Friday, 7 June 2024

মর্যাদার প্রতীক -- সেকাল ও একাল

মর্যাদার প্রতীক বলতে কি বোঝায়? কত সুন্দর প্রশস্ত জায়গা জুড়ে ঝাঁ চকচকে বাড়ি, দেশীর তুলনায় বহু বিদেশী মহা মূল্যবান গাড়ি, বাড়ির  বাইরে কড়া প্রহরা,  ঢুকতে বা বেরোতে গেলে যেখানে আদ্যোপান্ত বিবরণ জানিয়ে যেতে হয় এবং বোর্ডে লেখা দেখা যায় ," আপনি সি সি টিভির নজরবন্দী।" এইরকম বাড়ির  কোন ছেলে বা মেয়ে যদি বন্ধু হয় এবং নিজেরাও যদি সমগোত্রীয়  না হয় তাহলে বন্ধুত্ব তো কোন দূরস্থান,  স্বপ্নেও ভুলে ভাবতে পারা যায়না যে সেখানে কোন বন্ধু থাকে। যদিও  বা ছোটবেলায় কোন এক স্কুলে একই বিভাগে পড়ে থাকে এবং ঐ মর্যাদাশালী পরিবারের ছেলেটি যতই পিছনের  সারির হোক না কেন, অর্থের জোরে সে বিদেশে কোন এক কলেজে বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি হাসিল করে তুরীয়ানন্দে কোন  নামী কোম্পানির প্রায় সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত  হবে যেখানে তারই সঙ্গে পড়া প্রথম হওয়া ছাত্র অনেক নীচে কাজ করে। এ নিয়ে অনেক সিনেমা হয়েছে এবং ব্যাপারটা ক্লিশে হয়ে গেছে। সুতরাং ঐ বিষয়ে আলোচনা করে লোকের  বিরক্তি উৎপাদন না করাই ভাল। 
এইরকম  তথাকথিত একটা সমাজ গড়ে উঠেছে যারা মেঘনাদের মতো আকাশেই ওড়েন এবং মাঝে মাঝে যখন প্রয়োজন  পড়ে তখন মেঘের  ফাঁক থেকে এক চিলতে ঝলক দেখিয়ে সাধারণদের বলেন, " আমি আছি, আমি তোমাদের ই একজন।" কোন কাজে  আসেনা এরা সমাজের  কিন্তু সমস্ত রকম সুযোগ সুবিধা এঁরাই ভোগ করেন আর আপামর জনতা বিস্ফারিত  নেত্রে অবলোকন করেন  আর মনে মনে অস্ফূট স্বরে বলেন  আহারে কি কষ্টটাই না হচ্ছে বাছাদের আমাদের  কথা ভেবে। নিজেদের  হাজারো কষ্ট থাকলেও  দেঁতো হাসি হেসে বলেন আপনারা এত কষ্ট করে আপনাদের মূল্যবান সময় নষ্ট করে আমাদের কষ্ট লাঘব করার জন্য  এসেছেন,  এতেই আমরা ধন্য। সবসময়ই  এক  প্রজাসুলভ মনোভাব  নিয়ে জোড় হাত করে আপামর জনতা তাদের আশীর্বাদ জানায় সেই রাজপুত্রকে,  তা তিনি যতই ভণ্ড  হোন বা অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত হোন না কেন। এটা একদিনে হয়নি, দীর্ঘদিন দাসত্ব করার  ফল এটা। বহুদিন নবাবী আমলে এবং পরবর্তীকালে ব্রিটিশদের অধীনে কাজ করার  সুবাদে আমাদের শিরায় ও ধমনীতে প্রবাহিত রক্তে চালিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত  দাসত্বের বীজ। এর একমাত্র  সমাধান  এই দূষিত রক্ত শরীর থেকে নিষ্কাশিত করে স্বাধীনতার  বীজ বপন করা। এটা কি করে সম্ভব? হ্যাঁ রাস্তা আছে, সেই রাস্তার নাম শিক্ষা। প্রকৃত শিক্ষাকে যদি সার্বজনীন করা যায় তাহলে ঠিক  ও ভুলের মধ্যে পার্থক্য  খুঁজে বের করতে পারবে এবং এই ব্যক্তিপূজার অবসান  হবে।
মনে হচ্ছে আলোচনার বিষয়বস্তু থেকে একটু  লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে যাওয়া হচ্ছে। এ তো গেল এখনকার মর্যাদার  প্রতীক।  কিন্তু পঞ্চাশ ষাট বছর বা তার ও আগে মর্যাদার  প্রতীক  ছিল  অন্য রকম। একটু খোলসা করা যাক। অনেকদিন আগে তুলসীমঞ্চে প্রদীপ ( দিদিমা, ঠাকুমারা বলতেন পিদিম) জ্বালিয়ে  সন্ধ্যারতি শাঁখের আওয়াজের সঙ্গে এবং ঘরে ঘরে জ্বলে ওঠা লন্ঠনে বোঝা যেত  তাঁরা কত বড় বাবু। লণ্ঠনের আলোয় পড়তে বসা সব ছেলেমেয়েদের আওয়াজের মাধ্যমে বোঝা যেত কি ধরণের  বাড়ি। যদি সেই বাড়িতে লণ্ঠনের জায়গায় ইলেকট্রিক  লাইট জ্বলত,  তাহলে শুরু হতো ফিসফিসানি। নিশ্চয়ই বাড়িতে কিছু বাড়তি অর্থাগম  হয়েছে সেটা ভাল ফসল হওয়ার জন্য ই হোক বা জমিজমা  বিক্রিপাট্টা করার জন্যই হোক। সিধুদের বাড়িতে সেদিন  একটা বেশ দরজাওয়ালা  ছোটখাট ঘর এল।  পরে জানা গেল যে ঐ ঘরথেকে জিনিসপত্র বের করলে খুব  ঠাণ্ডা লাগে হাত দিলে , যার নাম রেফ্রিজারেটর। বেশিরভাগ  লোকই  তো রোজ বাজার  যান, রোজ মাছ আনেন এবং রাতে শেষ হয়ে গেলে আবার  পরের দিন বাজার  যাওয়া। কোন কোন  সময় একটু বেশি আনা হয়ে গেলে ভেজে রাখা পরেরদিনের জন্য। মাছকে যে ফ্রিজে রেখে অনেকদিন ধরে খাওয়া যায় এই ধারণাই কারও ছিল না। আমরা খেলাধূলো করে সিধুদের বাড়ি যেতাম ঐ ঘর প্রমাণ ফ্রিজ  থেকে ঠাণ্ডা জল খাওয়ার জন্য আর সেই কারণেই সিধুর একটু রোয়াব সহ্য করতেই হতো। এর পরেই আবার  একটা আশ্চর্য হবার মতো ঘটনা। সিধুদের  বাড়িতে ফোন এল। পাড়ার মধ্যে এই একটাই ফোন।  বোঝাই যায় যে সিধু কোথা দিয়ে হাঁটছে। আর পাড়ার  লোকের ও হ্যাংলামি যেন দিন দিন বাড়তে লাগল। যে লোক জীবনেও  ভুল করে কারও  প্রয়োজনে  এগিয়ে আসেননি তিনিও সিধুদের  বাড়ির  ফোন নম্বর অন্যদের  দিয়ে দিলেন।  কিন্তু প্রত্যেক জিনিসের  একটা মাত্রা থাকা উচিত। তাঁরা বিপদে আপদে সবাইকে সাহায্য করেন বলেই  সবাই তার মজাটা লুটবে এটা হওয়া ঠিক নয়। একদিন  ফোনটা বেজে উঠল। বাড়িতে কেউ নেই, সুতরাং একরকম  বাধ্য হয়েই  সিধুর মা ধরলেন  ফোন। অপরপ্রান্তে একটি অল্পবয়সী মেয়ের গলা।" মাসিমা, একটু প্রণবকে ফোন টা দেবেন?"
" প্রণব, সে কে? আমিতো তাকে চিনিনা মা।"
সিধুর মা সাধারণত বাড়ির বাইরেই বেরোন না। পাড়ার কিছু ছেলেদের নাম তাঁর ছেলেদের  কাছে শোনেন বলে তবু কয়েক জন কে চেনেন । কিন্তু সে তো ডাক নাম। কিন্তু মেয়েটি সেই সময়ের তুলনায় বহু যোজন  এগিয়ে। বলল," মাসিমা প্রণব মানে পিনু।  ওর ডাকনাম পিনু। "
" ও পিনু! কিন্তু মা, ও তো থাকে আমাদের  বাড়ি থেকে পাঁচটা বাড়ি পরে। বাড়িতে এই মূহুর্তে কেউ তো নেই যে খবর দেব। তোমার  কিছু বলার  থাকলে বলো, আমি পরে খবর পাঠিয়ে দেব।"
" ঠিক আছে মাসিমা, ওকে বলে দেবেন  আমি সন্ধে বেলায় ওকে ফোন করব, ও যেন  থাকে।"
কি স্পর্ধা ! এতো সাঙ্ঘাতিক বেহায়া  মেয়ে। ফোনটাতো রেখে দিলেন।  কিন্তু পাড়ায় প্রণবের  নামে পড়ে গেল ঢিঢি। মুখচোরা প্রণব যেন আরও  গুটিয়ে গেল এই ফোনের  পরে। সিধুর বাবা নিতান্তই ভদ্রলোক।  কিন্তু সেই ভদ্রতার ও তো একটা সীমা আছে। পরিবারের সবাইকে বলে দিলেন মেসেজ টা নিয়ে রাখতে এবং সময় সুযোগ মতো খবরটা দিয়ে দেবার জন্য। সিধুদের  আমাদের  পাড়ার  সবচেয়ে সচ্ছল পরিবার। কোন কিছু নতুন  জিনিস ওদের বাড়িতেই প্রথম আসে। মহালয়ার আগে বাড়িতে এসে গেল এক পেল্লাই ফিলিপসের রেডিও।  সিধুর মা আমার  মাকে এসে বলে গেলেন,  " দিদি, বাড়িতে নতুন রেডিও  এসেছে। কাল ভোরবেলায় চলে আসবেন,  একসঙ্গে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের মহিষাসুর মর্দিনী শুনব। আমার  মনে একটু লাগল।  আমাদের  বাড়িতে রেডিও নেই বলে আমাদের  পাশের  বাড়িতে গিয়ে শুনতে হবে?  না কখনোই নয়। কিন্তু যারা বড়লোক,  তারা নিজেদের অন্যদের কাছে একটু জাহির  করতে না পারলে ঠিক  যেন  সন্তুষ্ট হতে পারেনা। ভোরবেলায় রেডিও তে কুঁ উ, কুঁকুঁকুঁ উ, কুঁকুঁকুঁউ, কুঁকুঁকুঁউ শুরু হতেই পাড়ার সমস্ত লোক হামলে পড়ল। প্রথমে ওদের  বাড়ির  বারান্দা , তারপর আমাদের  বাড়ির  বারান্দা ভরে উঠল। ওদের  বাড়িতে না গিয়ে ও ঘুমের  বারোটা গেল বেজে। মহিষাসুর মর্দিনী তো তখনকার  মতো শেষ  হলো কিন্তু এরপরেও বহুদিন  মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গলের ম্যাচ অজয় বসু, কমল ভট্টাচার্য ও পুষ্পেন সরকারের ধারাবিবরণীতে পাড়ার  সমস্ত  লোকজনদের অনেক আনন্দ  দিয়েছে। কিন্তু আমার  নজর ছিল সিধুর দাদা বিনোদ দার সাইকেলের উপর।ঝকঝকে বটল গ্রীন রঙের সাইকেল,  পুরো চেনকভার,  পিছনের  টায়ারে লেগে থাকা এক ব্যাটারি,  সাইকেল চললেই  টায়ারের ঘর্ষণে সাইকেলের হেডলাইট, পিছনের  লাইট জ্বলত  এবং গাড়ির  হর্ণের  মতো পিঁপ পিঁপ করে আওয়াজ করত। স্ট্যাণ্ডের উপর দাঁড়ানো সাইকেলের  উপর সূর্যর আলো যখন  তেরচা ভাবে পড়ত তখন  আমার  মনে হতো যেন  পক্ষীরাজের ঘোড়া -- মর্যাদার  এক মূর্ত প্রতীক।  শুধু আমাদের  পাড়া কেন সমস্ত শহরে ঐরকম  সাইকেল  আর দুটি দেখিনি।
এখন তো অনেক বড়লোকের ছেলেমেয়েরা বাবার পয়সায় মার্সিডিজ বেঞ্জ বা অডি বা পর্শ চালিয়ে তাদের মর্যাদা জাহির করছে কিন্তু আগের দিনে একটা ঝকঝকে সাইকেল ই ছিল মর্যাদা রক্ষার পক্ষে যথেষ্ট। এখন তো সমস্ত লোকের পায়ে নানাধরণের জুতো বা চটি কিন্তু এ বেশিরভাগ লোকই খালি পায়ে যাতায়াত করত।  হাওয়াই চটির চল অনেক পরে।
ঠা ঠা রোদে খালি পায়ে পথ চলা ছিল এক দুঃসাধ্য ব্যাপার। অনেক সময় রোদে তেতে ওঠা বালির  চরে হাঁটতে বাচ্চাদের পায়ে গাছের পাতা বেঁধে দিত তার বাবামায়েরা।   রিস্ট ওয়াচ হাতে গোনা লোকের হাতে দেখা যেত। এখন লোকের  হাতে পয়সা এসেছে, না খেয়ে লোকের মৃত্যু এখন প্রায় শোনাই যায়না। আটানব্বই নিরানব্বই সালে বিশাল সাইজের মোবাইল খুব কম সংখ্যক লোকের কাছে ছিল  যেটা এখন এক বিপ্লবের  আকার  ধারণ করেছে।  এখন জনমজুর,  কাজের দিদিদের  হাতেও দামী  মোবাইল বলতে থাকে এ দেশের  জিডিপি বেড়েছে। আকাশ  কি উপর থেকে নীচে নেমে এল না আমাদের গতি ঊর্ধগামী?

No comments:

Post a Comment