Saturday, 27 December 2025

"বনলক্ষ্মীর দ্বারে"

সুজন বাবু আজ খুশীতে ডগমগ। অনেকদিন পরে স্ত্রী, ছেলে, বৌমা, নাতি, নাতনিদের নিয়ে শান্তিনিকেতনে দুটো দিন কাটিয়ে ফিরে যাচ্ছেন নিজের বাড়িতে। দুটো দিন কেটেছে তাঁর পছন্দের গার্ডেন বাংলোয়, নানান ধরণের গাছগাছড়ায় ভর্তি আর পাখিদের কূজনে যেখানে ঘুম ভাঙে সেই ছবির মতন গেস্ট হাউসে। সামনে বড় লোহার গেট, গাড়ি পৌঁছে হর্ণ দেওয়া মাত্র দারোয়ান বেরিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল বুকিং আছে কি না এবং ভেতরে ঢুকে দেখে নিয়েই খুলে দিল গেট। দরজা খুলে বেরিয়ে আসতেই একগাল হেসে দারোয়ান মহাদেব বলল," স্যার, আপনি?" সুজন বাবু মনে মনে একটু খুশিই হলেন চিনতে পেরেছে দেখে , প্রত্যেক মানুষেরই একটা অহংবোধ থাকে আর সেটা যখন পরিতৃপ্ত হয় তখনই মানুষের মন খুশিতে ভরে ওঠে। ঢুকেই ডানদিকে গাড়ি রাখার জায়গা, বেশ কয়েকটা বড় গাড়ি থাকতে পারে। গাড়ি আর আগে যাবেনা, সমস্ত মালপত্র ওখানেই নামিয়ে রিক্সা ভ্যানে করে দুজন মহিলা সেটাকে টেনে নিয়ে রিসেপশনে চলে এল। মাল্টিপল অ্যাকটিভিটি তাদের, তারাই রেজিস্টার এগিয়ে দিল, তারাই মালপত্র ওপরে নিয়ে গেল এবং সব ব্যবস্থা করে দিল। ভাল লাগল দেখে, স্থানীয় মহিলারা যাঁরা খুব বেশি পড়াশোনা না করেও স্রেফ মুখের হাসি এবং আন্তরিকতা দিয়ে গ্রাহকদের মন জয় করে নেন না এবং সঙ্গে সঙ্গে গেস্ট হাউসের মর্যাদাও।


শান্তিনিকেতনে সবাই যেন গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের মর্যাদা ধরে রাখতে ব্যস্ত। ভারী সুন্দর কাব্যিক নাম তাদের বাড়ির এবং ফুলের বাহার সর্বত্র। কোন বাড়ির নাম খেয়া আবার কোনটার নাম গেহ আবার কেউ বা হলো দর্পণ বা শ্যামশ্রী বা ছান্দিক। ভাল লাগল যে কবিগুরুর আত্মাও হয়তো পরিতৃপ্ত হয়েছেন। এই বাড়ির মালিক একজন শিল্পী এবং তাঁর বাড়ির প্রত্যেকটি কোণে তার ছাপ স্পষ্ট। ডাইনিং হল সম্পূর্ণ কাচের, শীতের হিমেল হাওয়ার সেখানে প্রবেশ নিষেধ। তার ই সংলগ্ন একটা আধুনিক ধারার অ্যাপার্টমেন্ট আর ওই ডাইনিং হলের সোজা লনের উপর দিয়ে হেঁটে গেলে আসবে সেই হেরিটেজ বাংলো যার দুটো তলায় চারটে  অত্যন্ত প্রশস্ত ঘর এবং মাঝখানে বিরাট লাউঞ্জ। বিশাল দুই দেয়ালে দুটো বড় আয়না এবং কারুকার্য মণ্ডিত কাঠের সোফা এবং দেওয়ালে শিল্পীর আঁকা পটচিত্র যা যে কোন শিল্পমনস্ক ব্যক্তিকেই আকর্ষণ করবে। ঐ হেরিটেজ বাংলোর তৃতীয় তলে প্রবেশ নিষেধ। বিশাল উঁচু ঘরের প্রবেশ পথে এক শিল্পময় দরজা যাতে   লাগানো তালা খুলে ঘরে প্রবেশ করতে হবে এবং ডানদিকে একটা বড় বাথরুম। উল্টোদিকের ঘরে বাঁদিকে বাথরুম। বাথরুম থেকে বেরিয়ে শোবার ঘর , সেখানে ও রয়েছে একটা বড় শক্তপোক্ত কাঠের দরজা যাতে তালা ও লাগানো যায়। বিশাল বড় ঘরে রয়েছে আরও দুটো বড় দরজা এবং তার ই সঙ্গে মানানসই জানলা। বড় কাঠের সোফা ও টেবিল রয়েছে একদিকে আর অন্যদিকে রয়েছে সুদ‌শ্য ড্রেসিং টেবিল এবং কাঠের চেয়ার ও টেবিল। একদিকে রয়েছে বিরাট মাপের সাবেকি আমলের কারুকার্য করা খাট যাতে তিনজন খুব ভাল ভাবে শুতে পারে, শীতকালে হয়তো চারজনেও। ড্রেসিং টেবিলের দিকেও একটা বড় খাট যেখানে দুজন আরামে শুতে পারে। আরও একটা দারুন জিনিস চোখে পড়ল যেটা হচ্ছে সুদৃশ্য এক আলনা যেখানে কোট, জামা কাপড় রাখা যায়। বড় খাটের পায়ের দিকে রয়েছে এক প্রকাণ্ড কাঠের সিন্দুক যার ভেতরে রয়েছে বাড়তি লেপ, চাদর ও বালিশ। সিন্দুকের ওপরে রাখা ইলেকট্রিক কেটলি এবং চায়ের সম্ভার, কাপ ও প্লেট। ঘরের দেয়ালেও রয়েছে সুন্দর চিত্রকলা। এককথায় বলা যায় যে হেরিটেজ যেন সর্বাঙ্গে মিশে আছে। একতলায় ও এক ই রকম, বাঁকানো কাঠের সিঁড়ির উল্টোদিকে রয়েছে রিসেপশন এবং সিসিটিভির মনিটর যা চব্বিশ ঘণ্টা নজর রাখছে কি হচ্ছে বা কে এল বা গেল। মানে আধুনিকতায় মোড়ানো হেরিটেজ।

মেন গেটের বাঁদিকে রয়েছে মাড হাউস যার দরজা, জানলা ও কাঠের স্তম্ভগুলো প্রত্যেকটি ই শিল্পময়। বাড়ির মালিক যে শিল্পী তা যেন প্রতি মূহুর্তে মনে পড়িয়ে দেয়। বহু বছরের পুরনো কাঠের স্তম্ভগুলো ইট দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে যা বছর পাঁচেক আগে এসে সুজন বাবু দেখেন নি। হয়তো বা দোতলার ঘরগুলোকে একটু মজবুত করার জন্য। কিন্তু সেই ইটগুলো ও বসানো  হয়েছে শিল্পীর মান রেখেই। এই মাড হাউসে মাঝে মাঝেই সিনেমার শ্যুটিং হয়। পাঁচ বছর আগে যখন প্রথম এসেছিলেন সুজন তখন শিল্পীর স্ত্রী ছিলেন এবং তাঁর স্বামীর শিল্পকর্মের কিছু অ্যালবাম ও দেখেছিলেন যেটা এবার হলো না উনি না থাকায়।
আসার পথে শক্তিগড়ে ব্রেকফাস্ট বেশ ভাল রকমের হওয়ায় লাঞ্চ করার তেমন ইচ্ছে হলোনা, গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পরা হলো সোনাঝুড়ির মেলায়। এই মেলার প্রধান আকর্ষণ আশপাশের গ্রাম থেকে আসা বিভিন্ন ধরনের শিল্পীর হাতের কাজের নমুনা। দেবদারু গাছ, ইউক্যালিপটাস গাছ ও নানাধরণের গাছের ফাঁকে ফাঁকে বসা এই মেলায় ঘুরে ঘুরে নানাবিধ জিনিস কেনা একটা দারুন অভিজ্ঞতা। কেউ বা বিক্রি করছে দই, কেউ বা গামছা আবার কেউ বা বসে আছে পেয়ারা, কামরাঙা বা কদবেল নিয়ে। আচারের তেলে মাখানো পেয়ারা খাওয়া এক বিরল অভিজ্ঞতা। কতরকমের জিনিস এই গ্রামীণ শিল্পীরা যে বিপণন করেন তার ইয়ত্ত্বা নেই এবং দামেও যথেষ্ট শস্তা। কলকাতা এবং অন্যান্য জায়গা থেকে বহুলোক এখানে আসেন ব্যবসার খাতিরে। বাউলরা আগে বসতেন বাঁশের মাচার উপর কিন্তু এখন সেগুলো ভেঙে দেওয়ায় তাদের মাটির উপর ত্রিপল বা প্লাস্টিকের চাদরে বসতে হয়। চারিদিকে নানান কলরব কিন্তু এর ই মধ্যে এই শিল্পীদের গান গাইতে হয়। আদিবাসী মেয়েরা সাধারণত হলুদ শাড়িতে সজ্জিত হয়ে তালে তালে নাচেন এবং কিছু আধুনিকারা তাঁদের সঙ্গে তাল মেলান। প্রথম দিন বাউলদের দেখা মিলল না, বেলাও বেশ বেড়েছে, যাওয়া হলো একজনের রেফারেন্সে আমোলি রেস্তোরাঁয়। গলি ঘুঁজি খুঁজে বের করা রীতিমতো কঠিন কাজ কিন্তু অবশেষে মিলল দেখা তাঁর এবং অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর এল বহু প্রতীক্ষিত কিছু বিশেষ খাবার যা সচরাচর সাধারণ রেস্তোরাঁয় পাওয়া যায়না এবং অবশ্যই তুলনায় দামী অন্তত ঐ জায়গার অনুপাতে। অবশ্য ওটা না হলে চলবেই বা কি করে। যাই হোক ওখান থেকে বিশ্বভারতীর ছাতিম তলায় পৌষ মেলার উদ্বোধনের আয়োজন দেখতে যাওয়া হলো কিন্তু সিকিউরিটি গার্ডের কাছে পাওয়া খবরে বিশেষ উৎসাহী হতে পারা গেলনা। ফিরে আসা হল গেস্ট হাউসে এবং সেখান থেকে ভোরবেলা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ভেসে আসা আওয়াজে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো হলো। গা গড়িমসি করে উঠে জলখাবার খেতে বেশ দেরী হলো এবং কঙ্কালীতলার উদ্দেশ্যে যাওয়া হলো।  বেশ কয়েক বছর বন্ধ থাকার  পর ফের চালু হওয়া পৌষ মেলার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে নানান বিড়ম্বনায় পড়তে হলো ।পুলিশে  পুলিশে  ছয়লাপ । এদিকে রাস্তা খোলা  তো ঐদিকো
 বন্ধ । গাড়ি ছেড়ে  দিয়ে টোটোয় যাত্রা  পৌষ মেলার উদ্দেশ্যে । সেখানে ও কিছু জিনিসপত্র  কেনা হলো কিন্তু অসম্পূর্ণ কেনাকাটা সম্পূর্ণ করতে যাওয়া হলো ফের সোনা ঝুড়ির মেলায়। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হবার মতো, খাওয়া হলো রাম শ্যামের হোটেলে। ভেজিটেরিয়ান থালি ২০৫টাকা জি এস টি সমেত কিন্তু খাওয়ার গুণগতমান এবং আতিথেয়তা প্রশংসনীয়। খাওয়ার পর ছোটখাটো দুচারটে জিনিস কিনে ফেরার পথে চোখে পড়ল বাউলদের। সুজনের  অত্যন্ত পছন্দের জগন্নাথ দাস বাউলের সন্ধান পেয়ে নমস্কার করে প্রিয় গান"পরের জায়গা পরের জমিন ঘর বানাইয়া আমি রই, আমি তো এই জমির মালিক নই" শুনে মনটা ভরে গেল। বাঁ হাতে একতারা, ডান হাতে মাঝে মাঝে তবলা বা ম্যারাকাশ এবং পায়ে ঝুমুর এবং গলায় দরদ ভরা গান এক আলাদা মাত্রা নিয়ে আসে। নাতি, নাতনী ও ছেলের সঙ্গে আলাপচারিতার মাঝে আরো খান চারেক গান শোনালেন জগন্নাথ দাস বাউল এবং ফিরে আসা গার্ডেন বাংলোয়।

পরের দিন সকাল বেলায় ফিরে আসার পালা। বোঁচকা বুঁচকি সব বাঁধা ছাঁদা শেষ। ব্রেকফাস্ট সারা হয়ে গেছে, মালপত্র গাড়িতে উঠে গেছে, সবাইকে বিদায় জানিয়ে অবশেষে ফেরার পালা। কিন্তু বনলক্ষ্মী তো যাওয়া হলোনা। বিভিন্ন রাস্তা বন্ধ, ঘুরে ঘুরে পৌঁছানো গেল বনলক্ষ্মীর দ্বারে। প্রবেশ পথ একটা বাঁশ দিয়ে আটকানো। গাড়ি পৌঁছাতেই কয়েকটি বাচ্চা ছেলেমেয়েরা ছুটে এল, কারণ জিজ্ঞেস করতেই জানালো তারা সরস্বতী পুজো করবে, তার জন্য চাঁদা চাইছে তারা। কয়েকজন গাড়িওয়ালা খুব বকাবকি করায় ওই শিশুদের মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। কয়েকটা গাড়ির পিছনে থাকা সুজনের নজর সেটা এড়ায়নি। বছর দশ এগারোর ছেলেমেয়েদের এমনভাবে বকুনি দেওয়াটা সুজনের একদমই পছন্দ নয়। মনে পড়ে গেল তার নিজের শৈশবের কথা। শিব পূজোর চাঁদা তুলতে গিয়েছিল সে তার বন্ধুদের সঙ্গে কলেজের মেন হোস্টেলে। কলেজের  পড়ুয়া ড়্গলল্লছাত্ররা প্রথমে তাদের একটা ঘরে বন্ধ করে দিয়েছিল। তারপর কান্নাকাটি করায় তাদের ছেড়ে দিয়েছিল কিন্তু কয়েকটা গান শোনানোর পরে। সুজন সেই সময় খান চার পাঁচেক করার পর ছাড়া পেয়েছিল কিন্তু কয়েকজন ছাত্র যারা একটু কষ্ট পেয়েই হোক বা সহানুভুতিশীল হয়েই হোক একটাকা সাড়ে দশ আনা চাঁদা তুলে দিয়েছিল। তখন সুজন কান্না ভুলে টাকাটা পকেটে ভরে নিয়েছিল।  একটা একটা করে গাড়ি ঢুকছে আর বেরোচ্ছে। ছেলেমেয়েগুলো  একটু দমে গিয়ে পাশেই এক্কা দোক্কা খেলতে শুরু করে দিল। অনেকদিন পর এই খেলাটা দেখে সুজন আবার শৈশবের গভীরে ডুব দিল। আগে তো সেও তার দিদিদের সঙ্গে এক্কা দোক্কা খেলেছে এবং নিজেদের বন্ধুদের সঙ্গে পিট্টু বা গাদন খেলেছে। সবকিছুই মনে পড়ে যাচ্ছে। অবশেষে তাদের গাড়ি ঢুকলো। ও প্রথমে বনলক্ষ্মীর ভেতরে ঢুকল না এবং বাচ্চাদের খেলা দেখতে লাগলো। বছর দশেকের একটি ছিপছিপে চেহারার কোঁকড়ানো চুলের মেয়ের দিকে চোখ পড়ে গেল। কি অপূর্ব সুন্দর রূপ দিয়েছেন ভগবান তাকে। তার নাতনির থেকে বছর খানেক বড় হবে হয়তো, তার সঙ্গে আরো একটি  দীঘল চোখের মেয়ে। সুজন তাদের ডাকলো এবং নাম জিজ্ঞেস করল ও কোন স্কুলে ও কোন ক্লাসে পড়ে জিজ্ঞেস করল। একজন ক্লাস ফোর থেকে ফাইভে উঠবে আর অন্যজন ফাইভ থেকে সিক্সে। ছেলেরাও এগিয়ে এসে বললো, " আঙ্কেল,আমরা সরস্বতী পূজো করব, আমাদের একটু চাঁদা দেবেন?"
"নিশ্চয়ই দেব" বলে জিজ্ঞেস করলেন কত দিতে হবে। ওরা জানালো পাঁচ টাকা,দশ টাকা যা হোক। সুজন ওদের একটা একশো টাকার নোট দিয়ে বললো যে এটা এই গাড়ির তরফ থেকে। ওরা তো খুব খুশি। সবাই ঘিরে ধরেছে ওঁকে। হঠাৎ ই একটা মোটর সাইকেলে স্বামী ও স্ত্রী বনলক্ষ্মী থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে দেখে ওরা তাদের কাছে চাঁদা চাইল। ওরা বললো," আমরা মুসলমান, আমরা পূজোর চাঁদা দিই না।" ঐ বাচ্চা ছেলেমেয়েদের মধ্যে যে সবচেয়ে বড় সেই সুদীপ সরকার ক্লাস সিক্স থেকে সেভেনে উঠবে সুজনকে এসে সরাসরি জিজ্ঞেস করলো, " আঙ্কেল, মুসলমানরা কি পড়াশোনা করেনা?" সুজন প্রায় বোল্ড আউট, বাঁচিয়ে দিল তাদের ই ড্রাইভার আলম ভাই। উনি বললেন, যে চাঁদা না দেওয়ার বাহানায় উনি এইরকম কথা বলেছেন। আমি ও তো মুসলমান, আর ইনি হচ্ছেন আমার দাদা। আমিও তো আমার ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করিয়েছি। মনের মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকল সুদীপের প্রশ্নটা। তাঁর সঙ্গে ও তো পড়তো কুদ্দুস, আকবর, মোর্শেদ, রিয়াজুল, সফিকুল ও রফিকুল রা। তারা তো ওঁর সঙ্গে দূর্গাপূজো, সরস্বতী পুজোর চাঁদা তুলতো, কোনদিন তো এইধরণের প্রশ্ন ওঠেনি, তবে আজ কেন? কেন এই রাজনৈতিক নেতারা মানুষের মনের মধ্যে বিষ ঢুকিয়ে দিচ্ছেন যাতে এই শিশুদের মনটাও কলুষিত হয়ে যায়? বনলক্ষ্মীর দ্বারে এসে নিজেকেই হারিয়ে ফেললেন সুজন, ধীরে ধীরে বৌমা, নাতি নাতনিদের ডেকে গাড়িতে উঠে পড়লেন।

Tuesday, 16 December 2025

"সম্রাটের সম্রাট দর্শন"

ইতিহাসের পাতা ওল্টালেই দেখা যায় একজন রাজা বা সম্রাট আরও একজন রাজা বা সম্রাট(তিনি যত ই ছোট মাপের হ'ন না কেন) তাঁকে যথাযোগ্য মর্যাদা প্রদর্শন করেন। মহাভারতে বা অন্য বিদেশী সাহিত্যেও এর প্রচুর নিদর্শন রয়েছে। কোন কোন ক্ষেত্রে যেখানে এক দেশের রাজা আর এক দেশ আক্রমণ করেছেন এবং বিজয়ী  হয়েছেন সেক্ষেত্রে অবশ্য আলাদা ব্যাপার। সেখানে পরাজিত রাজাকে বন্দী করে অমানুষিক অত্যাচার করে মেরে ফেলা হয়েছে এবং সমস্ত রকমের লুণ্ঠন করা হয়েছে কিন্তু অবশ্যই তার ব্যতিক্রম ও আছে। যেমন আলেকজাণ্ডার পুরুকে পরাজিত করার পর যখন জিজ্ঞেস করেন তিনি তাঁর কাছে কি রকম ব্যবহার আশা করেন যার উত্তরে রাজা পুরু উত্তর দেন একজন রাজার প্রতি আরেকজন রাজার ব্যবহার। তাঁর এই নির্ভীক উত্তরে আলেকজান্ডার খুশী হয়ে তাঁর রাজ্য ফিরিয়ে দেন এটাই আমরা জেনেছি। আজকের দিনে ও পৃথিবীর মহাশক্তিধর রাষ্ট্রের নেতার ব্যবহার আর একজন ক্ষুদ্র দেশের প্রধানের প্রতি সেই ইঙ্গিত বহন করে। মাঝে মাঝে বড় দাদার মতো ছোট ভাইকে ডেকে এনে কান মলে দেওয়ার মতো ভর্ৎসনা করার নিদর্শন ও কিন্তু আছে যদিও সেটা সংখ্যায় নিতান্তই কম।

সম্রাট যার ভাল নাম সেই নীলু গেছে বাবার সঙ্গে চিড়িয়াখানায়। ছোটবেলা থেকেই নীলু ছিল একটু বেশি পরিমাণেই অনুসন্ধিৎসু এবং ছোটখাটো সব বিষয়েই ওর মনোযোগ ছিল নজরে পড়ার মতো। নীলুদের বড় বাড়ির মাঠে ও বাগানে ছিল নানাধরনের গাছগাছড়া এবং ফুলের গাছ।  রঙ বেরঙের প্রজাপতিগুলো একফুল থেকে অন্য ফুলে নাচতে নাচতে চলে যায় আর নীলু কিন্তু একদৃষ্টে নজর করে যে প্রজাপতিগুলো একটা ফুলের উপর তার দুটো ডানা সোজা উপর করে ত্রিভুজাকৃতি ধারণ করে আবার মাঝেই ডানা দুটো ছড়িয়ে দিয়ে আস্তে আস্তে নাড়াতে নাড়াতে কখন আরও একটা ফুলের উপর বসার আয়োজন করে।  ফড়িংগুলোর বসার  ধরণ একটু অন্য রকম, তারা মাঝে মাঝেই তাদের নিম্ন ভাগ উপর থেকে  নীচের দিকে বাঁকায় এবং তারপরেই টুক করে অন্য জায়গায় ধাওয়া করে। ছোট থেকেই ওর মৃৎশিল্পের উপর একটা আলাদা ভালবাসা ছিল। বাড়ির কাছে থাকা প্রতিমা শিল্পী বসন্ত এবং কার্তিকের বাড়ি ওকে খুঁজে  পাওয়ার একটা জায়গা ছিল। ওর বয়সী ছেলেরা যখন এদিকে ওদিকে ছুটোছুটি করে খেলা করে নীলু তখন একদৃষ্টিতে দেখে মা দূর্গার মূর্তি তৈরি করা বিশেষ করে সিংহ কি করে অসুরকে আক্রমণ করছে সেটা দেখা। মাঝে মাঝেই ওর নিজের আইডিয়াটাও বলতো বসন্ত বা কার্তিকের কাছে। ও মনে মনে নিজেই প্রতিমা গড়তো এবং ওর ছোট ছোট পেলব নরম আঙ্গুলের ছোঁয়ায় গড়ে উঠত মা দূর্গা বা মা কালীর মূর্তি এবং কেউ ধারণায় আনতে পারতো না যে এটা কোন পাকা শিল্পীর সৃষ্টি নয়। নীলুর শৈশবটাই ছিল শিল্পময়। এহেন নীলুর চিড়িয়াখানা দর্শন ওর  মনে এক বিশেষ প্রতিফলন ফেলল। কেশরধারী সিংহকে দেখে ওর মনে একটা আলাদা অনুভুতির সঞ্চার হলো। ঐরকম যদি একটা সিংহ ওর বন্ধু হতো, ঐ পশুরাজ সমস্ত পশুর সঙ্গে ওর পরিচয় করিয়ে দিত যে এই নীলু আমার বন্ধু, ও এই বনের মধ্যে যখন ইচ্ছে আসবে যাবে, ওর যেন কোন ক্ষতি কেউ না করে। নীলুর বুকটা দারুণ ফুলে উঠল। সেই সিংহের প্রতি ওর আকর্ষণ যেন কয়েকগুণ বেড়ে গেল। প্রতিভাশালী সৃষ্টিশীল নীলু বড় হয়েছে কিন্তু মনের নিভৃতে সেই সিংহের সঙ্গে বন্ধুত্ব করার ইচ্ছেটা কিন্তু যায়নি। ভাল চাকরি করার সুবাদে একদিন ও চিড়িয়াখানার অধিকর্তার সঙ্গে দেখা করে ওর মনের ইচ্ছার কথা বলল। উনি শুনে তো খুব খুশি। তিনি বললেন যে আপনার মতো অনেকেই যদি এগিয়ে আসেন এই পশুপাখিদের সংরক্ষণের ব্যাপারে তাহলে তো সত্যিই সেটা খুব আনন্দের। আমরা চাই আরও বহু মানুষ এই ব্যাপারে এগিয়ে আসুন। কথাবার্তা সব পাকা, মাসে বার হাজার টাকা লাগবে ওই সম্রাটের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য । নীলুও সম্রাটের জন্য এই টাকার ব্যয়ভার বহন করতে রাজি। এরপর ই হল একটা বিপত্তি। মোটরসাইকেলে আসার সময় একটা কুকুরকে বাঁচাতে গিয়ে সাঙ্ঘাতিক এক দুর্ঘটনার সম্মুখীন হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলো এবং দীর্ঘ সময়ের অপারেশনের পর নীলু বা সম্রাট সুস্থ হয়ে উঠল কিন্তু এর মধ্যেই বেশ কয়েক মাস কেটে গেছে। সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েই ছুটল সেই চিড়িয়াখানার অধিকর্তার সঙ্গে দেখা করতে এবং সেই সিংহটি যার নাম ও সম্রাট তার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সই সাবুদ করতে। চিড়িয়াখানার অধিকর্তা সুদর্শন বাবু নীলুকে দেখেই চিনতে পারলেন এবং বললেন," সম্রাট বাবু, কি হয়েছিল আপনার, সেই গেলেন আর এতদিন পরে এলেন, কি ব্যাপার?" নীলুর কাছে সমস্ত ঘটনা জানার পর তিনি একটু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন," সরি , সম্রাট বাবু, এযাত্রায় আপনার ইচ্ছা পূরণ করতে পারা গেল না কারণ আমাদের সেই সিংহটি যার নাম ও সম্রাট ছিল সে মারা গেছে।"  এক রাশ যন্ত্রণা বুক ঠেলে এগিয়ে এল, ছলছলে চোখে কোন রকমে অশক্ত শরীরটাকে টেনে নিয়ে এসে গাড়ির মধ্যে চুপ করে বসে থাকলো। ড্রাইভার তো হতভম্ব। খানিকক্ষণ পরে জিজ্ঞেস করল, " নীলু দা, শরীরটা ঠিক আছে তো?"
নীলু কোন উত্তর না দিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে ইশারা করল স্টার্ট করার জন্য।

Saturday, 13 December 2025

"অথ মার্জার কথা"

 মার্জার বা বিড়ালকে অনেক লোক যেমন ভালবাসেন তেমন ই অনেক লোক মনে প্রাণে ঘৃণা করেন। কেউ কেউ আবার বিড়াল দেখলে ভয়ে সিঁটিয়ে যান, যতক্ষণ তাকে না সরানো হবে ততক্ষণ সে ঐ পথ ই মারাবে না।ভয়ানক জ্বালা। কোন কোন মানুষ আছেন যাঁদের পশুপাখিদের প্রতি স্বাভাবিক ভালবাসা আছে এবং সুযোগ পেলেই তাঁরা এদের খাবার দিয়ে ক্ষুন্নিবৃত্তি করেন আবার উল্টোদিকে কেউ কেউ তাদের খাবার তো দেন ই না উপরন্তু অন্য কেউ দিলে রে‌রে করে তেড়ে আসেন এবং নানাভাবে তাদের সমালোচনা করেন এবং খাবার দিয়ে নোংরা করছেন জায়গাটা বলেও গালমন্দ করতে ছাড়েন না। মাঝে মাঝে সমাজ মাধ্যমে লেখালেখি করে জনমত গড়ে তুলে এমনকি থানা পুলিশ পর্যন্ত ও গড়ায়। এঁদের মধ্যে কয়েকজন এমন নাক উঁচু লোক আছেন যাঁদের এইসব ব্যাপারস্যাপারগুলো beneath dignity বলে মনে হয়। অথচ এঁরাই জনসমক্ষে এমন বেশভূষা করে বেরোন যে লোকজন তাদের দেখেন ই না আবার হঠাৎ চোখ পড়ে গেলেও নিজেরাই অপ্রস্তুত হয়ে যান। কিছু তো বলা যাবেনা, ব্যক্তি স্বাধীনতায় আঘাত বলে কথা। এঁরা মাঝে মাঝেই কথায় এমন খই ফোটান যেন মনে হয় কত ই না রুচিশীল ব্যক্তি এঁরা কিন্তু একটু গভীরে খোঁজাখুঁজি করলেই দেখা যাবে যে এদের অনেকেই চরম অসৎ এবং তাঁদের ঐ খারাপ দিক ঢাকতেই তাঁরা এরকম আচরণ করেন।

এবার মূল বিষয়ে ফিরে আসা যাক। মার্জারকুল কিন্তু ভীষণ সুন্দর। তাদের আচার আচরণে রীতিমতো মুগ্ধ হয়ে যেতে হয়। সবাই একটু ভালবাসা পেতে চায়। একটু আদর করে খেতে দিলে কি আর এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায়? রাস্তা ঘাট নোংরা হয়ে যায় এইরকম সমালোচনার তীর প্রায়শই ছুটে আসে অথচ আমরা যেন ধোয়া তুলসী পাতা। আমাদের দ্বারা কোনরকম দূষণ হচ্ছে না এইরকম গ্যারান্টি কি আমরা দিতে পারি? গাড়িতে যেতে যেতে পথে ঝালমুড়ি ( ভুল হয়ে গেল, এঁরা তো  রাস্তায় পাতি লোকের কাছে ঝালমুড়ি কিনলে এঁদের মানসম্ভ্রম মাটিতে মিশে যাবে)/ মঞ্জিনী বা মিও অ্যামোরের চিকেন প্যাটিস বা রোল কিনে খাওয়া শেষে প্যাকেটটা রাস্তায় ফেলে দিয়ে নোংরা করেন না? খুব কম লোকই আছেন যাঁরা বাক্সটিকে সযত্নে রেখে দিয়ে নিকটবর্তী কোন ডাস্টবিনে ফেলে দেন। এঁদের কথা তবু একটু হজম করা যায় কিন্তু বেশিরভাগ লোকই সমালোচনা করতে হয় ভেবে করেন। তাঁদের কাছে পশুপাখিদের প্রতি ভালবাসা দেখানো একটা অপরাধ বা স্রেফ ন্যাকামো বলে মনে হয়।

আমি সেই ন্যাকার দলের একজন।  কথায় আছে ন্যাড়া বেলতলায় একবারই যায় কিন্তু আমি ন্যাড়ার ও অধম। আমি দু দুবার কুকুরের কামড় খেয়ে চোদ্দটা করে আটাশটা ইঞ্জেকশন নেওয়ার পরেও আমার হুঁশ হয়নি এবং এখনও আমি মনেপ্রাণে পশুপাখিদের ভালবাসি এবং সুযোগ পেলেই একটু আদিখ্যেতা দেখাই। এতে প্রচুর গনগনানি শুনতে হয় কিন্তু আমি তখন কালা ও বোবা। ছাদ সারানোর কাজ সবে শেষ করে মিস্ত্রিরা চাবি দিয়ে গেছে আর আমিও কেমন কাজটা করলো দেখতে গেছি। কখন পিছন পিছন একটা সাদা বিড়াল আমার সঙ্গ নিয়ে পিছু পিছু দেখতে এসেছে খেয়াল করিনি। আমি এদিক সেদিক দেখছি আর মোবাইলে ফটো তুলছি। হঠাৎ কা কা করে অনেকগুলো কাকের আওয়াজে সচকিত হয়ে ভাবছি কোন কাকের বাসা টাসা রয়েছে আর আমাকে দেখে চেঁচামেচি শুরু করেছে। কাকের ঠোকর যাতে না খেতে হয় এইভেবে যেই না পিছন ফিরে চলে আসার চেষ্টা করছি, দেখি সেই সুন্দরী মার্জার আমার পিছনে আর তাকে দেখেই বায়সদের এত আর্তনাদ। তাকে নামানোর চেষ্টা  অনেক ক্ষণ ধরে করার পরে বিফল হয়ে ফিরে এলাম। তিনি তো এলেন ই না উপরন্তু একটু জেদাজেদি করাতে তিনি পাশের বাড়ির ছাদে আশ্রয় নিলেন এবং ফিরে এলাম। ছাদের দরজা খোলা রাখা যায়না বলে বন্ধ করে এলাম কিন্তু মনটা খচখচ করছে। একজন খুব কাছের প্রতিবেশীকে ফোন করে জানতে পারলাম যে তিনি নেই এবং তাঁর নিদান অনুযায়ী দরজা খুলে রেখেই খানিকক্ষণ এদিক ওদিক পায়চারি করলাম কিন্তু তাঁকে আর দেখা গেল না। ঠাণ্ডা টা বেশ বাড়ছে, নাক দিয়ে জল পড়াতে আরও বেশী মনে হচ্ছে, খানিকক্ষণ থাকার পরে আবার বন্ধ করে চলে এলাম। মনটা একটা ভীষণ অপরাধ বোধে ভুগছে যে এই ঠাণ্ডায় বিড়ালটা না কিছু খেতে পাবে না কোন আশ্রয় পাবে জলের ট্যাঙ্কের নীচে ছাড়া। ফের রাত দশটা নাগাদ গিয়ে আরো একবার টর্চ জ্বেলে খোঁজ করেও কিছু লাভ হলোনা মাঝখান থেকে আমার নাক দিয়ে জল পড়ার মাত্রা বেড়ে গেল। রাতে ঠিক ঘুম ও হলোনা, সকালে উঠেই আরো একবার দেখতে গেলাম কিন্তু না, এবার ও দেখা পেলাম না। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। একটা অপরাধবোধ মনটাকে কুড়ে কুড়ে খেতে লাগল কিন্তু কিছু করার ও নেই বলে মনটাকে সান্ত্বনা দিলাম।

এরমধ্যেই নয় নয় করে চারটে দিন কেটে গেছে। ব্যালকনিতে বসে খবরের কাগজ পড়ছি। হঠাৎ ই চোখ পড়ল সামনে পার্কিং করা বড় কালো গাড়িটার দিকে। একজন লোক নীল জ্যাকেট পড়ে কারও জন্য অপেক্ষা করছে। একটু বাদ বাদ ই ঘড়িটা দেখছে আর মোবাইলে কাউকে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে। হঠাৎ করেই সেদিনের ঐ সাদা বিড়ালটার মতো একটা বিড়াল লোকটির দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে। মুখের দিকে চেয়ে অস্ফূট স্বরে ম্যাও ম্যাও করছে। আমার মনে হলো সেদিনের বিড়ালটাই এবং বেশ খানিকটা আশ্বস্ত বোধ করলাম যে অন্তত আমার জন্য বিড়ালটা মারা যায়নি। মনটা বেশ হালকা লাগছে। বিড়ালটা অনেকক্ষণ দৃষ্টি আকর্ষণ করার পর লেজটাকে উঠিয়ে লোকটার পায়ের কাছে নিজের গা টা ঘষতে থাকলো। তারপর তড়াক করে লাফ দিয়ে গাড়ির বনেটে উঠে পড়লো। এইবার বেশ স্পষ্ট দেখতে পেলাম যে হ্যাঁ, ইনিই তিনি। লোকটা কথা বলার ফাঁকে ফাঁকেই বিড়ালটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো আর বিড়ালটাও বেশ আদর খেতে লাগলো। বুঝতে অসুবিধা হলোনা যে এটা কারো পোষা বিড়াল। আরও একটা জিনিস ভেবে খুব ভাল লাগলো যে হয়তো এখনও কিছু পাগল রয়েছে যাদের জন্য পৃথিবীটা এখনো পর্যন্ত নীরস হয়ে যায় নি।