Thursday, 13 July 2023

রামকেষ্টর উইল

খুবই সাদাসিধে মানুষ  রামকেষ্ট।  একটা পুরোন সাইকেল  করে সে এদিক সেদিক  চষে নানাধরণের কাজকর্ম করে এবং তা দিয়েই মোটামুটিভাবে সংসারটা চালিয়ে নেয়। মাঝেমধ্যেই  যে একটু আধটু ধার বাকি হয়না তা নয়, কিন্তু টাকা পাওয়ামাত্র আগে দেনা মিটিয়ে বাড়ি আসবে। অভাব অনটনই তো সংসারে ঝগড়াঝাঁটির মূল কারণ  কিন্তু তার বৌ যখন  রাগে গনর গনর করে তখন  চুপ করে থাকে বেচারার মতো। খানিকটা রাগ পড়লে বলবে এক কাপ চায়ের কথা আর তাতেই একপ্রস্থ ঝাঁঝালো আওয়াজ । মুখ পাঁশুটে করে ঘরে চলে যায় রামকেষ্ট।  এবার নিভার একটু মনঃকষ্টের পালা। দুধ নেই, চিনি নেই একটু জল গরম করে চা পাতা দিয়ে কোনরকম  একটু চায়ের রঙধরা  জল এগিয়ে দিয়ে আসে। আর তাতেই কি খুশি রামকেষ্ট।  চা খেয়ে একটু ধাতস্থ  হয়ে  স্নান করে ভাত খেয়েই একটু ঘুম আর তারপরেই সেই ঠা ঠা রোদে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়া লোকের  কাছে টাকা আদায়ের জন্য। এই হচ্ছে রামকেষ্টর রোজকার কাজ, কি শীত,কি গ্রীষ্ম বা কি বর্ষা। গরমকালে লু  বইছে, ঘাড়ের  কাছে একটা তোয়ালে রুমাল  দিয়ে কলারটা যাতে নোংরা না হয় তার দিকে খেয়াল রাখা কিন্তু ঘামে সর্বাঙ্গ ভিজে গেলেও উপায় নেই, সেই ঘাম শরীরেই  শুকায় আবার  নতুন  করে ভিজে ওঠে। একটা চিরাচরিত প্রথা আছে, কেউ ধারের টাকা  একবারে মেটায় না, তিন চারবার ঘুরিয়ে তবেই  দেবে তাও হয়তো পুরোটা নয়। কিন্তু উপায় নেই, সকালে স্কুলে পড়ানোর পরেও তাকে এই কাজটা করতেই হয় বাড়তি রোজগার করার জন্য নাহলে এতগুলো লোকের  মুখে দুমুঠো  কি করে জোগাবে? স্কুলে পড়ানোর সুবাদে একটা সুবিধা অবশ্যই ছিল,  লোকে মাস্টার জী বলে সম্বোধন করত সে টাকা মেটাক বা না ই মেটাক।  সামনাসামনি গালাগালি দিয়ে কেউ অন্তত কোনদিন  কথা বলেনি । কিন্তু পিছনে কেউ  অন্য রকম কিছু বলবেনা তার গ্যারান্টি কেউ দিতে পারবে না।

এইরকম অবস্থা কিন্তু বরাবর ছিলনা তার। মহা ঠাটবাটে তার দিন চলছিল। পড়াশোনা চলছিল  শ্রীরামপুর কলেজে। একদিন কলেজে বাইবেল  ক্লাস চলাকালীন  অন্য একজন ছাত্র কিছু একটা কথা বলায়  শিক্ষক সাহেব সেই ছাত্রকে নিদারুণ ভাবে প্রহার করেন।  প্রহারের মাত্রাটা একটু  বেশিই হয়ে যাওয়ায় রামকেষ্ট এবং তার  তিনবন্ধু মিলিত ভাবে প্রতিবাদ  করে । তখন  বৃটিশ জমানা,  কয়েকজন নেটিভ ছাত্র সাহেব অধ্যাপকের কাজের  প্রতিবাদ  করবে এটা একদমই  আশা করা যায়না। সুতরাং করা হলো তাদের  বহিষ্কার। আবার  প্রতিবাদ শুরু হলো। বাইবেল  ক্লাসে  কথা বলা অপরাধ কিন্তু ঐ ছাত্রটিকে যেভাবে মারা হয়েছে সেটা একটু বাড়াবাড়ি পর্যায়ের।  কলেজের অধ্যক্ষ ডেকে পাঠালেন ছাত্র এবং শিক্ষককে আলাদা আলাদাভাবে। শিক্ষক  অধ্যক্ষকে জানান  যে ঐ ছাত্ররা তাঁকে মেরেছে।  অধ্যক্ষ ও ছিলেন বৃটিশ,  সুতরাং কোন কথা নয়, তাদের সবাইকেই  রাস্টিকেট করা হলো। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য তখন  শ্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। তাঁর কাছে আর্জি জানালেন ঐ চার ছাত্র এবং তাদের অভিভাবকেরা এবং  সাহেবের মিথ্যে কথা তাঁর  কানে তুললেন।  উনি বিচক্ষণ মানুষ ছিলেন এবং সব শুনে বুঝতে পারলেন  যে সাহেব অধ্যাপক মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছেন।  যাই হোক, একটা সমাধান সূত্র তিনি বের করলেন।  উনি বললেন  যে তোমাদের  রাস্টিকেট করা হচ্ছে না কিন্তু তোমরা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য কোন কলেজ থেকে  প্রথম বর্ষ থেকে পড়তে পারবে। রাস্টিকেট হলে ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন কলেজেই  পড়তে পারতো না। তখন তারা ছিল  তৃতীয় বর্ষের ছাত্র,  সুতরাং তাদের  তিনটে বছর  নষ্ট  হলো। রামকেষ্টর বাবা, ঠাকুর্দারা সব বড় বড় সরকারী চাকরি করতেন,  সুতরাং তাঁরা আর জিনিসটাকে  বেশী গুরুত্ব দিলেন না। তখনকার দিনে শ্রীরামপুরে থেকে ভবানীপুরে চুল কাটতে আসাটা একটু বাড়াবাড়িই ছিল। পাশ করেই রেলে একটা চাকরি, তারপরেই বিয়ে রামকেষ্টকে আর পায় কে? কিন্তু বলেনা, মাথা  যাদের গরম তাদের  হঠকারিতার ফল অবশ্যই  আসে। একদিন  দুম করে তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঝগড়া বাধিয়ে চাকরিতেই  দিল ইস্তফা।  ছিল বাবার পয়সা, নেমে গেল ব্যবসায়। কিন্তু  সহজ  সরল লোকের দ্বারা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠিত হওয়া  সহজ কথা নয়। সুতরাং, যা হবার  তাই হলো। প্রচুর টাকা লোকসান হল সেখানে। বড় বড় ব্যবসাদাররা ধারে জিনিস নিয়ে আর টাকা দেয়না, আজ দেবো কাল দেবো করে ব্যবসাটাকেই  লাটে  ওঠালো। গোদের উপর বিষফোড়া হল ব্যাঙের  ছাতার মত গজিয়ে ওঠা ব্যাঙ্কের  লালবাতি জ্বলা।  সুতরাং ইমারতের  ইট খসা  শুরু হলো। এরপর  একের পর এক ব্যবসা শুরু করল এবং যথারীতি মুখ  থুবড়ে পড়া। এককথায় রামকেষ্টর  সুদিন এবং দুর্দিন দুইই খুব কাছ থেকে দেখা। বহু অভিজ্ঞতা  সমৃদ্ধ রামকেষ্ট কিন্তু নিজে আদ্যোপান্ত সৎ এবং কঠোর পরিশ্রমী  আর সেই কারণেই ঐ অত্যন্ত  দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থা থেকেও মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকা একটা আদর্শ  উদাহরণ। 

কোন কোন মানুষ  ভাগ্যের সহায়তায় এবং পরিশ্রমের দ্বারা অনেক  উঁচু জায়গায় তার স্থান  করে নেয়। আবার  কিছু কিছু লোক অত্যন্ত সৎ এবং পরিশ্রমী হওয়া সত্ত্বেও দুর্ভাগা হবার জন্য একটু এগিয়েই থেমে যায়। যদি কোন  লোককে পাথর ভেঙে, জঙ্গল সাফ করে রাস্তা তৈরী করে এগোতে হয় তাতে তার পরিশ্রমের বেশিরভাগটাই ঐ কাজে চলে যায় এবং তার পক্ষে আর বেশী দূর এগোনো সম্ভব হয়না। রামকেষ্টর  ক্ষেত্রেও  তা ব্যতিক্রম নয়। রিটায়ার করার  একমাস পরেই পরিশ্রমী রামকেষ্ট একেবারে মুখ থুবড়ে পড়ল এবং সেটাই তার অন্তিম যাত্রা। জীবনের  বেশিরভাগ সময়টাই তার সংগ্রাম  করে কেটেছে , সুতরাং বুড়িয়ে  যাওয়াটাই স্বাভাবিক। একটা মেয়ের বিয়ে বাড়ির কাছেই হয়েছিল এবং তাকে খুব  ভালবাসতো রামকেষ্ট।  শরীরটা  বিশেষ ভাল  যাচ্ছেনা কিছুদিন ধরে। একদিন রামকেষ্ট বাড়ি ফেরার  পথে তার মেয়ের বাড়ি এসে একটা বন্ধ করা খাম তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, " এই খামটা তোমার কাছে রাখো এবং এটা আমার মারা যাবার পরেই খুলবে।" মেয়েও  তার  বিশ্বাসের অমর্যাদা করেনি। হঠাৎই  একদিন  অসুস্থ  হয়ে পড়ল সে যখন  তার পাশে স্ত্রী, ছেলে বা বৌমা কেউ ই নেই। একা বাড়িতে, কি করে খবর দেবে মেয়েকে বুঝে পাচ্ছেনা।  হঠাৎই  বাড়ির  সামনে দিয়ে যাওয়া পাড়ার ই একজন লক্ষ্য  করল রামকেষ্টর অবস্থা এবং সঙ্গে সঙ্গেই মেয়ের বাড়িতে খবর দিল এবং হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করল। বাড়ির কাছেই  গঙ্গার ধারে হাসপাতালে ভর্তি হল রামকেষ্ট।  এরপর  খবর দিল  তার  ছোটছেলেকে কিন্তু মানুষ যখন অন্তিম যাত্রা শুরু করে তখন  পৃথিবীর  কোন  শক্তির  ক্ষমতা নেই তাকে প্রতিহত করে। রামকেষ্ট ও চলে গেলেন কয়েকদিন হাসপাতালে থেকে। ছোটছেলেও খুবই  প্রিয় ছিল  রামকেষ্টর এবং প্রায় বন্ধুর মতো আচরণ ছিল তাদের মধ্যে। কিন্তু কোমায় চলে যাওয়া রামকেষ্ট  আর বিশেষ কিছুই  বলতে পারল না তার প্রিয় সন্তান  এবং বন্ধুকে। চলে গেলেন  রামকেষ্ট এবং তাঁর মেয়ে  যথারীতি খামটা এনে ভাইয়ের  হাতে দিল।খাম খুলে এক অপার  বিস্ময়। একটা ছোট্ট  চিঠি আর সঙ্গে আরও  একটা ছোট্ট  খাম। দিদিই  চিঠিটা পড়ল। ছোট্ট  কয়েক লাইনের।  আমি আমার  স্ত্রী, ছেলেমেয়েদের জন্য  কোনও  সুখ দিতে পারিনি যার জন্য  আমি অত্যন্ত দুঃখিত।  সেই কারণেই  আমার  মৃত্যুর পর আমার  ছেলেমেয়েদের  কাঁধে কোনরকম  বোঝা  চাপাতে চাইনা। ছোট্ট  খামে রাখা আছে মাত্র  একশ বারো টাকা। ঐ টাকা দিয়ে আমার জন্য  তিলকাঞ্চন শ্রাদ্ধ এবং সম্ভব হলে বারোজন ব্রাহ্মণকে অন্তত ডাল ভাত খাওয়াবে।  কারও জন্য  কিছু না করতে পারার জন্য  আমাকে ক্ষমা কোর। জানিনা আশীর্বাদ  করার যোগ্যতা আমার  আছে কি না তবুও  জানাই তোমাদের প্রতি আশীর্বাদ।  এবার  আমি আসি।
সবার চোখে জল কিন্তু কারও মুখে নেই কোন কথা।  সবার মুখেই এক কথা, রামকেষ্ট  একজন অত্যন্ত সৎ এবং ভদ্রলোক  ছিলেন। তাঁর আত্মার  শান্তি হোক।

No comments:

Post a Comment