Monday, 13 April 2026

"কে আমি?" (১)

এই বিশাল পৃথিবীর সমস্ত দেশে( ছোট বড় সব মিলিয়ে ১৯৫ ) প্রায় ৮৩০ কোটি লোক আছে। তাদের সবার ই সাধারণ মানুষের মতো দুটো চোখ, দুটো কান , দুটো করে হাত,পা, একটা মাথা ও একটা নাক কিন্তু দৈহিক গঠন বা গায়ের রঙ ভিন্ন বা দেখতেও ভিন্ন এবং খাদ্যাভ্যাস ও ভিন্ন এবং সবাই এক একজন "ভিন্ন আমি"। কিছু কিছু ক্ষেত্রে একজনের সঙ্গে আরও একজনের মিল হতে পারে কিন্তু সম্পূর্ণ মিল কখনোই হয়না। দুটো যমজ ভাই বা বোনের ক্ষেত্রেও অনেক অমিল ধরা পড়ে, সুতরাং সব মানুষকেই একটি গোত্রে ফেলা ভীষণ কঠিন, এককথায় অসম্ভব। আমার গণ্ডিও খুব সীমিত এবং চারপাশে যে ধরনের লোকের সংস্পর্শে এসেছি, তাদের কথাই তুলে ধরার একটি সামান্য প্রয়াস। ৮৩০কোটি মানুষের মধ্যে আমিও একজন কিন্তু পৃথিবীতে এমন কোন মানুষ নেই যিনি আত্মানুসন্ধান করার পরেও নিজেকে সম্পূর্ণ জানতে পেরেছেন। আমরা অন্য সবার সম্বন্ধে হাজারটা কথা বলতে পারি কিন্তু নিজের সম্বন্ধে বলতে গেলেই গুণগুলো আরো ফলাও করে বলি এবং দোষগুলো চোখেই পড়েনা। অন্যজন আমার সম্বন্ধে খুব পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে সমালোচনা করতে পারে কিন্তু সেও তার নিজের সম্পর্কে বলতে গেলে আমার ই মতন কি আরও একটু বেশি বিশ্লেষক। আপ্তবাক্য হলো "আপনাকে এই জানা আমার ফুরাবে না"। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ও বলেন 
"জীবনে জীবনে যোগ করা 
ব্যর্থ হয়নি সে গানের পসরা
আমার কবিতা জানি আমি
গেলেও বিচিত্র পথে হয় নাই সে সর্বত্র গামী।"

প্রথমেই আসব কয়েকজন মহান শিক্ষকের কথা যাঁরা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন ছাত্র তথা দেশ গড়ার কাজে। কেউ অনেক বড় সরকারী পদ উপেক্ষা করে শিক্ষকতা  পেশা বেছে নিয়েছেন এবং শিক্ষক হিসেবে যাঁদের অবদান অনস্বীকার্য। তাঁদের সঙ্গে দেখা হবার সুযোগ না ঘটলেও তাঁদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি এবং আমার দেখা কিছু মাস্টার মশাইদের কথাই বলছি। প্রথমেই বলব আমাদের স্কুলের অঙ্কের মাস্টার মশাই কাবুলি বাবু বা শ্রী রণেন্দ্রনাথ বাগচির কথা। ওঁকে কখনো স্কুলের মেন বিল্ডিং এর টিচার্স রুমে বসতে দেখিনি, উনি বসতেন স্কুলের নতুন বিল্ডিং এ সায়েন্স ব্লকের একতলায় ছোট্ট একটি ঘরে। ছিলনা কোন পাখা, গরমকালে তালপাতার হাতপাখাই ছিল সম্বল। সামনে টেবিলে রাখা ডাঁই করা ছাত্রদের খাতা যেগুলো হোম টাস্ক দেওয়া হতো। অফ পিরিয়ডে বা টিফিনের সময় চা খেতে খেতে ঝড়ের গতিতে দেখতেন খাতা কিন্তু একদম নির্ভুল। একটা ছোট্ট ঘটনার কথা উল্লেখ না করলেই নয়। তখন ফাউন্টেন পেনে লেখা হতো , অঙ্ক করার মাঝে যোগ চিহ্ন দিতে হবে কিন্তু মাইনাস চিহ্ন দেওয়ার জন্য ওপর থেকে ভার্টিক্যাল লাইন দিয়ে প্লাস চিহ্ন করার সময় কালি শেষ এবং একটা আঁচড় পড়লেও কালির দাগ আর পড়লো না। পাশের বন্ধুর কাছ থেকে একটু কালি নিয়ে অঙ্ক শুরু করলেও সেই জায়গাটায় আর কালি দিয়ে দাগানো হলোনা এবং খাতা চেক করার সময় স্যারের নজর সেটা এড়ালো না। এর থেকেই বোঝা যায় তিনি যেন চোখ দিয়ে এক্সরে করতেন এবং খুঁটিনাটি সব কিছুই তিনি দেখতেন। স্যারকে কখনো গল্প করতে দেখিনি এবং তাঁর ভারী শরীর নিয়ে ক্লাসে চেয়ারে বসতেও কখনো দেখিনি। যে কোন চ্যাপ্টারের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত অঙ্ক তিনি করতেন এবং হোম টাস্ক দিয়ে সমস্ত চ্যাপ্টার আড়াই থেকে তিন বার শেষ করতেন যেখানে অন্য স্কুলে সব চ্যাপ্টারের সব অঙ্ক ই করা হতো না। কখনো কখনো মেন বিল্ডিং থেকে ক্লাস নিয়ে নতুন বিল্ডিংয়ে ক্লাস নিতে আসছেন , ছাত্ররা ব্যালকনিতে রোদ পোহাচ্ছে, হঠাৎ একটা ছেলে ছুটতে ছুটতে এসে বললো কবুলিবাবু আসছেন আর মূহুর্তেই ব্যালকনি ফাঁকা এবং যে  যার নিজের জায়গায় বসে স্যারের আসার অপেক্ষায়। দুর্দান্ত পারসোন্যালিটি, মোটা কালো ফ্রেমের চশমায় মোটা মোটা চোখ মাথা থেকে পা পর্যন্ত যখন দেখতেন তখন সেই ছাত্রের ই শুধু নয় সমস্ত ছাত্রদের অবস্থা খারাপ। কিন্তু অসম্ভব ছাত্রদরদী এই কাবুলি বাবুর ভাগ্যে কিন্তু কোন সরকারী শিরোপা জোটেনি কিন্তু তিনি তাঁর অগণিত ছাত্রের হ‌দয়ে আজ ও সমুজ্জল।
আরও অনেক মাস্টার মশাইয়ের সান্নিধ্যে এসেছি যাঁদের মধ্যে একজনের নাম অবশ্যই উল্লেখ করতে হয় এবং তিনি হলেন কৃষ্ণনাথ কলেজের কেমিস্ট্রি বিভাগের প্রধান এবং পরবর্তীকালে ঐ কলেজের প্রিন্সিপ্যাল শ্রী ধীরেন্দ্রনারায়ন রায় । ক্লাসে পড়াতে পড়াতে একটা অন্য জগতে বিচরণ খুব কম স্যারের মধ্যেই দেখা যায়। পুরো বিজ্ঞানটাই যেন তাঁর চোখের সামনে ভেসে ওঠে এবং ওঁর ক্লাস করাটা এক অসাধারণ অনুভূতি। এমন ছাত্র দরদী মাস্টার মশাইয়ের সান্নিধ্যে আসা একটা ভাগ্যের ব্যাপার।

অনেক খবর কানে আসে যেখানে একসময়ের ছাত্র বা ছাত্রী উন্নতির শিখরে উঠেও তাদের শিক্ষক বা শিক্ষিকার অবদান ভোলে না এবং নানারকম বাধা বিঘ্ন অতিক্রম করে তাঁদের অবদানের স্বীকৃতি জানাতে আসেন। এইখানেই সেই শিক্ষক বা শিক্ষিকার অবদান। তাঁরা তাঁদের পেশাগত প্রক্রিয়ায় ছাত্রছাত্রীদের গড়ে তোলেন কিন্তু কেউ কেউ তা মনে রাখে আবার কেউ কেউ তা বেমালুম ভুলে যায়।এক ই শিক্ষা কাউকে উন্নতির শিখরে তোলে আবার যারা তা গ্রহণ করতে অক্ষম তারা সাধারণ হয়ে থাকে বা বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যায়।
এইরকম অনেক শিক্ষক শিক্ষিকা রয়েছেন দেশ বিদেশে আনাচে কানাচে যাঁরা তাঁদের শিক্ষায় বহু ছাত্র ছাত্রীদের আলোকিত করেছেন এবং প্রকৃত মানুষ হতে সাহায্য করেছেন যাঁদের কথা আমরা জানিনা। সমস্ত শিক্ষক শিক্ষিকাদের প্রতি সশ্রদ্ধ নমস্কার জানাই।
এঁরা সবাই এক একজন "আমি"এবং তাঁরা নিজেদের সম্বন্ধে সম্পূর্ণ না জানলেও আমরা যারা তাঁদের সংস্পর্শে এসেছি তারা এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে তাঁদের সম্মান জানাই।

1 comment:

  1. আপনার লেখনী অসাধারণ।

    ReplyDelete