অনেকদিন মুম্বাই শহরে কাটিয়ে কলকাতায় ফিরছি। সন্ধেবেলায় ফ্লাইট ল্যাণ্ড করেছে কিন্তু লাগেজ পেতে একটু দেরি হওয়ায় অন্ধকার বেশ ঘনিয়ে এল। উবের ট্যাক্সিতে বাড়ি ফিরতে ফিরতে প্রায় একঘন্টার উপর লেগে গেল। মাঝে একটু আধটু জায়গা ছাড়া বেশিরভাগ জায়গাই অন্ধকারে ডুবে আছে বিশেষত মুম্বাইএর মতো আলো ঝলমলে শহর থেকে ফিরে মনে হচ্ছে যেন প্রেতপুরীতে প্রবেশ করছি। তবুতো এটাই আমার নিজের শহর, রিটায়ার করার আগে অন্য অনেক ঝাঁ চকচকে আলো ঝলমলে শহরে থাকার সুযোগ ও ছিল কিন্তু তাকে বিশেষ পাত্তা না দিয়ে আমার প্রিয় শহরেই থাকা শ্রেয় মনে করেছি এবং আত্মীয় স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে থাকাই বেছে নিয়েছি। দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকা এবং কাজে ডুবে থাকার সুবাদে আমার পুরনো শহর কলকাতা টা কেমন যেন বদলে গেছে এবং আজকের কলকাতা আমার দেখা কলকাতা থেকে অনেক বদলে গেছে। রাজনীতি এই শহরের এবং সমস্ত পশ্চিমবঙ্গকে কেমন যেন এক অজানা খাদের দিকে নিয়ে গেছে। অন্যান্য প্রদেশের তুলনায় আমরা অনেক পিছনের দিকে হেঁটে গিয়েছি। রাজনীতি সমস্ত পৃথিবীতেই আছে কিন্তু ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে আমরা প্রগতির পথে এগোতে পারিনি। অবনমন অনেক আগেই শুরু হয়েছিল কিন্তু এখন যেন তলানিতে ঠেকেছে। সমস্ত দেশেই ভোট হয় কিন্তু এখানে ভোট পরবর্তী হিংসা এক অভূতপূর্ব ব্যাপার। কত সংসার ভেসে যায় কিন্তু কোন হেলদোল নেই। তবুও কলকাতার প্রেমে গদগদ, এখানে ওখানে খুঁজি আমার সেই পুরনো চেনা শহর কলকাতাকে। আড্ডা মারার জায়গা ছিল গড়িয়াহাট মোড়। তখন ফ্লাই ওভার ছিলনা, মাঝখানে ছিল ট্রামলাইন, ঘটাংঘটাং শব্দ করে চলত ট্রাম। পিছনে সেকেন্ড ক্লাসের জানলার বাইরে থাকা অ্যান্টিনা মাঝে মাঝেই ওভারহেড তার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত এবং কন্ডাক্টার নীচে নেমে সেই অ্যান্টিনাকে যথাযথভাবে সংযোগ ঘটিয়ে ট্রামকে সচল করতে সাহায্য করতো। অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরা বাবা মা বা চেনা পরিচিতদের চোখ এড়িয়ে যশোদা ভবনের নীচে বা ঢাকেশ্বরী বস্ত্রালয়ের গেটের মুখে অপেক্ষা করতে বলত। অপেক্ষাকৃত ভীতু ছেলেমেয়েরা বলতো বাসন্তী দেবী গার্লস কলেজের সামনে। গড়িয়াহাট মোড় থেকে গোল পার্ক পর্যন্ত মাঝখানে থাকা ফুটপাতে সারি সারি গাছের মাঝে ছিল বুলেভার্ড হকার্স কর্ণার যা হিন্দুস্থান পার্ক ,গোল পার্ক বা বালিগঞ্জ এলাকার কাকিমা, মাসিমা ওবৌদিদের টুকিটাকি দরকারি জিনিস সরবরাহ করতো। গড়িয়াহাট বাজারে নিত্যানন্দ ভোজনালয় বা মাইতিদের ভাতের হোটেল খুব কম পয়সায় সাধারণ মানুষের উদরপূর্তির ব্যবস্থা করতো। রামকৃষ্ণ মিশনের উল্টোদিকে গোল পার্কে সন্ধেবেলায় অনেক লোক একটু খোলা হাওয়া নিতে আসতেন। গোল পার্ক থেকে গড়িয়াহাট মোড় আসতে বাঁদিকে ছিল ভাল্লা ফুটওয়্যার যেদিক দিয়ে হিন্দুস্থান পার্কে যাবার আরও একটা রাস্তা। গড়িয়াহাট মোড় থেকে ট্রাইঅ্যাঙ্গুলার পার্ক যেতে ছিল স্টাইলো, বেঙ্গল ফার্মেসি, সিনহা ব্রাদার্স এবং আরও একটু এগিয়ে ছিল এম এল রায়ের দোকান। আরও একটু এগোলেই ডানদিকে পড়তো আশা ব্রাদার্স ও হাটারি রেস্তোরাঁ এবং তাদের সঙ্গে পাঁচিল শেয়ার করা মহানির্বাণ মঠ। আশা ব্রাদার্স বাড়ির কোণে থাকা ছোট্ট একটা সাদামাটা রেস্তোরাঁ যার নাম ছিল জনতা রেস্তোরাঁ এবং স্বাভাবিক ভাবেই তা অতি সাধারণ লোকদের প্রয়োজনীয় রুটি, তরকা খাওয়াতো নামমাত্র পয়সায় কিন্তু তাতেও লোকে ধার বাকিতে খেত। পাশেই ছিল পণ্ডিতিয়া মোড়। নামীদামী রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী দেবব্রত বিশ্বাস, সাগর সেন ও অশোকতরু বন্দোপাধ্যায় কাছাকাছি থেকে যেন পণ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথের গানকে এক অসাধারণ উচ্চতায় নিয়ে যাবার। দেশপ্রিয় পার্কে তখন এত ইট কাঠ পাথরের জঙ্গল হয়নি, ছিল খেলার জন্য বিরাট খোলা মাঠ। ল্যান্সডাউন রোড ছিল এক অসাধারণ সুন্দর রাস্তা যা আরো মহিমান্বিত হয়েছিল রবীন্দ্রসঙ্গীতকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য শুভ গুহঠাকুরতার পরিচালনায় এক বিশ্বস্ত সংস্থা" দক্ষিণীর" উপস্থিতির। এই দক্ষিণী উপহার দিয়েছে অনেক প্রথিতযশা রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পীদের এবং এখনও সেই ধারা অব্যাহত। দক্ষিণ কলকাতার দক্ষিণ দেশীয় খাবার জোগাতে কেরালা কাফে, তারা মহল এবং একটু দূরেই লেক মার্কেটের কাছে কোমলা ভিলা যার ভেতরেই রয়েছে ব্যানানা লিভস। দেশপ্রিয় পার্ক মোড় থেকে স্টেডিয়ামের দিকে এগোতেই প্রথম ডানদিকের মোড়ে একটু এগোলেই এই উদুপি রেস্তোরাঁ। আমাদের দেশের রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালাম সাহেব যখনই কলকাতায় আসতেন, রাজভবনে উঠলেও তাঁর খাবার যেত এই উদুপি রেস্তোরাঁ থেকেই। সুতরাং বলাই বাহুল্য যে তখন থেকেই এই রেস্তোরাঁ একটা আলাদা জাতে উঠে গেছে।
এই উদুপি রেস্তোরাঁ একটি পুরনো আমলের বাড়িতে। ভেতরের ঘরগুলোতে বসার ব্যবস্থা থাকলেও বাইরের বারান্দাটা ঘিরে সেখানেও অনেকগুলো টেবিল পাতা আছে। কিন্তু সবচেয়ে পছন্দের যে জায়গা সেটা হচ্ছে বাইরে ফুটপাতে পাতা সারি করা চেয়ার এবং তাদের সামনে থাকা প্লাস্টিকের টুল যেখানে লোকজন চা, কফি বা স্ন্যাকস খায়। আবার এর ই মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান জায়গা সরু সরু লম্বা ছয়টি দেবদারু গাছ এবং তারা দুটি সারিতে তিনজন করে দাঁড়িয়ে আছে যার মাঝখানে রয়েছে একটি টেবিল এবং উভয় দিকে তিনটি করে চেয়ার। এই জায়গাটা হচ্ছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং কোন সময় ই তা ফাঁকা পাওয়া যায়না। এইখানে কোন সময় বসার সুযোগ পেলে নিজেকে ধন্য মনে হয়। সবসময়ই ওই জায়গায় কেউ না কেউ বসে আছে। গতবছর ফেব্রুয়ারী মাসের নয় তারিখে আমরা স্কুলের চার বন্ধু তাদের পরিবার নিয়ে বেঙ্গল হাটারিতে লাঞ্চ সেরে কফি খেতে এই উদুপিতে গিয়েছিলাম। হয়তো বা সেই বন্ধুদের ভাগ্যেই বা স্ত্রীদের ভাগ্যেই জায়গা পেয়ে গিয়েছিলাম সেই মহামূল্যবান দেবদারু ছায়ায় থাকা সিটগুলোয়। আমরা চার বন্ধু এবং আমাদের স্ত্রীরা মোট আটজন ঐখানেই গুঁতোগুঁতি করে ম্যানেজ করে নিলাম। হাজারো পুরনো গল্পের স্মৃতি রোমন্থনে সময় কিভাবে এগিয়ে চলেছে কারো হুঁশ নেই। দু রাউন্ড কফির পরেও গল্প আর শেষ হয়না আর ওই জায়গার মৌরসীপাট্টাধারী সদস্যরা উশখুশ করছে আমরা ঐ জায়গা কখন খালি করি এবং তারা কখন সেই জায়গা দখল করে। আমরা উঠে গাড়ির দিকে পা বাড়াতেই সবাই প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে জায়গা দখল করতে এল। এর পরেও অনেকবার উদুপিতে কফি খেতে গিয়েছি কিন্তু আমাদের ভাগ্যে ঐ জায়গায় বসার শিকে ছেঁড়েনি।
মুম্বাই থেকে ফেরার পর দুই বন্ধু পরিবারসহ গিয়েছি কফি খেতে। যথারীতি দেবদারু গাছের ছায়ায় চেয়ারগুলো তাদের বিশেষ সদস্যদের দ্বারাই পূর্ণ ছিল , আমরা ফুটপাতে রাখা চারটে চেয়ারে বসে সামনে রাখা দুটো টুলের উপর কফি রেখেই খেলাম। যতীন দাস রোড যা ল্যান্সডাউন রোডকে পূর্ব পশ্চিমে বিভক্ত করেছে একটু আলো আঁধারিতে ভরা। বড় বড় গাছ গাছড়া এই দিকটাকে আরও একটু মায়াবী করে তুলেছে। মুম্বাই শহরের ঝলকানি এখানে নেই , ম্লান চাঁদের আলো এবং রাস্তার স্তিমিত আলো এক অপূর্ব রূপ আমাদের সবাইকে মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছে। কফি শেষ, কিন্তু কিছুতেই উঠতে ইচ্ছে করছে না অথচ যেতে হবেই। একটা বিড়াল খুব আয়েশ করে ঘুমাচ্ছে। সাধারণত সে চেয়ারেই ঘুমায় কিন্তু আজ বাধ্য হয়েই টুলের উপর শুতে হয়েছে । লেজটা ঠিক জুত করে রাখা যাচ্ছে না যাতে একটু অস্বস্তি ই হচ্ছে। হঠাৎ একটা গাড়ি এসে দাঁড়ালো এবং তিনিও একটু স্বস্তি পেলেন। গুটি গুটি পায়ে টুল থেকে নেমে লঘুপদে তিনি গাড়ির বনেটে উঠে পড়লেন এবং এদিক ওদিক দেখে নিশ্চিন্ত মনে নিদ্রায় মগ্ন হলেন। এদিকে ভদ্রলোকের ও যাবার সময় হয়েছে। অনেক আদর করে বিড়ালটিকে অনুনয় বিনয় করতে লাগলেন এবং নেমে যাওয়ার অনুরোধ করলেন কিন্তু তিনি লেজ নাড়িয়ে নাড়িয়ে আদর খেতে থাকলেন কিন্তু ওঠার নামগন্ধও নেই। তখন ভদ্রলোক ঐ উদুপি রেস্তোরাঁর একজনকে বললেন বিড়ালটিকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য এবং সেই ছেলেটি অনেক আদর করে যেমন করে ছেলেকে ভুলিয়ে নিয়ে যায় সেইভাবে তাকে তুলে নিয়ে গেল। আমাদের ও ওঠার সময় হয়েছে কিন্তু দেবদারু ছায়ায় বসা লোকগুলো যেন ফেভিকল লাগিয়ে বসে আছে, একবার বাঁদিকে কাত হয়ে আবার কেউ কেউ ডানদিকে। একবার জিজ্ঞেস করলাম এই জায়গাটা কি শুধু মেম্বারদের জন্য? হা হা করে হেসে সবাই বলে উঠল," না, না কি যে বলেন?"
No comments:
Post a Comment