এরপর অনেকদিন কেটে গেছে। দাদার সঙ্গে বিবেকানন্দ ব্যায়াম সমিতি ক্লাবে গিয়েছি। ওখানে একটা সুন্দর বক্সিং রিং ছিল। শহরে দুটো রিং ছিল, একটা এখানে আরও একটা ছিল গোরাবাজারের শক্তিমন্দিরে। কিন্তু এখানে ছিল বিরাট জায়গা এবং শহরের মাঝখানে। সেইকারণে এখানে ভিড় হতো অনেক বেশী। হাঁ করে দেখছি দুজন হাতে গ্লাভস পরে বক্সিং লড়ছে আর রেফারি হিসেবে রয়েছেন দুলুদা। পরে শুনেছিলাম দুলুদা বেঙ্গল চ্যাম্পিয়ন বক্সার ছিলেন। আরও অনেককেই দেখেছি বক্সিং লড়তে যাদের মধ্যে চঞ্চল দা, রবি দা, শক্তি দা , দোদা দা, মোহন দা, বীরেন দা, দিলীপ দা,অভয় দারা ছিলেন এবং প্রত্যেকেই খুব ভাল বক্সার ছিলেন। বীরেন দা, দিলীপ দা খুবই ভাল ছাত্র ছিলেন এবং দুজনেই ফিজিক্সের অধ্যাপক ছিলেন। বীরেন দা রানাঘাট কলেজের হেড অফ দি ডিপার্টমেন্ট ছিলেন এবং দিলীপ দা বহরমপুর গার্লস কলেজে পড়াতেন। ঐ ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা প্রণব দা( পিনু দা) পরে পণ্ডিচেরি চলে যান এবং অরবিন্দ আশ্রমে শরীর চর্চার অধ্যক্ষ ছিলেন। পরে তিনি তাঁর জমানো টাকার একটা বিরাট অংশ এই ক্লাবকে দান করেন। বক্সিং রিংয়ের দিকে হাঁ করে চেয়ে দেখতাম যে দুজনেই কেমন ডান হাত, বাঁহাত একসঙ্গে চালিয়ে লড়ছে। তখন ভাবতাম এরাও তো তাহলে সব্যসাচী।
বক্সিং এর প্রতি আমার একটা আলাদাই আকর্ষণ ছিল। নিজেও লড়তাম এবং শেখাতাম ও বাচ্চাদের। দীর্ঘদিন বক্সিং কম্পিটিশন বন্ধ ছিল। ক্লাবের প্রধান কর্ণধার দুলুদা বললেন যে এবার কিন্তু বক্সিং কম্পিটিশনটা চালু করতেই হবে। সবচেয়ে উপভোগ্য হবে মলয় এবং দিলীপের লড়াই এবং তারপরেই হবে জয়দেব এবং শ্যামলের লড়াই। সব মনে মনে ছকে নেওয়া হচ্ছে কে কার সঙ্গে লড়বে এবং কাকে কি দায়িত্ব দেওয়া হবে। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, ভগবান করেন আর এক এবং তাঁর কথাই শেষ কথা। পরের দিন শো , সব কিছুই ঠিক ঠাক চলছে, হঠাৎ বাড়ি থেকে খবর এল আগামীকাল শিলিগুড়িতে জরুরী কাজে যেতেই হবে এবং এগারোটার মধ্যেই পৌঁছাতে হবে।সুতরাং ঐদিন রাতেই কামরূপ এক্সপ্রেস রাধারঘাট থেকে ধরতেই হবে। রাতে কামরার দরজা কেউ খুলতেই চায়না, ভাবে বোধহয় ডাকাত উঠছে। যাই হোক, অনেক অনুনয় বিনয় করার পর কেউ একজন খুলে দিলেন। গিজগিজ করছে ভিড়, তিলধারনের স্থান নেই। কাঁধে একটা ছোট ব্যাগ, কোনরকমে একটা বই বের করে ইন্টারভিউ এর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। পা টনটন করছে, যখন একদম পারছি না তখন যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি, ঐ জায়গাতেই সোজা হয়ে বসছি আবার উঠে পড়ছি। এক ভদ্রলোক তখন একটু দয়াপরবশ হয়ে অন্যদের চেপে আমাকে একটু বসার জায়গা করে দিলেন। ঐ ভাবেই সকালে নিউ জলপাইগুড়ি পৌঁছে বাসে শিলিগুড়ি পৌঁছলাম এবং একজন পরিচিতের বাড়ি গিয়ে স্নান করে বেরিয়ে পড়লাম গন্তব্যস্থলে। সব কিছু সেরে ফিরতে ফিরতে বিকেল গড়িয়ে গেল এবং শিলিগুড়ির আশ্রম রোডে সেই পরিচিতের বাড়ি খাওয়া দাওয়ার পর আবার ফেরার পালা। কিন্তু আমার ভাগ্য ই খারাপ ছিল, ট্রেন লেট করায় বক্সিং কম্পিটিশনের দ্বিতীয় এবং শেষ দিনেও এসে পৌঁছতে পারলাম না আর, আরও একবার সব্যসাচী হওয়া হয়ে উঠলনা। দ্বিতীয় দিনে ঠিক সময়ে না পৌঁছানোর জন্য আমার সঙ্গে যার লড়ার কথা ছিল তাকে ওয়াক ওভার দেওয়া হলো আর শুনে মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল।
এরপর কর্মসূত্রে বিভিন্ন জায়গায় ঘোরা শুরু হলো। কোন জায়গায় বেশীদিন থাকতে ইচ্ছে করেনা। বিভিন্ন জায়গায় যাব, সেখানকার লোকদের সঙ্গে মিশব এবং তাদের সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হয়ে নিজেকে একটু বেশীরকম অভিজ্ঞ করব এটাই ছিল মনোগত বাসনা। তিনবছরের মেয়াদ ফুরোবার আগেই নতুন কোন জায়গায় যাবার বাসনা মনের মধ্যে চাগিয়ে উঠত। পোস্টিং হলো বিশাখাপটনম শহরের দ্বারকানগর শাখায়। ওখানে একজন বিচিত্র ধরণের ভদ্রলোকের সঙ্গে কাজ করবার সুযোগ ঘটল। ভদ্রলোকের নাম পাস্তুলা সূর্যনারায়ণ ঐ ব্রাঞ্চের অ্যাকাউন্টান্ট। মাঝারি লম্বা, ছিপছিপে চেহারার ভদ্রলোকের মাথাভর্তি চুল এবং ব্যাকব্রাশ করা। সদাহাস্যময় ভদ্রলোক কখনও কাউকে না করতেন না, যতক্ষণ সম্ভব হতো সকলকে খুশী রাখার চেষ্টা করতেন । তাঁর পাশে বসে কাজ করতে করতে হঠাৎই আমার চোখ পড়ে গেল তাঁর দিকে। বিশ্বাস করতেই পারছিনা নিজের চোখকে। বারবার চোখ কচলাচ্ছি আর ভাবছি ঠিক দেখছি তো। উনি বাঁহাতে নিজের স্ক্রোল যোগ করছেন এবং ডান হাতে একটা চিঠি লিখছেন। আমি নিজের চোখে না দেখলে, অন্য কারও কাছে শুনলে কিছুতেই বিশ্বাস করতাম না। আমি অন্য স্টাফদের যখন বলছি তখন কেউই আশ্চর্য হলনা। মানে সবাই জানে তাঁর এই বিশেষ গুণের কথা। এই পিংলে চেহারার ভদ্রলোকের ও এক ভীষণ নেশা বক্সিং। তখন এম ভি পি কলোনিতে থাকি। একটা রবিবার দুপুর বেলায় ওয়ার্ল্ড হেভিওয়েট বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপের লড়াই হবে, সবেমাত্র খাওয়াদাওয়া সেরে টিভি খুলে বসেছি, হঠাৎ গেট খোলার আওয়াজে বাইরে এসে দেখি সূর্যনারায়ণকে। আসুন আসুন বলে ভিতরে নিয়ে গিয়ে বসালাম। উনি বললেন টিভি চালু করতে কারণ উনি বক্সিং লড়াই দেখতে এসেছেন ঋষিকোণ্ডায় চলতে থাকা পিকনিক ছেড়ে। আমার দেখা প্রকৃত সব্যসাচীর এই আশ্চর্য রকম ঝোঁক দেখে আমি সত্যিই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম। অনেকেই হয়তো দুইহাতেই লিখতে পারেন বা কাজ করতে পারেন কিন্তু একই সঙ্গে দুটো ভিন্ন ধরণের কাজ করতে কাউকেই দেখিনি। হয়তো এইরকম প্রতিভাশালী অনেকেই আছেন কিন্তু আমার দেখা একজনই সব্যসাচী যাঁর নাম পাস্তুলা সূর্যনারায়ণ।
No comments:
Post a Comment