এবার মূল বিষয়ে ফিরে আসা যাক। মার্জারকুল কিন্তু ভীষণ সুন্দর। তাদের আচার আচরণে রীতিমতো মুগ্ধ হয়ে যেতে হয়। সবাই একটু ভালবাসা পেতে চায়। একটু আদর করে খেতে দিলে কি আর এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায়? রাস্তা ঘাট নোংরা হয়ে যায় এইরকম সমালোচনার তীর প্রায়শই ছুটে আসে অথচ আমরা যেন ধোয়া তুলসী পাতা। আমাদের দ্বারা কোনরকম দূষণ হচ্ছে না এইরকম গ্যারান্টি কি আমরা দিতে পারি? গাড়িতে যেতে যেতে পথে ঝালমুড়ি ( ভুল হয়ে গেল, এঁরা তো রাস্তায় পাতি লোকের কাছে ঝালমুড়ি কিনলে এঁদের মানসম্ভ্রম মাটিতে মিশে যাবে)/ মঞ্জিনী বা মিও অ্যামোরের চিকেন প্যাটিস বা রোল কিনে খাওয়া শেষে প্যাকেটটা রাস্তায় ফেলে দিয়ে নোংরা করেন না? খুব কম লোকই আছেন যাঁরা বাক্সটিকে সযত্নে রেখে দিয়ে নিকটবর্তী কোন ডাস্টবিনে ফেলে দেন। এঁদের কথা তবু একটু হজম করা যায় কিন্তু বেশিরভাগ লোকই সমালোচনা করতে হয় ভেবে করেন। তাঁদের কাছে পশুপাখিদের প্রতি ভালবাসা দেখানো একটা অপরাধ বা স্রেফ ন্যাকামো বলে মনে হয়।
আমি সেই ন্যাকার দলের একজন। কথায় আছে ন্যাড়া বেলতলায় একবারই যায় কিন্তু আমি ন্যাড়ার ও অধম। আমি দু দুবার কুকুরের কামড় খেয়ে চোদ্দটা করে আটাশটা ইঞ্জেকশন নেওয়ার পরেও আমার হুঁশ হয়নি এবং এখনও আমি মনেপ্রাণে পশুপাখিদের ভালবাসি এবং সুযোগ পেলেই একটু আদিখ্যেতা দেখাই। এতে প্রচুর গনগনানি শুনতে হয় কিন্তু আমি তখন কালা ও বোবা। ছাদ সারানোর কাজ সবে শেষ করে মিস্ত্রিরা চাবি দিয়ে গেছে আর আমিও কেমন কাজটা করলো দেখতে গেছি। কখন পিছন পিছন একটা সাদা বিড়াল আমার সঙ্গ নিয়ে পিছু পিছু দেখতে এসেছে খেয়াল করিনি। আমি এদিক সেদিক দেখছি আর মোবাইলে ফটো তুলছি। হঠাৎ কা কা করে অনেকগুলো কাকের আওয়াজে সচকিত হয়ে ভাবছি কোন কাকের বাসা টাসা রয়েছে আর আমাকে দেখে চেঁচামেচি শুরু করেছে। কাকের ঠোকর যাতে না খেতে হয় এইভেবে যেই না পিছন ফিরে চলে আসার চেষ্টা করছি, দেখি সেই সুন্দরী মার্জার আমার পিছনে আর তাকে দেখেই বায়সদের এত আর্তনাদ। তাকে নামানোর চেষ্টা অনেক ক্ষণ ধরে করার পরে বিফল হয়ে ফিরে এলাম। তিনি তো এলেন ই না উপরন্তু একটু জেদাজেদি করাতে তিনি পাশের বাড়ির ছাদে আশ্রয় নিলেন এবং ফিরে এলাম। ছাদের দরজা খোলা রাখা যায়না বলে বন্ধ করে এলাম কিন্তু মনটা খচখচ করছে। একজন খুব কাছের প্রতিবেশীকে ফোন করে জানতে পারলাম যে তিনি নেই এবং তাঁর নিদান অনুযায়ী দরজা খুলে রেখেই খানিকক্ষণ এদিক ওদিক পায়চারি করলাম কিন্তু তাঁকে আর দেখা গেল না। ঠাণ্ডা টা বেশ বাড়ছে, নাক দিয়ে জল পড়াতে আরও বেশী মনে হচ্ছে, খানিকক্ষণ থাকার পরে আবার বন্ধ করে চলে এলাম। মনটা একটা ভীষণ অপরাধ বোধে ভুগছে যে এই ঠাণ্ডায় বিড়ালটা না কিছু খেতে পাবে না কোন আশ্রয় পাবে জলের ট্যাঙ্কের নীচে ছাড়া। ফের রাত দশটা নাগাদ গিয়ে আরো একবার টর্চ জ্বেলে খোঁজ করেও কিছু লাভ হলোনা মাঝখান থেকে আমার নাক দিয়ে জল পড়ার মাত্রা বেড়ে গেল। রাতে ঠিক ঘুম ও হলোনা, সকালে উঠেই আরো একবার দেখতে গেলাম কিন্তু না, এবার ও দেখা পেলাম না। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। একটা অপরাধবোধ মনটাকে কুড়ে কুড়ে খেতে লাগল কিন্তু কিছু করার ও নেই বলে মনটাকে সান্ত্বনা দিলাম।
এরমধ্যেই নয় নয় করে চারটে দিন কেটে গেছে। ব্যালকনিতে বসে খবরের কাগজ পড়ছি। হঠাৎ ই চোখ পড়ল সামনে পার্কিং করা বড় কালো গাড়িটার দিকে। একজন লোক নীল জ্যাকেট পড়ে কারও জন্য অপেক্ষা করছে। একটু বাদ বাদ ই ঘড়িটা দেখছে আর মোবাইলে কাউকে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে। হঠাৎ করেই সেদিনের ঐ সাদা বিড়ালটার মতো একটা বিড়াল লোকটির দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে। মুখের দিকে চেয়ে অস্ফূট স্বরে ম্যাও ম্যাও করছে। আমার মনে হলো সেদিনের বিড়ালটাই এবং বেশ খানিকটা আশ্বস্ত বোধ করলাম যে অন্তত আমার জন্য বিড়ালটা মারা যায়নি। মনটা বেশ হালকা লাগছে। বিড়ালটা অনেকক্ষণ দৃষ্টি আকর্ষণ করার পর লেজটাকে উঠিয়ে লোকটার পায়ের কাছে নিজের গা টা ঘষতে থাকলো। তারপর তড়াক করে লাফ দিয়ে গাড়ির বনেটে উঠে পড়লো। এইবার বেশ স্পষ্ট দেখতে পেলাম যে হ্যাঁ, ইনিই তিনি। লোকটা কথা বলার ফাঁকে ফাঁকেই বিড়ালটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো আর বিড়ালটাও বেশ আদর খেতে লাগলো। বুঝতে অসুবিধা হলোনা যে এটা কারো পোষা বিড়াল। আরও একটা জিনিস ভেবে খুব ভাল লাগলো যে হয়তো এখনও কিছু পাগল রয়েছে যাদের জন্য পৃথিবীটা এখনো পর্যন্ত নীরস হয়ে যায় নি।
No comments:
Post a Comment