Tuesday, 16 December 2025

"সম্রাটের সম্রাট দর্শন"

ইতিহাসের পাতা ওল্টালেই দেখা যায় একজন রাজা বা সম্রাট আরও একজন রাজা বা সম্রাট(তিনি যত ই ছোট মাপের হ'ন না কেন) তাঁকে যথাযোগ্য মর্যাদা প্রদর্শন করেন। মহাভারতে বা অন্য বিদেশী সাহিত্যেও এর প্রচুর নিদর্শন রয়েছে। কোন কোন ক্ষেত্রে যেখানে এক দেশের রাজা আর এক দেশ আক্রমণ করেছেন এবং বিজয়ী  হয়েছেন সেক্ষেত্রে অবশ্য আলাদা ব্যাপার। সেখানে পরাজিত রাজাকে বন্দী করে অমানুষিক অত্যাচার করে মেরে ফেলা হয়েছে এবং সমস্ত রকমের লুণ্ঠন করা হয়েছে কিন্তু অবশ্যই তার ব্যতিক্রম ও আছে। যেমন আলেকজাণ্ডার পুরুকে পরাজিত করার পর যখন জিজ্ঞেস করেন তিনি তাঁর কাছে কি রকম ব্যবহার আশা করেন যার উত্তরে রাজা পুরু উত্তর দেন একজন রাজার প্রতি আরেকজন রাজার ব্যবহার। তাঁর এই নির্ভীক উত্তরে আলেকজান্ডার খুশী হয়ে তাঁর রাজ্য ফিরিয়ে দেন এটাই আমরা জেনেছি। আজকের দিনে ও পৃথিবীর মহাশক্তিধর রাষ্ট্রের নেতার ব্যবহার আর একজন ক্ষুদ্র দেশের প্রধানের প্রতি সেই ইঙ্গিত বহন করে। মাঝে মাঝে বড় দাদার মতো ছোট ভাইকে ডেকে এনে কান মলে দেওয়ার মতো ভর্ৎসনা করার নিদর্শন ও কিন্তু আছে যদিও সেটা সংখ্যায় নিতান্তই কম।

সম্রাট যার ভাল নাম সেই নীলু গেছে বাবার সঙ্গে চিড়িয়াখানায়। ছোটবেলা থেকেই নীলু ছিল একটু বেশি পরিমাণেই অনুসন্ধিৎসু এবং ছোটখাটো সব বিষয়েই ওর মনোযোগ ছিল নজরে পড়ার মতো। নীলুদের বড় বাড়ির মাঠে ও বাগানে ছিল নানাধরনের গাছগাছড়া এবং ফুলের গাছ।  রঙ বেরঙের প্রজাপতিগুলো একফুল থেকে অন্য ফুলে নাচতে নাচতে চলে যায় আর নীলু কিন্তু একদৃষ্টে নজর করে যে প্রজাপতিগুলো একটা ফুলের উপর তার দুটো ডানা সোজা উপর করে ত্রিভুজাকৃতি ধারণ করে আবার মাঝেই ডানা দুটো ছড়িয়ে দিয়ে আস্তে আস্তে নাড়াতে নাড়াতে কখন আরও একটা ফুলের উপর বসার আয়োজন করে।  ফড়িংগুলোর বসার  ধরণ একটু অন্য রকম, তারা মাঝে মাঝেই তাদের নিম্ন ভাগ উপর থেকে  নীচের দিকে বাঁকায় এবং তারপরেই টুক করে অন্য জায়গায় ধাওয়া করে। ছোট থেকেই ওর মৃৎশিল্পের উপর একটা আলাদা ভালবাসা ছিল। বাড়ির কাছে থাকা প্রতিমা শিল্পী বসন্ত এবং কার্তিকের বাড়ি ওকে খুঁজে  পাওয়ার একটা জায়গা ছিল। ওর বয়সী ছেলেরা যখন এদিকে ওদিকে ছুটোছুটি করে খেলা করে নীলু তখন একদৃষ্টিতে দেখে মা দূর্গার মূর্তি তৈরি করা বিশেষ করে সিংহ কি করে অসুরকে আক্রমণ করছে সেটা দেখা। মাঝে মাঝেই ওর নিজের আইডিয়াটাও বলতো বসন্ত বা কার্তিকের কাছে। ও মনে মনে নিজেই প্রতিমা গড়তো এবং ওর ছোট ছোট পেলব নরম আঙ্গুলের ছোঁয়ায় গড়ে উঠত মা দূর্গা বা মা কালীর মূর্তি এবং কেউ ধারণায় আনতে পারতো না যে এটা কোন পাকা শিল্পীর সৃষ্টি নয়। নীলুর শৈশবটাই ছিল শিল্পময়। এহেন নীলুর চিড়িয়াখানা দর্শন ওর  মনে এক বিশেষ প্রতিফলন ফেলল। কেশরধারী সিংহকে দেখে ওর মনে একটা আলাদা অনুভুতির সঞ্চার হলো। ঐরকম যদি একটা সিংহ ওর বন্ধু হতো, ঐ পশুরাজ সমস্ত পশুর সঙ্গে ওর পরিচয় করিয়ে দিত যে এই নীলু আমার বন্ধু, ও এই বনের মধ্যে যখন ইচ্ছে আসবে যাবে, ওর যেন কোন ক্ষতি কেউ না করে। নীলুর বুকটা দারুণ ফুলে উঠল। সেই সিংহের প্রতি ওর আকর্ষণ যেন কয়েকগুণ বেড়ে গেল। প্রতিভাশালী সৃষ্টিশীল নীলু বড় হয়েছে কিন্তু মনের নিভৃতে সেই সিংহের সঙ্গে বন্ধুত্ব করার ইচ্ছেটা কিন্তু যায়নি। ভাল চাকরি করার সুবাদে একদিন ও চিড়িয়াখানার অধিকর্তার সঙ্গে দেখা করে ওর মনের ইচ্ছার কথা বলল। উনি শুনে তো খুব খুশি। তিনি বললেন যে আপনার মতো অনেকেই যদি এগিয়ে আসেন এই পশুপাখিদের সংরক্ষণের ব্যাপারে তাহলে তো সত্যিই সেটা খুব আনন্দের। আমরা চাই আরও বহু মানুষ এই ব্যাপারে এগিয়ে আসুন। কথাবার্তা সব পাকা, মাসে বার হাজার টাকা লাগবে ওই সম্রাটের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য । নীলুও সম্রাটের জন্য এই টাকার ব্যয়ভার বহন করতে রাজি। এরপর ই হল একটা বিপত্তি। মোটরসাইকেলে আসার সময় একটা কুকুরকে বাঁচাতে গিয়ে সাঙ্ঘাতিক এক দুর্ঘটনার সম্মুখীন হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলো এবং দীর্ঘ সময়ের অপারেশনের পর নীলু বা সম্রাট সুস্থ হয়ে উঠল কিন্তু এর মধ্যেই বেশ কয়েক মাস কেটে গেছে। সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েই ছুটল সেই চিড়িয়াখানার অধিকর্তার সঙ্গে দেখা করতে এবং সেই সিংহটি যার নাম ও সম্রাট তার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সই সাবুদ করতে। চিড়িয়াখানার অধিকর্তা সুদর্শন বাবু নীলুকে দেখেই চিনতে পারলেন এবং বললেন," সম্রাট বাবু, কি হয়েছিল আপনার, সেই গেলেন আর এতদিন পরে এলেন, কি ব্যাপার?" নীলুর কাছে সমস্ত ঘটনা জানার পর তিনি একটু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন," সরি , সম্রাট বাবু, এযাত্রায় আপনার ইচ্ছা পূরণ করতে পারা গেল না কারণ আমাদের সেই সিংহটি যার নাম ও সম্রাট ছিল সে মারা গেছে।"  এক রাশ যন্ত্রণা বুক ঠেলে এগিয়ে এল, ছলছলে চোখে কোন রকমে অশক্ত শরীরটাকে টেনে নিয়ে এসে গাড়ির মধ্যে চুপ করে বসে থাকলো। ড্রাইভার তো হতভম্ব। খানিকক্ষণ পরে জিজ্ঞেস করল, " নীলু দা, শরীরটা ঠিক আছে তো?"
নীলু কোন উত্তর না দিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে ইশারা করল স্টার্ট করার জন্য।

No comments:

Post a Comment