Thursday, 22 October 2026

"রাজার গামছা"

বহুবছর ধরে সুদূর ইংরেজদের দেশে পাকাপাকি ভাবে বসবাসকারী রায়বাহাদুর সুধীন্দ্র নারায়ণ সিংহ মশায়ের হঠাৎ করেই মনে হলো এবার দুর্গাপূজোর সময় বাংলার নিজের গ্রামের পূজোয় গেলে মন্দ হয়না। ভিটেমাটি ছেড়ে একবার চলে গেলে সেই দালান বাড়ি, ঠাকুরবাড়ি, খামার বাড়ি, পুকুর, জমিজমা সবই বেদখল হয়ে যায়। সেই কবে তাঁর বাবা ডাক্তারি পড়তে পাঠিয়েছিলেন তার পর প্রথম প্রথম দুচার বার এসেছিলেন নাড়ীর টানে। তারপর বাবা এবং মা গত হবার পর ফিরে আসার সেই টানটা ক্রমশই শুকিয়ে আসতে শুরু করলো। কিন্তু একেবারে কি ভোলা যায় শৈশবের সেই পুরনো দিনের কথাগুলো? ব্যস্ততার মাঝেও সেই বিলের মধ্যে ভেলায় চড়ে বেড়ানো বা আমগাছে উঠে আম পাড়া( যদিও লোকজন ই ঐসব কাজ গুলো করতো) বা  বটের ঝুড়ি ধরে হিতু মুনিষের ছেলের সঙ্গে দোল খাওয়া মাঝে মাঝেই মনে পড়ে যায় আর নিজের মনেই হেসে ওঠেন। শৈশব এমন ই একটা সময় যখন মনে হয় কবে বড় হব আমরা, কেউ বকবে না কিন্তু যেই না বড় হলাম তখন ই এসে গেল একের পর এক দায়িত্ব আর জীবনের জটিলতা গ্রাস করে নিল সেই অনাবিল আনন্দের দিনগুলো।
হাসপাতাল থেকে অবসর নিয়েছেন সুধীন্দ্র নারায়ণ, এবার আর অন্য কোন দেশ নয়, ফিরবেন সেই শৈশবের গ্রামের বাড়িতে, দেখবেন সেই হিতু মুনিষের ছেলে বা জটেশ্বর জেলের ছেলে যাদের সঙ্গে একসময় বাড়ির কড়া শাসন উপেক্ষা করে তিনি নির্মল আনন্দ উপভোগ করতেন। চিরকালই ধনী এবং দরিদ্রের মধ্যে পার্থক্য আছে এবং দরিদ্র হলেই তারা ভাল হয়না বা তাদের সঙ্গে মেলামেশা করলে ছেলেরা গোল্লায় চলে যায় এই মতবাদটা বড়লোকদের মধ্যে ভীষণ ভাবে সংক্রমিত। সেই কারণেই তারা সবসময়ই ভয়ে ভয়ে থাকে যে এই বুঝি তাদের বাড়ির ছেলেরা ওই গরীবগুর্বোদের সঙ্গে মিশে বখে যাবে। কিন্তু ধারণাটা যে কত ভুল তা বারে বারে প্রমাণিত হয়েছে এবং পাঁকে পদ্মফুল ফোটার মতো ওই গরীব ঘরের ছেলেরাই বড় হয়ে দেশের ও দশের মুখ উজ্জ্বল করেছে আর তথাকথিত বড় বাড়ির ছেলেমেয়েরা বেলেল্লাপনায় শীর্ষ স্থান লাভ করেছে।
ভাগ্যিস সুধীন্দ্র নারায়ণের বিয়ে তাঁর বাবামায়ের উপস্থিতিতেই হয়েছিল এবং তাঁদের ই পাল্টি ঘরের সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ের সঙ্গে হয়েছিল নাহলে সুধীন্দ্র নারায়ণ হয়তো আর ফিরেও তাকাতেন না তাঁর গ্রামের দিকে।

মানুষ যখন অর্থনৈতিক ভাবে বলীয়ান হয়ে যায় বা খ্যাতির শিখরে উঠে যায় তখন তার চারপাশে আলোর একটা বলয় তৈরী হয় এবং সেই বলয় ই তাদের আরো উজ্জ্বল করে তোলে। পাঁচ করলেও প্রচারে পঞ্চাশ হতে সময় লাগেনা। এমতাবস্থায় দেশে রায়বাহাদুর সুধীন্দ্র নারায়ণ গ্রামের বাড়িতে আসছেন পূজোর সময় এই নিয়ে হৈচৈ পড়ে গেছে গ্রামে। কিন্তু সুধীন্দ্র নারায়ণের একদমই পছন্দ নয় এ সামনের লেজ রায়বাহাদুর শব্দটি। তিনি ডাক্তারবাবু নামেই পরিচিত হতে ভালবাসেন এবং পূজোয় এসে তাঁর ফেলে যাওয়া গ্রামবাসী কেমন আছে তার সম্যক ধারণা পেতে চান এবং তাঁর পক্ষে যতটা করা সম্ভব ততটাই তিনি করতে চান এবং এই প্রচার বিমুখ মানুষ আজকের জগতে বিরল। বেশিরভাগ মানুষই নিজেকে আলোকিত দেখতে চান এবং নিকষ কালো অন্ধকারে সামান্য প্রদীপের আলোই যেমন সদর্পে তার উপস্থিতি ঘোষণা করে ঠিক সেই ভাবেই নিজেকে উপস্থাপিত করতে চান। কিন্তু সুধীন্দ্র নারায়ণ একজন শুধু ভাল ডাক্তার ই নন তিনি একজন বিরাট মাপের মানুষ। তিনি নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার আশেপাশের ব্যক্তিকেও আলোয় প্রতিভাত করতে চান। একটা রেলের ইঞ্জিন যদি শুধু নিজে চলে বা অল্পসংখ্যক কামরা নিয়ে চলে সে যতটা স্পীডে চলতে পারে তা অতটা স্পীড কিছুতেই নিতে পারবে না যদি তার সঙ্গে অনেক কামরা জুড়ে দেওয়া হয়। সুধীন্দ্র নারায়ণ কিন্তু এই দ্বিতীয় পর্যায়ের মানুষ। তিনি চান অনেক লোকের উপকার।

 গ্রামে তাঁর বাড়ি একটা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। সুতরাং সেই বাড়িতে বসবাস করা মানে সাপখোপের পাল্লায় পড়া। সুতরাং, নিকটবর্তী শহরের একটি হোটেলে থেকে গাড়িতে আসা যাওয়া করা এবং এই কয়েকটা দিনে শুধু তাঁর নিজের গ্রামটাই নয় আশেপাশের গ্রামের লোকজনকেও দেখে তাদের ওষুধ দেওয়া এবং নিজের সঙ্গে আনা নানারকম ওষুধ গ্রামবাসীদের দিয়ে লোকের উপকার করা। সুধীন্দ্র নারায়ণ অন্য মাপের মানুষ। গরীব গাড়া মানুষের সেবা করার ফাঁকেই মহাষ্টমীর দিন রাজওয়াড়ায় ঠাকুর দর্শন এবং অঞ্জলি নিবেদনের উদ্দেশ্যে একটু দূরে গাড়িতে যাওয়া। গাড়িতে আছে স্ত্রী মেয়ে, জামাই এবং নাতি নাতনি রা। রাজওয়াড়ায় এসে গাড়ি থামলো। বিশাল রাজবাড়ির বেশিরভাগই ধ্বংস স্তূপে পরিণত তবুও নাটমন্দির তার মধ্যেই কিছুটা মন্দের ভালো। সমস্ত রাজবাড়ির গঠন প্রায় একই রকম। চকমিলান বাড়ির মতো। মানে একদিকে তার নাটমন্দির আর তিনদিকে তার ঘর। মন্দিরের বিপরীতে থাকে জলসাঘর যেখানে রাজারা নৃত্যগীত উপভোগ করতে করতে মায়ের পূজো ও হোম দেখতেন এবং বাড়ির মেয়েরা ( রানীমা ও রাজকন্যারা ) পূজো দেখতেন নাটমন্দিরের দুইপাশের দালান বাড়ি থেকে। যিনি যত বড়মাপের রাজা , মাঝখানের ফাঁকা জায়গাটিও ততটাই প্রশস্ত এবং তার ই মানানসই দালান বাড়ি। সিংহ দরজায় গাড়ি এসে থামলো এবং গাড়ি থেকে সুধীন্দ্র নারায়ণ সপরিবারে নামলেন এবং নাতি নাতনিকে পুরনো দিনের কথা বেশ রসিয়ে রসিয়ে বলতে লাগলেন। মন্দিরের গায়ে একটু রঙের ছোঁয়া লাগিয়ে একটু ঝকমকে করার চেষ্টা হয়েছে কিন্তু পারিপার্শ্বিক অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। নাটমন্দিরের ঠিক উল্টো দিকে যেখানে নৃত্যগীতাদি পরিবেশিত হতো তার অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। পলেস্তারা খসে পড়া জানলা ও দরজাগুলো তার রং খুইয়ে শুধু কাঠের উপস্থিতি ঘোষণা করছে এবং জানলায়  ঝোলানো দড়িতে মেলা আছে পুরনো লুঙ্গি ও গামছা । রাজওয়াড়ায় এইরকম অবস্থা দেখবেন এটা সুধীন্দ্র নারায়ণ স্বপ্নেও ভাবেননি। এতক্ষণ নাটমন্দিরের গল্প শোনা নাতি ও নাতনিরাও একটু ধন্দে পড়ে গেছে। " দাদু, এগুলো কি রাজামশাইয়ের পোষাক?" একদম ক্লিন বোল্ড সুধীন্দ্র নারায়ণ। কোন উত্তর নেই তাঁর কাছে। রাজাদের সোনার মুকুট, হীরেজহরতের রাজপোশাক, কোমরে  তলোয়ার ও পায়ের বহু মূল্যবান নাগড়া জুতো কোথায় অন্তর্হিত, তার জায়গায় ঝুলছে পুরনো লুঙ্গি ও গামছা! কালক্ষেপ না করে সবাইকে নিয়ে গাড়িতে উঠে পড়লেন এবং খুবই বিষণ্ণ মনে ফিরে এলেন।