কি চাই বল্? তোদের জন্য ঝুলনযাত্রা এনেছি এখন, খুশী কি না বল্। সত্যিই তো, ঝুলনযাত্রা এমনই এক অনুষ্ঠান যা সমগ্র উত্তর, পশ্চিম এবং পূর্ব ভারতে মহা সমারোহে পালিত হয়। হোলি এবং জন্মাষ্টমীর পরেই এই গুরুত্বপূর্ণ উৎসব যা হিন্দুরা অত্যন্ত ধূমধাম করে পালন করেন। রাধা এবং কৃষ্ণকে নিয়ে বহু চর্চিত প্রেমগাথা এই উৎসবের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়। ঝুলনযাত্রা মানে কোনসময় রাধা দোলনায় বসে আছেন এবং শ্যামসুন্দর তাঁকে দোলা দিচ্ছেন এবং মাঝে এত জোরে তিনি দোলা দিতে থাকলেন যে শ্রীরাধা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লেন এবং হে মাধব আমায় রক্ষা করো এবং সেই সুযোগে শ্যামসুন্দর তাঁর পাশে দোলনায় বসে পড়লেন এবং শ্রীরাধার সখীরা খিলখিলিয়ে হেসে উঠলেন। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে শ্রীরাধা এবং শ্রীমাধব পরস্পর উল্টোদিকে দোলায় দুলছেন এবং সখীরা তাঁদের সেবা করছেন। প্রায় ষাট বছর আগে ইসকন ( ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর কৃষ্ণ কনসাসনেস) মানে উনিশশো বাহাত্তর সালে তাঁদের মন্দির বা অফিস রাসবিহারী মোড়ে প্রতাপাদিত্য রোডের সন্নিকটে খোলে এবং পরবর্তীকালে স্থান সঙ্কুলান না হওয়ায় থিয়েটার রোডে তাদের মন্দির স্থাপন করে। ধীরে ধীরে এর কলেবর বৃদ্ধির কারণে বিভিন্ন জায়গায় এঁদের সম্প্রসারণ হয় এবং বর্তমানে কলকাতা থেকে একশ চল্লিশ কিলোমিটার দূরে মায়াপুরে সর্ববৃহৎ মন্দির স্থাপন করেন এবং এটাই এঁদের হেড অফিস। যাই হোক, এবার ফিরে আসা যাক ঝুলনযাত্রায়।
প্রচন্ড গরমের পরে বৃষ্টি আসায় সবাই খানিকটা হাঁফ ছেড়ে বাঁচে।শুকিয়ে যাওয়া গাছপালা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আবার সবুজ পাতায় সেজে ওঠে আর এর মধ্যেই শ্রাবণ পূর্ণিমার স্নিগ্ধ আলোকে শুরু হয় ঝুলনোৎসব। শৈশবের সেই ঝলমলে দিনগুলো চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে ওঠে। শেখর, মলয়, প্রকাশ এবং আমার কাজ ছিল পাড়ার যত ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে শহরের অলিতে গলিতে দু পা অন্তর বাড়িতে বাড়িতে বিভিন্ন রকমের পুতুল দিয়ে সাজানো ঝুলন দেখানো। ঘাসের চাপড়া দিয়ে তৈরী হতো পাহাড়, তার মধ্যেই করা হতো কুলু কুলু বয়ে যাওয়া ঝর্ণা। অদূরে শহরের রাস্তা এবং চলছে রিক্সা , চলছে গাড়ি এবং রাস্তার মোড়ে ট্রাফিক পুলিশ। একটু দূরে করা হতো বাজার, নানারকম তরি তরকারি নিয়ে বসতো বুড়ি মা এবং ক্রেতা হিসেবে থাকতো কিছু লোকজন। আমরা যদি আজে বাজে দাম বলতাম তাহলে সূত্রে বাঁধা বুড়ির মাথা নাড়িয়ে দেওয়া হতো যার অর্থ না ঐদামে সে বিক্রি করবেনা। পাহাড়ের মাঝখানে থাকতো একটা দোলনা যেখানে শ্রীরাধা ও শ্রীকৃষ্ণ বসে থাকতেন এবং দোল খেতেন। কোন একটা বাড়িতে সবরকমের পুতুল না থাকায় বিভিন্ন বাড়ি থেকে এইসমস্ত পুতুল সংগ্রহ করা হতো এবং ঝুলন শেষে ঐ পুতুলগুলো আবার ফিরিয়ে দেওয়া হতো। তুতু, জলু, টিঙ্কু, রিঙ্কু, ইতি, গজু,ঝকান এবং আরও অনেক ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের ঝুলনোৎসব দেখিয়ে আনা আমাদের কাজ ছিল। তখন বাড়িতে বাড়িতে টিভির আক্রমণ ছিলনা আর সেই কারণেই খেলাধূলো ছেড়ে দিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা চোখ সাঁটিয়ে বসে থাকা ছিলনা, ছিল ক্লাবে যাওয়া, ড্রিল করা,মেয়েদের খো খো খেলা বা যোগাসন করা এবং রাস্তার আলো জ্বলে ওঠার আগেই বাড়ি ফিরে হাতমুখ ধুয়ে পড়তে বসা এবং রাত নটার আগে খেয়েদেয়ে ঘুম। আবার সকালে উঠে পড়তে বসা এবং স্কুলে যাওয়া এবং স্কুল থেকে ফিরেই কিছু খেয়ে ক্লাবে যাওয়া। এই ছিল দৈনন্দিন রুটিন এবং মাঝে মাঝেই এইধরণের পূজো, অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে এক বিশেষ আনন্দ পাওয়া।
সময়ের পরিবর্তনে সবকিছুই পরিবর্তন হয়েছে। পড়াশোনার ধাঁচ পাল্টেছে, জীবন যাত্রায় এসেছে বহুল পরিবর্তন কিন্তু এরই মধ্যে সেই অনাবিল আনন্দ যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। চাকা তো আর উল্টোদিকে ঘুরবে না, সুতরাং পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে এবং যারা পারবে না তারা পিছনে পড়ে থাকবে। জানিনা এখন কটা বাচ্চা ছেলেমেয়েরা ঝুলনোৎসব পালন করে এবং আনন্দ উপভোগ করে।
Khub bhalo Sabuj da. Purono dingulo bhule ekhon natuner sathei amra এগিয়ে jacchi.
ReplyDelete