত  এবং অর্থনৈতিক  বৈষম্য  যতটা কম হয় ততটাই ভাল কিন্তু  কথাটা কেমন যেন সোনার পাথর বাটি বলে মনে হয়। খুবই আদর্শবাদী ধারণা কিন্তু এই সাম্যবাদের প্রবক্তা দেশ চীন ও আজ বাস্তববাদী হয়েছে এবং রিফর্মের মাধ্যমে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে। অথচ চীন,ভারত ও কোরিয়ার অর্থনীতি সত্তরের দশকে এক লাইনেই খাড়া ছিল। অর্থনৈতিক সংস্কার ভারত নব্বইয়ের দশকে একরকম বাধ্য হয়েই করেছিল এবং তার সুফল আজ মিলছে যদিও নিন্দুকের সংখ্যা কম নেই যারা প্রতিনিয়ত দেশ রসাতলে যাচ্ছে বলে চিৎকার করে চলেছে অথচ এরাই যখন ক্ষমতাসীন ছিল তারা সেরকম ভাবে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেনি।
শুধু খাদ্যে স্বনির্ভরতাই যথেষ্ট নয় তার সুষম বণ্টন ভীষণ প্রয়োজন এবং দুর্নীতিমুক্ত না হলে এটা প্রায় অসম্ভব। দুর্নীতির সূচকে ভারতের অবস্থান ৯১ তম ১৮২টি দেশের মধ্যে যেখানে আমেরিকার অবস্থান ২৯ নম্বরে। ০ থেকে ১০০ নম্বরের স্কেলে আমেরিকার মান ৬৪ যেখানে ভারত পেয়েছে ৩৯। ডেনমার্ক ৮৯ নম্বর পেয়ে শীর্ষস্থানে মানে দুর্নীতি সেখানে সবচেয়ে কম।
ভারতবর্ষকে দুর্নীতিমুক্ত করতে গেলে আমাদের সকলের প্রয়াস দরকার এবং যাতে কোন লোক অনাহারে মারা না যায় তার দিকে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। প্রকৃতির রোষ থেকে হয়তো সবসময় রক্ষা পাওয়া যাবেনা কিন্তু যদি প্রয়োজনীয় খাদ্যের ভাণ্ডার গড়ে তোলা যায় তাহলে  অতিবৃষ্টি বা অনাবৃষ্টির ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতির মোকাবিলা করা সম্ভব এবং জনগণকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব।


Saturday, 18 April 2026

"ব্যালকনি"

আগের দিনের প্রশস্ত জায়গা জুড়ে নয়নাভিরাম বাড়ি আজকের দিনে আর দেখা যায়না যেখানে বসে দেখা যেত দূরদূরান্ত  বিশাল প্রান্তর, কোথাও বা ধানের ক্ষেত আর কোথাও বা অন্য কোন ফসল। মাঝে মধ্যে পুকুর বা দীঘি যার চারপাশটা নানা গাছ দিয়ে ঘেরা যা পুকুরের জলকে সূর্যের প্রখর তাপ থেকে শীতল রাখতে বেশ সাহায্য করে। দিনে দিনে লোকসংখ্যা বাড়ছে, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য খানিকটা হলেও কমেছে। আজকের যুগে যাঁদের হাতে প্রভূত অর্থ তাঁরাও আজ শহরে বড় বাড়ি করলেও সেই সুদূরপ্রসারী দিগন্ত পাওয়া সম্ভব নয় কারণ শহরে জায়গার অপ্রতুলতা। তাই জনসংখ্যার চাপেই হোক বা অন্য যে কোন কারণেই হোক না কেন বাড়ির বারান্দা বা ব্যালকনিতে বসে সেই দৃশ্য দেখা আর হয়ে ওঠেনা। সেটা দেখতে গেলে যেতে হবে  শহর থেকে একটু দূরে তাদের বাগানবাড়ি বা ফার্ম হাউসে যেটা প্রতিদিন তো সম্ভব নয়,  ছুটির ফাঁকে মাঝে মধ্যে শহরের ইট, কাঠ, কংক্রিটের জঙ্গল থেকে অব্যাহতি পেতে। তাই দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে ফ্ল্যাট বাড়িতে ব্যালকনি একটা আলাদা মাত্রা পেয়েছে। পুরনো দিনে সরকারী আনুকুল্যে যে ফ্ল্যাটগুলো তৈরী হয়েছিল তাতে দুটো বাড়ির মাঝে বেশ অনেকটাই ব্যবধান থাকায় আকাশের দিকে তাকালে যেন মনে হয় এই একটুকরো আকাশটাই আমার। কিন্তু বর্তমানে প্রোমোটারের কল্যাণে যে ফ্ল্যাটগুলো তৈরী হচ্ছে তাতে ব্যবধান এতটাই কম যে এ বাড়ির কথা পাশের বাড়ি থেকে শোনা যায় এবং তাই ঐ আকাশটুকুও যেন ভাগ বাটোয়ারা হয়ে গেছে। তবে একটা কথা অনস্বীকার্য যে ব্যালকনি ফ্ল্যাটের মর্যাদা ঢের বাড়িয়ে দিয়েছে।

আশির দশকের প্রথম দিকে তৈরী হওয়া গল্ফগ্রীনের ফ্ল্যাট গুলো গাছপালাদের সঙ্গী করে হয়েছিল বলে অনেক হাউসিং প্রজেক্টের তুলনায় এর আকর্ষণটা অনেক বেশী। রোলস রয়েস গাড়ি যত ই পুরনো হোক না কেন তার মর্যাদা একটা আলাদা। এই গল্ফগ্রীনের ফ্ল্যাটগুলোও অনেকটা সেইরকম এবং হালফিলের তৈরী ঝাঁ চকচকে ফ্ল্যাটের তুলনায় অনেক বেশী মনে ধরে। একদম সারি সারি পিছনে না থেকে অবয়ব এক ই রকম রেখে একটু আঁকাবাঁকা ছন্দে তৈরী এই বিল্ডিংগুলো প্রত্যেকটি একটা নিজস্ব ঢঙে গড়ে উঠেছে যেন মনে হয় নৃত্যশিল্পীরা এক ই মঞ্চে বিভিন্ন  আঙ্গিকে নৃত্য পরিবেশন করছে। এখানে বেশিরভাগ বাড়িগুলোই চারতলা কিংবা পাঁচতলা কেবল একটি বহুতল ছাড়া। ছাদে না উঠেও একটু উপরের দিকে ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে বসে অনেকটা আকাশ দেখা যায়। এই আবাসনে  অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরা জীবিকার কারণে অন্য প্রদেশে চলে যাওয়ায় পড়ে থাকা বৃদ্ধ বাবা মায়েদের  একটা বৃহৎ বৃদ্ধাশ্রমে পরিণত হয়েছে। এখন ফ্ল্যাট গুলোর গমগমে ভাব একেবারেই উধাও । বয়সের ভারে ব্যালকনিতে বসার লোক দিন দিন কমে যাচ্ছে, কোথাও দুই থেকে এক আবার কোথাও বা শূন্য ব্যালকনি মনের দুঃখে ম্রিয়মাণ। তবুও যাঁরা রয়েছেন ভোরবেলায় ও সন্ধেবেলায় পাখির কলতানে নিজেদের উদ্বুদ্ধ করতে পারেন। আলোর আভা ফোটার আগেই পাখিদের কিচিরমিচির শব্দে ঘুম ভাঙিয়ে দেয়, নানান ধরণের পাখিরা ব্যালকনিতে বসে থাকা বৃদ্ধ বৃদ্ধাদের কাছে খাবার খেতে আসে এবং গ্রিলের মধ্যেই রাখা জলের পাত্র থেকে নিজেদের তৃষ্ণা মিটিয়ে চলে যায়। সারাদিন কোথায় কোথায় যে তারা ঘোরে বুড়োবুড়িরা চিন্তা করেও উঠতে পারেনা। গ্রীষ্মের দাবদাহে মাঝে মাঝেই তারা আসে জল খেতে এবং কখনও কখনও শরীরের জ্বালা মেটাতে স্নানটাও সেরে নেয়। আশেপাশে সেগুন গাছ, কাঁঠাল গাছ বা বাদাম গাছগুলো এখন একটু স্তব্ধ কারণ তাদের অধিবাসীরা এখন বেড়িয়েছে খাবারের সন্ধানে এবং সন্ধেবেলায় ফিরে এসেই ঝগড়া অবশ্যম্ভাবী নিজেদের জায়গা নিয়ে। কিছুদিন ধরেই দূরে একটা বাড়ির জলের পাইপের উপর বসে থাকা একটা চিল চিঁহি হিঁহিঁ করে ডাকতে দেখা যাচ্ছে। কোন সময় তাকে খেতে দেখা যায়না। হয়তো বা সেও বয়সের ভারে ন্যূব্জ এবং খাওয়ার তাগিদ ও বিশেষ দেখতে পাওয়া যায় না। সমস্ত পাখিদের মোটামুটি ভাবে খাবার দেওয়া হয় এবং ইচ্ছে ও করে ওই চিলটার খিদে মেটাতে কিন্তু তাকে তো ডাকা যায় না আর সেও আমাদের থোড়াই তোয়াক্কা করে। প্রতিটি প্রাণীর ই খিদে তেষ্টা সব ই আছে কিন্তু এই চিলটাকে  দেখে সব ধারণাই কেমন ওলোট পালোট হয়ে যাচ্ছে। আর কাকগুলোও বড্ড বেশি হিংসুটে, ঐ বুড়ো চিলটাকে কারণে অকারণে ঠোকরাতে আসে। একটু যে নিশ্চিন্তে বিশ্রাম নেবে তাতেও তাদের হিংসা।  
ব্যালকনিতে বসে থাকা বুড়ো বুড়ির সংখ্যা যেমন কমছে তেমন ই হয়তো একদিন ওই বুড়ো চিলটাকেও আর দেখা যাবেনা ।

Monday, 13 April 2026

"কে আমি?" (১)

এই বিশাল পৃথিবীর সমস্ত দেশে( ছোট বড় সব মিলিয়ে ১৯৫ ) প্রায় ৮৩০ কোটি লোক আছে। তাদের সবার ই সাধারণ মানুষের মতো দুটো চোখ, দুটো কান , দুটো করে হাত,পা, একটা মাথা ও একটা নাক কিন্তু দৈহিক গঠন বা গায়ের রঙ ভিন্ন বা দেখতেও ভিন্ন এবং খাদ্যাভ্যাস ও ভিন্ন এবং সবাই এক একজন "ভিন্ন আমি"। কিছু কিছু ক্ষেত্রে একজনের সঙ্গে আরও একজনের মিল হতে পারে কিন্তু সম্পূর্ণ মিল কখনোই হয়না। দুটো যমজ ভাই বা বোনের ক্ষেত্রেও অনেক অমিল ধরা পড়ে, সুতরাং সব মানুষকেই একটি গোত্রে ফেলা ভীষণ কঠিন, এককথায় অসম্ভব। আমার গণ্ডিও খুব সীমিত এবং চারপাশে যে ধরনের লোকের সংস্পর্শে এসেছি, তাদের কথাই তুলে ধরার একটি সামান্য প্রয়াস। ৮৩০কোটি মানুষের মধ্যে আমিও একজন কিন্তু পৃথিবীতে এমন কোন মানুষ নেই যিনি আত্মানুসন্ধান করার পরেও নিজেকে সম্পূর্ণ জানতে পেরেছেন। আমরা অন্য সবার সম্বন্ধে হাজারটা কথা বলতে পারি কিন্তু নিজের সম্বন্ধে বলতে গেলেই গুণগুলো আরো ফলাও করে বলি এবং দোষগুলো চোখেই পড়েনা। অন্যজন আমার সম্বন্ধে খুব পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে সমালোচনা করতে পারে কিন্তু সেও তার নিজের সম্পর্কে বলতে গেলে আমার ই মতন কি আরও একটু বেশি বিশ্লেষক। আপ্তবাক্য হলো "আপনাকে এই জানা আমার ফুরাবে না"। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ও বলেন 
"জীবনে জীবনে যোগ করা 
ব্যর্থ হয়নি সে গানের পসরা
আমার কবিতা জানি আমি
গেলেও বিচিত্র পথে হয় নাই সে সর্বত্র গামী।"

প্রথমেই আসব কয়েকজন মহান শিক্ষকের কথা যাঁরা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন ছাত্র তথা দেশ গড়ার কাজে। কেউ অনেক বড় সরকারী পদ উপেক্ষা করে শিক্ষকতা  পেশা বেছে নিয়েছেন এবং শিক্ষক হিসেবে যাঁদের অবদান অনস্বীকার্য। তাঁদের সঙ্গে দেখা হবার সুযোগ না ঘটলেও তাঁদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি এবং আমার দেখা কিছু মাস্টার মশাইদের কথাই বলছি। প্রথমেই বলব আমাদের স্কুলের অঙ্কের মাস্টার মশাই কাবুলি বাবু বা শ্রী রণেন্দ্রনাথ বাগচির কথা। ওঁকে কখনো স্কুলের মেন বিল্ডিং এর টিচার্স রুমে বসতে দেখিনি, উনি বসতেন স্কুলের নতুন বিল্ডিং এ সায়েন্স ব্লকের একতলায় ছোট্ট একটি ঘরে। ছিলনা কোন পাখা, গরমকালে তালপাতার হাতপাখাই ছিল সম্বল। সামনে টেবিলে রাখা ডাঁই করা ছাত্রদের খাতা যেগুলো হোম টাস্ক দেওয়া হতো। অফ পিরিয়ডে বা টিফিনের সময় চা খেতে খেতে ঝড়ের গতিতে দেখতেন খাতা কিন্তু একদম নির্ভুল। একটা ছোট্ট ঘটনার কথা উল্লেখ না করলেই নয়। তখন ফাউন্টেন পেনে লেখা হতো , অঙ্ক করার মাঝে যোগ চিহ্ন দিতে হবে কিন্তু মাইনাস চিহ্ন দেওয়ার জন্য ওপর থেকে ভার্টিক্যাল লাইন দিয়ে প্লাস চিহ্ন করার সময় কালি শেষ এবং একটা আঁচড় পড়লেও কালির দাগ আর পড়লো না। পাশের বন্ধুর কাছ থেকে একটু কালি নিয়ে অঙ্ক শুরু করলেও সেই জায়গাটায় আর কালি দিয়ে দাগানো হলোনা এবং খাতা চেক করার সময় স্যারের নজর সেটা এড়ালো না। এর থেকেই বোঝা যায় তিনি যেন চোখ দিয়ে এক্সরে করতেন এবং খুঁটিনাটি সব কিছুই তিনি দেখতেন। স্যারকে কখনো গল্প করতে দেখিনি এবং তাঁর ভারী শরীর নিয়ে ক্লাসে চেয়ারে বসতেও কখনো দেখিনি। যে কোন চ্যাপ্টারের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত অঙ্ক তিনি করতেন এবং হোম টাস্ক দিয়ে সমস্ত চ্যাপ্টার আড়াই থেকে তিন বার শেষ করতেন যেখানে অন্য স্কুলে সব চ্যাপ্টারের সব অঙ্ক ই করা হতো না। কখনো কখনো মেন বিল্ডিং থেকে ক্লাস নিয়ে নতুন বিল্ডিংয়ে ক্লাস নিতে আসছেন , ছাত্ররা ব্যালকনিতে রোদ পোহাচ্ছে, হঠাৎ একটা ছেলে ছুটতে ছুটতে এসে বললো কবুলিবাবু আসছেন আর মূহুর্তেই ব্যালকনি ফাঁকা এবং যে  যার নিজের জায়গায় বসে স্যারের আসার অপেক্ষায়। দুর্দান্ত পারসোন্যালিটি, মোটা কালো ফ্রেমের চশমায় মোটা মোটা চোখ মাথা থেকে পা পর্যন্ত যখন দেখতেন তখন সেই ছাত্রের ই শুধু নয় সমস্ত ছাত্রদের অবস্থা খারাপ। কিন্তু অসম্ভব ছাত্রদরদী এই কাবুলি বাবুর ভাগ্যে কিন্তু কোন সরকারী শিরোপা জোটেনি কিন্তু তিনি তাঁর অগণিত ছাত্রের হ‌দয়ে আজ ও সমুজ্জল।
আরও অনেক মাস্টার মশাইয়ের সান্নিধ্যে এসেছি যাঁদের মধ্যে একজনের নাম অবশ্যই উল্লেখ করতে হয় এবং তিনি হলেন কৃষ্ণনাথ কলেজের কেমিস্ট্রি বিভাগের প্রধান এবং পরবর্তীকালে ঐ কলেজের প্রিন্সিপ্যাল শ্রী ধীরেন্দ্রনারায়ন রায় । ক্লাসে পড়াতে পড়াতে একটা অন্য জগতে বিচরণ খুব কম স্যারের মধ্যেই দেখা যায়। পুরো বিজ্ঞানটাই যেন তাঁর চোখের সামনে ভেসে ওঠে এবং ওঁর ক্লাস করাটা এক অসাধারণ অনুভূতি। এমন ছাত্র দরদী মাস্টার মশাইয়ের সান্নিধ্যে আসা একটা ভাগ্যের ব্যাপার।

অনেক খবর কানে আসে যেখানে একসময়ের ছাত্র বা ছাত্রী উন্নতির শিখরে উঠেও তাদের শিক্ষক বা শিক্ষিকার অবদান ভোলে না এবং নানারকম বাধা বিঘ্ন অতিক্রম করে তাঁদের অবদানের স্বীকৃতি জানাতে আসেন। এইখানেই সেই শিক্ষক বা শিক্ষিকার অবদান। তাঁরা তাঁদের পেশাগত প্রক্রিয়ায় ছাত্রছাত্রীদের গড়ে তোলেন কিন্তু কেউ কেউ তা মনে রাখে আবার কেউ কেউ তা বেমালুম ভুলে যায়।এক ই শিক্ষা কাউকে উন্নতির শিখরে তোলে আবার যারা তা গ্রহণ করতে অক্ষম তারা সাধারণ হয়ে থাকে বা বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যায়।
এইরকম অনেক শিক্ষক শিক্ষিকা রয়েছেন দেশ বিদেশে আনাচে কানাচে যাঁরা তাঁদের শিক্ষায় বহু ছাত্র ছাত্রীদের আলোকিত করেছেন এবং প্রকৃত মানুষ হতে সাহায্য করেছেন যাঁদের কথা আমরা জানিনা। সমস্ত শিক্ষক শিক্ষিকাদের প্রতি সশ্রদ্ধ নমস্কার জানাই।
এঁরা সবাই এক একজন "আমি"এবং তাঁরা নিজেদের সম্বন্ধে সম্পূর্ণ না জানলেও আমরা যারা তাঁদের সংস্পর্শে এসেছি তারা এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে তাঁদের সম্মান জানাই।

"কে আমি" (২)

ভোটের দামামা বেজে উঠেছে, চারিদিকে সাজো সাজো রব। সবাই খুব ব্যস্ত,এমনকি পাড়ার সবচেয়ে অকিঞ্চিৎকর ছেলে পটাই ও। সারাদিন কোন কাজ কর্ম করেনা, এখানে সেখানে বেগার খেটে বেড়ায় , বিনিময়ে কেউ একটু আদর করে মিষ্টি কথা বললেই ও গদগদ। বাড়িতেও তার উপস্থিতি কেউ কখনো নজর করেও দেখেনা। বাবা কবে যে ছিল তা মনেও পড়েনা, জ্ঞান হওয়া অবধি মাকে আর তার থেকে বড় একটা দাদাকে ই দেখেছে। তিন জনের সংসার থেকে বেড়ে ইদানিং চার হয়েছে, তার দাদা চায়ের দোকানের কাজ ছেড়ে একটু প্রোমোশন হয়ে ভাতের হোটেলে কাজ পেয়েছে এবং তার জীবন সঙ্গী জোগাড় করে নিয়েছে এবং তারপরেই শুরু হয়েছে বাড়িতে রোজ গনগনানি। এতদিন মা লোকের বাড়িতে কাজ করে যা পেত তা দিয়ে আর দাদার টাকা দিয়ে কোন রকমে টানাটানি করে চলে যেত। কিন্তু বাড়িতে দ্বিতীয় মহিলা আসার পরেই শুরু হয়েছে ছোট খাটো নানা বিষয়ে, শান্তি হয়েছে বাড়ন্ত। পটাই তার নিজের মতো করেই চলতো, এখানে সেখানে ঘুরে ফিরে বাড়িতে এসে কলাই করা থালায় খানিকটা তরকারি বা ডালের একটু ছোঁয়ায় বদলানো রঙের ভাতে তার ক্ষুন্নিবৃত্তি হতো। ঘুরে ঘুরে এর তার সঙ্গে হাত লাগিয়ে দুচার টাকা যে রোজগার করতো না তা নয় কিন্তু বাড়ি ঢোকার আগে তার খুব অল্প অংশ ই বেঁচে থাকতো যেটা তার মায়ের হাতে দিয়ে দিত।  ওর নিজের কোন কাজ ছিলনা, যে যা বলতো পটাই তাই করে দিত এবং বিনিময়ে পটাই এর কপালে কিছু জুটত। হয়তো কেউ সব্জি বিক্রি করবে বলে মোটর চালিত ভ্যান থেকে একটা বড়সড় বস্তা নামাল, তার সবজিগুলো সাজিয়ে গুছিয়ে আলাদা করে দিল,  খদ্দের এলে তার পছন্দের জিনিসগুলো দিয়ে সাহায্য করলো, বিনিময়ে পড়ে থাকা কিছু সবজি পাতি তার ভাগ্যে জুটলো বা সবটাই বিক্রি হয়ে গেলে দুচার টাকা সে পেলো কিন্তু কোন জায়গায় তার বাঁধা কাজ জোটেনা। গোদের উপর বিষফোঁড়া হলো যখন তার দাদার হাঁড়ি আলাদা হলো। মা তো আথান্তরে, কি করে সংসার চলবে সেই ভেবেই কূলকিনারা পাচ্ছেনা। তার নিজের ও বয়স হয়েছে, আগের মতো পাঁচ বাড়িতে কাজ করতে পারেনা আর ছোট ছেলে পটাইকে তো কেউ ধর্তব্যের মধ্যেই আনে না। হাজার হলেও ছেলে তো, মায়ের মন তো মানতে চায় না। আর দিন দিন বড় হচ্ছে, তার খাওয়ার জোগানটাও সেই রকমই বাড়ছে কিন্তু মায়ের কাজের বাড়ি কম হওয়ায় টাকার সঙ্গে সঙ্গে টুকটাক খেয়ে যে নিজের পেটটা ভরে যেত সেখানেও পড়েছে টান, এ যেন শাঁখের করাত, টাকাও কমেছে আবার নিজের পেটের সঙ্গে বেড়ে ওঠা পটাইয়ের ও বাড়তি খিদে। কিন্তু ভগবান যেন মুখ তুলে চেয়েছেন এবার।
 ভোটের কাজের জন্য সব দলেরই লোক দরকার। লোক পাওয়া খুব কঠিন নয় কিন্তু বিশ্বাসী ও কাজের লোক খুব কম। আর নেতাদের দরকার বোকাসোকা কর্মক্ষম লোকের। আর এই সময়েই চোখ পড়ল পটাইএর দিকে আর তাও আবার শাসকদলের নেতার। এখন সবাই নেতা, কুচোকাচা থেকে শুরু করে বড় মাপের কিন্তু নেতারা খুব বড় মাপের দাদার উপর ভরসা করতে পারেন না কারণ অতি অল্পসময়েই এরা তার চেয়ারের দাবিদার হতে পারে । এইসব ভেবে এই পটাই জাতীয় হঠাৎই বেড়ে ওঠা শক্তপোক্ত  ছেলেরাই তার সম্পদ। এদের সেরকম উচ্চাশা নেই এবং সামান্য কিছু অর্থের বিনিময়ে এদের বিশ্বস্ততা আদায় করে নেওয়া যায় আর পটাই এর ভাগ্য ও সেইভাবেই খুলে গেল। কিছুদিন আগে অবধি ," এই পটাই এটা নিয়ে আয় বা ওটা করে দে" এখন কিছুদিন ধরেই নিশ্চুপ। পটাই এখন নেতার বডিগার্ডের মর্যাদা পেয়ে গেছে। নেতার সংস্পর্শে থেকে বেশভূষা,চলন বলনে কেমন একটা কেতাদূরস্ত হয়ে গেছে। পটাই এখন সবসময় বাড়ি ফিরতে পারেনা। মা ভাতের থালা ঢাকা দিয়ে রাখলেও বেশিরভাগ দিনই তা কুকুর বিড়ালের পেটে যায় কারণ তাদের  বাড়িতে  তখন ও ফ্রিজ আসেনি যে রেখে দেবে। আর তাছাড়া নেতার দৌলতে বিরিয়ানি, মাংস দিয়েই রোজ পেট ভরছে। মায়ের কথা মনে হলেও নেতা দাদার অনুমতি ছাড়া এক পা ও এদিক ওদিক হবার জো নেই। রাতে দুচার পাত্র বিদেশি তরল ও জুটছে, মোটকথা একটা নিষ্পাপ ছেলেকে জাহান্নামের রাস্তায় টেনে নিয়ে যাওয়া আর কি। দাদা, বৌদির কথা মনে পড়লেই ভিতরটা যেন ঘেন্নায় ভরে যায় কিন্তু মা, মায়ের কথা মনে পড়লেই দাদার হাজার কাজের মধ্যেও ভিজে ওঠা চোখ দুটো রুমাল দিয়ে মুছে নেয়। পাঁচ বছর আগের ভোটে পটাই ততটা শক্তপোক্ত হয়ে ওঠেনি কিন্তু এবারের ভোটে নেতা দাদার কাছাকাছি থাকায় ওর গুরুত্ব বেড়েছে, সাইলেন্সার খোলা একটা মোটর সাইকেল জুটেছে যাতে তার উপস্থিতি সবার নজরে আসে। এই সুযোগে যতটা পারো কামিয়ে নাও আর একবার ভাল পয়সার মালিক হয়ে গেলে কোথা থেকে যে টাকার স্রোত আসতে থাকবে তা জানা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। অসদুপায়ে অর্জিত অর্থের দৌলতে এমন ই এক জায়গায় পৌঁছে যায় যে পরবর্তী জীবনে ভালোমানুষের একটা জোব্বা দিয়ে নিজেকে ঢেকে ফেলা যায়। পটাই থেকে পটাই দা বা পটাই বাবু এবং যে কোন ছোটখাটো বিবাদে পটাই দা বা ছোড়দার কথাই শেষ কথা। দুপক্ষের কাছেই টাকা নিয়ে মোটামুটি একটা আপসরফা সে করে দেয়। এসব করে এবং শাসকদলের নেতাদের ছত্রছায়ায় থাকার সুবাদে পুলিশের কাছেও সে বিশেষ সম্মান লাভ করে। তবে নীচুতলার সব পুলিশ যে ওকে পছন্দ করে তা নয় কিন্তু ওপরের মহলে ওর যোগাযোগ থাকায় কোন বাজে জায়গায় পোস্টিং হবে এই ভয়ে ওরা যেমন ঘাঁটায় না তেমন সেরকম সুযোগ পেলে ওকে মাটিতে মিশিয়ে দিতেও ওরা পিছপা হবেনা। নেতা ও পুলিশের এই মেলামেশার ফলে সাধারণ মানুষের প্রাণ ওষ্ঠাগত। যে পটাই একদিন সকলের কাছে হেলাফেলার মানুষ ছিল আজ ভোটের আগমনে সে একজন কেউকেটা। আজ সে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তার নেতা দাদাকে ভোট দেবার জন্য ঠাণ্ডা চোখে হুমকি দেয়। যদি দাদা জেতে তাহলে তো সোনায় সোহাগা, নাহলেও কোন ক্ষতি নেই  কারণ ইতিমধ্যেই সে ছোড়দা বনে গেছে এবং নতুন দাদা এসেও হয়তো তাকেই তোষামোদ করবে এবং আরও ক্ষমতার লোভ দেখাবে।
যেহেতু এরা স্কুলের গণ্ডি ও পেরোয়নি সুতরাং অন্তর্দর্শনের আশা করাই বৃথা তবুও সে একজন মানুষ এবং কখনও কোন এক বিষণ্ণ মূহুর্তে নিজের পূর্ব কথা ভাবতে যদি চেষ্টা করে তবে কতদূর সফল হবে তাতে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।

Wednesday, 1 April 2026

"উদুপি"

উদুপি কর্ণাটকের পশ্চিম প্রান্তে উপকূলবর্তী একটি ছোট শহর যা শ্রীকৃষ্ণ মঠ এবং  অন্যান্য অনেক হিন্দু মন্দিরের উপস্থিতির জন্য বিখ্যাত। শ্রীকৃষ্ণ মঠ ত্রয়োদশ শতাব্দীতে শ্রীমাধবাচার্য্য দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই প্রতিষ্ঠার পিছনে একটি সুন্দর পৌরাণিক কাহিনী প্রচলিত আছে যা হলো এইরকম। একদিন একটি জাহাজ সমুদ্রে ঝড়ের মধ্যে পড়ে এবং শ্রী মাধবাচার্য্য তাঁর ঐশ্বরিক যোগবলে সেই সামুদ্রিক ঝড়কে স্তিমিত করেন এবং জাহাজের ক্যাপ্টেন তাঁকে সেই জাহাজের যে কোন জিনিস উপহার হিসেবে দিতে চান কিন্তু শ্রী মাধবাচার্য্যজী( যিনি দ্বৈতবাদের প্রবক্তা) কর্দমাক্ত একটি অত্যন্ত ভারী জিনিস পছন্দ করেন এবং তা পরিষ্কার করার পরে শ্রীকৃষ্ণের ঐ মূর্তিটি তিনি পান এবং পরে তিনি ঐমঠের প্রতিষ্ঠা করেন। এই উদুপি শহরটি আবার তার নিরামিষ খাবারের জন্য খুব বিখ্যাত। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এবং বিদেশে ও এই উদুপির খাবার বিশেষ ভাবে সমাদৃত।শহর কলকাতাও এর ব্যতিক্রম নয়। লেক মার্কেট এবং দেশপ্রিয় পার্ক অঞ্চল কিছুদিন আগে পর্যন্তও দক্ষিণ ভারতীয়দের দখলেই ছিল এবং এখনও দক্ষিণ ভারতের কোন লোকজন এলেই তাঁরা এই অঞ্চলের হোটেলে এসে ওঠেন কারণ তাঁরা এখানকার খাবার ও দক্ষিণ ভারতের সংস্কৃতির সঙ্গে একাত্ম বোধ করেন যদিও ইদানিং কালে অনেক তামিল ও তেলেগু মানুষজন গড়িয়া সংলগ্ন এলাকায় নিজেদের বাড়ি অথবা ফ্ল্যাট কিনে থাকছেন। এতদসত্ত্বেও অনেক তামিল, তেলুগু,কন্নড় ও কেরালাবাসীরা এখনও এই অঞ্চলেই আছেন এবং তাঁদের আনুকুল্যে দক্ষিণ ভারতীয় রেস্তোরাঁয় অবিরত ভিড়। হোটেল স্বাগত,কোমলাভিলা, তারা মহল এবং উদুপি মধ্যবিত্তের নাগালের মধ্যেই রয়েছে এবং দক্ষিণ ভারতের এই খাবার বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। উদুপি হোটেলে থাকার ব্যবস্থা নেই কিন্তু খাবারের নিরিখে এটাই বোধহয় সর্বোত্তম। 

অনেকদিন মুম্বাই শহরে কাটিয়ে কলকাতায় ফিরছি। সন্ধেবেলায় ফ্লাইট ল্যাণ্ড করেছে কিন্তু লাগেজ পেতে একটু দেরি হওয়ায় অন্ধকার বেশ ঘনিয়ে এল। উবের ট্যাক্সিতে বাড়ি ফিরতে ফিরতে প্রায় একঘন্টার উপর লেগে গেল। মাঝে একটু আধটু জায়গা ছাড়া বেশিরভাগ জায়গাই অন্ধকারে ডুবে আছে বিশেষত মুম্বাইএর মতো আলো ঝলমলে শহর থেকে ফিরে মনে হচ্ছে যেন প্রেতপুরীতে প্রবেশ করছি। তবুতো এটাই আমার নিজের শহর, রিটায়ার করার আগে অন্য অনেক ঝাঁ চকচকে আলো ঝলমলে শহরে থাকার সুযোগ ও ছিল কিন্তু তাকে বিশেষ পাত্তা না দিয়ে আমার প্রিয় শহরেই থাকা শ্রেয় মনে করেছি এবং আত্মীয় স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে থাকাই বেছে নিয়েছি। দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকা এবং কাজে ডুবে থাকার সুবাদে আমার পুরনো শহর কলকাতা টা কেমন যেন বদলে গেছে এবং আজকের কলকাতা আমার দেখা কলকাতা থেকে অনেক বদলে গেছে। রাজনীতি এই শহরের এবং সমস্ত পশ্চিমবঙ্গকে কেমন যেন এক অজানা খাদের দিকে নিয়ে গেছে। অন্যান্য প্রদেশের তুলনায় আমরা অনেক পিছনের দিকে হেঁটে গিয়েছি। রাজনীতি সমস্ত পৃথিবীতেই আছে কিন্তু ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে আমরা প্রগতির পথে এগোতে পারিনি। অবনমন অনেক আগেই শুরু হয়েছিল কিন্তু এখন যেন তলানিতে ঠেকেছে। সমস্ত দেশেই ভোট হয় কিন্তু এখানে ভোট পরবর্তী হিংসা এক অভূতপূর্ব ব্যাপার। কত সংসার ভেসে যায় কিন্তু কোন হেলদোল নেই। তবুও কলকাতার প্রেমে গদগদ, এখানে ওখানে খুঁজি আমার সেই পুরনো চেনা শহর কলকাতাকে। আড্ডা মারার জায়গা ছিল গড়িয়াহাট মোড়। তখন ফ্লাই ওভার ছিলনা, মাঝখানে ছিল ট্রামলাইন, ঘটাংঘটাং শব্দ করে চলত ট্রাম। পিছনে সেকেন্ড ক্লাসের জানলার বাইরে থাকা অ্যান্টিনা মাঝে মাঝেই ওভারহেড তার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত এবং কন্ডাক্টার নীচে নেমে সেই অ্যান্টিনাকে যথাযথভাবে সংযোগ ঘটিয়ে ট্রামকে সচল করতে সাহায্য করতো। অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরা বাবা মা বা চেনা পরিচিতদের চোখ এড়িয়ে যশোদা ভবনের নীচে বা ঢাকেশ্বরী বস্ত্রালয়ের গেটের মুখে অপেক্ষা করতে বলত। অপেক্ষাকৃত ভীতু ছেলেমেয়েরা বলতো বাসন্তী দেবী গার্লস কলেজের সামনে। গড়িয়াহাট মোড় থেকে গোল পার্ক পর্যন্ত মাঝখানে থাকা ফুটপাতে সারি সারি গাছের মাঝে ছিল বুলেভার্ড হকার্স কর্ণার যা হিন্দুস্থান পার্ক ,গোল পার্ক বা বালিগঞ্জ এলাকার কাকিমা, মাসিমা ও‌বৌদিদের টুকিটাকি দরকারি জিনিস সরবরাহ করতো। গড়িয়াহাট বাজারে নিত্যানন্দ ভোজনালয় বা মাইতিদের ভাতের হোটেল খুব কম পয়সায় সাধারণ মানুষের উদরপূর্তির ব্যবস্থা করতো। রামকৃষ্ণ মিশনের উল্টোদিকে গোল পার্কে সন্ধেবেলায় অনেক লোক একটু খোলা হাওয়া নিতে আসতেন। গোল পার্ক থেকে গড়িয়াহাট মোড় আসতে বাঁদিকে ছিল ভাল্লা ফুটওয়্যার যেদিক দিয়ে হিন্দুস্থান পার্কে যাবার আরও একটা রাস্তা। গড়িয়াহাট মোড় থেকে ট্রাইঅ্যাঙ্গুলার পার্ক যেতে ছিল স্টাইলো, বেঙ্গল ফার্মেসি, সিনহা ব্রাদার্স এবং আরও একটু এগিয়ে ছিল এম এল রায়ের দোকান। আরও একটু এগোলেই ডানদিকে পড়তো আশা ব্রাদার্স ও হাটারি রেস্তোরাঁ এবং তাদের সঙ্গে পাঁচিল শেয়ার করা মহানির্বাণ মঠ। আশা ব্রাদার্স বাড়ির কোণে থাকা ছোট্ট একটা সাদামাটা রেস্তোরাঁ যার নাম ছিল জনতা রেস্তোরাঁ এবং স্বাভাবিক ভাবেই তা অতি সাধারণ লোকদের প্রয়োজনীয় রুটি, তরকা খাওয়াতো নামমাত্র পয়সায় কিন্তু তাতেও লোকে ধার বাকিতে খেত। পাশেই ছিল পণ্ডিতিয়া মোড়। নামীদামী রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী দেবব্রত বিশ্বাস, সাগর সেন ও অশোকতরু বন্দোপাধ্যায় কাছাকাছি থেকে যেন পণ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথের গানকে এক অসাধারণ উচ্চতায় নিয়ে যাবার। দেশপ্রিয় পার্কে তখন এত ইট কাঠ পাথরের জঙ্গল হয়নি, ছিল খেলার জন্য বিরাট খোলা মাঠ। ল্যান্সডাউন রোড ছিল এক অসাধারণ সুন্দর রাস্তা যা আরো মহিমান্বিত হয়েছিল রবীন্দ্রসঙ্গীতকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য শুভ গুহঠাকুরতার পরিচালনায় এক বিশ্বস্ত সংস্থা" দক্ষিণীর" উপস্থিতির। এই দক্ষিণী উপহার দিয়েছে অনেক প্রথিতযশা রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পীদের এবং এখনও সেই ধারা অব্যাহত। দক্ষিণ কলকাতার দক্ষিণ দেশীয় খাবার জোগাতে কেরালা কাফে, তারা মহল এবং একটু দূরেই লেক মার্কেটের কাছে কোমলা ভিলা যার ভেতরেই রয়েছে ব্যানানা লিভস। দেশপ্রিয় পার্ক মোড় থেকে স্টেডিয়ামের দিকে এগোতেই প্রথম ডানদিকের মোড়ে একটু এগোলেই এই উদুপি রেস্তোরাঁ। আমাদের দেশের রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালাম সাহেব যখনই কলকাতায় আসতেন, রাজভবনে উঠলেও তাঁর খাবার যেত এই উদুপি রেস্তোরাঁ থেকেই। সুতরাং বলাই বাহুল্য যে তখন থেকেই এই রেস্তোরাঁ একটা আলাদা জাতে উঠে গেছে।

এই উদুপি রেস্তোরাঁ একটি পুরনো আমলের বাড়িতে। ভেতরের ঘরগুলোতে বসার ব্যবস্থা থাকলেও বাইরের বারান্দাটা ঘিরে সেখানেও অনেকগুলো টেবিল পাতা আছে। কিন্তু সবচেয়ে পছন্দের যে জায়গা সেটা হচ্ছে বাইরে ফুটপাতে পাতা সারি করা চেয়ার এবং তাদের সামনে থাকা প্লাস্টিকের টুল যেখানে লোকজন চা, কফি বা স্ন্যাকস খায়। আবার এর ই মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান জায়গা সরু সরু লম্বা ছয়টি দেবদারু গাছ এবং তারা দুটি সারিতে তিনজন করে দাঁড়িয়ে আছে যার মাঝখানে রয়েছে একটি টেবিল এবং উভয় দিকে তিনটি করে চেয়ার। এই জায়গাটা হচ্ছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং কোন সময় ই তা ফাঁকা পাওয়া যায়না। এইখানে কোন সময় বসার সুযোগ পেলে নিজেকে ধন্য মনে  হয়। সবসময়ই ওই জায়গায় কেউ না কেউ বসে আছে। গতবছর ফেব্রুয়ারী মাসের নয় তারিখে আমরা স্কুলের চার বন্ধু তাদের পরিবার নিয়ে বেঙ্গল হাটারিতে লাঞ্চ সেরে কফি খেতে এই উদুপিতে গিয়েছিলাম। হয়তো বা সেই বন্ধুদের ভাগ্যেই বা স্ত্রীদের ভাগ্যেই জায়গা পেয়ে গিয়েছিলাম সেই মহামূল্যবান দেবদারু ছায়ায় থাকা সিটগুলোয়। আমরা চার বন্ধু এবং আমাদের স্ত্রীরা মোট আটজন ঐখানেই গুঁতোগুঁতি করে ম্যানেজ করে নিলাম। হাজারো পুরনো গল্পের স্মৃতি রোমন্থনে সময় কিভাবে এগিয়ে চলেছে কারো হুঁশ নেই। দু রাউন্ড কফির পরেও গল্প আর শেষ হয়না আর ওই জায়গার মৌরসীপাট্টাধারী সদস্যরা উশখুশ করছে আমরা ঐ জায়গা কখন খালি করি এবং তারা কখন সেই জায়গা দখল করে। আমরা উঠে গাড়ির দিকে পা বাড়াতেই সবাই প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে জায়গা দখল করতে এল। এর পরেও অনেকবার উদুপিতে কফি খেতে গিয়েছি কিন্তু আমাদের ভাগ্যে ঐ জায়গায় বসার শিকে ছেঁড়েনি।
 মুম্বাই থেকে ফেরার পর দুই বন্ধু পরিবারসহ গিয়েছি কফি খেতে। যথারীতি দেবদারু গাছের ছায়ায় চেয়ারগুলো তাদের বিশেষ সদস্যদের দ্বারাই পূর্ণ ছিল , আমরা ফুটপাতে রাখা চারটে চেয়ারে বসে সামনে রাখা দুটো টুলের উপর কফি রেখেই খেলাম। যতীন দাস রোড যা ল্যান্সডাউন রোডকে পূর্ব পশ্চিমে বিভক্ত করেছে একটু আলো আঁধারিতে ভরা। বড় বড় গাছ গাছড়া এই দিকটাকে আরও একটু মায়াবী করে তুলেছে। মুম্বাই শহরের ঝলকানি এখানে নেই ,  ম্লান  চাঁদের আলো এবং রাস্তার স্তিমিত আলো এক অপূর্ব রূপ  আমাদের সবাইকে মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছে। কফি শেষ, কিন্তু কিছুতেই উঠতে ইচ্ছে করছে না অথচ যেতে হবেই। একটা বিড়াল খুব আয়েশ করে ঘুমাচ্ছে। সাধারণত সে চেয়ারেই ঘুমায় কিন্তু আজ বাধ্য হয়েই টুলের উপর শুতে হয়েছে । লেজটা ঠিক জুত করে রাখা যাচ্ছে না যাতে একটু অস্বস্তি ই হচ্ছে। হঠাৎ একটা গাড়ি এসে দাঁড়ালো এবং তিনিও একটু স্বস্তি পেলেন। গুটি গুটি পায়ে টুল থেকে নেমে লঘুপদে তিনি গাড়ির বনেটে উঠে পড়লেন এবং এদিক ওদিক দেখে নিশ্চিন্ত মনে নিদ্রায় মগ্ন হলেন। এদিকে ভদ্রলোকের ও যাবার সময় হয়েছে। অনেক আদর করে বিড়ালটিকে অনুনয় বিনয় করতে লাগলেন এবং নেমে যাওয়ার অনুরোধ করলেন কিন্তু তিনি লেজ নাড়িয়ে নাড়িয়ে আদর খেতে থাকলেন কিন্তু ওঠার নামগন্ধও নেই। তখন ভদ্রলোক ঐ উদুপি রেস্তোরাঁর একজনকে বললেন বিড়ালটিকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য এবং সেই ছেলেটি অনেক আদর করে যেমন করে ছেলেকে ভুলিয়ে নিয়ে যায় সেইভাবে তাকে তুলে নিয়ে গেল। আমাদের ও ওঠার সময় হয়েছে কিন্তু দেবদারু ছায়ায় বসা লোকগুলো যেন ফেভিকল লাগিয়ে বসে আছে, একবার বাঁদিকে কাত হয়ে আবার কেউ কেউ ডানদিকে। একবার জিজ্ঞেস করলাম এই জায়গাটা কি শুধু মেম্বারদের জন্য? হা হা করে হেসে সবাই বলে উঠল," না, না কি যে বলেন?"


Saturday, 7 March 2026

"তারাপীঠ দর্শন"

বাড়িতে একলা বসে থেকে একঘেয়ে লাগছে, ভাবতে ভাবতে  সহদেব একটু  আনমনা হয়ে গেছে এবং ভাবছে আশেপাশে কোথাও ঘুরে এলে কেমন হয়। যেমন ভাবা, তেমন কাজ। পঞ্চপাণ্ডব এখন কেমন ছন্নছাড়া হয়ে গেছে। সর্বজ্যেষ্ঠ যুধিষ্ঠিরের শরীরটা মোটেও ভাল যাচ্ছে না, সুতরাং দেবিকাকে তার দেখাশোনা করতে হচ্ছে, দ্বিতীয় পাণ্ডব ভীম সদ্য প্রয়াত, তাই ভীমজায়া ভালান্দারা শোকে মূহ্যমান, চতুর্থ পাণ্ডব নকুল ও কারেনুমতি সুদূর আমেরিকায়  পাড়ি দিয়েছে এবং তার ই মতন সহদেব জায়া বিজয়াও প্রবাসে মেয়ের কাছে। থাকার মধ্যে অর্জুন ও সুভদ্রা এবং সহদেব এবং ধৃষ্টদ্যুম্ন ও তার সহধর্মিণী সুধন্যা। দুঃশলা দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ থাকায় সে ও এই অভিযানে সামিল হতে পারছেনা। অতএব বরাবরের মতো পাণ্ডব ত্রাতা অর্জুন ই ভরসা। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী        অর্জুনকে সব্যসাচী না বলে আরও অন্য কোন নামে ভূষিত করলেও কিছু খারাপ হতোনা। যাই হোক, অর্জুন ই স্বভাবসিদ্ধভাবে গাণ্ডীবের সঙ্গে সঙ্গে এই দায়িত্ব ও তুলে নিল।

যেমন ভাবা তেমন কাজ। যাওয়া হবে তারাপীঠ‌ গাড়িতে। ধৃষ্টদ্যুম্ন ও সুধন্যা দুর্গাপুর চলে যাওয়ায় প্রথমে ঠিক হয়েছিল যে তারা ওখান থেকে সরাসরি তারাপীঠ চলে যাবে এবং অর্জুন, সুভদ্রা ও সহদেব সাঁইথিয়া হয়ে ওখানে পৌঁছে যাবে। তারপর প্ল্যানে একটু রদবদল হলো, ঠিক হলো দুর্গাপুর হয়েই দুটো গাড়ি একসঙ্গে যাবে। ১৭ ই নভেম্বর ভোরে রওনা দিল অর্জুন, মাঝপথে তুলে নিল সহদেব কে, সঙ্গে সারথি রজত। দুর্গাপুর যাওয়ার পথে শক্তিগড়ে একটা ছোট্ট বায়ো ব্রেক নিয়ে ব্রেকফাস্ট করে নেওয়া হলো এবং দুর্গাপুরে মুচি পাড়া মোড়ে ধৃষ্টদ্যুম্ন ও সুধন্যা সারথি হৃদয়হরণকে নিয়ে মিলিত হলো। ঠাণ্ডা তখনো সেরকম জাঁকিয়ে না পড়লেও একটা হালকা মিষ্টি শীতের ভাব বেশ আনন্দদায়ক ছিল। মুচি পাড়া মোড়ে দুটো গাড়ি বেশ চলছে, একটু দূরেই শুরু হলো শাল পিয়ালের জঙ্গল। তারপর ওখানে একটু চওড়া জায়গা দেখে সুধন্যার সকাল সকাল বানিয়ে আনা ঘিয়ে ভাজা পরোটা ও আলুর দম এবং মিষ্টি দিয়ে বনভোজন শুরু হলো। রজত ও হৃদয়হরণের সহযোগিতায় ওই দুর্লভ দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি হলো। যাত্রা শুরু হলো তারাপীঠের দিকে। অর্জুন সোনার বাংলা হোটেলে দুটো স্যুইট বুক করে রেখেছিল আগে থেকেই। সুতরাং একটু দেরি হলেও অসুবিধা কিছুই হলোনা। রাস্তার মোড়েই উল্টোদিকে পশ্চিমবঙ্গের ট্যুরিজম ডিপার্টমেন্টের হোটেল রক্তজবায় রজত ও হৃদয়হরণের ব্যবস্থা করা হলো। খুব দারুণ কিছু না হলেও ব্যবস্থাপনা এবং খাওয়া দাওয়া সাধারণ মধ্যবিত্তের নাগালের মধ্যে। তবে লোকেশন কিন্তু দারুণ। অর্জুন সব ব্যবস্থাই করে রেখেছিল এবং পূজো দেওয়ার জন্য পুরোহিত ও ঠিক করেই রেখেছিল। আগেও বার তিনেক তারাপীঠ এসেছে সহদেব কিন্তু এবারের দর্শন একটা আলাদা অভিজ্ঞতা। হোটেলে ফিরে একটা দারুণ ডিনার এবং রাতে গল্প করতে করতে কখন চোখ লেগে আসা কিছুই বোঝা গেল না। পরদিন সকালে ব্রেকফাস্ট করে তারাপীঠের   শ্মশান দেখে বিরাট পরিবর্তন দেখতে পেল।বছর ষাটেক আগে প্রথম যখন সহদেব আসে তখন শ্মশানে এদিক সেদিকে জ্বলন্ত চিতা চোখে পড়েছিল এবং ইতস্ততঃ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কঙ্কাল ও নজরে পড়েছিল কিন্তু  মাঝের সময়টা একটু বেশিই লম্বা এবং তার ছাপ এই শ্মশানেও পড়েছে ।  বামা ক্ষ্যাপার মন্দির তথা বাড়ি দর্শন করে বক্রেশ্বরের পথে যাত্রা শুরু হলো। তারাপীঠ থেকে ঘন্টা দুয়েক চলার পর এল বক্রেশ্বরের মন্দির। সহদেবের এখানে আসা প্রায় ৬০বছর পর যখন তারাপীঠের সঙ্গেই এই বক্রেশ্বর দর্শন হয়েছিল ।  সহদেবের স্মৃতিশক্তির কথা মহাভারতে উল্লেখ রয়েছে কিন্তু এখানে সহদেব বোধহয় পাশ করতে পারবে বলে মনে হয়না আর যদিও বা করে তাহলে টেনেটুনে পাশ করবে। অষ্টাবক্র মুনি তাঁর কঠিন তপস্যায় মহাদেবকে সন্তুষ্ট করেন এবং তাঁর আশীর্বাদে তিনি পুনরাবস্থা ফিরে পান। এই বক্রেশ্বরেই দেবী পার্বতীর ভ্রূর অংশ পড়ার জন্য এটি ৫১পীঠের অন্যতম। দেবী এখানে মহিষাসুরমর্দিনী হিসেবে পূজিত হন। এক ই জায়গায় দেবী দুর্গা ও শিবের মন্দির হওয়ায় শিবরাত্রিতে প্রচুর ভক্ত সমাগম হয়। এখানকার আরও একটি বিশেষত্ব এখানকার উষ্ণ প্রস্রবণ। এখানে স্নান করে বহু লোকের রোগ নিরাময় হয়। পেট চোঁ চোঁ করছে, ডান হাতের কিছু ব্যবস্থা করা ভীষণ প্রয়োজন কিন্তু কাছাকাছি কোন ভাল হোটেল পাওয়া গেলনা। অতএব যাওয়া যাক দুর্গাপুরের পথে। ঘন্টা দুয়েক চলার পর দুর্গাপুর মুচি পাড়া মোড়ের একটু আগে ধৃষ্টদ্যুম্ন নিয়ে গেল পড়তি বেলায় লাঞ্চ করার জন্য। হোটেলটা মোটামুটি ভালো এবং রাস্তার উল্টোদিকেই একটা কলেজ থাকায় খাবার দাবার বাসি থাকার প্রশ্নই নেই। রজত ও হৃদয় হরণ ওই হোটেলেই দুপুরের খাবার খেয়ে নিল। ফেরার পালা এবার। সুধন্যা ও ধৃষ্টদ্যুম্ন দুর্গাপুরেই থেকে গেল হৃদয়কে নিয়ে আর এর পরেই শুরু হলো রজতের রথ ছোটানো আর অর্জুনের মনে পড়তে লাগল বাসুদেবের রথ ছোটানোর কথা। কখন যে শক্তিগড় পেরিয়ে গেল বোঝা গেলনা, চলে এল কলকাতায় চা না খেয়েই।

Wednesday, 4 March 2026

" আরাবল্লী এক্সপ্রেস"

আমেদাবাদে কাজের সুবাদে কয়েকজন বন্ধু বান্ধবের সংস্পর্শে এসেছিলাম যাদের সঙ্গে রিটায়ার করার পরেও ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ রয়ে গেছে। এইরকমই একজন বন্ধু দিলাওয়ার অনেকদিন আগে থেকেই বলে রেখেছিল যে তার মেয়ের বিয়েতে আমাকে উপস্থিত থাকতে হবে। ওর মেয়ের যখন বছর সাতেক বয়স তখন ও শুধু আমার সহকর্মী ই নয় , একটা গভীর বন্ধুত্ব ওর সঙ্গে হয়ে গেছিল। তারপর ওখান থেকে বদলি একের পর এক জায়গায় কিন্তু বন্ধুত্বের রেশ থেকেই গেছিল।  অপূর্ব সুন্দর ছিল ওর মেয়ে জার্মিন বা জারু। গলার আওয়াজ ছিল ভারী মিষ্টি এবং ওর গলার মিষ্টি আওয়াজ শুনে ওকে একটা হারমোনিয়াম উপহার দিয়েছিলাম ওর জন্মদিনে। দেখতে দেখতে জারু বড় হয়ে উঠছে এবং পড়াশোনার চাপের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গান করতে পারছে কিনা আর খবর পাইনি। হোয়াটসঅ্যাপে ই কার্ড পাঠিয়ে ও ক্ষান্ত হয়নি, ক্যুরিয়ারে একটা খুব সুন্দর
 কার্ড পাঠিয়েছে,ভেতরে একটা অতি পরিচিত হাতে লেখা চিরকুট আপকো আনা হি চাহিয়ে। মনে পড়ে গেল নিজের প্রতিজ্ঞার কথা এবং তখনই ঠিক করে ফেললাম যে বম্বেতে কয়েকটা দিন কাটিয়ে ওখানে বিয়েতে অন্তত একটা দিন কাটিয়ে আসব। ছেলেকে পাকড়াও করে সাথী করে নিলাম এবং গুজুমেলে( গুজরাট মেল) যাওয়ার টিকিট হলো। ফ্লাইটে যাওয়া আসা করায় আমার ঘোর আপত্তি কারণ এত হ্যাপা করে মুখ গোমড়া করে যাতায়াত করায় প্রচণ্ড মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। মানুষের বয়স হলে কথাবার্তা বলার লোক কমে যায় এবং ট্রেনে যদি স্লিপার ক্লাসে দিনের যাত্রা হয় তবে দুচারটে লোকের সঙ্গে আলাপচারিতা হয়। ছেলে কিন্তু যে টিকিট কেটেছে তাতে কোনটাই সম্ভব নয় কারণ রাতের ট্রেন এবং তাও আমার  ট্রেন সফরের  সাধ মেটাতে এসি ফার্স্ট ক্লাস । দাদার স্টেশনের সাত নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে ছাড়বে কিন্তু প্ল্যাটফর্ম খুঁজে পেতে ট্রেন প্রায় মিস হয়ে যায় আর কি। যাই হোক, দুজনের ক্যূপে ঢুকে পড়ে ভেতর থেকে লাগিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুম। কিন্তু গুজুমেলে মাঝেমাঝেই একটা এমন হেঁচকা টান পড়ছিল  যে মনে হচ্ছিল যে আমাদের কামরাটা বোধহয় যেতে  ইচ্ছুক নয় কিন্তু বড় দাদার মতো ইঞ্জিন হাত ধরে টান মেরে বলছিল ," চল, যাবিনা মানে"  কোন কথাবার্তা না হয়েই ভোরবেলা আমেদাবাদ পৌঁছে গেলাম। ট্রেনেই মুখ ধুয়ে নেওয়ায় স্টেশনে নেমে চা খেতে কোন অসুবিধা হলোনা।এরপর উবের ট্যাক্সিতে আমার পরিচিত এক হোটেলে।

খানিকক্ষণ ঘুমিয়ে নিয়ে তৈরী হয়ে নিলাম এবং পুরনো বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে দেখা করে বিয়েবাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। নিকা হয়ে গেল জারুর আর্মানের সঙ্গে। ঝকঝকে ছেলে আরমান। বিয়ের কয়েকদিন পরেই জারুকে নিয়ে চলে যাবে সুদূর আমেরিকায়। ভারী সুন্দর লাগছিল জার্মিনকে। ও চিনতে পেরেছে আমাকে, মৃদু হাসিতে জানালো। ডিনারের পরে আবার আমেদাবাদ স্টেশনে। ফেরার পালা কিন্তু এবার আমাদের টিকিট আরাবল্লী এক্সপ্রেসের এসি টু টায়ারে। রথ দেখা হলো কিন্তু কলা বেচা  হলোনা মানে লোকজনের সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে আসা এবং সেকেণ্ড ক্লাস চেয়ার কার বা স্লিপারে আসা হলোনা। কি আর করা যাবে, একসঙ্গে সব কিছু তো হয়না কারণ ছেলেকে একদিন  ছুটি নিয়ে পরের দিন অফিস করতেই হবে। অতএব করতেই হবে সমঝোতা।

এবার ট্রেন আসার বেশ খানিকক্ষণ আগেই পৌঁছে গেছি আগের রাতের কথা মনে রেখে। আমাদের কোচটা যেখানে থামবে তার খুব কাছেই একটা বেঞ্চে বসে আছি। আর পি এফের লোকরা আলতু ফালতু লোকদের ভাগিয়ে দিচ্ছে। এখন স্টেশনগুলো খুব পরিষ্কার এবং সেটা সবার সহযোগিতার জন্য ই সম্ভব হয়েছে। হঠাৎ ঘসঘস করে কিছু টেনে নিয়ে যাওয়ার আওয়াজে চোখ চলে গেল পিছনদিকে। দুটো বছর আট নয়েকের ছেলে দুটো বড় প্লাস্টিকের বালতি টেনে নিয়ে যাচ্ছে আর সেই বালতিতে রয়েছে খালি জলের প্লাস্টিক বোতল। মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল। এই বয়সের ছেলেদের পেট চালাতে এইরকম কাজ করতে হচ্ছে এই ভাবে! আমাদের ঘরের ছেলেমেয়েরা এই বয়সে এত রাতে ঘুমাতে চলে যায় পরেরদিন স্কুলের রুটিন অনুযায়ী বইপত্র গুছিয়ে আর এরা বোতলগুলো বুঝিয়ে দিয়ে কিছু পয়সা নিয়ে তার মা বা বাবার কাছে বুঝিয়ে দেবে এবং তার পরে তাদের খাওয়াদাওয়া ও ঘুম। এক ই বয়সের শিশু অথচ কতটাই না বৈষম্য। ট্রেন আসতে এখনও প্রায় আধঘণ্টা দেরী। আমার আরাবল্লী এক্সপ্রেসের কথা মনে হতে লাগল আর মনে পড়তে লাগল মহারানা প্রতাপের কথা। রাজপুতানার ইতিহাস ঘাঁটলে এটাই দেখা যায় এরা নিজেদের মধ্যে যত রেষারেষি করেছে ততটাই সুবিধা করে দিয়েছে বাইরের শত্রুদের। এঁরা নিজেদের মধ্যে দলাদলি না করে যদি ঐক্যবদ্ধ ভাবে প্রতিরোধ করতো তাহলে ভারতবর্ষের ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতো। মনে পড়তে লাগলো হলদিঘাটের যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে মহারানা প্রতাপকে নিয়ে হাতির দাঁতে আহত মহারানা প্রতাপের ঘোড়া   চেতক  পালিয়ে যাচ্ছে নিরাপদ দূরত্বে, পিছন থেকে বৈমাত্রেয় ভাই শক্তি সিং রানা প্রতাপ কে হত্যার উদ্দেশ্যে প্রেরিত দুজন মুঘল যোদ্ধাকে হত্যা করে চিৎকার করে ডাকছে," হো নীল ঘোড়াকা সওয়ার" বলে রানা প্রতাপের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। আহত চেতকের আর চলার শক্তি নেই, পড়ে গেল মাটিতে কিন্তু ততক্ষণে তার মনিব মহারানাকে বিপন্মুক্ত করে দিয়েছে। ইতিমধ্যে শক্তি সিং পৌঁছে গেছেন তাঁর বড় ভাই রানার পাশে এবং চেতকের মৃত্যুর পর তার নিজের ঘোড়াটি দিয়ে মহারানাকে পালাতে সাহায্য করলেন। ইতিহাসে যদিও আছে যে শক্তি সিং আকবরের সঙ্গে ছিলেন অন্যান্য অনেক রাজপুত রাজাদের মতো কিন্তু যখন তিনি জানতে পারেন যে আকবর মেওয়ার আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং সেইখানে তাঁকে মেওয়ারের রাজা বানাতে চাইছেন, তিনি আকবরের অনুমতি না নিয়েই মহারানাকে সতর্ক করে দিয়েছেন যা এককথায় বলা যায় গুপ্তচরবৃত্তি করেছেন কারণ তিনি আকবরের সঙ্গে যোগ দিলেও নিজের বাবা ও ভাই তথা নিজের দেশের বিরুদ্ধে যেতে চাননি। চোখের সামনে চেতককে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে দেখে শক্তি সিং তার দাদাকে নিজের ঘোড়াটি দিয়ে পালাতে সাহায্য করলেন। এইসব ভাবতে ভাবতে কখন ট্রেন আসার ঘোষণা হয়ে গেল। ইতিহাসকে কাঁধে করে আরাবল্লী এক্সপ্রেস স্টেশনে এসে ঢুকল এবং আমরাও নিজেদের সীটে বসে পড়লাম। এটা আর পাঁচটা ট্রেনের মতোই , কিছু পার্থক্য নেই অথচ মনটা আমার কোথায় যেন উধাও হয়ে গেছিল, আমি তখনো সেই ট্রেনের মধ্যে ইতিহাস খুঁজে চলেছি। দশ মিনিট পরে ট্রেন ছাড়ল, ঘন্টা খানেক বাদে আনন্দ এবং দুঘন্টা পরে এল বরোদা, সুরাট, বাপি, নভসারী ,ভালসাড ও দহনুরোড। জেগে বসে আছি একটা ঘোরের মধ্যে, মনে হচ্ছে এই বোধহয় আটফুট দীর্ঘ রানা প্রতাপ এসে বলবেন আমি স্বাধীনতার প্রতীক, আমার মৃত্যু নেই, যুগে যুগে আমি আসি আর স্বাধীনতার বাণী শোনাই। চোখটা একটু লেগে এসেছিল সবে কিন্তু রাজপুতানা তথা ভারতবর্ষের গর্ব সেই মহারানা প্রতাপের চিন্তা মাথায় কিলবিল করছে। তিনি যেন বলছেন যে ইতিহাসবিদদের লেখনীতে তাঁর বীরত্বের কথা সেইভাবে প্রচার না পেলেও তিনি আছেন আপামর জনতার হৃদয়ে। ধীরে ধীরে এর বোরিভালি যেখানে বহু যাত্রী নেমে গেল। ট্রেন প্রায় খালি আর মাঝে মাঝেই থেমে যাচ্ছে এখানে সেখানে যখন যে কোন মূহুর্তে ছিনতাই হবার সম্ভাবনা প্রবল। জেগেই থাকলাম বান্দ্রা টার্মিনাস অবধি। এখানেই যাত্রা শেষ কিন্তু আমরা নামতে না নামতেই হুড়মুড় করে বোরখা পরা মহিলা ও লোকজন উঠতে লাগল এবং বাথরুমে ঢুকে পড়ল প্রাতঃকৃত্য সারার জন্য। স্টেশনের বাইরে এত নোংরা যে মনের মধ্যে যে রানা প্রতাপ ঘোরাঘুরি করছিলেন তিনি কোথায় যেন ভ্যানিশ হয়ে গেলেন।

Saturday, 28 February 2026

"কার্টার রোডে কিছুক্ষণ"

বম্বে আসা দুসপ্তাহ হয়ে গেছে। পুরোনো সহকর্মীরা রিটায়ার করার পর যে যার নিজের জায়গায় ফিরে গেছে আমার ই মতন। নাতি নাতনিদের পরীক্ষা শেষ হয়ে গেলেও বিভিন্ন রকম কাজ যেমন আঁকা, গান বা নাচ বা ফুটবল খেলা ও সাঁতারে যুক্ত থাকায় তাদের সঙ্গটাও  নিরবচ্ছিন্ন ভাবে পাওয়া যাচ্ছে না। সময় কাটানোর একটাই রাস্তা, বাজারে যাওয়া ও নানান বিক্রেতাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলা। সেটাও বৃহনমুম্বাই মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের সৌজন্যে প্রায় অনেকটাই ব্যাহত। অবশ্য বহুবছর পর ভারতের সবচেয়ে ধনী কর্পোরেশনের পরিচালনে বদল হয়েছে এবং তাদের সামনে একটাই রাস্তা খোলা যে এই শহরের উন্নয়ন কি ভাবে আরও ভাল করা যায়। তাই মাঝে মাঝেই গলির রাস্তায় বদল আনা হচ্ছে এবং যে কোনও বদলেই সাময়িক অসুবিধা হয়। এই শহরেও তার ব্যতিক্রম নয় এবং পিচের রাস্তা বদলে কংক্রিটের রাস্তা করা হচ্ছে। এতে প্রথমেই অনেক খরচ হলেও ফি বছর রাস্তা সারাইয়ের ঝঞ্ঝাট থাকেনা। সুতরাং চেনা রাস্তা ও অচেনা হয়ে যাচ্ছে এবং ভরসার জায়গা সেই গাড়ি ও ড্রাইভার। এইসব কারণে বাড়ির বাইরে যাওয়া হয়েই উঠছে না।

আজ নাতনি যেখানে পাশ্চাত্য গান শেখে সেই সংস্থার বার্ষিক অনুষ্ঠানে ছাত্র ছাত্রীদের দ্বারা অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রিত থাকায় অল্পবয়সী মেধাবী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরিচয় ঘটলো। এতটাই পরিচ্ছন্ন ব্যবস্থা এবং উঁচু মানের শিশুশিল্পীদের সান্নিধ্যে কি করে তিন ঘণ্টা সময় কেটে গেল টের পেলাম না। মাঝে দুবার ব্রেক দিলেও অনুষ্ঠান কে তিন ঘন্টা টেনে নিয়ে যাওয়া যে সে কম্মো নয়। এতেই বোঝা যায় খুদে শিল্পীদের মান কি ধরণের। যাই হোক অনুষ্ঠান শেষে একটু কফি খাওয়ার উদ্দেশ্যে বান্দ্রার দিকে রওনা দেওয়া হলো। কিন্তু যেখানেই যাওয়া হচ্ছে সেখানেই দেখা যাচ্ছে বিরাট লাইন। শনিবার সন্ধ্যায় যে কোন রেস্তোরাঁয় ঢোকাই কঠিন।অতএব বান্দ্রার গলিঘুঁজিতে একটা পুরনো আমলের বাড়িতে একটা রেস্তোরাঁর খোঁজ পাওয়া গেল, নাম যার ভ্যানিলা মিয়েল যার মানে হচ্ছে খুব মিষ্টি ভ্যানিলা। গলিতে ঢুকে মনে হচ্ছিল যেন গোয়ার কোন গলিতে এসে পড়েছি। আশে পাশে নামী দামী প্রোমোটারদের গগনচুম্বী বহুতল গড়ে উঠেছে অথচ তাদের এই ছোবল থেকে কি করে নিজেদের বাঁচিয়ে রেখে নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রেখেছে তা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। সামনে পিছনে গলিতে সব বাংলো প্যাটার্নের বাড়ি , এককথায় ভারী সুন্দর। আধুনিকতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সাবেকিয়ানা বজায় রাখা চাট্টিখানি কথা নয়। বাড়ির বাইরের গঠন এক ই রয়েছে কিন্তু ঐ ছোট্ট জায়গায় এত সুন্দর ব্যবস্থা, না দেখলে হয়তো বিশ্বাস করাই যেত না। যাই হোক, জায়গা পাওয়া গেল। আমরা হয়তো খানিকটা ভাগ্যবান কারণ আমরা বেরোনোর পরেই আস্তে আস্তে জমায়েত হতে লাগল। কফির সঙ্গে তাল মিলিয়ে কিছু খাবার খেয়ে রওনা দিলাম কার্টার রোডের দিকে।

সূর্য তখন অস্ত যাচ্ছে এবং তার জায়গা দখল করছে আকাশ জুড়ে স্নিগ্ধ করে পূর্ণিমাতে বিলীন হতে সুন্দরী সেই চাঁদ। আমাদের নামিয়ে দিয়ে গাড়ি পার্কিং করতে লাগল ড্রাইভার। সমুদ্রের জল অনেকটাই নেমে গেছে, কাদায় মাখা পাথরগুলো তাদের নগ্নতা ঢাকতে অপারগ। কথায় আছে উপরে খোঁচার পত্তন ভিতরে ছুঁচোর কেত্তন, একদম ঠিক মনে হলো। একটু দূরেই বিস্তীর্ণ জলরাশি যা দেখে বোঝার উপায় নেই যে তার ই নীচে এইরকম রুক্ষ পাথরের অবিন্যস্ত সমাগম । সামনে চলছে সমুদ্রের উপর রাস্তা তৈরি যা মেরিন ড্রাইভ থেকে বোরিভালি পর্যন্ত যাবে এবং  সফরের সময়টাও অনেকটাই কমে যাবে।  সময় তো বহু মূল্য।চোখটা ঘোরাতেই দেখা গেল নানান দৃশ্য। হাঁটছে নানা বয়সী ছেলেমেয়ে, বুড়ো, বুড়ি। এঁদের মধ্যে কেউ বা হুইলচেয়ারে, কেউ বা লাঠির ভরে আবার কেউ বা লাঠি নিয়েও অন্যের সহায়তায়। বসে আছে অনেক লোক নানাধরণের কুকুর নিয়ে ( বড়, মেজো, সেজো, ন, ফুল ইত্যাদি) , গলায় তাদের নানা ধরণের গলাবন্ধ ও বেল্ট। পাশেই তাদের পথে থাকা কুকুররাও, তাদের ও মনে হয় কেন তাদের গলায় ওইরকম সুদৃশ্য গলাবন্ধ ও বেল্ট নেই? একটু কেমন যেন দুঃখ দুঃখ ভাব তাদের। তারাও পেতে চায় একটু স্নেহ , চায় একটা যেমন তেমন গলাবন্ধ, করুক শাসন বাংলা বা ইংরেজিতে। কিন্তু সেগুড়ে বালি, এপাশে ওপাশে লেজ নেড়ে ও কোন লাভ হলোনা, বরং মিলল একটু আধটু টক মিষ্টি ঝাল তিরস্কার। কোন জায়গায় আমল না পেয়ে শুয়ে পড়ল তার নিজের জায়গায় স্ন্যাকস কাউন্টারের পাশে। সেখানেই তার স্বর্গ যেখানে লোকজন খাওয়ার পর একটু উচ্ছিষ্ট তাদের উদ্দেশ্যে ফেলে দেয়। স্ন্যাকস বারের মালিক ই তাদের অকথিত মালিক যদিও সে কখনোই তাদের গলায় বেল্ট পড়ায় না এবং তাদের অপার স্বাধীনতা কেড়ে নেয় না। মানুষ ও স্বাধীনতা ই চায়, নাই বা মিলল তাদের দুবেলা পেট ভরা খাবার। সোনার চেন দিয়ে  বাঁধা থেকে রাজভোগ খাওয়ার  চেয়ে আধপেটা বা খালি পেটে  থেকে স্বাধীনতার স্বাদ অনেক ভাল ।   কুকুরটা তার পায়ের উপর মাথা রেখে শুয়ে শুয়ে দেখতে থাকল আমাকে ও অন্যান্য লোকদের, চোখদুটো থেকে যেন জল গড়িয়ে পড়ছে। ভাল করে লক্ষ্য করলাম যে জল নয় দুটো চোখের নীচেই এমন কালো দাগ যেন জল গড়াতে গড়াতে শুকিয়ে গেছে এবং রেখে গেছে এক অমলিন ছাপ। দুঃখে যাদের জীবন গড়া, দুঃখে তাদের ভয়টা কিসের?