সান্ধ্যবাসরে আলোচনা হতে থাকল কোথায় যাওয়া যায়। উঠে আসতে থাকে একের পর এক প্রস্তাব। শেষমেষ ঠিক হলো দক্ষিণ রায়ের জমিদারিতে গেলে মন্দ হয়না। শান্তিনিকেতনে সোনা ঝুড়ির মেলায় বাউলের কাছে শোনা গান " পরের জায়গা, পরের জমিন, ঘর বানাইয়া আমি রই, আমি তো এই জমির মালিক নই" মনে পড়ে গেল। দক্ষিণ রায়ের মুলুকে যাওয়া হবে অথচ দক্ষিণ রায়ের কোন মত নেওয়া হলোনা। অনেক সাতপাঁচ ভেবে যাত্রা স্থির হলো। মত নেওয়া হলে জমিদার বাবু হয়তো দর্শন দিতেন আর তাঁর অমতে গিয়ে দর্শন প্রার্থী হলে তিনি দেখা দেবেন কিনা সেটা তাঁর একান্তই মর্জির উপর নির্ভর করছে। যাই হোক, ক্যাপ্টেনের ঘুঁটি সাজানো শুরু হলো। পারফেক্ট প্ল্যানিং শুরু হলো নীরবে এবং তার রূপায়ণ সার্থক হলো এই দ্বিতীয় সারিতে থাকা বিশেষ কয়েকজনের অমানুষিক পরিশ্রমের ফলে। যাতায়াতের সুন্দর ব্যবস্থা, মাঝপথে একটু পেট পূজোর ব্যবস্থা এবং খাওয়া দাওয়া ও বিনোদনের সমস্ত ব্যবস্থা করা প্ল্যানিং এর এক অঙ্গ বিশেষ এবং সমস্ত যাত্রার সফল রূপায়ণ দলের অন্য সমস্ত সদস্য ও সদস্যার ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফল।
নভেম্বরের ৫ তারিখে সকাল সাড়ে ছটায় বিরাট লাক্সারি বাস এসে গেছে এবং সান্ধ্যবাসরের অধিকাংশ লোকই এসে গেছেন চাকা লাগানো স্যুটকেস নিয়ে এবং কাঁধে একটা ছোট্ট ব্যাগ যেটা টুকিটাকি দরকারি জিনিসে ভরা। সকাল সাতটায় নধরকান্তি বাসটা একটু যেন নড়ে উঠলো আর শুরু হলো দক্ষিণ রায়ের জমিদারির উদ্দেশ্যে যাত্রা। ঘন্টা দেড়েক চলার পরে এল চা খাওয়া এবং হাত পা ছাড়ানোর জায়গা মালঞ্চের কাছে নোনা মাটির রেস্তোরাঁ। সেখানে আগে ভাগে বলে রাখা লুচি, আলুর তরকারি ও বিশেষ ভাবে অর্ডার দেওয়া দরবেশ সকলের পেট ও মন জয় করে নিল এবং পরে গরম চা শরীর ও মনকে তরতাজা করে তুলল। আবার যাত্রা শুরু, ফের ঘন্টা দেড়েক চলার পর এল গদখালি। সেখানে নেমে মালপত্র কুলির মাথায় চাপিয়ে লঞ্চের উদ্দেশ্যে যাত্রা। নীচের ডেকে মালপত্র ও উপরের ডেকে বর্ষীয়ান ও বর্ষিয়সী সদস্য ও সদস্যাদের একে একে তুলে লঞ্চ চলতে শুরু করল দক্ষিণ রায়ের জমিদারির উদ্দেশ্যে। তখন চলছে ভাটার টান , তাই পোঁছাতে লাগল দেড় ঘন্টার উপর। এদিক সেদিক বাঁক নিয়ে পৌঁছে গেল দুলকি জে এফ এম সি দ্বীপে যেখানে রয়েছে হোটেল সোনার বাংলা এবং সেখানেই আমাদের থাকার বন্দোবস্ত হয়েছে। মালপত্র ও বয়স্ক সদস্য ও সদস্যাদের ট্রেনের প্ল্যাটফর্মে বা এয়ারপোর্টে চলা মোটরগাড়িতে চাপিয়ে এবং মালপত্র পাঠিয়ে দিয়ে বাকিরা পায়ে হেঁটে পৌঁছে গেল অনতিদূরে অবস্থিত হোটেলে। চেক ইন করে সমস্ত মালপত্রে লাগানো স্টিকার অনুযায়ী নির্ধারিত ঘরে এবং হাতমুখ ধুয়ে এসেই রেস্তোরাঁয় বসে খেয়ে নেওয়া এবং নির্ধারিত সময়ে সুইমিং পুলে জলের মধ্যে দাপাদাপি করা। সবাই তো আর সাঁতার জানেন না, তাঁরা অন্যদের দাপাদাপি দেখে দুধের স্বাদ ঘোলে মিটিয়ে নিলেন এবং অনেক ছবি মোবাইলে ধরে রাখলেন। এরপর যে যার রুমে চলে গেলেন এবং সন্ধ্যে বেলায় হাই টিতে অংশ গ্রহণ করে স্থানীয় অধিবাসীদের নৃত্য পরিবেশনায় সময় কাটাতে যাওয়া হলো। তাদের সঙ্গে আমাদের ও কয়েকজন নাচ গানে মাতিয়ে দিল। এরপর ই একটা মজার ঘটনা ঘটল। হোটেল সোনার বাংলা বেশ অনেকটা জায়গা জুড়ে অনেকগুলো ব্লক তৈরী করেছে। সবকটা ব্লক দোতলা এবং উপর নীচ করে চারটে করে ঘর আছে অর্থাৎ ছোট গ্রুপ হলে একটা ব্লকেই সীমিত থাকবে এবং অন্য কোন লোকের উপস্থিতি থাকবে না আর বড় গ্রুপ হলে দুটো তিনটে ব্লকেই আবদ্ধ থাকবে। আমাদের পঁচিশ জনের গ্রুপে সবাইকেই দোতলায় রাখতে গিয়ে বেশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে হয়েছে। ঝুমুর নাচ দেখে ঘরে ওষুধ খাওয়ার জন্য একাই ঘরে ফিরছি। রাতে আলো আঁধারে রাস্তাটা কেমন যেন গুলিয়ে গেল। এদিক ওদিক ঘুরে ও জায়গাটা ঠিক বাগে আসছে না, কয়েকটা চক্কর লাগিয়েও নিজের ব্লকটা খুঁজে পাচ্ছি না, হঠাৎ ই মনে পড়ল দক্ষিণ রায়ের কথা আর মূহুর্তেই জমিদারের রাগত চক্ষু আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল। সব দিকটাই ঘেরা আছে কিন্তু তিনি ক্রুদ্ধ হলে কারো কিছু করার থাকেনা। আর তিনি ধরলে তো আর কথাই নেই। ভয়ে লোমগুলো খাড়া হয়ে উঠল। টর্চের নতুন ব্যাটারি বেশ অনেক দূরেই আলোকপাত করে কিন্তু আমি খেয়াল করলাম যে আলোটা ঠিক এক জায়গায় ফোকাস করছে না, কেমন যেন কেঁপে কেঁপে উঠছে আর ঐ কাঁপা আলোতেই দূরে একটা লোক দেখতে পেয়ে এই ভাই ,এই ভাই বলে ডাকতে থাকলাম। লোকটি কাছে আসার পর তাকে ব্লকের নম্বরটা বলে জিজ্ঞেস করায় সে জানালো যে আমি এই দিকে কেন এসেছি? আরও ভয়ে বুকটা কেঁপে উঠল।
ভাই, একটু দেখিয়ে দিন না ব্লকটা।
লোকটা আমায় সঙ্গে করে নিয়ে এসে বলল, এবার বাঁ দিকে ঘুরে ডান দিকে গেলেই আমাদের ব্লকটা এসে যাবে। পকেটে ছিল মোবাইল কিন্তু নেটওয়ার্ক পাওয়া যাচ্ছে না বলে ওটার কথা আর মাথায় আসেনি। যাই হোক, টর্চের আলোয় ব্লকটা খুঁজে পেয়ে ভগবানকে অনেক ধন্যবাদ জানালাম। দোতলায় উঠে দরজা খুলেই দরজাটা বেশ ভাল করে আটকে দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। খানিকটা ধাতস্থ হয়ে ওষুধটা খেলাম কিন্তু খিদে তো কোন দিক দিয়ে পালিয়েছে। যেতেই ইচ্ছে করছে না, তবে ওষুধটা খাওয়ার পর একটু মনে জোর পেয়ে বেরিয়ে পড়লাম রেস্তোরাঁর দিকে। একটা কথা ছেলেবেলায় শুনতাম, সদা সত্য কথা বলিবে, কদাচ মিথ্যা কথা কহিবে না। কিন্তু এই সত্য কথাটা বললে যে নিতান্তই ডরপোঁক বলবে সকলে এটাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অনেক সাহস সঞ্চয় করে সত্যি কথাটাই বলে ফেললাম। দক্ষিণ রায়ের অনেক প্রতিপত্তি শুনেছি কিন্তু তার চিন্তা ও যে কপালে এত ভাঁজ ফেলে সেটা জানা ছিল না।
পরদিন সকাল আটটার মধ্যে ব্রেকফাস্ট করে বেরোতেই হবে সুন্দরবনের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে দেখতে। দেরী হলেই সময়মতো লাঞ্চ করে বেরোতে পারা যাবে না এবং বাড়ি ফিরতে অনেক রাত হয়ে যাবে। কিন্তু আমরা সেই সময়ের মধ্যে বেরোতে না পারায় কোন দ্বীপে নামা গেলনা কিন্তু লঞ্চে চড়ে বিভিন্ন দ্বীপের পাশ দিয়ে পরিক্রমা করা হলো এবং হোটেলে ফিরেই রেস্তোরাঁয়। স্যুটকেস গোছানোই ছিল এবং কালক্ষেপ না করে ফিরে আসা লঞ্চের দিকে। ভাটার টানে লঞ্চের গতি বাড়ানো যাচ্ছে না, গদখালিতে থাকা বাসে উঠতে বিকেল গড়িয়ে চারটে। অনেক বয়স্ক সদস্য, সদস্যা ছিলেন।ফিরে আসার পথে আবার সেই নোনা মাটির রেস্তোরাঁয় চায়ে গলা ভেজানো এবং সঙ্গে আলুর টিক্কা ও পনীর পকোড়া। জমাটে এই সফর এসে শেষ হলো রাত্রি আটটার কিছু পরে। কাণ্ডারী আশিস রায় ও তাঁর সুযোগ্য সহযোগী সুব্রত চৌধুরী, উতথ্য লাহিড়ি এবং দেবজ্যোতি ঘটক, অমিত রায় এবং লালমণি চক্রবর্তীর অসাধারণ প্রয়াসে দক্ষিণ রায়ের জমিদারি দর্শন এক দারুণ অভিজ্ঞতা।ফেজ থ্রির অধিবাসীবৃন্দদের সনির্বন্ধ অনুরোধ ফ্ল্যাটের মধ্যে নিজেদের আবদ্ধ না রেখে সান্ধ্যবাসরে যোগদান এবং আমাদের এই ফেজকে সবদিক দিয়ে এক আদর্শ বাসস্থান গড়ে তোলার। এতবড় একটা প্রজেক্টকে সার্থক রূপ দিতে অনেক সময় কিছু ভুল ত্রুটি হতে পারে কিন্তু তার থেকেও অনেক বড় এই বিশাল কর্মযজ্ঞের অগ্রগতি। আসুন আমরা সবাই এগিয়ে আসি এর বাস্তবায়নে।
No comments:
Post a Comment