গোলু ভাল স্কুলে চান্স পাওয়ায় মাইনেটাও যথেষ্ট বেশী। সেখানে অনেক বড় বড় লোকের মানে ধনী লোকের ছেলেরা পড়ে, যারা আসা যাওয়া করে গাড়িতে যেখানে তিতাস বা বাসু বাসে করে বা নিদেন পক্ষে অটো করে যাতায়াত করে। গোলুর বন্ধুবান্ধবদের জন্মদিন খুব হৈ হৈ করে উদযাপন হয় এবং বড় কোন ক্লাবে বা হোটেলে। গোলুর ও বন্ধুদের নিমন্ত্রণ করতে ইচ্ছ করে কিন্তু তিতাস বা বাসুর সেই সামর্থ্য নেই। ছোট্ট দুকামরার ফ্ল্যাটে জন্মদিন পালন অসম্ভব, সুতরাং অগতির গতি ঐ অ্যাসোসিয়েশন হল। সেখানেও ভাড়া আজকাল বেড়েছে, হয়েছে তিন থেকে পাঁচ হাজার। এছাড়াও হল সাজানো , খাওয়াদাওয়া এবং রিটার্ন গিফট সব মিলিয়ে আরও বেশ অনেক টাকা যা তাদের চিন্তার মাঝে ফেলে দেয়। সে আর কি করা যাবে, পরের মাসগুলোয় একটু টেনেটুনে চালাতে হবে। ওদের সময় তো এত হ্যাপা ছিলনা, মা হয়তো একটু পায়েস করে দিল আর তার থেকে আরেকটু বেশী হলে একটু মাংস আনা হলো এবং অবশ্যই রবিবার দিন মাংস বাদ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছুই বদলায়। এখন বাচ্চারা পায়েস খাক বা না ই খাক, কেক কাটতেই হবে, বেলুন দিয়ে ঘর সাজাতেই হবে। উপরি আছে রিটার্ন গিফট। বাচ্চারা কেউ একা আসেনা, আসে তাদের মা বা বাবা কিংবা দুজনেই। সুতরাং সব কিছু মিলিয়ে একটা বড় ধাক্কা।
অ্যাসোসিয়েশনের হলটা বেলুন দিয়ে সাজানো হয়েছে। দাস ক্যাটারার এর লোকজন এসে নিচে পলিথিনের শিট দিয়ে রান্নার জায়গাটা ঘিরেছে এবং মাঝে মাঝেই বেশ সুন্দর গন্ধ ভেসে আসছে। সন্ধ্যার সময় ঝিমিয়ে থাকা হল বেশ ঝলমলে হয়ে উঠেছে, প্রাণ ফিরে পেয়েছে বাচ্চাদের কলরবে। আজকাল তো বাচ্চা চোখেই পড়েনা। আগে কত ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের কলতানে পার্কটা গমগম করতো আর এখন বাচ্চা একটু বড় হতেই নানাধরণের ক্লাসে তাদের ভর্তি করে দিয়ে শৈশবের দফারফা করে দেওয়া হয়। হয় আঁকা, নাহলে নাচ বা গানের ক্লাসে তাদের খেলাধূলার পরিসমাপ্তি। সেই কারণেই এত আনন্দ বাচ্চাদের আর আমরা যারা বুড়ো তারা ওদের চেঁচামেচিতে নিজেদের শৈশবের কথা ভাবছি। বেশ রাত অবধি বাচ্চাদের গুঞ্জনে মনটা বেশ হাল্কা হয়ে গেল। নিজের নাতি নাতনিদের কথা মনে পড়ে চোখটা একটু ছলছল করে উঠল আর অনেক অনেক ভালবাসা ও আশীর্বাদ তাদের উদ্দেশ্যে পাঠানো হলো।
পরদিন সকাল। হলটা আবার কেমন ম্রিয়মান। সাফসুতরো চলছে। গতকাল সন্ধ্যার ফুলে ওঠা বেলুনগুলোর জেল্লা যেন ফিকে হয়ে এসেছে, গুচ্ছে বাঁধা বেলুনগুলো বাইরে এদিকে ওদিকে হেসে খেলে বেড়াচ্ছে। রিক্সাভ্যানে তরকারি নিয়ে আসা বিক্রেতা দুটো গোছা নিজের ছেলেমেয়েদের জন্য নিল আর বাকি গোছাগুলো ম্লান দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল। কিন্তু সব্জিতে ভর্তি ভ্যান, বিক্রেতা অস্ফূট স্বরে বলে উঠল," ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই ছোট সে তরী, অতএব ক্ষমা করো মোরে নিজগুণে।" হাওয়ায় ভাসা উপেক্ষিত বেলুন গুলো মাঝেমধ্যেই ফুট ফাট আওয়াজ করে চুপসে যেতে লাগল আর তখনও ফুলে থাকা বেলুনের গায়ে লেজের মতন ঝুলতে থাকল। আহ্, কি হচ্ছেটা কি,ছাড়না মোর হাত কিন্তু ক্ষীণ স্বরে বলে উঠল চুপসে যাওয়া বেলুন, " আমি তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ, সুরের বাঁধনে , অতএব ভেসে চল ধরে মোর হাত।"