এইরকমই আমার কিছু পুরোনো বন্ধুর কথা মনে পড়ছে যারা আমাকে ছেড়ে দিয়ে পাড়ি জমিয়েছে না ফেরার দেশে। খুবই অন্তরঙ্গ, আমার খুশীতে তাদের ও খুশী , দুঃখে পিঠে হাত রেখে বলতো," এত ভেঙে পড়ার কিছু নেই, আমরা তো পাশে আছি; আবার ফিনিক্স পাখির মতো উড়ে যাবি আকাশে আর সঙ্গে সঙ্গে আমরাও উড়ব তোর সাথে।" চাকরির সূত্রে একঝাঁক পায়রা এসে হাজির হলো কলকাতার বুকে সুদূর দক্ষিণ দেশ হতে। নক্ষত্রের সমাবেশ বলা যেতে পারে। কেউ বা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদীয়মান নক্ষত্র, কেউ বা বিখ্যাত লেডি ব্রেবোর্ন কলেজের ঝলমলে ছাত্রী আবার কেউ বা অসুস্থতার কারণে স্কুল ফাইনাল পরীক্ষার উজ্জ্বলতম ছাত্রী হওয়া সত্ত্বেও পড়াশোনা চালিয়ে যেতে অসমর্থ। কিন্তু আগুন তো চিরদিন ছাই চাপা পড়ে থাকতে পারেনা, তা কোন না কোন সময় প্রতিভাত হবেই। তাদের কাজের মাধ্যমেই সেই প্রতিভার বিচ্ছুরণ হতে লাগল যার অবশ্যম্ভাবী প্রতিফলন সেই অফিসের কাজের মধ্যে। তার নাম যশ বাংলা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ল দাক্ষিণাত্যে এবং ধীরে ধীরে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে। অফিসের উত্তরণের সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গতকারীদের ও উত্তরণ হলো এবং ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে তারা পতাকা বহন করতে লাগল। কিন্তু কর্মসূত্রে গেঁথে ওঠা মালার পুঁতিগুলো এদিক সেদিক ছড়িয়ে পড়লেও মনে মনে সর্বক্ষণ ই একটা আশা যে আবার আসিব ফিরে, মিলিব সবার সাথে সেই পুরাতন ঝিলের ধারে। হাসিব, খেলিব গাহিব সবাই সেই পুরাতন গান। হয়তো সবটাই হয়ে ওঠেনি কিন্তু পুরোন সেই স্মৃতির রেশ আজও ঝলমলে হয়ে আছে। খোলা আকাশের নীচে বসে গান, তর্ক বিতর্ক, মান অভিমান সবই মনে পড়ছে, মনে পড়ছে সেই ছুটির দিন সবাই মিলে পুরোন কলকাতা পরিক্রমার কথা। সবাই মিলে তারামহলে টিফিন খেতে যাওয়া বা অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসে নাটক দেখতে যাওয়া বা রবীন্দ্র সদনে স্বনামধন্য শিল্পীদের অনুষ্ঠান শুনতে যাওয়া সবকিছুই মনে পড়ছে আর আবার ভুলে যাবার আগে তাকে স্মৃতির মণিকোঠায় সাজিয়ে রাখতে চাই।
সেদিনের তরুণরা আজ প্রায় বৃদ্ধ, অনেকেই আজ এই সুন্দর পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে আবার কেউ কেউ অপেক্ষারত জিনিসপত্র গোছগাছ করে । ডাক এলেই চলে যাবে। যারা এই মূহুর্তে রয়েছে তারা ব্যস্ত স্মৃতি রোমন্থনে। কখনও সখনো মিটিং হলে বা পিকনিক হলে তারা একত্রিত হয় কিন্তু ঐ আনন্দের মধ্যেও চোখদুটো খোঁজে সেই পুরোন বন্ধুদের আর সবার অলক্ষ্যে রুমাল দিয়ে চোখটা মোছে এবং চশমার কাচটা পরিষ্কার করে নেয়। চৌধুরীর হাতটা ছিল ভারী মিষ্টি। তবলার বোলগুলো যেন প্রাণ পেত তার আলতো আঙ্গুলের টোকায়। স্বভাবটাও ছিল বড় মিষ্টি তার সদাহাস্য মুখের মতন। কত ছেলেমেয়েদের সে উৎসাহ যুগিয়েছে গান বাজনা করার জন্য এবং পরবর্তীকালে তারা যথেষ্ট ভাল গান করেছে। সুজিতের ছিল প্রাণখোলা গলা এবং কি শ্যামাসঙ্গীত বা ভক্তিগীতি বা রবীন্দ্র সঙ্গীত বা অতুলপ্রসাদী বা রজনীকান্তের গান যা কিছুই গাইত তা একটা আলাদা মাত্রা পেত। মাধবিকা গাইত প্রধানত নজরুল গীতি এবং পুরোদস্তুর প্রশিক্ষণের ছাপ তার গলায় ছিল। প্রিয়রমা, কণিকা সবাই অফিসের ফাংশনে রীতিমত অংশ গ্রহণ করতো এবং অনুষ্ঠানকে প্রাণবন্ত করে তুলত। ম্যানেজমেন্ট বললে জয়ন্তর কথা সবচেয়ে আগে আসবে। ও ছিল মেরুদন্ড, কথা কম কাজ বেশি। তৃপ্তিদার কথা অবশ্যই বলতে হবে। হঠাৎই একটা কাগজ নিয়ে খসখস করে গান লিখে, তার সুর ও দিয়ে দিত এবং চৌধুরী ও আমাকে দুই হাতে শক্ত করে ধরে লাঞ্চরুমে দরজা বন্ধ করে গান শুনতে বাধ্য করতো। দরজা বন্ধ করে তার পিছনে চেয়ার টেনে বসে( যাতে আমরা বাইরে পালিয়ে যেতে না পারি) হারমোনিয়ম টেনে নিয়ে স্বরচিত এবং সুরারোপিত গান আমাদের শুনতে বাধ্য করতো। তবলায় চৌধুরীর হাজার চেষ্টাও গানকে তালে রাখতে পারত না। একদিকে গলা আর অন্যদিকে হারমোনিয়মের সুর, সে যে কি ভয়ানক অভিজ্ঞতা তা বলে বোঝানো যায়না। গান শেষ হলে মতামত জানতে চাইলে কি যে বলা উচিত ভেবে পেতাম না। অনেক ভেবে চিন্তে একটা জুতসই উত্তর খুঁজে পেয়েছিলাম এবং সেটা হলো যে ঠিকই আছে তবে একটু স্কেলটা চেঞ্জ হয়ে যাচ্ছে যার চটজলদি সমাধান ছিল ও একটা স্কেলচেঞ্জ হারমোনিয়ম কিনে ফেলবে। আর চৌধুরীর উত্তর ছিল, তালটা কেটে যাচ্ছে তো, একটু ডেটল লাগাতে হবে। এহেন তৃপ্তিদা রবীন্দ্র সদনে অফিসের অনুষ্ঠানে সোলো গাইবেই গাইবে যেখানে গাইবেন শ্রদ্ধেয় সাগর সেন এবং ফিরোজা বেগম। ত্রাতা সেই একজন, সুজিত ব্যানার্জি। অনেক কষ্টে বুঝিয়ে সুজিয়ে কোরাস গানে অংশগ্রহণ এবং তাকে একেবারে পিছনের দিকে রাখা যাতে তার গলা মাইক্রোফোনে ধরা না পড়ে। এইসব আনন্দের মুহুর্ত গুলো যদি না বলা হয় তবে সমস্ত প্রচেষ্টাই একেবারে পানসে হয়ে যাবে এবং ম্যাড়মেড়ে হয়ে যাবে। সবচেয়ে গ্ল্যামারাস ছিলেন আমাদের অফিসের প্রধান শ্যামল ধর। ছিলেন অমরনাথ মিত্র মুস্তাফি এবং ব্রেবোর্ন রোড শাখার প্রধান শচীন দাশগুপ্ত এবং সুব্রত রায়চৌধুরী। ছিল শিবু ,সুশান্ত, মোহন, তরুণ, শচী, নির্মল এবং অবনী। ছায়াদির উপস্থিতি ছিল একদম নির্বাক কিন্তু প্রয়োজনীয় যা কিছু করা দরকার তা উনি নিঃশব্দেই করতেন।
আজ আমরা অনেককেই হারিয়েছি। স্যার ( শ্যামল ধর), অমরনাথ মিত্র মুস্তাফি, শচীন দাশগুপ্ত, সুব্রত রায়চৌধুরী, মোহন, শুভ সবাই একে একে চলে গেছেন এবং হৃদয়ে এক একটা মোক্ষম আঘাত হেনে গেছেন। বিনয় দা, কান্তি দা, মধু( পাল), বাড়ারি, সবিতা, বিভাস এবং সাহা সর্দার আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছেন। বিদায় নিয়েছে সমীর,পার্থ ও স্বপন, খলিল ও ভগীরথ কিন্তু চৌধুরীর চলে যাওয়া মন থেকে কিছুতেই মেনে নিতে পারিনি, সেইরকম মানতে পারিনি অসীম ধৈর্য্যশীলা সবিতার চলে যাওয়াকেও। কিন্তু গতবছর উপর্যুপরি দুই দিনে চৌঠা জুন এবং পাঁচই জুন সুজিত এবং শঙ্খপাণির প্রয়াণ এক মহা ধাক্কা। দুজনেই ছিল একাধারে বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ী। আজ তাদের চলে যাওয়া প্রায় বছর গড়াতে চলল কিন্তু যে রেশ তারা মনের মাঝে রেখে গেছে তা ভোলা কঠিন। তাদের সকলের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বিবর্ণ স্মৃতিকে একটু ঝাড়পোঁছ করে চাগিয়ে তোলার অক্ষম প্রচেষ্টা।
No comments:
Post a Comment