Wednesday, 8 March 2023

বখাটে ভগবান

ভগবানকে দেখেছ কিনা জিজ্ঞেস করলে সবাই  হাঁ করে এমনভাবে চেয়ে থাকবে যেন একটা পাগল কোথা থেকে এসে জুটেছে। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেবকেও বহু লোক পাগলের  আখ্যা দিয়েছেন,  আবার  কেউ বা তাঁকে ভণ্ড জাতীয় কিছু বিরূপ মন্তব্য করেছেন আবার  সেইখানেই  তাঁর অনেক অনেক  শিষ্যও  হয়েছেন। আজ সমস্ত পৃথিবীর বুকে রামকৃষ্ণ মঠ ছড়িয়ে আছে, সেটা কি বিনা কারণে হয়েছে?  তাঁর মাহাত্ম্য ছড়িয়ে পড়েছে তাঁর শিষ্যদের মাধ্যমে যাঁদের  মধ্যে স্বামী  বিবেকানন্দের নাম কে না জানে? তিনি ছাড়াও  আরও অনেক শিষ্যদেরও  যথেষ্ট  অবদান  রয়েছে। লেখাপড়া না জানা মানুষটা কি রকম প্রাঞ্জলভাবে ভগবান  এবং সমস্ত  জটিল প্রশ্নের  সমাধান  দিয়েছেন  তা বিভিন্ন  গল্পের  মাধ্যমে পরিস্ফূট  হয়েছে।
স্বামী বিবেকানন্দ  তো বলেছেন, " বহুরূপে সম্মুখে তোমার  ছাড়ি কোথা খুঁজিছ  ঈশ্বর, 
জীবে প্রেম  করে যেই জন সেইজন সেবিছে ঈশ্বর। " সুতরাং যাঁরাই বিভিন্ন  কাজের  মাধ্যমে সেবা করছেন, তাঁরা সবাই  ভগবানের ই দেওয়া কাজ করছেন। তাঁরই  সৃষ্টি ভাল মানুষ  এবং তাঁরই  সৃষ্টি চোর, ডাকাত এবং বদমাস লোকেরাও। চোররাও  চুরি করতে যাবার আগে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করে যেন বেশ ভাল  কিছু  দাঁও মারতে পারে এবং অবশ্যই যেন  ধরা না পড়ে। এ তো গেল সেইসব ভগবানের  দাস দাসীদের কথা বা সেবকদের কথা। কিন্তু প্রশ্ন  হচ্ছে ভগবানকে কেউ দেখেছেন  কি না? যদি দেখে থাকেন  তাহলে তিনি দেখতে কেমন? 
আমরা সবাই  তাঁকে দেখেছি কিন্তু ভিন্ন  ভিন্ন  রূপে। আমার দেখা ভগবান  সেই রকে বসে থাকা গুলতানি  করা কিছু চেটো চ্যাংড়া ছেলেদের  মধ্যে। বাপের পয়সায় রাজা উজির মারা ছেলেরা যাদের দৌরাত্ম্যে পাড়ার মেয়েরা এবং তাদের  বাবামায়েরা সদাই  সন্ত্রস্ত, কি হয় কি হয় ভাব সদাই  মনের মধ্যে ঘুরপাক  খায় কিন্তু কারও  বিপদে আপদে বুক চিতিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া  সেই তথাকথিত  বাজে ছেলেরা বা বখাটে ছেলেরা। এদের  সময়ই  সময়। কুছ  পরোয়া  নেই এই মন নিয়ে আপনাকে বিপন্মুক্ত করে তবেই এদের  শান্তি। এরা কিন্তু মাঝপথে আপনাকে বিপদে ফেলে পালাবে না। এদের  নীতি হলো মরদ কি বাত, হাতি কি দাঁত। এরা হয়তো কেউই বেশী পড়াশোনার ধার ধারেনি  কিংবা কেউ কেউ দুয়েকটা  ধাপ এগোলেও প্রতিযোগিতায়  এরা কেউ এঁটেও  উঠতে পারবে না। তবে এরা করবে টা কি? কি করে এদের  সংসার চলবে? আর এদের  বাবামায়েদের পক্ষেও একটা সময়ের পরে এদের  টানা সম্ভব  নয়। তাহলে এরা কি চিরকাল  এইভাবেই থাকবে? বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই  এদের  শোষণ করে রাজনৈতিক  নেতারা। তাঁরা নিজেদের  স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে এদের ব্যবহার  করে এবং প্রয়োজন  মিটলেই এদের  ছুঁড়ে ফেলে দেয়। কেউ বা এই দলের  আবার  কেউ বা অন্য দলের।  এদের  ভবিষ্যত  দেখার দায়িত্ব কার? এই বিশাল  যুবসমাজের  সুকুমার বৃত্তিগুলো  এই দাদাদের  কল্যাণে বিলুপ্ত হয়ে যাবে এবং এদের  হাতে তুলে দেওয়া হবে ছোরা, বন্দুক এবং বোমা। কিছুদিনের মধ্যেই  যারা দুদিন  আগেই  গলায় গলায় বন্ধু ছিল  তারাই হয়ে উঠবে পরস্পরের  শত্রু। তবে এটাকে সামলানোর  উপায় কি, কোন রাস্তাই কি খোলা নেই? আছে, সমস্যা যখন আছে তখন  তার সমাধান ও আছে। একটু ভেবেই  দেখা যাক না কেন এই সমাধানের রাস্তা খোঁজার। 
আচ্ছা আমাদের  রাজ্যে তো ক্লাবগুলোকে প্রতি বছরই কিছু অনুদান  দেওয়া হয়। এই অনুদানকেই একটু অন্যরকম ভাবে দিলে কিছুটা বেকার সমস্যার সমাধান ও হয় আর সাধারণ জনগণের ও কিছু উপকার হয়। আজকাল  প্রত্যেক সংসার ই খুব ছোট হয়, একটা কি দুটো বাচ্চা। সমস্ত বাবা মায়েরাই আপ্রাণ চেষ্টা করেন তাঁদের  সন্তানদের  নিজেদের  সামর্থ্যের বাইরে গিয়েও ভালভাবে শিক্ষা দান করার।  যদি তারা খুব ভাল ভাবে সফল হয় তারা জীবিকার সন্ধানে বিদেশে  চলে যায় এবং সেখানেই তারা থিতু হয়ে যায়। মেয়েদের  বিয়ে হওয়ার পর  তারাও অনেক সময়ই বাইরেই থেকে যায় এবং এখানে আমাদের  দেশে বৃদ্ধ  বাবা মায়েরা অসহায় অবস্থায় পড়ে থাকেন। এঁদের  মধ্যে যাঁদের  অনেক  পয়সা আছে তাঁরা বিলাস বহুল বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে পারেন কিন্তু যাঁদের  পয়সা মোটামুটি আছে কিন্তু সেরকম  আহামরি কিছু নেই তাঁরা এইসব ক্লাবের  ভরসা থাকতে পারেন অবশ্যই  কিছু টাকার বিনিময়ে। এতে বহু কর্মসংস্থান হতে পারে এবং এই ক্লাবগুলোই  সরকারের  পরিপূরক  হিসাবে কাজ করতে পারে। যাঁদের অর্থ সংস্থান সেরকম  নয় তাঁরাও  এই ক্লাবগুলোর সাহায্যে যাতে বঞ্চিত  না হন সেদিকে সরকারের  নজরদারি অবশ্যই  থাকা উচিত।  এই ক্লাবগুলো হবে সম্পূর্ণ  অরাজনৈতিক, ধর্ম নিরপেক্ষ  এবং জাতপাতের  ঊর্ধে  নাহলে সবই পণ্ডশ্রম হবে এবং কিছু ক্ষমতাসম্পন্ন  লোকের কুক্ষিগত  হবে। এই ক্লাবগুলির  সঙ্গে হাসপাতালের  সমন্বয় থাকবে এবং সমস্ত  জনগণ এতে উপকৃত  হবেন। কিন্তু এইসবের  পিছনে যে মূলকারণ  থাকবে তা  হলো  সমবেদনা এবং সংবেদনশীলতা।
কিছুদিন  আগে একজন পরিচিত  ভদ্রলোক  যিনি অত্যন্ত  পরোপকারী তিনি অসুস্থ  হয়ে পড়লেন।  অনেক  বড় বড় ডাক্তার  দেখানোর  পর তাঁরা এই রায় দিলেন  যে একটা বড় ধরণের অপারেশন করা দরকার।  তাঁর পরিবারের লোকজন এবং আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে রক্ত  নেওয়া সত্ত্বেও  তা অপ্রতুল হলো। বিভিন্ন  সংস্থার  সঙ্গে যোগাযোগ  করার  পর  একজন হৃদয়বান ব্যক্তি এগিয়ে এলেন এবং তিনি দুইজনের  খবর দিলেন  যাঁরা রক্ত দান করতে ইচ্ছুক। সম্পূর্ণ  অজানা অচেনা ভদ্রলোক যাঁদের  একজনের  একটি ছোট্ট  দশকর্মা  ভাণ্ডারের দোকান  এবং অন্যজন উবের সংস্থার  মোটরসাইকেল চালক। সেদিন  ছিল  রবিবার।  তিনি দোকান  বন্ধ  করে দূরে থাকা হাসপাতালে যেখানে ভদ্রলোক  ভর্তি আছেন  রক্ত দিতে চলে এলেন  এবং অন্য জন সকাল  থেকে যাত্রী সেবা দিয়ে ব্লাড ব্যাঙ্ক  বন্ধ  হবার আগে পৌঁছে গেলেন রক্ত  দেবার  জন্য।  এটা এমনই  এক জিনিস  যা টাকা দিলেও মেলেনা।  অনেকে এখানে সেখানে রক্ত দান শিবিরে রক্ত দান  করেন এবং বিনিময়ে তাঁরা একটা কার্ড ও পান কিন্তু কিছু হাসপাতাল  আছে তাঁরা এই কার্ড স্বীকার  করেন না এবং তাঁরা তাঁদের  ওখানেই  রক্ত  দেবার জন্য চাপ দেন। তাহলে রক্ত দান শিবিরে প্রাপ্ত রক্তগুলো কি কাজে আসবে যদি ঐ কার্ড গুলো ভবিষ্যতে অন্য  হাসপাতালে না নেওয়া হয়? এই দুজন ভদ্রলোক ই যাঁরা নিজেদের  কথা না ভেবে সম্পূর্ণ  এক অপরিচিত  ব্যক্তিকে সাহায্যের  জন্য  এগিয়ে এসেছেন  এঁরাই  আমার  কাছে ভগবান।  পরিচিত  কেউ বা আত্মীয় কেউ রক্ত দান করতে পারেন  কিন্তু এই সামান্য  ব্যক্তিরাই নিজগুণে তাঁদের  অসাধারণত্ব প্রমাণ  করেছেন  এবং  অন্য লোকে তাঁদের  কি হিসেবে দেখবেন জানিনা ,আমার  কাছে এঁরাই  প্রকৃত ভগবান ।
 

Monday, 6 March 2023

দোলপূর্ণিমা ও হোলি

আজ দোলপূর্ণিমায় সারা শহর মেতে উঠেছে দোলযাত্রা উদযাপনে।  বরাবরের মতো গল্ফগ্রীন  এই ব্যাপারে ভীষণ  অগ্রণী এবং আমাদের কাউন্সিলর শ্রী তপন দাশগুপ্ত  মহাশয়ের উদ্যোগে পুরোপুরি শান্তিনিকেতনের ঢঙে এখানে সেন্ট্রাল পার্কে দোলযাত্রার অনুষ্ঠান  সম্পন্ন হয়। গল্ফগ্রীনে কলকাতার  অন্যান্য জায়গার  তুলনায় গাছপালার আধিক্য একটু বেশী হওয়ায় পরিবেশটাও অনেক  শান্ত এবং লালপলাশের উপস্থিতি এই বসন্তোৎসবকে একটা আলাদা মাত্রা দেয়। বাচ্চা বাচ্চা মেয়েদের যথাযথভাবে প্রশিক্ষণ  দিয়ে অভিজ্ঞ শিল্পীরা এই অনুষ্ঠানের উপযুক্ত  করে তোলেন  এবং নাচ ও গানের মাধ্যমে গল্ফগ্রীনকে উৎসব মুখরিত করে তোলেন।  অনেক বর্ষীয়ান শিল্পীরাও  অংশ গ্রহণ করে অনুষ্ঠানটিকে  মনোজ্ঞ  করে তোলেন। 
নীল দিগন্তে ওই ফুলের আগুন  লাগল গানে মনটাও হিন্দোলিত হয়ে ওঠে কিন্তু এবার  যেন  কোন অজ্ঞাত  কারণে মনটা তেমন ভাবে সাড়া দিলনা।  হয়তো বা বয়সজনিত কারণ  কিংবা কোন নিকট আত্মীয় বা বন্ধুর অসুস্থতার কারণেও হতে পারে। এই সব কারণগুলো তো প্রত্যেক  বছর ই কিছু  কম বা কিছু বেশী পরিমাণে থাকেই তবে এইবার  এরকম  কেন মনে হচ্ছে। চিন্তার  গভীরে ডুব দিয়ে কারণ  অনুসন্ধানে মন দিলাম।  হ্যাঁ , পেলাম খুঁজে। হাজার হাজার  যোগ্য  চাকরিপ্রার্থীরা উপেক্ষিত  হয়ে দিনের পর দিন  বিভিন্ন  জায়গায় অবস্থানরত আর তাদের  জায়গায় অযোগ্য  প্রার্থীরা টাকার বিনিময়ে রাজনৈতিক নেতাদের হাত ধরে সেইসব জায়গা দখল  করে বসে আছে এবং এই অযোগ্য অশিক্ষিতদের হাতে ভবিষ্যত  প্রজন্ম কতটা  সুরক্ষিত সেটা ভাবার  সময় ভীষণ ভাবে এসেছে।  প্রত্যেক  যুগেই  মানে বিভিন্ন  সরকারের  আমলেই  এটা হয়েছে কিন্তু গোটা শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে এই ব্যাপকতা ভবিষ্যত প্রজন্মকে কিভাবে পিছিয়ে দিয়েছে এটা ভাবলেই গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। মধ্যবিত্ত  সংসারে সবার  পক্ষে প্রাইভেট স্কুলে পড়ানো সম্ভব নয় কারণ  অতিরিক্ত খরচ তাঁদের  পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। কিন্তু এই অসৎ  রাজনৈতিক  নেতারা তাঁদের  ছেলেমেয়েদের  ভুলেও  এই সরকারী স্কুলে পড়তে পাঠাবেন না। অনেকটা এইরকম  কথা," ডু হোয়াট আই সে, ডোন্ট  ডু হোয়াট আই ডু।" নেতাদের  ছেলেমেয়েরা ভাল স্কুল,  ভাল  কলেজে পড়ে তাঁদের  মতন নেতা হবে আর সাধারণ  মানুষের ছেলেমেয়েরা তাঁদের  তাঁবেদারি করবে আর এই ব্যবস্থাটাই পাকাপোক্ত করার  ভীষণ প্রয়োজন। গোটা শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে এই ঘূণ যাঁরা ধরিয়েছেন তাঁদের  কি ধরণের  শাস্তি হওয়া উচিত  তার প্রতিবিধান করবেন আদালত। সর্বস্তরে এই ব্যাপক দুর্নীতির প্রকোপে মন আজ ভীষণ ভারাক্রান্ত  এবং মন আর সায় দিচ্ছেনা গেয়ে উঠতে, " ওরে বকুল পারুল, ওরে শাল পিয়ালের বন, কোনখানে আজ পাই এমন মনের  মতো ঠাঁই, যেথায়  ফাগুন ভরে দেব দিয়ে সকল মন।"
হে বসন্ত,  আমায় মাফ করো, এবারের  মতো আমায় রেহাই  দাও, আমাকে ঐ যোগ্য  চাকরি প্রার্থীদের সমব্যথী হতে দাও। জীবন সায়াহ্নে এসে একবার অন্তত এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ না করে আমায় এই অন্যায়ের  বিরুদ্ধে প্রতিবাদ  করতে দাও।