আজকের দিনে আমার কথা একজন ব্যাঙ্কের অধিকারীকে নিয়ে। ভদ্রলোকের নাম নেওয়া সমীচীন হবে কিনা ঠিক বুঝতে পারছিনা কিন্তু তিনি তাঁর সহকর্মীদের মধ্যে এতটাই পরিচিত যে কথাগুলো শুনতে শুনতে তাঁরা বলে উঠবেন যে আরে এ তো আমাদের অসিতবরণ রায়ের কথা বলছেন এবং মায়ের কাছে মামার বাড়ীর গল্পের কথা বলতে এসেছেন। হ্যাঁ খানিকটা হয়তো তাই তবে আমার চোখে যতটুকু ধরা পড়েছেন তিনি সেটুকুই বলবো এবং অনুরোধ জানাবো যদি আরও কিছু সংযোজন করা দরকার যেটা তাঁদের চোখে পড়েছে এবং আমার চোখ এড়িয়ে গেছে তাহলে সেটাকে অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করব এবং তাঁকে আরোও উজ্জ্বলতর হিসেবে তুলে ধরতে পারব।
ব্যাঙ্কের অধিকারী বললেই সাধারণ লোকের চোখে ভেসে ওঠে একজন গোমড়ামুখো ভারিক্কি চেহারার ভদ্রলোক কাচের চেম্বারের ভিতরে বসে আছেন এবং মাঝে মধ্যে টেলিফোনে কারো সঙ্গে কথা বলছেন কিংবা টেবিলে রাখা ল্যাপটপে গভীর মনোযোগের সঙ্গে কাজ করছেন এবং প্রয়োজনে কোন অধস্তন কর্মচারীর সঙ্গে ইন্টারকমে কথা বলছেন বা ডেকে পাঠাচ্ছেন কোন ব্যাপারে আলোচনার জন্য। কিন্তু কখনোই আমরা এটা ভেবে দেখিনা যে ভদ্রলোক কাচের ঘরে চুপ করে বসে আছেন তাঁর মাথায় যে কি ধরণের সুনামি চলছে, অবশ্য এটা ভাবাও সম্ভব নয়। আধুনিক যুগে পাশের টেবিলে রাখা একটা স্ক্রীনে ব্রাঞ্চের আনাচে কানাচে কি ঘটছে তা ওখানে বসে সবকিছু দেখতে পান শাখা অধীক্ষক। আগে তো এই সুব্যবস্থা ছিলনা , সুতরাং শাখা প্রবন্ধককে বিভিন্ন জায়গায় উঁকি মারতে হতো সবাই ঠিকঠাক কাজকর্ম করছে কিনা দেখার জন্য। প্রত্যেক মানুষের জীবনে কিছু না কিছু সমস্যা আসবেই এবং এটা খুব দরকার কারণ সমস্যা না থাকলে মানুষ মানসিক ভাবে মজবুত হয়ে ওঠেনা। অসিত বাবুর ক্ষেত্রেও তার কোন ব্যতিক্রম নয়। জীবন শুরু এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার ১৯৪৮ সালের ১৪ই মে মদনমোহন বাবু এবং বিভাদেবীর ঘরে তদানীন্তন অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার শ্রীমন্তপুর গ্রামে। গ্রামের অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শুরু শিক্ষা চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত । পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্রেণী সম্পন্ন হয় খাসবড়ের জুনিয়র হাইস্কুলে এবং সপ্তম থেকে একাদশ শ্রেণী ইরপালা কৃষ্ণমোহন ইনস্টিটিউশন হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল থেকে। প্রথম বিভাগে হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করার সুবাদে কলকাতার নামী কলেজ স্কটিশ চার্চ কলেজে রসায়ন বিভাগে অনার্স পড়া এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি বিভাগে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে স্বর্ণপদক প্রাপ্তি অসিত বাবুর মেধার পরিচয় বহন করে। ১৯৭১-৭২ সালে উত্তাল নকশালবাড়ির আন্দোলনে কলকাতায় তখন এক টালমাটাল অবস্থা এবং চাকরির বাজারেও ছিল মন্দা। কিন্তু সেই অবস্থাও অসিত বাবুকে দমাতে পারেনি এবং কলকাতায় থেকে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অবতীর্ণ হওয়ার জন্য প্রাইভেট টিউশনিকে নিজের পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন যাতে বাবামায়ের উপর কোনরকম চাপ না পরে। মেধার স্বীকৃতি মেলে যখন তিনি ইণ্ডিয়ান ফরেস্ট সার্ভিস এবং ভারতবর্ষের সেরা ব্যাঙ্ক স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ায় প্রবেশনারি অফিসার হিসেবে যোগ্যতা অর্জন করেন। একটু দোলাচলে পড়ে যান তিনি এবং স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ায় নিজেকে উৎসর্গ করেন। প্রবেশনারি অফিসার হিসেবে প্রথম পোস্টিং হয় কলকাতা থেকে সুদূর পশ্চিম প্রান্তে গুজরাটের রাজকোটে। তখন সরাসরিভাবে ট্রেনে যাওয়া যেতনা রাজকোটে। সম্পূর্ণ আলাদা সেখানকার জলবায়ু, খাদ্যাভ্যাস,ভাষা এবং সংস্কৃতি কিন্তু এইসব বাধা বিঘ্নকে অতিক্রম করতে হয়েছিল অসিত বাবুকে। বিভিন্ন বিভাগে কাজ শিখিয়ে একজন প্রকৃত সুদক্ষ অফিসার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে স্টেট ব্যাঙ্কের ট্রেনিং প্রোগ্রাম এককথায় অতুলনীয়। সেই কারণে অসিত বাবুকে গান্ধীধাম, ব্রোচ, আমেদাবাদ এবং বিশনগর ব্রাঞ্চে যেতে হয়। এরপরেই আসে এক যুগান্তকারী পোস্টিং। ভারতবর্ষের বৃহত্তম ব্যাঙ্কের বৃহত্তম বিদেশ বিভাগ তখন ছিল কলকাতায় এবং সেখানে পোস্টিং পাওয়া ছিল উজ্জ্বলতম ছেলেমেয়েদের জন্য। এখানেই তাঁর প্রতিভা ভাস্বর হয়ে ওঠে এবং পরবর্তী কালে তাঁর লেখা এক্সচেঞ্জ এরিথমেটিক বইটি বিভিন্ন ছাত্রছাত্রীদের দারুণ ভাবে সাহায্য করে।
এরপর তিনি আসেন গড়িয়া শাখায় এবং তারপরে বর্ধমানের আঞ্চলিক অফিসে। বিবিধ শাখায় কাজ করার অভিজ্ঞতা ভারতের সেরা ব্যাঙ্ক তাঁকে মোবাইল ইন্সপেকশন বিভাগে কাজে লাগান এবং লখনৌ, জয়পুর এবং পাটনা জোনাল অফিসে তাঁর অভিজ্ঞতা কাজে লাগায়।এরপর ফিরে আসা কলকাতার ইন্টারন্যাশনাল ব্যাঙ্কিং ডিভিশন কমার্শিয়াল ব্রাঞ্চে এবং সেখান থেকে হাওড়া জোনাল অফিস, গড়বেতা শাখা এবং তাঁর বিবিধ বিভাগে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে কলকাতাস্থিত স্ট্রেসড ৎঅ্যাসেটস ম্যানেজমেন্ট অফিসে নিয়োজিত করে এবং ধীরে ধীরে ২০০৮ সালের মে মাসে তিনি সসম্মানে রিটায়ার করেন। কিন্তু তাঁর অভিজ্ঞতা ব্যাঙ্ক রিটায়ারমেন্টের পরেও কাজে লাগায় এবং বিভিন্ন ট্রেনিং সেন্টারে কাজে লাগায়। তাঁর লেখা ভেস্টিজেস অব টাইম আরও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা এবং তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর লেখা স্ট্রেসড অ্যাসেটসের মধ্য দিয়ে।
দীর্ঘদিনের ব্যাঙ্কের কাজের অভিজ্ঞতা এবং সমগ্র ভারতবর্ষ জুড়ে বিভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গে যোগাযোগ কিন্তু তাঁকে শিকড় থেকে উৎপাটিত করতে পারেনি যা তাঁকে আরো উজ্জ্বল করে তুলেছে। ইরপালা কৃষ্ণমোহনো ইন্সটিটিউশনে মেধাবী ছাত্রদের জন্য কুড়িলাখ টাকার ট্রাস্ট তৈরী করা, ইরপালা রামকৃষ্ণ মিশনে এক লক্ষ টাকা দান এবং তাঁর গ্রামের অবৈতনিক প্রাথমিক স্কুলে ত্রিশ হাজার টাকা দান তাঁকে এক অন্য জগতে স্থান দিয়েছে। সাধারণ লোকের মনে একটা ধারণা রয়েছে যে ব্যাঙ্কের ম্যানেজারকে খুশি না করতে পারলে ব্যাঙ্ক থেকে লোন পাওয়া যায়না, এই ধারণাকে সর্বৈব ভাবে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার জন্য অসিত বাবুর এই দান যথেষ্ট। এই প্রসঙ্গে মাদার টেরিজার এক উদ্ধৃতি খুবই মূল্যবান। তিনি বলেছেন যে আমাদের ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত কিন্তু আমরা অনেক সাধারণ কাজ ও খুব ভালভাবে করে নিজেদের অনেক উন্নীত করতে পারি যা সমাজে এক অসাধারণ বিপ্লব আনতে পারে। অসিত বাবুর এই উদাহরণ অনেক লোককে উদ্বুদ্ধ করবে এই আশায় বুক বেঁধেছি।
No comments:
Post a Comment