কয়েক বছরের মধ্যেই তাঁর ওপর একটা কেজো লোকের তকমা সেঁটে গেল এবং তারই ফলশ্রুতি তিনি হলেন সম্পাদক এবং পরের বছর সভাপতি। আমাদের ক্লাব ছিল সভাপতি ভিত্তিক মানে তাঁর কথাই হতো শেষ কথা যদিও তিনি অন্যান্য সদস্যদের মতামত ও নিতেন কিন্তু তিনি কোন সিদ্ধান্ত নিলে তা সকলেই মেনে চলতো। কিন্তু একটা কথা ঠিক যে তিনি সভাপতি থাকাকালীন ক্লাবের যেরকম রমরমা সেটা আর কোন সময়েই হয়নি। প্রাণের স্পন্দন সবার মধ্যেই সংক্রামিত হয়েছিল। একটা কথা আছে না যে কোন কোন সময় একটা ঝাঁকানির প্রয়োজন হয় যেমন গাড়ি চালানোর সময় কোন সেরকম পরিপক্ক নয় ড্রাইভারের গিয়ার চেঞ্জের সময় হয়। গজুদার কোন কোন সিদ্ধান্ত সেরকম স্থির মস্তিষ্ক প্রসূত না হলেও তাঁর ঐকান্তিক ইচ্ছা আর অক্লান্ত পরিশ্রম তাঁকে সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দিয়েছিল।
কথায় কথায় জেনেছিলাম তিনি তাঁর কর্ম ক্ষেত্রে একজন সর্বভারতীয় সম্পাদক ছিলেন এবং তাঁর সেই অভিজ্ঞতাই ক্লাবের উন্নতির শিখরে পৌঁছতে সাহায্য করেছিল। একটা গাড়ি সে যতই পুরোন হোক না কেন যদি চালু থাকে তা বসে থাকা এক নতুন গাড়ির থেকেও ভাল সার্ভিস দেয়। সভাপতির টার্ম ছিল একবছর এবং দ্বিতীয়বার সভাপতির আসন অলঙ্কৃত করার কোন নিয়ম না থাকায় চলন্ত গাড়িটা যেন ঝাঁকুনি দিয়ে থেমে গেল। পরে টুকটাক রিপেয়ারিং হলেও সেই মাত্রায় আর পৌঁছাল না। ধীরে ধীরে ক্রমহ্রাসমান সদস্য সংখ্যা ক্লাবকে একটা প্রায় সাইনবোর্ডে পরিণত করল যদিও গজুদার কোন পরিশ্রমে ঘাটতি ছিলনা কিন্তু কথা আছে না যথা রাজা তথা প্রজা। যদি সভাপতি শুধু আসনে বসার জন্য ই হয় তাহলে তাকে ধাক্কা দিয়ে আর কতদূর নিয়ে যাওয়া যায়?
কিন্তু প্রতিভা এমনই একটা জিনিস যা কোন না কোন ভাবে বিচ্ছুরিত হবেই। শুরু হলো গজুদার লেখা এবং কিছুদিনের মধ্যেই লেখাগুলোর প্রাসঙ্গিকতা ভীষণ বলিষ্ঠ ভাবে প্রতীয়মান হতে লাগল। যে কোন লেখক, তিনি যাই লিখুন না কেন, যদি পাঠকের পৃষ্ঠপোষকতা না পান তাহলে তাঁর উদ্যমে অবশ্য ই ভাটা পড়তে বাধ্য। কিন্তু কেউ যদি তাঁকে উৎসাহ দেন তা ছোট্ট চারাগাছে জল দিয়ে মহীরুহে পরিণত করতে পারে। গজুদার প্রচেষ্টায় আমার কাজ ছিল সেই চারাগাছে জল দেওয়ার মতন। প্রথম প্রথম সেই বলিষ্ঠতা না থাকলেও ক্রমে ক্রমে তা যথেষ্ট মজবুত লেখা হতে থাকল। একের পর এক লেখা আসতে লাগল এবং আমিও চাতক পাখির মতো লেখার আশায় থাকতাম। তারপর হঠাৎই দেখি যে লেখার সংখ্যা কমে কমে একেবারেই শূন্যে এসে ঠেকে গেল। ভাবছি হয়তো গজুদা বাইরে গেছেন কিংবা অন্য কোন কাজে ব্যস্ত আছেন। কয়েকবার টেলিফোন করেও সাড়াশব্দ না পাওয়ায় যথেষ্ট উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লাম। হঠাৎই একদিন টেলিফোনের অন্য প্রান্ত থেকে সাড়া পেলাম। লেখা না আসার কারণ জানতে চাওয়ায় যা উত্তর পেলাম তাতে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। শুনলাম বৌদি মানে গজুদার স্ত্রী মানসিক ভাবে অসুস্থ। প্রচন্ড ধাক্কা খেলাম উত্তর শুনে। তিনি এতটাই শুচিবাইগ্রস্ত হয়ে গেছেন যে কেবল স্নান আর ঠাকুর দেবতাদের সেবা ছাড়া আর কিছুই করেন না। দুর্ভাগ্যবশত তাঁদের কোন সন্তানাদি না থাকায় সংসারের সেই আঠাটাই কোনদিন জমাট বাঁধেনি। আর তার নীটফল মানসিক অবসাদ। বৌদি কারো হাতের রান্না খাবেন না, হোম ডেলিভারি তো দূর অস্ত। সুতরাং গজুদাকেই ঘর ঝাঁট দেওয়া, মোছা, রান্না বান্না সব কিছুই করতে হয়। তারপরও লিখতে বসলেই বৌদির চেঁচামেচি শুরু হয়ে যায়। শুনে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। এই ব্রহ্মান্ডে একা সূর্য ই তো নয়, বহু ছোট বড় নক্ষত্র, গ্রহ উপগ্রহ আছে যদিও সূর্য তুলনামূলক ভাবে কাছে থাকার জন্য তার উপস্থিতি সব সময়ই মনে পড়িয়ে দেয় কিন্তু রাতের আকাশে যখন তিনি থাকেন না তখন চাঁদের স্নিগ্ধ মহিমা বা ঝিকমিক করতে থাকা বহুদূরের নক্ষত্রগুলো কি দৃষ্টিনন্দন নয়? গজুদার লেখা রবীন্দ্রনাথ বা অন্যান্য নামী সাহিত্যিকদের মতো না হলেও তার ও একটা আলাদা বৈচিত্র্য রয়েছে। বিরিয়ানি খেলেও শুক্তোর ও তো একটা আলাদা স্বাদ আছে।
No comments:
Post a Comment