Tuesday, 2 June 2026

"ছোটঘর"

একান্নবর্তী পরিবারে একটা আলাদা মজা। অনেক ভাই বোন একসঙ্গে থাকার ফলে সবসময়ই একটা হৈহৈ রৈরৈ কাণ্ড। আজকাল তো এটা দেখতে পাওয়া একটা বিরল ঘটনা। তবে দেখা যায় আমাদের টিভির নিরবচ্ছিন্ন সিরিয়ালে আর কিছু পারিবারিক ব্যবসায়ীর পরিবারে। কিন্তু যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে মজাটা যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। ব্যবসায়িক পরিবারে জেঠতুতো, খুড়তুতো ভাইবোনেরা সবাই পড়াশোনা আর প্রাইভেট টিউশনের চাপে যেন কেমন সদাই ম্রিয়মাণ। এই ভাই একটা ক্লাসে তো আর এক ভাই ক্রিকেট কোচিং এ যাচ্ছে। নিজেদের মধ্যে খেলে যে অনাবিল আনন্দ পাওয়া, সেটা যেন কোন মন্ত্রবলে উধাও। টিভির সিরিয়ালে বাবা, মা, বড়ছেলে ও তার পরিবার, মেজ ছেলে ও তার পরিবার, বিবাহিত মেয়ে ও জামাইদের আসাযাওয়া, অবিবাহিত ছেলে এখনও চাকরি জোগাড় করতে না পারায় তার সংসার এখনও হয়নি এবং  সংসারে যাবতীয় এটা সেটা খাটার জন্য কেউ কোন অসুবিধা টের পাচ্ছে না এবং অবিবাহিত মেয়ে চাকরি করে বা টিউশনি করে নিজের হাতখরচা চালিয়ে নিচ্ছে কিন্তু কূটকচালিতে ওস্তাদ। এইধরনের সিরিয়ালগুলো মাসের পর মাস, বছরের পর বছর চলে এবং আই পি এল ক্রিকেট না থাকলে আপনি কোপনি পরিবারের এটাই একমাত্র সম্বল এবং তার পরেও সেই সিরিয়ালগুলো নিয়ে আলোচনা এবং কেউ একজনকে আবার কেউ অন্যকে সমর্থন করায় নিজেদের মধ্যেও মন কষাকষি। কিন্তু আমি যে সময়ের কথা বলতে চাইছি সেটা বেশ অনেকদিন আগের।

বড় একটা বাড়ি, অনেকগুলো ঘর এবং তাও  যথেষ্ট বড় ,বাবা মায়ের একটা ঘর এবং  অবিবাহিত ছেলে ও মেয়ের একটা করে ঘর হলেও বিবাহিত ছেলেদের দুটো করে ঘর , ঠাকুর ঘর, বাইরের ঘরে ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে পড়াশোনা করে এবং অন্যসময় অতিথি এলে সেখানে বসেন, বড় রান্নাঘরে যৌথ পরিবারের হেঁসেল এবং বড় বারান্দায় মাটিতে আসন পেতে খেতে বসা(ছুটির দিনে এবং রাতের খাওয়ার সময়) এবং বারান্দার শেষ প্রান্তে ছোটঘর যেখানে বাচ্চা ছেলেমেয়েরা খেলা করে এবং বিশেষ সময়ে সেটা আঁতুড়ঘর হিসেবে বা কেউ অসুস্থ হলে রোগের বিচার করে সেখানে থাকে। কোন কোন বাড়িতে ঠাকুরের স্থান হয় চিলেকোঠার ঘরে এবং খুব বয়স্ক মানুষ হলে( দাদু বা ঠাকুমা)  সেখানে থাকেন এবং সমস্ত ব্যবস্থা সেখানেই থাকে। তখন ছিল পাড়া কালচার এবং একটা পাড়ায় লোকজন বলতে বোঝাতো অমুকের বাড়ি বা তমুক বাবুর বাড়ি। ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে অস্থিরতা বাড়তে লাগল, সঙ্গে সঙ্গে অসহিষ্ণুতাও, রেষারেষি শুধু এবাড়ির সঙ্গে ও বাড়ির নয়, এক ই বাড়িতে ভাইয়ে ভাইযেও সংক্রমিত হতে লাগল এবং পারিবারিক বাঁধন যেন ক্রমশ শিথিল হতে লাগল। যারা একটু সফিস্টিকেটেড তারা ট্রান্সফার নিয়ে বাইরে চলে গেল এবং পরিবারের ভেঙে যাওয়া সাময়িক ভাবে পিছিয়ে দিতে পারল কিন্তু ততদিনে যা হবার তা হয়ে গেছে, জল চুঁয়ে চুঁয়ে পারিবারিক বন্ধনকে ধীরে ধীরে ক্ষয় ধরিয়ে দিয়েছে। আচ্ছা এটা তো বেশ পরের ঘটনা, ফিরে যাওয়া যাক সেই সোনালী দিনের কথায়, সেই ছোটঘরের প্রসঙ্গে।
ওটা নামেই ছোটঘর মানে অন্যান্য ঘরের তুলনায় বেশ ছোট যদিও তা দৈর্ঘ্যে ১২ ফুট এবং প্রস্থেও ১২ ফুট এবং সাবেকি আমলের বাড়ি বলেই উচ্চতাও ১২ ফুট। পূর্ব দিকে একটা বড় কাঠের খড়খড়ি দেওয়া জানলা, ভেতরের দিকে  খোলে কাঁচের ভাঁজ করা জানলা। পশ্চিমদিকে দরজা যা বাড়ির ভেতরের বারান্দায় সংযুক্ত এবং উত্তর দিকেও একটা দরজা যেখান দিয়ে বাড়ির সামনের ঘরের দিকে যাওয়া যায়। ঘরে একটা বেশ বড় তক্তাপোশ, একটা টেবিল  ও চেয়ার এবং ছিল একটা  বইয়ে ঠাসা দেয়াল আলমারি।  ঐ ছোটঘর  আবার আঁতুড়ঘর হিসেবে ও ব্যবহৃত হতো। প্রথমদিকে  দাই এবং  পরবর্তীকালে হাসপাতাল ফেরত পিসিমা বা কাকিমাদের বাচ্চা নিয়ে  স্থান হতো এ ছোট ঘরে এবং  একমাস তারা এককথায়  কোয়ারেন্টাইন অবস্থায় থাকতো। তখন বাচ্চাদের  এত পড়াশোনার চাপ ছিল না এবং স্কুলের পরে খেলা এবং সন্ধে বেলায়  পড়তে বসা। ছুটির দিন বাচ্চাদের  কলকলানিতে বাড়ি একদম মুখরিত  থাকতো। সামনের মাঠে খেলা বা বাড়ির  উঠোনে খেলা বা বৃষ্টি হলে বারান্দায় বা ছোটঘরে খেলা।  মাঝে মাঝেই পাড়ার সমবয়সীরাও এসে যোগ দিত এবং বাড়ি তখন কলরবে মুখরিত হয়ে উঠতো।  ওই সময় ঘরের সংলগ্ন পায়খানা (চিন্তাঘর) বা  বাথরুম কেউ কল্পনাও করতে পারত না। ঠাকুমা, দিদিমার পরিভাষায় হতো সেটা ম্লেচ্ছ বাড়ি। কিন্তু আজকের ফ্ল্যাট বাড়িতে তো সবগুলোই তো ম্লেচ্ছ বাড়ি কারণ প্রতি বর্গফুট জায়গা অত্যন্ত মূল্যবান। আর সেই ছোটঘরের দক্ষিণ দিকের বারান্দায় ও দুটো ঘর এবং তার পাশে কলতলা এবং কলতলা সংলগ্ন বারান্দায় একটা মেয়েদের বাথরুম এবং দুটো চিন্তাঘর এবং কলতলায় পাশে ছেলেদের দুটো স্নান ঘর যদিও ছেলেরা সবাই কলতলায় টিউবওয়েল পাম্প করে জল তুলে স্নান করতো। কলতলা এবং  রান্নাঘরের মাঝে বিরাট বাঁধানো উঠোন এবং বেশ খানিকটা ফাঁকা জায়গা যেখানে পেয়ারা গাছ, আমগাছ এবং নানারকম ফুলগাছ ও তুলসীতলা। রান্নাঘরের সংলগ্ন খানিকটা জায়গায় মাটি যেখানে লেবু গাছ, শিউলি গাছ এবং একটা পীচফলের গাছ ছিল। আর ছিল একটা স্থলপদ্ম গাছ যেটা দূর্গা পূজোর সময় ফুলে ফুলে ভরে থাকতো। এরপর ছিল গোয়ালঘর এবং দুটো পেয়ারা গাছ ও একটা আম গাছ। বাড়ির পিছন দিকে ছিল পাঁচটা ঘর  এবং তারপরেই ছিল বাগান। বাগানের পূর্ব দিকে ছিল একটা কুল গাছ, একটা খেজুর গাছ ও একটা খুব বড় ডুমুর গাছ। আউটহাউসের বাসিন্দাদের জন্য ছিল একটা বাথরুম ও চিন্তাঘর এবং আরও একটা টিউবওয়েল।
বাড়ির একটা বিশেষত্ব ছিল এই যে ছোটঘরের সংলগ্ন খিড়কির দরজা খুললে এবং সমস্ত ঘরের দরজাগুলো খুলে দিলে পূর্ব দিকে ওঠা সূর্যের আলো পশ্চিম প্রান্তে বাইরের ঘরে যাবার রাস্তায় পৌঁছে যেত। সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে ঐ সুন্দর বাড়িও ধীরে ধীরে অন্য হাতে চলে গেল কিন্তু রেখে গেল একরাশ স্মৃতি যা মনে পড়লেই ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে ওঠে।

No comments:

Post a Comment