Monday, 28 October 2024

বুদ্ধিজীবি

বুদ্ধিজীবির সংজ্ঞা বেশ কঠিন বলেই মনে  হয় আমার কাছে । খুব বেশি বুদ্ধি মগজে নেই বলে কোনরকমে একটা কাজ জুটিয়ে সারা জীবন ঐখানেই কেটে গেছে । আজকালকার ছেলেমেয়েরা খুব বুদ্ধিদীপ্ত ও ঝকঝকে । তারা বেশ মাথা খাটিয়ে কোন এক  সংস্থায় বছর দুয়েক কাটিয়ে ফুরুৎ করে উড়ে যায় আরেক সংস্থায়, মাইনেও বেড়ে যায় তিরিশ থেকে চল্লিশ শতাংশ -- যার যেমন বারগেন করার ক্ষমতা তার উপর । কয়েক বছরের মধ্যেই  একটা কোম্পানির কেউকেটা। তারা কাজটাকে ভালবাসে কোম্পানিকে নয়। তারা কি বুদ্ধিজীবি নয়?  কিছু লোক সংস্থায় ঢোকা ইস্তক রিটায়ার করার দিন পর্যন্ত  সব কাজ ঠিকঠাক করে পরবর্তী যে লোক এসেছে তার জায়গায় তাকে সমস্ত কিছু বুঝিয়ে দিয়েও তার শান্তি নেই । একটু কিছু অসুবিধা হলেই তার স্থলাভিষিক্ত ব্যক্তি তাঁকে ফোন করে জিজ্ঞেস করেন বা অনেক  সময়েই তাঁকে অফিসে আসতে বলেন। ইনি তো কখনোই  বুদ্ধিজীবি নন, তবে কি ইনি  বোকা ? না, ইনি বোকা নন, ইনি একজন  ভাল মানুষ যিনি তাঁর জীবনের সেরা সময় তাঁর সংস্থাকে দিয়েছেন এবং অনেক  সময়ই  পরিবারকে বঞ্চিত করে কোম্পানির জন্য প্রাণপাত করেছেন । বিনিময়ে কোম্পানির কর্তাব্যক্তিরা একটু মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে কাজটা গুছিয়ে নিয়েছেন এবং বাহবা কুড়িয়েছেন। তবে এই কর্তাব্যক্তিরা কি বুদ্ধিজীবি? অবশ্যই । যারাই নিজের  মাথা খাটিয়ে অন্যদের  মাথায়  কাঁঠাল ভেঙ্গে নিজের  কার্যসিদ্ধি করেছেন  তিনি  তো বুদ্ধিজীবি বটেই। কিন্তু ঝকঝকে বুদ্ধিদীপ্ত  ছেলেমেয়েদের  সঙ্গে এদের একাসনে ফেলাটা ঠিক হবেনা । 

আজকের দিনে  বুদ্ধিজীবি বললে কেমন একটা তির্যক  শব্দ বলেই মনে হয়। কেউ হয়তো লেখক বা  কোন শিল্পী( চিত্রকর বা সঙ্গীত বা নাট্যকলায় পারদর্শী) যখন প্রয়োজন মতো নিজের অবস্থান বদল করতে পারেন তখন তিনিই বুদ্ধিজীবি বলেই গণ্য হন। অবশ্যই এই শিল্পীরা নিজেদের চোখ কান খোলা রেখে কোনদিকে বাতাস বইছে সেটা বুঝতে পারেন এবং সেই মতন নিজের অবস্থান পরিবর্তন করেন। এঁদের নানা রঙের জামা আছে এবং সময় মতন এঁরা জামা বদল করেন এবং বলেন আমি তোমাদের ই লোক যদিও নিজের  সুবিধা ছাড়া আর  কিছুই  বোঝেন না এঁরা। 
সুমিত আজকাল একটু লেখালেখি করছে এবং  পাঠকমহলে ওর লেখা বেশ নজর কেড়েছে । বাচ্চাদের জন্য লেখা ছড়া গ্রাম ও মফস্বলে বেশ পরিচিতি পেয়েছে। শহরে বাচ্চারা একটু ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ার জন্যই  হোক বা একটু বেশি চালাক চতুর হবার জন্যই হোক ছড়ার দিকে নজর দেয়না। নানারকম লেখা যেমন ছোটগল্প, উপন্যাসেও বেশ ভালরকম প্রশংসা পেয়েছে। অনেক জায়গা থেকে প্রধান অতিথি হবার আমন্ত্রণ পাচ্ছে। সেদিন বই মেলায়  তো ওকে দেখে  বেশ ভীড় জমে গেল অনেকেই ওর অটোগ্রাফ  নিতে চাইছিল। দেখে বেশ ভাল লাগছিল কারণ প্রথম দিকে ও আমাকে পড়তে দিত ওর লেখাগুলো। উৎসাহ  ওকে দিয়েছি এবং  ধীরে ধীরে ওর লেখা  আরও  পরিণত হয়েছে। সেই জন্য ওর সাফল্যে নিজেকে রামচন্দ্রের  সেতু বন্ধনে কাঠবিড়ালির মতন মনে হচ্ছিল । কিন্তু ওকে কেউ বুদ্ধিজীবি বললে ও খুবই রেগে যেত। একদিন ওকে বললাম, " তুমি এত রেগে যাও কেন?"
ও রাগ না কমিয়ে বলল যে ও একটা নীতি মেনে চলে যা সরকারী নীতির পরিপন্থী। অতএব ও বুদ্ধিজীবি বলে ছাপ নিতে রাজি নয়।"
সত্যিই তো এঁদের  অনেকেই  একসময় তাঁদের লেখা ও গানে বা অন্যশিল্পকলায়  তাঁদের  ছাপ রেখেছেন এবং অনেক লোককে উদ্বুদ্ধ করেছেন, হঠাৎই  কিছু স্বীকৃতির বিনিময়ে বা কিছু  সুবিধার বিনিময়ে কেন তাঁরা নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বিসর্জন দিয়েছেন এটা বোধগম্য হয়না। তাঁদের কাছে বিনীত অনুরোধ যে আপনারা স্বকীয়তায়  ভাস্বর, আপনারা সেই মহিমায় বিরাজ করুন,  কেউ যেন আপনাদের  এইভাবে কলঙ্কিত করতে না পারে ।

Monday, 14 October 2024

সাবেকি দু্র্গাপূজো বনাম থিম পূজো

এখন শহর ও শহরতলীতে থিম পূজোর ঘনঘটা যা ধীরে ধীরে  গ্রাস করছে গ্রামের মানুষকেও। সাবেকি পূজো শহরাঞ্চলে খুব  কম জায়গায়ই  হচ্ছে আজকাল । বাঙালি আগে প্রতিদিন মানে সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী ও দশমীতে অঞ্জলি দিত। পূজো মানেই হৈ হৈ, যে যেখানেই থাকুক না কেন পূজোর সময় নিজের  কোটরে এসে হাজির। হাতে হাত লাগিয়ে রাত জেগে পূজো মণ্ডপ করা, নিজেদের  মধ্যেই  যাদের  শৈল্পিক ধারণা আছে তারাই প্রতিমার ব্যাকগ্রাউন্ড তৈরী করা এবং মৃৎশিল্পীদের কারখানা বাড়ি থেকে প্রতিমা আনা সব ই নিজেরাই করত যার ফলে পূজোর প্রতি পদক্ষেপে পাড়ার ছেলেদের ঘাম লেগে থাকতো এবং আনন্দটাও ছিল অবর্ণনীয় । আস্তে আস্তে পাড়ার ছবিটা  বদলে গেছে। একটা জমির উপর একটা বাড়ির জায়গা দখল করেছে বহুতল বাড়ি যেখানে  অনেক পরিবার  একসঙ্গে থাকলেও সম্পর্কের আঠা তেমনভাবে লাগেনি যার নীট ফল বাড়ির কেউ অসুস্থ  হলে  বা মারা গেলে কোন সংস্থাকে খবর দিতে  হয় যেটা আগে ভাবাই যেত না। তখন কি তাহলে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াবার অনেক  লোক ছিল ? হয়তো খানিকটা  তাই। প্রত্যেক বাড়িতেই পাঁচ সাতটা ছেলে মেয়ে  ছিল। দু একটা ছেলেপিলে যারা লেখা পড়ার ধার সেরকম ভাবে মাড়াতো না তারাই এই পরোপকারে ঝাঁপিয়ে পড়ত। যারা খুবই ভাল  পড়াশোনায়  তারা এগিয়ে  না এলেও মধ্য মেধার ছেলেমেয়েরাও যোগ দিত। এক কথায় পাড়া থেকেই সবাই এগিয়ে আসত এবং যে কোন  সমস্যার সমাধান পাড়ার  লোকজন সামলে দিত। ধীরে ধীরে  চারদিন অঞ্জলির বদলে অষ্টমী ও দশমীতে অঞ্জলি দেওয়া ঠিক হলো। অষ্টমীর অঞ্জলি দেওয়ার  সময়ই ভীড় সামাল দেওয়া এক বিরাট ব্যাপার ছিল। প্রথমে বুড়োবুড়িদের অঞ্জলি দেওয়া,  তারপর মাঝ বয়সী এবং  সবশেষে চেটো চ্যাংড়াদের । এই সময়টাতে অঞ্জলি দেওয়ার ফাঁকে একটু চোখাচোখি বা একঝলক মিষ্টি হাসির মধ্যে মন্ত্র পড়া এবং  ফুল ছোঁড়ার সময় কোন  নির্দিষ্টের গায়ে বা মাথায় ফুলের আঘাত। দশমীতে অঞ্জলি দেওয়ার পর অপরাজিতার ডাল হাতে বাঁধার একটা রেওয়াজ ছিল বিশেষ করে অল্প বয়সী ছেলেমেয়েদের মধ্যে। মা, মাসি বা কাকি, পিসিরাও এটাতে একটু উৎসাহ  যোগাতেন, হয়তো বা নিজেদের  পুরনো দিনের  কথা ভেবে । অবশ্যই এটা খুব  একটা দোষের নয় কারণ সব বাবা মা ই চায় যে তার মেয়ের  একটা ভাল  ছেলের  সঙ্গে  বিয়ে হোক। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে ই এটা ঠিক  না হলেও দু চারটে যে পরিণতি পেতনা  তা নয়। যাই হোক,  পূজো নিয়ে একটা বিরাট  হৈচৈ হতো এবং  সেটা সাবেকি পূজোয়।
 এখন এসেছে থিমের পূজো । কোন শিল্পী কোন বিশেষ  জায়গার আদলে মণ্ডপ বানিয়ে তাঁর শৈল্পিক  ধারণা  বাস্তবায়িত করেন এবং অনেক সময়ে ও অর্থ ব্যয়ে  এবং  যথেষ্ট উঁচু মানের হয় কিন্তু প্রতিমা দর্শন করে ভক্তি রসে উদ্বেলিত হয়ে মনে মনে  মা মাগো বলে ডাকটা আসেনা। আবছা আলো আঁধারিতে মা সেখানে গৌণ এবং  মণ্ডপ সজ্জা মুখ্য। সেখানে প্রবেশের জন্য কাউকে ধরা ধরি করে পাস যোগাড় করতে হয়ে। এই পাসের ও আছে রকমফের। সাদাসিধে পাস, ভি আই পি পাস আবার ভি ভি আই পি পাস। যার যেমন  ওজন তিনি তেমন পাসের অধিকারী। সুতরাং এখানে মণ্ডপসজ্জাই হচ্ছে মুখ্য। তা, এত কৃতিত্বের অধিকারী যাঁরা তাঁদের  শিল্পকীর্তি এক বিশাল প্রাঙ্গনে প্রদর্শনের ব্যবস্থা সরকারী বা বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়  করা যায়না এবং  তাঁদের  যথাযথভাবে সম্মানিত করা যায়না? এতে প্রচুর  লোকের  কর্মসংস্থান হবে এবং  শিল্পীরাও তাঁদের যথাযথ সম্মান পেতে পারেন কিন্তু যে প্রতিমার দিকে তাকিয়ে সেই ভক্তিরস না আসে সেইরকম ঠাকুর  করার কি দরকার?  এটা না হাঁস না সজারু হয়ে গেল  হাঁসজারু । একটু ভেবে দেখার অনুরোধ  কি রাখতে পারি? 

Sunday, 13 October 2024

গুপ্তিপাড়ার ভ্যাবল

ভ্যাবল আমার খুব ছোটবেলার বন্ধু না হলেও নয় নয় করে পঞ্চাশ বছর মনের খুব কাছাকাছি ছিল। পড়াশোনা শেষ করেই টগবগে তারুণ্যে ভরপুর আমরা একই সংস্থায় যোগ দিয়ে খুব কাছাকাছি চলে এলাম । পঞ্চাশ বছর নিতান্ত কম সময় নয় , এর মধ্যে নানারকম অবস্থায় কেটে গেছে, ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছি কর্মসূত্রে কিন্তু বন্ধুত্বের যে সূক্ষ্ম তার, তাতে কোন সময়ই মরচে পড়েনি বা ছিন্ন হয়নি। রয়েছি দুজন দুই প্রান্তে, হঠাৎই মোবাইলের রিংটোনে দুজনে পড়লাম বাঁধা। মোবাইল ধরতেই সেই চেনাগলায় ভেসে এল, "শোন,একটা গান তুললাম।গানটা শুনে কেমন লাগল বলবে।"  গান শুরু হলো, দরাজ গলায় গান, সকাল টা বেশ ভাল ভাবেই শুরু হলো । চলল পুরনো দিনের  কথা, মাঝে মাঝেই কিছু খিস্তি, গালাগালি আর তার পরেই  হা হা করে হাসি যা থামতেই  চায়না। ঘন্টা দেড়েক সময় যে কোথা দিয়ে  চলে গেল বুঝতেই পারলাম না।
এই ছিল ভ্যাবল যার ছোটবেলা কেটেছে গুপ্তিপাড়ায় । সবচেয়ে ছোট ভ্যাবল ছোটবেলাতেই  মা কে হারিয়ে বাবার কাছে মা ও বাবার দুজনের আদর একসঙ্গে পেয়েছে। তখন ও থাকে উত্তরপাড়ার ভদ্রকালীতে আর আমি থাকি পিসিমার  বাড়ি লিলুয়ায়।একটা রবিবার  ও আমাকে নিমন্ত্রন করল দুপুর বেলায় খাবার জন্য। লিলুয়া থেকে বালিখাল
৫৪ নম্বর বাসে গিয়ে ওখান থেকে  বাস বদলে পৌঁছে গেলাম  ভদ্রকালী । বাস স্টপেই দাঁড়ানো ভ্যাবল নিয়ে গেল তার বাড়ি। ওর বাবা ই রান্না করেছিলেন ইলিশ মাছ,  অসাধারণ রান্না। সারা দুপুর  তিনজন মিলে কত গল্প  এবং তারপর ফিরে আসা। প্রথম আলাপের কয়েকদিন পরে লাঞ্চ রুমে  ওর দরাজ গলায়  গান  শুনে ওকে বললাম  গান শেখার কথা। একদিন অফিস শেষে ও চলে গেল এলগিন রোডের  মুখে ডায়োশেসন স্কুলের উল্টোদিকে  থাকা স্কুল  সৌরভে যেখানে  প্রবাদ প্রতিম পণ্ডিত  জ্ঞান প্রকাশ ঘোষ  শেখাতেন। ও কিন্তু কোনরকম দ্বিধা না করে সোজা চলে গেল ভিতরে এবং  জিজ্ঞেস করায় ও বলল আমি সেরা লোকের  কাছে  গান  শিখতে চাই। যে কোনদিন গান  করেনি সে যদি এই ধরণের কথা বলে তাহলে বুঝতে হয় তার প্রত্যয় কতটা। যাই হোক  একজন  বিশিষ্ট শিল্পী শ্রীমতি স্নিগ্ধা বন্দোপাধ্যায় ওকে জিজ্ঞেস করলেন যে আগে কোনদিন  ও কারও কাছে  শিখেছে কি না। ও সরাসরি জানালো যে "না"।উনি তখন বললেন  যে তুমি একটা গান করতে পারবে?  ও সম্মতি জানিয়েই " আমার  আপনার  চেয়ে আপন যে জন খুঁজি তারে আমি আপনায়" গানটা ওর নিজস্ব ভঙ্গীমায় গাইল আর স্নিগ্ধা বন্দোপাধ্যায়  তো ওর গলা শুনে স্তম্ভিত । উনি জানালেন  যে ভ্যাবলকে উনি গান শেখাবেন। চলল কিছুদিন  এইভাবেই এবং স্ববভাবতই গলাও হলো অনেক  পরিশীলিত।
অনেকবার আমাকে এবং  চৌধুরীকে নিয়ে যেতে চেয়েছে তার গ্রামের বাড়ি গুপ্তিপাড়ায়  কিন্তু কোন না কোন  কারণে যাওয়া হয়ে  ওঠেনি।
অনেকদিন পরে আমাদের  অর্জুন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পর্যটন বিভাগের উদ্যোগে মহাষ্টমীর দিন  হুগলী সফরের টিকিট কাটল। আমাদের দলটাও  গেছে ভেঙে। কেউ শারীরিক কারণে, কেউ বা বিদেশে আবার কেউ  বা পরিবারের কোন  সদস্যের অসুস্থতার জন্য অনুপস্থিত । বাকি রইল অর্জুন আর সহদেব এবং তাদের  পরিবার মানে মোট চার জন। ভোর ছটায়  উপস্থিতি, সুতরাং ঠিক পাঁচটায় রওনা দিয়ে পৌনে ছটায় রবীন্দ্র সদন পৌঁছে গেলাম ,মনে পড়ে গেল শৈশবের কথা যখন কবির জন্মোৎসব উপলক্ষ্যে নামী শিল্পীদের গান শুনতে আসতাম।এখন বহুদিন পর এসেছি যখন রবীন্দ্র সদন  তার গৌরব অনেকটাই হারিয়েছে নন্দনের কাছে।ঐসময়ে ছিলনা নন্দন যার ফলে আমাদের কাছে রবীন্দ্র সদন ই ছিল প্রথম প্রেমের মতো মিষ্টি।আতিথেয়তায়  কোন  ত্রুটি নেই,  যাওয়া মাত্র ই চা, বিস্কুটের আপ্যায়ন আমাদের মতো হাজির হওয়া গুটিকতক লোকের  কাছে। পাশেই একটা বড় ভলভো বাস দাঁড়িয়ে আছে আমাদের  হুগলী সফরের জন্য কিন্তু এখনও বহু মানুষের আসা বাকি। সুতরাং ঠিক সময়ে যে বাস ছাড়বে না এটা নিশ্চিত । সদন প্রাঙ্গনে ছাতিম গাছটা  ফুলে ভরে গেছে  আর একটা মিষ্টি গন্ধের রেশ আকাশে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। পাশেই একটা বড় বট গাছ। মোবাইল ক্যামেরা তার দিকে তাক করতেই একটা দারুণ সুন্দর  জিনিস চোখে পড়ল। জুম করতেই দেখি বটগাছের ফুল । জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এই জিনিসটা পড়ল চোখে।  ধরে রাখলাম ক্যামেরায় । একটু বিরক্ত ই বোধ করছিলাম সময়ানুবর্তীতা না থাকায় কিন্তু প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্য্য  ভুলিয়ে দিল। বাস যাত্রা শুরু করল ঠিক সাতটা বেজে পাঁচ মিনিটে । বিদ্যাসাগর সেতু ধরে বাস চলতে লাগল শ্রীরামপুরের দিকে। ওঠা মাত্র ই একটা বেশ বড়সড় বাক্সে সফরের প্রথম উপহার উদ্যোক্তাদের  তরফ থেকে এবং  সঙ্গে একটা জলের বোতল। আমাদের বিরক্তি উদ্যোক্তাদের আতিথেয়তায় দূর হয়ে গেল । খাবারের গুণমান যথেষ্ট ভাল । অনেক জিনিস আছে, সামান্য কিছু খেয়েই বাক্স বন্ধ করে উপরে রাখা হলো। খানিকক্ষণ পরেই পৌঁছে গেলাম একসময় ওলন্দাজ উপনিবেশ শ্রীরামপুর । মনে পড়ে গেল উইলিয়াম কেরী, জোসুয়া মার্সম্যান ও উইলিয়াম ওয়ার্ডের কথা যাঁরা অগ্রনী ছিলেন খ্রীষ্ট ধর্ম প্রচার এর  সঙ্গে এদেশে শিক্ষা প্রসারে । ১৮০০ সালে ১০ই জানুয়ারী  তাঁদের  প্রেস থেকে বেরোয়  সমাচার দর্পণ। সেই ঐতিহাসিক বিরাট হলে বসার ব্যবস্থা । একটু হাত পা ছাড়িয়ে নিয়ে চা খেয়ে টোটোয় চড়ে শহর পরিক্রমা। বাবা একসময় শ্রীরামপুর কলেজে পড়েছিলেন; সুতরাং  কলেজটা না দেখলে মনে আক্ষেপ থেকে যেত। গাইড মশায়ের অনুমতি নিয়ে  কলেজটা দেখে এলাম। গঙ্গার ধারে বহু পুরনো শহর, আধুনিকতার ছোঁয়া সেভাবে লাগেনি। কলেজের গেট বন্ধ থাকায় ভিতরে যাওয়া হলো না, বাইরে থেকেই এক ঝলক চোখের দেখা আর  মনে করার চেষ্টা  যে এখানেই বাবা, মিঠালাল কাকারা( বাবার মুখে শোনা) পড়তেন । চলে এলাম রাজবাড়ির পূজো দেখতে। রাজবাড়ির  সেই জাঁকজমক আর  নেই, তারাও আমাদের মতন ই ছাপোষা হয়ে গেছেন কিন্তু  তবুও রাজবাড়ি  বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে মাথায় মুকুট কোমরে ঝোলানো  তলোয়ার আর মণিমানিক্য  খচিত রাজপোষাক। দালানের স্তম্ভগুলো এখনও  যেন বুক  ফুলিয়ে বলে আমরা আছি। ওখান থেকে  যাওয়া  হলো শতাব্দী প্রাচীন  গোস্বামী বাড়ির  পূজোয়। ওখানে আমাদের  অঞ্জলি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল  যার ফলে আমরাও খুব খুশী হয়েছিলাম। এর পর যাওয়া হলো শেওড়াফুলি রাজবাড়ির পূজো দেখতে। এখানে চালকুমড়ো বলি দেওয়া হয়। কয়েক বছর আগে ডায়মণ্ড হারবারের দিকে এক প্রাচীন  বাড়ির  পূজো  দেখতে  গিয়ে একটু  অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সামনে পড়ে গিয়েছিলাম। সেখানে বলি দেওয়া হয়। কোনরকমে অন্যদিকে পালিয়ে গিয়ে ঐ দৃশ্য থেকে অব্যাহতি পেয়েছিলাম । এরপর আমাদের  গন্তব্যস্থল বাঁশবেড়িয়ার  হংসেশ্বরী মন্দির । দারুণ  সুন্দর  মন্দিরটির  রক্ষণাবেক্ষণের ভার সরকার নেওয়ায় একটু উন্নতি চোখে পড়ল কারণ উপযুক্ত দেবোত্তর  সম্পত্তি এবং ট্রাস্ট না থাকলে এই পুরনো দিনের  পূজোগুলো ধীরে ধীরে  অবলুপ্ত হয়ে যাবে। সরকারের ক্লাবগুলোতে অনুদান  বন্ধ রেখে এটা ভেবে দেখতে পারে তবে ক্লাবগুলোতে অনুদান দেওয়া  মানে ভোটের সময় তাদের হয়ে প্রচার  করা এবং  ভোটবাক্সে তার প্রতিফলন ঘটানো। এরপর যাত্রা শুরু  গুপ্তিপাড়ার পথে। খানিকক্ষণ চলার পর এলাম সেখানে। এসে পৌঁছলাম  বৃন্দাবনচন্দ্র মঠে। এখানে চারটে মন্দির আছে। বৃন্দাবনচন্দ্র ও কৃষ্ণচন্দ্র মন্দির  আটচালার কিন্তু  রামচন্দ্র মন্দির  একচালার। পোড়ামাটির  কাজ দেখার  মতন। এই মঠের চতুর্থ  মন্দির চৈতন্যদেবের  মন্দির সবচেয়ে  পুরনো । মনটা ভরে গেল এক অপূর্ব পবিত্রতায় । ওখান থেকে হাটখোলা পাড়ায় সেনবাড়ির শতাব্দী প্রাচীন দুর্গা পুজো দেখা হলো।সেনবাড়িতে একটা  অদ্ভূত জিনিস  চোখে  পড়ল ঝুলন্ত অবস্থায়। জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম যে ওটা না কি তিমি মাছের শিরদাঁড়া । বহুদিন আগে তাঁদের  পূর্বজরা না কি ঐ মাছ শিকার করেছিলেন এবং  তাঁদের  শৌর্যের  প্রতীক হিসেবে তিনি দালানে ঝুলছেন। এবার দুপুর বেলায় খাবার ব্যবস্থা । যেমন খাবারের  গুণমান তেমন ই সুস্বাদু রান্না । সর্বোপরি আতিথেয়তা অতুলনীয় । খাওয়া দাওয়ার পর একটু দূ্রেই তেলিপাড়ায় কনকদূর্গার মন্দির দর্শন করে ফেরার পালা।
গুপ্তিপাড়ায় খোঁজ করলাম  কোন বৃদ্ধ বা বৃদ্ধার যাঁরা ঐ মাস্টারমশাই বা ভ্যাবল সম্বন্ধে কোনও  খবর দিতে পারেন । কিন্তু  না, পেলাম না ঐ অল্প সময়ের মধ্যে । ভ্যাবল আমাদের  ছেড়ে পাড়ি দিয়েছে  না ফেরার  দেশে দুবছর আগে চৌঠা জুন কিন্তু রেখে গেছে তার গুপ্তিপাড়াকে। মনটা খুব খারাপ  হয়ে গেল  এই ভেবে  যে কতবার হাজার অনুরোধেও তার শৈশবের গ্রামে  আসতে  পারিনি  আর আজ যখন  এলাম তখন  গুপ্তিপাড়া ভ্যাবলশূন্য। আমার জানা ছিলনা যে এরা গুপ্তিপাড়ায় আসবে,  জানতে পারলে  হয়তো আসতাম না।