Thursday, 13 November 2025

তবে কেমন হতো?

চারিদিকে আলোড়ন পড়ে গেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে, এবার সাধারণ মানুষের বুদ্ধি শুদ্ধি আর লাগবেনা, স্কুল কলেজ আর যেতে হবেনা, বাড়িতে বসেই রোবটের কাছে সব ঠিকঠাক উত্তর পেয়ে যাবে। অভিভাবকরাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচবেন বাচ্চাদের স্কুলে ভর্তি নিয়ে চিন্তা করার দিন শেষ। স্কুল, কলেজের আর দরকার নেই, শিক্ষক শিক্ষিকার দরকার নেই, খরচাপাতি করে একটা বেশ ভাল জাতের রোবট কিনলেই সব হ্যাপা গেল মিটে। বাচ্চাদের স্কুলের বাসের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না, স্কুল ই নেই তো কিসের বাস। বাড়িতে বাচ্চাদের পড়াতে বসানোর ঝামেলা নেই, টাকা রোজগার করো আর মস্তি করো। কিন্তু চাকরিও তো সহজে মিলবে না কারণ সেই রোবটের জয়জয়কার। কোম্পানিগুলো রোবট কিনেই লোকজনদের হটাবে। জিন্দাবাদ ধ্বনিতে আর কান ফাটবে না, আঙুলে গোনা দুচারটে লোক যারা থাকবে তারাও সবসময়ই কি হয় কি হয় ভেবে চিন্তিত থাকবে, বসের কথা না শুনলেই দাঁড় করানো রোবটের দিকে আঙুল দেখাবে। ভারী ঝামেলা হলো , তাই না?  লেখকরা আর নাটক লিখবেন না, প্রেমের গল্প --- সে তো কবে শেষ? প্রেম করার মতো সময় কোথায়? বেশ কয়েক বছর আগেও লেকটা বেশ খোলামেলা ছিল যেটা এখন ঘেরাটোপে বন্দী হয়েছে। কিছুদিন পর হয়তো লেকের হাওয়া খেতে গেলেও ট্যাঁক থেকে পয়সা বের করতে হবে। ধরা যাক, লেকের চারপাশে লোহার রেলিং নেই এবং সন্ধ্যে হয়ে যাবার পরেও প্রেমিক প্রেমিকার পাশে বসে থাকাটা ও পুলিশ বেশ সহানুভূতির চোখেই দেখে। একদিকে একটা ছেলে ও মেয়ে এবং তার থেকে আর একটু দূরেই আরেকটি মেয়েও তার একটি মানুষ রূপী রোবট বন্ধু ( যাকে মেয়েটি সত্যি সত্যিই মানুষ বলে ভেবেছে) বসে গল্প করছে। প্রথম জুটি লেকের জলে পূর্ণিমার চাঁদের গ্রহণ লাগার রূপটা দেখছে। ধীরে ধীরে চাঁদটা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে আসতে দেখে পাশে বসে থাকা বন্ধুকে বলে উঠল,
" দেখ, দেখ চাঁদটাকে কি সুন্দর লাগছে , তাই না?" ছেলেটি মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে পাশে বসে থাকা বান্ধবী ও জলে চাঁদের প্রতিবিম্বের প্রতি। অস্ফূট স্বরে বলে উঠল হুঁ। অদূরে বসে থাকা দ্বিতীয় যুগলের মেয়েটিও বলে উঠল এক ই কথা কিন্তু উত্তর পেল হ্যাঁ, আজ চন্দ্রগ্রহণ ,আজ পৃথিবী সূর্য ও চাঁদের মধ্যে  চলে আসায় এ ছায়াটা পড়েছে, এতে আশ্চর্য হবার কি আছে? মেয়েটা বলে উঠল,
"হ্যাঁ, সে তো জানি, কিন্তু কি সুন্দর লাগছে, তাই না?" উত্তর এল, যতখানি ছায়া পড়েছে, ততটাই জলে দেখা যাচ্ছে, তার বেশীও নয়, কম ও নয়। মেয়েটার মনটা বিরক্তিতে ভরে গেল। এদিকে প্রথম যুগলের প্রেম বেশ ঘনিয়ে উঠেছে, একে অপরের প্রতি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে কিন্তু দ্বিতীয় ক্ষেত্রে মেয়েটির মন তিক্ততায় ভরে গেছে, বলল এবার ওঠা যাক।
মনে পড়ে গেল স্কুলে বিটি পড়তে আসা প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস নেওয়ার একটা ঘটনা। একজন স্যার এসেছেন একটা ক্রাচ নিয়ে বাংলার ক্লাস নিতে। পড়াবেন কবি যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের "হাট" কবিতাটি। পিছনে বসে আছেন বিটি কলেজের প্রিন্সিপাল এবং এক্সটারনাল একজামিনার। স্যার কবিতাটি পড়াতে পড়াতে যেন এক অন্য জগতে চলে গিয়েছিলেন। পিছনে বসে থাকা দুজন একজামিনার সবার অলক্ষ্যে কখন চলে গেছেন কেউ জানেনা আর আমরাও সেই নাম না জানা স্যারের পড়ানোয় একদম মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। সমস্ত স্যাররাই যদি এইভাবে পড়াতেন তাহলে পড়াশোনা করার ভীতিতে এত ছেলেমেয়েরা স্কুল ড্রপ আউট হতো না। এখন সেই স্যারের জায়গায় ধরা যাক একজন রোবট ঐ কবিতাটি পড়াচ্ছেন। কি রকম পরিস্থিতি হবে একটু কল্পনা করা যাক।
দূরে দূরে গ্রাম দশ বারোখানি মাঝে একখানি হাট, 
সন্ধ্যায় সেথা জ্বলে না প্রদীপ, প্রভাতে পড়েনা ঝাঁট। 
রোবট স্যার বলবেন, প্রত্যেক গ্রামে তো এক একটা হাট বসতে পারে না কারণ কটাই বা লোক থাকে একটা গ্রামে। যদি ক্রেতার সংখ্যা বেশি না হয় তবে হাট বসবে কেন? আর সেই কারণেই দশ বারোটা গ্রামের মাঝেই একটা হাট বসে। বেচাকেনার শেষে লোকজন চলে গেলে কে ই বা সন্ধ্যে প্রদীপ জ্বালবে আর কে ই বা সকালে ঝাঁট দেবে? সম্পূর্ণ সত্যি কথা কিন্তু মনটা কি ভরে উঠবে?  কবিতা তো শুধু কথাবার্তার কচকচানি  নয়, এর মধ্যে আছে ছন্দ, ভাব আর এটার অভাব ঘটলে সেটা কবিতা হবেনা,  হবে শব্দবন্ধের প্রতিফলন। জানিনা ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় ভাব ভালবাসার ও উন্মেষ হবে কিনা। যদি এটাও হয়ে যায় তাহলে আর মানুষের দরকার কি? মানুষ থাকলেই তার খাওয়া পড়া, শিক্ষা দীক্ষা, রোগভোগের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল কিছুই দরকার হবেনা। মন দেওয়া নেওয়ার কোন ব্যাপার নেই। বোমা ফাটিয়ে নিশ্চিহ্ন করার দরকার নেই, দলাদলির দরকার নেই, রাজনৈতিক নেতাদের দরকার নেই, শুধু থাকবে হৃদয়হীন রোবট আর দেশ চলবে ড্যাং ড্যাং করে।
কেমন হবে তাহলে?

No comments:

Post a Comment