Wednesday, 3 July 2024

পক্ষীরাজ ঘোড়া

শৈশবে বড়মার কাছে গল্প শুনতাম নানা ধরণের গল্প। বড়মার গল্প বলার ভঙ্গীটা ছিল ভীষণ সুন্দর। গল্প বলার মধ্য দিয়েই  নিয়ে যেতেন সেই কল্পলোকে । চোখ দুটো বড় বড় করে শুনতাম আমি আর ছোড়দি। বড়মা ছিলেন সদরপুর রাজবাড়ীর মেয়ে। তখনকার দিনে স্কুল কলেজে না গেলেও বাড়িতে মাস্টারমশাই আসতেন এবং  বাড়ির মেয়েদের শিক্ষা দিতেন এবং এইভাবেই হয়তো সময়ের তুলনায় এগিয়ে থাকতেন। সেই মুখে শোনা পক্ষীরাজ ঘোড়ায় চড়ে রাজপুত্র যেতেন দূরদূরান্তের গহন বনে থাকা রাক্ষস বা ডাইনির কাছে বন্দী রাজকন্যাকে উদ্ধার করতে। ঘোর যুদ্ধে অবশ্যই জয়ী রাজকুমার রাজকন্যাকে উদ্ধার করে পক্ষীরাজ ঘোড়ায় চড়ে ফিরতেন নিজের রাজ্যে এবং  তারপর মহাসমারোহে তাদের বিয়ে হয়ে যেত। এই গল্পটাই বড়মার কাছে বারবার শুনতে চাইতাম আর ছোড়দির চাহিদা ছিল অন্য গল্পের । এ নিয়ে মাঝে মধ্যেই  খিটিমিটি লেগে যেত আমাদের মধ্যে কিন্তু বড়মা ঠিক বুঝিয়ে সুঝিয়ে দুজনকেই নিরস্ত করতেন। মাঝেমাঝেই গল্প শোনার মধ্যে জিজ্ঞেস করতাম এই পক্ষীরাজ ঘোড়া কি এবং আমরা এখন তাকে দেখতে পাইনা কেন? বড়মা বলতেন যে বহুদিন আগে গ্রীস দেশে পার্সিউস বলে একজন পরম শক্তিশালী রাজা ছিলেন এবং  তিনি মেডুসাকে গলা কেটে হত্যা করেন । ঐসময় মেডুসা ছিল সন্তান সম্ভবা। পসাইডন ছিল তার স্বামী । আরও  বলেছিলেন যে মেডুসার চোখ  যার দিকে পড়বে, সে  পাথর হয়ে যাবে। একটা হেলমেট পড়ে পার্সিউস ঘুমন্ত অবস্থায় মেডুসার গলা কেটে  দেয় এবং  তার মাথাটা একটা থলির মধ্যে ভরে নেয়। গলা কাটার সময়  ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসে এবং  জন্ম হয় দুধ সাদা পক্ষীরাজ ঘোড়া  বা পেগাসাসের যার ছিল দুটো ডানা এবং  সে উড়তে পারত প্রচণ্ড বেগে। এরপর পার্সিউস উদ্ধার করে  রাজকুমারী অ্যান্ড্রোমিডাকে এবং  তাকে সঙ্গে নিয়ে আসে।

স্বপ্নালু চোখে সামনে দেখতাম দুধ সাদা পক্ষীরাজ ঘোড়া তার ডানা ঝটপটিয়ে আহ্বান করছে তার পিঠে চড়ার জন্য আর আমিও যখন ই সাড়া দিয়েছি, মায়ের হাতের চাপড় একটু জোরালো ভাবেই পড়েছে আর একটু ভারী গলায় আওয়াজ ঘুমিয়ে পড় শুনেছি । কখনোই  সেই স্বপ্ন সাকার হয়নি এবং আমারও  রাজপুত্র হয়ে ওঠা হয়নি,  রাজকন্যা উদ্ধার তো দূরস্থান । 
কিন্তু একটা কথা ঠিক যে মনে মনে কোন  বাসনা যদি থাকে তাহলে ভগবান কোন না কোন ভাবে সেই মনস্কামনা পূর্ণ করেন । আমারও ভাগ্যে সেই শিকে ছিঁড়ল।আমাদের  পঞ্চপাণ্ডবের জ্যেষ্ঠ যুধিষ্ঠিরের বাড়িতে অসুখ বিসুখ,  অর্জুন ও নকুল পাড়ি দিয়েছে সুদূর আমেরিকায়। রয়েছে কেবল ভীম ও সহদেব। ভাইজাগে থাকাকালীন পঞ্চপাণ্ডবের সঙ্গে একটা জমাটে বাঙালি সমাজ গড়ে উঠেছিল এবং  এখনও  তা অক্ষুণ্ন । ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেলেও অটুট রয়েছে তাদের  স্মৃতি এবং কোন অনুষ্ঠানে হয় সকলের দেখা সাক্ষাত আর রোমন্থন হয় পুরনো দিনের  স্মৃতি। এইরকম ই আমাদের  চোখের সামনে জন্ম নেওয়া একটা ছোট্ট মেয়ের বিয়ে প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে  এক শহরতলীতে।বহুদিন আগে থাকা পঞ্চপাণ্ডবরা যৌবনকে ফেলে  এসে হয়েছেন প্রৌঢ় বা বৃদ্ধ এবং কালের গতিতে সেই ছোট্ট শিশুকন্যা আজ যুবতী এবং  তারই বিয়ে । ভীমের কাছে থাকা এক পক্ষীরাজ ঘোড়া ই আজ ভীম, বলধরা ও সহদেব এবং বিজয়ার বাহন এবং  অবশ্যই সারথী সঞ্জয় । এই পক্ষীরাজের আছে চারটে পাখা এবং  পেটের তলায় ও রয়েছে  আরও একটি। বিকেল পাঁচটা নাগাদ রওনা দেবার  মুখেই একটা  পাখা একটু  দুর্বল মনে হতেই পেটের কাছে থাকা পাখনা লাগানো হলো। মিনিট কুড়ি হলো দেরী কিন্তু সঞ্জয়ের পরিচালনায়  পক্ষীরাজ  তীব্র গতিতে এগিয়ে চলেছে, পিছনে পড়ে রয়েছে আরও  অনেক আধুনিক ও উন্নতমানের  পক্ষীরাজ । কথায় আছে পুরনো চাল ভাতে বাড়ে এই কথাটা ভীমের পক্ষীরাজ আবার  প্রমাণ করল। যাত্রাপথের শেষ লগ্নে শুরু হলো প্রচণ্ড বৃষ্টি, সামনে প্রায় কিছুই  যায় না দেখা।  এই পক্ষীরাজের সামনে আবার জোড়া দুটো ছোট ছোট  হাত যা বৃষ্টির জলের ঝাপটা সামলাচ্ছে আর আওয়াজ হচ্ছে  ফটাস ফটাস। অজানা অচেনা জায়গায় ভীম একটু বেশি রকম ই বিচলিত, সহদেব এবং সঞ্জয়কে বারবার বলছে লোকজনকে জিজ্ঞেস করতে যে পক্ষীরাজ  ঠিকঠাক চলছে কি না কিন্তু  কে রহিবে এই ঘনঘোর বর্ষায় দিক নির্দেশের তরে? কিন্তু অবিচলিত  পক্ষীরাজ পৌঁছে গেল। গন্তব্যস্হলে  মসৃণগতিতে সারথি সঞ্জয়ের নির্দেশনায় ।
দেখা হতে থাকল সেই পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে, শুরু হল কুশল বিনিময় এবং আক্রমণ ট্রে হাতে কিশোরীদের । কারও  হাতে রয়েছে স্ন্যাকস,  কারও হাতে  কফি আবার কারও  হাতে সুস্বাদু জিলাপী । কেউ কেউ আক্রমণ প্রতিহত করছে তাদের  হাত থেকে নিয়ে আবার  কেউ বা উদাসীন, গল্পতেই মত্ত। ভীম সবাইকে খুশি করছে আর করবেনা এটা ভাবাই অমূলক। সহদেব কেমন একটু লাজুক, একবার একটু নিয়েই গুটিয়ে গেল। কিন্তু কফির অনুরোধ  উপেক্ষা করতে না পেরে দু কাপ নিয়ে নিল।
হাসি, ঠাট্টা, মশকরা চলছে সমানে অথচ বরের দেখা নাই রে , বরের দেখা নাই, আটকে আছে জ্যামে। আবার  অনেক দূরের রাস্তা, বৃষ্টিও হয়েছে,  ফিরতে হবে। তাই ডান হাতের  কাজটা ইতিমধ্যে  সেরে ফেলাটাই ভাল। আর তা করতে করতে পাত্র এসে গেলে দেখা হয়ে যাবে আমাদের  সেই ছোট্ট মেয়েটার জীবনসঙ্গী কে হতে চলেছে ।  তারপর এক ঝলক চোখে দেখেই নিজ গৃহে প্রত্যাগমন।
খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে ওপর তলায়। এখানে ব্যুফে সিস্টেম নয়, বসে খাওয়া, আজকাল যা প্রায়ই উঠেই গেছে। দুটো ব্যবস্থারই  সুবিধা অসুবিধা রয়েছে। ব্যুফেতে অনেক লোক একসঙ্গে নিজের পছন্দ মাফিক খেতে পারে এবং কোন  বিশেষ পদ ভাল হলে তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যেতে পারে  আর অন্য পদগুলো থেকে যেতে পারে। কিন্তু এখানে বসার জায়গা অপ্রতুল হলে কারও প্লেটের ঝোল জন্য  কারও জামাকাপড়  নষ্ট করে দিতে পারে। আর টেবিল চেয়ার ব্যবস্থায়  যারা খাবার  দিচ্ছে তারা ইচ্ছে করলে খাওয়ার বারোটা বাজিয়ে দিতেপারে। একটা জিনিস খাওয়া শেষ না হতেই আরও একটা জিনিস  দিয়ে পুরো স্বাদটাই বদলে দিতে পারে। কিন্তু তারা  যদি ভাল হয় তবে ধীরে সুস্থে লোকজন একটু আরামে খেতে পারে। তবে যদি মনে করা যায়  যে সব জিনিস তো একটাই জায়গায় পৌঁছে যাবে তাহলে আর কোন অসুবিধে নেই ।
খাওয়া শেষ । ব্যাণ্ডপার্টির আওয়াজে বোঝা গেল যে পাত্রপক্ষ হাজির। ম্যারেজ রেজিষ্ট্রার বেশ খানিকক্ষণ আগেই এসে গিয়ে  একটু উসখুশ করছিলেন আর মাঝেমাঝেই বন্ধুকে জিজ্ঞেস করছিলেন পাত্রের আসা আর কতদূর। যাই হোক,  তিনি স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন । আর একটু সময় গেলেই  পকেটে আসবে মোটা টাকা এবং  বিশেষ  উপঢৌকন।
পক্ষীরাজ হাজির। সারথি সঞ্জয়ের খাওয়া হয়নি।তাকে একটা সুদৃশ্য থলিতে দেওয়া হয়েছে একটা ওজনদার বাক্স কিন্তু ফেরার তাগিদে সেটা আর খুলে উঠতে পারেনি বেচারা। বৃষ্টির তোড় বাড়তে থাকল কিন্তু  পক্ষীরাজের সামনে বৃষ্টি ও মানল  হার। তীরের গতিতে এগিয়ে চলেছে আমাদের পক্ষীরাজ । আবার ও বিপত্তি শেষ লগ্নে। আরও  একটা ডানা গেল ভেঙে । রাত সাড়ে এগারটা বেজে গেছে। ভীম পক্ষীরাজকে একা ছাড়তে রাজি নয় আবার সঞ্জয়ের  হাতেও ছাড়তে রাজি  নয় ।সহদেব কয়েকজন নগরপ্রহরীকে অনুরোধ  জানালো পক্ষীরাজকে একটু আস্তানা দিতে কিন্তু কেউ সেই অনুরোধ রাখল না। অতএব স্থির হলো যে সহদেব বলধরা এবং  বিজয়াকে নিয়ে অন্য  একটা বাহনে বাড়ি ফিরে আসবে এবং ভীম সঞ্জয় কে নিয়ে পক্ষীরাজের ভাঙা ডানা নিয়ে কোন ডাক্তার বাবুর কাছে নিয়ে যাবে। রাত্রি বারটা বেজে গেছে । বলধরা ইতিমধ্যে একটু অসুস্থ  হয়ে পড়েছে । সহদেব এবং বিজয়া বলধরাকে  বাড়ি পৌঁছে দিয়ে ওষুধ খাইয়ে বাড়ি ফিরে যখন এল তখন  বাজে রাত একটা। এদিকে ভীমের ও  পক্ষীরাজের ডানা সারিয়ে ফিরতে রাত একটা বেজে গেছে । 
এবার আমাদের  পক্ষীরাজের পরিচয় করানো যাক। এখানে পক্ষীরাজের বা বা মারুতি হচ্ছে  পসাইডন এবং মা মেডুসা হচ্ছে সুজুকি।



No comments:

Post a Comment