কিন্তু বাজার বলতে সাধারণত যা বোঝায় মানে তরিতরকারি বা মাছের বাজার সেখানে প্রমিলা সমাজের এত দাপট নেই। একটা যুৎসই কারণ হলো যে স্নো পাউডার মেখে বা সাজগোজের ঘটা করে গেলে দশটাকার জিনিসটা কুড়ি টাকা বলে পাঁচ টাকা কমিয়ে পনের টাকায় জিনিসটা কিনলে আখেরে লোকসান বই লাভ কিছুই হয়না। তাছাড়া, রোদের মধ্যে ঘুরে ঘুরে গলদঘর্ম হয়ে ঢেঁড়সের ল্যাজ মুড়িয়ে দেখে নেওয়া যে তিনি শিশু না শিশুর কাকা, জ্যাঠা বা দাদামশাই কিনা ,এটা এত সহজ কাজ নয়। দৈবাৎ, দুর্ঘটনাবশত দুচারটে এরকম চলে এলে বা বেগুনে একটাদুটো ফুটো বেরোলে বাবা, দাদুদের যে মুণ্ডুপাত হতো তা তো আর করা যাবেনা, সুতরাং ওই জায়গাটা পুরুষদের ই থাক, গজর গজর করলে হার্টটা অন্তত ভাল থাকবে। সেই কারণে সফ্ট স্কিল যেখানে দরকার সেখানে মহিলারা যাবেন এবং দোকানে গিয়ে পুরুষ সেলসম্যানদের প্রাণ ওষ্ঠাগত করে ছাড়বেন। হাজার এক টা জিনিস নামিয়ে তারপর নাক সিঁটকে অন্য দোকানে পাড়ি জমাবেন। এঁদের ঠেকাতে যেমন বুনো ওল তেমন বাঘা তেঁতুল করার জন্য দোকানদাররাও তেমন সেয়ানা হয়ে গেছেন এবং তাঁরাও বেছে বেছে অত্যন্ত মুখরা মেয়েদের বিক্রেতা হিসেবে রেখেছেন। তারা ঐরকম মহিলা দেখলেই বুঝতে পারে যে এরা কিনতে আসেনি, বাড়ির ইলেকট্রিক বিল বাঁচিয়ে শপিং মলের ঠাণ্ডা উপভোগ করতে এসেছে। পান চিবোতে চিবোতে জিজ্ঞেস করে ম্যাডাম, আপনার বাজেটটা একটু বলুন তো। তারপর পাঁচ সাতটা দেখিয়েই বলে, সরি ম্যাডাম আপনার ওই বাজেটে আমাদের স্টকের মিল হচ্ছে না। এবার বোঝ ঠ্যালা। যে স্বামীর কপাল খারাপ তাকে তার স্ত্রীর পিছন পিছন চলতে হয় এবং একটু দেঁতো হাসি হেসে দোকান থেকে বিদায় নিতে হয়। এ এক রীতিমতো হিউমিলিয়েশন , একবার এ দোকানে আর একবার ওই দোকানে। বোনাস পেলে বা কিছু বাড়তি ইনসেনটিভ পেলে স্বামীর তখন তোয়াজ হয় এবং তখনই বুঝতে হবে যে পাঁঠাকে বলি দেবার জন্য স্নান করানো হচ্ছে। এইসব হক কথা লেখার ফল যে কি বিষময় তার ভাবলেই বুকটা কেঁপে কেঁপে উঠছে। যাওয়া যাক অন্য বাজারে যেখানে সামান্য একটু খারাপ জিনিস হলেও দুচারটে অভিধান থেকে খুঁজে বের করা শব্দ বিন্যাস কানে ঢুকবে। ঠিক আছে, তখনকার জিনিস তখনই সামলানো যাবে।
এবার আসা যাক পুরুষের একচ্ছত্র সাম্রাজ্য সব্জি ও মাছের বাজারে। এখানে যে বাজারের কথা বলা হচ্ছে সেটা কিন্তু পাইকারি বাজার নয়, এটা হচ্ছে প্রতিদিনের খুচরো বাজার। প্রত্যেকটি লোকের ই কিছু পছন্দসই লোক আছে যার কাছে মালপত্র না নিলে মনে হয় বাজারটা ই ঠিকঠাক হলোনা। সোমনাথ, সুকুমার, কাশী, রহমানের কাছে বিশেষ বিশেষ জিনিস কিনতেই হবে। মাসির কাছে শাকের আঁটি ছাড়া বাজারটা তো সম্পূর্ণ ই হবেনা। অশোকের কাছে ফল, দিদির কাছে ফুল
( বিশেষ করে বৃহস্পতিবার পূজোর ফুলে একটা আমের শাখা, অন্তত দুচারটে জবা ও তুলসী পাতা থাকতেই হবে) এবং মাছের বাজারে সাধন বা উত্তমের কাছ থেকে নিতেই হবে কারণ ওরা মাছটা বেশ পরিস্কার করে কেটে দেয়। কোন কারণবশত ওরা না থাকলে অন্য কারো কাছে নিতে হয় কিন্তু মনটা একটু খুঁতখুঁত করে। তারপরে ছোট মাছ হলে ভোম্বল বা নারায়ণ বাবু যেরকম পরিষ্কার করে ছাড়িয়ে দেয় বাড়িতে আর বিশেষ কিছু করার থাকে না। পাঁঠার মাংস ফুল মহম্মদ এবং চিকেন টা মতির কাছেই কিনতে হবে। এদের ছাড়া বাজার করাটাই যেন অতৃপ্তির। অনেক সময়ই মুম্বাই যেতে হয় ছেলের কাছে এবং সেখানে রোহিত বা ফৈয়জ বা মাছ ওয়ালি ইন্দু ছাড়া অন্য কারো কাছে যাওয়া নয়। ওরা যে কিছু কম দাম নিচ্ছে এমন নয় কিন্তু একটা দারুণ সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে এই কেনাবেচার মাধ্যমে। কব আয়া আঙ্কেল শুনলেই মনটা কেমন যেন খুশিতে ভরে ওঠে আসলে আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে যে " আমিটা" লুকিয়ে আছে সেটা পরিতৃপ্ত হয় এবং যে দামটাই তারা বলুক না কেন সেই ভেতরের আমিটা তাতেই সায় দেয়। মাঝে মাঝেই কোন পানু বা সৈয়দ কে আর দেখতে পাওয়া যায়না এবং তাদের বসার জায়গায় অন্য লোক বসলেও ফিরে তাকাতেও ইচ্ছে করেনা, কেবলই মনে হয় অলি বারবার ফিরে আসে অলি বারবার ফিরে যায়। এই বাজারেই গরীব, মধ্যবিত্ত বা বড়লোক আসে এবং নিজের নিজের সাধ্যানুযায়ী তাদের পছন্দের সোমনাথ, সুকুমার বা কাশীর কাছে জিনিস কেনে এবং এই মহা মিলনস্থলে সকলের সমাগম হয়। গ্রামে গঞ্জে যেমন দূরে দূরে গ্রাম দশবারোখানি মাঝে একখানি হাট, সন্ধ্যায় সেরা জ্বলে না প্রদীপ প্রভাতে পড়েনা ঝাঁট শহরের বাজার কিন্তু দিনে রাতে সবসময়ই জমজমাট আর আমরা সবাই এই মহামিলন স্থলের প্রতিনিয়ত যাত্রী।
No comments:
Post a Comment