Thursday, 30 January 2025

অথ বিবাহ কথা

বহুদিন পর এক ধমাকাদার বিয়ের সাক্ষী হতে পারলাম । বড় শিল্পপতিদের ছেলেমেয়ের বিয়েতে আমাদের মতন উলুখাগড়াদের ড্যাব ড্যাব করে চেয়ে থাকা ছাড়া আর খবরের কাগজ বা দূরদর্শনের বিভিন্ন চ্যানেলের প্রতিযোগিতামূলক প্রদর্শনের কল্যাণে খুঁটিনাটি খবরের বিশদ বিবরণ জানা ছাড়া আর কিছুই করার  থাকেনা। যে যেমন ওজনদার, তার তেমন সমারোহ। রাজারাজড়ার ঘরের বিয়ে আমাদের মতন আমজনতার মধ্যেও একটা আনন্দের রেশ জাগিয়ে তোলে যদিও  তা সাময়িক। একজন শিল্পপতির ছেলের সঙ্গে আর এক শিল্পপতির মেয়ের  বিয়ে হলো, সারা পৃথিবীর তাবড় তাবড় নেতা মন্ত্রীর সমাগম হলো, কোটি কোটি টাকা কেমন ভুস করে উড়ে‌গেল-- অবশ্যই এক পকেট থেকে আর এক পকেটে আর আমজনতা বলতে লাগল, " কেয়া বাত হ্যায়,  শাদী হো তো অ্যায়সা''। আমরা আদার ব্যাপারী, জাহাজের খবরে কি দরকার?  না, তা ঠিক নয়, ছোটখাটো ব্যাবসাদার যদি নিষ্ঠার সঙ্গে ব্যাবসা করতে পারে তাহলে তার ভাগ্যেও শিকে ছিঁড়তে পারে। যেমন  যে পান বানায় খুব  সুন্দর,  সে পানের‌ বরাত পেতে পারে বা কেউ ভাল ঢোল বাজালে সেও ডাক পেতে পারে।

বিয়ে মানে তো একটা ছেলের  সঙ্গে  একটা মেয়ের  বিয়ে নয়, একটা পরিবারের সঙ্গে আর একটা পরিবারের মেলবন্ধন। বিয়ের ব্যাপারটা আজকাল বেশ আধুনিক  হয়ে গেছে। আগে ঘটকদের মাধ্যমে বিয়ের যোগাযোগ হতো। অমুক ঘটকের খুব নাম ডাক, ওর কাছে গেলেই বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাওয়া ছেলেমেয়েদের বিয়ে হবেই হবে। তখন কম্পিউটার না থাকলেও জাবদা খাতায়  ঠিকুজি কুলজি সব থাকত এবং  ঐ ঘটক মশাইরা যেন এক একজন জীবন্ত কম্পিউটার । তাঁর দক্ষিণা তো নাম রেজিস্ট্রেশনের সময় দিতেই হতো , এছাড়া বিয়ে হলে তাঁর  সাম্মানিক দক্ষিনাও বেশ ভাল রকম হতো যার নাম ছিল  ঘটকবিদায়। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে  ঘটকমশাইএর জায়গা নিয়েছে বিভিন্ন ম্যাট্রিমোনিয়াল । সেখানেও নাম রেজিস্ট্রি করতে হয় একটা বাঁধা সময়ের জন্য এবং এই ব্যবসাও বেশ রমরমিয়ে চলছে। আত্মীয় স্বজনের সূত্রে সম্বন্ধ এলে পাত্র পাত্রীদের সম্বন্ধে অনেক  খবর জানা যেত। চলতি কথা ছিল  উঠতি ঘরের ছেলে এবং পড়তি ঘরের মেয়ের সম্বন্ধে খোঁজ পড়ত বেশী, বড় জোর সমানে সমানে । পুরুষ শাসিত সমাজে ছেলের বাড়ির  কথাই বেশী  প্রাধান্য পাবে কিন্তু সেটা বিয়ে হওয়া ইস্তক, তার পরেই ছেলের বাবা মা বা কাকা, পিসিরা সব ব্রাত্য, তার জায়গা নেয় মেয়ের বাড়ির লোকজন  মানে মেয়ের বাবা, মা এবং মাসি বা মামারা। সুতরাং,  ঘটের বুদ্ধি একটু খরচ করলেই  সম্পর্কটা বেশ টিকিয়ে রাখা যায়।  বেশী বেগড়বাঁই করলে সম্পর্ক ফুটুস। ম্যাট্রিমোনিয়ালের মাধ্যমে যে সম্পর্কগুলো আসে সেগুলো যথেষ্ট  সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষা করতে হয় নাহলে পরে ম্যাট্রিমনি সংস্থাকে দোষ. দিয়েও বিশেষ লাভ হবেনা আর তা ছাড়া তারা দায়িত্ব নেবেই বা কেন? ওরা সমস্ত‌ দেওয়া তথ্য পরীক্ষা করে কিনা জানা নেই । তথ্য পরীক্ষা করার জন্য আলাদা সংস্থা আছে এবং তাদের সার্ভিস পেতে গেলে গাঁটের কড়ি খরচ করতে হবে । বাবা মায়ের অনেক কষ্ট লাঘব হয়ে যায় যদি ছেলে মেয়েরা নিজেদের জীবন সঙ্গী বা সঙ্গিনী বেছে নেয়। তারা অনেক দিন ধরে মেলামেশা করার ফলে বুঝতে পারে যে নিজের পছন্দের সঙ্গে কতটা মিলছে এবং  সেই হিসাবে নিজেদের জীবন সঙ্গী  বা সঙ্গিনী বেছে  নেয় । কিন্তু এ সত্ত্বেও কি সব কিছু ঠিকঠাক চলছে? না, এতেও মাঝে মধ্যে চলার পথে কিছু বাধা আসে যার অনিবার্য পরিণতি বিচ্ছেদ । খুবই দুঃখের কথা, কিন্তু বাস্তবে ঘটছে ও তাই। ছেলে, মেয়ে দুজনেই যথেষ্ট  শিক্ষিত এবং  তাদের  দুজনের  ক্যারিয়ারের গ্রাফ ই ঊর্ধমুখী কিন্তু কোন  কারণে তাদের  একই শহরে পোস্টিং না হলে দীর্ঘদিন আলাদা থাকতে হয় যার ফলে মানসিক অবসাদে ভুগতে হয় এবং  একটা স্টেজ পরে সেটা বিচ্ছিন্নতার পথে ঠেলে দেয়। এই সময় কাউকে না কাউকে একটু ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। আজকাল সবার ই নিউক্লিয়ার  ফ্যামিলি । সুতরাং  ছেলে বা মেয়েরা তাদের  বাবা মায়ের  সাধ্যানুযায়ী যত্নে বেড়ে ওঠে এবং  বিয়ের  পর সেই মানে একটু ঘাটতি হলেই অসন্তোষ  ধীরে ধীরে পুঞ্জীভূত হতে থাকে এবং বিস্ফোরক অবস্থার দিকে এগোতে থাকে। এইসময় বাবামায়ের ভূমিকা  অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ করে মায়েদের। এইসময়  কাউন্সেলিং ভয়ানক ভাবে দরকার। কাউন্সেলিং এর পরেও যদি মানিয়ে নেওয়ার অবস্থায় না যাওয়া সম্ভব হয় তাহলে তার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি  বিচ্ছেদ । এমন ও ঘটনা চোখে পড়ে যেখানে সন্তান হওয়ার  পরেও  বিচ্ছেদ  ঘটে যায় । অত্যন্ত মর্মান্তিক ঘটনা কিন্তু এর সাক্ষীও হতে হয়। আজকাল  যে কোন বিয়েই ভীষণ ব্যয়সাপেক্ষ । এত খরচ করেও যদি তার স্থায়িত্বে সন্দেহ থাকে তাহলে তাও রীতিমতো  বেদনাদায়ক ।
বিয়ে স্বভাবতঃই এক গাম্ভীর্যপূর্ণ অনুষ্ঠান । এই অনুষ্ঠানে  একটু হালকা মেজাজ আনার জন্য  ঠাকুমা দিদিমাদের এক বিরাট দায়িত্ব ছিল। নানারকম ছড়া বা কবিতা তাঁরা লিখতেন এবং পুস্তিকার আকারে তা প্রকাশ করা হতো।আইবুড়ো ভাত(অনূঢ় বা অনূঢ়া অবস্থায় ভাত খাওয়া) একটা খুব বড়সড় অনুষ্ঠান ছিল ।বিয়ের দিন সকাল বেলায় পাত্রর গায়ে হলুদ  হতো এবং  সেই  হলুদ বীর মুটের কড়ি সমেত পাত্রীর বাড়ি নিয়ে যাওয়া হতো এবং  তারপর পাত্রীর গায়ে হলুদ  হতো। এরপর আর পাত্র বা পাত্রীর কোন খাবার জুটত না একটু আধটু সরবত ছাড়া ।এখন আর এত কষ্ট ছেলে মেয়েদের  দেওয়া হয়না। বিয়ের দিন দিদিমা ঠাকুমারা কিন্তু রীতিমতো নাচতেন,  এখন যেটা সঙ্গীতে হয়। এছাড়া নানারকম ছোটখাটো খেলাধূলোর মাধ্যমে এই গম্ভীর অনুষ্ঠান কে আরও কত প্রাণবন্ত করা যায় তার দিকে  খেয়াল রাখতেন। হোম এবং সপ্তপদী হিন্দুশাস্ত্রমতে বিয়ের  এক অঙ্গাঙ্গী অনুষ্ঠান  এবং  আজও তা পালন করা হয়।

সাম্প্রতিক কালে কয়েকটা বিয়েতে যোগ দিয়ে ভীষণ ভাল লাগল। দিল্লীতে তাজ হোটেলে দুই পরিবারের  একসঙ্গে থেকে বিয়ে বা জয়পুরের রাজবাড়িতে  বন্ধুর  ছেলের বিয়েতে চুটিয়ে আনন্দ করার প্রায় একবছর বাদে একটা ধমাকাদার বিয়ে হলো যেখানে আশপাশের লোকজন  সবাই মিলিতভাবে এত আনন্দ করলো যে কার বাড়ির বিয়ে প্রায় ভুলে যাবার ই দশা। ছেলের বাবা মায়ের তরফ থেকে  সমস্ত আত্মীয়স্বজনদের আগমন এবং পাড়া প্রতিবেশীদের সবার আন্তরিক  যোগদান একটা দারুণ আনন্দময় পরিস্থিতির  সৃষ্টি করেছিল ।  দিল্লী বা জয়পুরের  ডেস্টিনেশন ম্যারেজের মতন এবার ও চুটিয়ে আনন্দ করা হলো। আত্মীয় পরিজনদের সঙ্গে পাড়া প্রতিবেশীদের এই যোগদান একটা বিরল আনন্দের সৃষ্টি করেছে। সবার আশীর্বাদ ও শুভেচ্ছা  নিয়ে দাম্পত্য  জীবন শুরু হোক এই আমাদের  সবার প্রার্থনা। 

Monday, 13 January 2025

পৌষল্যা------তখন ও এখন

শীতের আমেজ শুরু হতেই পৌষল্যা বা বনভোজনের কথা মনে পড়ে এখন যার পোষাকি নাম বা ইংরেজিতে নাম পিকনিক। তখন ক্লাসের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হয়ে যেত ডিসেম্বর মাসে। নতুন বছরে নতুন ক্লাস শুরু হতো, পড়াশোনার চাপ নেই বললেই চলে, সুতরাং পৌষল্যা নিয়ে গজল্লা  বেশ রসিয়ে রসিয়ে চলত। কোথায় পৌষল্যা হবে সেটা নিয়েও তর্ক বিতর্ক বেশ জোরদার হতো এমন কি মতান্তর মনান্তরের পর্যায়েও চলে যেত। কিন্তু একটা কথা মানতেই হবে যে পৌষল্যা বা বনভোজন নিয়ে একটা ভালরকমের উন্মাদনা থাকত।
স্থান  নির্বাচনের ভার তিন চারজন ডাকাবুকোদের উপর থাকত যারা নিভৃত জায়গার সঙ্গে সঙ্গে খাওয়ার জলের ব্যবস্থা আছে এই কথাটা মাথায় রাখত। বন্ধু সার্কেল পাড়ার মধ্যে হলে সেরকম কিছু জাঁকজমক থাকত না কিন্তু ক্লাব স্তরে হলে বিভিন্ন পাড়ার ছেলেদের সমন্বয়ে বেশ বড়সড় বনভোজন বা পিকনিক হতো। সুতরাং  পৌষল্যা হচ্ছে ছোট স্তরে ( খেলার মধ্যে দুধভাত যেমন) এবং  বনভোজন বা পিকনিক হচ্ছে একটু বড় লেভেলে । যে কোন  খেলায় কাউকে দুধ ভাতে বলা হতো  যে একেবারেই ধর্তব্যের মধ্যে নয় অথচ তাকে বাদ ও দেওয়া যাবেনা।এটা একটা প্রেস্টিজ ইস্যু হয়ে যেত কারণ যাকে দুধভাতে রাখা হতো সে সবসময়ই মনে করত যে সে অন্যদের সমকক্ষ কিন্তু তার বন্ধুদের  চোখে বাচ্চা বা আনাড়ি। যাই হোক,  পৌষল্যা বা বনভোজন হতো সাধারণতঃ লোকালয়ের বাইরে কোন বড়সড় পুকুর বা বিলের পাড়ে কিংবা কোন বনের মাঝে কালিবাড়ির কাছে একটা বড়সড় গাছের নীচে যেখানে একটা চাদর বা বেডকভার  টাঙিয়ে  নেওয়া হতো এবং তার  নীচে রান্নার ব্যবস্থা করা হতো। খাবার জল কালীবাড়ির টিউব ওয়েল থেকে নেওয়া হতো এবং অন্য সব কিছু বিলের জলে করা হতো। রান্না সেরকম বিশেষ কিছু হতো না-- ভাত, ডাল, আলুভাজা বা বেগুন ভাজা, ফুলকপির তরকারি  ও ডিমের ঝোল এবং  শেষ পাতে একটু বোঁদে ও রসগোল্লা । মাংস করলে খরচাও বেশী যা বাচ্চাদের পক্ষে বাবা মায়ের কাছে  চাওয়া যেতনা এবং কেউ একটু বেশী পেল বা কম পেল তাই নিয়ে মন কষাকষির সম্ভাবনা থাকতো ।  সুতরাং মাংস বাদ আর কম খরচের মাংস বা চিকেন ছিল ই না তখন।  নিজেরাই জায়গা পরিষ্কার  করা,মশলা বাঁটা (তখন গুঁড়ো মশলার চল ছিলনা), গর্ত করে উনুন বানানো,চারদিকে গাছগাছড়া থাকায় কাঠের অভাব হতো না এবং  রান্নায় নুন কম বা ঝাল বেশী নিয়ে কেউ মাথাই ঘামাতো না। রান্নার বাসনকোসন কোন গরীব লোককে দিয়ে  মাজিয়ে নেওয়া হতো কিছু খাবার ও সামান্য পয়সার বিনিময়ে । দুর্দান্ত আনন্দ হতো এই পৌষল্যায়।  সাধারণত বাড়িতে আধখানা ডিম খাওয়া হতো কিন্তু এই পৌষল্যায় গোটা ডিম খাওয়া একটা বিরাট ব্যাপার। মোদ্দা কথা, অল্পতেই সন্তুষ্টি কারণ সেই সময় প্রত্যেক বাড়িতেই  পাঁচ সাতটা ছেলেমেয়ে নিয়ে কোন পিসি বা কাকা থাকায় প্রায়  দশজনের মুখে  খাবার জোগানো বড় সহজ ব্যাপার ছিলনা। নিজেরা সমস্ত কাজ করায়  আনন্দের মাত্রা ছিল আকাশ ছোঁয়া। 
ক্লাব স্তরে যখন পিকনিক হতো তখন আমরা নিতান্ত  ছোট হওয়ায় ক্লাবের দাদারাই সব মাথা এবং  ব্যবস্থাপনা তাদের ই। সকাল বেলায় স্নান করে ক্লাবে হাজির  হওয়া এবং লাইন দিয়ে মাড়োয়ারি বাগানে যাওয়া। ঐ বিশাল বাগানবাড়ির নাম কেন মাড়োয়ারি বাগান হয়েছিল তা জানিনা তবে পঞ্চানন তলা থেকে জঙ্গলের পথে আরও মাইলখানেক গেলে পড়ত সেই ফাটক ওয়ালা বিশাল বাগানবাড়ি। অনেকগুলো বাঁধানো পুকুর , নানা ফুল ফলের গাছে ভরা বিশাল বাগানের মধ্যে এক পোড়ো রাজবাড়ি যার আশে পাশে গেলেই গা ছমছম করতো। ভুটানদার ওপর ভার ছিল  আমাদের  সামলানো। আমার দেখা একজন অত্যন্ত নিষ্ঠাবান ভদ্রলোক  যাঁর হাতের ছড়ি কখন যে কার মাথায় পড়বে একটু বেচাল হলেই , কেউ বলতে পারতনা। আর এইরকম দুর্ধর্ষ বোম্বেটেদের সামলানো ঐ ছড়ি ছাড়া সম্ভব হতো‌ না বলেই মনে হয়। কিন্তু কাজ যে একেবারেই কিছু করতে হতো না তা হয়, নতুন  আলুর খোসা বস্তায় ঘসে ওঠাতে হতো। রান্নার ভার রঘুদার ওপর। দুলু দা, বুড়োদা, শক্তি দা, মনা দা, চঞ্চলদা, দোদা দা,মোহন দা, মদন দা, রবি দা, প্রণব দা, কাজল দা, ভুটান দা, পল্টু দা, মিলি দা, ছোকুদা, বীরেনদা ছাড়াও আরও অনেকেই থাকতেন  এই পিকনিকে । খাওয়াদাওয়া সারতে সারতে ছোট দিনের বেলা গড়িয়ে যে কখন সন্ধে হয়ে যেত বুঝতেই  পারতাম না।  সকাল বেলায় পিকনিক স্পটে পৌঁছানোর পর  ডিমসেদ্ধ, পাঁউরুটি ও কলা দিয়ে টিফিন খাওয়া হতো। আলুর খোসা ছাড়ানোর পরেই দড়ি ছাড়া গরুর মতো এদিক সেদিক করে কুল  বা পেয়ারা পেড়ে খাওয়া  হতো। লম্বা লম্বা নারকেল গাছ থেকে  নারকেল  পাড়া আমাদের  কম্মো ছিলনা কিন্তু  ব্রজেন দা পুকুর পাড়ে নারকেল গাছে তরতরিয়ে উঠত এবং  নারকেল পাড়তো। কোন কোন সময় দুচারটে নারকেল পুকুরের জলেও পড়ে যেত। পুকুরগুলো সব বাঁধানো ছিল মানে যাঁদের বাড়ি ছিল তাঁরা  বেশ বড়মাপের জমিদার বা রাজা ছিলেন। অত লোকের রান্না হতে যথেষ্ট  সময়  লাগত আর এর মধ্যেই মনাদার গল্প ও চুটকি সবার মন ভরিয়ে দিত। এইরকম জমজমাট পিকনিক জীবনেও ভোলার নয় কারণ এখানে ছোট বড়সড় সবাইকেই কিছু দায়িত্ব  দেওয়া হতো এবং প্রত্যেকেই সেটা আনন্দের সঙ্গে করতো যেটা এখনকার পিকনিকের থেকে অনেক আলাদা। এখন কাছাকাছি  পিকনিক  স্পট নেই বললেই চলে। লোকসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য আশপাশের ফাঁকা জায়গাগুলোয় বাড়ি ঘর হয়ে গেছে এবং বড়সড় জায়গা খুঁজতে গেলে যেতে হবে গাড়িতে বা বাসে বা ট্রেনে । লোকসংখ্যা বেশী হলে একটা বাসেও হবেনা, অনেক গাড়ি বা বাসের সংখ্যা বাড়াতে হবে। এ ছাড়া লোকজন বেশী হলে গ্রুপের মধ্যে যে বাঁধন সেটা বহুলাংশেই শিথিল হয়ে যায় । তখন নামেই একটা বড়দলের পিকনিক  কিন্তু তা ছোট ছোট  অনেক গ্রুপের  সমন্বয় । এই গ্রুপের লোকের  সঙ্গে ঐ গ্রুপের  লোকের  বিশেষ  সদ্ভাব নেই। সুতরাং জমাটে পিকনিক  হবার  সম্ভাবনা খুব কম । এ ছাড়া নিজেদের  যোগদান, না থাকার ই সামিল। চাঁদা দিয়েই খালাস। কতটা পেলাম প্রতিদানে এই নিয়ে হিসেব কষতে কষতেই আনন্দের  দফারফা। এছাড়া রয়েছে ক্যাটারার, তারাই খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারটা দেখে বলে পিকনিকে অংশগ্রহণকারীদের ভূমিকা অত্যন্ত নগণ্য। তবুও  এরই মধ্যে দুএকজন বিশেষ  ভূমিকা পালন করেন বলে এখনও এর মধ্যেই কিছু  আনন্দ পাওয়া যায় । এঁরা যদি কোন কারণে  দায়িত্ব  না নেন তাহলে পিকনিকটাই হয়তো বন্ধ হয়ে যাবে। এখন সবকিছুই যেমন নিউক্লিয়ার,  গ্রুপটাও সেরকম নিউক্লিয়ার বাঊ আঁটোসাঁটো হওয়া দরকার । এঁরা আছেন বলে আজ ও কিছু আনন্দ পিকনিকে  পাওয়া যায়। 
আজকের দিনে পিকনিক অবশ্য সারাবছর ধরেই হয় বলে এখানে সেখানে বহু রিসর্ট হয়েছে এবং ঠা ঠা রোদেও এয়ার কণ্ডিশনড ঘরে বসে দিব্যি রমরম করে পিকনিক ও চলছে আর রিসর্টগুলোও চলছে। এখন পৌষল্যা পৌষমাসেই আবদ্ধ নেই, নাম বদলে পিকনিক  হয়েছে এবং বার মাস ধরে চলছে।

Friday, 10 January 2025

প্রত্যাবর্তন

হঠাৎই একটা মেসেজ এল পাশের বাড়ির মেসোমশাই  গতকাল রাতে  অমৃতলোকে যাত্রা করেছেন। একাই থাকতেন তিনি স্ত্রী বিয়োগের পর। এক ছেলে ও এক মেয়ে বিদেশে থাকে, তারা তাদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। মাঝে মধ্যে আসে তারা বাবা মায়ের সঙ্গে সময় কাটাতে তাদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে । রবি বাবু ও তাঁর স্ত্রী সুকন্যা দেবী খুশীতে ডগমগ হয়ে উঠতেন, বিশাল বাড়িটা  ঝলমলিয়ে উঠত বাচ্চাদের কলরবে। কয়েকটা দিন হৈচৈ,  তারপরেই ঝিমিয়ে পড়ত গেট ওয়ালা বাড়িটা। কেউ এলে গেলে মাসিমা বলতেন, "বাবা, গেট টা লাগিয়ে দিয়ে যেও। "সেই মাসিমা ও চলে গেছেন গতবছর। তারপরেই রবি বাবুর একাকীত্ব শুরু। লোকজনের আসা যাওয়া কমে গেছে। একটু আধটু লেখাজোখা করে খানিকটা সময় কাটে কিন্তু  দীর্ঘ সময় তো আর কাটতেই চায়না। বেশীক্ষণ লিখতেও আর ভাল লাগেনা। আগে যখন স্ত্রী বেঁচে ছিল তখন লেখার সময় অবধারিতভাবে বলত যে বাজারে যাও সকাল সকাল নাহলে ঐ ঝটতি পটতি জিনিসগুলো তোমার থলিতে ঢুকবে আর আমার প্রাণান্ত। খুবই বিরক্ত হয়ে কলমটা টেবিলের ওপর আছড়ে ফেলে থলিটা নিয়ে বেরিয়ে যেতেন। রাগের মাথায় জিনিস পত্র আনাতেও গণ্ডগোল হয়েযেত যার অবশ্যম্ভাবী ফল গিন্নীর গনগনানি। তখন বিরক্তির মাত্রা আরও বেড়ে যেত কিন্তু আজ কেউ পিছনে  টিকটিক করার নেই, চোখা চোখা বাণে কেউ বিদ্ধ করার নেই,  আছে শুধু নিস্তব্ধতা, তবু লিখতে মন আর চায়না।  পিছন থেকে  খানিকটা বিদ্রূপাত্মক শব্দ উড়ে না এলে কলম যেন আগে বাড়তেই চায়না। সেও যেন বুঝে গেছে ঝাঁকানি শেষ অতএব দাও ক্ষান্তি। রবিবাবু ও বুঝতে পারেন সুকন্যার অনুপস্থিতি তাঁকে নিরুৎসাহী করে তুলেছে। প্রকাশকের তাগাদাও তাঁকে আর উজ্জ্বীবিত করতে পারছে না। অথচ, না লিখলেও পয়সা আসবে না,সঞ্চিত পুঁজিতে পড়বে টান। জীবনের উপান্তে এসে ছেলেমেয়েদের কাছে নিজের  কোন চাহিদার কথা বলতে খুব কুণ্ঠা বোধ হয় । সেই জন্য এক রকম বাধ্য হয়েই কলম খুলে বসতে হয়। কি যেন লিখছিলাম ভুলে গেছি, প্রথম থেকে একবার পড়ে নিয়ে খেই ধরতে হয়। তবু সেই তখনকার মনের অবস্থায়  ফিরে যেতে যথেষ্ট অসুবিধা হচ্ছে। লেখক এক, বিষয় এক, কলম ও এক কিন্তু ভিন্ন মন । গল্পের গতি ভিন্নমুখী।রবি বাবু ভাবেন এটা নিশ্চয়ই সব লেখকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য কারণ শয়ে শয়ে পাতার উপন্যাস তো আর একটা সিটিং এ লেখা সম্ভব নয়। সুতরাং ভিন্ন মানসিকতায় শেষ হয় এই দীর্ঘ উপন্যাস। যাঁরা সেই গতি প্রকৃতি এক ধারায় রাখতে পারেন তাঁরা সত্যিই নমস্য।
কদিন ধরেই  শরীরটা বিশেষ  ভাল যাচ্ছেনা। অল্প অল্প জ্বর, প্যারাসিটামল খেয়ে জ্বর নেমে যাচ্ছে আবার খানিকক্ষণ বাদেই যে কে সেই। বন্ধুবান্ধব আসছে দেখা করতে,  নিয়েও যেতে চাইছে ডাক্তারের কাছে কিন্তু রবি বাবুর মন আর সরছে না। কেবল ই মনে পড়ছে শৈশবের কথা,  ধোপঘাটির মাঠে ফুটবল খেলার কথা এবং খেলা শেষে বৈঁচি পাড়ার কথা,  মণ্ডল বাড়ির বাতাপি লেবু বা ভাদুড়িদের বাড়ির নারকেল চুরির কথা । এক কথায় শৈশবের হাতছানি আর উপেক্ষা করতে পারছেন না রবি বাবু । কাজের মেয়ে রান্না করে যাবার সময় বলে গেল গরম গরম খাবার খেয়ে নিও, ঠাণ্ডা খাবার খেওনা, শরীরটা তোমার ভাল নেই । রবি বাবু কোন উত্তর দিলেননা। ল্যাচটা টেনে দিয়ে চলে গেল দীপা। রবি বাবু কিন্তু সেই শৈশবের দিনগুলোয়  মত্ত, কোনরকম ভ্রূক্ষেপ করলেন না।
দীপা পরদিন সকালে এসে চাবি খুলে ঢুকে দেখে খাবার টেবিলে রাতের খাবার  যেমনকার তেমন সাজানোই আছে। ঘরে ঢুকে দেখে রবিবাবু যেমনভাবে শুয়েছিলেন তেমন ভবেই শুয়ে আছেন, ঠোঁটের ফাঁকে একটু মুচকি হাসি কিন্তু শরীরটা যেন স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশী রকম ই ঠাণ্ডা। কাকু,কাকু বলে অনেক ডাকার পরেও কোন  উত্তর না পেয়ে চিৎকার করে উঠে সবাইকে ডেকে আনল। পাড়ার ডাক্তার বীরেন ভট্টাচার্য এসে পরীক্ষা করে দেখে বললেন, " নাহ্, সব শেষ । কিন্তু ছেলে মেয়ে  কেউই নেই এখানে, খবর দিতে হবে দেহ সৎকারের জন্য। অতএব খবর দিতে হলো পীস হ্যাভেনে। গাড়ি এসে গেছে রবি বাবুর নিথর দেহটা নিয়ে যাওয়ার জন্য। দীপা সারাক্ষণ ই কাঁদছিল ।মুখে মৃদুহাসি  নিয়ে রবি বাবু চললেন শৈশবের বন্ধুদের উদ্দেশ্যে  যেখানে রয়েছে  নিমাই, দেবু, বাবু, মোহন, বিজয়রা ডাণ্ডা গুলি নিয়ে, রয়েছে ছোট বল পিট্টু খেলার জন্য, যেটা রবি বলবে সেটাই খেলবে কারণ আজ ওই হচ্ছে প্রধান অতিথি ।