Wednesday, 4 November 2026

"অথ সারমেয় কথা"

চারিদিকে এখন সারমেয়দের নিয়ে হৈচৈ পড়ে গেছে। এতটাই গণ্ডগোল যে ব্যাপারটা আদালতের দরজা পর্যন্ত গড়িয়েছে। দুই যুযুধান গোষ্ঠী, একদিকে সারমেয় প্রেমী আর অপরদিকে সারমেয় দের দুচক্ষে ঘেন্নাকরা লোকজন। দুই পক্ষেরই শাণিত যুক্তি। প্রেমীরা বলেন," অবলা জীব, ওরা যাবে কোথায়? ওদের ও তো এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অধিকার আছে।।" ওদের খেতে না দিলে ওরা তো এমনিতেই মারা যাবে। অপরপক্ষের যুক্তি যে এই রাস্তার কুকুরগুলো ক্ষিপ্ত হয়ে পথচারীদের কামড়ে দিচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই কুকুরের কামড়ে বেশ কিছু লোক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে। মামলা আদালত অবধি গড়ালো। আদালতের হয়েছে ছুঁচো গেলার মতো অবস্থা। শ্যাম রাখি না কুল রাখি করে একটা মাঝামাঝি জায়গায় পৌঁছাতে চেষ্টা করে বললো যে অবশ্যই সারমেয়কুলের বাঁচার অধিকার আছে এবং তাদের খাওয়ানো খুবই দরকার কিন্তু সেটা একটা নির্দিষ্ট জায়গায় খাওয়াতে হবে এবং সংরক্ষণ করতে হবে যাতে তারা যত্রতত্র ঘুরে পরিবেশ নোংরা না করে এবং কোন লোক যাতে তাদের কামড়ে মারা না যায়। সরকারকে কিছু জায়গা নির্দিষ্ট করতে হবে যেখানে তাদের দেখভাল করতে পশুপ্রেমী দের কোন অসুবিধা না হয়। এই নিদানটা আপাতদৃষ্টিতে যতটা সহজ বলে মনে হয় ততটা নয়। কতগুলো সারমেয় কোন কোন এলাকায় আছে এবং তাদের পুনর্বাসন কিভাবে কোথায় হবে সেটাও যথেষ্ট আলোচনা সাপেক্ষ। তারপর এ পাড়ার দলের সঙ্গে অন্য পাড়ার দলের সঙ্গে মিলমিশ হবে কি না তাতেও বিস্তর সন্দেহ রয়েছে। সুতরাং পশুপ্রেমী বিশেষ করে সারমেয় প্রেমীরা তাঁদের নিজেদের জায়গার কুকুরগুলোকে যথেষ্ট ভালবেসেই সেখানকার নির্দিষ্ট জায়গায় তাদের খাবার দেন। এলাকার বেশ কিছু লোক আছেন যাঁরা বাড়িতে ভাতের সঙ্গে আরও কিছু দিয়ে খাবার বানিয়ে প্লাস্টিকের থালায় খেতে দেন এবং তাদের খাওয়া শেষ হলে সেই প্লেটগুলো নিয়ে তাঁরা চলে যান এবং পরের দিনের প্রস্তুতি নেন। এতে যথেষ্ট পয়সা খরচ হয় এবং তাঁরা সেই টাকা খরচে ও পিছপা হন না কিন্তু সমালোচনার তীর ধেয়ে আসে তাঁদের দিকে যাঁরা এইরকম সারমেয়কুলের সেবা বরদাস্ত করতে একদমই রাজি নন। সারমেয়কুলের জন্য রাখা জলের মাটির পাত্র মাঝেমাঝেই কোন না কোন কারণে উল্টে যায় এবং এই সারমেয়কুল তাদের তৃষ্ণা মিটাতে অসমর্থ হয়। 
তৃষ্ণা সকলের ই পায়, কারো বেশি, কারো কম। কিন্তু এদের তৃষ্ণা না মিটলে স্বাভাবিক ভাবেই এরা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠবে এবং কোন অজানিত কারণেই তারা পথচারীদের আক্রমণ করে এবং অনেক ক্ষেত্রেই তা মৃত্যুর পথে ঠেলে দেয়। 
চারিদিকে বড় বড় হাউসিং কমপ্লেক্স গড়ে উঠেছে যার মধ্যে অনেকগুলোই প্রাচীর বিহীন এবং আশেপাশের লোকজন সেই কমপ্লেক্সের মধ্যে দিয়ে শর্টকাটে যাওয়া আসা করে এবং অনেক ক্ষেত্রেই কমপ্লেক্সের বিভিন্ন লোকদের সঙ্গে তাদের বন্ধুত্ব ও নানাবিধ আদানপ্রদান আছে। আবার কোন কোন হাউসিং কমপ্লেক্স পাঁচিল দিয়ে ঘেরা এবং সেখানে ঢোকা বা বেরানো যথেষ্ট নিয়ন্ত্রিত সিকিউরিটি গার্ড থাকার জন্য। সেখানে মেইনটেন্যান্স বাবদ অনেক টাকাই গুণতে হয়। অবশ্য সিকিউরিটি ছাড়াও নানাবিধ সুযোগ সুবিধা সেই কমপ্লেক্সের লোকজন ভোগ করেন। আসল কথা হলো ফেল কড়ি মাখো তেল। সুতরাং যত সুযোগ ভোগ করতে চাও সেইমতো টাকা দাও। আলোর পাশেই যেমন অন্ধকার থাকে এখানে ও তার ব্যতিক্রম নয়। ঘেরাটোপে থাকা লোকদের সেবা করার জন্য অবশ্যই কিছু প্রান্তিক মানুষের দরকার হয় যারা বাড়িতে ফাইফরমাশ খাটে বা রান্নাবান্না করে এবং তারা অবশ্যই আসে সেই ঘেরাটোপের বাইরে থাকা বস্তি থেকে। গোলাপ বাগে গোলাপ তুলতে গেলে কিছু কাঁটা হাতে ফুটতেই পারে। এরা আমাদের জীবনের অঙ্গ, এদের ছাড়া আমরা চলতে অসমর্থ। বস্তিবাসীদের সঙ্গে ঘেরাটোপের বাসিন্দাদের অনেক পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও এরা পরস্পরের পরিপূরক।
ঘেরাটোপ কমপ্লেক্সের মধ্যে সারমেয় বা মার্জারকুল সিকিউরিটির কড়া নজর এড়িয়ে ঢোকে কিনা জানা নেই কিন্তু খোলা হাট হাউসিং কমপ্লেক্সে তাদের খুব একটা না হলেও অবাধ বিচরণ আছে এবং তাদের এই উপস্থিতি এই উপনগরীবাসীর মধ্যে কিছু বিভেদ সঞ্চার করছে। একটু সহনশীলতা দুই পক্ষেরই দেখানো প্রয়োজন। এখন এই খোলামেলা উপনগরীতেও খোলা ড্রেন দেখা যায় না বা টিউবওয়েল গুলো কোথায় অন্তর্হিত হয়েছে। তা এই সারমেয়কুল বা মার্জারকুল তাদের তৃষ্ণা কি করে মেটাবে এটা যদি সবাই একটু সহৃদয়তার সঙ্গে বিবেচনা করেন তাহলে সমস্যার অর্ধেক সমাধান হয়ে যায়। মানুষ খিদের জ্বালায় বা তেষ্টায় পাগল হয়ে যায় তো এই অবলা জীবগুলো তার ব্যতিক্রম কি করে হবে?  যাঁরা কষ্ট করে নিজেদের পকেটের পয়সা খরচ করে এই পশুপাখিদের খাওয়াচ্ছেন তাঁদের প্রতি একটু সহমর্মিতা দেখিয়ে এই অবলা জীবগুলোকে একটু বাঁচতে দিন। আবার অপরপক্ষের যুক্তি কেও ফেলে দেওয়ার নয়। রাস্তার কুকুরের কামড়ে মৃত্যুও অনাঙ্কাখিত। আর সবচেয়ে  বড় কথা মানুষের জীবনের চেয়ে  তো কুকুরের জীবন বেশি মূল্যবান হতে পারেনা। সুতরাং , তাদের  যেভাবেই হোক না কেন বর্জন কর ।
 কিছুক্ষণ আগেই আকাশ ভাঙা বৃষ্টি থেকে বাঁচতে  বয়সের ভারে ন্যুব্জ এক বৃদ্ধ কুকুর যে দৌড়বার ক্ষমতাটা ও হারিয়ে ফেলেছে সে অসহায় দৃষ্টিতে একবার আকাশের দিকে আর একবার ইতিউতি কোথাও ঠাঁই পাওয়া যায় কিনা তা দেখছে কিন্তু সমস্ত গেট বন্ধ আর তার নিজেরও শরীরটাও নীচু করে যে গাড়ির তলে আশ্রয় নেবে তাতেও সে অসমর্থ। এই দৃশ্য দেখেও কি কেউ চুপ করে থাকতে পারে বা কোন গেটের ফাঁক দিয়ে যদি সে ঢুকে পড়ে একটু শরীরটাকে বৃষ্টি থেকে বাঁচাতে, তাহলে কি তাকে হ্যাট হ্যাট করে তাড়িয়ে দেওয়া যায়? এদের নাই তো কোন ডানা ,কেমন করে উড়বে সেতো মেলে যে তার পাখনা? অতএব, তার ভেজা ছাড়া যে উপায় নেই।
একটু ভাবতে সবাইকে অনুরোধ জানাই।