"বাঁধের জলে ভোরের আকাশ ,
বৃষ্টি সবুজ জংলা দুপুর,
লালমাটিতে সন্ধ্যে মেশে,
ধামসা মাদল সাঁওতালি সুর,
ঘরের কাছেই মোটেই না দূর,
চলুন এবার মুকুট মনিপুর।"
দেখতে দেখতে ছয়টা বছর কিভাবে কেটে গেছে জানিনা, তবে স্মৃতিতে এখনও যথেষ্ট সতেজ। পিয়ারলেস গেস্ট হাউসে ভীম ও ভালন্ধারাকে একটা কটেজে ঢুকিয়ে দিয়ে দেবিকা, সুভদ্রা, বিজয়া ও দুঃশলা একটা বড় ঘরে এবং যুধিষ্ঠির, অর্জুন ও সহদেব আরও একটি ঘরে দারুণ আনন্দে রাত কাটিয়েছিল। সকাল বেলায় চায়ের আসর দেবিকা, বিজয়া ও সুভদ্রাদের ঘরে বসেছিল এবং যথারীতি দুঃশলা চায়ের সঙ্গে বিস্কুট ও কেকের ব্যবস্থা করেছিল। আগের দিন রাতে অনেক রাত অবধি হাউসি খেলা তাদের ঘুমের মাত্রা কমিয়ে দিলেও উৎসাহে কিন্তু এতটুকু ভাটা পড়েনি। জলখাবার খেয়েই মুকুটমনিপুরের নদীর জলে নৌকা বিহার ছিল এক আলাদা অভিজ্ঞতা। এই স্মৃতি মনে পড়তেই গুনগুন করে গানের কলি মনে পড়ে গেল," অলি বারবার ফিরে আসে, অলি বারবার ফিরে যায়।" মুকুটমনিপু্রের কাছেই এই বড়ঘুটু অতিথি নিবাস।
তাই বেশ, নাই মামার চাইতে তো কানা মামা ভাল।
অর্জুনের ব্যবস্থাপনা একদম ঠিকঠাক। ২০শে আগস্ট গাড়িতে বসে সকাল ৬টায় রওনা দিয়ে ৬টা বেজে ২০ মিনিটে সহদেবকে তুলে৬টা ৪৫ মিনিটে নকুল ও কারেনুমতিকে তোলা হলো। এরপর ধানুমতিকে (ধৃষ্টদ্যুম্ন জায়া )তুলে যাত্রা শুরু হলো দুর্গাপুরের পথে যেখানে আছেন ধৃষ্টদ্যুম্ন । বিজয়া মেয়ের কাছে ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকার জন্য এবং কৃষ্ণ ও রুক্মিণীর ঐদিন ই আমেরিকার পথে যাত্রা করার জন্য এই বড়ঘুটু অভিযানে সামিল হননি। প্রাতরাশ সারার জন্য বাছাই হলো গুড়াপস্থিত হিন্দুস্তান ধাবা। আলুর পরোটা ও লুচির মতো পুরি ও ছোলার ডাল এবং মিষ্টি ও চা দিয়ে প্রাতরাশ সেরে দুর্গাপুরের পথে ধৃষ্টদ্যুম্নকে তোলার ব্যবস্থা হলো এবং বড়ঘুটু পৌঁছাতে হয়ে গেল প্রায় আড়াইটা। চেক ইন করেই খেতে বসে যাওয়া। ম্যানেজার শান্তনু ঘোষকে বলেই রাখা ছিল নিরামিষ থালির কথা। ঘি, বেগুন ভাজা, মুগডালের সঙ্গে পোস্তর বড়া ও দুরকম তরকারি ও চাটনি পাঁপড় ভাজা ও মিষ্টি দিয়ে দারুণ সুস্বাদু খাবার আর তার সঙ্গে নরেন কর্মকার, ভবতোষ দেব(বাসু) ও প্রতীক দাসের আতিথেয়তা ভুলিয়ে দিল গেস্টহাউসের খামতি। সরকারি গেস্টহাউসের এইখানেই সীমাবদ্ধতা। কি করলে যে কাস্টমার আরও ভালভাবে উপভোগ করবে সেইদিকে নজর দেওয়াটা তাদের প্রাথমিকতার মধ্যে পড়ে কিনা সন্দেহ আছে। কিন্তু এইসমস্ত ছেলে বা কর্মীদের আন্তরিকতা সত্যিই মনে রাখার মতো। বুকিং করার সময় অফিসের ম্যানেজারের যা বক্তব্য তার সঙ্গে কিন্তু বিস্তর তফাৎ। যাই হোক, সূর্যাস্ত দেখার জন্য ঐ অতিথিশালার মধ্যেই টিলায় উঠতে হলো এবং নয়নাভিরাম দৃশ্য মোবাইলে ক্যামেরাবন্দী হলো। ওখানে আসা আর একজন অতিথি সাবধান করে দিলেন বিছে ও কাঁকড়াবিছে সম্বন্ধে। বেসিনের কল খুলতেই ইঞ্চি নয়েক একটা তেঁতুল বিছের ছবি দেখালেন এবং জামা কাপড় বা মোজা জুতো পরার আগে ভাল করে নে
ঝেড়ে নিতে বললেন। ভয় ধরে গেল মনে, রাতে ঘুমোচ্ছি, হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল , টর্চ জ্বেলে দেখে নিলাম যে কোন বিছের আগমন হয়েছে কিনা। আমাদের ড্রাইভার জগদীশ বাইরে বেঞ্চে বসে রাতের নিস্তব্ধতা উপভোগ করছিল, হঠাৎ একটা চিরচিরে জ্বলুনি -- একটা ছোট বিছের আক্রমণ। সময়মতো সেটাকে মুক্ত করেছে বলেই বেঁচে গেল নাহলে ফিরে আসা একটা দুষ্কর কাজ হয়ে যেত। রাতে দেশী কায়দায় চিকেন কারি ও রুটি এবং শেষে মিষ্টি আলাদা মাত্রা আনল।
পরদিন সকাল। ভোরবেলা সহদেব ও ধৃষ্টদ্যুম্ন বেরিয়েছে গ্রাম দেখতে, সঙ্গে সাথী লাল্টু, পল্টু, ঘন্টু ও চুটকি। দূর থেকে আসা লোকজনদের জিজ্ঞেস করছি কোথায় চা ও বিস্কুট ( লাল্টু, পল্টুদের জন্য) পাওয়া যেতে পারে। গতকাল পৌঁছানোর পরেই ওরা আমাদের সাথী। গ্রামের জীব তো, শহরের প্যাঁচ পয়জার ওদের মধ্যে ঢোকেনি। গায়ে, মাথায় হাত বোলানোর অভ্যেসটা বন্ধু দাশুর কাছ থেকে পাওয়া। একটু ভালবাসাতেই তাদের লেজ নাড়ানোয় কমতি নেই। ধৃষ্টদ্যুম্ন গিয়ে ওপর থেকে টাকা নিয়ে এল আর আমরা একে তাকে জিজ্ঞেস করতে করতে কখন দু কিলোমিটার চলে এসেছি চায়ের তেষ্টা মেটাতে ও সঙ্গী সাথীদের বিস্কুটের চাহিদা জোগাতে। গাঁয়ের ছেলেমেয়েরা দাঁতন করছে এবং পথনির্দেশ করছে কোথায় দোকান পাওয়া যাবে। অবশেষে গ্রামের বেশ ভেতরে চলে এসেছি। চা যদিও ভাগ্যে জুটলো না কিন্তু আমাদের সহযোগীদের জন্য বিস্কুট পাওয়া গেল। তিন প্যাকেট বিস্কুট কিনে আমরা ওদের খাওয়াতে খাওয়াতে ফিরে এলাম এবং চা খেয়েই উঠলাম। স্নান সেরে ব্রেকফাস্ট ( কমপ্লিমেন্টারি বা ফোঁকটে) করলাম, এককথায় দুর্দান্ত।পৌনে দশটা নাগাদ মালপত্র নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম এবং কাঁসাই শিলাই এর সঙ্গমস্থলে এলাম এবং বাঁধের ওপর উঠে নয়নাভিরাম দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করে রওনা দিলাম দুর্গাপুরের উদ্দেশ্যে। মাঝপথে শুরু হলো বৃষ্টি এবং তার নাচন কোঁদনে রীতিমতো ভয় ধরে গেল। দেখতে দেখতে দু্র্গাপু্র এসে গেল। ধৃষ্টদ্যুম্ন আর ধানুমতী লাঞ্চ সেরে ওখানেই থেকে গেল আর অর্জুন, সুভদ্রা, নকুল, কারেনুমতি ও সহদেব ফিরে এল কলকাতায়। ছোট্ট অথচ নিটোল অভিযান,মনে রাখার মতো।