Saturday, 18 April 2026

"ব্যালকনি"

আগের দিনের প্রশস্ত জায়গা জুড়ে নয়নাভিরাম বাড়ি আজকের দিনে আর দেখা যায়না যেখানে বসে দেখা যেত দূরদূরান্ত  বিশাল প্রান্তর, কোথাও বা ধানের ক্ষেত আর কোথাও বা অন্য কোন ফসল। মাঝে মধ্যে পুকুর বা দীঘি যার চারপাশটা নানা গাছ দিয়ে ঘেরা যা পুকুরের জলকে সূর্যের প্রখর তাপ থেকে শীতল রাখতে বেশ সাহায্য করে। দিনে দিনে লোকসংখ্যা বাড়ছে, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য খানিকটা হলেও কমেছে। আজকের যুগে যাঁদের হাতে প্রভূত অর্থ তাঁরাও আজ শহরে বড় বাড়ি করলেও সেই সুদূরপ্রসারী দিগন্ত পাওয়া সম্ভব নয় কারণ শহরে জায়গার অপ্রতুলতা। তাই জনসংখ্যার চাপেই হোক বা অন্য যে কোন কারণেই হোক না কেন বাড়ির বারান্দা বা ব্যালকনিতে বসে সেই দৃশ্য দেখা আর হয়ে ওঠেনা। সেটা দেখতে গেলে যেতে হবে  শহর থেকে একটু দূরে তাদের বাগানবাড়ি বা ফার্ম হাউসে যেটা প্রতিদিন তো সম্ভব নয়,  ছুটির ফাঁকে মাঝে মধ্যে শহরের ইট, কাঠ, কংক্রিটের জঙ্গল থেকে অব্যাহতি পেতে। তাই দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে ফ্ল্যাট বাড়িতে ব্যালকনি একটা আলাদা মাত্রা পেয়েছে। পুরনো দিনে সরকারী আনুকুল্যে যে ফ্ল্যাটগুলো তৈরী হয়েছিল তাতে দুটো বাড়ির মাঝে বেশ অনেকটাই ব্যবধান থাকায় আকাশের দিকে তাকালে যেন মনে হয় এই একটুকরো আকাশটাই আমার। কিন্তু বর্তমানে প্রোমোটারের কল্যাণে যে ফ্ল্যাটগুলো তৈরী হচ্ছে তাতে ব্যবধান এতটাই কম যে এ বাড়ির কথা পাশের বাড়ি থেকে শোনা যায় এবং তাই ঐ আকাশটুকুও যেন ভাগ বাটোয়ারা হয়ে গেছে। তবে একটা কথা অনস্বীকার্য যে ব্যালকনি ফ্ল্যাটের মর্যাদা ঢের বাড়িয়ে দিয়েছে।

আশির দশকের প্রথম দিকে তৈরী হওয়া গল্ফগ্রীনের ফ্ল্যাট গুলো গাছপালাদের সঙ্গী করে হয়েছিল বলে অনেক হাউসিং প্রজেক্টের তুলনায় এর আকর্ষণটা অনেক বেশী। রোলস রয়েস গাড়ি যত ই পুরনো হোক না কেন তার মর্যাদা একটা আলাদা। এই গল্ফগ্রীনের ফ্ল্যাটগুলোও অনেকটা সেইরকম এবং হালফিলের তৈরী ঝাঁ চকচকে ফ্ল্যাটের তুলনায় অনেক বেশী মনে ধরে। একদম সারি সারি পিছনে না থেকে অবয়ব এক ই রকম রেখে একটু আঁকাবাঁকা ছন্দে তৈরী এই বিল্ডিংগুলো প্রত্যেকটি একটা নিজস্ব ঢঙে গড়ে উঠেছে যেন মনে হয় নৃত্যশিল্পীরা এক ই মঞ্চে বিভিন্ন  আঙ্গিকে নৃত্য পরিবেশন করছে। এখানে বেশিরভাগ বাড়িগুলোই চারতলা কিংবা পাঁচতলা কেবল একটি বহুতল ছাড়া। ছাদে না উঠেও একটু উপরের দিকে ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে বসে অনেকটা আকাশ দেখা যায়। এই আবাসনে  অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরা জীবিকার কারণে অন্য প্রদেশে চলে যাওয়ায় পড়ে থাকা বৃদ্ধ বাবা মায়েদের  একটা বৃহৎ বৃদ্ধাশ্রমে পরিণত হয়েছে। এখন ফ্ল্যাট গুলোর গমগমে ভাব একেবারেই উধাও । বয়সের ভারে ব্যালকনিতে বসার লোক দিন দিন কমে যাচ্ছে, কোথাও দুই থেকে এক আবার কোথাও বা শূন্য ব্যালকনি মনের দুঃখে ম্রিয়মাণ। তবুও যাঁরা রয়েছেন ভোরবেলায় ও সন্ধেবেলায় পাখির কলতানে নিজেদের উদ্বুদ্ধ করতে পারেন। আলোর আভা ফোটার আগেই পাখিদের কিচিরমিচির শব্দে ঘুম ভাঙিয়ে দেয়, নানান ধরণের পাখিরা ব্যালকনিতে বসে থাকা বৃদ্ধ বৃদ্ধাদের কাছে খাবার খেতে আসে এবং গ্রিলের মধ্যেই রাখা জলের পাত্র থেকে নিজেদের তৃষ্ণা মিটিয়ে চলে যায়। সারাদিন কোথায় কোথায় যে তারা ঘোরে বুড়োবুড়িরা চিন্তা করেও উঠতে পারেনা। গ্রীষ্মের দাবদাহে মাঝে মাঝেই তারা আসে জল খেতে এবং কখনও কখনও শরীরের জ্বালা মেটাতে স্নানটাও সেরে নেয়। আশেপাশে সেগুন গাছ, কাঁঠাল গাছ বা বাদাম গাছগুলো এখন একটু স্তব্ধ কারণ তাদের অধিবাসীরা এখন বেড়িয়েছে খাবারের সন্ধানে এবং সন্ধেবেলায় ফিরে এসেই ঝগড়া অবশ্যম্ভাবী নিজেদের জায়গা নিয়ে। কিছুদিন ধরেই দূরে একটা বাড়ির জলের পাইপের উপর বসে থাকা একটা চিল চিঁহি হিঁহিঁ করে ডাকতে দেখা যাচ্ছে। কোন সময় তাকে খেতে দেখা যায়না। হয়তো বা সেও বয়সের ভারে ন্যূব্জ এবং খাওয়ার তাগিদ ও বিশেষ দেখতে পাওয়া যায় না। সমস্ত পাখিদের মোটামুটি ভাবে খাবার দেওয়া হয় এবং ইচ্ছে ও করে ওই চিলটার খিদে মেটাতে কিন্তু তাকে তো ডাকা যায় না আর সেও আমাদের থোড়াই তোয়াক্কা করে। প্রতিটি প্রাণীর ই খিদে তেষ্টা সব ই আছে কিন্তু এই চিলটাকে  দেখে সব ধারণাই কেমন ওলোট পালোট হয়ে যাচ্ছে। আর কাকগুলোও বড্ড বেশি হিংসুটে, ঐ বুড়ো চিলটাকে কারণে অকারণে ঠোকরাতে আসে। একটু যে নিশ্চিন্তে বিশ্রাম নেবে তাতেও তাদের হিংসা।  
ব্যালকনিতে বসে থাকা বুড়ো বুড়ির সংখ্যা যেমন কমছে তেমন ই হয়তো একদিন ওই বুড়ো চিলটাকেও আর দেখা যাবেনা ।

No comments:

Post a Comment