Saturday, 30 May 2026

আকাল--- সেকাল ও একাল

আকাল বা দুর্ভিক্ষ চিরকালের , আগেও ছিল, এখনও আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। কিন্তু তার গতি প্রকৃতি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে যাচ্ছে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা সরকারের ভ্রান্ত নীতির কারণে এই দুর্ভিক্ষ বা আকাল নেমে এসেছে এবং লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি মানুষের প্রাণ হরণ করেছে। কয়েকটা ঘটনা  এই মর্মান্তিক দৃশ্যের প্রত্যক্ষ সাক্ষী। বিগত শতকে ঘটে যাওয়া এই আকাল কিভাবে জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি মানুষের প্রাণ হরণ করেছে যা ভাবলেই শিউরে উঠতে হয়। প্রথমেই মনে আসে ছিয়াত্তরের মন্বন্তর ১৭৭০ সালে ঘটে যাওয়া এই দুর্ভিক্ষ যা প্রায় ১ কোটি মানুষের প্রাণ হরণ করেছে। ১৭৮৩-৮৪ সালে উত্তর ভারতে ঘটে যাওয়া  দুর্ভিক্ষে প্রায় ১কোটি ১০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দোজি বারায় ১৭৮৯-৯২ সালে ঘটা দুর্ভিক্ষ যা খুলি দুর্ভিক্ষ নামেও পরিচিত প্রায় ১কোটি ১০লক্ষ মানুষের প্রাণ নিয়েছে। এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা কঙ্কাল সৎকারের অভাবে এই (খুলি দুর্ভিক্ষ) নামে পরিচিত হয়েছে। আয়ারল্যান্ডে ১৮৪৫-৫২ সালে তাদের প্রধান শস্য আলু উৎপাদন প্রাকৃতিক কারণে ব্যাহত হওয়ায় প্রায় দশ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। চীনের উত্তর ভাগে ১৮৭৬-৭৯সালে ঘটে যাওয়া দুর্ভিক্ষে আনুমানিক ৯০লক্ষ থেকে ১কোটি ৩০লক্ষ মানুষ প্রাণ হারান। সোভিয়েত রাশিয়ায় ঘটে যাওয়া দুর্ভিক্ষে দুই দফায় ৫০লক্ষ থেকে ১ কোটি(১৯২১-২২) এবং ৩৫লক্ষ থেকে ৫০লক্ষ মানুষ ১৯৩২-৩৩ সালে প্রাণ হারান। প্রথম দফায় মৃত্যুর কারণ প্রকৃতি হলেও দ্বিতীয় দফায় দুর্ভিক্ষের কারণ তখনকার শাসক জোসেফ স্ট্যালিনের ভ্রান্ত নীতি যা হলোডোমোর নামে খ্যাত। এর পরেই উল্লেখ করতে হয় আমাদের বাংলায় ১৯৪৩ সালে দুর্ভিক্ষের কথা যেখানে প্রায় ৩০থেকে ৭০ লক্ষ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়। প্রকৃতি ছাড়াও বৃটিশ সরকারের অত্যাচার মূলক ব্যবহার যা এখানে অপ্রতুল উৎপাদিত শস্যের ভাণ্ডার থেকে ব্রিটেনে পাঠিয়ে দেওয়া হয় এবং স্থানীয় লোকেরা অনাহারের সম্মুখীন হয়ে মৃত্যুবরণ করে। সাম্প্রতিক কালে চীনের দুর্ভিক্ষ যা মাও সে তুং এর ভ্রান্ত নীতির ফসল(১৯৫৯-৬১) প্রায় দেড় কোটি থেকে সাড়ে পাঁচ কোটি মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়। সাম্প্রতিক কালে (১৯৮৩-৮৫) ইথিওপিয়ায় ঘটে যাওয়া দুর্ভিক্ষ অনাবৃষ্টি, গৃহযুদ্ধ এবং শাসকদের ভ্রান্ত নীতির সমষ্টিগত ফল। 

সুতরাং, পর্যালোচনা করলে দেখা যায় অতিবৃষ্টি বা অনাবৃষ্টির সঙ্গে যখন তদানীন্তন শাসকদের অদূরদর্শিতা যোগ হয় তখন তার ফল হয় মারাত্মক। আজকের যুগে বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির ও অনেক পরিবর্তন হয়েছে এবং সহমর্মিতা ও বৃদ্ধি পেয়েছে। ইন্টিগ্রেটেড ফুড সোসাইটি ফেজ ক্ল্যাসিফিকেশন (আই পি সি) দুর্ভিক্ষ বা আকালের কারণ এবং সমস্ত বিশ্বের তাবড় তাবড় বিজ্ঞানীদের মতামত সংগ্রহ করে কিভাবে এই দুর্ভিক্ষ বা আকাল এড়ানো যায় এবং একদম এড়ানো না গেলেও তার প্রকোপ কমানো যায় তা নিয়ে পর্যালোচনা করে এবং তার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করার পরামর্শ দেয়। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য প্রকল্প দুর্ভিক্ষ কবলিত দেশগুলিকে খাদ্য জুগিয়ে মানুষকে অনাহার থেকে মুক্তি দান করার চেষ্টা করে এবং মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচতে সাহায্য করে। বিজ্ঞানের উন্নতি এবং মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হলেও প্রকৃতির সঙ্গে সবসময় এঁটে ওঠা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এখনও আফ্রিকার অনেক দেশে বিশেষ করে সুদানের বিস্তীর্ণ এলাকায় এবং দক্ষিণ সুদান ও মধ্য প্রাচ্যের গাজায় খরার প্রকোপে খাদ্যের প্রচণ্ড ঘাটতি হয় কিন্তু মানুষের সহযোগিতার ফলে মৃত্যুহার অনেক কমানো সম্ভব হয়েছে।

স্বাধীনোত্তর ভারতের প্রথমদিকে যখন আমাদের দেশ খাদ্যে স্বনির্ভর হয়ে উঠতে পারেনি তখন মানুষের চরম দুরবস্থা গেছে। অনাবৃষ্টি ও দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির মোকাবিলা করতে ভারতকে আমেরিকার দ্বারস্থ হতে হয় যা "পি এল ৪৮০"  বা পাবলিক ল ৪৮০ নামে খ্যাত। এই আইনটি বিখ্যাত এগ্রিকালচার ট্রেড ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাক্ট,১৯৫৪  বা ফুড ফর পিস বা শান্তির জন্য খাদ্য নামে খ্যাত। এর মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল আমেরিকায় উৎপন্ন বাড়তি খাদ্যশস্য বিক্রি করা এবং ঐদেশের বিদেশ নীতিকে প্রভাবিত করা যাতে তারা কমিউনিস্ট দেশের প্রতি না ঝোঁকে এবং তৃতীয়ত আমেরিকার বাজারের ব্যাপ্তি ঘটানো যা যে কোন দেশের ই লক্ষ্য । আর এই পি এল ৪৮০র অনেকগুলো ভাল দিক আছে। যেমন ক্রেতা দেশকে তাদের ডলার না দিয়ে  নিজেদের মুদ্রা দিয়ে কিনতে হতো এবং এই  মুদ্রাই তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে আমেরিকার সাহায্য হিসেবে গণ্য হতো এবং তৃতীয়ত দুর্গত ও বুভুক্ষু মানুষের প্রতি সহৃদয়তার হাত বাড়ানো একটা অত্যন্ত মানবিকতার পরিচয় এবং এই সাহায্য বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও ধর্মীয় সংগঠনের মাধ্যমে দেওয়া হতো।
যে কোন বিপর্যয়ের একটা ভাল দিক ও থাকে। এই বিপর্যয়ের মোকাবিলা করতে মানুষ চোয়াল শক্ত করে নিজের উদ্ভাবনী ক্ষমতার বিকাশ ঘটায়। স্বনামধন্য বিজ্ঞানী নরম্যান বোর্লো মেক্সিকোয় এক অসামান্য ছাপ রাখেন। তাঁর প্রচুর উৎপাদনশীল এবং পোকায় নষ্ট না হওয়া  ধান ও গমের বীজ, উন্নত মানের সার, আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা এবং যন্ত্রের ব্যবহার মেক্সিকোকে খাদ্যে স্বনির্ভর ই করে তোলেনি, আমদানি কারক দেশ থেকে রপ্তানিকারক দেশে রূপান্তরিত করেছে। আমাদের দেশের বিখ্যাত কৃষিবিজ্ঞানী প্রফেসর এম এস স্বামীনাথন নর্ম্যান বোর্লোর সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে  আমাদের দেশে সবুজ বিপ্লব আনেন এবং পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও পশ্চিম উত্তর প্রদেশে ধান ও গমের ফলনে আমূল পরিবর্তন আনেন এবং ধীরে ধীরে ভারত ও খাদ্যে স্বনির্ভরতার পথে এগিয়ে যায়। কিন্তু যে কোন জিনিসের ভাল ও মন্দ দুটো দিকই আছে। ধান ও গম দুটো শস্য উৎপাদনের জন্য প্রচুর জলের প্রয়োজন এবং হরিয়ানা ও পাঞ্জাবে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কম হওয়ায় অচিরেই ভূগর্ভস্থ জলের পরিমাণ কমে যাবে এবং এই কৃষি ব্যবস্থার পরিবর্তন না হলে মরুভূমিতে পরিণত হয়ে যাবে। বিহারে ধান ও গমের পরিবর্তে অন্যান্য কম জলের প্রয়োজন শস্য উৎপাদনের ফলে বহুলাংশে তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে।

আমাদের দেশে সবুজ বিপ্লবের আগে সাধারণ দরিদ্র মানুষের অবস্থা খুবই সঙ্গীন হয়ে গিয়েছিল। মানুষ ভাতের বদলে ভাতের ফেন ভিক্ষা করতো। ঠা ঠা রোদে খালি পায়ে ভিখারীদের ," মা গো একটু ফেন দাও" বলে ভিক্ষা করতে দেখা যেত। এখন খুব কম লোককেই খালি পায়ে হাঁটতে দেখা যায়। নিলেন পক্ষে হাওয়াই চপ্পল বা রবারের  চপ্পল তো দেখাই যায়। মোবাইল নিয়ে ভিখারির সংখ্যাও নিতান্ত কম নয়। এখন সব সরকার ই দারিদ্র্য সীমারেখার নীচে থাকা লোকজন যাতে অনাহারে না মারা যায় তা সুনিশ্চিত করেন।মাথা পিছু পাঁচ সাত কেজি চাল বা গম/ আটা এবং আর্থিক অনুদানের ও ব্যবস্থা করেছে যেটা পঞ্চাশ ষাট বছর আগে ছিল না। অর্থনৈতিক বৈষম্য চিরদিন ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে সে সাম্যবাদীরা যত ই চিৎকার করুন না কেন। সাম্যবাদের প্রবক্তারা যত ই গলা ফাটিয়ে চিৎকার করুন না কেন তাঁদের স্বপ্নের দেশেও সেই একই অবস্থা । সাম্যবাদ নিশ্চয় ই থাকা উচিত  এবং অর্থনৈতিক  বৈষম্য  যতটা কম হয় ততটাই ভাল কিন্তু  কথাটা কেমন যেন সোনার পাথর বাটি বলে মনে হয়। খুবই আদর্শবাদী ধারণা কিন্তু এই সাম্যবাদের প্রবক্তা দেশ চীন ও আজ বাস্তববাদী হয়েছে এবং রিফর্মের মাধ্যমে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে। অথচ চীন,ভারত ও কোরিয়ার অর্থনীতি সত্তরের দশকে এক লাইনেই খাড়া ছিল। অর্থনৈতিক সংস্কার ভারত নব্বইয়ের দশকে একরকম বাধ্য হয়েই করেছিল এবং তার সুফল আজ মিলছে যদিও নিন্দুকের সংখ্যা কম নেই যারা প্রতিনিয়ত দেশ রসাতলে যাচ্ছে বলে চিৎকার করে চলেছে অথচ এরাই যখন ক্ষমতাসীন ছিল তারা সেরকম ভাবে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেনি।
শুধু খাদ্যে স্বনির্ভরতাই যথেষ্ট নয় তার সুষম বণ্টন ভীষণ প্রয়োজন এবং দুর্নীতিমুক্ত না হলে এটা প্রায় অসম্ভব। দুর্নীতির সূচকে ভারতের অবস্থান ৯১ তম ১৮২টি দেশের মধ্যে যেখানে আমেরিকার অবস্থান ২৯ নম্বরে। ০ থেকে ১০০ নম্বরের স্কেলে আমেরিকার মান ৬৪ যেখানে ভারত পেয়েছে ৩৯। ডেনমার্ক ৮৯ নম্বর পেয়ে শীর্ষস্থানে মানে দুর্নীতি সেখানে সবচেয়ে কম।
ভারতবর্ষকে দুর্নীতিমুক্ত করতে গেলে আমাদের সকলের প্রয়াস দরকার এবং যাতে কোন লোক অনাহারে মারা না যায় তার দিকে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। প্রকৃতির রোষ থেকে হয়তো সবসময় রক্ষা পাওয়া যাবেনা কিন্তু যদি প্রয়োজনীয় খাদ্যের ভাণ্ডার গড়ে তোলা যায় তাহলে  অতিবৃষ্টি বা অনাবৃষ্টির ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতির মোকাবিলা করা সম্ভব এবং জনগণকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব।


No comments:

Post a Comment