অনেকদিন ধরেই নাতি নাতনিরা আবদার করছে ওদের সঙ্গে কিছুদিন কাটিয়ে যাওয়ার কিন্তু নানা কারণে তা আর হয়ে উঠছে না। এবার কিন্তু আর ছাড় পাওয়া গেলনা। ছেলে টিকিট কেটে পাঠিয়ে দিয়েছে, আর বারবার তাদের অনুরোধ ফেলাও যাচ্ছে না। ভাইফোঁটার দিন সন্ধের ফ্লাইটে রওনা দেওয়া হলো। দুজনের ই হুইল চেয়ারের ব্যবস্থা হয়েছে। এতে সুবিধা ও আছে আবার অসুবিধা ও রয়েছে । মালপত্রের সঙ্গে নিজেদেরকেও একটা লাগেজের( মাল বলতে একটু লজ্জ্বা লাগল) মতন মনে হতে লাগল। দিব্যি হেঁটে যাওয়া যায় তবে অনেকটা রাস্তা চলতে হবে।এ ছাড়াও রয়েছে চেক ইন করা, সিকিওরিটি চেক করার সময় মোবাইল, মানি ব্যাগ মায় কোমরের বেল্টটা পর্যন্ত খুলে এক্সরে মেশিনে চেক করানো এক ভীষণ ঝামেলার ব্যাপার যেটা সামলে দেয় ঐ হুইল চেয়ার বাহকেরা। নিজেরা বোকার মতো হুইল চেয়ারে বসে সবকিছুই লক্ষ্য করা একটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মোকাবিলা করা। সিকিওরিটির লোকজন একটু করুণার সঙ্গে ব্যবহার করে এটা ভাবলেই কেমন ভেতরে ভেতরে কুঁকড়ে যেতে হয়। যাই হোক, হুইল চেয়ারে বসলে লাইনে না দাঁড়িয়ে অন্যদের টাটা বাই বাই করে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে এগিয়ে যাওয়া। হাতে যে ব্যাগটা যাবে তাকে কোলের ওপর বসিয়ে বেল্ট বাঁধা অবস্থায় চেয়ারে অসহায়ভাবে বসে থাকা । একা থাকলে খুবই বিশ্রী লাগত কিন্তু দুজনে থাকায় একটু কম হয়েছিল অস্বস্তি। কিন্তু বোর্ডিংয়ের সময় একেবারে শেষে হুইল চেয়ারের যাত্রীদের নিয়ে যাওয়া মানে প্রায় দুঘন্টার বেশী সময় ধরে ঐ বাঁধা ছাঁদা অবস্থায় বসে থাকা কোন সুখকর পরিস্থিতি নয়। এয়ারোব্রিজ হলে গড়গড়িয়ে প্লেনের দরজা অবধি পৌঁছে যাওয়া যায় কিন্তু বাসে করে গিয়ে তারপর সিঁড়ি দিয়ে একটা প্রায় আশি কেজির জ্যান্ত লাগেজকে ওঠানো সেটা খুব সহজ সাধ্য নয়। কিন্তু ঐ অবস্থায় চেয়ার থেকে নেমে আমি চলে যেতে পারব বলাটাও নিজেকে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করা ছাড়া আর কিছুই নয়। এয়ারলাইন্সের নিয়ম অনুযায়ী ঐ হুইল চেয়ার বাহকদের কিছু টাকা পয়সা দেওয়া বারণ। ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি যে হুইল চেয়ার ব্যবহারকারীদের কাছে কিছু টাকা নেওয়া উচিত আর সেক্ষেত্রে নিজেদের অপরাধ বোধে ভুগতে হয়না। যাই হোক দুঘন্টা ধরে বোর্ডিং গেটের সামনে বসে নানা ধরণের যাত্রীদের নানারকম ব্যবহার লক্ষ্য করা সেটাও একটা বিরাট ব্যাপার । ভিনদেশী একটা ছোট্ট শিশু নিজের মনে গান করে চলেছে, ভাষাটা বুঝতে না পারলেও সুরেলা মিষ্টি সুর সব বাধা অতিক্রম করে মনে যথেষ্ট আনন্দের সঞ্চার করছে। একে একে সবাই চলে গেল নিজেদের গন্তব্যস্হলের প্লেনের দিকে, চলে গেল সেই মিষ্টি বাচ্চাটাও। বোর্ডিংয়ের সময়ে একটা জিনিস নজরে এল। প্রায়োরিটি বোর্ডিং বলে একটা কথা কানে এল। যারা বিজনেস ক্লাস বা এক্সিকিউটিভ ক্লাস বা প্রিমিয়ার ইকনমি ক্লাসের যাত্রী তারা একটু আগে যাবেন । একজন সাধারণ ইকনমি ক্লাসের টিকিটধারী তাদের সঙ্গে একসাথে যেতে পারবেন না। কথাটা কানে গেল যখন একজন সাধারণ ইকনমি ক্লাসের যাত্রী হয়তো ঠিকমতন না শুনেই ঐ প্রায়োরিটি বোর্ডিং এর যাত্রীদের সঙ্গে যেতে গিয়েছিলেন এবং তাঁকে যেতে দেওয়া হলোনা এবং বলেও দেওয়া হলো। ব্যাপার টা হচ্ছে ফেল কড়ি মাখো তেল।
এরপর ই শুরু হলো আমাদের বোর্ডিং। সবশেষে আমরা চারজন হুইল চেয়ারের যাত্রী।
নাতি নাতনিদের কাছে বলা হয়নি যে আমরা তাদের সঙ্গে কদিন কাটাতে আসছি। হঠাৎই এসে তাদের সারপ্রাইজ দেওয়াটাই উদ্দেশ্য । কিন্তু বাচ্চারা ভীষণ বুদ্ধিমান । তারা ঠিক জেগে বসে আছে। আট বছরের মিশু আর সাড়ে চার বছরের লিও, ওরাই আমাদের সারপ্রাইজ দেওয়াটা বানচাল করে দিল যারা নটার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ে তারাই সাড়ে এগারটা অবধি জেগে আমাদের ভালোবাসায় ভরিয়ে দিল। বুড়ো বয়সের সমস্যা হলো যে একজায়গায় যেখানে ওঁরা থাকেন সেইখানে ই তাঁরা খুব স্বচ্ছন্দে থাকেন এবং বাইরে বেড়াতে গেলেও দুচারদিনের বেশী থাকতে চাননা । যদিও মিশু এবং লিওর খুব ব্যস্ত শিডিউল কিন্তু তাদের ওর ই মধ্যে অন্ধকার রাতে বিদ্যুত ঝলকের মতো উপস্থিতি আমাদের মতো বুড়োবুড়িদের শরীরে অক্সিটোসিনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় এবং ভালবাসা আরও কিছুদিন বাঁচার তাগিদ বাড়িয়ে দেয়।
দুর্দান্ত হয়েছে লেখাটা। আমাদের শ্যামলদা এখন নাতি নাতনীদের ভালোবাসায় সমৃদ্ধ হয়েছেন।
ReplyDelete