কলকাতা থেকে টেলিগ্রাম এসেছে," Father ill, come soon." তখন এটা একটা রেওয়াজ ছিল কোন ছুটিছাটা নিতে হলে এইধরণের একটা টেলিগ্রাম পাঠানো হতো। টেলিগ্রাম এসেছে অফিসে। ম্যানেজার চেম্বারে ডেকে পাঠালেন ডালুকে আর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওর প্রতিক্রিয়া দেখতে লাগলেন যে টেলিগ্রাম টা পাওয়ার পর।
স্যার, আমাকে বাড়ি যেতে হবে ।
বাড়ি যেতে হবে মানে? এত কাজ, মাসের প্রথম, বাড়ি যেতে হবে বললেই হবে? তোমার এই কাজ কে সামলাবে?
মনে মনে একটা খুব খারাপ গালাগালি এল কিন্তু সেটা সামলে খুব মোলায়েম করে বলল যে ,"স্যার আমিই বাবার একমাত্র ছেলে, বাবার বিপদে আমি না গেলে কে দেখবে, বলুন।" ওর মুখে এসে গেছিল যে আমি না গেলে কি পাড়ার পঞ্চু এসে দেখবে। ম্যানেজার একটু নরম হয়ে বললেন ,"আচ্ছা শোন, তুমি যাও কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসতে হবে।"
ডালু বুঝল যে ব্যাটা একটু নরম হয়েছে। হ্যাঁ স্যার, ঠিক আছে স্যার বলে ধন্যবাদ দিয়ে নিজের কাজগুলো পাশের সহকর্মীকে বুঝিয়ে দিতে লাগল।
আসলে সবটাই একটা সেটিং। এতদূরে থেকে হঠাৎ বাড়ি যাব বললেই কি ট্রেনের টিকিট পাওয়া যায়? আগের দিন সন্ধ্যা বেলায় পাণ্ডিয়ার বাড়ি কাম অফিস হয়ে বাড়ি গেছে টিকিটের জন্য। পাণ্ডিয়া ছিলেন খুব করিৎকর্মা লোক। একদিন আগে জানালেও উনি সাধারণ টিকিট কেটে টিকিট চেকারের সঙ্গে কথা বলে কোন কামরায় উঠতে হবে বলে দিতেন। এমন ই ছিল তাঁর যোগাযোগ, নিতেন মাত্র দশ টাকা বাড়তি। অবশ্য দশটাকার তখন অনেক দাম। কিন্তু পাণ্ডিয়া স্টেশনের কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে সব বলে দিতেন এবং টিকিট চেকারের সঙ্গে দেখা করিয়ে তবে উনি ফিরে আসতেন। এতটাই ছিলেন প্রফেশনাল।
এইরকম ই একটা দিন যখন চেন্নাই হাওড়া মেলে পাণ্ডিয়া উঠিয়ে দিয়েছেন এক কামরায় যেখানে ডালু ছাড়া আর জনা তিন চারেক অন্য লোক আর বাকি সব ছেলেমেয়েরা গরমের ছুটিতে বাড়ি ফিরছে । ডালুর মুখ নিশপিশ করছে কথা বলার জন্য। বাকি যে তিন চারজন তারা কামরার এক প্রান্তে নিজেদের মধ্যে আলাপচারিতায় ব্যস্ত এবং মনেই হয় তারাও হয়তো চেন্নাই থেকেই উঠেছে। এই ট্রেন যাত্রায় একটা জিনিস লক্ষ্য করা যায় যে প্রথমে যারা ওঠে তাদের মধ্যে যে আন্তরিকতা বা আলাপচারিতা জমে ওঠে, মাঝপথে ওঠা কোন লোককেই তারা আর সেই গ্রুপে ঢুকতে দেননা। এমনকি পাশের ক্যূপের যাত্রীরাও অন্য লোক বলেই গণ্য হন। আর এখানে তো ডালু এক প্রান্তে আর ছাত্রছাত্রী বাদে লোকগুলো অপর প্রান্তে। সুতরাং, জমবে না, এই ছেলেমেয়েদের সঙ্গেই ভাব জমিয়ে চলতে হবে। ষোল সতেরো ঘন্টার যাত্রা যদি মুখ বুঁজে যেতে হয় তাহলে নির্ঘাত ও অসুস্থ হয়ে পড়বে, বাবাকে দেখতে গিয়ে ওকেই কে দেখে সেটা নিয়ে ভাবতে হবে। যাই হোক, শ্রীকাকুলামে ট্রেন এসে পৌঁছালো। কামরায় বেশ হকার উঠেছে। এই একটা দারুণ জিনিস সেকেন্ড ক্লাস কম্পার্টমেন্টে। এখানে বিভিন্ন রকম আওয়াজ করে ভিন্ন ভিন্ন হকার ওঠে এবং তাদের সঙ্গেও দুচারটে কথা বিনিময় হয় জিনিস কেনার সময়। খোলামেলা কামরার আলাদাই মেজাজ। চিপস আর চানাচুরের দুটো করে প্যাকেট কিনে একটা সামনে বসা কলেজের ছাত্রটিকে দিল। কিছুতেই নেবেনা সে আর ডালুও ছাড়বে না। হাজার হলেও ডালুর বয়স বেশি এবং লোকজনকে বিশ্বাস করানোতে ও একজন আদর্শ লোক। ছেলেটাকে পটিয়ে ও তার হাতে গুঁজে দিল একটা চিপস ও চানাচুরের প্যাকেট। ধীরে ধীরে জমে উঠল কথাবার্তা। ওঁর কাছেই জানতে পারল যে ওরা ম্যাঙ্গালোরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে। এর ই মধ্যে একটা ছোট খাটো চেহারার ভীষণ বুদ্ধিদীপ্ত মেয়ে নজরে পড়ল। এই ছোট মেয়েটা অতি আধুনিকা হয়েও পান খাচ্ছে। এই বয়সের ছেলেমেয়েরা সাধারণত পান খাচ্ছে এটা চোখেই পড়েনা। কোন সময় হয়তো অনুষ্ঠান বাড়িতে খাওয়ার পর খেলেও খেতে পারে কিন্তু ঐ ছোট্ট মেয়েটি পান খাচ্ছে আর সমস্ত ছেলেমেয়েদের বলে দিচ্ছে কি করতে হবে বা কি নয় এটা দেখে ডালু তো থ বনে গেছে। সামনে বসা ছেলেটার কাছে জানতে পারল যে মেয়েটি ঢাকা থেকে পড়তে এসেছে আর ওর নাম জার্মিন। কি দারুণ পার্সোনালিটি মেয়েটার। একে সুন্দর তার উপর যেভাবে কথাবার্তা বলছে কোন ছেলে বা মেয়ে তাকে অস্বীকার করতে পারছেনা। ওই মেয়েটির বাবার নাকি বিরাট ব্যবসা এবং মেয়েটিও প্রচুর পয়সা খরচ করে তার বন্ধুদের পিছনে। একে সুন্দরী তার উপর পয়সা খরচে কোন কার্পণ্য নেই, সুতরাং স্বাভাবিক ভাবেই ছেলেমেয়েরা যে তার কথা মেনে চলবে , এটাই খুব স্বাভাবিক। খাবার দাবার বেরোল ঝুলি থেকে। সবাইকে বিতরণ করার সময় ডালুকেও একটা দিল। খেতে খেতে গান ধরলো তারা, ডালুকেও বলল তাদের সঙ্গে গলা মেলাতে। ডালু ঠিক কাকুর পর্যায়ে না হলেও বড় দাদার মতন কিন্তু সেই সময় ডালু ও ভিড়ে গেল তাদের মধ্যে । রাতের খাবার এসে গেছে, খাওয়া দাওয়া করে সবাই গল্পে মত্ত হলো এবং অনেক রাত অবধি আড্ডা চলল। আর কয়েক ঘণ্টা পরেই হাওড়া স্টেশন এসে যাবে আর তার পরেই দীর্ঘ গরমের ছুটি এবং তারপর আবার ফিরে যাওয়া ও নিজেদের পড়াশোনায় মেতে ওঠা।
ডালুর মনে পড়ে গেল ইউনিভার্সিটির দিনগুলোর কথা। ছুটির শুরুতে এবং ছুটি শেষে আবার পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে একত্র হওয়া, এটা একটা বিরাট ব্যাপার। কিন্তু এই এত বড় ব্যাচ একসাথে কলকাতা থেকে বাইরে পড়তে যাচ্ছে এটা সে কোনদিন দেখেনি। ডালুর একবার মনে হলো তাহলে কি আমাদের শিবপুর, যাদবপুর বা খড়গপুর আই আই টিরা তাদের জৌলুস হারিয়ে ফেলছে। না তাই নয়, এখনও তারা সেরাদের পর্যায়েই আছে তবে যা হারিয়ে গেছে তা হচ্ছে পড়াশোনা করার পরিবেশ। মেধাবী ছাত্র ছাত্রীরাই এখানে পড়তে আসে কিন্তু রাজনীতি এতটাই কলুষিত করে তুলেছে এই শিক্ষায়তনগুলি যে অভিভাবকরা আর ভরসা করতে পারছেন না। আমরা কি হৃত গৌরব ফেরাতে সচেষ্ট হবো না?