সুখ কি, কত রকমের সুখ আছে এইসব নিয়ে চিন্তা করলে দেখা যাবে যে আকাশে কটা তারা আছে এই নিয়ে কেউ যেন প্রশ্ন করছে।সুখ কি এটা বলা ভীষণ কঠিন । বিরাট বড়লোক, অনেক টাকা পয়সা গাড়ি বাড়ি চাকর বাকর, দারোয়ান ঢুকতে বেরোতে সেলাম ঠোকে কিন্তু নরম গদিতে শুয়েও তার দুটো চোখের পাতা এক করতে পারেনা অথচ ফুটপাতে থাকা অভুক্ত, অর্ধভুক্ত লোকেরা তার সম্বলের ছেঁড়া মাদুরের ওপর শুয়েই মরার মতন ঘুমায়। সুতরাং টাকা পয়সাই সুখের মানদণ্ড হতে পারেনা। কেউ জ্ঞান পিপাসু, বইয়ের মধ্যে ডুবে থেকেই ঘোর মগ্ন হয়ে থাকেন বা কেউ চিত্রকর তাঁর শিল্পকীর্তির মধ্যেই ডুবে থাকেন বা কোন সঙ্গীত শিল্পী তাঁর সুরের সাগরে নিমজ্জিত থাকেন।কেউ ভগবানের চিন্তায় মগ্ন থাকতে ভালবাসেন আবার কেউবা পরোপকারে নিজেকে ব্যস্ত রেখে সুখ পান আবার কেউ চৌর্য্য বৃত্তিতে খুশী থাকেন । সুতরাং, এক একজনের কাছে সুখের সংজ্ঞা এক একরকম। সুতরাং কিসে যে সুখ মিলবে একথা কেউ জোর গলায় বলতে পারবে না। একই বই সবাই পড়লেও বিভিন্ন জনের উপলব্ধি বিভিন্ন রকম ।
জন্ম ইস্তক আমরা সবাই ছুটছি কিন্তু দিশা সবার ভিন্ন। তবে সুখ পাওয়ার একটা মোটামুটি শর্টকাট রাস্তা হচ্ছে যে জ্ঞানত কারও কোন ক্ষতি করা বা ক্ষতির চিন্তা করায় বিরত থাকলে অনেকটাই আনন্দ পাওয়া যায়। পরনিন্দা বা পরশ্রীকাতরতা থেকে যদি নিজেকে দূরে রাখা যায় তাহলেও অনেক মানসিক শান্তি বজায় থাকে। মানুষের বড় হওয়ার উপর অনেকটাই নির্ভর করে মানসিক গঠন এবং সে কিভাবে সুখের সন্ধানে নিজেকে ব্যাপৃত করবে তা ও নির্ভর করে সেই মানসিক গঠনের উপর।
কেউ একাকীত্ব পছন্দ করে আবার কেউ লোকজনের সংসর্গ ভালবাসে। অনেকেই বলে যে ও একদম লোকের সঙ্গে মিশতে পারেনা। মনের দরজা খুলে বাইরে না বেরোলে একাকীত্ব কাটবে কি করে? গতকাল কয়েকটা সত্তরোর্ধ্ব একই স্কুলে পড়া বুড়ো(কিন্তু মনে মনে যুবক) তাদের বুড়িদের নিয়ে যেরকম হৈচৈ করল তাতে আশপাশের লোকজন একটু শঙ্কিত ই হয়ে উঠেছিল আর ভাবছিল এরা সবাই প্রকৃতিস্থ আছে তো? বুড়োগুলো সবাই স্বকীয়তায় মহীয়ান কিন্তু তারা ফিরে গেছিল তাদের স্কুল জীবনে পুরনো দিনের স্মৃতিচারণায়। কোন স্যার কিভাবে পড়াতেন, তাঁদের মুদ্রাদোষ নিয়ে আলোচনা, বেঞ্চের উপর দাঁড়ানো, টিফিন চুরি, অন্যের ব্যাগ দিয়ে চেয়ার মুছে নেওয়া, লিখতে লিখতে ফাউন্টেন পেনের কালি শেষ হয়ে গেলে পাশের বন্ধুর কাছ থেকে দুফোঁটা কালি নিয়ে আবার লেখা শুরু করা, পরীক্ষার সময়ে বাথরুম গিয়ে কারো কাছ থেকে কোন অজানা প্রশ্নের উত্তর জেনে নেওয়া বা ট্যারা স্যারের পরীক্ষায় গার্ড দেওয়ার পদ্ধতি নিয়ে হাসাহাসিতে ওই বন্ধুরাই শুধু নয়,তাদের বুড়িরা এবং আশপাশের লোকজন সবাই হাঁ করে শুনছিল তাদের কথা। আরও একজন তাদের স্কুলের সহপাঠী শুনেই বলল তোরা লাঞ্চ টা শুরু কর ঘন্টা দুয়েক বাদে কারণ ও তখন তার স্ত্রীকে হাসপাতালে ভর্তি করছিল, পরদিন তার অপারেশন হওয়ার কথা । এইরকম অনাবিল আনন্দের স্বাদ কজন নিতে পারে? স্ট্যাম্প কালেকশন এবং বদলা বদলি করা বা স্কুলের টিফিনের সময় পাশেই থাকা মেয়েদের স্কুলের দিকে একটা চক্কর মেরে আসা বা লরি বোঝাই আখের মধ্যে থেকে একটা আখ টেনে বার করার কি টেকনিক তা নিয়ে ও যথেষ্ট আলোচনায় সবাই মশগুল ।হয়তো আশপাশের লোকজন ভাবছিল যে খুশীতে বুড়োগুলো পাগল হয়ে গেছে । বেঙ্গল হাটারিতে লাঞ্চ সেরে এবং সেখানকার কর্ণধার পার্থ ঘোষাল এবং তাঁর পুরো টিমের সহযোগীতায় এই বুড়োবুড়িদের দল তাঁদের শৈশবে ফিরে গেছিল । সেখানে একপ্রস্থ হৈচৈ করে পরের গন্তব্যস্থল যতীন দাস রোডের উদিপীতে কফি খাওয়া। ওখানকার কফি একটা আলাদা মাত্রা আনে স্বাদে।ওখানকার একটা বিশেষ জায়গা ছয়টি সরু দেবদারু গাছের একটা শেড যেখানে সচরাচর জায়গাই মেলেনা সেইখানে ভগবানের বিশেষ দয়ায় মিলল ঠাঁই এবং সেখানেও ঘন্টা দুয়েক আড্ডা বুড়োবুড়িদের একটু বাড়তি অক্সিজেন যোগাল। সবাই এই জায়গায় বসার অপেক্ষায় থাকে এবং এই বুড়ো খোকাখুকিরা গাড়িতে ওঠামাত্র জায়গাটা ভরে গেল নতুন দলের দ্বারা ।
এই ধরণের আনন্দ বা খুশী খু়ঁজতে কোন অনৈতিক কাজের প্রয়োজন পড়েনা এবং বন্ধুদের সাহচর্য জীবনে এক আলাদা মাত্রা যোগ করে। মানুষ হয়ে যখন জন্ম হয়েছে তখন একদিন তার পরিসমাপ্তি হবেই কিন্তু এই স্বল্প দিনের মেয়াদে কে কতটা সুখের ঝুলি ভরতে পারে সেটাই দেখার ।
No comments:
Post a Comment