সরকারি প্রকল্পে যে আবাসনগুলো গড়ে উঠেছিল সেগুলো ঠিক তাৎক্ষণিক চাহিদার কথা মাথায় রেখে, অদূর ভবিষ্যতে কি হতে পারে সেই কথা মাথায় ছিল বলে বিশেষ মনে হয়না। সরকারের কাজ তখন ছিল জনগণের সেবা করা এবং সেটাই হওয়া উচিত কিন্তু উন্নয়নের জন্য যে টাকার দরকার সেটা কিভাবে আসবে তা নিয়ে খুব গভীর চিন্তাভাবনা ছিল বলে মনে হয়না। স্বাধীনতার পর দেশ গড়ে তুলতে অনেক অর্থের প্রয়োজন। কিন্তু জনগণের উপর ট্যাক্স চাপানো চলবে না, তাদের নিখরচায় বা সামান্য টাকার বিনিময়ে স্বাস্থ্য পরিষেবা দিতে হবে, গরীবদের জন্য বিনামূল্যে রেশন দিতে হবে, তাদের বিনামূল্যে মাথা গোঁজার ঠাঁই দিতে হবে, নিম্ন মধ্যবিত্ত , মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তদের জন্য আবাসন তৈরী করে দিতে হবে এবং তা বিক্রি করা হবে কোন লাভ না করেই। বিনামূল্যে বা অত্যন্ত স্বল্প মূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু এই বিশাল কর্মযজ্ঞের জন্য যে অর্থের প্রয়োজন তার সংস্থান কি করে হবে সেটাও তো ভাবার প্রয়োজন। শুধু টাকা ছাপিয়ে আর বেসরকারী উদ্যোগপতিদের উপর ট্যাক্স চাপিয়ে এটা কতটা সম্ভব সেটা নিয়ে বিশেষ ভাবনাচিন্তা ছিল বলে মনে হয়না। এর উপর ছিল রাজনৈতিক নেতাদের সাধারণ মানুষের ভিতর এক ধারণার সৃষ্টি করা যে বেসরকারী উদ্যোগপতি মানেই তারা সাধারণ জনগণের শত্রু এবং বিশেষ চিন্তায় উদ্বুদ্ধ হয়ে এক নতুন কথার আবিষ্কার শ্রেণীশত্রু ও শ্রেণীসংগ্রাম। উদ্যোগপতিদের কালো হাত ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও জাতীয় কথাবার্তা কতটা ভাল করেছে তাতে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। অন্তত একটা জিনিস করা সম্ভব হয়েছে, তা রাজনৈতিক চেতনা বাড়ানোর নামে মানুষের মনে হিংসার বীজ খুব সুন্দর ভাবে বুনে দিতে পেরেছে এবং উত্তরোত্তর তা বেড়ে এক বিশাল মহীরুহের আকার ধারণ করেছে এবং সেটা আজ বিভিন্ন ভাবে শাখাপ্রশাখা বিস্তার করেছে এবং কখনো তা জাতিভেদে এবং কখনো তা ধর্মভেদের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছে। কিন্তু যাঁরা এই বীজ বপন করেছেন তাঁরা সবজায়গায় সুন্দর ভাবে মিলে মিশে আছেন, একবার সাপের গালে আর একবার ব্যাঙের গালে চুমু খাচ্ছেন।
ফিরে আসা যাক মূল বক্তব্যে। সরকারী উদ্যোগে গড়ে ওঠা আবাসনগুলো মানুষের বেড়ে ওঠা চাহিদার সঙ্গে তাল না মেলাতে পারায় সেগুলোর পরিবর্ধনের প্রয়োজন অনুভূত হয়েছে এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাত পায়ের জোর কমেছে এবং উপরতলায় থাকা লোকজনের লিফটের প্রয়োজন মনে হয়েছে। এই আবাসনগুলো যখন হয়েছিল তখন কেউ এই চিন্তা করেননি যে বয়স হলে সবার সিঁড়ি ভেঙে চারতলায় বা পাঁচ তলায় উঠতে কষ্ট হবে এবং লিফটের চিন্তা মাথায় আসেনি। অবশ্য লিফট করে ওঠা লোকজন মানে এক বিশাল ব্যাপার এবং নিশ্চয়ই তারা পুঁজিপতি। মনে পড়ে যখন জ্যোতিবাবুর হিন্দুস্থান পার্কের বাড়িতে লিফট বসানো হয় তখন কাগজে কাগজে সমালোচনার প্রতিবেদনে ছেয়ে গিয়েছিল। সেইরকম ই সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন তাঁর চেম্বারের সংলগ্ন বাথরুম সংস্কারের তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। হয়তো সকলের মনে আছে যে কারও বাড়িতে ফ্রিজ থাকলে তাকে বুর্জোয়া শ্রেণীভুক্ত করা হতো এবং আরও কিছুদিন পরে যখন সাদাকালো টিভি এল তখন যার বাড়িতে টিভি এল তারা ছাড়া পাড়ার আর সবাই সেই ঘরের আনাচে কানাচে পর্যন্ত দখল করে নিত। আমাদের মানসিকতা তখন এর বাইরে বেরিয়ে আসতে পারেনি। রেডিও তে মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গল ম্যাচের ধারাবিবরণী অজয় বসু, কমল ভট্টাচার্য এবং পুষ্পেন সরকারের মাধ্যমে সম্প্রচার একটা গোটা পাড়ার লোক একসঙ্গে শুনতো। সুতরাং বোঝা যায় সাধারণ মানুষের কি অবস্থা ছিল। আবাসন গুলোর এক্সটেনশন করার জন্য সবাই এককাট্টা হয়ে দরখাস্ত করেছে এবং কর্পোরেশনের স্যাংশনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের বহু গুণ অর্থ বিভিন্ন ধাপে সাম্মানিক মূল্য হিসাবে দিতে হয়েছে। কিন্তু এ সত্ত্বেও সমস্ত আবাসিকরা বিভিন্ন কারণে এই উদ্যোগে সামিল হতে পারেন নি এবং বহুতলীয় এই বাড়িগুলোর ফাঁকা অংশগুলো খানিকটা হাঁ করা মড়ার মাথার খুলির মতন লাগত। এইরকম ই কয়েকটা ফাঁকা জায়গা কিন্তু আমফানের সময় বহু পাখির আশ্রয়স্থল হয়েছিল। যখন প্রবল ঝড়ে সমস্ত গাছগুলো একের পর এক ধূলিসাত হয়ে যাচ্ছে তখন ঐ পাখিগুলোর কি দুর্দশা। যখন গাছগুলো সাধারণ অবস্থায় থাকে তখন রোজ সন্ধেবেলায় পাখিদের মধ্যে অনবরত ঝগড়া লেগেই থাকে। কাকের সঙ্গে শালিকের বা শালিকের নিজেদের মধ্যে বা শালিকের সঙ্গে ময়নার ঝগড়া নিত্যদিনের ব্যাপার কিন্তু আমফানের সময় সবাই নিজেদের ঝগড়া ভুলে একসঙ্গে সবাই আশ্রয় নিয়েছে ঐ মড়ার খুলির মুখের মধ্যে। শাটার টানা ব্যালকনিতে বসে তাদের ঐ করুণ অবস্থা লক্ষ্য করেছি। এক্সটেনশন না করা ঐ ফ্ল্যাটের ভদ্রলোক কিন্তু খুবই মানবিকতা দেখিয়েছেন ঐ অবস্থাতেও। প্যাকেট প্যাকেট বিস্কুট, ভাত ছড়িয়ে দিয়েছেন তাদের উদ্দেশ্যে এবং ঐ সময়ে তারাও ঝগড়া ভুলে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে খেয়েছে। সাধারণত কাকেদের থাকে দাদাগিরি কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার তারা কিন্তু সব বৈরীতা ভুলে নিজেদের বাঁচিয়ে রেখেছিল। আস্তে আস্তে আমফান বিদায় নিল, এখন ঘরে ফেরার পালা। কি ক্ষয় ক্ষতি হয়েছে তা নির্ধারণ করার পালা। বহু গাছই ভেঙে গেছে ,যে কয়েকটা নিজেদের বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছে তা সবাইকে স্থান দিতে অপারগ। এখানে কোন সরকারী সহায়তা নেই , নেই কোন তার থেকে দুপয়সা রোজগার করা, আছে শুধু ঐ কয়েকটা এক্সটেনশন না করা ফ্ল্যাট এবং বিভিন্ন বাড়ির কার্নিশ এবং গাছগুলো বেড়ে উঠে ডালপালা বিস্তার করার অপেক্ষা। এরই মধ্যে এক্সটেনশন না করা ফাঁকা ফ্ল্যাটের দেয়াল উঠতে শুরু হয়েছে আর পাখিগুলো একদৃষ্টে লক্ষ্য করছে কতটা উঠল ঐ দেওয়াল এবং দিন গুনছে ফের বাস্তুহারা হবার আশঙ্কায়। গাছগুলো তো এখনও সেইভাবে বেড়ে ওঠেনি যাতে সবার বাসস্থানের স্থান হয়। হায়, কারও পৌষমাস আর কারও সর্বনাশ।
No comments:
Post a Comment