Wednesday, 10 August 2022

বানপ্রস্থ

পূর্বে প্রচলিত কথা ছিল  পঞ্চাশোর্ধে বনং ব্রজেত অর্থাৎ  পঞ্চাশ  পেরোলেই রিটায়ারমেন্ট ফ্রম অ্যাকটিভ লাইফ। রাজা রাজড়ারা তাঁদের  সাধের সাম্রাজ্য সন্তান সন্ততিদের হাতে ন্যস্ত করে বনে চলে যেতেন এবং বাকি জীবনটা ধর্মকর্মে ব্যস্ত থেকে কাটিয়ে দিতেন। কিন্তু একটা খটকা মনের  মধ্যে থেকেই  যায়। রাজা মহারাজারা সাধারণত পরনির্ভরশীল ছিলেন  অর্থাৎ দাসী বাঁদি বা ভৃত্য পরিবৃত থাকতেন এবং তাঁদের সমস্ত কাজ এই চাকর বাকররাই করতো। তাহলে বনে যাবার পর হঠাৎই  নিজের কাজ নিজেরা করতে শুরু করে দেবেন  এটা ভাবা খুবই কষ্টকর। তাহলে কি তাঁরা সমস্ত  লোক লস্কর সমেত যেতেন আর যদি সেটাই হয় তাহলে সেই লোকদের  থাকার  জন্য কাছাকাছি তাদের  বাসস্থান বা বেঁচে থাকার জন্য  নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস পত্রের জোগাড় করতে হতো যার অর্থ  আরও একটা জনপদ গড়ে ওঠা । তাহলে বন আর কি করে বন থাকে? এই ধন্দ মেটানোর জন্য ভাবতে বাধ্য  হতে হলো যে ঐ ব্যবস্থাপনাই কি আজকের  বৃদ্ধাশ্রমের ব্লুপ্রিন্ট?  নানাভাবে দীর্ঘদিন ধরেই এই প্রশ্নের  উত্তর  খুঁজে চলেছি, তাই ভাবলাম  যে কোন সহৃদয়  ব্যক্তি হয়তো আমার অনুসন্ধিৎসা মেটাবেন বা আমার  নিজস্ব  চিন্তাধারাকে তাঁদের  মেধা দিয়ে পরিপুষ্ট করবেন। তবে একটা কথা ঠিক যে রাজা বা রানী সাধারণ জনগণের  মতো হাতে বাজারের থলি ঝুলিয়ে দোকান বাজার  করতে যাবেন আর  চাইলেও ঐ বনবাদাড়ে কে দোকান খুলতে যাবে রাজা রানীর চাহিদা মেটানোর জন্য? এইসব আবোল তাবোল চিন্তা মাথার  মধ্যে ঘুরপাক খায়। তারপর তো শরীর সরাগতের ব্যাপার  আছে। রাজা রানীরাও তো আদতে মানুষ।  তাঁদের ও শরীর খারাপ  হতে পারে। আগে না হয় রাজবৈদ্য ছিল, হুকুম  হলেই নিদান নিয়ে তারা হাজির হতো কিন্তু এই বনে তাদের  বয়ে গেছে থাকতে। তারপর তাঁদের  কেউ মারা গেলে  অপরজন  কি করতেন? শবদেহ করা কি তাঁদের  দ্বারা সম্ভব? এই নিদারুণ  অবস্থা থেকে বাঁচার  একমাত্র  উপায় যে কাছাকাছি কোন  লোকালয়ের   উপস্থিতি এবং সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের  দেখভাল  করার  জন্য  পর্যাপ্ত  লোক লস্কর। মানে আজকের  দিনে পেনশন ভোগী। পেনশনের টাকায় যেমনভাবে  চলা দরকার  তেমনভাবে  চলো।

মাঝে মাঝেই মনে হয় বৃদ্ধাশ্রমে চলে গেলে কেমন  হয় বিশেষ করে যখন  সংসারে খিটিমিটি লাগে। তবে মাঝে মাঝে ফ্যাঁস ফোঁস  না হলে সংসারটা  যেন কেমন  পান্তা ভাত হয়ে যায়। অবশ্য  পান্তা ভাতে পেঁয়াজ,  লঙ্কা ছাতু দিয়ে খাওয়াটাও  একটা ভীষণ  ডেলিকেট খাওয়া আর তার মধ্যে যদি শুকনো লঙ্কা ভেজে মাখা  খাওয়া যায় তাহলে সেটা একটা বিশেষ মাত্রা পায়। সুতরাং মাঝে মধ্যে বৃদ্ধাশ্রমের চিন্তা মাথায় আসেনা  এরকম  নয় কিন্তু ভাল মন্দ  সবকিছু মানিয়ে নিয়ে চলাটাই তো জীবনের আর একটা নাম। কালের গতিতে স্বামী স্ত্রীর  দুজনের মধ্যে কেউ না কেউ তো একজন হয়ে যাবে, তখন  কি করা যাবে? সবাই  তো আর   জেনারেল বিপিন রাওয়াত এবং তাঁর  স্ত্রীর  মতন সৌভাগ্যবান বা সৌভাগ্যবতী নন যে দুজনেই  একসঙ্গে চলে যাবেন।  অতএব  কাউকে না কাউকে একা থাকতেই হবে, উপায় নেই। ছেলে মেয়েরাও  দূরে থাকে , কর্ম ব্যস্ততার মধ্যে তাদের ও নিজেদের  সংসার  ছেড়ে বৃদ্ধ বাবা বা মাকে দেখতে আসাও  সবসময়  সম্ভব  হয়ে ওঠেনা।  তাহলে উপায় কি? ছেলের  সংসার  বা মেয়ের সংসারে কাবাব মে হাড্ডি হয়ে থাকা নতুবা নিজের  বাড়িতেই থেকে অপরের স্মৃতিতে বিভোর  হয়ে থাকা  বা নতুন বন্ধুর  খোঁজে বৃদ্ধাশ্রমের পথে পা বাড়ানো। বন্ধুর  খোঁজে বৃদ্ধাশ্রমের  পথে পা বাড়ানো খুব  একটা খারাপ  কিছু নয় কিন্তু সেখানে গিয়েও যে সমমনোভাবাপন্ন লোক পাওয়া যাবে এমন কোন  নিশ্চয়তা নেই। এছাড়া রয়েছে বৃদ্ধাশ্রমের  নিজস্ব  নিয়মকানুন  যা পছন্দ  না হলেও  মেনে চলতেই হবে যদি ওখানে একান্তই থাকতে হয়। তাছাড়া কর্মীদের  মুখঝামটা যে মাঝেমধ্যেই  শুনতে হবেনা এমন গ্যারান্টিও নেই। সুতরাং গরম  কড়াই  থেকে আগুনের  মধ্যে ঝাঁপ দেওয়ার  কোন মানে  আছে কি? বাইরে থেকে ঝাঁ চকচকে রূপ  দেখে না ভোলা শ্রেয়। নিজের  বাড়িতেই  থাকা এবং পাড়া প্রতিবেশীদের  সঙ্গে সৌহার্দ্য পূর্ণ  সম্পর্ক  বজায় রাখাটাই  সবচেয়ে ভাল।  ভগবানের  দেওয়া দান একটা জীবনের  উৎকর্ষতা তারিয়ে তারিয়ে  উপভোগ  করে কালের নিয়মে ফিরে যাবার  আগে দেহদান করে জীবনের  যতপাপ খানিকটা ক্ষালন করা মনে হয় সর্বোত্তম। নিজের  ছোট পরিসর নিজের  সাম্রাজ্য  মনে করে মন চল নিজ নিকেতনে বলে আমার বিচার তুমি কর তব আপনার করে বলে সুন্দর পৃথিবীকে জানাও বিদায়।

No comments:

Post a Comment