দেবরাজ ইন্দ্র তাঁর সহযোগী অন্য দেবতারা স্বর্গ থেকে প্রায় বিতাড়িত অসুরদের দ্বারা। অসুরদের দলপতি বৃত্রা শিবের আশীর্বাদে প্রায় অমরত্ব লাভ করেছিলেন। তাকে কোন অস্ত্রের দ্বারা বধ করা যাবেনা। তাহলে তাকে হারাবে কে? আর সঙ্গে সঙ্গে দেবরাজ ইন্দ্রকেও তাঁর চ্যালা চামুন্ডা সমেত স্বর্গ থেকে চাটি বাটি গোটাতে হবে। স্বয়ং রাজা ইন্দ্র মুখ কালো করে ভগবান বিষ্ণুর শরণাপন্ন হলেন। রাজনীতি তখনও ছিল এখনকার মতো। রাশিয়া বা আমেরিকা এখন যেমন একবার ভারতের গালে আর একবার পাকিস্তানের গালে চুমু খায়, তখনও ভগবান বিষ্ণু এবং মহেশ্বর আমেরিকা রাশিয়ার রোল প্লে করতো। স্বয়ং ভোলানাথ অল্পেই তুষ্ট হন এবং বেশি কূটকচালির মধ্যে না গিয়ে খুব বেশি না ভেবেই চাওয়া এমন একটা বরকে তথাস্তু বলে বসতেন যে তাকে সামলাতে অন্যদের দফারফা। রাশিয়া যদি প্যালেস্টাইনকে সমর্থন করে তবে আমেরিকাকে ইস্রায়েলের সমর্থনে নামতেই হয়। সুতরাং স্বয়ং বিষ্ণু যে দেবরাজ ইন্দ্রকে বুদ্ধি দেবেন এতে আর আশ্চর্য কি আছে। তিনি দেবরাজ ইন্দ্রকে বললেন যে যাও মহর্ষি দধীচির কাছে এবং তাঁর কাছে তাঁর অস্থি র প্রার্থনা কর। স্বর্গের এইসব ব্যাপার স্যাপার বড্ড গোলমেলে। দেবরাজ ইন্দ্র, তুমি রাজা। দেবতাদের দেখভাল করা তো তোমার কাজ। কেমন তোমার কূটনীতি হে? তুমি তো ঠিকমতো সামলাতেই পারনি। তুমি থাকতে কেমন করে অসুর বাবাজী স্বয়ং মহেশ্বরের কাছ থেকে বর নিয়ে চলে গেল আর তুমি কি তখন আঙুল চুষছিলে? আরও একটা জিনিস কিছুতেই বোধগম্য হয়না। রাজ্যপাট তোমার, সামলাবে তুমি। কথায় কথায় তোমাকে দাদা ধরতে হবে কেন শুনি? অনেক ভাবনা চিন্তার পর একটা মিল এখনকার রাজনীতির সঙ্গে মিল খুঁজে পেলাম। সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর সর্বময় ক্ষমতা কিন্তু কোথা থেকে তাঁর মাথার উপর উড়ে এসে জুড়ে বসল ন্যাশনাল অ্যাডভাইসরি কাউন্সিল যার মতামত ছাড়া পাতাও হেলবে না। অতএব যা হবার তাই হলো। দেবরাজ ইন্দ্রর ক্ষেত্রেও তার কোন ব্যতিক্রম নয়। সুতরাং আমেরিকান বিষ্ণুর কথামতন মহর্ষি দধীচির কাছে যাওয়া এবং আবদার ধরা, ঋষিবর, " আপনি প্রাণ ত্যাগ করুন এবং আপনার অস্থি দিয়ে আমি অস্ত্র বানাবো এবং সেই অস্ত্রে আমি বৃত্রাসুরকে বধ করে স্বর্গ উদ্ধার করব।" মহর্ষি জ্ঞানী পুরুষ , উনি দেবরাজ ইন্দ্রর আগমনের কারণ জানেন এবং একটা শর্ত আরোপ করলেন। তিনি বললেন যে সমস্ত নদীতে অবগাহন করার পর তিনি প্রাণ ত্যাগ করবেন। কিন্তু ইন্দ্রর আর তর সইছে না অথচ মহর্ষিকে হত্যাও করতে পারছেন না। আর ঐদিকে ঊর্বশী, মেনকাদের নৃত্য গীত কতদিন শোনা হয়নি আর সেই জায়গায় অসুররা আহ্লাদিত হচ্ছে তাদের নৃত্য গীতে, এটা ভেবেই দেবরাজের মন খুব খারাপ হয়ে গেল। তিনি তখন সমস্ত নদীর জল একত্রিত করে সেইখানে নিয়ে এলেন এবং মহর্ষিকে বললেন, " এইখানেই সব নদীর জল আছে যেটা যোগবলে আপনি জেনে নিতে পারেন যে সব ঠিক ঠাক আছে কিনা।" এখনকার যেমন অডিটরের সামনে সমস্ত বই খাতা ফেলে দিয়ে বলা হয় দেখে নিন স্যার একবার চোখ বুলিয়ে আর চট করে সই করে স্ট্যাম্প লাগিয়ে দিন। আমাকে আর বলতে হবেনা বাপধন, আমি বুঝেছি তোমার যথেষ্ট তাড়া। মুনিবর তাঁর
কথামতন সেই জলে অবগাহন করে স্বেচ্ছায় প্রাণ ত্যাগ করে দেবরাজ ইন্দ্রকে ব্রহ্মহত্যা থেকে নিষ্কৃতি দিলেন। আহ্লাদে আটখানা দেবরাজ ইন্দ্র তাঁর অস্থি নিয়ে সঁপে দিলেন বিশ্বকর্মার হাতে এবং তিনি মহর্ষির মেরুদন্ড দিয়ে বানালেন বজ্র এবং সেই বজ্রাঘাতে নিধন হলো বৃত্রাসুর এবং দেবতারাও ফিরে পেলেন তাঁদের মনসবদারি। আর বেশ লোকদেখানি শান্তি স্থাপন হলো ভগবান বিষ্ণুর মহেশ্বরের সঙ্গে। ব্রিটেন আমেরিকা ও রাশিয়া যেন ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের পুনর্মিলন হলো।
এ তো গেল সেই পুরানের কচকচানি। এবার আসা যাক আজকের দধীচির কথায়। স্বার্থ ত্যাগের মহান আদর্শ মহর্ষি দধীচির। অনেকটা আমাদের পরমবীর চক্রের মতন। আমেরিকা বা রাশিয়া কেউ প্যাটন ট্যাঙ্ক বা স্যাবার জেট বা এফ সিক্সটিন বা মিগ বিক্রি করে যুদ্ধ করতে সাহায্য করে কিন্তু সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আর কেউ নিজে মাঠে ময়দানে নেমে যুদ্ধ করতে এগিয়ে আসেনি। তোমরা আমাদের অস্ত্র কেনো, যুদ্ধ কর। ফেল কড়ি, মাখ তেল। তোমরা যত যুদ্ধ করবে কর, অস্ত্র চাই কেনো আর আমাদের অর্থভাণ্ডার সমৃদ্ধ কর। ব্রহ্মা তো সৃষ্টি করেই খালাস, গোল বাধে বিষ্ণু আর মহেশ্বরের। তা, যা চলছিল সেটা এখনও চলছে। আমাদের স্লোগানের মতো চলছে, চলবে। এখনও ইতি উতি খুঁজলে কিছু দধীচির সন্ধান মেলে। সংখ্যায় অল্প হলেও এরা আছে এবং এদের এই স্বার্থহীন কাজের জন্য সমস্ত পৃথিবীটা চলছে। সেবা নিবৃত্ত হবার পরেও তাদের এই অসামান্য সেবা যে কত অসহায় লোককে অন্ধের যষ্টির মতো সঠিক পথে চালিত করে তার ইয়ত্ত্বা নেই। কোনরকম দ্বিধা না করে এরা যে কত লোকের উপকার করে সেটা ভাবলেই অবাক হতে হয়। কার স্বামী অসুস্থ হয়েছেন বা গত হয়েছেন এই দধীচিরা কারও ডাকের অপেক্ষা করেন না, কেমনভাবে বাতাস যেন তাদের কানে পৌঁছে দেয় ওখানে তোমার প্রয়োজন আর সেও ছোটে নির্দ্বিধায়। গুরু রামদাস যখন শিবাজীকে ভিক্ষার সন্ধানে বেরোতে নির্দেশ দেন তখন যথেষ্ট অন্ধকার। শিবাজী বলেন, " প্রভু, ভিক্ষা, এখন! এখনও তো হয়নি প্রভাত।" গুরু রামদাস বলেন, " প্রভাত কি রাত্রির অবসানে ? যখনই চিত্ত জেগেছে, তখনই হয়েছে প্রভাত। চল যাই, ভিক্ষার সন্ধানে।" এই দধীচিদের অন্তরেই গুরুদেবের অধিষ্ঠান এবং এরা স্বতঃপ্রণোদিত হয়েই সমস্ত কিছু উপেক্ষা করে এগিয়ে যান অন্যের সাহায্যে। এঁরা বয়োঃকনিষ্ঠ হলেও এঁদের জানাই শত সহস্র প্রণাম।
No comments:
Post a Comment