Sunday, 17 August 2025

দাসুর পশুপ্রেম

মফস্বলের ছেলে দাশু একেবারে এলেবেলে ছেলে না হলেও খুব ভাল কিছু ও নয়। মোটামুটি ভাবে পাশ করে যায়। একটু হাঁফালো চেহারা বলে বন্ধুদের উপর খবরদারি করা স্বভাব আছে। তবে মনটা বেশ ভাল আর পশুপাখির প্রতি ওর একটা স্বভাবসিদ্ধ প্রেম বা আকর্ষণ আছে। ছোটবেলায় কোন স্যার পড়িয়েছিলেন "বহুরূপে সম্মুখে তোমার ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর
জীবে প্রেম করে যেইজন সেইজন সেবিছে ঈশ্বর" ওর মনে ভীষণ ভাবে গেঁথে গিয়েছিল। ছোট থেকেই একটু ক্যাবলা গোছের দাশু পকেটে মুড়ি কিংবা বিস্কুট নিয়ে বেরোত এবং পাড়ার কুকুর লালু, ভোলা, টমি ও তাদের সাঙ্গোপাঙ্গোরা সব ওর পিছন পিছন চলত এবং নিজেদের সীমানা অবধি তো যেত ই , দলবেঁধে অন্যদের ডেরায় ও কখনো সখনো চলে যেত। অনেকেই ওকে ঠাট্টা করে বলতো হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা। কিন্তু সাদাসিধে টাইপের দাশু কিছু মনে করতো না, বরঞ্চ কুকুর বিড়াল বা পশুপাখির মধ্যেই যেন ও ভাল থাকত কারণ অন্য বন্ধুরা ওকে দেখলেই টিটকারী মারত যেটা ওর পছন্দের ছিলনা এবং প্রতিবাদ করলেই ঝগড়াঝাঁটি এবং কোন কোন সময় তা হাতাহাতির পর্যায়েও চলে যেত। তার থেকে ঢের গুনে ভাল এই অবলা জীবজন্তুগুলোর মধ্যে থাকা।  এই পৃথিবীতে সবাই একটু গুরুত্ব পেতে চায়, দাশুই বা তার ব্যতিক্রম কিভাবে হবে? লালু, ভোলা, টমিরা কোন প্রতিবাদ করেনা, ওরা মাঝেমধ্যে একটু মুড়ি বা বিস্কুট পেয়েই সন্তুষ্ট। ওপর বয়সী অন্য ছেলেরা কুকুর দেখলেই ইটের টুকরো তাক করে ছুঁড়ত আর কখনো পায়ে বা গায়ে লাগলে কাঁই কাঁই করে আর্তনাদ করত আর ওদের আর্তনাদ শুনলেই দাশু ঠিক থাকতে না পেরে তাড়া করত যে ঢিল ছুঁড়েছে তার প্রতি এবং তাকে পাকড়াও করে দুচার থাপ্পড় লাগিয়ে দিত। আর এই কারণেই এসব সমবয়সী ছেলেদের সঙ্গে লেগে যেত ঝগড়া। তাদের সবার অনুযোগ যে পাড়ার সব কুকুরগুলোই কি দাশুর যে ওদের ঢিল মারলেই দাশু ফিরে আসবে মারতে? আর দাশুর বক্তব্য ছিল ঐ ঢিলটা যদি তাদের মারা যায় তাহলে ওদের কি লাগবে না? তাহলে শুধু শুধু কেন ঢিল ছোঁড়া তাদের প্রতি যখন তারা কোন দোষ করেনি?

আজ ষাট পঁয়ষট্টি বছর পরে এই তরজা আজ দেশ জুড়ে। সারমেয়প্রেমী বনাম সারমেয় বিদ্বেষী বা নিরপেক্ষ, পৌঁছেছে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের দরজায় এবং আদালত রায় দিয়েছেন যে সারমেয়কুলকে রাস্তাঘাটে যথেচ্ছভাবে চলাফেরা করতে দেওয়া হবেনা এবং তাদের একটা বিশেষ জায়গায় রাখতে হবে যার নাম হবে সারমেয় নগর। সেখানে আর কেউ থাকবে না দাশু, হরি বা বাবলারা যারা ওদের বিস্কুট ভেঙে খাওয়াবে বা মুড়ি বা অন্যান্য খাবার খাওয়াবে।  যেখানে সবাই কুকুর সেখানে নিশ্চয়ই এলাকা দখল থাকবে যেমন মানুষের মধ্যে এক মস্তান বনাম আর এক মস্তান থাকে। মানুষের মধ্যে না হয় বিবাদ মেটানোর জন্য কাউন্সিলর বা বিধায়ক বা বেশি বাড়াবাড়ি হলে থানা, পুলিশ বা মহামান্য বিচারপতি হস্তক্ষেপ করতে পারেন কিন্তু সারমেয় খুলে বিবাদ হলে মিউনিসিপ্যালিটি বা কর্পোরেশনের পক্ষে দায়িত্বে থাকা লোকজন সেটাকে সামলাবেন না কেল্লা ফতে করার জন্য বিষ প্রয়োগ করে তাদের সরিয়ে দেবেন?  মানুষ যখন কাজ করতে হবে বলে করে, তখন তা হয় দায়সারা আর যদি সে অন্তরের ভালবাসা মিশিয়ে কাজটা করে তখন তার মাত্রা হয় আলাদা।

দাশু আর ইহজগতে নেই। থাকলে নিশ্চয়ই এই কাজের দায়িত্ব সে নিজে চেয়ে নিত এটা হলফ করে বলতে পারি। দাশু কিন্তু দু দুবার চৌদ্দটা করে আটাশটা ইঞ্জেকশন নিয়েছে এ সারমেয়দের কামড়ে। প্রথমবার বন্ধু দীপকের বাড়ি থেকে গল্পের বই আনতে গিয়ে ফকির কাকার কুকুরের কামড় খেয়ে। হাসপাতালের কম্পাউন্ডার পবিত্র বাবুর কুকুর কুকুর ডাকে সচকিত হয়ে হাফপ্যান্টের বোতামটা আলগা করে নাভির নিচে নামিয়ে পুটুশ করে ইঞ্জেকশন নিত আর পেটের ঐ জায়গাটা ছোট্ট টমেটোর মতো ফুলে উঠত। দ্বিতীয়বার যখন দাশুর কপালে জোটে কামড় তখন সে রীতিমতো যুবক। ভবানীপুরে শ্বশুরবাড়িতে বৌ ছেলেকে নামিয়ে দিয়ে মিত্রস্কূলের সামনে বাস স্টপে দাঁড়িয়ে আছে অফিস যাওয়ার জন্য। হঠাৎ ই এসপ্ল্যনেডগামী একটা মিনি বাস অনেক ভিড় থাকার জন্য ঐ স্টপে না থেমে স্পীড বাড়িয়ে চলে যাওয়ার মুখে একটা কুকুরের দুর্মতি  হয় রাস্তা পেরোনোর জন্য এবং অবধারিত ভাবে ধাক্কা খেয়ে বোঁ বোঁ করে ঘুরতে ঘুরতে মিনিবাসের সামনের চাকার ডানদিকে নিজের পেটটা চেপে ধরে যেমন আমাদের কোন জায়গায় ধাক্কা লাগলে বা কেটে গেলে আমরা সেই জায়গাটা চেপে ধরি। মিনিবাসটা ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষে থেমে গেছে। রাস্তায় এত লোক কিন্তু দাশু গেল এগিয়ে , দুহাত দিয়ে আস্তে করে কুকুরটাকে সরিয়ে দিয়ে পাশে থাকা টিউবওয়েল থেকে আঁজলভরে জল নিয়ে কুকুরের মুখে দিতে গেল আর কুকুরটা জল খেয়ে মারা যাওয়ার আগে ওর বাঁ হাতে ব্যথার চোটে কামড়ে দিল অবশ্যই বুঝতে না পেরে। কোমড়ের উপর কামড় ,অতএব দশ মিলিমিটার করে ফের চৌদ্দটা ইঞ্জেকশন। কিন্তু এ সত্ত্বেও দাশুর সারমেয় প্রীতি বিন্দুমাত্র কমেনি বরং বেড়েছে। শুধু কুকুর ই নয়, বিড়াল বা অন্যান্য পশুপাখির প্রতি ওর বিশেষ ভালবাসা সবসময়ই চোখে পড়ত। কিন্তু দাশু আজ আর নেই। বেঁচে থাকলে সুপ্রিম কোর্টের এই  আদেশ নিয়ে যে ওর কি প্রতিক্রিয়া হতো তা ভাবতেও পারছিনা।
কথায় আছে ন্যাড়া বেলতলায় যায় একবার কিন্তু দাশুরা যায় বারবার। পৃথিবীতে এইরকম দাশু না থাকলে  একেবারে বিবর্ণময় হয়ে যাবে।

No comments:

Post a Comment