Monday, 14 October 2024

সাবেকি দু্র্গাপূজো বনাম থিম পূজো

এখন শহর ও শহরতলীতে থিম পূজোর ঘনঘটা যা ধীরে ধীরে  গ্রাস করছে গ্রামের মানুষকেও। সাবেকি পূজো শহরাঞ্চলে খুব  কম জায়গায়ই  হচ্ছে আজকাল । বাঙালি আগে প্রতিদিন মানে সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী ও দশমীতে অঞ্জলি দিত। পূজো মানেই হৈ হৈ, যে যেখানেই থাকুক না কেন পূজোর সময় নিজের  কোটরে এসে হাজির। হাতে হাত লাগিয়ে রাত জেগে পূজো মণ্ডপ করা, নিজেদের  মধ্যেই  যাদের  শৈল্পিক ধারণা আছে তারাই প্রতিমার ব্যাকগ্রাউন্ড তৈরী করা এবং মৃৎশিল্পীদের কারখানা বাড়ি থেকে প্রতিমা আনা সব ই নিজেরাই করত যার ফলে পূজোর প্রতি পদক্ষেপে পাড়ার ছেলেদের ঘাম লেগে থাকতো এবং আনন্দটাও ছিল অবর্ণনীয় । আস্তে আস্তে পাড়ার ছবিটা  বদলে গেছে। একটা জমির উপর একটা বাড়ির জায়গা দখল করেছে বহুতল বাড়ি যেখানে  অনেক পরিবার  একসঙ্গে থাকলেও সম্পর্কের আঠা তেমনভাবে লাগেনি যার নীট ফল বাড়ির কেউ অসুস্থ  হলে  বা মারা গেলে কোন সংস্থাকে খবর দিতে  হয় যেটা আগে ভাবাই যেত না। তখন কি তাহলে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াবার অনেক  লোক ছিল ? হয়তো খানিকটা  তাই। প্রত্যেক বাড়িতেই পাঁচ সাতটা ছেলে মেয়ে  ছিল। দু একটা ছেলেপিলে যারা লেখা পড়ার ধার সেরকম ভাবে মাড়াতো না তারাই এই পরোপকারে ঝাঁপিয়ে পড়ত। যারা খুবই ভাল  পড়াশোনায়  তারা এগিয়ে  না এলেও মধ্য মেধার ছেলেমেয়েরাও যোগ দিত। এক কথায় পাড়া থেকেই সবাই এগিয়ে আসত এবং যে কোন  সমস্যার সমাধান পাড়ার  লোকজন সামলে দিত। ধীরে ধীরে  চারদিন অঞ্জলির বদলে অষ্টমী ও দশমীতে অঞ্জলি দেওয়া ঠিক হলো। অষ্টমীর অঞ্জলি দেওয়ার  সময়ই ভীড় সামাল দেওয়া এক বিরাট ব্যাপার ছিল। প্রথমে বুড়োবুড়িদের অঞ্জলি দেওয়া,  তারপর মাঝ বয়সী এবং  সবশেষে চেটো চ্যাংড়াদের । এই সময়টাতে অঞ্জলি দেওয়ার ফাঁকে একটু চোখাচোখি বা একঝলক মিষ্টি হাসির মধ্যে মন্ত্র পড়া এবং  ফুল ছোঁড়ার সময় কোন  নির্দিষ্টের গায়ে বা মাথায় ফুলের আঘাত। দশমীতে অঞ্জলি দেওয়ার পর অপরাজিতার ডাল হাতে বাঁধার একটা রেওয়াজ ছিল বিশেষ করে অল্প বয়সী ছেলেমেয়েদের মধ্যে। মা, মাসি বা কাকি, পিসিরাও এটাতে একটু উৎসাহ  যোগাতেন, হয়তো বা নিজেদের  পুরনো দিনের  কথা ভেবে । অবশ্যই এটা খুব  একটা দোষের নয় কারণ সব বাবা মা ই চায় যে তার মেয়ের  একটা ভাল  ছেলের  সঙ্গে  বিয়ে হোক। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে ই এটা ঠিক  না হলেও দু চারটে যে পরিণতি পেতনা  তা নয়। যাই হোক,  পূজো নিয়ে একটা বিরাট  হৈচৈ হতো এবং  সেটা সাবেকি পূজোয়।
 এখন এসেছে থিমের পূজো । কোন শিল্পী কোন বিশেষ  জায়গার আদলে মণ্ডপ বানিয়ে তাঁর শৈল্পিক  ধারণা  বাস্তবায়িত করেন এবং অনেক সময়ে ও অর্থ ব্যয়ে  এবং  যথেষ্ট উঁচু মানের হয় কিন্তু প্রতিমা দর্শন করে ভক্তি রসে উদ্বেলিত হয়ে মনে মনে  মা মাগো বলে ডাকটা আসেনা। আবছা আলো আঁধারিতে মা সেখানে গৌণ এবং  মণ্ডপ সজ্জা মুখ্য। সেখানে প্রবেশের জন্য কাউকে ধরা ধরি করে পাস যোগাড় করতে হয়ে। এই পাসের ও আছে রকমফের। সাদাসিধে পাস, ভি আই পি পাস আবার ভি ভি আই পি পাস। যার যেমন  ওজন তিনি তেমন পাসের অধিকারী। সুতরাং এখানে মণ্ডপসজ্জাই হচ্ছে মুখ্য। তা, এত কৃতিত্বের অধিকারী যাঁরা তাঁদের  শিল্পকীর্তি এক বিশাল প্রাঙ্গনে প্রদর্শনের ব্যবস্থা সরকারী বা বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়  করা যায়না এবং  তাঁদের  যথাযথভাবে সম্মানিত করা যায়না? এতে প্রচুর  লোকের  কর্মসংস্থান হবে এবং  শিল্পীরাও তাঁদের যথাযথ সম্মান পেতে পারেন কিন্তু যে প্রতিমার দিকে তাকিয়ে সেই ভক্তিরস না আসে সেইরকম ঠাকুর  করার কি দরকার?  এটা না হাঁস না সজারু হয়ে গেল  হাঁসজারু । একটু ভেবে দেখার অনুরোধ  কি রাখতে পারি? 

No comments:

Post a Comment