Saturday, 26 July 2025

মনসুখ ভাইয়ের রোজনামচা

আমেদাবাদ শহরে " বাসনা " অঞ্চলে মনসুখ ভাইয়ের আস্তানা। আস্তানা শব্দটা কানে এলেই মনে হয় একটা বাড়ি(গেট ওয়ালা বড় বাড়ি কিংবা নিদেন পক্ষে  একটা ছোট কুঁড়ে ঘর) কিন্তু মনসুখ ভাইয়ের আস্তানা খোঁজ করতে গিয়ে আমি রীতিমতো নাস্তানাবুদ হয়ে গেলাম।

যে গেস্টহাউসে ছিলাম তার বাইরে গেটের ধারে কোন সাতসকালে এসে ঠেলাগাড়ি নিয়ে এসে যেত মনসুখ ভাই, আর সকাল থেকেই তার খরিদ্দার আসতে শুরু করে দিত, কেউ নিত ইডলি বড়া আবার কেউ বা নিত ডাল বড়া ও কান্দা ভাজি( আমাদের পরিভাষায় পেঁয়াজি)। কিন্তু মোটামুটি বেলা বারোটা বাজতেই সেই ঠেলাগাড়ি সমেত মানুষটাই উধাও।  বেশ কিছুদিন হলো গেস্টহাউসেই আছি, ফ্ল্যাটের অ্যালটমেন্ট এখনও আসেনি, অফিস করতে হচ্ছে  সেই গেস্টহাউস থেকেই। সকালের জলখাবারটা মনসুখ ভাইয়ের কাছ থেকেই নিচ্ছি কারণ সেই একঘেয়ে ব্রেড, বাটার আর ওমলেট মুখে রুচছে না। কিন্তু মুশকিল হলো ওর কাছে সবসময়ই ভিড়, আমার কাছে টাকা ওর নেওয়া হয়ে ওঠেনা, বলে বাদ যে একসাথে লে লেঙ্গে, বরাবর(মানে ঠিক আছে)। একটু অস্বস্তি ই হয় কারণ আমার ফিরে আসার সময় সে তো থাকেনা।

এদিকে ফ্ল্যাটের অ্যালটমেন্ট এসে গেছে, আমাকে চলে যেতে হবে। ফিরে এসে দেখি মনসুখ ভাই নেই। গেস্টহাউসের কেয়ারটেকারের কাছে দিতে গেলাম কিন্তু কেন জানি না ও নিল না, সম্ভবত ওর ব্যবসার লাভে ভাগ বসিয়েছে বলে। মনটা খচখচ করছে গরীব মানুষের পয়সা না দিতে পারার জন্য। যাই হোক রবিবার ঠিক করলাম আজ যে ভাবেই হোক ওর পয়সা মেটাবোই। কিন্তু সকালে উঠতে দেরি হওয়ায় এবং শহরের অন্য প্রান্ত থেকে আসতে দেরি হয়ে গেল এবং যথারীতি ও ভাগলবা। কিন্তু আমি ওকে আজ যেভাবেই হোক পয়সা দিয়ে যাব ই ঠিক করেছি। আশেপাশের লোককে জিজ্ঞেস করে তিনটে মোড় পেরিয়ে পেলাম দেখা তার বাড়ি। কিন্তু ততক্ষণে অনেক সময় গড়িয়ে গেছে। খিদেতে পেট চোঁ চোঁ করছে কারণ বিভিন্ন লোকের বিভিন্ন রকম দিক নির্দেশন যার ফলে আমার আজ হাঁড়ির হাল।
 মোড়ের কাছে একটা পার্ক আর তার কাছেই এক জৈন মন্দির। মন্দিরের লাগোয়া একটা দেয়ালে রয়েছে মনসুখ ভাইয়ের সেই গাড়ি। চারটে ইট দিয়ে আটকানো আছে গাড়ির চাকা আর একটা শিকল দিয়ে একটা চাকা বাঁধা আছে দেয়ালের রেলিং এর সঙ্গে যাতে গাড়িটা বেসামাল হয়ে অন্য জায়গায় না চলে যায়। গ্যাসের স্টোভ, কড়াই গাড়ির পেটের তলে একটা বাক্সে চলে গেছে যেটা এখন তালা বন্ধ এবং ওপরের পাটাতনে যেখান থেকে অন্য সময় বিক্রি পাট্টা করে সেখানে একটা চটের উপর চাদর বিছিয়ে পরমানন্দে মনসুখ ভাই ঘুমিয়ে আছে। ঘুম ভাঙাতে একটু মনটা খারাপ ই লাগছিল কিন্তু আমাকে আবার ফিরে আসতে হবে ভেবে ডেকেই ফেললাম। সারাদিন এত পরিশ্রম করে যে কয়েকবার ডাকার পর তার ঘুম ভাঙলো এবং চোখ কচলাতে কচলাতে বলল, " সাব, আপ!" ম্যায় আপকো পাস যো বহুত কর্জ হ্যায়, উয়ো চুকানে কে লিয়ে আয়া হুঁ।" এতনা তকলিফ কিঁউ উঠায়া সাব? আপ থোড়ি ভাগনে বালা আদমী হ্যায়? একটু অবাক হয়ে গেলাম ওর আমার উপর ভরসা করা দেখে। সাধারণত কেউ ধারে কোন জিনিস দিতে চায়না আর দিলেও পয়সা ফেরত পাওয়া এক ভাগ্যের ব্যাপার কিন্তু যে লোকটার এই গাড়িটাই সম্বল, এটাই ওর কর্মস্থল এবং ঘর সেই লোকটা কেবল বিশ্বাসের উপর ভরসা করে এত টাকা বাকি থাকা সত্ত্বেও এত নিশ্চিন্তে কি করে ঘুমায়? আসলে যাদের অনেক সম্পদ তারা সামলাতেই ব্যস্ত আর যারা ভগবানের উপর ভরসা করে সামান্য পূঁজি নিয়ে সৎপথে এগিয়ে চলে তারাই বোধহয় এত নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে। জিজ্ঞেস করলাম যে বারিশ কা মৌসমমে ক্যায়সে রহতে হ্যায় ইঁহা?  ও দেখালো প্লাস্টিকের চাদর। এই দিয়ে বৃষ্টির সঙ্গে যুদ্ধ করে। এইরকম মনসুখ ভাই সারা দেশে আনাচে কানাচে ছড়িয়ে আছে এবং যথেষ্ট সততার সঙ্গে বেঁচে আছে আর অন্যদিকে প্রচুর সম্পদের মালিক তারা কত অসদুপায়ে টাকা রোজগারের ফন্দিফিকির খুঁজছে। এরাই  চিরদিন বলীয়ান আর মনসুখ ভাইদের সততার পুণ্যে এই অসৎ লোকগুলো মাথার উপর বসে রাজত্ব করে চলেছে।
মনসুখ ভাই আপনারা বেঁচে থাকুন অনেকদিন। ভগবান আপনাদের মঙ্গল করুন।

No comments:

Post a Comment