Wednesday, 10 August 2022

বানপ্রস্থ

পূর্বে প্রচলিত কথা ছিল  পঞ্চাশোর্ধে বনং ব্রজেত অর্থাৎ  পঞ্চাশ  পেরোলেই রিটায়ারমেন্ট ফ্রম অ্যাকটিভ লাইফ। রাজা রাজড়ারা তাঁদের  সাধের সাম্রাজ্য সন্তান সন্ততিদের হাতে ন্যস্ত করে বনে চলে যেতেন এবং বাকি জীবনটা ধর্মকর্মে ব্যস্ত থেকে কাটিয়ে দিতেন। কিন্তু একটা খটকা মনের  মধ্যে থেকেই  যায়। রাজা মহারাজারা সাধারণত পরনির্ভরশীল ছিলেন  অর্থাৎ দাসী বাঁদি বা ভৃত্য পরিবৃত থাকতেন এবং তাঁদের সমস্ত কাজ এই চাকর বাকররাই করতো। তাহলে বনে যাবার পর হঠাৎই  নিজের কাজ নিজেরা করতে শুরু করে দেবেন  এটা ভাবা খুবই কষ্টকর। তাহলে কি তাঁরা সমস্ত  লোক লস্কর সমেত যেতেন আর যদি সেটাই হয় তাহলে সেই লোকদের  থাকার  জন্য কাছাকাছি তাদের  বাসস্থান বা বেঁচে থাকার জন্য  নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস পত্রের জোগাড় করতে হতো যার অর্থ  আরও একটা জনপদ গড়ে ওঠা । তাহলে বন আর কি করে বন থাকে? এই ধন্দ মেটানোর জন্য ভাবতে বাধ্য  হতে হলো যে ঐ ব্যবস্থাপনাই কি আজকের  বৃদ্ধাশ্রমের ব্লুপ্রিন্ট?  নানাভাবে দীর্ঘদিন ধরেই এই প্রশ্নের  উত্তর  খুঁজে চলেছি, তাই ভাবলাম  যে কোন সহৃদয়  ব্যক্তি হয়তো আমার অনুসন্ধিৎসা মেটাবেন বা আমার  নিজস্ব  চিন্তাধারাকে তাঁদের  মেধা দিয়ে পরিপুষ্ট করবেন। তবে একটা কথা ঠিক যে রাজা বা রানী সাধারণ জনগণের  মতো হাতে বাজারের থলি ঝুলিয়ে দোকান বাজার  করতে যাবেন আর  চাইলেও ঐ বনবাদাড়ে কে দোকান খুলতে যাবে রাজা রানীর চাহিদা মেটানোর জন্য? এইসব আবোল তাবোল চিন্তা মাথার  মধ্যে ঘুরপাক খায়। তারপর তো শরীর সরাগতের ব্যাপার  আছে। রাজা রানীরাও তো আদতে মানুষ।  তাঁদের ও শরীর খারাপ  হতে পারে। আগে না হয় রাজবৈদ্য ছিল, হুকুম  হলেই নিদান নিয়ে তারা হাজির হতো কিন্তু এই বনে তাদের  বয়ে গেছে থাকতে। তারপর তাঁদের  কেউ মারা গেলে  অপরজন  কি করতেন? শবদেহ করা কি তাঁদের  দ্বারা সম্ভব? এই নিদারুণ  অবস্থা থেকে বাঁচার  একমাত্র  উপায় যে কাছাকাছি কোন  লোকালয়ের   উপস্থিতি এবং সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের  দেখভাল  করার  জন্য  পর্যাপ্ত  লোক লস্কর। মানে আজকের  দিনে পেনশন ভোগী। পেনশনের টাকায় যেমনভাবে  চলা দরকার  তেমনভাবে  চলো।

মাঝে মাঝেই মনে হয় বৃদ্ধাশ্রমে চলে গেলে কেমন  হয় বিশেষ করে যখন  সংসারে খিটিমিটি লাগে। তবে মাঝে মাঝে ফ্যাঁস ফোঁস  না হলে সংসারটা  যেন কেমন  পান্তা ভাত হয়ে যায়। অবশ্য  পান্তা ভাতে পেঁয়াজ,  লঙ্কা ছাতু দিয়ে খাওয়াটাও  একটা ভীষণ  ডেলিকেট খাওয়া আর তার মধ্যে যদি শুকনো লঙ্কা ভেজে মাখা  খাওয়া যায় তাহলে সেটা একটা বিশেষ মাত্রা পায়। সুতরাং মাঝে মধ্যে বৃদ্ধাশ্রমের চিন্তা মাথায় আসেনা  এরকম  নয় কিন্তু ভাল মন্দ  সবকিছু মানিয়ে নিয়ে চলাটাই তো জীবনের আর একটা নাম। কালের গতিতে স্বামী স্ত্রীর  দুজনের মধ্যে কেউ না কেউ তো একজন হয়ে যাবে, তখন  কি করা যাবে? সবাই  তো আর   জেনারেল বিপিন রাওয়াত এবং তাঁর  স্ত্রীর  মতন সৌভাগ্যবান বা সৌভাগ্যবতী নন যে দুজনেই  একসঙ্গে চলে যাবেন।  অতএব  কাউকে না কাউকে একা থাকতেই হবে, উপায় নেই। ছেলে মেয়েরাও  দূরে থাকে , কর্ম ব্যস্ততার মধ্যে তাদের ও নিজেদের  সংসার  ছেড়ে বৃদ্ধ বাবা বা মাকে দেখতে আসাও  সবসময়  সম্ভব  হয়ে ওঠেনা।  তাহলে উপায় কি? ছেলের  সংসার  বা মেয়ের সংসারে কাবাব মে হাড্ডি হয়ে থাকা নতুবা নিজের  বাড়িতেই থেকে অপরের স্মৃতিতে বিভোর  হয়ে থাকা  বা নতুন বন্ধুর  খোঁজে বৃদ্ধাশ্রমের পথে পা বাড়ানো। বন্ধুর  খোঁজে বৃদ্ধাশ্রমের  পথে পা বাড়ানো খুব  একটা খারাপ  কিছু নয় কিন্তু সেখানে গিয়েও যে সমমনোভাবাপন্ন লোক পাওয়া যাবে এমন কোন  নিশ্চয়তা নেই। এছাড়া রয়েছে বৃদ্ধাশ্রমের  নিজস্ব  নিয়মকানুন  যা পছন্দ  না হলেও  মেনে চলতেই হবে যদি ওখানে একান্তই থাকতে হয়। তাছাড়া কর্মীদের  মুখঝামটা যে মাঝেমধ্যেই  শুনতে হবেনা এমন গ্যারান্টিও নেই। সুতরাং গরম  কড়াই  থেকে আগুনের  মধ্যে ঝাঁপ দেওয়ার  কোন মানে  আছে কি? বাইরে থেকে ঝাঁ চকচকে রূপ  দেখে না ভোলা শ্রেয়। নিজের  বাড়িতেই  থাকা এবং পাড়া প্রতিবেশীদের  সঙ্গে সৌহার্দ্য পূর্ণ  সম্পর্ক  বজায় রাখাটাই  সবচেয়ে ভাল।  ভগবানের  দেওয়া দান একটা জীবনের  উৎকর্ষতা তারিয়ে তারিয়ে  উপভোগ  করে কালের নিয়মে ফিরে যাবার  আগে দেহদান করে জীবনের  যতপাপ খানিকটা ক্ষালন করা মনে হয় সর্বোত্তম। নিজের  ছোট পরিসর নিজের  সাম্রাজ্য  মনে করে মন চল নিজ নিকেতনে বলে আমার বিচার তুমি কর তব আপনার করে বলে সুন্দর পৃথিবীকে জানাও বিদায়।

Friday, 5 August 2022

বাস্তুহারা

গল্পের  নামটা উদ্বাস্তু না বাস্তুহারা হওয়া উচিত তা নিয়ে একটু ধন্দে ছিলাম। বিশেষ জ্ঞানের অধিকারী আমি কখনোই  নই, গড়পড়তার চেয়ে একটু সামান্য  বেশি। ভাবলাম  কোন  বন্ধুবান্ধবদের  কাছে জেনে নেব  সমস্ত  ঘটনাটা বর্ণনা করে কি হওয়া উচিত  নামটা। একটু গভীর ভাবে চিন্তা করে বাস্তুহারা নামটাই দিলাম  কারণ  উদ্বাস্তু কথাটা সাধারণত  ব্যবহার  হয় যেখানে কেউ নিজের  দেশ ছেড়ে যে কোন  কারণেই  হোক পালাতে বাধ্য হয় এবং অন্য  দেশে তাকে আশ্রয় নিতে হয় যেমন  হয়েছিল  দেশভাগের  সময়। বাস্তুহারাদের ক্ষেত্রেও প্রায় সেইরকম ই কিন্তু সেটা দেশভাগের জন্য নয়, কোন  প্রাকৃতিক  দুর্যোগ  হেতু বা কারও অত্যাচারের জন্য  যেখানে তার ফিরে যাবার  সম্ভাবনা থাকে। ধারণা ঠিক  নাও হতে পারে এবং সংশোধনের কথাও মনে থেকে গেল। 

সরকারি প্রকল্পে  যে আবাসনগুলো গড়ে উঠেছিল সেগুলো ঠিক তাৎক্ষণিক  চাহিদার কথা মাথায় রেখে, অদূর ভবিষ্যতে কি হতে পারে সেই কথা মাথায় ছিল  বলে বিশেষ  মনে হয়না। সরকারের কাজ   তখন  ছিল জনগণের  সেবা করা এবং সেটাই হওয়া উচিত কিন্তু উন্নয়নের জন্য যে টাকার দরকার সেটা কিভাবে আসবে তা নিয়ে খুব  গভীর  চিন্তাভাবনা ছিল  বলে মনে হয়না। স্বাধীনতার পর  দেশ গড়ে তুলতে অনেক অর্থের  প্রয়োজন। কিন্তু জনগণের  উপর ট্যাক্স  চাপানো চলবে না, তাদের নিখরচায় বা সামান্য টাকার বিনিময়ে স্বাস্থ্য পরিষেবা দিতে হবে, গরীবদের জন্য  বিনামূল্যে রেশন দিতে হবে, তাদের বিনামূল্যে মাথা গোঁজার ঠাঁই দিতে হবে, নিম্ন মধ্যবিত্ত , মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তদের জন্য আবাসন তৈরী করে দিতে হবে এবং তা বিক্রি করা হবে কোন  লাভ  না করেই। বিনামূল্যে বা অত্যন্ত  স্বল্প  মূল্যে শিক্ষার  ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু এই বিশাল  কর্মযজ্ঞের  জন্য যে অর্থের প্রয়োজন  তার সংস্থান কি করে হবে সেটাও  তো ভাবার প্রয়োজন।  শুধু টাকা  ছাপিয়ে আর বেসরকারী উদ্যোগপতিদের  উপর ট্যাক্স  চাপিয়ে এটা কতটা সম্ভব সেটা  নিয়ে বিশেষ ভাবনাচিন্তা ছিল বলে মনে হয়না। এর উপর ছিল রাজনৈতিক নেতাদের সাধারণ  মানুষের  ভিতর এক ধারণার  সৃষ্টি করা যে বেসরকারী উদ্যোগপতি মানেই  তারা সাধারণ  জনগণের  শত্রু এবং বিশেষ  চিন্তায় উদ্বুদ্ধ  হয়ে এক নতুন কথার আবিষ্কার   শ্রেণীশত্রু  ও শ্রেণীসংগ্রাম। উদ্যোগপতিদের  কালো হাত ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও জাতীয় কথাবার্তা কতটা ভাল  করেছে তাতে যথেষ্ট  সন্দেহ  রয়েছে। অন্তত  একটা জিনিস  করা সম্ভব  হয়েছে, তা রাজনৈতিক  চেতনা বাড়ানোর  নামে মানুষের  মনে হিংসার বীজ খুব  সুন্দর ভাবে বুনে দিতে পেরেছে এবং উত্তরোত্তর  তা বেড়ে এক বিশাল  মহীরুহের আকার ধারণ  করেছে এবং সেটা আজ বিভিন্ন ভাবে শাখাপ্রশাখা বিস্তার করেছে এবং কখনো তা জাতিভেদে এবং কখনো তা ধর্মভেদের  মাধ্যমে প্রতিফলিত  হয়েছে। কিন্তু যাঁরা এই বীজ বপন করেছেন  তাঁরা সবজায়গায় সুন্দর ভাবে মিলে মিশে আছেন, একবার  সাপের গালে আর একবার  ব্যাঙের  গালে চুমু খাচ্ছেন। 

ফিরে আসা যাক মূল বক্তব্যে। সরকারী উদ্যোগে গড়ে ওঠা আবাসনগুলো মানুষের বেড়ে ওঠা চাহিদার  সঙ্গে তাল না মেলাতে পারায় সেগুলোর পরিবর্ধনের প্রয়োজন অনুভূত হয়েছে এবং বয়স বাড়ার  সঙ্গে সঙ্গে হাত পায়ের জোর  কমেছে এবং উপরতলায় থাকা লোকজনের লিফটের প্রয়োজন মনে হয়েছে। এই আবাসনগুলো যখন  হয়েছিল  তখন কেউ এই চিন্তা করেননি যে বয়স হলে সবার সিঁড়ি ভেঙে চারতলায় বা পাঁচ তলায় উঠতে কষ্ট  হবে এবং লিফটের  চিন্তা মাথায় আসেনি।  অবশ্য  লিফট করে ওঠা লোকজন মানে এক বিশাল  ব্যাপার এবং নিশ্চয়ই  তারা পুঁজিপতি। মনে পড়ে যখন  জ্যোতিবাবুর হিন্দুস্থান  পার্কের  বাড়িতে  লিফট বসানো হয় তখন  কাগজে কাগজে সমালোচনার  প্রতিবেদনে ছেয়ে গিয়েছিল।  সেইরকম ই সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন  তাঁর চেম্বারের সংলগ্ন  বাথরুম  সংস্কারের তীব্র  সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। হয়তো সকলের মনে আছে যে কারও  বাড়িতে ফ্রিজ থাকলে তাকে বুর্জোয়া শ্রেণীভুক্ত করা হতো এবং আরও  কিছুদিন  পরে যখন  সাদাকালো টিভি এল তখন  যার  বাড়িতে টিভি এল তারা ছাড়া পাড়ার  আর সবাই  সেই ঘরের  আনাচে কানাচে পর্যন্ত  দখল করে নিত। আমাদের  মানসিকতা তখন  এর বাইরে বেরিয়ে আসতে পারেনি। রেডিও তে মোহনবাগান  ইস্টবেঙ্গল  ম্যাচের ধারাবিবরণী অজয় বসু, কমল ভট্টাচার্য এবং পুষ্পেন সরকারের মাধ্যমে সম্প্রচার  একটা গোটা পাড়ার  লোক একসঙ্গে শুনতো।  সুতরাং বোঝা যায় সাধারণ  মানুষের  কি অবস্থা ছিল। আবাসন গুলোর এক্সটেনশন করার জন্য সবাই এককাট্টা  হয়ে দরখাস্ত  করেছে এবং কর্পোরেশনের স্যাংশনের জন্য  প্রয়োজনীয় অর্থের বহু গুণ অর্থ  বিভিন্ন ধাপে সাম্মানিক মূল্য হিসাবে দিতে হয়েছে।  কিন্তু এ সত্ত্বেও  সমস্ত আবাসিকরা বিভিন্ন  কারণে এই উদ্যোগে সামিল  হতে পারেন  নি এবং বহুতলীয়  এই বাড়িগুলোর ফাঁকা অংশগুলো  খানিকটা  হাঁ করা মড়ার মাথার  খুলির  মতন লাগত। এইরকম ই কয়েকটা ফাঁকা জায়গা কিন্তু আমফানের সময় বহু পাখির  আশ্রয়স্থল হয়েছিল।  যখন  প্রবল ঝড়ে সমস্ত গাছগুলো একের পর এক ধূলিসাত হয়ে যাচ্ছে  তখন ঐ পাখিগুলোর কি দুর্দশা। যখন গাছগুলো সাধারণ অবস্থায় থাকে তখন  রোজ সন্ধেবেলায় পাখিদের  মধ্যে অনবরত ঝগড়া লেগেই থাকে। কাকের সঙ্গে শালিকের বা শালিকের নিজেদের  মধ্যে বা শালিকের সঙ্গে ময়নার  ঝগড়া নিত্যদিনের ব্যাপার  কিন্তু আমফানের  সময় সবাই নিজেদের  ঝগড়া ভুলে একসঙ্গে সবাই আশ্রয় নিয়েছে ঐ মড়ার খুলির  মুখের মধ্যে। শাটার টানা ব্যালকনিতে বসে তাদের  ঐ করুণ অবস্থা লক্ষ্য  করেছি। এক্সটেনশন  না করা ঐ ফ্ল্যাটের  ভদ্রলোক কিন্তু খুবই  মানবিকতা দেখিয়েছেন  ঐ অবস্থাতেও।  প্যাকেট প্যাকেট  বিস্কুট,  ভাত ছড়িয়ে দিয়েছেন তাদের  উদ্দেশ্যে এবং ঐ সময়ে তারাও  ঝগড়া ভুলে নিজেদের  মধ্যে ভাগ করে খেয়েছে। সাধারণত  কাকেদের থাকে দাদাগিরি কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার তারা কিন্তু সব বৈরীতা ভুলে নিজেদের  বাঁচিয়ে রেখেছিল।  আস্তে আস্তে আমফান বিদায় নিল, এখন ঘরে ফেরার  পালা। কি ক্ষয় ক্ষতি হয়েছে তা নির্ধারণ  করার পালা। বহু গাছই  ভেঙে গেছে ,যে কয়েকটা নিজেদের  বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছে  তা সবাইকে স্থান  দিতে অপারগ। এখানে কোন সরকারী সহায়তা নেই , নেই কোন  তার  থেকে দুপয়সা  রোজগার করা, আছে শুধু ঐ কয়েকটা এক্সটেনশন  না করা ফ্ল্যাট এবং বিভিন্ন বাড়ির কার্নিশ এবং গাছগুলো  বেড়ে উঠে ডালপালা বিস্তার  করার অপেক্ষা। এরই  মধ্যে   এক্সটেনশন  না করা ফাঁকা ফ্ল্যাটের দেয়াল উঠতে শুরু হয়েছে আর পাখিগুলো একদৃষ্টে  লক্ষ্য  করছে কতটা উঠল ঐ দেওয়াল এবং  দিন গুনছে ফের বাস্তুহারা হবার  আশঙ্কায়। গাছগুলো তো এখনও  সেইভাবে বেড়ে ওঠেনি যাতে সবার বাসস্থানের  স্থান হয়। হায়, কারও পৌষমাস আর কারও  সর্বনাশ। 

Wednesday, 3 August 2022

অথ যৌধেয় বিবাহ কথা

যুধিষ্ঠিরের নিজের  পছন্দের স্ত্রী দেবিকা যদিও সেটা ঘটকালি  করেই এবং তাদের একমাত্র  পুত্র যৌধেয়। মহাভারতে এদিক সেদিক আতিপাতি করে খুঁজেও যৌধেয়র বিয়ের কথা জানা গেলনা এবং অধুনা যৌধেয়র ও বিয়ের কথা প্রায় সেইরকম পর্যায়েই চলে যাচ্ছিল  কিন্তু ভগিনী দুঃশলার অতি আদরের প্রিয়পাত্র যৌধেয়( আজকের  নুটু) তার পিসির  কথা একদমই  ঠেলে ফেলতে পারলনা এবং তারই সহপাঠিনী এবং দীর্ঘদিনের বান্ধবী ও বহু সুখ দুঃখের সমব্যথী তিতলির  সঙ্গে বিয়ের ব্যাপারটা চুকিয়ে ফেলে সবাইকে চিন্তামুক্ত করতে চাইল। এখন জ্যেষ্ঠ পাণ্ডব যুধিষ্ঠিরকে পায় কে, আনন্দে আত্মহারা এবং তারই সঙ্গে দেবিকাও। অন্য পাণ্ডবরাও খুবই খুশি এই খবরে কিন্তু যুধিষ্ঠির ও দেবিকার কপালে ফুটে উঠেছে চিন্তার  ভাঁজ  কারণ ভীম ও বালন্দারার দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতি এবং নকুল ও কারেনুমতীর বিশ্ব পরিভ্রমণ। উপস্থিত  কেবল অর্জুন ও সুভদ্রা  এবং সহদেব  ও দেবিকা। অর্জুনের  সহায়তায় যুধিষ্ঠির তাঁর দুই হাঁটুই  প্রতিস্থাপন  করিয়েছেন  এবং সহদেবের ও অবস্থা তথৈবচ। তিনিও যুধিষ্ঠিরের  পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন এবং এখনও টলোমলো অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন নি এবং ইদানীং কালে অর্জুনের শরীরটাও  বিশেষ  যুতসই  নয়। 

নুটু এবং তিতলি দুজনেই  বাইরে থাকে এবং বর্তমানে তিতলি প্রাগে  পোস্ট ডক্টরেট করতে চলে গেছে এবং নুটু ব্যাঙ্গালোরের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সে থিসিস  জমা দেবার  উদ্যোগ করছে। তিতলিরা যমজ বোন এবং ওর চেয়ে কিছু সময়ের বড় তিয়াস তার বন্ধু শতদ্রুকে বিয়ে করে ক্যালিফোর্নিয়ায় গুগলে কর্মরত। তিতলির কিন্তু মনোগত ইচ্ছা কোন ইনস্টিটিউটে পড়ানো এবং একই মনোভাব নুটু বা যৌধেয়র। নুটু টাটা কনসালটেন্সির তিনবছরের চাকরির সম্পর্কে ছেদ ঘটিয়ে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সে রিসার্চ করতে লেগে গেল  এবং সেই কারণেই তার ডক্টরেট করাটাও একটু দেরী হয়ে গেল। কিন্ত জ্ঞান পিপাসা এমনই একটা জিনিস যা মেটাতে মানুষ সহজলভ্য সুখ ছেড়ে অনিশ্চয়তার পিছনে ধাওয়া করে। ঠিক  সময় বের করে নুটু ও তিতলির জীবনে স্থায়িত্ব আনাটা  একটু গোলমেলে হয়ে যাচ্ছিল  কিন্তু ভগবান  যখন সহায় হন তখন কোন বাধাই তার গতিরোধ করতে পারেনা। তিয়াস এবং শতদ্রু কাজের ফাঁকে একটা ছোট্ট  বিরতি নিয়ে সুদূর  আমেরিকা থেকে তিতলির বিয়েতে যোগ দেওয়ার পরদিনই সন্ধের ফ্লাইটে ব্যাক টু আমেরিকা।  

আজকের  যুগের  ছেলেমেয়েদের  যতই  দেখি ততই  আশ্চর্য  হয়ে যাই। আমাদের  সময় যেন  একটা গদাই লস্করি চাল ছিল, হচ্ছে হবে এইরকম ধারণাতেই মন মজে থাকতো কিন্তু এখন এই জেটগতির  যুগে এই এখানে,  এই সেখানে। কি সুন্দর  টাইম ম্যানেজমেন্ট,  একেবারে টাইট শিডিউল, কোথাও কোন নড়চড় হবার  উপায় নেই। নুটু এসেছে রবিবার,  বিয়ে সারলো সোমবার  এবং অষ্টমঙ্গলা সেরে শনিবার ফিরে যাবে ব্যাঙ্গালোরে থিসিস জমা দেবার জন্য। তিতলিও কয়েকদিন পরেই চলে যাবে প্রাগে তার ইনস্টিটিউটে যোগ দিতে। এরই  মধ্যে সময় করে খুব  ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করে যাচ্ছে এবং তাদের  আশীর্বাদ  পাথেয়  করে নিজেদের চলার জীবন মসৃণ করতে। 

সোমবার বিয়ের পর্ব মিটেছে যৌথ উদ্যোগে সময়াভাবের জন্য। মঙ্গলবার  দুপুরে আরও একদফা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজন এবং তারপরেই ভাঙা হাটের  পালা। তিয়াস ও শতদ্রু পাড়ি দিয়েছে তাদের  কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে। বুধবার আত্মীয়স্বজনের  সঙ্গে দেখা করার পালা। সওয়া ছটা নাগাদ নুটু ও তিতলি নামল ধবধবে একটা সাদা গাড়ি থেকে।তরতর করে উঠে চলে এল প্রাণোচ্ছল এক তরুণ ও তরুণী।  এ কুলুকুলু রবে বয়ে যাওয়া নদী নয় এ ঝরঝর করে ঝর্ণার মতো খুবই  পরিচ্ছন্ন  ও মার্জিত কথাবার্তা। নয় নয় করে কিভাবে ঘন্টা দেড়েক সময় কেটে গেল বুঝতেই  পারলাম  না। " উঠি এবার " শুনে সচকিত  হয়ে উঠলাম। মন চাইছিল ঝর্ণার  গান  আরও  কিছুক্ষণ শোনার কিন্তু উপায় নেই তাদের  অনেক কমিটমেন্ট,  সুতরাং বাধা দেওয়া যায়না। একরাশ আনন্দের  ডালি  উজাড় করে দিয়ে রেখে গেল ঝর্ণার অনুরণন।