Monday, 22 June 2026

"আঁধারমানিক"

কোন কিছু লিখতে গেলেই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা মনে পড়ে যায় এবং তাঁকে নৈবেদ্য উৎসর্গ না করে কোন লেখাই যেন সম্পূর্ণতা পায়না। হঠাৎই তাঁর স্ফুলিঙ্গের একটি ছোট্ট কবিতা মনে পড়ে গেল আর বিড়বিড় করে বলে উঠলাম 
"বহুদিন ধরে বহু ক্রোশ দূরে 
বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে 
দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা,
দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু।
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া 
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া 
একটি ধানের শিষের উপর 
একটি শিশিরবিন্দু।"
সত্যিই তাঁর কি ব্যাপ্তি, কি গভীরতা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের চিন্তার ও অগম্য। আমাদের চিন্তা, বোধ বুদ্ধি কেমন যেন তাঁকে ঘিরেই আবর্তিত হয় বারবার যেমন সূর্যের চারপাশে সমস্ত গ্রহগুলো আবহমানকাল থেকে আবর্তিত হয়ে চলেছে।

আমাদের মধ্যে অনেকেই লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে বিদেশে যাই কিন্তু কাছে পিঠে কত সৌন্দর্য্য যে লুকিয়ে আছে যা আমাদের অজানা। এইরকম ই কলকাতা থেকে খুব একটা দূরে নয় প্রায় ১৫০কিলোমিটার দূরে
বর্ধমান জেলার গুসকরা থেকে দশ কিলোমিটার ভিতরে ছোট্ট একটা গ্রাম নূরপুরে থাকা কুটুমবাড়ি রিসর্ট বা গেস্ট হাউস। কুটুমবাড়ি শুনলেই যেন পাওয়া যায় একটা বৈবাহিক সম্বন্ধের গন্ধ, একটা বেশ ঘন মাখোমাখো সম্পর্কের সুবাস। আমাদের অর্জুন সব বিষয়েই যেন সিরিয়াস। কোন কিছু করার আগে তার সম্পর্কে চারিদিক থেকে নানান তথ্য সংগ্রহ করে সকলের সামনে যখন উপস্থাপন করে তখন আর কারও কিছুই জিজ্ঞাস্য থাকেনা। অবশ্য এটা একদিনেই সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতা আসেনা, আসে দীর্ঘ পথ পরিক্রমার পর। কেউ কেউ অতি অল্প সময়েই নিজের প্রতিষ্ঠা পায় আবার কারো হাজার চেষ্টাতেও তা অধরাই থেকে যায়। 
জামাইষষ্ঠী পেরিয়ে গেল সবেমাত্র গতকাল আর তার অব্যবহিত পরেই কুটুমবাড়ি যাওয়া সেই পুরনো দিনের সকাল সকাল জামাইবাবাজীবনের বৌ,ছেলেমেয়েকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার কথা মনে পড়িয়ে দিল। অর্জুন, নকুল,সহদেব ও ধৃষ্টদ্যুম্ন বেরিয়ে পড়েছে তাদের সহধর্মিণীদের নিয়ে( সবার ছেলেমেয়েরাই প্রতিষ্ঠিত এবং বাইরে থাকে)  কমন কুটুমবাড়ির উদ্দেশ্যে  একটা বাস ভাড়া করে। মাঝে ব্রেকফাস্ট সেরে পৌঁছাতে প্রায় বারোটা বেজে গেল। বাঁদিকে লম্বা লম্বা শালগাছগুলো পরস্পরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছে কে আগে ভাগে সূর্যের আলোটা নিতে পারে, পাশে অর্জুন গাছ, ইউক্যালিপটাস ও সোনাঝুড়িও বলছে তোমরা যদি ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনা হও, আমরাও পর্তুগাল বা সেনেগাল হতে পারি। যাওয়া মাত্রই নিজেদের জমিতে লাগানো ড্রাগন ফ্রুট জুস ওয়েলকাম ড্রিঙ্কস হিসেবে পেলাম এবং কর্ণধার হিসেবে যাকে দেখলাম তাতে আমাদের চোখ ছানাবড়া। একটি অল্পবয়সী সপ্রতিভ মেয়ে ইকনমিক্সে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন করে এই হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টকে প্রফেশন হিসেবে বেছে নিয়েছে। সবার আধার কার্ড রেজিস্ট্রেশন হয়ে যাওয়ার পরে স্থানীয় কয়েকটি ছেলে যারা ওই রিসর্ট বা কুটুমবাড়িতে কাজ করে ঘরে ঘরে সুটকেস ও ব্যাগ দিয়ে দিল। শালবনের উল্টো দিকে একটি গেস্ট হাউস যেখানে  এক ই ছাদের তলায় তিনটে ঘর এবং আরও একটি ঘর তার ডানদিক থেকে লক্ষ্য রাখা ম্যানেজমেন্ট হাউসে যেখানে বড় চওড়া বারান্দায় ডাইনিং হল , রান্নাঘর এবং মেয়েটির থাকার ঘর।  ম্যানেজমেন্ট হাউসের পাশে একটি ছোট অথচ সুন্দর মন্দির যা রিসর্টে ঢুকতে গেলেই চোখে পড়বে। ধৃষ্টদ্যুম্নের স্থান হলো মন্দির সংলগ্ন ম্যানেজমেন্ট হাউসে এবং অর্জুন, নকুল ও সহদেব থাকল অপর গেস্ট হাউসে। একটু পরিচয় বিনিময়ের পরেই হাতমুখ ধুয়ে চলে আসা হলো সেই ম্যানেজমেন্ট হাউসের বড় বারান্দায় বা ডাইনিং হলে। মেনু কি আছে জিজ্ঞেস করায় মেয়েটি মুচকি হেসে বললো একটু সারপ্রাইজ আছে স্যার। কোন কথা না বাড়িয়ে সারপ্রাইজের অপেক্ষা করতে লাগলাম। সরু চালের ভাতে যখন বাড়িতে তৈরি গাওয়া ঘি পড়ল সমস্ত জায়গাটা ম ম করে উঠলো ঘিয়ের সুগন্ধে। স্যালাডে নিজেদের জমির লঙ্কা এবং লেবু, নিজেদের জমির টাটকা বেগুন ভাজা, পাবতা মাছের ঝাল ও চরে খাওয়া খাসির মাংসের অপূর্ব স্বাদের পাতলা ঝোল। পাণ্ডবদের যথেষ্ট বয়স হয়েছে, সুতরাং হাজার অনুরোধ ও তাদের টলাতে পারল না আরও একটু মাংস নিতে। দারুণ পেঁপের চাটনি এবং পাঁপড় ভাজা ও ঘরে পাতা খুবই সুস্বাদু দই এবং খাঁটি ছানার রসগোল্লা। সেখানে ও অনুরোধ এবং তাতেও টলানো গেলনা তাদের। এরপর জম্পেশ আড্ডা এবং প্রকৃতির রূপ উপভোগ করা। রোদ পড়ে আসছে, গাছের পাতাগুলো তাদের রঙ বদলাচ্ছে তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আর তিনটি সারমেয় কালু, ঘুন্টুও ভুলুর পায়ে পায়ে সারাক্ষণ লেপটে থাকা । যারা কুকুর প্রেমী অথচ শহর কলকাতায় সেটা ব্যবহারে ফুটে উঠলে চারিদিকে হৈহৈরৈরৈ পড়ে যাবে, তাঁরা প্রাণভরে তাঁদের ভালবাসা বিনিময় করে নিলেন। একটু পরেই সেই অল্পবয়সী কর্ণধার  নিয়ে গেলেন তাঁর বাগান ও পুকুর দেখাতে। ছোট ছোট পেঁপে গাছে বিরাট বড় পেঁপে ঝুলছে, ছোট আমগাছে আমের গুচ্ছ, লেবু, মুসম্বি, কলা, সারি সারি কাঁঠাল গাছ, দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। পুকুর পাড়ে পৌঁছে আন্দাজ করা গেলনা কত মাছ আছে তবে মালকিন জানালেন যে  সেখানে থাকা রুই ও কাতলা প্রায় তিন কেজির এবং অনেক কৈ মাছ আছে সেখানে। পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সেই কালু, ঘুন্টুও ভুলু। বারান্দায় থাকা বেতের সোফায় বসে আড্ডা চলার ফাঁকে অরণ্যে সন্ধ্যা নেমে আসা উপভোগ করা। প্রকৃতি যে কিভাবে রঙ বদলায় তার বর্ণনা স্বয়ং কবিগুরু হয়তো পারতেন এবং তাঁর কলম থেকে নিঃসৃত হতো  সেই অসাধারণ রূপ। ধীরে ধীরে আলো জ্বলে উঠলো এবং শুরু হলো ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। হঠাৎই গেল আলোটা নিভে এবং জোনাকির আনাগোনা শুরু হলো। ওহ্, সেকি দারুণ রূপ। শহর কলকাতায় তো ঝিঁঝিঁর ডাক বা জোনাকির নিরুত্তাপ আলো দেখা তো বিরল ঘটনা। সন্ধে নামার আগে নানান রঙের প্রজাপতির নেচে নেচে বেড়ানো দেখাও  এক দুর্লভ ব্যাপার। অল্পক্ষণের মধ্যেই আলো এল কিন্তু সবগুলো জ্বলছে না মানে ইনভার্টার চালু হয়েছে। এর কিছুক্ষণ পরেই আবার কুটুমবাড়ি আলোয় ঝলমলিয়ে উঠলো, বোঝা গেল সরকারি আলো এসে গেল। রাতে খাবার টেবিলে বসে একটু গান গাওয়া হলো এবং অল্পবয়সী কর্ণধার ও তার সুরেলা গলায় ঝঙ্কার তুললেন । ইতিমধ্যে নকুলজায়া কারেনুমতিও তাঁর সুরেলা গলায় কয়েকটি রবীন্দ্র সঙ্গীত, নজরুল গীতি ও অতুলপ্রসাদের গান পরিবেশন করলেন এবং বোঝা গেল গত নয়মাস সুদূর আমেরিকায় তাঁর যথেষ্ট চর্চা হয়েছে।

অন্ধকারের এক বিশেষ রূপ আছে। আলো নিভিয়ে বসে আড্ডা চলছে এবং মাঝে মাঝেই বিদ্যুতের ঝিলিক এসে দেখিয়ে দিচ্ছে রাস্তাটা। মাঝে মাঝেই হুক্কা হুয়া শব্দে শেয়ালের ডাক শোনা যাচ্ছে আর দলপতি কালু তার দলবল নিয়ে ঐদিকে তেড়ে তেড়ে যাচ্ছে আর ঐ ডাকছাড়ার মালিকরা দিচ্ছে চম্পট। মাঝে মাঝেই পেঁচার ডাক জমাট বাঁধা অন্ধকারের নিস্তব্ধতাকে বাঙ্ময় করে তুলছে। রাত প্রায় সাড়ে বারোটা হলো, এবার একটু বিছানায় গা এলানো দরকার। 
সকাল সাতটায় চা এসে গেছে। ধৃষ্টদ্যুম্ন শরীরটাকে নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করছে। এবার স্নান করে জলখাবার খেয়েই বেরিয়ে পড়ার আয়োজন। তরুণী কর্ণধার দেবস্মিতার একটি বিশেষ গুণ লক্ষ্য করা গেল যে তিনি নিজেই পাখা নিয়ে হাওয়া করছেন যদিও ফ্যান যথেষ্ট জোরেই চলছে। অতিথি অভ্যাগতদের এইরকম যত্ন আত্তি করা আজকাল এক বিরল ঘটনা। সামনে রয়েছে তার বিরাট ভবিষ্যত। তাঁর সহযোগী অক্ষয়, মঙ্গল ও ধর্মের ব্যবহার ও রীতিমতো উল্লেখ করার মতো। আসলে যথা রাজা তথা প্রজা কথাটার সত্যতা এদের ব্যবহারে নজর পড়লো। বাসে মালপত্র ওঠাতে ওঠাতেই গেটের মধ্যে ঢুকল দুটো গাড়ি এবং নেমে এলেন আমাদের ই মতো আটজন ভদ্রলোক। বুঝলাম কুটুমবাড়ির খ্যাতি বেশ ভালই ছড়িয়েছে। প্রার্থনা করলাম সর্বশক্তিমান ভগবানের কাছে এই মেয়েটি যেন তার এই আন্তরিক আতিথেয়তা বজায় রাখে এবং জীবনে আশাতীত সাফল্য লাভ করে।

No comments:

Post a Comment