আজ নাতনি যেখানে পাশ্চাত্য গান শেখে সেই সংস্থার বার্ষিক অনুষ্ঠানে ছাত্র ছাত্রীদের দ্বারা অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রিত থাকায় অল্পবয়সী মেধাবী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরিচয় ঘটলো। এতটাই পরিচ্ছন্ন ব্যবস্থা এবং উঁচু মানের শিশুশিল্পীদের সান্নিধ্যে কি করে তিন ঘণ্টা সময় কেটে গেল টের পেলাম না। মাঝে দুবার ব্রেক দিলেও অনুষ্ঠান কে তিন ঘন্টা টেনে নিয়ে যাওয়া যে সে কম্মো নয়। এতেই বোঝা যায় খুদে শিল্পীদের মান কি ধরণের। যাই হোক অনুষ্ঠান শেষে একটু কফি খাওয়ার উদ্দেশ্যে বান্দ্রার দিকে রওনা দেওয়া হলো। কিন্তু যেখানেই যাওয়া হচ্ছে সেখানেই দেখা যাচ্ছে বিরাট লাইন। শনিবার সন্ধ্যায় যে কোন রেস্তোরাঁয় ঢোকাই কঠিন।অতএব বান্দ্রার গলিঘুঁজিতে একটা পুরনো আমলের বাড়িতে একটা রেস্তোরাঁর খোঁজ পাওয়া গেল, নাম যার ভ্যানিলা মিয়েল যার মানে হচ্ছে খুব মিষ্টি ভ্যানিলা। গলিতে ঢুকে মনে হচ্ছিল যেন গোয়ার কোন গলিতে এসে পড়েছি। আশে পাশে নামী দামী প্রোমোটারদের গগনচুম্বী বহুতল গড়ে উঠেছে অথচ তাদের এই ছোবল থেকে কি করে নিজেদের বাঁচিয়ে রেখে নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রেখেছে তা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। সামনে পিছনে গলিতে সব বাংলো প্যাটার্নের বাড়ি , এককথায় ভারী সুন্দর। আধুনিকতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সাবেকিয়ানা বজায় রাখা চাট্টিখানি কথা নয়। বাড়ির বাইরের গঠন এক ই রয়েছে কিন্তু ঐ ছোট্ট জায়গায় এত সুন্দর ব্যবস্থা, না দেখলে হয়তো বিশ্বাস করাই যেত না। যাই হোক, জায়গা পাওয়া গেল। আমরা হয়তো খানিকটা ভাগ্যবান কারণ আমরা বেরোনোর পরেই আস্তে আস্তে জমায়েত হতে লাগল। কফির সঙ্গে তাল মিলিয়ে কিছু খাবার খেয়ে রওনা দিলাম কার্টার রোডের দিকে।
সূর্য তখন অস্ত যাচ্ছে এবং তার জায়গা দখল করছে আকাশ জুড়ে স্নিগ্ধ করে পূর্ণিমাতে বিলীন হতে সুন্দরী সেই চাঁদ। আমাদের নামিয়ে দিয়ে গাড়ি পার্কিং করতে লাগল ড্রাইভার। সমুদ্রের জল অনেকটাই নেমে গেছে, কাদায় মাখা পাথরগুলো তাদের নগ্নতা ঢাকতে অপারগ। কথায় আছে উপরে খোঁচার পত্তন ভিতরে ছুঁচোর কেত্তন, একদম ঠিক মনে হলো। একটু দূরেই বিস্তীর্ণ জলরাশি যা দেখে বোঝার উপায় নেই যে তার ই নীচে এইরকম রুক্ষ পাথরের অবিন্যস্ত সমাগম । সামনে চলছে সমুদ্রের উপর রাস্তা তৈরি যা মেরিন ড্রাইভ থেকে বোরিভালি পর্যন্ত যাবে এবং সফরের সময়টাও অনেকটাই কমে যাবে। সময় তো বহু মূল্য।চোখটা ঘোরাতেই দেখা গেল নানান দৃশ্য। হাঁটছে নানা বয়সী ছেলেমেয়ে, বুড়ো, বুড়ি। এঁদের মধ্যে কেউ বা হুইলচেয়ারে, কেউ বা লাঠির ভরে আবার কেউ বা লাঠি নিয়েও অন্যের সহায়তায়। বসে আছে অনেক লোক নানাধরণের কুকুর নিয়ে ( বড়, মেজো, সেজো, ন, ফুল ইত্যাদি) , গলায় তাদের নানা ধরণের গলাবন্ধ ও বেল্ট। পাশেই তাদের পথে থাকা কুকুররাও, তাদের ও মনে হয় কেন তাদের গলায় ওইরকম সুদৃশ্য গলাবন্ধ ও বেল্ট নেই? একটু কেমন যেন দুঃখ দুঃখ ভাব তাদের। তারাও পেতে চায় একটু স্নেহ , চায় একটা যেমন তেমন গলাবন্ধ, করুক শাসন বাংলা বা ইংরেজিতে। কিন্তু সেগুড়ে বালি, এপাশে ওপাশে লেজ নেড়ে ও কোন লাভ হলোনা, বরং মিলল একটু আধটু টক মিষ্টি ঝাল তিরস্কার। কোন জায়গায় আমল না পেয়ে শুয়ে পড়ল তার নিজের জায়গায় স্ন্যাকস কাউন্টারের পাশে। সেখানেই তার স্বর্গ যেখানে লোকজন খাওয়ার পর একটু উচ্ছিষ্ট তাদের উদ্দেশ্যে ফেলে দেয়। স্ন্যাকস বারের মালিক ই তাদের অকথিত মালিক যদিও সে কখনোই তাদের গলায় বেল্ট পড়ায় না এবং তাদের অপার স্বাধীনতা কেড়ে নেয় না। মানুষ ও স্বাধীনতা ই চায়, নাই বা মিলল তাদের দুবেলা পেট ভরা খাবার। সোনার চেন দিয়ে বাঁধা থেকে রাজভোগ খাওয়ার চেয়ে আধপেটা বা খালি পেটে থেকে স্বাধীনতার স্বাদ অনেক ভাল । কুকুরটা তার পায়ের উপর মাথা রেখে শুয়ে শুয়ে দেখতে থাকল আমাকে ও অন্যান্য লোকদের, চোখদুটো থেকে যেন জল গড়িয়ে পড়ছে। ভাল করে লক্ষ্য করলাম যে জল নয় দুটো চোখের নীচেই এমন কালো দাগ যেন জল গড়াতে গড়াতে শুকিয়ে গেছে এবং রেখে গেছে এক অমলিন ছাপ। দুঃখে যাদের জীবন গড়া, দুঃখে তাদের ভয়টা কিসের?
No comments:
Post a Comment