Thursday, 11 November 2021

গানের আসর

গানের আসর বিভিন্ন ধরনের হয়। কোথাও  ক্ল্যাসিকাল, কোথাও  রবীন্দ্র সঙ্গীত,  কোথাও আধুনিক  আবার কোথাও  বা পাঁচমিশেলি। আসরের  শ্রোতাও সেখানে ভিন্ন, ভিন্ন  তাদের  স্বাদ যার প্রতিফলন  হয় তাদের  পোশাক আশাকে। উচ্চমার্গের  ক্ল্যাসিকাল গানের আসরে খুঁজে পাওয়া যায় ধুতি পাঞ্জাবি পরিহিত ভদ্রলোকের, চোখে তাদের  চশমা যেটা প্রায় নাকে নেমে এসেছে কিন্তু অত্যন্ত  দক্ষতার সঙ্গে সেটা ম্যানেজ করছেন যাতে না পড়ে যায়। শীতের  সময়েই  সাধারণত এই অনুষ্ঠানগুলো হয় এবং শালটা  কাঁধের  উপর ফেলে একটু শিল্পী বা সাহিত্যিক টাইপের আঁতেল মার্কা ভাব করে অনুষ্ঠানে আসেন এবং কথা যেখানে না বললেই  নয় সেখানে বলেন এবং  বেশিরভাগ  সময়েই  মাথা নেড়ে সম্মতিসূচক  ঘাড় নাড়েন এবং মাঝে মধ্যেই  হুম  বলে একটা আওয়াজ  বেরোয়। আর ঠিক  পছন্দ  না হলে ঠোঁটটা একটু সামান্য বিস্তার করেই আবার  যথাস্থানে  ফিরে যায়। অনুষ্ঠান  শুরু হতেই এঁদের  মাথা নাড়ার জন্য এবং বাহ বাহ আওয়াজে শিল্পীর মনঃসংযোগে কখনও  বাধা সৃষ্টি হয় এবং শিল্পীর বিরক্তিকর  দৃষ্টি তাঁদের  উপর প্রতিফলিত  হয়।
মহিলাদের শাড়ি ও গয়নার প্রতিযোগিতা এই অনুষ্ঠানের মধ্যে দেখা যায়। আর দেখা যায় মেক আপের প্রতিযোগিতা। ভাল  অনুষ্ঠান  দেখব না এদের  দেখব এই নিয়ে রীতিমত  ধন্দে পড়ে যেতে হয়। দামী শাল কিন্তু শীত নিবারণ করার  বদলে গয়নাগাঁটির  প্রদর্শনে সহায়তা করে। যাই হোক,  এটা এলিট সমাজের অনুষ্ঠান  এবং এঁরা যতটা সম্ভব  সামনের  সারির  টিকিট  সংগ্রহ  করেন  এবং যতটা গান বোঝেন তার থেকে বেশী  বোঝার  ভান  করেন। দেখা যায় যাঁরা ছোটখাট  শিল্পী বা সত্যিই  শিল্পানুরাগী  তাঁরা আপাদমস্তক  চাদর বা শালে মুড়ে সবচেয়ে কম দামের  টিকিটে একদম পিছনের  সারিতে বসে সুরজালের মায়ায়  বুঁদ  হয়ে রয়েছেন। এতো গেল ক্ল্যাসিকাল গানের আসর।  এবার  আসা যাক, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের  অনুষ্ঠান। বিশ্বভারতীর কপিরাইট  শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন শিল্পীদের রবীন্দ্র সঙ্গীতের পরিবেশন যেন অবাধ স্বাধীনতা পেয়ে গেছে। যে যেমন ইচ্ছা গেয়ে চলেছে, কারও  কিছু বলার  নেই।  এঁদের  মধ্যে অনেকেই  হয়তো বেশ  নাম করে ফেলেছেন  এবং স্বঘোষিত  অথরিটির  তকমা লাগিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু অতীতের প্রথিতযশা শিল্পীদের  গাওয়া গানের  সঙ্গে এদের আকাশ পাতাল তফাত। হয়তো আমাদের  সকলের  মনে আছে যে দেবব্রত বিশ্বাসের  মতন শিল্পীর  গাওয়া গানও বিশ্বভারতী মিউজিক  বোর্ডের  অনুমোদন  না পাওয়ায় রেকর্ড  হিসেবে বেরোয়নি। এই নিয়ে শিল্পীর  মনঃকষ্টের  কোন শেষ  ছিলনা। তাহলে আজ যাঁরা পয়সা দিয়ে রেকর্ড  করছেন তাঁদের  কি অবস্থা হতো ভাবতেই  ভয় লাগে। সুতরাং, যাঁরা সুবিনয় রায়, সুচিত্রা মিত্র  বা কণিকা বন্দোপাধ্যায়ের  গান শুনেছেন  তাঁরা চট করে এমুখো হবেন  না। কিন্তু এখনও  কিছু শিল্পী আছেন যাঁরা ঐ প্রবাদপ্রতিম শিল্পীদের যোগ্য উত্তরসূরী হিসাবে বিশুদ্ধ ভাবেই  গাইছেন এবং যোগ্য  সম্মান পাচ্ছেন। 
এবার  আসা যাক, পাঁচমিশেলি ঝকমক রামা হো টাইপের  গানের  আসরে। যেমন শিল্পী তেমনই  শ্রোতা। টাইট জিনস,  অন্ধকারেও সান গ্লাস পরা, সাধারণ  লোক পরলে যখন তখন  হোঁচট খেয়ে মরবে। বড় বড় ড্রাম, হাতে লাঠি সোঁটা( ড্রাম বাজানোর  কাঠি) , হাতে নানান ধরণের গিটার,  শিল্পীদের  মাথায়  বাঁধা চকরা বকরা রুমাল, দেখলেই গা টা কেমন ঘুলিয়ে ওঠে। শ্রোতাদের চেহারা এবং বেশবাস ও প্রায় একই রকম। প্রায় ষোল সতের  বছর আগে বান্দ্রায়  অনেক রাতে একগুচ্ছ আধুনিকা কে ছেঁড়া, ফাটা জিনসের প্যান্ট পরতে দেখে নিজের  চোখকেই  বিশ্বাস  করতে পারিনি। কিন্তু এখন  তো দেখছি এগুলো আকছার। শিল্পীর  গলায় নেই কোন সুর যা ঢাকা পড়ে যায় বাজনার  গগনভেদী  আওয়াজে। সুতরাং, মান বাঁচিয়ে পাশ কাটানোই  ভাল। 

এবার  আসা যাক, এক বিচিত্র  গানের  আসরে। যাঁরা খুব ভোরে ওঠেন তাঁরা নিশ্চয়ই  এই গানের  সঙ্গে পরিচিত  হয়েছেন। ভোরের  আলো ফুটতে না ফুটতেই শুরু হয়ে যায়  এই কলতান। টিয়া , বুলবুল, পায়রা, কাক,শালিক, চড়াই,  ঘুঘু ,কোকিল, কাঠঠোকরার  তির তির তির তির তির তির ডাক এবং মাঝে মাঝেই  বসন্ত বাউরির টুই টুই রব মনকে ভীষণ  পবিত্র  করে তোলে। শ্রোতা  কে আছে না আছে তার  বিন্দুমাত্র  তোয়াক্কা না করে নিজেদের  মনে আপন খেয়ালে গেয়ে চলে নতুন দিনের  আগমনবার্তা। এই আসরের  কিন্তু কোন  তুলনা নেই । সবাই  নিজেদের  সাধ্য মতো  গেয়ে চলেছে, কোথাও কোন সমালোচক  নেই, আছে শুধু সঙ্গীত  এবং এ এক অপূর্ব  বিচিত্রানুষ্ঠান।

Sunday, 7 November 2021

আত্মীয়

আত্মীয় শব্দটা শুনলেই মনে হয় যেন কোন রক্তের সম্পর্ক  আছে কিন্তু ঘটনাচক্রে শব্দটা একটু গোলমেলে। প্রায়শই  দেখা যায় যেখানে কোন  রক্তের  সম্পর্ক ই নেই সেখানেই  প্রগাঢ় বন্ধুত্ব এবং রক্তের  সম্পর্কে একদম লাঠালাঠি ব্যাপার। কিন্তু এরকম  উলট পুরান কেন? আসলে আত্মীয় মানে যেখানে আত্মার  সম্পর্ক  আছে বা যোগ আছে এবং সেখানে রক্তের সম্পর্ক  থাকতেও পারে নাও পারে। অনেক ঘটনা মনে আসে এ সম্বন্ধে আলোচনা করতে গেলে কিন্তু কিছু কিছু ঘটনার  কথা বললেই এই শব্দের  তাৎপর্য বোঝা যাবে।

আমেদাবাদে ওসমানপুরায় গুজরাট বিদ্যাপীঠের পাশের  গলির ডালবড়া অত্যন্ত বিখ্যাত। ভাল করে ফাঁটানো ডালের  বড়া লেবুর রসে জারিত পেঁয়াজ কুচি এবং গরম তেলের  কড়াইয়ে  একবার  ছেড়ে দিয়েই উঠিয়ে নেওয়া আধভাজা কাঁচালঙ্কার  যে কি অপূর্ব  স্বাদ সেটা যে না খেয়েছে সে কিছুতেই  বুঝতে পারবে না। অনুজের  এটা ছিল  খুবই  পছন্দের  খাবার  এবং বহুদিন  অফিসের  পরে রান্না করে খেতে ইচ্ছে না হলে বেশ খানিকটা  ডালবড়া  খেয়েই উদরপূর্তি করতো। পাশেই ছিল  তুকারামজীর সাইকেল ভ্যানে লাগানো দোকান যেখানে ভাত, ডাল, তরকারি পাওয়া যেত। মাঝে মাঝে অনুজ তুকারামজীর  দোকানের খদ্দেরও   হয়ে যেত। ডালবড়ার দোকান এবং তুকারামজীর দোকানের  সামনে সারি সারি বেঞ্চ পাতা থাকত যেখানে বসে খরিদ্দাররা  বসে খেতে পারতো। বেঞ্চগুলোর সামনে পাতা থাকতো টুল যেখানে  লোকে খাবার রাখত। অফিসের  খুব কাছেই তার বাড়ি এবং দোকান গুলো থাকার জন্য খুব  বেশি সময় যেতনা খাবার  সংগ্রহের জন্য। ডালবড়াই হোক আর তুকারামজীর  দোকানের রুটি তরকারিই হোক একটা দৃশ্য  অনুজের  নজর এড়ায় না। একটা অন্ধ লোককে রোজ তুকারামজীর  দোকানের  সামনে বসে থাকতে দেখত। কৌতূহলবশত একদিন জিজ্ঞেস  করে ফেলল তুকারামজী এই লোকটিকে রোজ দোকানের  সামনে বসে থাকতে দেখি, কি ব্যাপার? জবাবে সে জানালো যে ওর নাম জিতুভাই এবং ও সারাদিন  ভিক্ষা করে রাত্রিবেলায় ও এখানে আসে খাবার  খেতে। অনুজ একটু আগ্রহ  দেখিয়ে আরও  জিজ্ঞেস  করল ওর খেতে  কত টাকা লাগে এবং তার উত্তরে সে জানালো যে দশ টাকা কিন্তু ও জিতুভাইয়ের  কাছে কোন  পয়সা নেয়না। আশ্চর্য ব্যাপার,  রাস্তার  ফুটপাথের ধারে চালানো এক দোকানের  মালিক  এই গরীব  অন্ধ মানুষটিকে অন্তত  একবেলা পেটভরে খাবার  জোগায় অথচ এত পয়সাওয়ালা লোক চারিদিকে এত বাজে পয়সা খরচ করে কিন্তু কাউকে কিছু দিতে গেলেই এদের  প্রাণ বেরিয়ে যায়। 

অনুজের  বদলির  অর্ডার  এসে গেছে কারণ তার এখানে থাকার  মেয়াদ  শেষ। রিলিভারকে চার্জ বুঝিয়ে দিতে আরও  তিন চার দিন  লাগবে। তুকারামজী, একটা কথা বলব আপনাকে? বলুন স্যার।  তুকারামজী, আপনি তো জিতুভাইকে রোজই খাওয়ান,  আমাকে একটু ওর সেবা করতে দেবেন? তুকারাম তো একটু অবাক হয়ে গেল, বলল আপনি কেন দেবেন? অনুজ  জানালো যে ওর বদলি  হয়ে গেছে এবং সে একহাজার  টাকা দিতে চায় জিতুভাইয়ের  খাবারের  জন্য। তুকারামজী একটু অস্বস্তিতে পড়ে গেল কিন্তু অনুজ তার হাতে জোর করে টাকাটা গুঁজে দিল। জিতুভাইয়ের  সঙ্গে না তুকারাম না অনুজ কারো কোন  রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও কোথাও  যেন  একটা যোগ  রয়েছে যার নাম আত্মীয়তা। 
 

Saturday, 6 November 2021

ভাই ফোঁটা

আজ ভাই ফোঁটা, কালী পূজোর  পর দ্বিতীয় দিন।  কেউ  কেউ  বলেন  ভাই  দ্বিতীয়া। কোন কোন  রাজ্যে একে বলে ভাই  দুজ। যে নামেই  বলা হোক না কেন এই বিশেষ অনুষ্ঠানে ভাইদের  একেবারে পোয়াবারো। দূর দূরান্ত থেকে ভাইরা আসতেন বোন  বা দিদির কাছে ফোঁটা নিতে। যে সমস্ত  ভাইরা ছিল ভোজন রসিক এবং উদরের অন্তস্থলের পরিধি ছিল বিশাল,  এই বিশেষ  দিনে বোনেরা সাধ্য মতন যোগাড়যন্ত্র করত ভাইদের  উদরের  পরিতৃপ্তির জন্য। বিশাল চেহারার মালিক হলেই যে সে খুব  খেতে পারবে, এমন নয়। কিন্তু অনেক রোগা পাতলা লোক যাদের কুকুরের পেট বলত তাদের  খাওয়া দেখলে লোকে তাজ্জব  হয়ে যেত। বোনদের ভাগ্যেও  যে কিছু জুটত না তা নয় । যদি ভাইয়েরা একটু সুপ্রতিষ্ঠিত  হতো তাহলে তো কথাই নেই। সৈনিক  ভাইরা এই অনুষ্ঠানকে  অত্যন্ত  মর্যাদা দেয় এবং বহু সিনেমায় দেখা গেলেও  এটা সত্যি যে ওরা অনেক কষ্ট করেও বোনের  কাছে ফোঁটা নিতে আসে। বোনেরা, ভাইয়ের কপালে দিলাম  ফোঁটা , যমের দুয়ারে  পড়ল কাঁটা এই কথাগুলো বলে সত্যিই  যমের  দরজা আটকাতে পারে কি না জানিনা কিন্তু প্রার্থনার  তো একটা জোর আছে আর এই প্রার্থনা শুনতেই  তো এত দূর থেকে ছুটে আসা। যে কোন মূহুর্তে শত্রুর  বা আতঙ্কবাদীর ছুটে আসা বুলেটে সচল দেহটা  নিশ্চল হয়ে যেতে পারে যেটা আমাদের মতন সাধারণ নাগরিকদের  সম্ভাবনা খুবই  কম। সুতরাং আমাদের মতন স্বার্থপর আত্মসুখী  লোকেরা এক ভালোমন্দ  খাওয়া ছাড়া আর কিছুই  ভাবতে পারিনা। বোনদের ভাগ্যে জোটে হয় কিছু টাকা না হয় একটা শাড়ি, হালফিলে একটা মোবাইল  কিংবা ট্যাবলেট অবশ্য  বোন যদি আধুনিকা  হয়। সাহিত্যের  প্রতি আকর্ষণ  থাকলে ভাল লেখকের  বই ও জোটে।একটা কথা  কিন্তু আমাকে বেশ বিব্রত করে। ভাইয়ের  কপালে দিলাম ফোঁটা, যমের  দুয়ারে পড়ল  কাঁটার পরের দুটো লাইন  সম্বন্ধে আমার  সংশয় কিছুতেই যায়না।যমুনা দেয় যমকে ফোঁটা, আমি দিই আমার  ভাইকে ফোঁটা । যমুনা যমকে বাঁচাতে কার দুয়ারে কাঁটা দেয়? তার মানে যমকে চমকানোর জন্য  আরও  বড় কেউ  আছে? প্রশ্নের  উত্তর  খুঁজেই  চলেছি, উত্তর  এখনও  অধরা।

এবার  যাওয়া যাক আগের  দিনের  ভাই ফোঁটায়  তারপর আসা যাবে এখনকার  ভাইফোঁটায়। আগে তো প্রত্যেক সংসারেই পাঁচ সাতজন  ছেলেমেয়ে ছিল এবং আশেপাশে মাসিমা বা পিসিমারা থাকতেন এবং তাঁদের  সংসারেও ভাইবোনের সংখ্যাও  ঐ একই রকম ছিল। সুতরাং ভাই ফোঁটা মানেই একবিরাট উৎসবমুখর দিন। লম্বা বারান্দায় আসন পেতে নিজের ভাইয়েরা, পিসতুতো মাসতুতো ভাইয়েরা একসঙ্গে বসে ফোঁটার  অপেক্ষায় বসে থাকা এবং দিদিদের সিনিয়রিটি হিসেবে ফোঁটা দেওয়া এবং সবার  ফোঁটা শেষ হলে সমস্ত দিদি বোনেরা হাত লাগিয়ে এক একজনের  প্লেট ধরে ভাইদের  হাতে তুলে দেওয়া। দিদি, বোনদের  সংখ্যা বেশি হলে সবার  হাত একটা প্লেটে লাগানো সম্ভব  না হলে বলা হতো অন্তত গায়ে হাত লাগিয়ে রাখ। বসে বসে কিন্তু আড়চোখে  কোন প্লেটে বেশি পড়েছে বা কোন  প্লেটে কম এটা দেখা চলতো এবং মনে মনে যিনি দিয়েছেন তার মুন্ডপাত করা। কিন্তু এ সত্ত্বেও একটা বিপুল  আনন্দ উপভোগ  করা যেত।  যে ভাইরা দূরে থাকার জন্য  ফোঁটা নিতে আসতে পারেনি তার মঙ্গল  কামনা করতে দরজার  চৌকাঠে ফোঁটা দিত। ফোঁটা শেষ হতে হতে মেয়েদের  জলখাবারের পালা এবং সেটাও  মিটতে মিটতে বেলা গড়িয়ে যেত। এরপর দুপুরের খাওয়া এবং সেই  পর্ব শেষ  হতে প্রায়  চা খাওয়ার  সময়। কিন্তু এত কষ্ট সত্ত্বেও  সব দিদিদের  বা মা বোনদের  মুখের  হাসিটা মিলাতো না। তবে কতটা জোর করে হাসি বা কতটা স্বতঃস্ফূর্ত  সেটা তখনই বোঝা যেত না। বোঝা যেত যখন  মা বলতো একটু পা টা টিপে দেওয়ার  জন্য।  গৃহকর্তা কতটা চাপের  মধ্যে থাকতেন সেটা তাঁর গম্ভীর মুখের অভিব্যক্তি থেকে বুঝতে হতো। তবুও  তিনি এই উৎসবের আনন্দের  অন্তরায়  হতেন না। আজ আমরা যখন  ঐ জায়গায় এসেছি তখন সেদিনের  গৃহকর্তার গম্ভীর মুখের  কারণ  বুঝতে পারি।

এখন প্রত্যেক  পরিবারেই ছেলেমেয়েদের  সংখ্যা হয় এক বা বড় জোর দুই। যদি দুজনই ছেলে বা দুজনই মেয়ে হয় তাহলে এই উৎসবের  আনন্দ উপভোগ  করার জন্য  মাসতুতো বা পিসতুতো  ভাই বোনদের  সাহায্য  নিতে হয়। আর কাছাকাছি কেউ না থাকলে কমপ্লেক্সের  ভাই  বোনদের সাহায্য  নিয়ে উৎসবের  আনন্দ  উপভোগ করতে হয়। আগে পায়েস  যেমন ভাইফোঁটার  বা জন্মদিনের  এক বিশেষ  অঙ্গ  ছিল এখন সেই জায়গায় এসে গেছে কেক। আনন্দ  এখন কতটা  ফিকে হয়ে গেছে সেটা যারা দুটো অবস্থারই সাক্ষী তারা বুঝতে পারে, অন্যরা নয়। 

আজ জীবন  সায়াহ্নে পৌঁছে যখন মূল্যায়ন  করতে যাই তখন  ভাবতে চেষ্টা করি যে কোন  অবস্থাটা ভাল  ছিল।  দুই অবস্থারই  কিছু  সদর্থক এবং নঞর্থক  দিক আছে কিন্তু একটা কথা স্বীকার  করতেই  হবে যে কিছু পেতে গেলে কিছু ত্যাগ স্বীকার করতেই  হয়। গতবছর  যা ছিল  এবছরে তা  নেই। গতবছর  এইদিনে  আমার  বড়দি করোনার জন্য  ফোঁটা দিতে না পারলেও দরজার চৌকাঠে ফোঁটা দিয়ে আশীর্বাদ  জানালো আর তার  কিছুদিন  পরেই তিনি করোনাক্রান্ত হয়ে আমাদের  ছেড়ে চলে গেল। তার আগের বছর  চলে গেলেন  আমার অত্যন্ত  শ্রদ্ধেয় রামাইয়া  সাহেব।  জানিনা পরের বছর  আবার সবাইকে পাব কিনা।


Thursday, 4 November 2021

কবি

ছন্দোময় জীবনে  প্রবেশ  করিনি আমি
ডানা নাই মোর আকাশে উড়িনা আমি
কবি পরিচিতির যোগ্য  নই যে আমি
অতি সাধারণ মানুষের মতো আমি।