স্বামী বিবেকানন্দ তো বলেছেন, " বহুরূপে সম্মুখে তোমার ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর,
জীবে প্রেম করে যেই জন সেইজন সেবিছে ঈশ্বর। " সুতরাং যাঁরাই বিভিন্ন কাজের মাধ্যমে সেবা করছেন, তাঁরা সবাই ভগবানের ই দেওয়া কাজ করছেন। তাঁরই সৃষ্টি ভাল মানুষ এবং তাঁরই সৃষ্টি চোর, ডাকাত এবং বদমাস লোকেরাও। চোররাও চুরি করতে যাবার আগে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করে যেন বেশ ভাল কিছু দাঁও মারতে পারে এবং অবশ্যই যেন ধরা না পড়ে। এ তো গেল সেইসব ভগবানের দাস দাসীদের কথা বা সেবকদের কথা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে ভগবানকে কেউ দেখেছেন কি না? যদি দেখে থাকেন তাহলে তিনি দেখতে কেমন?
আমরা সবাই তাঁকে দেখেছি কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন রূপে। আমার দেখা ভগবান সেই রকে বসে থাকা গুলতানি করা কিছু চেটো চ্যাংড়া ছেলেদের মধ্যে। বাপের পয়সায় রাজা উজির মারা ছেলেরা যাদের দৌরাত্ম্যে পাড়ার মেয়েরা এবং তাদের বাবামায়েরা সদাই সন্ত্রস্ত, কি হয় কি হয় ভাব সদাই মনের মধ্যে ঘুরপাক খায় কিন্তু কারও বিপদে আপদে বুক চিতিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া সেই তথাকথিত বাজে ছেলেরা বা বখাটে ছেলেরা। এদের সময়ই সময়। কুছ পরোয়া নেই এই মন নিয়ে আপনাকে বিপন্মুক্ত করে তবেই এদের শান্তি। এরা কিন্তু মাঝপথে আপনাকে বিপদে ফেলে পালাবে না। এদের নীতি হলো মরদ কি বাত, হাতি কি দাঁত। এরা হয়তো কেউই বেশী পড়াশোনার ধার ধারেনি কিংবা কেউ কেউ দুয়েকটা ধাপ এগোলেও প্রতিযোগিতায় এরা কেউ এঁটেও উঠতে পারবে না। তবে এরা করবে টা কি? কি করে এদের সংসার চলবে? আর এদের বাবামায়েদের পক্ষেও একটা সময়ের পরে এদের টানা সম্ভব নয়। তাহলে এরা কি চিরকাল এইভাবেই থাকবে? বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এদের শোষণ করে রাজনৈতিক নেতারা। তাঁরা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে এদের ব্যবহার করে এবং প্রয়োজন মিটলেই এদের ছুঁড়ে ফেলে দেয়। কেউ বা এই দলের আবার কেউ বা অন্য দলের। এদের ভবিষ্যত দেখার দায়িত্ব কার? এই বিশাল যুবসমাজের সুকুমার বৃত্তিগুলো এই দাদাদের কল্যাণে বিলুপ্ত হয়ে যাবে এবং এদের হাতে তুলে দেওয়া হবে ছোরা, বন্দুক এবং বোমা। কিছুদিনের মধ্যেই যারা দুদিন আগেই গলায় গলায় বন্ধু ছিল তারাই হয়ে উঠবে পরস্পরের শত্রু। তবে এটাকে সামলানোর উপায় কি, কোন রাস্তাই কি খোলা নেই? আছে, সমস্যা যখন আছে তখন তার সমাধান ও আছে। একটু ভেবেই দেখা যাক না কেন এই সমাধানের রাস্তা খোঁজার।
আচ্ছা আমাদের রাজ্যে তো ক্লাবগুলোকে প্রতি বছরই কিছু অনুদান দেওয়া হয়। এই অনুদানকেই একটু অন্যরকম ভাবে দিলে কিছুটা বেকার সমস্যার সমাধান ও হয় আর সাধারণ জনগণের ও কিছু উপকার হয়। আজকাল প্রত্যেক সংসার ই খুব ছোট হয়, একটা কি দুটো বাচ্চা। সমস্ত বাবা মায়েরাই আপ্রাণ চেষ্টা করেন তাঁদের সন্তানদের নিজেদের সামর্থ্যের বাইরে গিয়েও ভালভাবে শিক্ষা দান করার। যদি তারা খুব ভাল ভাবে সফল হয় তারা জীবিকার সন্ধানে বিদেশে চলে যায় এবং সেখানেই তারা থিতু হয়ে যায়। মেয়েদের বিয়ে হওয়ার পর তারাও অনেক সময়ই বাইরেই থেকে যায় এবং এখানে আমাদের দেশে বৃদ্ধ বাবা মায়েরা অসহায় অবস্থায় পড়ে থাকেন। এঁদের মধ্যে যাঁদের অনেক পয়সা আছে তাঁরা বিলাস বহুল বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে পারেন কিন্তু যাঁদের পয়সা মোটামুটি আছে কিন্তু সেরকম আহামরি কিছু নেই তাঁরা এইসব ক্লাবের ভরসা থাকতে পারেন অবশ্যই কিছু টাকার বিনিময়ে। এতে বহু কর্মসংস্থান হতে পারে এবং এই ক্লাবগুলোই সরকারের পরিপূরক হিসাবে কাজ করতে পারে। যাঁদের অর্থ সংস্থান সেরকম নয় তাঁরাও এই ক্লাবগুলোর সাহায্যে যাতে বঞ্চিত না হন সেদিকে সরকারের নজরদারি অবশ্যই থাকা উচিত। এই ক্লাবগুলো হবে সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক, ধর্ম নিরপেক্ষ এবং জাতপাতের ঊর্ধে নাহলে সবই পণ্ডশ্রম হবে এবং কিছু ক্ষমতাসম্পন্ন লোকের কুক্ষিগত হবে। এই ক্লাবগুলির সঙ্গে হাসপাতালের সমন্বয় থাকবে এবং সমস্ত জনগণ এতে উপকৃত হবেন। কিন্তু এইসবের পিছনে যে মূলকারণ থাকবে তা হলো সমবেদনা এবং সংবেদনশীলতা।
কিছুদিন আগে একজন পরিচিত ভদ্রলোক যিনি অত্যন্ত পরোপকারী তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। অনেক বড় বড় ডাক্তার দেখানোর পর তাঁরা এই রায় দিলেন যে একটা বড় ধরণের অপারেশন করা দরকার। তাঁর পরিবারের লোকজন এবং আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে রক্ত নেওয়া সত্ত্বেও তা অপ্রতুল হলো। বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করার পর একজন হৃদয়বান ব্যক্তি এগিয়ে এলেন এবং তিনি দুইজনের খবর দিলেন যাঁরা রক্ত দান করতে ইচ্ছুক। সম্পূর্ণ অজানা অচেনা ভদ্রলোক যাঁদের একজনের একটি ছোট্ট দশকর্মা ভাণ্ডারের দোকান এবং অন্যজন উবের সংস্থার মোটরসাইকেল চালক। সেদিন ছিল রবিবার। তিনি দোকান বন্ধ করে দূরে থাকা হাসপাতালে যেখানে ভদ্রলোক ভর্তি আছেন রক্ত দিতে চলে এলেন এবং অন্য জন সকাল থেকে যাত্রী সেবা দিয়ে ব্লাড ব্যাঙ্ক বন্ধ হবার আগে পৌঁছে গেলেন রক্ত দেবার জন্য। এটা এমনই এক জিনিস যা টাকা দিলেও মেলেনা। অনেকে এখানে সেখানে রক্ত দান শিবিরে রক্ত দান করেন এবং বিনিময়ে তাঁরা একটা কার্ড ও পান কিন্তু কিছু হাসপাতাল আছে তাঁরা এই কার্ড স্বীকার করেন না এবং তাঁরা তাঁদের ওখানেই রক্ত দেবার জন্য চাপ দেন। তাহলে রক্ত দান শিবিরে প্রাপ্ত রক্তগুলো কি কাজে আসবে যদি ঐ কার্ড গুলো ভবিষ্যতে অন্য হাসপাতালে না নেওয়া হয়? এই দুজন ভদ্রলোক ই যাঁরা নিজেদের কথা না ভেবে সম্পূর্ণ এক অপরিচিত ব্যক্তিকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে এসেছেন এঁরাই আমার কাছে ভগবান। পরিচিত কেউ বা আত্মীয় কেউ রক্ত দান করতে পারেন কিন্তু এই সামান্য ব্যক্তিরাই নিজগুণে তাঁদের অসাধারণত্ব প্রমাণ করেছেন এবং অন্য লোকে তাঁদের কি হিসেবে দেখবেন জানিনা ,আমার কাছে এঁরাই প্রকৃত ভগবান ।