Friday, 22 August 2025

পাণ্ডবদের বড়ঘুটু অভিযান

বিশাখাপটনমের পঞ্চপাণ্ডবরা কেরালা সফরের পরেই কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেছে। বয়সজনিত কারণে তারা সেই আগের মতো মন হলেই বেরিয়ে পড়তে পারছেন না। অর্জুন ও গাণ্ডীব নিয়ে সেইরকম টঙ্কার দিতে পারছেন না। এই নাটকের দলের কুশীলবরা বয়সের ভারে কেমন যেন ন্যূব্জ কুব্জ হয়ে পড়েছেন বা জীবনের নানান সমস্যায় জড়িয়ে পড়েছেন এবং প্রাথমিকতাও স্বাভাবিক ভাবেই বদলে যাচ্ছে। যুধিষ্ঠির এবং তাঁর ভার্যা দেবিকার দুইজনেরই হাঁটু প্রতিস্থাপন হয়েছে, ভগ্নী দুঃশলা যিনি যুধিষ্ঠিরের সঙ্গেই থাকতেন তাঁর ও নিম্নাঙ্গ অবশ হয়ে গেছে, ভীম ও ভালন্ধারা কেরালা সফরের পরেই অসুস্থতার কারণে গদা সঞ্চালনে প্রায় অক্ষম, অর্জুন ও অপারেশনের পরে গাণ্ডীবের টঙ্কারে সেইরকম ভীতি সঞ্চার না করলেও অনেকটাই পুরনো ফর্মে ফিরে এসেছেন। সুভদ্রাই বা কেন পিছিয়ে থাকবেন, তাঁর ও অপারেশন হয়েছে। নকুলের গলব্লাডার অপারেশন ও কারেনুমতির হাঁটু প্রতিস্থাপন ও সহদেবের হাঁটু প্রতিস্থাপন হয়েছে কিন্তু তিনি কিছুটা হলেও সামলে উঠেছেন। অতএব কোন নতুন নাটক মঞ্চস্থ করতে গেলে যুধিষ্ঠির ও ভীমের বদলি চাই ই চাই। গতবছর ২১শে আগস্ট আরাকুভ্যালি অভিযানে যুধিষ্ঠির, দেবিকা, ভীম ও ভালন্ধারার বদলি পাওয়া না গেলেও  পাওয়া গিয়েছিল কৃষ্ণ ও রুক্মিণী  এবং ধৃষ্টদ্যুম্ন ও ধানুমতীকে কিন্তু দুঃশলা বোনের বদলি না পাওয়ায় চিত্রনাট্যে কিছু রদবদল করতে হয়েছিল এবং সহোদর জায়া বিজয়া ও সুদূর আমেরিকায় পাড়ি দিয়েছিলেন। নকুল ও কারেনুমতিও সেই অভিযানে ছিলেন না এবং এবার ও সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহেই আমেরিকার উদ্দেশ্যে আকাশ মার্গে যাত্রা করবেন। আমেরিকা থেকে সদ্যফেরত অর্জুন ও সুভদ্রার উপর একটা বাড়তি চাপ স্বভাবতই রয়েছে কোন অভিযানের পরিকল্পনা করা নিয়ে। বরাবরের মতই পাণ্ডবত্রাতা বিচক্ষণ অর্জুন সহদেবকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ভ্রমণ সহায়ক বিভাগের ডালহৌসি স্কোয়ারের অফিসে। পরিকল্পনা ছিল দুর্গাপুর নিবাসী ধৃষ্টদ্যুম্নকে নিয়ে মাইথন অভিযানে কিন্তু মনোমত গেস্ট হাউস না পাওয়ায় লালমাটির দেশ মুকুট মনিপুরের অদূরে বড়ঘুটু অতিথি নিবাসে ব্যবস্থা হলো ২০শে আগস্ট একদিনের জন্য। মুকুটমনিপুরের কথা মনে পড়তেই কার যেন লেখা কয়েকটি ছন্দোবদ্ধ শব্দ মনে পড়ে গেল ,
"বাঁধের জলে ভোরের আকাশ ,
বৃষ্টি সবুজ জংলা দুপুর,
লালমাটিতে সন্ধ্যে মেশে,
ধামসা মাদল সাঁওতালি সুর,
ঘরের কাছেই মোটেই না দূর,
চলুন এবার মুকুট মনিপুর।"
দেখতে দেখতে ছয়টা বছর কিভাবে কেটে গেছে জানিনা, তবে স্মৃতিতে এখনও যথেষ্ট সতেজ। পিয়ারলেস গেস্ট হাউসে ভীম ও ভালন্ধারাকে একটা কটেজে ঢুকিয়ে দিয়ে দেবিকা, সুভদ্রা, বিজয়া ও দুঃশলা একটা বড় ঘরে এবং যুধিষ্ঠির, অর্জুন ও সহদেব আরও একটি ঘরে দারুণ আনন্দে রাত কাটিয়েছিল। সকাল বেলায় চায়ের আসর দেবিকা, বিজয়া ও সুভদ্রাদের ঘরে বসেছিল এবং যথারীতি দুঃশলা চায়ের সঙ্গে বিস্কুট ও কেকের ব্যবস্থা করেছিল। আগের দিন রাতে অনেক রাত অবধি হাউসি খেলা তাদের ঘুমের মাত্রা কমিয়ে দিলেও উৎসাহে কিন্তু এতটুকু ভাটা পড়েনি। জলখাবার খেয়েই মুকুটমনিপুরের নদীর জলে নৌকা বিহার ছিল এক আলাদা অভিজ্ঞতা। এই স্মৃতি মনে পড়তেই গুনগুন করে গানের কলি মনে পড়ে গেল," অলি বারবার ফিরে আসে, অলি বারবার ফিরে যায়।" মুকুটমনিপু্রের কাছেই এই বড়ঘুটু অতিথি নিবাস।
তাই বেশ, নাই মামার চাইতে তো কানা মামা ভাল। 
অর্জুনের ব্যবস্থাপনা একদম ঠিকঠাক। ২০শে আগস্ট গাড়িতে বসে সকাল ৬টায় রওনা দিয়ে ৬টা বেজে ২০ মিনিটে সহদেবকে তুলে৬টা ৪৫ মিনিটে নকুল ও কারেনুমতিকে তোলা হলো। এরপর ধানুমতিকে (ধৃষ্টদ্যুম্ন জায়া )তুলে যাত্রা শুরু হলো দুর্গাপুরের পথে যেখানে আছেন ধৃষ্টদ্যুম্ন । বিজয়া মেয়ের কাছে ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকার জন্য এবং কৃষ্ণ ও রুক্মিণীর ঐদিন ই আমেরিকার পথে যাত্রা করার জন্য এই বড়ঘুটু অভিযানে সামিল হননি। প্রাতরাশ সারার জন্য বাছাই হলো গুড়াপস্থিত হিন্দুস্তান ধাবা। আলুর পরোটা ও লুচির মতো পুরি ও ছোলার ডাল এবং মিষ্টি ও চা দিয়ে প্রাতরাশ সেরে দুর্গাপুরের পথে ধৃষ্টদ্যুম্নকে তোলার ব্যবস্থা হলো এবং বড়ঘুটু পৌঁছাতে হয়ে গেল প্রায় আড়াইটা। চেক ইন করেই খেতে বসে যাওয়া। ম্যানেজার শান্তনু ঘোষকে বলেই রাখা ছিল নিরামিষ থালির কথা। ঘি, বেগুন ভাজা, মুগডালের সঙ্গে পোস্তর বড়া ও দুরকম তরকারি ও চাটনি পাঁপড় ভাজা ও মিষ্টি দিয়ে দারুণ সুস্বাদু খাবার আর তার সঙ্গে নরেন কর্মকার, ভবতোষ দেব(বাসু) ও প্রতীক দাসের আতিথেয়তা ভুলিয়ে দিল গেস্টহাউসের খামতি। সরকারি গেস্টহাউসের এইখানেই সীমাবদ্ধতা। কি করলে যে কাস্টমার আরও ভালভাবে উপভোগ করবে সেইদিকে নজর দেওয়াটা তাদের প্রাথমিকতার মধ্যে পড়ে কিনা সন্দেহ আছে। কিন্তু এইসমস্ত ছেলে বা কর্মীদের আন্তরিকতা সত্যিই মনে রাখার মতো। বুকিং করার সময় অফিসের ম্যানেজারের যা বক্তব্য তার সঙ্গে কিন্তু বিস্তর তফাৎ। যাই হোক, সূর্যাস্ত দেখার জন্য ঐ অতিথিশালার মধ্যেই টিলায় উঠতে হলো এবং নয়নাভিরাম দৃশ্য মোবাইলে ক্যামেরাবন্দী হলো। ওখানে আসা আর একজন অতিথি সাবধান করে দিলেন বিছে ও কাঁকড়াবিছে সম্বন্ধে। বেসিনের কল খুলতেই ইঞ্চি নয়েক একটা তেঁতুল বিছের ছবি দেখালেন এবং জামা কাপড় বা মোজা জুতো পরার আগে ভাল করে নে
ঝেড়ে নিতে বললেন। ভয় ধরে গেল মনে, রাতে ঘুমোচ্ছি, হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল , টর্চ জ্বেলে দেখে নিলাম যে কোন বিছের আগমন হয়েছে কিনা। আমাদের ড্রাইভার জগদীশ বাইরে বেঞ্চে বসে রাতের নিস্তব্ধতা উপভোগ করছিল, হঠাৎ একটা চিরচিরে জ্বলুনি -- একটা ছোট বিছের আক্রমণ। সময়মতো সেটাকে মুক্ত করেছে বলেই বেঁচে গেল নাহলে ফিরে আসা একটা দুষ্কর কাজ হয়ে যেত। রাতে দেশী কায়দায় চিকেন কারি ও রুটি এবং শেষে মিষ্টি আলাদা মাত্রা আনল।
পরদিন সকাল। ভোরবেলা সহদেব ও ধৃষ্টদ্যুম্ন বেরিয়েছে গ্রাম দেখতে, সঙ্গে সাথী লাল্টু, পল্টু, ঘন্টু ও চুটকি। দূর থেকে আসা লোকজনদের জিজ্ঞেস করছি কোথায় চা ও বিস্কুট ( লাল্টু, পল্টুদের জন্য) পাওয়া যেতে পারে। গতকাল পৌঁছানোর পরেই ওরা আমাদের সাথী। গ্রামের জীব তো, শহরের প্যাঁচ পয়জার ওদের মধ্যে ঢোকেনি। গায়ে, মাথায় হাত বোলানোর অভ্যেসটা বন্ধু দাশুর কাছ থেকে পাওয়া। একটু ভালবাসাতেই তাদের লেজ নাড়ানোয় কমতি নেই। ধৃষ্টদ্যুম্ন গিয়ে ওপর থেকে টাকা নিয়ে এল আর আমরা একে তাকে জিজ্ঞেস করতে করতে কখন দু কিলোমিটার চলে এসেছি চায়ের তেষ্টা মেটাতে ও সঙ্গী সাথীদের বিস্কুটের চাহিদা জোগাতে। গাঁয়ের ছেলেমেয়েরা দাঁতন করছে এবং পথনির্দেশ করছে কোথায় দোকান পাওয়া যাবে। অবশেষে গ্রামের বেশ ভেতরে চলে এসেছি। চা যদিও ভাগ্যে জুটলো না কিন্তু আমাদের সহযোগীদের জন্য বিস্কুট পাওয়া গেল। তিন প্যাকেট বিস্কুট কিনে আমরা ওদের খাওয়াতে খাওয়াতে ফিরে এলাম এবং চা খেয়েই উঠলাম। স্নান সেরে ব্রেকফাস্ট ( কমপ্লিমেন্টারি বা ফোঁকটে) করলাম, এককথায় দুর্দান্ত।পৌনে দশটা নাগাদ মালপত্র নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম এবং কাঁসাই শিলাই এর সঙ্গমস্থলে এলাম এবং বাঁধের ওপর উঠে নয়নাভিরাম দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করে রওনা দিলাম দুর্গাপুরের উদ্দেশ্যে। মাঝপথে শুরু  হলো বৃষ্টি এবং তার নাচন কোঁদনে রীতিমতো  ভয় ধরে গেল। দেখতে দেখতে দু্র্গাপু্র এসে গেল। ধৃষ্টদ্যুম্ন আর ধানুমতী লাঞ্চ সেরে ওখানেই থেকে গেল আর অর্জুন, সুভদ্রা, নকুল, কারেনুমতি ও সহদেব ফিরে এল কলকাতায়। ছোট্ট অথচ নিটোল অভিযান,মনে রাখার মতো।

Sunday, 17 August 2025

দাসুর পশুপ্রেম

মফস্বলের ছেলে দাশু একেবারে এলেবেলে ছেলে না হলেও খুব ভাল কিছু ও নয়। মোটামুটি ভাবে পাশ করে যায়। একটু হাঁফালো চেহারা বলে বন্ধুদের উপর খবরদারি করা স্বভাব আছে। তবে মনটা বেশ ভাল আর পশুপাখির প্রতি ওর একটা স্বভাবসিদ্ধ প্রেম বা আকর্ষণ আছে। ছোটবেলায় কোন স্যার পড়িয়েছিলেন "বহুরূপে সম্মুখে তোমার ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর
জীবে প্রেম করে যেইজন সেইজন সেবিছে ঈশ্বর" ওর মনে ভীষণ ভাবে গেঁথে গিয়েছিল। ছোট থেকেই একটু ক্যাবলা গোছের দাশু পকেটে মুড়ি কিংবা বিস্কুট নিয়ে বেরোত এবং পাড়ার কুকুর লালু, ভোলা, টমি ও তাদের সাঙ্গোপাঙ্গোরা সব ওর পিছন পিছন চলত এবং নিজেদের সীমানা অবধি তো যেত ই , দলবেঁধে অন্যদের ডেরায় ও কখনো সখনো চলে যেত। অনেকেই ওকে ঠাট্টা করে বলতো হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা। কিন্তু সাদাসিধে টাইপের দাশু কিছু মনে করতো না, বরঞ্চ কুকুর বিড়াল বা পশুপাখির মধ্যেই যেন ও ভাল থাকত কারণ অন্য বন্ধুরা ওকে দেখলেই টিটকারী মারত যেটা ওর পছন্দের ছিলনা এবং প্রতিবাদ করলেই ঝগড়াঝাঁটি এবং কোন কোন সময় তা হাতাহাতির পর্যায়েও চলে যেত। তার থেকে ঢের গুনে ভাল এই অবলা জীবজন্তুগুলোর মধ্যে থাকা।  এই পৃথিবীতে সবাই একটু গুরুত্ব পেতে চায়, দাশুই বা তার ব্যতিক্রম কিভাবে হবে? লালু, ভোলা, টমিরা কোন প্রতিবাদ করেনা, ওরা মাঝেমধ্যে একটু মুড়ি বা বিস্কুট পেয়েই সন্তুষ্ট। ওপর বয়সী অন্য ছেলেরা কুকুর দেখলেই ইটের টুকরো তাক করে ছুঁড়ত আর কখনো পায়ে বা গায়ে লাগলে কাঁই কাঁই করে আর্তনাদ করত আর ওদের আর্তনাদ শুনলেই দাশু ঠিক থাকতে না পেরে তাড়া করত যে ঢিল ছুঁড়েছে তার প্রতি এবং তাকে পাকড়াও করে দুচার থাপ্পড় লাগিয়ে দিত। আর এই কারণেই এসব সমবয়সী ছেলেদের সঙ্গে লেগে যেত ঝগড়া। তাদের সবার অনুযোগ যে পাড়ার সব কুকুরগুলোই কি দাশুর যে ওদের ঢিল মারলেই দাশু ফিরে আসবে মারতে? আর দাশুর বক্তব্য ছিল ঐ ঢিলটা যদি তাদের মারা যায় তাহলে ওদের কি লাগবে না? তাহলে শুধু শুধু কেন ঢিল ছোঁড়া তাদের প্রতি যখন তারা কোন দোষ করেনি?

আজ ষাট পঁয়ষট্টি বছর পরে এই তরজা আজ দেশ জুড়ে। সারমেয়প্রেমী বনাম সারমেয় বিদ্বেষী বা নিরপেক্ষ, পৌঁছেছে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের দরজায় এবং আদালত রায় দিয়েছেন যে সারমেয়কুলকে রাস্তাঘাটে যথেচ্ছভাবে চলাফেরা করতে দেওয়া হবেনা এবং তাদের একটা বিশেষ জায়গায় রাখতে হবে যার নাম হবে সারমেয় নগর। সেখানে আর কেউ থাকবে না দাশু, হরি বা বাবলারা যারা ওদের বিস্কুট ভেঙে খাওয়াবে বা মুড়ি বা অন্যান্য খাবার খাওয়াবে।  যেখানে সবাই কুকুর সেখানে নিশ্চয়ই এলাকা দখল থাকবে যেমন মানুষের মধ্যে এক মস্তান বনাম আর এক মস্তান থাকে। মানুষের মধ্যে না হয় বিবাদ মেটানোর জন্য কাউন্সিলর বা বিধায়ক বা বেশি বাড়াবাড়ি হলে থানা, পুলিশ বা মহামান্য বিচারপতি হস্তক্ষেপ করতে পারেন কিন্তু সারমেয় খুলে বিবাদ হলে মিউনিসিপ্যালিটি বা কর্পোরেশনের পক্ষে দায়িত্বে থাকা লোকজন সেটাকে সামলাবেন না কেল্লা ফতে করার জন্য বিষ প্রয়োগ করে তাদের সরিয়ে দেবেন?  মানুষ যখন কাজ করতে হবে বলে করে, তখন তা হয় দায়সারা আর যদি সে অন্তরের ভালবাসা মিশিয়ে কাজটা করে তখন তার মাত্রা হয় আলাদা।

দাশু আর ইহজগতে নেই। থাকলে নিশ্চয়ই এই কাজের দায়িত্ব সে নিজে চেয়ে নিত এটা হলফ করে বলতে পারি। দাশু কিন্তু দু দুবার চৌদ্দটা করে আটাশটা ইঞ্জেকশন নিয়েছে এ সারমেয়দের কামড়ে। প্রথমবার বন্ধু দীপকের বাড়ি থেকে গল্পের বই আনতে গিয়ে ফকির কাকার কুকুরের কামড় খেয়ে। হাসপাতালের কম্পাউন্ডার পবিত্র বাবুর কুকুর কুকুর ডাকে সচকিত হয়ে হাফপ্যান্টের বোতামটা আলগা করে নাভির নিচে নামিয়ে পুটুশ করে ইঞ্জেকশন নিত আর পেটের ঐ জায়গাটা ছোট্ট টমেটোর মতো ফুলে উঠত। দ্বিতীয়বার যখন দাশুর কপালে জোটে কামড় তখন সে রীতিমতো যুবক। ভবানীপুরে শ্বশুরবাড়িতে বৌ ছেলেকে নামিয়ে দিয়ে মিত্রস্কূলের সামনে বাস স্টপে দাঁড়িয়ে আছে অফিস যাওয়ার জন্য। হঠাৎ ই এসপ্ল্যনেডগামী একটা মিনি বাস অনেক ভিড় থাকার জন্য ঐ স্টপে না থেমে স্পীড বাড়িয়ে চলে যাওয়ার মুখে একটা কুকুরের দুর্মতি  হয় রাস্তা পেরোনোর জন্য এবং অবধারিত ভাবে ধাক্কা খেয়ে বোঁ বোঁ করে ঘুরতে ঘুরতে মিনিবাসের সামনের চাকার ডানদিকে নিজের পেটটা চেপে ধরে যেমন আমাদের কোন জায়গায় ধাক্কা লাগলে বা কেটে গেলে আমরা সেই জায়গাটা চেপে ধরি। মিনিবাসটা ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষে থেমে গেছে। রাস্তায় এত লোক কিন্তু দাশু গেল এগিয়ে , দুহাত দিয়ে আস্তে করে কুকুরটাকে সরিয়ে দিয়ে পাশে থাকা টিউবওয়েল থেকে আঁজলভরে জল নিয়ে কুকুরের মুখে দিতে গেল আর কুকুরটা জল খেয়ে মারা যাওয়ার আগে ওর বাঁ হাতে ব্যথার চোটে কামড়ে দিল অবশ্যই বুঝতে না পেরে। কোমড়ের উপর কামড় ,অতএব দশ মিলিমিটার করে ফের চৌদ্দটা ইঞ্জেকশন। কিন্তু এ সত্ত্বেও দাশুর সারমেয় প্রীতি বিন্দুমাত্র কমেনি বরং বেড়েছে। শুধু কুকুর ই নয়, বিড়াল বা অন্যান্য পশুপাখির প্রতি ওর বিশেষ ভালবাসা সবসময়ই চোখে পড়ত। কিন্তু দাশু আজ আর নেই। বেঁচে থাকলে সুপ্রিম কোর্টের এই  আদেশ নিয়ে যে ওর কি প্রতিক্রিয়া হতো তা ভাবতেও পারছিনা।
কথায় আছে ন্যাড়া বেলতলায় যায় একবার কিন্তু দাশুরা যায় বারবার। পৃথিবীতে এইরকম দাশু না থাকলে  একেবারে বিবর্ণময় হয়ে যাবে।

Tuesday, 12 August 2025

বিনিময়

প্রত্যেক জীবজন্তুই কিছু প্রত্যাশা করে, কোন কাজের বিনিময়ে টাকা কিংবা প্রশংসা বা টাকার বিনিময়ে কিছু কাজের বরাত যেটাকে একটু খারাপ ভাবে বললে শোনায় ঘুষ বা ভালভাবে বিচার করলে বলা যায় ভালবাসার বিনিময়ে ভালবাসা বা স্নেহের বিনিময়ে শ্রদ্ধা। যদিও গীতায় লেখা আছে কাজ করে যাও কোন ফলের আশা না করেই। এটা যত সহজে বলা যায় বাস্তবে ততটাই কঠিন। সৎকর্ম করে যদি তার স্বীকৃতি না পাওয়া যায় তাহলে সে কতদিন সেই ধরণের কাজ করবে তাতে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। বর্তমান পৃথিবীতে সবাই যখন নিজের লাভের জন্য ছুটছে তখন মুষ্টিমেয় কিছু নির্লোভ লোক তাতে বিরত থাকবে এটা আশা করা একটা বাতুলতা মাত্র। তবুও কিছু লোক নিশ্চয়ই রয়েছেন যাঁরা গীতার বাণী অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন এবং হয়তো তাঁদের জন্যই এই কথাটা " কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন" এখনও লোকের মুখে শোনা যায়। অনেকেই গীতার বাণী কথায় কথায় উদ্ধৃত করেন কিন্তু ব্যবহারিক জীবনে কতটা মেনে চলেন তাতে ঘোর সন্দেহ আছে। তবু একটা কিছু শক্ত খুঁটি দরকার যাকে কেন্দ্র করে গরু ছাগলরা চরে খেতে পারে কিন্তু বৃত্তের বাইরে যেতে পারেনা। খুঁটি যদি শক্ত না হয় তাহলে চরতে চরতে টানে খুঁটিটাই উপড়ে যাবে এবং সবকিছুই বিশৃঙ্খল হয়ে যাবে। সমুদ্রের ধারে পাহাড়ের গায়ে ঢেউগুলো আছড়ে পড়ে এবং ফিরে আসে দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে কিন্তু পাহাড় অটল অবিচল, দাঁড়িয়ে থাকে আর মৃদু মৃদু হাসে। ধর্মগ্রন্থগুলো ও অনেক টা সেই রকম, আমাদের প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয় কি করা উচিত আর কি না করা।
আমরা পড়ি এই ধর্মগ্রন্থ কিন্তু কতটা মেনে চলি তা আমাদের আধারের উপর নির্ভর করে। এই আধারটাও তৈরী হয় আমরা কিভাবে মানুষ হচ্ছি তার উপর। যে বাড়ির বড় মানুষদের মূল্যবোধ প্রবল সেখানে ছেলেমেয়েরা ও সেই গুণ সবটা না হলেও কিছুটা আত্মস্থ করে। তবে কি চোরের ছেলে ভাল মানুষ হয়না? নিশ্চয়ই হয় কারণ পাঁকেই পদ্মফুল ফোটে। অনেকেই আছেন যাঁরা কথায় কথায় ধর্মগ্রন্থের বাণী বা শ্লোক উচ্চারণ করেন কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তাঁদের আচরণ বিপরীত। তাঁদের জন্য এই কথাটা উপযুক্ত," আমি যা বলছি তাই কর কিন্তু আমি যা করছি তার কোর না।" এঁরা হচ্ছেন ভণ্ড এবং এঁদের আধিক্য ই চতুর্দিকে বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে।
কিন্তু তা বলে কি নিঃস্বার্থপর লোকজন নেই? অবশ্যই আছেন যদিও সংখ্যায় ভীষণ কম। এঁদের জন্য সম্মান ছাড়া আর কিছুই নেই কিন্তু এঁরা কে সম্মান দিল বা দিল না তার তোয়াক্কা করেন না এবং নিজেদের কর্মপথে অবিচল থাকেন। আর এঁদের জন্য ই পৃথিবী এখনও সচল। এঁরা অনেকটা সূর্যের মতন। সূর্য যেমন তার প্রভা দিয়ে পৃথিবীর ৮০০ কোটি মানুষের বেঁচে থাকতে সাহায্য করেও বিনিময়ে কিছুই চায়না এঁরা ও সেইরকম কারো কাছে কোন কিছু প্রত্যাশা না করেই নিজেদের কাজ করে যান। ভগবান এঁদের বাঁচিয়ে রাখুন।