Sunday, 22 December 2024

"লৌকিকতার পরিবর্তে আশীর্বাদ প্রার্থনীয়"

কোন কোন  লোক থাকেন যাঁরা দাদা ডাকেই খুব আনন্দ পান, তা সে ব্যক্তির বয়স যাই হোক না কেন। এইরকম ই একজন ব্যক্তি বিশুদা।আপামর জনতার বিশুদা, সে আমার বাবার ও বিশু দা, আমার ও বিশুদা, আমার ছেলের ও বিশুদা, আবার তার ছেলেও হয়তো বিশুদা ই বলবে যদি তিনি ততদিন বেঁচে থাকেন । এই সর্বজন শ্রদ্ধেয় বিশুদা তাঁর বিশাল দশাসই চেহারা নিয়ে নতুন বাজার যেতে যে উঁচু ধাপিওয়ালা বাড়িটা পড়ে সেখানে বসে থাকেন এবং বাজারগামী  বা বাজার করে ফিরে আসা সমস্ত লোকজন একবার তাঁর দিকে তাকিয়ে ঠোঁট টা সামান্য প্রসারিত করে কোন শব্দ উচ্চারন না করেও ভাল আছেন জিজ্ঞেস করেন এবং প্রত্যুত্তরে বিশুদা ও মাথা নাড়িয়ে কোন কথা না বলেও ভাল থাকার কথা বলেন । কোন কোন সময় হাত তুলেও ভাল থাকার কথা‌ জানান । বিশুদা কে বেশিরভাগ সময়ই আদুর‌ গায়ে দেখা যায়, হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডায় একটা স্যান্ডো গেঞ্জি, ‌বড়জোর একটা হাতকাটা সোয়েটার বা একটা চাদর । তাঁর  ঠাণ্ডা না লাগার কারণ জিজ্ঞেস করলেই লুঙ্গির ট্যাঁকে গোঁজা একটা তামার পয়সা  বের করে দেখাতেন আর বলতেন বুঝলি পয়সার গরম কাকে বলে? প্রকাণ্ড শরীরের মালিক এই বিশুদা কোথায়  থাকেন,  কে ই বা তাঁর খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করেন কিছুই  জানা ছিলনা । কাজকর্মহীন বিশুদা কে দেখা যেত ফুটবলের মাঠে। কোন  বিশেষ দলের সমর্থক ছিলেন বলে মনে হয়না কারণ যে দল ভাল খেলত  তাকেই উৎসাহ  যোগাতেন।হয়তো যে  দলের সমর্থক আমি তার বিরুদ্ধে একটা গোল হয়ে গেল আমার মন খারাপ  হয়ে গেল কিন্তু পাশে বসে থাকা বিশুদা দুহাত তুলে আনন্দ প্রকাশ করলেন এবং আমার মন দ্বিগুণ খারাপ হয়ে গেলেও বিশুদার প্রতি রাগ করতে পারতামনা।শুধু আমি কেন,  কেউই রাগ  করতে পারতনা। এমনই ছিল তাঁর জনপ্রিয়তা। 
খেতে খুব  ভালবাসতেন বিশুদা আর চেনা অচেনা সব লোকই তাঁকে  নিমন্ত্রণ করে আত্মতৃপ্তি লাভ করতেন। বিশুদা কে নেমন্তন্ন করা মানে দশটা লোককে নেমন্তন্ন করা কিন্তু  তা সত্ত্বেও বিশুদা কে লোকে নিমন্ত্রণ করত।উপহার‌ বিশুদার একগাল হাসি সমেত আশীর্বাদ । এ ছাড়া বিশুদার কাছ থকে কেউ কোন উপহার আশা করতনা। তারাশঙ্কর দা ছিলেন একটা স্কুলের  মাস্টারমশাই । তখন স্কুলের  মাস্টারমশাইদের  মাইনে তিন চার মাস  অন্তর হতো। মাইনে পেতেই প্রায় সবটাই চলে যেত ধার শোধকরতে। তবু ও মাইনে পাবার মাসে কোন নিমন্ত্রণ হলে খুব  একটা অসুবিধা হতোনা উপহার দিতে কিন্তু সেই নেমন্তন্ন যদি মাইনে পাওয়ার প্রায় শেষ অবস্থায় পাওয়া যায় তা হলে ধার করা ছাড়া আর কোন রাস্তাই থাকেনা। এইরকম একসময়  তারাশঙ্কর দার বন্ধুর মেয়ের বিয়েতে তারাদার নেমন্তন্ন হলো, সঙ্গে বিশুদার ও। আর ঐ বন্ধুই হচ্ছে তারাদার মুশকিল আসান । নানা সময় তারা দা তারই শরণাপন্ন হন টাকার দরকারে কিন্তু তাঁর ই মেয়ের বিয়েতে উপহার  দেওয়ার জন্য তাঁর ই কাছে টাকা চাইতে ভীষণ লজ্জ্বা  হচ্ছিল তারাদার। না, কিছুতেই ওর কাছে নেওয়া যাবেনা। অনেক  চিন্তা ভাবনা করে বিডিও অফিসের হেডক্লার্ক মুকুদার শরণাপন্ন হলো। মুকুদা বলল আসতে তারাদাকে তার অফিসে, যদি কোন ব্যবস্থা করাযায়  ধারের। সেদিন ছিল শনিবার শেষ দুটো পিরিয়ড ছিল কেমিস্ট্রি প্র্যাকটিক্যাল । আমার ও ছিল প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস । হেডমাস্টার মশাইকে বলে ম্যানেজ করে আমার ওপর দুটো ক্লাসের  ভার দিয়ে উনি তো মুকুদার উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন । মুকুদার সমস্ত চেষ্টা বিফল, কারও কাছে  বাড়তি টাকা নেই  ধার দেওয়ার মতো । তারাদাও খুবই বিমর্ষ । না,বন্ধুর মেয়ের বিয়েতে  কোন  উপহার  না নিয়ে কিছুতেই  যাবেনা সে। হঠাৎই  মনে পড়ে গেল  বিশুদার ও নিমন্ত্রিত হওয়ার কথা। বিডিও অফিসে অনেক লিফলেট পড়ে ছিল। উই প্ল্যান ফর প্রসপারিটি, রুরাল ডেভেলপমেন্ট,  ফাইভ ইয়ার প্ল্যান এই জাতীয় যত লিফলেট ছিল সবকটা থলি ভর্তি করে নিয়ে এল। স্টেশনারি দোকান থেকে মলাট দেবার লাল, কমলা রঙের অনেক গুলো কাগজ কিনে নিয়ে  এল।  সেলোফেন পেপার দিয়ে  ভাল করে মুড়িয়ে ঐ পুস্তিকাগুলো একটা দেখনদার গিফট প্যাক করে বিশুদার পাশাপাশি বন্ধুর মেয়ের বিয়ের নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে গেল। বন্ধু তারাদার হাতে সুদৃশ্য প্যাকেট  দেখে একটু আশ্চর্য ই হলো, ভাবল তারা ধারদেনা করে কেন এইরকম একটা দামী উপহার  কিনতে গেল। যাই হোক,  মুখ্য আকর্ষণ বিশুদার আশীর্বাদের পাশে অন্য যে কোন  লোকের উপহার কেমন ম্যাড়মেড়ে। তারা দা তো একেবারে লেপটে রয়েছে বিশুদার সঙ্গে । বিশালদেহী বিশুদার আশীর্বাদের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তারাদার গিফট প্যাকেট দিয়েই তারাদার খাওয়ার জায়গায় প্রস্থান বিশুদা কে নিয়ে। খাওয়া দাওয়ার পরেই যত তাড়াতাড়ি  সম্ভব বাড়ি ফিরে  আসা।
বিয়ে বাড়িতে কনের পাশে কোন বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়রা থাকে যারা কে কি উপহার  দিল তা একটা লম্বা কাগজে লিখে রাখে। মোটামুটি সব গিফটের উপহারদাতার নাম পাওয়া গেলেও  ঐ বিশেষ  প্যাকেট কে দিয়েছেন তা জানা গেল না। আর প্যাকেটটা এত মজবুত ভাবে মোড়ানো  হয়েছে  তাকে ঐ মূহুর্তে  খোলা গেলনা। পরদিন কন্যা বিদায়ের সময় অনেক  উপহারের সঙ্গে সেই মজবুত প্যাকেট ও চলে গেল । শ্বশুরবাড়িতে বিয়ের ঘনঘটা থিতিয়ে যেতেই ছুরি, কাঁচি দিয়ে সেই প্যাকেট খুলতেই পঞ্চবার্ষিকী প্ল্যান,গ্রামীন উন্নয়নের সরকারী ইস্তেহার সব ছড়িয়ে  ছিটিয়ে  পড়ল। সবাই ছিছি করতে লাগল আর মধুমিতার লজ্জ্বায়, দুঃখে কান্না পেয়ে গেল। অষ্টমঙ্গলায় ফিরে এসে মা কে বলল এই উপহারের কথা। মা তো হাঁ করে চেয়ে রইল কিছুই আঁচ করতেই পারলনা কিন্ত ওর বাবা অর্থাৎ  তারাদার বন্ধু কিন্তু বুঝতে পেরেছে যে এটা তারার কাজ। বিয়ের  পর বেশ কিছুদিন  কেটে গেছে । তারাদার মাইনে হয়েছে এবং  ধার শোধের পালা। বন্ধুর  কাছে  এসেছে টাকা ফেরত দিতে  কিন্তু  বন্ধু বলল, " তারা, পঞ্চাশ টাকা  বাড়তি দিবি এবার।" হকচকিয়ে গেল তারা দা। " কেন রে পঞ্চাশ টাকা বাড়তি কেন, তুই কি আজকাল  সুদের  ব্যবসা করছিস না কি?"
"না, সুদের  ব্যবসা নয়, তিরিশ টাকা  মেয়ের  বিয়ের  উপহার  আর কুড়িটাকা মেয়ের  শ্বশুরবাড়িতে  আমার সম্মান  নষ্ট করার জন্য।"
তারা দা যত ই অনুনয় বিনয় করে কিন্তু বন্ধু অনড় এই পেনাল্টিতে । "তোর কাছে টাকা ছিলনা তো তুই  এইসব ছাইপাঁশ এখানে আনলি কেন?"
তারা দা বলল, " দেখ , সবসময়ই টাকা তোর কাছেই নিই কিন্তু  তোর  মেয়ের  বিয়েতে  উপহারের জন্য তোর কাছে  টাকা নেওয়া  কি উচিত? "
" তোকে উপহার দিতেই হবে, এমন কোন  বাধ্যবাধকতা তো নেই ঐ তো বিশুদার মতন তুই ও আশীর্বাদ করতে পারতিস।"
 যাই হোক তারাদাকে বড্ড লজ্জায় ফেলে দিল তার বন্ধু। 
পরে আর কোনদিন  তারা দা ঐ বন্ধুর কাছে টাকা  ধার নিয়েছিল কিনা জানা যায়নি।

Saturday, 7 December 2024

মধুর যাত্রা

হঠাৎই ছেলের ফোন বেশ রাতে, ব্যাগ গুছিয়ে রাখ, যেতে হবে আমাদের মাউন্ট আবু। সবেমাত্র নিউমোনিয়া থেকে সেরে ওঠা আমি চমকে উঠলাম প্রস্তাব শুনে। এখনও  নিউমোনিয়ার ভ্যাক্সিন নেওয়া হয়ে ওঠেনি, আমি তো ভয়েই শুকিয়ে গেলাম। তবু একবার ভাবলাম যে প্রজাপিতা ব্রহ্মকুমারীর বেছে নেওয়া জায়গা মাউন্ট আবুর অপরিসীম শিল্প কীর্তি দিলওয়ারা টেম্পলের পাশে যদি বিলীন হয়ে যেতে পারি তাতে মন্দ কি? সোমবার  ২রা ডিসেম্বর আকাশ এয়ারলাইন্সে দুপুরের টিকিট আমাদের কিন্তু কপালের ফের, যান্ত্রিক ত্রুটির জন্য দুঘন্টা লেট। কিন্তু সবদিক দিয়েই লোকসান হলো না, প্রত্যেক যাত্রার ই একটা আলাদা মাত্রা থাকে এবং এখানেও তার ব্যাতিক্রম হলো না।
দুপুর বেলায় খাওয়া দাওয়া সেরে এয়ারপোর্ট  পৌঁছলাম । এসে গেল  হুইল চেয়ার । একটু বেচারা বেচারা মুখ করে চেয়ারে বসতেই একটা লজ্জ্বা চারদিক থেকে  ঘিরে এল। দিব্যি হেঁটে চলে হিল্লি দিল্লি করে বেড়াচ্ছি অথচ এয়ারপোর্টে এসেই যেন ঠুঁটো জগন্নাথ । তবু চেষ্টা করি এই হুইল চেয়ার বাহকদের কষ্টটা একটু প্রশমিত করার তাদের পকেটে কিছু গুঁজে দিয়ে একটু লোকচোখের নজর এড়িয়ে  কারণ এদের কর্মকর্তাদের নজরে এলে এদের চাকরি চলে যেতে পারে। আমরা অনেক সময়েই অনেক ভুল কাজ জেনে শুনেই করি। এর বদলে যদি এয়ারলাইন্স আমাদের কাছ থেকে   এই সেবার জন্য কিছু  মূল্য ধার্য করে তাহলে এই মানসিক যন্ত্রণায় ভুগতে হয়না। যাই হোক,  সিকিউরিটি চেক হয়ে যাওয়ার পর বোর্ডিং ও হয়ে গেছে,  এয়ারোব্রিজ দিয়ে তারা এদিক ওদিক করে প্লেনে ঢোকার আগে বেল্ট বাঁধা অবস্থায় চেয়ারে বসে আছি  কিন্তু  প্রতীক্ষার অবসান আর হয়না। প্রায় ঘন্টাখানেক ঐ অবস্থায় থাকার পর জানা গেল  যে যান্ত্রিক ত্রুটির জন্য প্লেন ছাড়তে দেরী হবে । বেচারা হুইল চেয়ার বাহকদের আরও  দুর্ভোগ বাড়ল, ফের আশি কেজির এই শরীরটাকে টেনে নিয়ে  আবার এক তলায় নিয়ে এল, ফের নতুন করে আবার সিকিউরিটি চেক আর এর ই মাঝে যান্ত্রিক ত্রুটি সারিয়ে নেওয়া। দুটো ঘন্টা  কেমন করে যে কেটে গেল  বুঝতেই পারলাম না।কিন্তু যাদের  যাওয়ার  তাড়া আছে তারা চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছে কারণ তাদের  তো অনেক কিছু  সামলাতে হবে, সবাই তো আমাদের  মতো বেকার নয়। যাই হোক,  এয়ারোব্রিজ থেকে মুক্তি পেয়ে রানওয়েতে এসেও আবার অপেক্ষা এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোলের ক্লিয়ারেন্সের জন্য। এরপর আস্তে আস্তে গড়াতে শুরু কথায় বুঝতে পারলাম যে নির্দেশ  এসে গেছে।
এতক্ষণ যারা হৈচৈ করছিল প্লেন ঠিক সময়ে না ছাড়ার জন্য তারাই বেশ কলরবে মেতে উঠল নিজেদের মধ্যে আলাপচারিতায় । কোন কোন  সময়ে ডেসিবেল একটু বেশি ই হয়ে যাচ্ছিল ।  আমাদের দুজনের টিকিট এক জায়গায় হয়নি, পাশে একজন অল্প বয়সী মেয়ে মোবাইলে ভিডিও দেখেই চলেছে আর মাঝে মাঝেই নিজের মনে খিলখিলিয়ে হাসছে‌। পিছনে একটা যুগল(বন্ধু ও  হতে পরে  বা সদ্য প্রেমে পড়া ছেলেমেয়েও হতে পারে) যেখানে ছেলেটি হিন্দি, ইংরেজিতে মিশিয়ে প্রচণ্ডভাবে ইম্প্রেস করে চলেছে। খারাপ  লাগছিল না বিশেষ করে স্ত্রী পাশে না থাকায় ধমক খাওয়ার ভয় ই ছিলনা। সুতরাং লোকজনের কথাবার্তাতেই নিজেকে খুশী রাখার চেষ্টা করছিলাম । সামনের সারিতে এক মুসলিম পরিবার কিন্তু তাদের তিনজনের সিট ও একসাথে হয়নি। কি বেআক্কেলে এয়ারলাইন্সের লোকজন । বাচ্চাটা জানলার ধারে ছাড়া বসবেই না।অল্প বয়সী স্ত্রীর পাশে অন্যান্য লোক বসে থাকবে এটা কিছুতেই  মেনে নিতে  পারছে না বেচারা। 'আইল' সিটে বসে থাকা ভদ্রলোক  বেশ জুত করে বসে সীটবেল্ট বেঁধে ফেলেছেন আর অল্প বয়সী স্বামী তাকে কাতর অনুনয় বিনয় করে চলেছে সীট বদলানোর জন্য । কিন্তু লোকটার মন ভিজল না। অগত্যা বাধ্য হয়েই জানলার ধারে বসে থাকা সীটে দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে উদাসী দৃষ্টিতে পেঁজা তুলোর মতন ভেসে থাকা মেঘের দিকে মনমরা হয়ে তাকিয়ে থাকল। সে আবার আমার ই সারির জানলাতে থাকায় তাকে দেখে একটু কষ্ট ই লাগছিল। পাষাণ হৃদয় লোকটার মন কিন্তু বিন্দুমাত্র টলল না । আমার ও অবস্থা  বিশেষ  সুবিধার নয়। কিন্তু আমার বয়স হয়েছে এবং এইরকম পরিস্থিতির মোকাবিলা মাঝে মাঝেই আমাকে করতে হয়েছে । কিন্তু খিদেটা বেশ  চাগিয়ে উঠেছে আর খাবারগুলো সব তার কাছে থাকা ব্যাগে, সুতরাং,  আমার অবস্থাও বিশেষ সুবিধার নয়, তবে সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে। মাথাটা তার বেশ বড়সড় এবং  দাড়ি নিয়ে সমস্ত জানলাটা প্রায় বন্ধ ই হয়ে গেছে। সেই কারণে আমার দিকের ডান দিকের জানলা দিয়ে যতটা দেখা সম্ভব তাই দেখেই মনের স্বাদ  মেটাচ্ছি। প্লেন  চলেছে  পূর্ব থেকে পশ্চিমে, অন্ধকার তাড়া করে চলেছে আলোকে কখন ধরবে বলে। মনে হচ্ছে অ্যানিম্যাল কিংডমে চিতা তাড়া করছে হরিণের পিছনে আর হরিণ প্রাণভয়ে ছুটে চলেছে নিজেকে বাঁচানোর জন্য। দৃশ্য অপূর্ব কিন্ত দেখার বিষয়ে কখন চিতা হরিণকে ধরে। অবশেষে দৌড়ের সমাপ্তি, লাফিয়ে পড়ে অন্ধকার ধরে ফেলল ক্লান্ত আলোর শিখাকে। আমাদের চারপাশে এত সৌন্দর্য্য ছড়িয়ে আছে আমরা তার দিকে  না তাকিয়ে সামান্য বিষয়ে নিয়েই তুলকালাম করি। প্রায় সাড়ে সাতটা নাগাদ প্লেনের চাকা মাটিতে আলতোভাবে চুমু খাওয়ার জায়গায় সিনেমার ভিলেনের মতো নায়িকার সঙ্গে জবরদস্তি করার মতো ল্যাণ্ড করল এবং  প্রমাণ করল ক্যাপ্টেনের অনভিজ্ঞতা। উবের বুক করে গেস্ট হাউস পৌঁছতে প্রায় নটা বেজে গেল। খাওয়া দাওয়া সারতে বেজে গেল দশটা।কাল গাড়িতে আসবে ছেলে বৌমারা।পাঁচ শ কিলোমিটারের কিছু বেশী রাস্তা আসতে দশ ঘন্টা তো লাগবেই, এ ছাড়া রয়েছে ট্র্যাফিক জ্যাম, কতক্ষণে এসে পৌঁছাতে পারে নির্ভর করছে কত তাড়াতাড়ি বাড়ি থেকে বেরোতে পারে তার উপর। 
আমেদাবাদ শহরটা খুব অপরিচিত নয়। তবে যে ভাবে শহরটা দৈর্ঘে প্রস্থে বেড়েছে এবং দেশের দুই শীর্ষস্থানীয় নেতার বাসস্থান হবার কারণে সৌন্দর্য্য আরও ত্বরান্বিত হয়েছে । ওদের না আসা পর্যন্ত আমাদের আর কোন কাজ নেই, এদিক ওদিক  ঘোরা ছাড়া। চারদিকে ফ্লাইওভারের ছড়াছড়ি, চেনা শহরটাও যেন বিদ্রূপ করে বলছে আমি কে বল তো? সত্যিই তো ,চিনতে পারছিনা । তবে ভাগ্য ভাল উবেরের কল্যাণে গাঁঠগচ্ছা বেশী গেলনা। আগে শহর কে দুইভাগে ভাগ করা সাবরমতী নদী ছিল শীর্ণকায়,  এখানে সেখানে ইতস্ততঃ জলরাশি নদীর বুকে জমে থাকা পাথরে ধাক্কা খেয়ে ছোট ছোট তরঙ্গ সৃষ্টি করছে এটা চোখে পড়ত। কিন্তু দুই পাড়েই বেশ খানিকটা জায়গা  ভরাট করে সেখানে হয়েছে রিভার ফ্রন্ট এবং নানারকম আলোয় সজ্জিত হয়ে এক অপূর্ব মনোরম পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন বয়সী লোকজন এসে পার্কে বসে আছে এবং আলোকমালার সৌন্দর্য্য উপভোগ করছে। দেখে ভাল লাগল যে এতকর্মব্যস্ততার মধ্যেও  লোকজন একটু সময় বের করে নিতে পেরেছে । হারিয়ে যাওয়া যৌবনের কথা মনে পড়ল যে শেষ কবে সবাই একসঙ্গে এসে এইভাবে আনন্দ উপভোগ করেছি। কাজ, কাজ আর কাজ। কাজের মধ্যেই  হারিয়ে গেছে যৌবন, চোখের জ্যোতি কমেছে, দাঁতের ব্যথা থেকে মুক্তি পেতে তাকে বিদায় জানাতে হয়েছে,  পাক ধরা চুলে কলপ লাগিয়ে নিজের বয়স কমানোর চেষ্টা  হয়তো হয়েছে কিন্তু চটপটে ভাবটা তো বয়সের সঙ্গে ব্যস্তানুপাতি, তা যেন ভয়ানক ভাবে কমে গেছে। মনটাই কেমন যেন  বুড়িয়ে গেছে। কর্মজীবন এবং  পারিবারিক জীবনের মধ্যে একটা ব্যালেন্স যারা রাখতে পারেনা তাদের ই এই দশা হয়। যাই হোক ফিরে এলাম গেস্ট হাউসে ব্যথা আনন্দের  এক মিশ্র অনুভূতি নিয়ে। এক সময় মন যখন ছিল চাঙ্গা তখন কর্মব্যস্ততায় জীবনকে আনন্দময় করে তুলতে পারিনি আর আজ যখন অখণ্ড অবসর তখন শরীর ও মন বিদ্রোহ করে।
প্রায়  এগারটা বেজে গেল  গাড়ী এসে থামল গেস্ট হাউসের সামনে । ওদের ঘর ঠিক করাই ছিল । রাস্তায় খেয়ে নেওয়ায় ঐ হাঙ্গামা হলো না। অল্পবিস্তর কথার মাঝে জানতে পারলাম যে নাতনির পা মচকে গেছে এবং  নাতির ও গায়ে বেশ  জ্বর। সঙ্গে থাকা ওষুধ দেওয়া হলো কিন্তু  মানসিকভাবে একটু ধাক্কা খেলাম, আদৌ যাওয়া হবে  তো? ছেলে বৌমার জন্য খারাপ লাগছিল,  ওদের ও সেই আমাদের মতন দুর্ভাগ্য দেখে। দেখা যাক, কি হয় আগামী কাল । পরদিন ভোর বেলায় উঠে স্নান করে তৈরী হয়ে আছি। সামনের জৈন মন্দিরে এক বিবাহ সম্পন্ন হচ্ছে। মন্দির দর্শন এবং বিবাহ দর্শন, রথ দেখা কলা বেচা দুইই হলো। ফিরে এসে দেখি তখনও ঘুম ভাঙেনি ওদের। দরজায় টোকা দিয়ে জানতে পারলাম যে নাতির জ্বর বা নাতনির পায়ের ব্যথার উপশম হয়নি। সুতরাং,  মাউন্ট আবু যাওয়া আপাতত হচ্ছেনা। আমাদের কষ্ট এতটা হলোনা যতটা আমার বৌমার বা বাচ্চাদের হলো ।আমি নিজের শরীর  সম্বন্ধেও যথেষ্ট সন্দিহান  ছিলাম । কিন্তু দুঃখ যে একেবারেই  হয়নি  তা নয়, কারণ প্রজাপিতা ব্রহ্মকুমারীর  ওই মেডিটেশন হলটা আমাকে বারবার কেমন যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছিল। কোনরকম রিস্ক না নিয়ে আমার পুরনো শহরটাকেই নতুন ভাবে দেখলাম এবং  বাচ্চারাও যথাসম্ভব গাড়ি থেকে না নেমে শহরটাকে দেখল। দুপুরের  খাওয়া স্যাটিলাইটে অবস্থিত নৈবেদ্যম রেস্তোরাঁয় সেরে গেস্ট হাউসে ফিরে আসা এবং  পরদিন সকাল বেলায় বম্বের উদ্দেশ্যে যাত্রা ।
ঠিক কথাই যে মাউন্ট আবু যাওয়া হলো না কিন্তু ছেলে, বৌমা, নাতি,নাতনিদের সঙ্গে একসাথে সময় কাটানো তো আজকাল এক দুর্লভ ব্যাপার।