Wednesday, 19 August 2026

"দাশু ঘরামির পাঁচালী"

গ্রামের উত্তর দিকে দাশু থাকে তার  বৌ,ছেলেমেয়ে নিয়ে । বহুদিন আগে বিশ্বযুদ্ধ লাগার সময় জমিদার বাবুরা বোমার ভয়ে কলকাতা ছেড়ে এসে এখানে গ্রামের পত্তন করেন। চাটিবাটি গুটিয়ে কলকাতার পাট ওঠানো যায় কিন্তু গ্রামে এসে থাকব বললেই তো আর হয়না, ধোপা, নাপিত, মুচি, বামুন, চাষাভুষো এদের ও সঙ্গে করে না আনতে পারলে ঠাটবাট বজায় থাকবে কি করে? আর বললেই তো তারা এসে পড়বে না, তাদের ও খানিকটা জমিজমা, পুকুরের ভাগ না দিলে তারাই বা আসবে কোন দুঃখে? অতএব, খানিকটা নিজেদের প্রয়োজনেই একটু দয়া দাক্ষিণ্য দেখাতেই হয়। এভাবেই এসেছিল দাশুর দাদু হরিশ, পুলু বামুনের দাদু নাড়ু চক্কোত্তি এবং নাপিত, মুচি ও ডোমদের দাদু ঠাকুর্দারা।  যুদ্ধ তো থামলো, মানুষের প্রয়োজন ও দিন দিন বাড়তে থাকলো। শুধু পেটে খেলেই তো হয়না, চাষার ছেলেমেয়েরাও আর চাষবাস করতে চায়না, মুচির ছেলেও আজকাল জুতো, চটি সারাই করে দিন গুজরান করতে চায় না। সবাই পড়াশোনা করে বিএ, এম এ পাশ করে চাকরি করতে চায়। আগে গ্রামে স্কুল ছিলনা, একটু পড়াশোনা করতে গেলেই চার মাইল দূরে  আলের পথ মাড়িয়ে রাজগঞ্জ স্কুলে যেতে  হতো। তখন আজকের মতো স্কুলে মিড ডে মিলের ব্যবস্থা না থাকায় কিছুদিন পরেই স্কুলের পাঠ চুকিয়ে বাপ দাদাদের কাজে হাত লাগাতে হতো। যারা একটু লেগে থাকতো কষ্ট শিষ্ট করে তারা মাস্টারমশাইদের নেক নজরে পড়ে যেত এবং পরবর্তী কালে তাদের অনেকেই শহরে থাকা জমিদার বাবুদের বাড়িতে বিনাপয়সায় থেকে খেয়ে কলেজের পাট চুকিয়ে মাস্টারি বা অন্যান্য সরকারি কাজে যোগ দিত। এরা কিন্তু জমিদার বাবুদের দান চিরদিন স্বীকার করতো এবং গ্রামে এলেই একবার অন্তত দেখা করে তাদের কৃতজ্ঞতা বোধ জানিয়ে যেত। ধীরে ধীরে মূল্যবোধের অবনমনের  সঙ্গে সঙ্গে কারো কারো মনে এটাও জাগতে থাকলো যে ওঁরা তো নিজেদের প্রয়োজনে আমাদের জন্য এই জমিজমা বা পুকুর দিয়েছেন, এমনি এমনি তো দেননি। কিন্তু এই কথাটা ভুললে চলবে না যে এই পৃথিবীতে কোন কিছুই বিনামূল্যে পাওয়া যায় না। দুর্ভিক্ষের সময় যখন মানুষ একটু ভাতের ফেন চাইতো বা ঘাস,পাতা খেয়ে পেট ভরাতো সেইসময় তাদের জমির ধান বা পুকুরের মাছ পাওয়া একটা বিরাট ব্যাপার ছিল। যুদ্ধোত্তর কালে ভূমি সংস্কার আইন পাস হলো এবং লাঙ্গল যার জমি তার
স( অপারেশন বর্গা) চালু হয়ে গ্রামের সম্প্রীতিকে একদম নষ্ট করে দিল। যে দৈত্য এতদিন বোতল বন্দী ছিল তাকে বোতলের বাইরে এনে এক ভীষণ অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো এবং জমিদার বা বড়লোকদের জোতদার ও শোষক বলে ছাপ মেরে দেওয়া হলো এবং যারা এতদিন শান্তিতে বসবাস করছিল তাদের মনের মধ্যে বিষ ঢেলে দিয়ে এই মধ্য মেধার লোকজন নিজেদের একটা কেউকেটা বলে মনে করতে লাগলো। এইসব লোকজন সবাই যে অসৎ ছিলেন তা নয় কিন্তু ক্ষমতার অলিন্দে একবার ঢুকলেই মাথাটা ভারী হয়ে যায়। অনেক জায়গায় এই জমিজমার মালিকরা প্রাণ হারান তাঁদের ই একসময় প্রতিপালিত প্রজাদের হাতে। আরও কিছুদিন পরে এই গজিয়ে ওঠা নেতারাও এই দৈত্যদের হাতের ক্রীড়নক হয়ে পড়েন এবং আজকের রাজনীতির মূলকথা জোর যার মূলুক তার। সুতরাং লাঠালাঠির যুগে যার লাঠি বেশি মজবুত, সেই টিকে থাকবে। নেতার মান কেমন হবে সেটা নির্ভর করে তার হাতে কত টাকা রয়েছে, কতজন লেঠেল, কতজন গুণ্ডা ও বোমাবাজি করার লোক আছে। রাজনীতির অঙ্গনে আজ এইসব ষণ্ডা গুণ্ডাদের জয়জয়কার। নীতিবোধ নিয়ে চলা রাজনৈতিক নেতারা আজ অচল এবং আঙুলে গুণে বলা যায় কজন আছেন এইরকম সব লোকজন।

দাশুর বাপ ঠাকুর্দাও এই ঘরামির কাজ করতো। কিন্তু শুধু ঘরামির কাজে তো পেট ভরে না, বাবুদের দেওয়া জমিতে চাষাবাদ করে নানারকম ফসল ফলিয়ে সংসার মোটামুটি ভাবে চলে যেত। দাশুর ছেলেমেয়েরা এখন বাবুদের দেওয়া জমিতে গড়ে ওঠা স্কুলে পড়াশোনা করে। পয়সাকড়ি লাগেনা আর সরকারের দেওয়া মিড ডে মিলে ছেলেমেয়েদের একটা বেলা খাবার জুটে যায়। এছাড়া রয়েছে সরকারি রেশন ব্যবস্থা, যাতে রেশনের চালগম খেয়েও খানিকটা বাজারে বিক্রি করে দুটো পয়সা আসে। দাশু এছাড়াও করে সাইকেল রিপেয়ারিং এবং খুচখাচ নানারকম কাজ। একটাই ইচ্ছা তার, যাতে তার ছেলেমেয়েকে আর তার মতো ঘরামির কাজ করে না খেতে হয়। পূজো এগিয়ে আসছে। পাড়ায় পাড়ায় প্যান্ডেল বানানোর কাজ শুরু হয়ে গেছে। নানা জায়গায় খুঁটি পূজো হয়ে‌গেছে এবং রামবাবু নানা জায়গায় কন্ট্রাক্ট ধরার চেষ্টা করছেন। খুবই ব্যস্ত এই দুই তিন মাস। দাশু একটা প্যান্ডেল বেঁধে আরেকটা পাড়ায় বাঁধতে চলে যায়, বাড়ি আসা তার হয়েই ওঠেনা। দাশুর বউ তার ছেলে মেয়েদের নিয়ে বাড়ি সামলায় আর প্রতীক্ষায় থাকে কবে রামবাবুর কাছ থেকে টাকা নিয়ে সে তাদের জন্য নতুন জামাকাপড় আনবে। রামবাবুও সবসময় পুরো টাকা একসাথে দিতে পারেন না কারণ তাঁকেও পূজো কমিটি থেকে সব টাকা পেতে হবে। যাই হোক, এইভাবেই এক পূজো গড়িয়ে আর এক পূজো এসে যায়। রামবাবুর ও বয়স হয়েছে। ব্যবসা দেখে মূলত তার ছেলে যার মাথাটা বড়ই গরম। মাঝে মধ্যেই তার থেকে বয়সে অনেক বড় দাশুকে দুচার কথা বিশ্রীভাবে শুনিয়ে দেয়। দাশু কোন কথা বলেনা, আড়ালে জামার হাতায় চোখ মোছে। এতদিনের ব্যবসা, রামবাবুর বাবার আমল থেকে সে রয়েছে। ছেড়েও যেতে পারেনা, কেমন যেন মনে হয় এই ব্যবসাটা হয়তো তার ই। কিন্তু রামবাবুর একটা বড় অসুখ থেকে ওঠার পরে আজকাল প্রায় আসেন ই না আর ছেলেটাও হয়েছে এক অপগণ্ডো। বাপের টাকায় মদ খেয়ে পয়সা উড়িয়ে ব্যবসাটা কে লাটে ওঠানোর জোগাড় করেছে। ধীরে ধীরে কন্ট্রাক্টের সংখ্যা কমছে আর সেখানে টান ধরা মানেই সবকিছুতেই টান ধরা। দাশু পুরনো খদ্দেরের কাছে যায় এবং শুনতে পায় যে রামবাবুর ছেলের ব্যবহারে তারা অত্যন্ত অসন্তুষ্ট এবং তারা কাজ দিয়ে দিচ্ছে অন্য কন্ট্রাক্টরকে। আজকাল তো পাড়ার ছেলেরা নিজেরা প্যান্ডেল বাঁধেনা, তারা এদিকে ওদিকে ঘুরে কাপ্তানি করে আর কার কাছে কিভাবে টাকা তোলা যায় তার ধান্দায় থাকে। এরা কোন না কোন দলের মন্ত্রী বা নেতাদের আশ্রয় পুষ্ট।তোলাবাজি এরাই করে নেতাদের কথায় এবং নেতাদের কাছে যখন সাধারণ লোক যায় তখন একটু মানিয়ে গুছিয়ে নেতারা তাঁর যা নেবার সেটাই বলে দেন এবং ওই চ্যালাদের হাত ঘুরে সেটা নেতাদের কাছে আসে এবং ভাগ বাটোয়ারা তারপর হয়। ওই নেতাদেরও দাশু ছোট থেকেই দেখেছে এবং ঘেন্নায় তাদের ধার মারাতেও সে লজ্জা বোধ করে। আর কিছুদিন যদি চালাতে পারে, ছেলেটা যদি একটু দাঁড়িয়ে যায়, দাশু ছেড়ে দেবে এই কাজ। কিন্তু করবেটাই বা কি? আর কোন কাজ সে ভালভাবে জানেও না। আর দিন দিন বয়স তো বাড়ছে, চাষবাস করতেও যে শরীরের জোর লাগে তা ও আজ কমে আসছে। সুতরাং, ঘুরে ফিরে সেই রামবাবুর ওখানেই যাওয়া এবং তাঁর ছেলের কাছে কারণে অকারণে গালমন্দ শোনা। একদিন হঠাৎ ই রামবাবু দোকানে এসে হাজির এবং তার ছেলেকে দাশুর প্রতি অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুনে ভীষণ বিরক্ত হলেন। ছেলেকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলেন। ছেলে জানালো যে দাশু কন্ট্রাক্ট ধরতে পারেনি এবং সেই কারণেই তার এত রাগ। পরে দাশুকে ডেকে জিজ্ঞেস করায় জানতে পারলেন যে ছেলের অসভ্যতার কারণে কন্ট্রাক্ট হাতছাড়া হয়েছে। কিছু বললেন না তারপর আস্তে করে দাশুকে বললেন যে বাড়িতে তার সঙ্গে দেখা করতে।
দাশু তাঁর কথামতো বাড়িতে এলো। খানিকক্ষণ কথাবার্তা বলার পর রামবাবু বললেন, " দাশু, এই প্যাকেট টা তুই রাখ আর তুই আসিস না এখানে। দাশু হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো আর বললো, বাবু, আপনার বাবার আমল থেকে আমি আসছি এই বাড়িতে, আমার এবাড়ি ছাড়া আর কোথাও জায়গা নেই।'' রামবাবু বললেন, " তুই চিন্তা করিস না, এই প্যাকেটে কিছু টাকা আছে যেটা  আমি তোর টাকা থেকে কেটেই রেখে দিয়েছিলাম। আজ এই টাকাটা তুই নিয়ে যা আর আমি তোকে অন্য একটা জায়গায় বলে দিচ্ছি, সেখানে তুই কাজ করবি এবং তারা আমার থেকেও অনেক ভাল লোক এবং সেখানে তুই আরামে থাকতে পারবি। তোর মতো বিশ্বাসী লোক পেলে ওরাও বর্তে যাবে।" 
বাবু, আমি আর কাজ করবো না, আপনাদের কাছেই কাজ করেছি আর এখানেই শেষ।
ঠিক আছে, এই টাকাটা খুব কম কিছু নয়, এতে তোদের ভালভাবে চলে যাবে এবং তোর ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ ও এতে হয়ে যাবে। এর পরেও কোন প্রয়োজন হলে আমার কাছে আসবি, আমি সাধ্যমত তোর পাশে থাকব।
হঠাৎ আকাশটা কেমন শূন্য হয়ে গেল। গতবছর অবধি কাজের চাপে দাশু পূজোর প্রায় শেষে আসতো সবার জামাকাপড় কিনে কিন্তু এইবছর পূজোতে সময় ই সময়। এবার বউকে নিয়ে ঠাকুর দেখতে বেরোবে।