জেলা সদরের সবচেয়ে বড় ব্যাঙ্ক, স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইণ্ডিয়া তার ই মতো একটা বড় বাড়িতে যেখানে কয়েক হাত অন্তর বিরাট বিরাট কাঠের জানলা কাম দরজা যার মধ্যে দুটো বড় কাঠের লম্বা ডাণ্ডা যেটা ওপর নীচ করলে জানলার খড়খড়িগুলো খুলে যায় এবং পরিমিত পরিমাণে আলো হাওয়া আসে সারি সারি ভাবে বারান্দার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চলে গেছে। অনেক কর্মচারী সামনে বসে আছেন কাউন্টারে যারা কাউন্টারের বাইরে লাইনে দাঁড়ানো লোকের কাছ থেকে চেক বা টাকা ওঠানোর ফর্ম নিয়ে একটা টোকেন দিয়ে দিচ্ছে এবং তাদের সামনে থাকা ব্যাঙ্কের লেজারে লিখে পাঠিয়ে দিচ্ছে পিছনে বসে থাকা ছোট,বড় ও মাঝারি কর্মকর্তাদের কাছে। কাউন্টারের পিছনে বসে আলাদা টেবিল চেয়ারে বসে থাকা কর্মকর্তারা পাঠানো চেকগুলো সই করে সাদা প্যান্ট জামা পরিহিত পিওনদের হাতে একটা ছোট খাতায় লিখে পাঠিয়ে দিচ্ছেন ক্যাশিয়ারদের কাছে। তখন ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তোলা এবং জমা দেওয়া ছিল এক বিরাট ব্যাপার। কোন লোককে জিজ্ঞেস করে যদি এই উত্তর পাওয়া যেত যে সে ব্যাঙ্কে যাচ্ছে তাহলে ধরে নিতে হতো যে সে একটা বিরাট কাজ করতে চলেছে। ব্যাঙ্ক খোলা মাত্রই অনেক লোক বিভিন্ন কাউন্টারে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে গেল, কেউ টাকা তুলবে, কেউ বা জমা দেবে আবার কেউ বা পাসবই আপ টু ডেট করাবে। ব্যাঙ্কের লোকেরা ভীষণ ব্যস্ত, কারো কথা বলার সময় নেই, ঠোঁটে সিগারেট চেপে সিনেমার নায়কদের মতো কথা বলতে তারা ব্যস্ত নিজেদের মধ্যে এবং কাউন্টারের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন অসহায় ভাবে তাকিয়ে আছে কখন সেই আকাঙ্খিত ভদ্রলোক কাউন্টারে এসে বসেন এবং তাঁরা তাঁদের কাজটা করে বিদায় নিতে পারেন। অনেক সময়ই অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা যেমন বর্তমান রাজনীতি বা বৈদেশিক রাজনীতি নিয়েও জ্ঞানগর্ভ আলোচনা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন তাঁরা, আলোচনায় ব্যাঘাত ঘটলে খুব বিরক্তি সহকারে এসে কাউন্টারে বসতেন এবং লাইনের সামনে থাকা প্রথম ভদ্রলোক খুব মোলায়েম স্বরে হয়তো জিজ্ঞেস করতেন, "ভাল আছেন?" বা আরও একটু বেশি পরিচিত হলে একটা সিগারেট অফার করতেন। একপ্রস্থ এই কাউন্টারে হলে,যাওয়া ক্যাশ কাউন্টারে এবং সেখানেও বিরক্তিভরা ক্যাশিয়ারের সামনে নিজের প্রয়োজনমতো টাকা চাইতে গেলে হয় ভীষণ বুকের পাটা কিংবা আরও একটা সিগারেট খসানো। অনেক সময়ই এমন হতো যে ক্যাশিয়ার একটা সিগারেট নেওয়ার ছলে পুরো প্যাকেটটাই নিজের কাছে রেখে দিত। অবশেষে কাজ সমাধা এবং একটা মহা আনন্দে বাড়ি ফিরে আসা যে ব্যাঙ্কের কাজ হয়েছে। এ তো গেল টাকা তোলার কথা। জমা দিতে গেলে এত হ্যাপা ছিলনা, টাকা নিয়ে জমা দেয়ার ফর্ম বা ভাউচার ভর্তি করে ক্যাশিয়ার বাবুর জন্য অপেক্ষা করা এবং তিনি উল্টেপাল্টে নোটগুলো পরীক্ষা করে টাকাটা নেবেন এবং কাউন্টারফয়েলটা স্ট্যাম্প মেরে একটা দুর্বোধ্য কলমের আঁচড় দিয়ে ফেরত দিয়ে দেবেন। যদি পাসবুক আপটুডেট করতে হয় তবে সে আরো এক ঝামেলা। একটা দুটো এন্ট্রি থাকলে বকুনি খাওয়ার সম্ভাবনা কম কিন্তু বেশ কিছুদিন না করালে বকুনি খেতেই হবে বা নিদেনপক্ষে একটা বিরক্তিভরা মুখ ব্যাদান দেখতেই হবে। যাই হোক, ব্যাঙ্কের কাজ একটা বিরাট ব্যাপার এবং গ্রাহকদের কাছে ব্যাঙ্কের কর্মচারী ও অধিকর্তাদের ভীষণ চাহিদা এবং তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে সবাই এককাট্টা। কিন্তু সবাই তো একরকম হননা, অনেক সহৃদয় ব্যক্তি আছেন যাঁরা গ্রাহকদের সুবিধা কিসে হবে সেই দিকে নজর দিতেন এবং বলাই বাহুল্য যে তাঁরা সকলের কাছে প্রিয় থাকতেন। কারেন্ট অ্যাকাউন্টে যারা টাকা দেওয়া নেওয়া করতেন তাদের টাকার অঙ্কটা সাধারণত বড় হতো এবং অনেক ক্ষেত্রেই তাঁরা একটা বড় ব্যাগে ছোট বড় সব ধরনের নোটে ভর্তি করে দিতেন । অনেক সময়ই ব্যাঙ্কের ক্যাশিয়ারদের সঙ্গে বিশ্বাসের মাত্রা এতটাই বেশি থাকতো যে ভাউচারে সই করে কোন টাকা কতটা দিয়েছেন সেটাও লিখতেন না, ক্যাশিয়ার বাবুর গোনা হলে তিনি লিখে দিতেন এবং জমা করে দিতেন। এটা একটা সর্বোচ্চ পর্যায়ের বিশ্বাস এবং এটা কখনোই এক দিনে আসেনা। কারেন্ট অ্যাকাউন্টের লেজার এক দেখার মতো জিনিস। বিশাল মোটা একটা চামড়ায় বাঁধানো রেজিস্টার যেটা তোলা বা নামানো যে সে লোকের কম্মো নয় এবং তিনি সযত্নে একটি টেবিলের উপর থাকতেন। কর্মচারীরা চেক নিয়ে এসে এখানে পোস্ট করতেন এবং আধিকারিকদের এখানে এসে সই করতে হতো কারণ ওটা নিয়ে নাড়াচাড়া করাটা খুব সহজসাধ্য ছিল না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছুই বদলে গেছে। এইরকম মোটা চামড়ায় বাঁধানো জাবদাখাতাগুলো আর্কাইভে স্থান পেয়েছে। সেভিংস ব্যাঙ্কের লেজারগুলো ছোট হলেও সেগুলোও বাঁধানো হতো। ধীরে ধীরে খোলা সিট দিয়ে কাঠের ফ্রেমে বাঁধানো হলো এবং ধীরে ধীরে তাও বদলে এল এ এল পি এম বা অ্যাডভান্সড লেজার পোস্টিং মেশিন। কিছুদিন পরে তাও বদলে গেল এবং ব্যাঙ্ক মাস্টার এবং তার ও পরে এল পুরোপুরি কম্পিউটারিজেশন। এখন অনেক লোক আর ব্যাঙ্কে কাজ করেনা, সেই কাজগুলো করে কম্পিউটার। আগে এক ই শহরে দুটো ব্রাঞ্চ থাকলে এক ব্রাঞ্চ থেকে অন্য ব্রাঞ্চে থাকা টাকা তোলা যেতনা। বিদেশ থেকে আসা কোন কাস্টমার যখন এই ধরণের কথা বলতেন তখন হাঁ করে সবাই শুনতো এবং তিনি চলে গেলে মুখ টিপে হাসতো, ভাবতো নির্ভেজাল মিথ্যে বা গুল দিয়েছে। এ তো গেল এক ই শহরের এক শাখার টাকা অন্য শাখা থেকে তোলা। এটা কি কখনো ভাবা গিয়েছিল যে এক শহরের টাকা অন্য শহরে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই ঢুকে যাবে? হ্যাঁ , তাও সম্ভব হয়েছে আর টি জি এস( রিয়েল টাইম গ্রহ সেটেলমেন্ট ) বা এন ই এবং টির
( ন্যাশনাল ইলেকট্রনিক ফাণ্ড ট্রান্সফারের ) বা আই এম পি এস( ইমিডিয়েট পেমেন্ট সার্ভিসের ) মাধ্যমে ।
আগে কারেন্ট অ্যাকাউন্টের লেজার ব্যালান্স হতো প্রতি সপ্তাহের শুক্রবার এবং সেভিংস ব্যাঙ্কের লেজারগুলো মাসে একবার। ফিক্সড ডিপোজিটগুলো হতো তিনমাস বা ছয়মাসে একবার। সেভিংস ব্যাঙ্কের লেজারের সংখ্যা বেশি হওয়ায় প্রত্যেক দশটা বা পনেরটা লেজারের জন্য একটা প্রোগ্রেসিভ বুক এবং কয়েকটি প্রোগ্রেসিভ বুক মিলে একটা মাস্টার প্রোগ্রেসিভ, যার ব্যালান্সটা মিলাতে হতো জেনারেল লেজারের ব্যালান্সের সঙ্গে। দিনের শেষে ডে বুক এবং ক্যাশ বুক, জেনারেল লেজার ও জেনারেল লেজার অ্যাবস্ট্রাক্ট। সপ্তাহের শেষে শুক্রবার দিন সাপ্তাহিক অ্যাবস্ট্রাক্ট, এই ছিল ব্যাঙ্কের কাজ। মাসের শেষে পি রিপোর্ট বা পারফর্মেন্স রিপোর্ট পাঠাতে হতো রিজিওনাল অফিসে। আজ সমস্ত দেশে কম্পিউটার আসায় এগুলো সব অতীত। আজ সবকিছুই কম্পিউটার করে , কেবল ঠিকঠাক করে প্রথম এন্ট্রিগুলো করলেই কাজ শেষ। এত লোকের ও দরকার নেই এবং ব্যাঙ্কের লাভের মাত্রাও অনেক বেড়ে গেছে। আজকের প্রজন্মকে খাতাপত্তরে লেখা কাজে ব্যাপৃত হতে হবেনা এবং কোন কাজ কেন করা হচ্ছে তা জানার ও দরকার নেই কেবল কম্পিউটারে ঠিকঠাক এন্ট্রি করলেই কাজ শেষ। যাঁরা কেন কাজটা করতে হচ্ছে জানার চেষ্টা করেন বা করবেন তাঁরা অবশ্যই শীর্ষে আরোহণ করবেন।
যারা পুরনো দিনের কর্মী তারা অনেকেই এই নতুন কর্মকাণ্ডের সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবহিত নন। প্রতিদিন কিছু না কিছু নতুন জিনিস আসছে গ্রাহকদের সুবিধার্থে যা মেশিন বা কম্পিউটার ই করছে তবুও কর্মীদের বা আধিকারিকদের মুখের হাসি কোথায় যেন মিলিয়ে গেছে । লেজার ব্যালান্স করা একটা কুশলতার পর্যায়ে ছিল যেটা নবীন প্রজন্মের কর্মীদের করতেই হয়না তবুও সবাই যেন ভীষণ ব্যস্ত এবং গম্ভীর, মানুষ যেন খুব বেশি মাত্রায় যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছে এবং ব্যাঙ্ক কর্মীরাও আর পাঁচটা কর্মীর মতো হয়ে গেছে। এর ই মধ্যে যাঁরা কাজ করার সঙ্গে সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের দিকেও নজর দেন তাঁরা একদমই আলাদা এবং তাঁরা এক শাখা থেকে চলে গেলেও লোকে তাঁদের অবশ্যই মনে রাখে।