Wednesday, 29 November 2023

বেলুন

দোকান থেকে তিতাস কিনে আনল এক বাক্স বেলুন। বাক্স খুলে দেখে কেমন যেন জড়াজড়ি করে শুয়ে আছে তারা সবাই।  কেউ সাদা, কেউ নীল, কেউ লাল,  কেউ গোলাপী আবার  কেউ বা হলুদ যেন কুকুরের অনেকগুলো বাচ্চা সবাই  ভিন্ন ভিন্ন ধরণের। বড় হলে তাদের আকৃতি ও প্রকৃতিও ভিন্ন  ধরণের  হয়। আগামীকাল গোলুর জন্মদিন উপলক্ষ্যে কিনেছে। ছোট্ট  দুই কামরার ফ্ল্যাটে তিতাস ও বাসুর সাম্রাজ্য গোলুকে নিয়ে। গোলু এখন স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে, সুতরাং তার বায়না তার বন্ধুদের তার জন্মদিনে নিমন্ত্রণ  করতে হবে। খুবই সাধারণ  মধ্যবিত্ত পরিবারে তারা বড় হয়েছে যদিও ছাত্র এবং ছাত্রী হিসাবে দুজনেই  ছিল  যথেষ্ট  মেধাবী এবং সেই সুবাদেই দুজনেই  ভাল চাকরি করছে। কিন্তু যাদের জীবন প্রথম থেকেই সংগ্রামের  মধ্য দিয়ে আসে তাদের থিতু হতে একটু সময় তো লাগবেই। একসঙ্গে ক্লাসে  পড়তে পড়তেই একটু একটু ভাল লাগা, তার থেকে প্রেম  এবং অবশেষে বিয়ে। বিয়ের পর পরই হাউসিং বোর্ডের ফ্ল্যাট  লটারিতে পাওয়া এবং ইনস্টলমেন্টে কেনা যদিও ডাউন পেমেন্ট এর পনের শতাংশ  জোগাড় করতেই হিমশিম খেতে হয়েছিল  তাদের। 

গোলু ভাল  স্কুলে চান্স পাওয়ায় মাইনেটাও যথেষ্ট  বেশী। সেখানে অনেক বড় বড় লোকের মানে ধনী লোকের ছেলেরা পড়ে, যারা আসা যাওয়া করে গাড়িতে যেখানে তিতাস বা বাসু বাসে করে বা নিদেন পক্ষে অটো করে যাতায়াত করে। গোলুর বন্ধুবান্ধবদের জন্মদিন  খুব  হৈ হৈ করে উদযাপন হয় এবং বড় কোন ক্লাবে বা হোটেলে। গোলুর ও বন্ধুদের নিমন্ত্রণ করতে ইচ্ছ করে কিন্তু তিতাস  বা বাসুর সেই সামর্থ্য নেই। ছোট্ট  দুকামরার ফ্ল্যাটে জন্মদিন  পালন  অসম্ভব,  সুতরাং অগতির  গতি ঐ অ্যাসোসিয়েশন হল। সেখানেও ভাড়া আজকাল  বেড়েছে, হয়েছে তিন থেকে পাঁচ হাজার। এছাড়াও হল সাজানো , খাওয়াদাওয়া এবং রিটার্ন  গিফট  সব মিলিয়ে আরও  বেশ অনেক টাকা যা তাদের  চিন্তার  মাঝে ফেলে দেয়। সে আর কি করা যাবে, পরের মাসগুলোয় একটু টেনেটুনে চালাতে হবে। ওদের সময় তো এত হ্যাপা ছিলনা, মা হয়তো একটু পায়েস করে দিল আর তার থেকে আরেকটু বেশী হলে একটু মাংস আনা হলো এবং অবশ্যই  রবিবার দিন মাংস বাদ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছুই  বদলায়।  এখন বাচ্চারা পায়েস  খাক বা না ই খাক,  কেক কাটতেই  হবে, বেলুন দিয়ে ঘর সাজাতেই  হবে। উপরি আছে রিটার্ন গিফট। বাচ্চারা কেউ একা আসেনা, আসে তাদের  মা বা বাবা  কিংবা দুজনেই। সুতরাং সব কিছু মিলিয়ে একটা বড় ধাক্কা।

অ্যাসোসিয়েশনের হলটা  বেলুন দিয়ে সাজানো হয়েছে। দাস ক্যাটারার এর লোকজন এসে নিচে পলিথিনের  শিট  দিয়ে রান্নার  জায়গাটা ঘিরেছে এবং মাঝে মাঝেই বেশ সুন্দর গন্ধ ভেসে আসছে। সন্ধ্যার সময় ঝিমিয়ে থাকা হল বেশ ঝলমলে হয়ে উঠেছে, প্রাণ ফিরে পেয়েছে বাচ্চাদের  কলরবে। আজকাল  তো বাচ্চা চোখেই পড়েনা। আগে কত ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের কলতানে পার্কটা গমগম করতো আর এখন বাচ্চা একটু  বড়  হতেই নানাধরণের  ক্লাসে তাদের  ভর্তি করে দিয়ে শৈশবের দফারফা করে দেওয়া হয়। হয় আঁকা, নাহলে নাচ বা গানের ক্লাসে  তাদের খেলাধূলার পরিসমাপ্তি।  সেই কারণেই এত আনন্দ বাচ্চাদের  আর আমরা যারা বুড়ো তারা ওদের  চেঁচামেচিতে নিজেদের  শৈশবের কথা ভাবছি। বেশ রাত অবধি বাচ্চাদের  গুঞ্জনে মনটা বেশ হাল্কা হয়ে গেল। নিজের  নাতি নাতনিদের কথা মনে পড়ে চোখটা একটু ছলছল করে উঠল আর অনেক অনেক ভালবাসা ও আশীর্বাদ  তাদের উদ্দেশ্যে পাঠানো হলো।

পরদিন সকাল।  হলটা  আবার  কেমন  ম্রিয়মান। সাফসুতরো চলছে। গতকাল সন্ধ্যার ফুলে ওঠা বেলুনগুলোর জেল্লা যেন ফিকে  হয়ে এসেছে, গুচ্ছে  বাঁধা বেলুনগুলো বাইরে এদিকে ওদিকে হেসে খেলে বেড়াচ্ছে। রিক্সাভ্যানে তরকারি নিয়ে আসা বিক্রেতা দুটো গোছা নিজের  ছেলেমেয়েদের জন্য নিল আর বাকি গোছাগুলো ম্লান দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল।  কিন্তু সব্জিতে ভর্তি ভ্যান,  বিক্রেতা অস্ফূট  স্বরে বলে উঠল," ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই ছোট সে তরী, অতএব ক্ষমা করো মোরে নিজগুণে।" হাওয়ায় ভাসা উপেক্ষিত বেলুন গুলো মাঝেমধ্যেই  ফুট ফাট আওয়াজ করে চুপসে যেতে লাগল আর তখনও ফুলে থাকা বেলুনের গায়ে লেজের মতন ঝুলতে থাকল। আহ্, কি হচ্ছেটা  কি,ছাড়না মোর হাত কিন্তু ক্ষীণ স্বরে  বলে উঠল চুপসে যাওয়া বেলুন, " আমি তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ,  সুরের বাঁধনে , অতএব  ভেসে চল ধরে মোর হাত।"

Friday, 24 November 2023

হলুদ বসন্ত

জীবন সায়াহ্নে পৌঁছানো মধুকর বাবু ও তাঁর  স্ত্রীর বেশিরভাগ সময়ই কাটে গাড়ি বারান্দার ওপরের ছাদে। দুই বুড়োবুড়ির কথোপকথন সেই একই ব্যাপারে সীমিত। কেউ না কেউ তো একজন হয়ে যাবে, তখন কি করে সময় কাটাবে অন্যজন। সবাই  তো আর  বিপিন রাওয়াতের মতো ভাগ্যবান নন যে একইসঙ্গে দুজনে বিদায় নিলেন  এই সুন্দর পৃথিবী থেকে। আরও অনেক ভাগ্যবান  আছেন যাঁরা কোন না কোন ভাবে একইসঙ্গে বিদায় নিয়েছেন যাঁদের কথা আমরা জানিনা। 
মধুকরের স্ত্রী রীনা খুবই  চিন্তিত  যে উনি যদি আগে চলে যান তাহলে মধুকরের কি হবে। মধুকর খুবই জেদি ধরণের মানুষ, কোনভাবে কারো সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারেন না। ভীষণ একবগ্গা টাইপের মানুষ প্রথম থেকেই। কেবলই নিজের মতামত অন্যের উপর চাপিয়েই ছিল  তাঁর আনন্দ।  সুতরাং বুঝতে কোন অসুবিধা হবার কথাই নয়। মেয়েরা তো সর্বংসহা, জলের  মতো, যে পাত্রেই রাখা যাক না কেন  সেই জায়গাতেই মানিয়ে নেয় কিন্তু যাঁরা একটুও  নমনীয় নন তাঁদের  তো মহা বিপদ। সেইজন্য রীনা রোজ পূজোর  সময় ঠাকুরের কাছে তাঁর মনের কথা ভক্তিভরে বলেন। কিন্তু নিয়তির লিখন অন্যরকম। হঠাৎই একদিন সবাইকে ভাসিয়ে রীনা চলে গেলেন। মধুকরের চোখের জল কেমন যেন শুকিয়ে গেছে। নিথর হয়ে বসে আছেন  তাঁর নিজের  জায়গায়, একদৃষ্টে চেয়ে আছেন  রীনার চেয়ারের দিকে। শববাহী গাড়ি এসে গেছে রীনার নিথর দেহটাকে নিয়ে যেতে। ছেলে মেয়ে বৌমা ও জামাই সবাই  বলছে মধুকরকে একবার  আসার জন্য  কিন্তু ভ্রূক্ষেপ নেই মধুকরের।  কারো দিকে ফিরেও তাকাচ্ছেন না তিনি। সবাই খুব  অস্বস্তিতে পড়ে গেছে, অন্তত একবারের জন্য  তো তাঁর  আসা দরকার। নাতি, নাতনিরা কেউ আসতে পারেনি রীনার  হঠাত প্রয়াণে। সুতরাং তাদের  আবদারেও  অন্তত  সাড়া দেবার অবকাশ  নেই।

মধুকর ছিলেন  অত্যন্ত  ছাপোষা মানুষ,  বিরাট চাহিদা তাঁর কোনদিনই  ছিলনা। শৈশবের কঠিন  সংগ্রাম এবং দায়িত্ব বোধ তাঁকে কোনদিনই বিরাট স্বাচ্ছল্যের হাতছানি দেয়নি আর পাঁচজনের মতন। জীবনে  চাহিদা যাদের  কম তাদের কষ্ট ও কম। কারও  কাছে হাত পাতার দরকার হয়না, নিজের কষ্ট নিজেই   হজম করতে শেখে তারা। সুতরাং একরোখা হবার এটা একটা কারণ হতে পারে। কি ছেলে, কি মেয়ে বা বন্ধুবান্ধব কারও  কাছেই  মাথা নোয়াতে  রাজি নয় তারা। মাঝেমধ্যেই  মনে হয়  যেন  একটু বেশিই অসামাজিক।  কিন্তু কে কি ভাবে তাতে তাদের  বিন্দুমাত্র  আগ্রহ  নেই। অনেকটা সেই আপনারে দিয়ে রচিলি রে কি এ , আপনারই আবরণ এর মতো। রিটায়ার করার পর পাওয়া টাকা দিয়ে একটা বড় ফ্রিজ ও ওয়াশিং মেশিন কিনেছেন যাতে  রোজ বাজার যাওয়ার ঝামেলা না থাকে বা কাপড়চোপড় কাচার  ঝামেলাও  বেশি না থাকে। আজকাল  কাজের  লোকের কথায় কথায় কামাই যাতে খুব  অসুবিধার সৃষ্টি না করে। কিন্তু ওয়াশিং মেশিন খুব  কম সময়ই ব্যবহার  হয়। ফ্রিজ কিন্তু বেশ ভালোই চলছে মধুকরের অবস্থার  কথা ভেবে অবশ্য মাঝে মধ্যে তেল সাবানের দরকার তো হয়ই।  এইভাবেই  বেশ চলছিল কিন্তু বাদ সাধল  মেয়ের আবদার। ঐ বুড়ো ফ্রিজটাকে এবার বাতিল  না করলেই  নয়। বুড়ো হলেই তো তার কদর কমে যায় সে মানুষ ই হোক  আর অন্য  যে কোন  জিনিস  হোক  না কেন। একদিন  ছিলে তুমি ঝকঝকে , ছিল তোমার কদর, কত প্রশংসাই না হতো তোমার কিন্তু আজ তুমি তোমার গ্ল্যামার হারিয়েছ,  জায়গা ছেড়ে দাও নতুনকে।  এটাই  তো জগতের  নিয়ম। অতএব প্রকৃতির নিয়মে তোমার জায়গায় এসে যাবে নতুন।  পুরোন চেহারাটাকে নিয়ে বদলে দেবে নতুন চেহারা। কিন্তু এই পৃথিবীতে অনেক লোক আছে যারা পুরোন কে ফেলতে ইতস্তত  করে, তাদেরই আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায় কারণ তাদের বদ্ধমূল  ধারণা এদের  এখনও  অনেক কিছুই  দেবার  আছে। কিন্তু না, তারা অত্যন্ত  সংখ্যালঘু, অতএব ফেলে দাও সেই পুরাতনে। 
অনেক  সময় চলে গেছে।  শববাহী যানের  লোকজন  একটু বেশিই  অধৈর্য হয়ে পড়েছে। তাদের  আবার  অন্য জায়গায় যেতে হবে। ছেলে এসে মধুকরের পাশে এসে বলল, " বাবা, একবার  এস, মাকে শেষবারের  মতন বিদায় দাও।" কিন্তু কোন  সাড়া নেই । গায়ে হাত দিয়ে একটু ধাক্কা দিতেই চেয়ার থেকে পড়ে গেলেন  মধুকর,  নিথর নিস্তব্ধ  দেহ। রীনার  প্রার্থনা শেষমেশ ভগবান মঞ্জুর করলেন।