ফ্লোটেল হচ্ছে একটা সুন্দর ছোট্ট জাহাজ যেটা স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার পূর্বাঞ্চল লোকাল হেড অফিসের উল্টোদিকে। কয়েক বছর আগে আমাদের স্কুলের বন্ধুদের প্রায় একান্ন বছর বাদে গেট টুগেদার হয়েছিল এবং ওখানে আমরা ডিনার করেছিলাম কিন্তু থাকার সুযোগ ঘটেনি। ওখানে দুটোর সময় চেক ইন, কিন্তু খাওয়া দাওয়া সেরে পৌঁছাতে প্রায় বেলা চারটে। অর্জুন বিরাট বড় প্ল্যানার, খুঁটিনাটি সবকিছুই একদম ঠিকঠাক ।নয়জনের চারটে কেবিন এবং সবটাই গঙ্গার দিকে কিন্তু একটা কেবিন হয়ে গেল অন্য ডেকে। কিন্তু অর্জুন চাইছে সবার একটা ডেকে ই হোক। রিসেপশনে একটা ছোট খাটো চেহারার মেয়ে কিন্তু অসম্ভব ঝকঝকে চেহারা এবং ভীষণ স্মার্ট। নাবিকের ড্রেস, মাথায় তাদের মতন টুপি-- এককথায় বলা যেতে পারে নাবিকোচিত। সুন্দর আঙুলগুলো যথোচিত ম্যানিকিওর করা এবং বিভিন্ন আঙুলে বিভিন্ন রকম চিত্র। ল্যাপটপে তার আঙ্গুলগুলো নটরাজের নৃত্য করছে এবং অসম্ভব দক্ষতার সঙ্গে অর্জুনের সঙ্গে মোকাবিলা করছে। যদিও সে বলল যে একটা ডেকে ই করে দেবে কিন্তু শেষমেশ তা হলো না । তখন নিজেরাই বলাবলি করলাম যে একটাই তো রাত্রি, কেটে যাবে কোনভাবে।
বিকেল বেলায় ঠিক আছে গঙ্গারতি দেখার। অর্জুন তার ও ব্যবস্থা করে রেখেছে। গাড়িগুলো আমাদের ছেড়ে দিল যেখান থেকে লঞ্চটা ছাড়বে কিন্তু একটু ভুল বোঝাবুঝির জন্য অনেকখানি পিছনে হেঁটে আসতে হলো এবং দেখা গেল যে ফ্লোটেল থেকে হেঁটেই আসা যেত। যাই হোক, তিনটে লঞ্চ পেরিয়ে আমাদের লঞ্চে পৌঁছলাম। লঞ্চের ওপরের ডেকে উঠতে সব নড়বড়ে বুড়োবুড়িদের একদম দফারফা। যাই হোক, ওপরে উঠে বসার পর ইঞ্জিন স্টার্ট করল আর ধীরে ধীরে যেখানে আরতি হচ্ছিল তার একটু দূরেই নোঙর করল। বারাণসীর আদলে এখানে গঙ্গা আরতি শুরু হলো। একদিকে সূর্যাস্ত, অন্যদিকে আরতি এবং পিছনে মাঝে মাঝে চক্ররেলের হর্ন মিলেমিশে এক অন্য আবহাওয়ার সৃষ্টি হলো। গঙ্গার জলের যে ভিন্ন ভিন্ন রঙ হয় তা না দেখলে বিশ্বাস ই করা যায়না। ছবিগুলো মনের মধ্যে গেঁথে আছে যেটা এখানে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আরতি শেষে লঞ্চ আবার স্টার্ট করে যেখান থেকে উঠেছিলাম সেখানেই নামিয়ে দিল এবং বাবুঘাটে স্পেশাল চা খেয়ে এলাম ফিরে ফ্লোটেলে। বাতাসে আদ্রতা থাকায় ঘামে জবজব শরীরটা এসে ঠাণ্ডা করে রাতের খাবারের জন্য সর্বোচ্চ ডেকে এসে পৌঁছলাম। হরেক রকমের খাবার, কোনটা ছেড়ে কোনটা খাব ভেবে পাচ্ছি না, তবে তার মধ্যেই যেগুলো সচরাচর বাড়িতে খাওয়া হয়না সেগুলোর দিকেই নজর দিলাম। আগের বার যখন এসেছিলাম তখন খাবারের মান ততটা ভাল ছিলনা কিন্তু এখন বেসরকারি হাতে যাওয়ায় খাবারের মান এবং সার্ভিসের প্রভূত উন্নতি হয়েছে। যাই হোক খাওয়া সেরে কেবিনে ফিরে আসা এবং মহিলাদের হাউসি খেলা শুরু।
অবাক হয়ে জানলা দিয়ে গঙ্গার নানান রূপ চোখে পড়ছে এবং মোবাইল ক্যামেরায় একের পর এক ছবি তুলে চলেছি। দুটো পরিবারের চারজন দুটো কেবিনে চলে গেল, তৃতীয় কেবিনে তিনজন মহিলা এবং চতুর্থ কেবিনে আমরা দুই বন্ধু। রাতটা বেশ গভীর হয়েছে, বন্ধুও বেশ গাঢ় ঘুমে আচ্ছন্ন আর আমারও চোখটা একটু লেগে এসেছে। হঠাৎই যেন মনে হল জাহাজটাকে যেন কেউ ধাক্কা দিয়ে ডাকছে আর বলছে চল্, এবার তো ভাসার পালা। এদিকে জাহাজের ও এলানো শরীরে ঘুমটা বেশ জাঁকিয়ে এসেছে কিন্তু আমি যেন সেই জলের বার্তা পেলাম " অ্যাই ওঠ, ছবি তুলবি না?" আমার শরীরটা ও যথেষ্ট ক্লান্ত কিন্তু আমি সেই ডাকের হাতছানি উপেক্ষা করতে পারলাম না। আস্তে আস্তে বন্ধুর ঘুম না ভাঙিয়ে একাই নদীর সঙ্গে প্রেমে মত্ত হলাম। সোঁ সোঁ করে আওয়াজ করে জলের ঢেউ একের পর এক ধাক্কা দিচ্ছে জাহাজটাকে আর দুলে দুলে উঠছে সেই জাহাজ মানে আমাদের ফ্লোটেল। একের পর এক ফটো তুলে চলেছি আর তন্ময় হয়ে দেখছি গঙ্গার রূপ গভীর নিশীথ রাতে। ডান দিকে দেখছি হাওড়া ব্রিজ আর জেটির আলো আর বাঁদিকে দেখছি দ্বিতীয় হুগলি ব্রিজের আলো আর মাঝখানে আমি রয়েছি জেগে এই অসাধারণ রূপ দেখার আশায়। কখনও কখনও একটা নৌকো লন্ঠন জ্বেলে চলছে মাছ ধরার আশায়। নিকষ কালো অন্ধকারে সেই চলমান নৌকো এক ভৌতিক আবেশ সৃষ্টি করেছে। দেখতে দেখতে অন্ধকার আস্তে আস্তে ফিকে হতে লাগল এবং ভোরের আলো ফুটে উঠল। কিন্তু সমস্ত রাত্রির জাগরণ শরীরে কোন ক্লান্তির ছাপ ই ফেলতে পারেনি কারণ আনন্দটা যে পরিমাণ উপভোগ করেছি তা ক্লান্তিকে আসতে দেয়নি। কেবিনে থাকা চায়ের ব্যবস্থা কাজে লাগিয়ে চাঙ্গা হয়ে সাতসকালেই হাঁটতে বেরিয়ে পড়লাম হাইকোর্ট পাড়ার গলিতে। ফিরে এসে স্নান করে দুর্দান্ত ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে পড়লাম বাড়ির দিকে। ফেরার পথে এলগিন রোডে আমূলের এক দোকানে নানাধরণের আইসক্রিমের স্বাদ চেটেপুটে নিয়ে সোজা বাড়ি।
অসাধারণ এই ফ্লোটেলে থাকার অভিজ্ঞতা বিশেষ করে রাতের বেলায় গঙ্গার এই আকর্ষণীয় রূপ চিরদিন মনে রাখার মতো।
No comments:
Post a Comment