গোছগাছ চলছে এবং অপ্রয়োজনীয় জিনিস ছাঁটকাট করে নিতে হচ্ছে কারণ নতুন বাড়ি বা ফ্ল্যাটটা অপেক্ষাকৃত ছোট এবং ভাড়াটাও একটু বেশিই। কিন্তু উপায় নেই এছাড়া কারণ বাড়ির সংখ্যা তখন এতটাই কম ছিল যে ভাড়াটেরা একবার ঢুকলে আর ছাড়তেই চাইতো না। টুকিটাকি গোছাতে গোছাতে কয়েকটা পোস্টকার্ড ও ইনল্যান্ড লেটারের গোছা চোখে পড়লো। রজতের একটা বদভ্যাস ছিল চিঠিগুলো পড়া হলেও ও কখনো ছিঁড়ত না। হোস্টেলে থাকাকালীন এই অভ্যেসটা যে শুরু করেছে যা এখনও ছাড়তে পারেনি। রবার ব্যাণ্ড দিয়ে পরপর চিঠিগুলো সে রেখে দিত। মফস্বলের ছেলে, কলেজ শেষে অবসর সময়ে বাবা, মা বা দাদুর চিঠিগুলো বারবার পড়তো আর তাদের মুখগুলো ভেসে উঠতো চোখের সামনে। কখনো কখনো জলে ভিজে উঠতো তার চোখ বিশেষ করে মায়ের হাতের রান্নার কথা যখন মনে পড়তো আর হোস্টেলের মুরারি ঠাকুরের ট্যালটেলে ডালের সঙ্গে অবশ্যম্ভাবী তুলনা চলে আসতো। কিন্তু তাদের জায়গায় একটা কলেজ ছিল কিন্তু সেরকম ভাল না হওয়ায় তাকে আসতে হয়েছে শহরে। একটু বেশি রকম পেটুক বলেই হয়তো তার কষ্টটা আরো বেশি হতো। বাবার হাতের লেখা, মায়ের লেখা এবং দাদুর লেখাগুলো প্রত্যেকেই যেন এক বিশেষ বার্তা বহন করে নিয়ে আসতো। দাদুর সম্বোধন ছিল স্নেহের ছুটকু, বাবার ছিল কল্যাণবরেষু শানু এবং মায়ের ছিল স্নেহের ছোটু এবং সবার শেষেই থাকতো আশীর্বাদক দাদু, বাবা এবং মায়ের ছিল ভালবাসা নিও-- ইতি ' মা'।
ছোট্ট হলদে রঙের পোস্টকার্ড, একটু শক্ত কার্ড দাম মাত্র পাঁচ পয়সা আর ইনল্যান্ড লেটার ছিল আকাশের মতো হাল্কা নীল দুই পাতার পাতলা কাগজ যার প্রথম পাতায় উপরের দিকে প্রাপকের নাম ও ঠিকানা লেখার জায়গা চারটে লাইন এবং নীচে থাকতো প্রেরকের নাম ও ঠিকানা লেখার জায়গা। দ্বিতীয় পাতাটা ছিল লম্বায় ও চওড়ায় অপেক্ষাকৃত ছোট । দ্বিতীয় পাতা প্রথম পাতার উপর ভাঁজ করে প্রথম পাতার বাড়তি কাগজ দিয়ে ঘিরে দেওয়া হতো এবং তার পরে উপরে প্রাপক ও নীচে প্রেরককে ভাঁজ করে প্রথম পাতার ভিতরে মাথায় লাগানো আঠাতে একটু জল লাগিয়ে মুখ বন্ধ করে দেওয়া হতো এবং হয়ে যেতো একটু গোপনীয়। দাম মাত্র পনেরো পয়সা অথচ কত গোপনীয় ব্যক্তিগত কথাবার্তা বহন করতো এই ইনল্যাণ্ড লেটার যেখানে পাঁচ পয়সার পোস্টকার্ড ছিল খোলামেলা বিন্দাস। পঁচিশ পয়সার খামে কত যে লেখা পাতা ভরা হতো তা ভাবলেই একটু আশ্চর্য লাগে।চৌরাস্তার মোড়ে থাকা লাল একটা লেটার বক্স যেটা একদম শেষে সন্ধ্যেবেলা সাড়ে পাঁচটায় খোলা হতো। এরপরে চিঠি ফেললে পরের দিন সংগ্রহ করা হতো। তখন পোস্টাল ইনডেক্স নাম্বার চালু হয়নি এবং দূরদূরান্ত থেকে চিঠি চলে আসতো আজহার দা বা শচীন কাকুদের মাধ্যমে। টেলিগ্রাম সন্ধে বেলায় এলেই গা টা ছমছম করে উঠতো কোন দুঃসংবাদের সম্ভাবনা চিন্তা করে। ১৫ই আগস্ট,১৯৭২ সালে শ্রীরাম ভিকাজি ওয়েলেঙ্কারের মাথা থেকে বেরিয়ে আসা পোস্টাল ইনডেক্স নাম্বার এক যুগান্তকারী ঘটনা নিয়ে এল। ছয়টি নম্বর সম্বলিত এই পিআইএন ( পিন) এর প্রথম সংখ্যা পোস্টাল জোন, দ্বিতীয় টি সাব জোন , তৃতীয়টি কোন জেলা এবং পরের তিনটি অর্থাৎ চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ নম্বরটি কোন পোস্ট অফিস সেটা বোঝায়। অনেক সরলীকৃত হয়েছে এবং আগে যে ডেড লেটার বক্স যেখানে প্রাপককে যে কোন কারণে ওই চিঠি দেওয়া যায়নি সেগুলো পড়ে থাকতো এবং এই পিন বা পোস্টাল ইনডেক্স নাম্বার চালু হবার পর তার কলেবর অনেকটাই কমে গেছে। পৃথিবীটাই এখন কত ছোট হয়ে গেছে। চিঠিপত্র আজকাল লেখা প্রায় উঠেই গেছে। মোবাইল ফোনের কল্যাণে আজ পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্ত নিমেষেই যোগাযোগ হয়ে যাচ্ছে। সময় এখন অত্যন্ত মূল্যবান , সুতরাং স্বাভাবিক ভাবেই চিঠি তার জৌলুস হারিয়ে ফেলেছে।
আজ পোস্টকার্ড নেই, নেই ইনল্যাণ্ড লেটার, হারিয়ে গেছে সেই জ্বলজ্বল করা লাল রঙের লেটার বক্স। এখন তার জায়গা নিয়েছে রেজিস্টার্ড পোস্ট এবং স্পীড পোস্ট এবং সেটাও পোস্ট অফিসে গিয়েই করতে হয়। আগে আজহার দা, শচীন কাকুরা চিঠি দিয়ে যেতেন বাড়ি বাড়ি ঘুরে এবং তাঁরাও সুখে দুঃখে আমাদের সাথী হয়েই থাকতেন।
চিঠির গোছা নিয়ে ভাবছে রজত কি করব কি করব, হঠাৎ এমন সময় পৃথা পিছনে এসে পিঠে হাত দিয়ে বললো কি, এত কি ভাবছো?
একটু অপ্রস্তুত হয়েই রজত জানালো যে এই পুরনো চিঠির বাণ্ডিলটা ফেলে দেবে কিনা ভাবছে সে।
"কেন এত চিন্তা করছো তুমি? এরা তোমার এতদিনের সঙ্গী, অনেক সুখ দুঃখের সাথী এরা। এতদিন তুমি সযত্নে এগুলো সামলে রেখে এখন তুমি ফেলে দেবার কথা কি করে চিন্তা করলে?"
ঠিক তাই। কবে দাদু, বাবা ও মা চলে গেছে তাকে ছেড়ে কিন্তু ছেড়ে গেছে তাদের স্মৃতি এই চিঠির মাধ্যমে। তাদের হাতের লেখা সেই সময়ের ঘটনার কথা এমনভাবে তুলে ধরেছে যে চিঠিটা পড়লেই সেই ঘটনাগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। বিয়ের পরে প্রথম লীভ ট্র্যাভেল কনসেশন নিয়ে বাবা ও মাকে নিয়ে বেড়াতে যাবে বলে ঠিক করেছে জানতে পেরেই বাবা পোস্ট কার্ডে চিঠি লিখে দিল যে তোমার মায়ের শরীরটা বিশেষ ভাল যাচ্ছে না, সুতরাং আমরা দুজনেই যেন ঘুরে আসি। না, আমরা দুজনে গেলে নিজের পয়সায় যাব কিন্তু এলটিসি নিয়ে সবাইকে নিয়ে যাব। কিন্তু বলাই বাহুল্য যে রজতের তার বাবাকে নিয়ে আর বেড়াতে যাওয়া হয়নি কারণ তার বাবা কিছুদিনের মধ্যেই অমৃত লোকের পথে যাত্রা করেন। এক একটা চিঠি যা কয়েক লাইনের কিন্তু মনে পড়িয়ে দেয় অনেক গভীর স্মৃতি। তাই পৃথার কথাতেই সম্মতি জানালো সে, চিঠির গোছা থেকে গেল নতুন বাড়িতে একটা কোণে স্থান নিতে।
No comments:
Post a Comment